দেশব্যাপী সার সংকটের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ডিলার ও পাচারকারী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশের ভেতরে কৃষকেরা সারের জন্য হাহাকার করলেও অধিক মুনাফার আশায় প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে ইউরিয়া ও টিএসপি সার। মূলত বস্তাপ্রতি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা লাভের আশায় ডিলারদের একটি অংশ এই পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে দেশে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে এবং কৃষকেরা চড়া দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ, চট্টগ্রাম ও ভোলার উপকূলীয় এলাকা পাচারের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সর্বশেষ গত শনিবার ভোলার তজুমদ্দিনে মেঘনা নদী থেকে মিয়ানমারে পাচারের সময় ৮ হাজার কেজি ইউরিয়া সার জব্দ করেছে কোস্টগার্ড। এর আগে সীতাকুণ্ড, হালিশহর ও রামুতে আরও বড় কয়েকটি চালান ধরা পড়ে।
কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বলেন, ‘সার নিয়ে একটি চক্র ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু নজরদারির কারণে তা সফল হয়নি। বর্তমানে দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আমরা নতুন ডিলার নিয়োগসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। আশা করছি, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’
অধিক লাভের প্রলোভন
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের দাম যেখানে ১ হাজার ২৫০ টাকা, মিয়ানমারে তা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এই বিশাল মূল্য ব্যবধানই পাচারকারীদের প্রলুব্ধ করছে। অনেক ক্ষেত্রে ডিলাররা কালোবাজারে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় সার বিক্রি করছেন, যা শেষ পর্যন্ত সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে কৃষকের দুর্ভোগ
রাজশাহী, সাতক্ষীরা, লালমনিরহাট ও সিলেটে সারের তীব্র সংকটের খবর পাওয়া গেছে। লালমনিরহাটে ডিলারদের কারসাজির প্রতিবাদে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। খুলনায় সরকারি মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ দামে সার বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যশোরের ঝিকরগাছা ও সদরের কৃষকেরা জানান, দোকানে দোকানে ঘুরেও সার মিলছে না, আর মিললেও দিতে হচ্ছে দ্বিগুণ দাম।
কুড়িগ্রাম ও রংপুরের কৃষকদের অবস্থাও শোচনীয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক চাষি সার পাচ্ছেন না। জামালপুরে বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
মজুত পর্যাপ্ত, তবু অস্থিরতা কেন?
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া মিলিয়ে ১২ লাখ ২৯ হাজার ৪০০ টন সার মজুত আছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ লাখ ২৭ হাজার টন এবং টিএসপি ৩ লাখ ৫২ হাজার ৮০০ টন। গত বছরের তুলনায় এই মজুত অনেক বেশি। পাইপলাইনে আরও সাড়ে ৪ লাখ টন সার রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরেও সংকটের প্রধান কারণ পাচার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি।
রামু বিজিবি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আনোয়ার এবং কোস্টগার্ডের লেফট্যানেন্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানিয়েছেন, সীমান্ত ও উপকূলীয় পথে পাচার রোধে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন।
আপনার মতামত লিখুন