সংবাদ

বাংলাদেশের সারে মিয়ানমারে বোমা তৈরির অভিযোগ


প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম
প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২২ পিএম

বাংলাদেশের সারে মিয়ানমারে বোমা তৈরির অভিযোগ
ছবি : সংবাদ

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ইউরিয়া সার পাচার হচ্ছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের সাম্প্রতিক অভিযানে উদ্ধার হওয়া সারের চালানগুলো এই অবৈধ পাচারের ভয়াবহ চিত্র সামনে আনছে। তবে উদ্বেগের নতুন কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশের কৃষিকাজে ব্যবহৃত এই ইউরিয়া সার দিয়ে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মারাত্মক বিস্ফোরক ও বোমা তৈরি করছে এবং তা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে কয়েকটি আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র নিয়মিত ইউরিয়া সার, ব্যাটারির অ্যাসিড, কয়লা, চিনি এবং রড-সিমেন্টসহ নানা ধরনের নির্মাণসামগ্রী মিয়ানমারে পাচার করছে। মিয়ানমারের কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী স্থানীয় চোরাকারবারীদের কাছ থেকে চড়া দামে এসব পণ্য কিনে নিচ্ছে।

সূত্রে প্রকাশ, সীমান্তপথে এসব পণ্য পাচারে উখিয়া-টেকনাফ, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক অন্তত ১৫ থেকে ২০টি সিন্ডিকেট সরাসরি জড়িত। এসব চক্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে এক শ্রেণির রোহিঙ্গা। ক্যাম্পের সূত্রগুলো দাবি করছে, আরাকান আর্মি (এএ), মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ), তা'আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ), কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ) এবং আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)-সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী পাচারকারীদের কাছ থেকে সরাসরি এসব রাসায়নিক ও নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহ করছে। পুরো বেচাকেনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে রোহিঙ্গাদের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী।

সার পাচারের মাধ্যমে বোমা তৈরির রাসায়নিক সংযোগ নিয়ে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পার হওয়া ইউরিয়া সারের রাসায়নিক উপাদান দিয়ে বিস্ফোরক তৈরি করা সম্ভব। নির্দিষ্ট রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ইউরিয়াভিত্তিক উপাদানগুলো শক্তিশালী বোমা বানাতে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সূত্রে প্রকাশ।

রাসায়নিক ব্যাখ্যার বিষয়ে কক্সবাজার সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) সাবেক সহকারী রসায়নবিদ মোহাম্মদ হারুনুর রশীদ গণমাধ্যমকে বলেন, “কৃষিতে ব্যবহৃত ইউরিয়া সারে প্রায় ৪৬ শতাংশ নাইট্রোজেন থাকে। সাধারণ অবস্থায় ইউরিয়া সার নিরাপদ এবং নিজে থেকে বিস্ফোরক নয়। তবে নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাইট্রোজেনযুক্ত উপাদান আলাদা করে বিপজ্জনক বিস্ফোরকের ‘প্রিকারসর’ বা পূর্বধাপের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যায়। একইভাবে পাচার হওয়া ব্যাটারির অ্যাসিডও বিস্ফোরক তৈরিতে অপব্যবহার হতে পারে।”

উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্যাসেট অ্যান্ড আইডি প্রোটেকশন নির্দেশিকা’ (CISA)-তেও ইউরিয়াকে সম্ভাব্য বিস্ফোরক তৈরির পূর্বধাপের রাসায়নিকের তালিকায় রাখা হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক কনস্যুলেট প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “কারিগরিভাবে ইউরিয়া সার থেকে বিস্ফোরক তৈরি করা পুরোপুরি সম্ভব। তবে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ইউরিয়া ব্যবহার করে মিয়ানমারের কোনো নির্দিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী সরাসরি বোমা বানাচ্ছে বা ব্যবহার করছে কি না, সে ব্যাপারে আমার কাছে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।”

সীমান্তে কড়া নজরদারি সত্ত্বেও যেভাবে কৌশল বদলে সারের মতো সংবেদনশীল রাসায়নিক সীমান্ত পার হচ্ছে, তা জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬


বাংলাদেশের সারে মিয়ানমারে বোমা তৈরির অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ইউরিয়া সার পাচার হচ্ছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের সাম্প্রতিক অভিযানে উদ্ধার হওয়া সারের চালানগুলো এই অবৈধ পাচারের ভয়াবহ চিত্র সামনে আনছে। তবে উদ্বেগের নতুন কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশের কৃষিকাজে ব্যবহৃত এই ইউরিয়া সার দিয়ে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মারাত্মক বিস্ফোরক ও বোমা তৈরি করছে এবং তা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে কয়েকটি আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র নিয়মিত ইউরিয়া সার, ব্যাটারির অ্যাসিড, কয়লা, চিনি এবং রড-সিমেন্টসহ নানা ধরনের নির্মাণসামগ্রী মিয়ানমারে পাচার করছে। মিয়ানমারের কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী স্থানীয় চোরাকারবারীদের কাছ থেকে চড়া দামে এসব পণ্য কিনে নিচ্ছে।

সূত্রে প্রকাশ, সীমান্তপথে এসব পণ্য পাচারে উখিয়া-টেকনাফ, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক অন্তত ১৫ থেকে ২০টি সিন্ডিকেট সরাসরি জড়িত। এসব চক্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে এক শ্রেণির রোহিঙ্গা। ক্যাম্পের সূত্রগুলো দাবি করছে, আরাকান আর্মি (এএ), মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ), তা'আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ), কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ) এবং আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)-সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী পাচারকারীদের কাছ থেকে সরাসরি এসব রাসায়নিক ও নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহ করছে। পুরো বেচাকেনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে রোহিঙ্গাদের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী।

সার পাচারের মাধ্যমে বোমা তৈরির রাসায়নিক সংযোগ নিয়ে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পার হওয়া ইউরিয়া সারের রাসায়নিক উপাদান দিয়ে বিস্ফোরক তৈরি করা সম্ভব। নির্দিষ্ট রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ইউরিয়াভিত্তিক উপাদানগুলো শক্তিশালী বোমা বানাতে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সূত্রে প্রকাশ।

রাসায়নিক ব্যাখ্যার বিষয়ে কক্সবাজার সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) সাবেক সহকারী রসায়নবিদ মোহাম্মদ হারুনুর রশীদ গণমাধ্যমকে বলেন, “কৃষিতে ব্যবহৃত ইউরিয়া সারে প্রায় ৪৬ শতাংশ নাইট্রোজেন থাকে। সাধারণ অবস্থায় ইউরিয়া সার নিরাপদ এবং নিজে থেকে বিস্ফোরক নয়। তবে নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাইট্রোজেনযুক্ত উপাদান আলাদা করে বিপজ্জনক বিস্ফোরকের ‘প্রিকারসর’ বা পূর্বধাপের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যায়। একইভাবে পাচার হওয়া ব্যাটারির অ্যাসিডও বিস্ফোরক তৈরিতে অপব্যবহার হতে পারে।”

উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্যাসেট অ্যান্ড আইডি প্রোটেকশন নির্দেশিকা’ (CISA)-তেও ইউরিয়াকে সম্ভাব্য বিস্ফোরক তৈরির পূর্বধাপের রাসায়নিকের তালিকায় রাখা হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক কনস্যুলেট প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “কারিগরিভাবে ইউরিয়া সার থেকে বিস্ফোরক তৈরি করা পুরোপুরি সম্ভব। তবে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ইউরিয়া ব্যবহার করে মিয়ানমারের কোনো নির্দিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী সরাসরি বোমা বানাচ্ছে বা ব্যবহার করছে কি না, সে ব্যাপারে আমার কাছে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।”

সীমান্তে কড়া নজরদারি সত্ত্বেও যেভাবে কৌশল বদলে সারের মতো সংবেদনশীল রাসায়নিক সীমান্ত পার হচ্ছে, তা জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত