দেশের বিভিন্ন আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, বলাৎকার এবং যৌন হয়রানির ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
সাভারের একটি মাদ্রাসায় শিশুশিক্ষার্থী নির্যাতন ও ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এবং লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে শিক্ষার্থীদের শিকলে বেঁধে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। এসব ঘটনায় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, কঠোর আইনি প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোরালো তাগিদ দিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান জানান, সাভারে ওই মামলার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে পাঁচ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার মডেল থানা, আশুলিয়া থানা এবং গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একাধিক দল বরগুনা, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর ও রাজধানী ঢাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে তিনজন কিশোর ও ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, যাদের বয়স ১২, ১৩ ও ১৫ বছর এবং বাকি দুজন একই মাদ্রাসার শিক্ষক। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কয়েকজন অপরাধের কথা স্বীকার করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত আসামিদের কয়েকজন ঘটনার আগেই বিভিন্ন সময়ে মাদ্রাসা ত্যাগ করেছেন।
এদিকে লক্ষ্মীপুরের রামগতি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আলেকজান্ডার মাদরাসায়ে বাবুত তাকওয়া নামক প্রতিষ্ঠানে শিশুশিক্ষার্থীদের শিকলে বেঁধে শারীরিক নির্যাতনের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষের দরজা বন্ধ করে আদনান নামের এক শিশু শিক্ষার্থীকে এলোপাতাড়ি চড়-থাপ্পড় দেওয়ার পাশাপাশি তার মাথায় আঘাত করা হচ্ছে এবং স্কেল দিয়ে মারধর করা হচ্ছে।
অন্য একটি ভিডিওতে এক শিশুকে দেওয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করা এবং দুটি শিশুকে জানালার সঙ্গে শিকলে বেঁধে রাখার দৃশ্য দেখা যায়। ভয়ে ছোট শিশুরা সাধারণত বাড়িতে গিয়ে এসব নির্যাতনের কথা প্রকাশ করত না বলে জানান ভুক্তভোগী অভিভাবকরা।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক আবদুল মতিন প্রধান শিক্ষকের পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তবে প্রধান শিক্ষক ও ইসলামী আন্দোলন রামগতি পৌরসভার সভাপতি হাবিবুল্লাহ নীরব দাবি করেন যে তিনি সরাসরি জড়িত নন।
প্রধান শিক্ষক হাবিবুল্লাহ নীরব বলেন, "একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করেছে, আমরা তাকে বহিষ্কার করেছি। আমি এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়।"
ঘটনার আইনি পদক্ষেপ প্রসঙ্গে রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দীন জানান, "প্রধান শিক্ষক পলাতক আছেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিভাবকরা আমার কাছে এসেছিলেন, তবে কোনো লিখিত অভিযোগ করেননি।"
শিশু অধিকার সংগঠন ও মানবাধিকার আইনজীবীদের মতে, মাদ্রাসাগুলোতে এ ধরনের অপরাধ রোধে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে নারীপক্ষের সদস্য ও মানবাধিকার আইনজীবী কামরুন নাহার সুপারিশ করেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে, শারীরিক ও মানসিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ছাত্র সুরক্ষা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রতিটি মাদ্রাসায় শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে 'শিশু সুরক্ষা কমিটি' গঠন এবং বারান্দা ও শ্রেণিকক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা প্রয়োজন। কোনো ধরনের যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলে তা ধামাচাপা না দিয়ে অবিলম্বে অপরাধীকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করতে হবে এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়াও সমাজবিজ্ঞানীরা সুপারিশ করেন, শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের 'গুড টাচ' ও 'ব্যাড টাচ' সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং আবাসিক মাদ্রাসার শিশুদের আচার-আচরণে কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে অভিভাবকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও মাঠ পর্যায়ে এর কঠোর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ জন শিশুর ৯ জনই কোনো না কোনো ধরনের হিংসাত্মক আচরণের শিকার হয়। এমন পরিস্থিতিতে চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ নম্বরে ফোন করে সরাসরি আইনি ও সামাজিক সহায়তা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬
দেশের বিভিন্ন আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, বলাৎকার এবং যৌন হয়রানির ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
সাভারের একটি মাদ্রাসায় শিশুশিক্ষার্থী নির্যাতন ও ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এবং লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে শিক্ষার্থীদের শিকলে বেঁধে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। এসব ঘটনায় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, কঠোর আইনি প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোরালো তাগিদ দিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান জানান, সাভারে ওই মামলার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে পাঁচ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার মডেল থানা, আশুলিয়া থানা এবং গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একাধিক দল বরগুনা, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর ও রাজধানী ঢাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে তিনজন কিশোর ও ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, যাদের বয়স ১২, ১৩ ও ১৫ বছর এবং বাকি দুজন একই মাদ্রাসার শিক্ষক। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কয়েকজন অপরাধের কথা স্বীকার করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত আসামিদের কয়েকজন ঘটনার আগেই বিভিন্ন সময়ে মাদ্রাসা ত্যাগ করেছেন।
এদিকে লক্ষ্মীপুরের রামগতি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আলেকজান্ডার মাদরাসায়ে বাবুত তাকওয়া নামক প্রতিষ্ঠানে শিশুশিক্ষার্থীদের শিকলে বেঁধে শারীরিক নির্যাতনের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষের দরজা বন্ধ করে আদনান নামের এক শিশু শিক্ষার্থীকে এলোপাতাড়ি চড়-থাপ্পড় দেওয়ার পাশাপাশি তার মাথায় আঘাত করা হচ্ছে এবং স্কেল দিয়ে মারধর করা হচ্ছে।
অন্য একটি ভিডিওতে এক শিশুকে দেওয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করা এবং দুটি শিশুকে জানালার সঙ্গে শিকলে বেঁধে রাখার দৃশ্য দেখা যায়। ভয়ে ছোট শিশুরা সাধারণত বাড়িতে গিয়ে এসব নির্যাতনের কথা প্রকাশ করত না বলে জানান ভুক্তভোগী অভিভাবকরা।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক আবদুল মতিন প্রধান শিক্ষকের পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তবে প্রধান শিক্ষক ও ইসলামী আন্দোলন রামগতি পৌরসভার সভাপতি হাবিবুল্লাহ নীরব দাবি করেন যে তিনি সরাসরি জড়িত নন।
প্রধান শিক্ষক হাবিবুল্লাহ নীরব বলেন, "একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করেছে, আমরা তাকে বহিষ্কার করেছি। আমি এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়।"
ঘটনার আইনি পদক্ষেপ প্রসঙ্গে রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দীন জানান, "প্রধান শিক্ষক পলাতক আছেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিভাবকরা আমার কাছে এসেছিলেন, তবে কোনো লিখিত অভিযোগ করেননি।"
শিশু অধিকার সংগঠন ও মানবাধিকার আইনজীবীদের মতে, মাদ্রাসাগুলোতে এ ধরনের অপরাধ রোধে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে নারীপক্ষের সদস্য ও মানবাধিকার আইনজীবী কামরুন নাহার সুপারিশ করেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে, শারীরিক ও মানসিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ছাত্র সুরক্ষা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রতিটি মাদ্রাসায় শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে 'শিশু সুরক্ষা কমিটি' গঠন এবং বারান্দা ও শ্রেণিকক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা প্রয়োজন। কোনো ধরনের যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলে তা ধামাচাপা না দিয়ে অবিলম্বে অপরাধীকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করতে হবে এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়াও সমাজবিজ্ঞানীরা সুপারিশ করেন, শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের 'গুড টাচ' ও 'ব্যাড টাচ' সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং আবাসিক মাদ্রাসার শিশুদের আচার-আচরণে কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে অভিভাবকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও মাঠ পর্যায়ে এর কঠোর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ জন শিশুর ৯ জনই কোনো না কোনো ধরনের হিংসাত্মক আচরণের শিকার হয়। এমন পরিস্থিতিতে চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ নম্বরে ফোন করে সরাসরি আইনি ও সামাজিক সহায়তা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন