সংবাদ

হোটেল বয়ের কাজ করেও কৌশিকের ঈর্ষণীয় সাফল্য


জেলা প্রতিনিধি, কুড়িগ্রাম
জেলা প্রতিনিধি, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম

হোটেল বয়ের কাজ করেও কৌশিকের ঈর্ষণীয় সাফল্য
মায়ের সঙ্গে অদম্য মেধাবী বিশাল সরকার কৌশিক।

নিজেদের এক টুকরো জমিও নেই। অন্যের জমিতে ভাঙা চালাঘরে মাথা গুঁজে থাকা। সংসারের অভাব মোচন ও পড়াশক্ষার খরচ জোগাতে দিনমজুরি, হোটেল বয় ও টিউশনির কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও লক্ষ্যচ্যুত হননি। সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ প্লাস) পেয়ে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছেন বিশাল সরকার কৌশিক। তবে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের পথে এখন প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চরম দারিদ্র্য ও পরিবারের মাথার ওপর থাকা ঋণের পাহাড়

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী বাজারের পাশে কৌশিকদের জীর্ণ কুটির। সম্প্রতি তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোটখাটো ভাঙাচোরা তিনটি চালাঘরে চরম দারিদ্র্যের ছাপ। পুরোনো টিনের চালে অসংখ্য ফুটো। বাঁশঝাড়ের এক কোনায় খোলা রান্নাঘর। কৌশিকের মা কণা রানী একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের আয়া হিসেবে সামান্য সম্মানী পান। বাবা সুকুমার সরকার অসুস্থতা সত্ত্বেও পেটের দায়ে সপ্তাহে দুদিন হাটবারে খোলা জায়গায় ছোট চা-স্টল চালান। এই সামান্য আয়ে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা।

সংসারের চাকা সচল রাখতে গিয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে পরিবারটি। অভাব ও ছেলেমেয়েদের পড়াশক্ষার খরচ জোগাতে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন মা কণা রানী। সেই কিস্তি শোধ করার উপায় না থাকায় এনজিও ‘আশা’ থেকে আরও ৩০ হাজার টাকা ঋণ নেন। সব মিলিয়ে সপ্তাহে ২ হাজার ৩০০ টাকার কিস্তির চাপ এবং বিভিন্ন জনের কাছ থেকে নেওয়া আরও ৫০ হাজার টাকার দেনা পরিশোধ করতে গিয়ে দিশেহারা পরিবারটি।

মেধাবী এই তরুণের সংগ্রামের শুরুটা সহজ ছিল না। কাঁঠালবাড়ী বিদ্যাকানন থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পাওয়ার পর ১০ কিলোমিটার দূরে কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন কৌশিক। সেখানে এসএসসিতেও সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়ে তাক লাগিয়ে দেন। এরপর ভর্তি হন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে।

কৌশিক বলেন, “স্কুলে ভর্তির পর বন্ধুর দেওয়া পুরোনো প্যান্ট ও জুতো পরেই ক্লাস শুরু করেছিলাম। নবম শ্রেণি পর্যন্ত অর্থাভাবে কোনো প্রাইভেট পড়তে পারিনি। পরে কয়েকজন শিক্ষক ও এক প্রবাসীর সহায়তায় পড়াশেনা চালিয়ে গেছি। অনেক দিন অটো ভাড়ার অভাবে হেঁটে কলেজে গিয়েছি, সারাদিন অভুক্তও থাকতে হয়েছে। কষ্টের মাঝেও চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন থেকে সরেনি।”

কৌশিকের বাবা সুকুমার সরকার জানান, ২০২০ সালে সড়কের পাশে থাকা তার ছোট্ট দোকানটি উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই তাদের এই মানবেতর জীবন শুরু। এক প্রতিবেশীর বাঁশঝাড়ের পাশে বিনা ভাড়ায় অন্যের জমিতে তারা ঠাঁই পেয়েছেন। তার বড় ছেলে কর্ণ সরকার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে সম্মান শ্রেণিতে পড়ছেন এবং ছোট মেয়েকে এসএসসি পাসের পর বিয়ে দিয়েছেন।

বড় ভাই কর্ণ সরকার বলেন, “ছোট ভাইয়ের এমন অসাধারণ ফলাফলে আনন্দের পাশাপাশি আমাদের চোখে জল চলে এসেছে। এত খরচে সে কীভাবে মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করবে, সেটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।”

মা কণা রানী জানান, তাদের দুজনের সামান্য আয়ে সংসারের খরচই চলে না, এর ওপর রয়েছে সাপ্তাহিক কিস্তির চাপ। এমতাবস্থায় ছেলের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে সরকার ও দেশের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


হোটেল বয়ের কাজ করেও কৌশিকের ঈর্ষণীয় সাফল্য

প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

নিজেদের এক টুকরো জমিও নেই। অন্যের জমিতে ভাঙা চালাঘরে মাথা গুঁজে থাকা। সংসারের অভাব মোচন ও পড়াশক্ষার খরচ জোগাতে দিনমজুরি, হোটেল বয় ও টিউশনির কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও লক্ষ্যচ্যুত হননি। সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ প্লাস) পেয়ে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছেন বিশাল সরকার কৌশিক। তবে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের পথে এখন প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চরম দারিদ্র্য ও পরিবারের মাথার ওপর থাকা ঋণের পাহাড়

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী বাজারের পাশে কৌশিকদের জীর্ণ কুটির। সম্প্রতি তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোটখাটো ভাঙাচোরা তিনটি চালাঘরে চরম দারিদ্র্যের ছাপ। পুরোনো টিনের চালে অসংখ্য ফুটো। বাঁশঝাড়ের এক কোনায় খোলা রান্নাঘর। কৌশিকের মা কণা রানী একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের আয়া হিসেবে সামান্য সম্মানী পান। বাবা সুকুমার সরকার অসুস্থতা সত্ত্বেও পেটের দায়ে সপ্তাহে দুদিন হাটবারে খোলা জায়গায় ছোট চা-স্টল চালান। এই সামান্য আয়ে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা।

সংসারের চাকা সচল রাখতে গিয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে পরিবারটি। অভাব ও ছেলেমেয়েদের পড়াশক্ষার খরচ জোগাতে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন মা কণা রানী। সেই কিস্তি শোধ করার উপায় না থাকায় এনজিও ‘আশা’ থেকে আরও ৩০ হাজার টাকা ঋণ নেন। সব মিলিয়ে সপ্তাহে ২ হাজার ৩০০ টাকার কিস্তির চাপ এবং বিভিন্ন জনের কাছ থেকে নেওয়া আরও ৫০ হাজার টাকার দেনা পরিশোধ করতে গিয়ে দিশেহারা পরিবারটি।

মেধাবী এই তরুণের সংগ্রামের শুরুটা সহজ ছিল না। কাঁঠালবাড়ী বিদ্যাকানন থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পাওয়ার পর ১০ কিলোমিটার দূরে কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন কৌশিক। সেখানে এসএসসিতেও সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়ে তাক লাগিয়ে দেন। এরপর ভর্তি হন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে।

কৌশিক বলেন, “স্কুলে ভর্তির পর বন্ধুর দেওয়া পুরোনো প্যান্ট ও জুতো পরেই ক্লাস শুরু করেছিলাম। নবম শ্রেণি পর্যন্ত অর্থাভাবে কোনো প্রাইভেট পড়তে পারিনি। পরে কয়েকজন শিক্ষক ও এক প্রবাসীর সহায়তায় পড়াশেনা চালিয়ে গেছি। অনেক দিন অটো ভাড়ার অভাবে হেঁটে কলেজে গিয়েছি, সারাদিন অভুক্তও থাকতে হয়েছে। কষ্টের মাঝেও চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন থেকে সরেনি।”

কৌশিকের বাবা সুকুমার সরকার জানান, ২০২০ সালে সড়কের পাশে থাকা তার ছোট্ট দোকানটি উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই তাদের এই মানবেতর জীবন শুরু। এক প্রতিবেশীর বাঁশঝাড়ের পাশে বিনা ভাড়ায় অন্যের জমিতে তারা ঠাঁই পেয়েছেন। তার বড় ছেলে কর্ণ সরকার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে সম্মান শ্রেণিতে পড়ছেন এবং ছোট মেয়েকে এসএসসি পাসের পর বিয়ে দিয়েছেন।

বড় ভাই কর্ণ সরকার বলেন, “ছোট ভাইয়ের এমন অসাধারণ ফলাফলে আনন্দের পাশাপাশি আমাদের চোখে জল চলে এসেছে। এত খরচে সে কীভাবে মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করবে, সেটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।”

মা কণা রানী জানান, তাদের দুজনের সামান্য আয়ে সংসারের খরচই চলে না, এর ওপর রয়েছে সাপ্তাহিক কিস্তির চাপ। এমতাবস্থায় ছেলের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে সরকার ও দেশের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত