একজন দক্ষ সামরিক পাইলট, যিনি বিমানবাহিনীর সারভাইভাল ট্রেইনিং প্রাপ্ত এবং পানিতে বেঁচে থাকার সব কৌশল যার নখদর্পণে তিনি কী করে সাধারণ একটি শান্ত নদের পানিতে ডুবে মারা যেতে পারেন? গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে ঢাকার উত্তরখানের তুরাগ নদ থেকে যখন সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তখন থেকেই সকলের মনে উঁকি দিচ্ছিল অনেক প্রশ্ন।
কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো হত্যাকাণ্ড বা দুর্ঘটনার টাইমলাইন বা সময়ের গোলকধাঁধা। সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড আর প্রধান সন্দেহভাজনের জবানবন্দির ঘড়ির কাঁটা কেন একেক দিকে ঘুরছে?
দেড় ঘণ্টার লুকোচুরি
তারিখ ও সময়: ২৭ অক্টোবর, রাত ১০:১৭ থেকে ১১:৫১
স্থান: উত্তরা, ঢাকা
তাহসিফ সৌরি তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ডাকে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হন। দীপ প্রথমে পুলিশ ও পরিবারের কাছে বলেছিলেন, তিনি তাহসিফকে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় নামিয়ে দিয়ে একাই চলে যান। কিন্তু উত্তরার একটি রেস্তোরাঁ ও বারের সিসিটিভি ফুটেজ দীপের এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে।
ফুটেজে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর রাত ১০:১৭ মিনিটের দিকে তাহসিফ, দীপ এবং জেরিকা তাসনিম দিশা নামের এক তরুণী একসঙ্গে বারে প্রবেশ করেন এবং সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটিয়ে রাত ১১:৫১ মিনিটের দিকে বের হন। দীপ কেন শুরুতেই এই দেড় ঘণ্টার অবস্থান এবং বারে যাওয়ার কথা গোপন করলেন? একজন বন্ধু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম জবানবন্দিতেই এই সময়টুকু চেপে যাওয়া কি প্রমাণ করে না, সেই রাত ১১:৫১ মিনিটের পর এমন কিছু ঘটেছিল যা দীপ আগে থেকেই আড়াল করতে চাচ্ছিলেন।
টঙ্গী মাজার বস্তির অন্ধকার সময়
তারিখ: ২৭ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২৮ অক্টোবর ভোর।
স্থান: টঙ্গী মাজার বস্তি এলাকা (তুরাগ নদের তীর)
বারের ফুটেজের মুখোমুখি করার পর দীপ তার বয়ান বদলান। তিনি স্বীকার করেন, বার থেকে বের হয়ে তাঁরা টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। যে স্থানটি মূলত মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত । দীপের দাবি, সেখানে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা কিছু লোক তাঁদের ধাওয়া দিলে তারা দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছোটেন এবং এক পর্যায়ে তাহসিফ নদীতে পড়ে যান। দীপ আরও দাবি করেন, তিনি প্রায় এক ঘণ্টা সেখানে তাহসিফকে খোঁজেন, পরে তাকে না পেয়ে একা বাড়ি ফিরে আসেন।
প্রশ্ন হলো, যদি মাঝরাতের দিকেই তাহসিফ নদীতে পড়ে গিয়ে থাকেন, তবে দীপ কেন তখনই চিৎকার করে স্থানীয়দের ডাকলেন না বা পুলিশ কিংবা তাহসিফের পরিবারকে ফোন করলেন না? একজন সামরিক কর্মকর্তাকে নদীতে পড়ে যেতে দেখেও তাঁর বন্ধু দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখলেন এবং পরদিন দুপুরেও স্বাভাবিক আচরণ করলেন এই আচরণ এবং সময়ের ব্যবধানটি চরম সন্দেহজনক।
রাত ১টা ৩৫ মিনিটের সেই টেক্সট মেসেজ
তারিখ ও সময়: ২৮ অক্টোবর, রাত ১:৩৫ মিনিট
দীপের দেওয়া টাইমলাইন অনুযায়ী, মধ্যরাতের পরপর আনুমানিক ১২টা থেকে ১টার মধ্যে মাজার বস্তিতে ধাওয়ার ঘটনা ঘটে এবং তাহসিফ নিখোঁজ হন। অথচ, ২৮ অক্টোবর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন থেকে তাঁর মায়ের ফোনে একটি মেসেজ যায় “আম্মু, আমি আসছি।” এর ঠিক পরপরই ফোনটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। সময়ের এই হিসাবটি কোনোভাবেই মিলছে না। তাহসিফ যদি ১টার আগেই নদীতে পড়ে গিয়ে থাকেন, তবে ১টা ৩৫ মিনিটে তার ফোন থেকে মেসেজটি কে পাঠাল?
১৪ ঘণ্টার শূন্যতা, ফোন ঘড়ি অক্ষত
তারিখ ও সময়: ২৮ অক্টোবর, রাত ১:৩৫ থেকে বিকেল ৪:৩০
স্থান: রাজাবাড়ী ঘাট, তুরাগ নদ, উত্তরখান
রাত ১টা ৩৫ মিনিটের শেষ মেসেজের পর দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে যায়। এরপর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে তাহসিফের লাশ ভেসে ওঠে। সুরতহাল রিপোর্টে দেখা যায়, তাঁর পকেটে থাকা দামি আইফোন এবং হাতের ঘড়ি সম্পূর্ণ অক্ষত ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়নি। তবে তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিল এবং পেট ফোলা ছিল।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক সূত্র ও সুরতহাল বলছে, লাশ উদ্ধারের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। যদি তা-ই হয়, তবে ২৭ তারিখ মাঝরাত থেকে ২৮ তারিখ দুপুর পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় তাহসিফকে কোথায় এবং কার জিম্মায় রাখা হয়েছিল? আইফোন ও ঘড়ি অক্ষত থাকা প্রমাণ করে এটি কোনো ছিনতাইকারীর কাজ ছিল না বরং ঠান্ডা মাথার কোনো পরিকল্পিত অপরাধ ছিল, যেখানে অপরাধীরা প্রমাণ লুকানোর জন্য লাশটি নদীতে ফেলে দেয় যাতে একে পানিতে ডুবে মৃত্যু বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।
সময়ের এই বিভ্রান্তিকর অমিলগুলো স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির মৃত্যু নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়। ঘটনার পেছনে প্রতি মিনিটে ঘড়ির কাঁটার যে অসংলগ্নতা, তা উন্মোচনের দায়িত্ব এখন পিবিআই-এর ওপর। রিমান্ডে থাকা দীপ ও দিশার মুখ থেকেই হয়তো বেরিয়ে আসবে ঠিক কোন মিনিটে নিভে গিয়েছিল এই তরুণ বৈমানিকের জীবনের আলো।

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬
একজন দক্ষ সামরিক পাইলট, যিনি বিমানবাহিনীর সারভাইভাল ট্রেইনিং প্রাপ্ত এবং পানিতে বেঁচে থাকার সব কৌশল যার নখদর্পণে তিনি কী করে সাধারণ একটি শান্ত নদের পানিতে ডুবে মারা যেতে পারেন? গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে ঢাকার উত্তরখানের তুরাগ নদ থেকে যখন সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তখন থেকেই সকলের মনে উঁকি দিচ্ছিল অনেক প্রশ্ন।
কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো হত্যাকাণ্ড বা দুর্ঘটনার টাইমলাইন বা সময়ের গোলকধাঁধা। সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড আর প্রধান সন্দেহভাজনের জবানবন্দির ঘড়ির কাঁটা কেন একেক দিকে ঘুরছে?
দেড় ঘণ্টার লুকোচুরি
তারিখ ও সময়: ২৭ অক্টোবর, রাত ১০:১৭ থেকে ১১:৫১
স্থান: উত্তরা, ঢাকা
তাহসিফ সৌরি তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ডাকে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হন। দীপ প্রথমে পুলিশ ও পরিবারের কাছে বলেছিলেন, তিনি তাহসিফকে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় নামিয়ে দিয়ে একাই চলে যান। কিন্তু উত্তরার একটি রেস্তোরাঁ ও বারের সিসিটিভি ফুটেজ দীপের এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে।
ফুটেজে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর রাত ১০:১৭ মিনিটের দিকে তাহসিফ, দীপ এবং জেরিকা তাসনিম দিশা নামের এক তরুণী একসঙ্গে বারে প্রবেশ করেন এবং সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটিয়ে রাত ১১:৫১ মিনিটের দিকে বের হন। দীপ কেন শুরুতেই এই দেড় ঘণ্টার অবস্থান এবং বারে যাওয়ার কথা গোপন করলেন? একজন বন্ধু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম জবানবন্দিতেই এই সময়টুকু চেপে যাওয়া কি প্রমাণ করে না, সেই রাত ১১:৫১ মিনিটের পর এমন কিছু ঘটেছিল যা দীপ আগে থেকেই আড়াল করতে চাচ্ছিলেন।
টঙ্গী মাজার বস্তির অন্ধকার সময়
তারিখ: ২৭ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২৮ অক্টোবর ভোর।
স্থান: টঙ্গী মাজার বস্তি এলাকা (তুরাগ নদের তীর)
বারের ফুটেজের মুখোমুখি করার পর দীপ তার বয়ান বদলান। তিনি স্বীকার করেন, বার থেকে বের হয়ে তাঁরা টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। যে স্থানটি মূলত মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত । দীপের দাবি, সেখানে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা কিছু লোক তাঁদের ধাওয়া দিলে তারা দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছোটেন এবং এক পর্যায়ে তাহসিফ নদীতে পড়ে যান। দীপ আরও দাবি করেন, তিনি প্রায় এক ঘণ্টা সেখানে তাহসিফকে খোঁজেন, পরে তাকে না পেয়ে একা বাড়ি ফিরে আসেন।
প্রশ্ন হলো, যদি মাঝরাতের দিকেই তাহসিফ নদীতে পড়ে গিয়ে থাকেন, তবে দীপ কেন তখনই চিৎকার করে স্থানীয়দের ডাকলেন না বা পুলিশ কিংবা তাহসিফের পরিবারকে ফোন করলেন না? একজন সামরিক কর্মকর্তাকে নদীতে পড়ে যেতে দেখেও তাঁর বন্ধু দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখলেন এবং পরদিন দুপুরেও স্বাভাবিক আচরণ করলেন এই আচরণ এবং সময়ের ব্যবধানটি চরম সন্দেহজনক।
রাত ১টা ৩৫ মিনিটের সেই টেক্সট মেসেজ
তারিখ ও সময়: ২৮ অক্টোবর, রাত ১:৩৫ মিনিট
দীপের দেওয়া টাইমলাইন অনুযায়ী, মধ্যরাতের পরপর আনুমানিক ১২টা থেকে ১টার মধ্যে মাজার বস্তিতে ধাওয়ার ঘটনা ঘটে এবং তাহসিফ নিখোঁজ হন। অথচ, ২৮ অক্টোবর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন থেকে তাঁর মায়ের ফোনে একটি মেসেজ যায় “আম্মু, আমি আসছি।” এর ঠিক পরপরই ফোনটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। সময়ের এই হিসাবটি কোনোভাবেই মিলছে না। তাহসিফ যদি ১টার আগেই নদীতে পড়ে গিয়ে থাকেন, তবে ১টা ৩৫ মিনিটে তার ফোন থেকে মেসেজটি কে পাঠাল?
১৪ ঘণ্টার শূন্যতা, ফোন ঘড়ি অক্ষত
তারিখ ও সময়: ২৮ অক্টোবর, রাত ১:৩৫ থেকে বিকেল ৪:৩০
স্থান: রাজাবাড়ী ঘাট, তুরাগ নদ, উত্তরখান
রাত ১টা ৩৫ মিনিটের শেষ মেসেজের পর দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে যায়। এরপর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে তাহসিফের লাশ ভেসে ওঠে। সুরতহাল রিপোর্টে দেখা যায়, তাঁর পকেটে থাকা দামি আইফোন এবং হাতের ঘড়ি সম্পূর্ণ অক্ষত ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়নি। তবে তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিল এবং পেট ফোলা ছিল।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক সূত্র ও সুরতহাল বলছে, লাশ উদ্ধারের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। যদি তা-ই হয়, তবে ২৭ তারিখ মাঝরাত থেকে ২৮ তারিখ দুপুর পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় তাহসিফকে কোথায় এবং কার জিম্মায় রাখা হয়েছিল? আইফোন ও ঘড়ি অক্ষত থাকা প্রমাণ করে এটি কোনো ছিনতাইকারীর কাজ ছিল না বরং ঠান্ডা মাথার কোনো পরিকল্পিত অপরাধ ছিল, যেখানে অপরাধীরা প্রমাণ লুকানোর জন্য লাশটি নদীতে ফেলে দেয় যাতে একে পানিতে ডুবে মৃত্যু বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।
সময়ের এই বিভ্রান্তিকর অমিলগুলো স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির মৃত্যু নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়। ঘটনার পেছনে প্রতি মিনিটে ঘড়ির কাঁটার যে অসংলগ্নতা, তা উন্মোচনের দায়িত্ব এখন পিবিআই-এর ওপর। রিমান্ডে থাকা দীপ ও দিশার মুখ থেকেই হয়তো বেরিয়ে আসবে ঠিক কোন মিনিটে নিভে গিয়েছিল এই তরুণ বৈমানিকের জীবনের আলো।

আপনার মতামত লিখুন