সংবাদ

গল্প / নববর্ষ সংখ্যা ১৪৩৩

মর্গ


সাদ কামালী
সাদ কামালী
প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৩ এএম

মর্গ
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

মরা মানুষের তেল, নিখোঁজ বন্ধুর জন্য দুশ্চিন্তা, চাকরি সব মিলিয়ে মোহাম্মদ মোর্শেদের চোখের খয়েরি মণি, ধূসর পরিসর ঘিরে রক্ত জমে, রাঢ়বঙ্গের পিঙ্গল ধূসর চুলেও অস্থির ঝড়। তিন তিনবার ব্রিফিং নিয়েও সম্পাদকীয় খসড়া মন মতো লিখতে পারলো না। নির্বাহী সম্পাদক দুই পৃষ্ঠায় লেখা সম্পাদকীয় পড়ে টেবিলের নিচে ছুড়ে ফেলে নিজে লিখে নেয়। মোর্শেদ লাল চোখ তুলে একবার নির্বাহী আব্দুল সারোয়ারকে দেখে বের হয়ে আসে। টোকনের দেয়া ‘ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস’ ছবির পাইরেট ভিসিডি কম্পিউটারের মিডিয়া প্লেয়ারে ঢুকিয়ে দেখতে শুরু করেও লাভ হয় না। মানুষ ও এলিয়েনের সঙ্কট যতো যুৎ করেই স্পিলবার্গ তৈরি করুক মোর্শেদের মনোযোগ টানতে পারছে না। বহুবার আদেশ অনুরোধ ধমক সত্ত্বেও মোর্শেদ সময় করতে পারেনি পূর্বরামপুরার অনেক ভিতরে একদা ঝিলের মধ্যে আবির্ভূত মুর্শিদাবাদের পির মালিশ হুজুরের দরবারে পোলিও আক্রান্ত ছোটভাইকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে। সকালে আম্মার কাছে প্রতিজ্ঞা করে এসেছিল, আজ যাবেই। অফিসে এসেও ঠিক ছিল তাড়াতাড়ি বের হয়ে মালিশ পিরের দরবারে যাবে।

দুপুরে খেতে বেরিয়ে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক সেনাকল্যাণ সংস্থার মাঝখানের সরু গলির ভিতর ছোট একটা ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টে বার্গার শেষ করেছে, চা টেবিলে, কায়দা করে গোল্ড লিফ ধরিয়ে লম্বা টান দেয়ার পরই সামনে এসে দাঁড়ায় সুমনের ছোটভাই সুজন, ভাইয়া এখনো ফিরে নাই। সুজনের চোখ লাল, গলাতে পানি, দশম শ্রেণির সুজনের কচি মুখে দাড়িগোঁফের সোনালি আঁশ, চিবুকে লাল ব্রণ ফর্সা মুখে বেশি চোখে পড়ে। মোর্শেদের বুকে গোল্ড লিফের ধোঁয়া আটকে যাবার মতো অবস্থা। তার শ্যামলা, ধারালো মুখেও ধোঁয়া জড়িয়ে যায়। ঠোঁট অল্প ফাঁক করে শুধু বলে, আচ্ছা। সুজন বলে, কাগজে কোনো...। মোর্শেদ সুজনের কাঁধে হাত রাখে। কাগজে কোনো খবর নাই। পুলিশ বা অতিপুলিশ র‌্যাব ধরে নিয়ে গেলে অন্তত তিনদিনের মধ্যে ক্রসফায়ারের খবর তৈরি হয়। এটা একরকম রেওয়াজ। ক্রসফায়ারের নিশ্চিত সুবিধা হলো অন্তত আর কোথাও খুঁজতে হবে না, নির্দিষ্ট মর্গেই খোঁজ পাওয়া যাবে। এমনকি জাতীয় প্রচারও পাওয়া যায়। শুধু পরিবার নয়, গোটা দেশ তখন জানে। সুমনের দুর্ভাগ্য র‌্যাব তাকে ধরেনি! প্রায় নিশ্চিহ্ন একটা বাম দলের লিফলেট-কর্মী ধূসর, সরু, খসখসে, লিকলিকে সুমনকে র‌্যাব নিয়ে কী করবে! তিন দিন নিখোঁজ থাকা সুমনের জন্য তত অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু কাজলের ডেকে নেয়ার মধ্যে কী যেন একটা ছিল বলে সুমনের আম্মা মনে করছে। মোর্শেদের মনও শনিগ্রস্ত হয়ে পড়ে গত রাতে দেখা স্বপ্নটির প্রতিক্রিয়ায়। কাজল সম্পর্কেও সে জানে।

সকালে অন্যদিনের মতো রুটি না করে খিচুড়ি আলু ভাজির ব্যবস্থা ছিল। আর মোর্শেদের জন্য স্পেশাল ডিম ওমলেট। একশ’ পঁয়তাল্লিশ টাকা ডজনের ফার্মের ডিম সবার জন্য সম্ভব নয়। মালিশ পিরের দরবারে নিয়ে যাবার প্রতিজ্ঞা করার পর বেশি করে পেঁয়াজ কাঁচামরিচ ধনেপাতা দিয়ে তেল তাতিয়ে ডিমের ওমলেট করে মোর্শেদের সামনে এগিয়ে দিয়ে আম্মা বলে, শোন, পারলে এক কেজি মিষ্টি আনিস, প্রথম প্রথম যাবো, মিষ্টি দেখলে মানুষ খুশি হয়, পির মুর্শিদ মিষ্টি পছন্দ করে। গরম খিচুড়ি আর ওমলেটের সুগন্ধ মুখে দেওয়ার আগেই মোর্শেদের মন সিগারেটের জন্য চঞ্চল হয়ে ওঠে। সিগারেটের নেশা আপাতত দমিয়ে খিচুড়ি তুলে নিতে নিতে বলে, কেমুন একটা স্বপ্ন দেখলাম, বুঝতে পারতেছি না। আম্মা একবার মোর্শেদের দিকে তাকায়, কিছু বলে না। মোর্শেদই বলে, আকাশে ভরা কালো মেঘ, বাতাস, আমি হাঁটতেছি, তখন বৃষ্টি শুরু হইছে। বৃষ্টি ঠিক বৃষ্টির মতো না, ঘন ঘন, ঘন দুধ অথবা পুঁজের মতো। এই দুধ-পুঁজের বৃষ্টির সঙ্গে মনে হলো আকাশ থেকে মেঘও নেমে আসছে রাস্তায়। হাত দিয়ে মেঘ ছোঁয়া যায়। তারপরই দেখি আরে এতো রক্ত, রক্তের বৃষ্টি হচ্ছে, সাদা বৃষ্টি আর নাই, আমার সারা শরীর লাল হয়ে ওঠে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কে যেন দুধ বৃষ্টি ভরছিল বাটিতে, তার বাটি ভরা এখন রক্ত। আমার দিকে এগিয়ে ধরে বলে, নিবি, আমার রক্ত নিবি? আমি ভয় পেয়ে দৌড় দেই। তখনই ঘুম ভেঙ্গে যায়। স্বপ্ন শুনে আম্মা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে, মোর্শেদের পোলিও আক্রান্ত ছোটভাই মেরাজ বলে, এইটা তোমার গল্প তাই না! মোর্শেদ আম্মার দিকে তাকায়, আম্মা বলে, ভালো দেখছোস বাবা! স্বপ্নের কথা শুনে সব সময় ভালো বলতে হয়, এটা রেওয়াজ। একটু সময় নিয়ে বলে, এমন একটা স্বপ্নের কথা তোর নানার কাছে শুনছিলাম। হযরতের কাছে একজন মানুষ এসে বলে, হে রসুলুল্লাহ (সাঃ) আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আকাশ ভইরা মেঘ করছে, তারপর দেখি মেঘ থেকে ঘি মধু বৃষ্টির মতো পড়ছে। লোকজন কেউ বেশি কেউ কম ওই ঘি মধু ধরে খাচ্ছে। আমি আরো দেখলাম, যে আকাশ থেকে মাটি পর্যন্ত একগাছি রশি ঝুলে পড়ছে। সেই রশি ধরে আপনি উপরে উঠে গেলেন, তারপর আরো দুইজন উঠে গেল। এরপর কে যেন রশিটা ধরতে গেলে ছিঁড়ে যায়। আবার সঙ্গে সঙ্গে জোড়াও লেগে যায়, তখন সেই মানুষটা রশি ধরে উপরে উঠে যায়। রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুমতি নিয়ে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ এই স্বপ্নের অর্থ করে দেয়, আকাশের মেঘ হইলো আমাদের ইসলাম ধর্ম। মেঘ থেকে ঘি মধু নামার অর্থ হইলো ইসলামের সৌন্দর্য ও মাধুর্য। কম-বেশি খাওয়ার অর্থ হইলো কোরআন হাদীসের আমল কেউ বেশি করে কেউ কম করে। আকাশ থেকে রশি নামার অর্থ হেদায়োত। মোর্শেদ মনোযোগ দিয়ে খিচুড়ি খায় আর আম্মার মুখে স্বপ্নের কথা শোনে। আম্মা বলা শেষ করে পানির গ্লাস হাত দিয়ে এগিয়ে দেয়। মোর্শেদের ছোটভাই মেরাজ বলে, আম্মা তোমার স্বপ্নের কথা কিন্তু ভাইয়া গল্পে লেখবে। মোর্শেদের আম্মা বলে, তোরে নিয়া খুব চিন্তা হয়, আল্লাহ রসুলের নাম করিস বাবা। মোর্শেদ খয়েরি চোখে হাসি জ্বেলে বলে, ইহারে হেদায়েত কয়, না আম্মা। আম্মা রাগ করে, তোরে কী হেদায়েত করব, সময় মতো আসিস। মোর্শেদ হাত ধুয়ে এসে মেরাজের চুলে ভেজা হাত ডলে বলে, তোর পায়ে আম্মা মরা মানুষের তেল মাখাবে, মালিশ পিরের ছ্যাপও তরে খাইতে হবে। মেরাজ মাথা নিচে নামিয়ে শুকিয়ে যাওয়া বাম পায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আম্মা কত কিছুই করলো, করুক...। মেরাজ এবার দ্বিতীয়বারের মতো এস.এস.সি. পরীক্ষা দিবে। তিন বছর বয়সে পোলিও হবার পর থেকে মেরাজের মা একাই দেশে পাওয়া সকল দেশি বিদেশি চিকিৎসার সঙ্গে পির ফকিরও বাদ রাখে নাই। আটরশি থেকে ওয়ারলেস, তালতলা থেকে হাইকোর্ট কোথায় না গেছে। শ্মশান থেকে চিতাভস্ম এনেও পায়ে মাখানো হয়েছে। মেরাজ অবশ্য মনে করে, এত সব তদ্বির করার ফলে তার পায়ের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারেনি। শিশু হাসপাতালে আসা এক জার্মান ডাক্তার তো পা কেটে ফেলে ক্রাচে অভ্যস্ত অথবা নকল পা লাগিয়ে নিতে পরামর্শ দিয়েছিল। আসল পা প্রায় কর্ম অক্ষম হলেও এখনো আম্মা টিকিয়ে রেখেছে। মরা মানুষের তেলের মালিশ দেবার খবরে মেরাজ তাই বিব্রত নয়। বরং সে তার মায়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করে যেতে চায়। মেরাজ বলে, ভাইয়া আকাশ থেকে দুধ মধুর বৃষ্টি, ভারতের মালিশ হুজুর, মরা মানুষের তেল সবই তো তোমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং তাই না। তোমার গল্পের মাল-মসলা! মোর্শেদ আর কথা বলে না, মেরাজের চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। মেরাজের কথার অন্তর্গত কষ্ট দেখতে সম্পাদকীয় বিভাগের সহকারী সম্পাদক মোহাম্মদ মোর্শেদ অক্ষম হতে পারে, ছোট গল্প লেখক মোর্শেদ রসুল তা দেখে ফেলে সহজেই এবং এই দেখে ফেলা সে আড়াল করতেও জানে। বলে, সন্ধ্যায় রেডি থাকিস, আমি আগে আগেই আসবো।

সুমনের খোঁজখবর, ওর আম্মার সঙ্গে দেখা করা মুর্শিদাবাদের মালিশ পিরের চেয়েও এখন দরকারি মনে হয়। মোর্শেদের মন বলছে সুমন আর আসবে না, সুজনকে ফিরিয়ে দিয়ে অফিসে ঢুকতেই নিচের তলার বিজ্ঞাপন বিভাগের মোবারেক বলে, কী খবর মোর্শেদ সাহেব খোলা পাইলেন? মোর্শেদ চট করে বুঝতে পারে না, চোখে ধূসর দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। মোবারক বলে, খাইলেন কিছু, হোটেল খোলা পাইছেন। মোর্শেদ মাথা ঝুলিয়ে হ্যাঁ বলে উপরে ওঠার জন্য এলিভেটারে চাপ দেয়। কথা বলতে ইচ্ছা করে না। না হলে হয়তো ভেজাল বিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে রেস্টুরেন্ট মালিক-শ্রমিকের ডাকা হরতাল এবং ভেজাল ধরার মহা ভেজাল নিয়ে একটি সম্পাদকীয় বক্তব্য ঝেড়ে দিতে পারতো। আর এই বক্তব্য দিতে পারলে এই বিষয়ের ওপর সম্পাদকীয় লিখতে বসে উপযুক্ত শব্দ ভাব আমদানি হতো সহজেই। দুই দুইবার লিখেও নির্বাহী সম্পাদকের কাছে অপদস্ত হতে হতো না।

মতিঝিল থানার ও.সি’র সঙ্গে মোর্শেদের পরিচয় আছে পত্রিকা সূত্রে। ‘ওয়ার অফ্ দ্য ওয়ার্ল্ডস’ বন্ধ করে থানায় গেলে ও.সি. সাহেবের সঙ্গে সুমনের ব্যাপারে আলাপ করা যায়, দরকার হলে একটা ডায়েরি করেও আসা সম্ভব, কিন্তু এসবই সময়ের ব্যাপার। মোর্শেদ ছবি বন্ধ করে ঘর থেকে বের হয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায়, সম্পাদকীয় খসড়া অমনোয়নের কষ্ট আর মনে নাই। সুমন আর মালিশ পিরের মধ্যে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয় সিগারেটের ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে ঘুরছে। দেয়ালের গায়ের অ্যাসট্রেতে সিগারেটের ফিল্টার গুঁজে মোর্শেদ ঠিক করে ফেলে, মালিশ পিরের কাছে দুই একদিন পরে গেলেও কোনো ব্যাপার না, মায়ের কাছে প্রতিশ্রুতি দেয়া ও রক্ষা করার বিদ্যাসাগরীয় পণ শুধুই আবেগ, এখন সুমনের খোঁজ নেয়াই আগে দরকার।

মতিঝিল থানার ও.সি. রকিবুদ্দিন থানাতে নাই, কোথায় সে কথাও কেউ বলতে পারলো না। তবে সাংবাদিক মোহাম্মদ মোর্শেদের কোনো অপমান হলো না, মেজ দারোগা সলিম হোসেনকে তার আসার কারণ জানিয়ে বলে, কোথায় খোঁজ করতে পারি কন তো ? ওতো সন্ত্রাসী না আবার তেমন রাজনীতিও করে না। মেজো দারোগা সলিম হোসেন হাতের গোল লাঠি ঘুরিয়ে বলে, এইটাই ভুল, আরে দলবাজি করলে, সন্ত্রাস করলে তার ঠিকানা থাকে, বেওয়ারিশ হইতে হয় না। বেওয়ারিশ শব্দটা মোর্শেদের কোথায় যেন লাগে, জীবিত কেউ বেওয়ারিশ হয় না, চোখ নিচে নামিয়ে বলে, ও.সি. সাহেবরে বইলেন, আমি আসছিলাম, উঠি।

মতিঝিল থানায় বেশি সময় লাগলো না, বাইরে কেবল আসর ওয়াক্তের ভরা বিকাল। মোর্শেদ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, সুমনের আম্মার সঙ্গে দেখা করে পারলে বাসায় ফিরবে। হাতে সময় আছে। মতিঝিল থেকে সিএনজি নিয়ে বিপদে পড়ে, অফিস ছুটির এই ব্যস্ত মুহূর্তে সিএনজি কখন পৌঁছবে কে জানে। উপায় নাই, বসেই থাকে, বসে থাকতে থাকতে ভাবে, মালিশ পিরের কাছেও সুমনের খবর জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারে সে কী বলে। মরা মানুষের তেল যে ব্যবস্থা হিসেবে দেয়, সে নিশ্চয় মরা মানুষের খবর বলতে পারে!

ধোঁয়া ধুলায় জড়ানো ফিকে হলুদ আলো বাইরে থাকলেও দক্ষিণ বাড্ডার রঙহীন সিমেন্ট বালির পলেস্তারা করা সাত-তালা দালানে সুমন সুজনদের অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়িতে অন্ধকার, বাতি জ্বালানো হয়নি। হয়তো বাইরে অন্ধকার হলে বাড়িওয়ালা ভিতরের অন্ধকারে মনোযোগ দেবে। মোর্শেদ রেলিং ধরে ধরে সাবধানে উঠে আসবার পথে অন্তত দু’জন কিশোর তার পাশ ঘেঁষে দ্রুত নেমে গেল অভ্যস্ত দৌড়ে। সুমনের আম্মা ঘুমিয়ে। সুজন অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ড এ্যাসেজ সিরিজের ৩য় ম্যাচের রিভিউ দেখছে ইএসপিএন চ্যানেলে। মোর্শেদকে দেখে পাতলা ঠোঁট ঘিরে হাল্কা আলোর মতো ম্যাড়মেড়ে হাসি ফোটে। মোর্শেদ বসেই বলে, এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দেও ভাই। সুজন মুহূর্তের মধ্যে পানি এনে টিভির পর্দায় চোখ রেখে বলে, দুই দিন আম্মা ঘুমায় নাই, আসর নামাজ পড়ে জায়নামাজেই দেখি ঘুমায় পড়ছে। মোর্শেদ লম্বা একটা শ্বাস ফেলে পানির ঠাণ্ডা ঘোলা গ্লাস দেখে টেবিলে নামিয়ে রাখে। মুখে দেয় না। গ্লাসের কাচ ঘিরে শুকনা এঁটো। ক্রিকেট আলোচনা রেখে গ্লাস ধুয়ে পানি দেবার ফুরসত হয় না সুজনের। মোর্শেদও কিছু সময় দেখে বলে, আশরাফুল দেখো কাউন্টিতে খেলবে। সুজন টিভিতে চোখ রেখে মাথা দোলায়। মোর্শেদ আর একবার লম্বা শ্বাস ফেলে বলে, শোনো আমি থানাতে বলে এসেছি, অন্য জাগাতেও খোঁজ করবো, তোমার কাছে সুমনের কোনো ছবি আছে? সুজন এবার মোর্শেদের দিকে শ্যামলা মুখে তাকায়, কোথায় যে আছে...। মোর্শেদ বলে, ঠিক আছে রাতে খোঁজ করে সকালে আমার অফিসে নিয়ে আসবে, আমি এগারোটার মধ্যে অফিসে পৌঁছে যাবো। খালাম্মাকে আর উঠাইয়ো না, ঘুমাক। সুজন বলে, থানা কী বলল, কোথায় খোঁজ করব ভাইয়াকে?

বাইরের আলো এখনো মরে নাই। মোর্শেদ দ্রুত সিএনজি-তে চড়ে বাসার পথে আসে। মালিশ পিরের কাছে শুধু মেরাজের জন্য নয় সুমনের জন্যও যাওয়া দরকার। মেরাজ তৈরি, মাগরেব নামাজ শেষ করে মোর্শেদের আম্মাও ঘাড়ে গলায় পাউডার লাগিয়ে সাদা শাড়ি ব্লাউজ পরে একেবারে তৈরি হয়ে মুখে পান দিয়েছে। মোর্শেদ অপেক্ষা করে না, ধরে রাখা সিএনজি নিয়েই পূর্বরামপুরার পথে রওনা হয়। মৌচাকের মোড়ের ভিড়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে চারদিক থেকে নামাজের আজান শুরু হলে মোর্শেদের আম্মা মাথায় কাপড় ভালো করে টেনে নেয়।

পূর্বরামপুরার অনেক ভিতরে ঢুকে সিএনজি ছেড়ে দিতে হলো, কোথাও ইট বসানো কোথাও কাঁচা রাস্তা। সরু রাস্তার দুই পাশেই আবার পান সিগারেটের দোকান। আরও একটু উত্তর পুবে যাওয়ার পর চোখে পড়ে বাঁশের মাথায় বিদ্যুতের তার টেনে বাল্ব লাগিয়ে একদা ঝিলের মধ্যে অর্ধসমাপ্ত আধা-পাকা বাড়ির পথ আলোকিত করা হয়েছে। এই কাঁচা পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মালিশ পিরের কাছে আসা-যাওয়া মানুষের মুখে পিরের গল্পই মুখ্য বিষয়।

পিরের দরবারে চোখের সামনে এসে পড়ার পর মোর্শেদের খুব সিগারেটের নেশা হয়, এখন কোনো অবস্থাতেই তা সম্ভব নয়। মেরাজ এবং আম্মাকে ভিতরে বসার ব্যবস্থা করে সিগারেট ধরাতে পারে। পকেটের মোবাইল বন্ধই ছিল, তারপর আরও একবার পাওয়ার বাটনে চাপ দিয়ে বন্ধ নিশ্চিত করে। মেরাজ তার শুকনা, ছোট হয়ে যাওয়া বাঁ-পায়ের ওপর বাঁ-হাত ফেলে অন্য হাতে মোর্শেদের কাঁধ ধরে গোটা শরীর ভেঙ্গেচুরে দরবারের ঘরে সামনে এসে দাঁড়ালে লাল টুপি লাল পাঞ্জাবি, চিকন গোঁফ দাড়ি নাই কয়েকজন মানুষ সাহায্য করে মেরাজকে ভিতরে বসতে। মোর্শেদের চিনতে অসুবিধা হয় না এরা পিরের খাদেম। চেহারা ছবি বলে এরাও মুর্শিদাবাদ না হলেও কোলকাতা থেকে আমদানি। মুখে বাংলা উর্দু মিলানো ভাষা। দরবারের বাইরে যত ভিড় জটলা ভিতরের ভিড় তত নয়। চারকোনা হলঘরের মেঝেতে হোগলার মাদুর বিছানো, পাশে ইটের দেয়াল হলেও চালে টিন। টিনের সঙ্গে কাঠ বা লোহার রডে বাতি ফ্যান ঝোলানো। ঘরের ভিতর কেমন আগর, আতর, জর্দা মিশানো গন্ধ। দুই পাশের দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধাই কালো লাল মখমলের কাবা শরীফ লটকানো। মসজিদের মিনারের মতো একটা জায়গার সমানে বেতের আলগা বেড়া, বেড়ার ওপারে মালিশ হুজুর, ঘরে ঢুকেই তাই হুজুরকে দেখা যায় না, তবে হুজুরের দুই পাশে মাঝারি আকারের তামার পাতিল লাল কাপড় দিয়ে ঢাকা, তা পরিষ্কার দেখা যায়। ওই বেতের বেড়ার দিকে মুখ করে চল্লিশ-পঁয়তাল্লি¬শজন নারী-পুরুষ বসে আছে। দর্শনার্থীদের মতো বসা লাল পাঞ্জাবি লাল টুপির আর একজন খাদেম পির সাহেবকে সাহায্য করছে একজন একজন করে বেড়ার ওপারে পাঠাতে।

মোর্শেদ চোখ সরু করে বেতের ফাঁকফোকর দিয়ে হলেও পিরকে দেখার চেষ্টা করে। পিরকে না পারলেও গল্পকার মোর্শেদ রসুল অনেক কিছুই দেখে ফেলে। দরজার কাছে লাল খাদেমকে বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করে কতক্ষণ লাগবে, আমিও হুজুরের সঙ্গে দেখা করবো। খাদেম পাশের খাদেমের দিকে তাকিয়ে মোর্শেদের ধূসর ময়লা চেহারা দেখে বলে, ভাইসাব ওজু বাধিয়া নিয়ত সহি করিয়া বসেন, ওতো টাইম কিছু লাগে গা না। মোর্শেদ দরবার থেকে বের হয়ে ডান দিকে দেখতে পায় তিনটা পানির ড্রামের সঙ্গে ট্যাপ লাগানো, সামনে টুলের মতো পাথর বা সিমেন্টের খণ্ড বসার জন্য। ওজু করার আগে মোর্শেদ সিগারেট ধরাতে চায়। পানির ড্রামের পিছনে কাদা প্যাচপেচে ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালে একজন লাল খাদেম এসে দাঁড়ায়। মোর্শেদ সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে গোল্ড লিফের প্যাকেট এগিয়ে ধরে, নেন ভাই। খাদেম মোর্শেদের চোখের দিকে তাকিয়ে সিগারেট নেয়, ধন্যবাদ। ধন্যবাদ শব্দ মোর্শেদের কানে লাগে। লাল খাদেমের সিগারেটে আগুন ধরিয়ে দিতে দিতে বলে, সব খবর ভালো, এদিকে তো কোনো ঝামেলা নাই? খাদেম অনেকক্ষণ ধরে ঠোঁট সরু করে ধীরে ধীরে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দুইদিকে মাথা নাড়ায়। না ঝামেলা নাই। মোর্শেদ আবার বলে, আপনি কোথা থেকে আসছেন?

আমি পিরের খাদেম গোলাম কুদ্দুস।

কুদ্দুস ভাই আপনার বাসা কোথায় ?

পিরের পাক দরবারেই আমার বাড়ি, তবে বাসা কোথাও নাই, বাসা হয় পাখিদের।

মোর্শেদ হজম করে নেয়, মুখে এলেও বলে না, পিরের দরবার আস্তানা হতে পারে, বাড়ি কখনো নয়। বলে,

ভালো বলছেন, আমরা কাজকে কাম বলি, এই দেশের মানুষদের বুলিই আলাদা।

গোলাম কুদ্দুস আর কথা বলে না, মনোযোগ দিয়ে সিগারেট টানে। মোর্শেদ হাতের সিগারেট দ্রুত শেষ করে বলে,

কুদ্দুস ভাই, মালিশ হুজুর কতদিন হইলো আইছে?

কুদ্দুস বলে না। মোর্শেদ সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে ধরে, আর একটা নিতে পারেন ভাই।

আর একটা সিগারেট নিয়ে গোলাম কুদ্দুস পাঞ্জাবির পকেটে রাখে। মোর্শেদ এগিয়ে এসে একটা রেখে বাকি সিগারেটসহ প্যাকেটটাই তার লাল পাঞ্জাবির পকেটে ভরে দিয়ে বলে,

আমার ছোটভাইয়ের পোলিও, আম্মা তারে নিয়ে আইছে। শুনছি হুজুর মরা মানুষের তেল দেন মালিশের জন্য। গোলাম কুদ্দুস সিগারেটের গোড়া মাটিতে ফেলে স্যান্ডেলের নিচে চেপে ধরে বলে, অন্যরকম তদ্বিরও হুজুর করেন।

যেমন?

ভষ্ম পড়া, তাবিজ, এইসব আর কী, তবে আপনের খোড়া ভাইয়ের জন্য তেল পড়াই দিবেন।

মরা মানুষের তেল কোথায় পান হুজুর?

অবাক কথা, মরা মানুষের তেলের অভাব হবে কেন? তেলের অনেক সাপ্লাই। তবে সাপ্লাই কোম হলে হুজুর সাত রকম বীজের তেলে চার ভাগের এক ভাগ বস্তু মিলায় দেন।

বস্তু কী?

ওই, মৃত দেহের চর্বি পুড়িয়ে যে তেল।

গন্ধ হয় না?

গরম মসল্লা, তেজপাতা, বড় লং দিয়ে বেশি করে জ্বালিয়ে নেয়। গন্ধ একটা হয়, তবে তা সুগন্ধ। মনে হয় হাতে পায়ে মাখি।

মোর্শেদ লম্বা শ্বাস ফেলে। বাঁশের খুঁটিতে টানা বিদ্যুতের আলো মোর্শেদের মুখে সামান্য পড়েছে, তার খয়েরি ধূসর চোখের পরিসরে চিকন পানির ধারা গোলাম কুদ্দুসের চোখে পড়ে না। মোর্শেদও বুঝতে পারে না, দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে চোখে কেন জ্বালাপোড়া বাড়ে। বলে, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু তিন-চারদিন হলো নিখোঁজ...। গোলাম কুদ্দুস সঙ্গে সঙ্গে বলে, মেডিকেল বা সলিমুল্লাহর মর্গে খোঁজ করেন। আমারও সোর্স আছে, কী নাম, দেখতে কেমন আপনের বন্ধু? মোর্শেদ বলে, কোন্ সোর্সের কথা বলছেন ভাই? মর্গের, মরা মানুষের চর্বির যোগান ওরাই দেয়। ও, মোর্শেদ আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। গোলাম কুদ্দুস আর একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বলে, ফটো থাকলে দিয়ে যাবেন, আমাকে তো মর্গে যেতে হয়। মোর্শেদ খসখসে গলায় বলে, আপনেকে কেন যাইতে হয়? বুঝেন না, ওদের সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায় না, মানুষের বদলে যদি জানোয়ারের চর্বি দেয়, বলা যায় না। হুজুরের আদেশ মতো আমিই দেখে আসি কোন কোন মরার ওজুরি কেটে সাদা সাদা চর্বি ছাড়ানো হয়েছে। মোর্শেদের মুখে পানি আসে, বমি বমি ভাব হয়, পেটের ভিতর হাল্কা অস্বস্তি। থুতু ফেলে সিগারেট ধরায়। কয়েক টান দিয়ে বলে, মালিশ হুজুর কোনো তদ্বির করতে পারবে না? পারবে নিশ্চয়, তবে মরে গেলে আর কোন তদ্বিরে কাজ হবে বলেন, তখন উল্টো মরার তেলেই অন্যদের তদ্বির করবেন হুজুর হেঃ হেঃ হেঃ!

মালিশ পিরের কাছে আর সুমনের কথা বলেনি মোর্শেদ। মেরাজের পোলিও আক্রান্ত পায়ের জন্য পাঁচশত এক টাকা দিয়ে এক লিটার কালো রঙের তেল কিনে রাত এগারটার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসে। আম্মা দ্রুত কাপড় বদল করে নামাজ পড়ে খাবার আয়োজন করে। মোর্শেদ খাবে না। শরীরে বমি বমি ভাব, বুক জ্বলছে। মুখের ভিতর দুটা অ্যান্টাসিড ফেলে কিছুক্ষণ চুষে এক গ্লাস পানি খেয়ে নেয়। মেরাজ অল্প খেলো। মোর্শেদের আম্মাও বড় এক গ্লাস পানি খেল শুধু।

মোর্শেদ অফিসে পৌঁছার আগেই সুজন সুমনের ছবি এনে অপেক্ষা করছে। মোর্শেদ আর না বসে মেরাজকে নিয়ে বাইরে এসে লাইট পোস্টের নিচে ছোট সিগারেটের দোকান থেকে খুচরা একটা সিগারেট নিয়ে মুখে বসিয়ে দুটি চায়ের অর্ডার দেয়। সুজনের থেকে ছবির খাম হাতে নিয়েও খুলে দেখে না। মুখেও তেমন কিছু বলে না।

সুজন বলে, ছবি কি থানাতে দিবেন? মোর্শেদ হ্যাঁ বলতে যেয়েও থেমে যায়। সুজন বলে, পারলে একবার আম্মার কাছে আসবেন, রাত থেকে তার জ্বর। মোর্শেদ মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বলে।

নিজের টেবিলে বসে দিনের কাগজ, অন্যসব দৈনিক দেখার আগে সাদা খাম থেকে সুমনের ছবিটা বের করে। টেলিভিশনের সামনে দাঁড়ানো রঙিন একটা ছবি, হাসছে। মোর্শেদের ঠোঁটেও হাসি ফোটে, এই ছবি থানায় দিয়ে আসবে না মুর্শিদাবাদের মালিশ পিরের খাদেম গোলাম কুদ্দুসের কাছে রেখে আসবে? লম্বা শ্বাস ফেলে মোর্শেদ ছবিটি আবার সাদা খামের ভিতর ভরে পাশের ড্রয়ারে রাখে।

মর্গের মতো ড্রয়ারের শীতল ঠাণ্ডা অন্ধকারে সাদা খামের ভিতর সুমনের ছবি নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকে

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬


মর্গ

প্রকাশের তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মরা মানুষের তেল, নিখোঁজ বন্ধুর জন্য দুশ্চিন্তা, চাকরি সব মিলিয়ে মোহাম্মদ মোর্শেদের চোখের খয়েরি মণি, ধূসর পরিসর ঘিরে রক্ত জমে, রাঢ়বঙ্গের পিঙ্গল ধূসর চুলেও অস্থির ঝড়। তিন তিনবার ব্রিফিং নিয়েও সম্পাদকীয় খসড়া মন মতো লিখতে পারলো না। নির্বাহী সম্পাদক দুই পৃষ্ঠায় লেখা সম্পাদকীয় পড়ে টেবিলের নিচে ছুড়ে ফেলে নিজে লিখে নেয়। মোর্শেদ লাল চোখ তুলে একবার নির্বাহী আব্দুল সারোয়ারকে দেখে বের হয়ে আসে। টোকনের দেয়া ‘ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস’ ছবির পাইরেট ভিসিডি কম্পিউটারের মিডিয়া প্লেয়ারে ঢুকিয়ে দেখতে শুরু করেও লাভ হয় না। মানুষ ও এলিয়েনের সঙ্কট যতো যুৎ করেই স্পিলবার্গ তৈরি করুক মোর্শেদের মনোযোগ টানতে পারছে না। বহুবার আদেশ অনুরোধ ধমক সত্ত্বেও মোর্শেদ সময় করতে পারেনি পূর্বরামপুরার অনেক ভিতরে একদা ঝিলের মধ্যে আবির্ভূত মুর্শিদাবাদের পির মালিশ হুজুরের দরবারে পোলিও আক্রান্ত ছোটভাইকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে। সকালে আম্মার কাছে প্রতিজ্ঞা করে এসেছিল, আজ যাবেই। অফিসে এসেও ঠিক ছিল তাড়াতাড়ি বের হয়ে মালিশ পিরের দরবারে যাবে।

দুপুরে খেতে বেরিয়ে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক সেনাকল্যাণ সংস্থার মাঝখানের সরু গলির ভিতর ছোট একটা ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টে বার্গার শেষ করেছে, চা টেবিলে, কায়দা করে গোল্ড লিফ ধরিয়ে লম্বা টান দেয়ার পরই সামনে এসে দাঁড়ায় সুমনের ছোটভাই সুজন, ভাইয়া এখনো ফিরে নাই। সুজনের চোখ লাল, গলাতে পানি, দশম শ্রেণির সুজনের কচি মুখে দাড়িগোঁফের সোনালি আঁশ, চিবুকে লাল ব্রণ ফর্সা মুখে বেশি চোখে পড়ে। মোর্শেদের বুকে গোল্ড লিফের ধোঁয়া আটকে যাবার মতো অবস্থা। তার শ্যামলা, ধারালো মুখেও ধোঁয়া জড়িয়ে যায়। ঠোঁট অল্প ফাঁক করে শুধু বলে, আচ্ছা। সুজন বলে, কাগজে কোনো...। মোর্শেদ সুজনের কাঁধে হাত রাখে। কাগজে কোনো খবর নাই। পুলিশ বা অতিপুলিশ র‌্যাব ধরে নিয়ে গেলে অন্তত তিনদিনের মধ্যে ক্রসফায়ারের খবর তৈরি হয়। এটা একরকম রেওয়াজ। ক্রসফায়ারের নিশ্চিত সুবিধা হলো অন্তত আর কোথাও খুঁজতে হবে না, নির্দিষ্ট মর্গেই খোঁজ পাওয়া যাবে। এমনকি জাতীয় প্রচারও পাওয়া যায়। শুধু পরিবার নয়, গোটা দেশ তখন জানে। সুমনের দুর্ভাগ্য র‌্যাব তাকে ধরেনি! প্রায় নিশ্চিহ্ন একটা বাম দলের লিফলেট-কর্মী ধূসর, সরু, খসখসে, লিকলিকে সুমনকে র‌্যাব নিয়ে কী করবে! তিন দিন নিখোঁজ থাকা সুমনের জন্য তত অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু কাজলের ডেকে নেয়ার মধ্যে কী যেন একটা ছিল বলে সুমনের আম্মা মনে করছে। মোর্শেদের মনও শনিগ্রস্ত হয়ে পড়ে গত রাতে দেখা স্বপ্নটির প্রতিক্রিয়ায়। কাজল সম্পর্কেও সে জানে।

সকালে অন্যদিনের মতো রুটি না করে খিচুড়ি আলু ভাজির ব্যবস্থা ছিল। আর মোর্শেদের জন্য স্পেশাল ডিম ওমলেট। একশ’ পঁয়তাল্লিশ টাকা ডজনের ফার্মের ডিম সবার জন্য সম্ভব নয়। মালিশ পিরের দরবারে নিয়ে যাবার প্রতিজ্ঞা করার পর বেশি করে পেঁয়াজ কাঁচামরিচ ধনেপাতা দিয়ে তেল তাতিয়ে ডিমের ওমলেট করে মোর্শেদের সামনে এগিয়ে দিয়ে আম্মা বলে, শোন, পারলে এক কেজি মিষ্টি আনিস, প্রথম প্রথম যাবো, মিষ্টি দেখলে মানুষ খুশি হয়, পির মুর্শিদ মিষ্টি পছন্দ করে। গরম খিচুড়ি আর ওমলেটের সুগন্ধ মুখে দেওয়ার আগেই মোর্শেদের মন সিগারেটের জন্য চঞ্চল হয়ে ওঠে। সিগারেটের নেশা আপাতত দমিয়ে খিচুড়ি তুলে নিতে নিতে বলে, কেমুন একটা স্বপ্ন দেখলাম, বুঝতে পারতেছি না। আম্মা একবার মোর্শেদের দিকে তাকায়, কিছু বলে না। মোর্শেদই বলে, আকাশে ভরা কালো মেঘ, বাতাস, আমি হাঁটতেছি, তখন বৃষ্টি শুরু হইছে। বৃষ্টি ঠিক বৃষ্টির মতো না, ঘন ঘন, ঘন দুধ অথবা পুঁজের মতো। এই দুধ-পুঁজের বৃষ্টির সঙ্গে মনে হলো আকাশ থেকে মেঘও নেমে আসছে রাস্তায়। হাত দিয়ে মেঘ ছোঁয়া যায়। তারপরই দেখি আরে এতো রক্ত, রক্তের বৃষ্টি হচ্ছে, সাদা বৃষ্টি আর নাই, আমার সারা শরীর লাল হয়ে ওঠে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কে যেন দুধ বৃষ্টি ভরছিল বাটিতে, তার বাটি ভরা এখন রক্ত। আমার দিকে এগিয়ে ধরে বলে, নিবি, আমার রক্ত নিবি? আমি ভয় পেয়ে দৌড় দেই। তখনই ঘুম ভেঙ্গে যায়। স্বপ্ন শুনে আম্মা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে, মোর্শেদের পোলিও আক্রান্ত ছোটভাই মেরাজ বলে, এইটা তোমার গল্প তাই না! মোর্শেদ আম্মার দিকে তাকায়, আম্মা বলে, ভালো দেখছোস বাবা! স্বপ্নের কথা শুনে সব সময় ভালো বলতে হয়, এটা রেওয়াজ। একটু সময় নিয়ে বলে, এমন একটা স্বপ্নের কথা তোর নানার কাছে শুনছিলাম। হযরতের কাছে একজন মানুষ এসে বলে, হে রসুলুল্লাহ (সাঃ) আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আকাশ ভইরা মেঘ করছে, তারপর দেখি মেঘ থেকে ঘি মধু বৃষ্টির মতো পড়ছে। লোকজন কেউ বেশি কেউ কম ওই ঘি মধু ধরে খাচ্ছে। আমি আরো দেখলাম, যে আকাশ থেকে মাটি পর্যন্ত একগাছি রশি ঝুলে পড়ছে। সেই রশি ধরে আপনি উপরে উঠে গেলেন, তারপর আরো দুইজন উঠে গেল। এরপর কে যেন রশিটা ধরতে গেলে ছিঁড়ে যায়। আবার সঙ্গে সঙ্গে জোড়াও লেগে যায়, তখন সেই মানুষটা রশি ধরে উপরে উঠে যায়। রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুমতি নিয়ে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ এই স্বপ্নের অর্থ করে দেয়, আকাশের মেঘ হইলো আমাদের ইসলাম ধর্ম। মেঘ থেকে ঘি মধু নামার অর্থ হইলো ইসলামের সৌন্দর্য ও মাধুর্য। কম-বেশি খাওয়ার অর্থ হইলো কোরআন হাদীসের আমল কেউ বেশি করে কেউ কম করে। আকাশ থেকে রশি নামার অর্থ হেদায়োত। মোর্শেদ মনোযোগ দিয়ে খিচুড়ি খায় আর আম্মার মুখে স্বপ্নের কথা শোনে। আম্মা বলা শেষ করে পানির গ্লাস হাত দিয়ে এগিয়ে দেয়। মোর্শেদের ছোটভাই মেরাজ বলে, আম্মা তোমার স্বপ্নের কথা কিন্তু ভাইয়া গল্পে লেখবে। মোর্শেদের আম্মা বলে, তোরে নিয়া খুব চিন্তা হয়, আল্লাহ রসুলের নাম করিস বাবা। মোর্শেদ খয়েরি চোখে হাসি জ্বেলে বলে, ইহারে হেদায়েত কয়, না আম্মা। আম্মা রাগ করে, তোরে কী হেদায়েত করব, সময় মতো আসিস। মোর্শেদ হাত ধুয়ে এসে মেরাজের চুলে ভেজা হাত ডলে বলে, তোর পায়ে আম্মা মরা মানুষের তেল মাখাবে, মালিশ পিরের ছ্যাপও তরে খাইতে হবে। মেরাজ মাথা নিচে নামিয়ে শুকিয়ে যাওয়া বাম পায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আম্মা কত কিছুই করলো, করুক...। মেরাজ এবার দ্বিতীয়বারের মতো এস.এস.সি. পরীক্ষা দিবে। তিন বছর বয়সে পোলিও হবার পর থেকে মেরাজের মা একাই দেশে পাওয়া সকল দেশি বিদেশি চিকিৎসার সঙ্গে পির ফকিরও বাদ রাখে নাই। আটরশি থেকে ওয়ারলেস, তালতলা থেকে হাইকোর্ট কোথায় না গেছে। শ্মশান থেকে চিতাভস্ম এনেও পায়ে মাখানো হয়েছে। মেরাজ অবশ্য মনে করে, এত সব তদ্বির করার ফলে তার পায়ের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারেনি। শিশু হাসপাতালে আসা এক জার্মান ডাক্তার তো পা কেটে ফেলে ক্রাচে অভ্যস্ত অথবা নকল পা লাগিয়ে নিতে পরামর্শ দিয়েছিল। আসল পা প্রায় কর্ম অক্ষম হলেও এখনো আম্মা টিকিয়ে রেখেছে। মরা মানুষের তেলের মালিশ দেবার খবরে মেরাজ তাই বিব্রত নয়। বরং সে তার মায়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করে যেতে চায়। মেরাজ বলে, ভাইয়া আকাশ থেকে দুধ মধুর বৃষ্টি, ভারতের মালিশ হুজুর, মরা মানুষের তেল সবই তো তোমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং তাই না। তোমার গল্পের মাল-মসলা! মোর্শেদ আর কথা বলে না, মেরাজের চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। মেরাজের কথার অন্তর্গত কষ্ট দেখতে সম্পাদকীয় বিভাগের সহকারী সম্পাদক মোহাম্মদ মোর্শেদ অক্ষম হতে পারে, ছোট গল্প লেখক মোর্শেদ রসুল তা দেখে ফেলে সহজেই এবং এই দেখে ফেলা সে আড়াল করতেও জানে। বলে, সন্ধ্যায় রেডি থাকিস, আমি আগে আগেই আসবো।

সুমনের খোঁজখবর, ওর আম্মার সঙ্গে দেখা করা মুর্শিদাবাদের মালিশ পিরের চেয়েও এখন দরকারি মনে হয়। মোর্শেদের মন বলছে সুমন আর আসবে না, সুজনকে ফিরিয়ে দিয়ে অফিসে ঢুকতেই নিচের তলার বিজ্ঞাপন বিভাগের মোবারেক বলে, কী খবর মোর্শেদ সাহেব খোলা পাইলেন? মোর্শেদ চট করে বুঝতে পারে না, চোখে ধূসর দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। মোবারক বলে, খাইলেন কিছু, হোটেল খোলা পাইছেন। মোর্শেদ মাথা ঝুলিয়ে হ্যাঁ বলে উপরে ওঠার জন্য এলিভেটারে চাপ দেয়। কথা বলতে ইচ্ছা করে না। না হলে হয়তো ভেজাল বিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে রেস্টুরেন্ট মালিক-শ্রমিকের ডাকা হরতাল এবং ভেজাল ধরার মহা ভেজাল নিয়ে একটি সম্পাদকীয় বক্তব্য ঝেড়ে দিতে পারতো। আর এই বক্তব্য দিতে পারলে এই বিষয়ের ওপর সম্পাদকীয় লিখতে বসে উপযুক্ত শব্দ ভাব আমদানি হতো সহজেই। দুই দুইবার লিখেও নির্বাহী সম্পাদকের কাছে অপদস্ত হতে হতো না।

মতিঝিল থানার ও.সি’র সঙ্গে মোর্শেদের পরিচয় আছে পত্রিকা সূত্রে। ‘ওয়ার অফ্ দ্য ওয়ার্ল্ডস’ বন্ধ করে থানায় গেলে ও.সি. সাহেবের সঙ্গে সুমনের ব্যাপারে আলাপ করা যায়, দরকার হলে একটা ডায়েরি করেও আসা সম্ভব, কিন্তু এসবই সময়ের ব্যাপার। মোর্শেদ ছবি বন্ধ করে ঘর থেকে বের হয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায়, সম্পাদকীয় খসড়া অমনোয়নের কষ্ট আর মনে নাই। সুমন আর মালিশ পিরের মধ্যে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয় সিগারেটের ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে ঘুরছে। দেয়ালের গায়ের অ্যাসট্রেতে সিগারেটের ফিল্টার গুঁজে মোর্শেদ ঠিক করে ফেলে, মালিশ পিরের কাছে দুই একদিন পরে গেলেও কোনো ব্যাপার না, মায়ের কাছে প্রতিশ্রুতি দেয়া ও রক্ষা করার বিদ্যাসাগরীয় পণ শুধুই আবেগ, এখন সুমনের খোঁজ নেয়াই আগে দরকার।

মতিঝিল থানার ও.সি. রকিবুদ্দিন থানাতে নাই, কোথায় সে কথাও কেউ বলতে পারলো না। তবে সাংবাদিক মোহাম্মদ মোর্শেদের কোনো অপমান হলো না, মেজ দারোগা সলিম হোসেনকে তার আসার কারণ জানিয়ে বলে, কোথায় খোঁজ করতে পারি কন তো ? ওতো সন্ত্রাসী না আবার তেমন রাজনীতিও করে না। মেজো দারোগা সলিম হোসেন হাতের গোল লাঠি ঘুরিয়ে বলে, এইটাই ভুল, আরে দলবাজি করলে, সন্ত্রাস করলে তার ঠিকানা থাকে, বেওয়ারিশ হইতে হয় না। বেওয়ারিশ শব্দটা মোর্শেদের কোথায় যেন লাগে, জীবিত কেউ বেওয়ারিশ হয় না, চোখ নিচে নামিয়ে বলে, ও.সি. সাহেবরে বইলেন, আমি আসছিলাম, উঠি।

মতিঝিল থানায় বেশি সময় লাগলো না, বাইরে কেবল আসর ওয়াক্তের ভরা বিকাল। মোর্শেদ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, সুমনের আম্মার সঙ্গে দেখা করে পারলে বাসায় ফিরবে। হাতে সময় আছে। মতিঝিল থেকে সিএনজি নিয়ে বিপদে পড়ে, অফিস ছুটির এই ব্যস্ত মুহূর্তে সিএনজি কখন পৌঁছবে কে জানে। উপায় নাই, বসেই থাকে, বসে থাকতে থাকতে ভাবে, মালিশ পিরের কাছেও সুমনের খবর জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারে সে কী বলে। মরা মানুষের তেল যে ব্যবস্থা হিসেবে দেয়, সে নিশ্চয় মরা মানুষের খবর বলতে পারে!

ধোঁয়া ধুলায় জড়ানো ফিকে হলুদ আলো বাইরে থাকলেও দক্ষিণ বাড্ডার রঙহীন সিমেন্ট বালির পলেস্তারা করা সাত-তালা দালানে সুমন সুজনদের অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়িতে অন্ধকার, বাতি জ্বালানো হয়নি। হয়তো বাইরে অন্ধকার হলে বাড়িওয়ালা ভিতরের অন্ধকারে মনোযোগ দেবে। মোর্শেদ রেলিং ধরে ধরে সাবধানে উঠে আসবার পথে অন্তত দু’জন কিশোর তার পাশ ঘেঁষে দ্রুত নেমে গেল অভ্যস্ত দৌড়ে। সুমনের আম্মা ঘুমিয়ে। সুজন অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ড এ্যাসেজ সিরিজের ৩য় ম্যাচের রিভিউ দেখছে ইএসপিএন চ্যানেলে। মোর্শেদকে দেখে পাতলা ঠোঁট ঘিরে হাল্কা আলোর মতো ম্যাড়মেড়ে হাসি ফোটে। মোর্শেদ বসেই বলে, এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দেও ভাই। সুজন মুহূর্তের মধ্যে পানি এনে টিভির পর্দায় চোখ রেখে বলে, দুই দিন আম্মা ঘুমায় নাই, আসর নামাজ পড়ে জায়নামাজেই দেখি ঘুমায় পড়ছে। মোর্শেদ লম্বা একটা শ্বাস ফেলে পানির ঠাণ্ডা ঘোলা গ্লাস দেখে টেবিলে নামিয়ে রাখে। মুখে দেয় না। গ্লাসের কাচ ঘিরে শুকনা এঁটো। ক্রিকেট আলোচনা রেখে গ্লাস ধুয়ে পানি দেবার ফুরসত হয় না সুজনের। মোর্শেদও কিছু সময় দেখে বলে, আশরাফুল দেখো কাউন্টিতে খেলবে। সুজন টিভিতে চোখ রেখে মাথা দোলায়। মোর্শেদ আর একবার লম্বা শ্বাস ফেলে বলে, শোনো আমি থানাতে বলে এসেছি, অন্য জাগাতেও খোঁজ করবো, তোমার কাছে সুমনের কোনো ছবি আছে? সুজন এবার মোর্শেদের দিকে শ্যামলা মুখে তাকায়, কোথায় যে আছে...। মোর্শেদ বলে, ঠিক আছে রাতে খোঁজ করে সকালে আমার অফিসে নিয়ে আসবে, আমি এগারোটার মধ্যে অফিসে পৌঁছে যাবো। খালাম্মাকে আর উঠাইয়ো না, ঘুমাক। সুজন বলে, থানা কী বলল, কোথায় খোঁজ করব ভাইয়াকে?

বাইরের আলো এখনো মরে নাই। মোর্শেদ দ্রুত সিএনজি-তে চড়ে বাসার পথে আসে। মালিশ পিরের কাছে শুধু মেরাজের জন্য নয় সুমনের জন্যও যাওয়া দরকার। মেরাজ তৈরি, মাগরেব নামাজ শেষ করে মোর্শেদের আম্মাও ঘাড়ে গলায় পাউডার লাগিয়ে সাদা শাড়ি ব্লাউজ পরে একেবারে তৈরি হয়ে মুখে পান দিয়েছে। মোর্শেদ অপেক্ষা করে না, ধরে রাখা সিএনজি নিয়েই পূর্বরামপুরার পথে রওনা হয়। মৌচাকের মোড়ের ভিড়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে চারদিক থেকে নামাজের আজান শুরু হলে মোর্শেদের আম্মা মাথায় কাপড় ভালো করে টেনে নেয়।

পূর্বরামপুরার অনেক ভিতরে ঢুকে সিএনজি ছেড়ে দিতে হলো, কোথাও ইট বসানো কোথাও কাঁচা রাস্তা। সরু রাস্তার দুই পাশেই আবার পান সিগারেটের দোকান। আরও একটু উত্তর পুবে যাওয়ার পর চোখে পড়ে বাঁশের মাথায় বিদ্যুতের তার টেনে বাল্ব লাগিয়ে একদা ঝিলের মধ্যে অর্ধসমাপ্ত আধা-পাকা বাড়ির পথ আলোকিত করা হয়েছে। এই কাঁচা পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মালিশ পিরের কাছে আসা-যাওয়া মানুষের মুখে পিরের গল্পই মুখ্য বিষয়।

পিরের দরবারে চোখের সামনে এসে পড়ার পর মোর্শেদের খুব সিগারেটের নেশা হয়, এখন কোনো অবস্থাতেই তা সম্ভব নয়। মেরাজ এবং আম্মাকে ভিতরে বসার ব্যবস্থা করে সিগারেট ধরাতে পারে। পকেটের মোবাইল বন্ধই ছিল, তারপর আরও একবার পাওয়ার বাটনে চাপ দিয়ে বন্ধ নিশ্চিত করে। মেরাজ তার শুকনা, ছোট হয়ে যাওয়া বাঁ-পায়ের ওপর বাঁ-হাত ফেলে অন্য হাতে মোর্শেদের কাঁধ ধরে গোটা শরীর ভেঙ্গেচুরে দরবারের ঘরে সামনে এসে দাঁড়ালে লাল টুপি লাল পাঞ্জাবি, চিকন গোঁফ দাড়ি নাই কয়েকজন মানুষ সাহায্য করে মেরাজকে ভিতরে বসতে। মোর্শেদের চিনতে অসুবিধা হয় না এরা পিরের খাদেম। চেহারা ছবি বলে এরাও মুর্শিদাবাদ না হলেও কোলকাতা থেকে আমদানি। মুখে বাংলা উর্দু মিলানো ভাষা। দরবারের বাইরে যত ভিড় জটলা ভিতরের ভিড় তত নয়। চারকোনা হলঘরের মেঝেতে হোগলার মাদুর বিছানো, পাশে ইটের দেয়াল হলেও চালে টিন। টিনের সঙ্গে কাঠ বা লোহার রডে বাতি ফ্যান ঝোলানো। ঘরের ভিতর কেমন আগর, আতর, জর্দা মিশানো গন্ধ। দুই পাশের দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধাই কালো লাল মখমলের কাবা শরীফ লটকানো। মসজিদের মিনারের মতো একটা জায়গার সমানে বেতের আলগা বেড়া, বেড়ার ওপারে মালিশ হুজুর, ঘরে ঢুকেই তাই হুজুরকে দেখা যায় না, তবে হুজুরের দুই পাশে মাঝারি আকারের তামার পাতিল লাল কাপড় দিয়ে ঢাকা, তা পরিষ্কার দেখা যায়। ওই বেতের বেড়ার দিকে মুখ করে চল্লিশ-পঁয়তাল্লি¬শজন নারী-পুরুষ বসে আছে। দর্শনার্থীদের মতো বসা লাল পাঞ্জাবি লাল টুপির আর একজন খাদেম পির সাহেবকে সাহায্য করছে একজন একজন করে বেড়ার ওপারে পাঠাতে।

মোর্শেদ চোখ সরু করে বেতের ফাঁকফোকর দিয়ে হলেও পিরকে দেখার চেষ্টা করে। পিরকে না পারলেও গল্পকার মোর্শেদ রসুল অনেক কিছুই দেখে ফেলে। দরজার কাছে লাল খাদেমকে বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করে কতক্ষণ লাগবে, আমিও হুজুরের সঙ্গে দেখা করবো। খাদেম পাশের খাদেমের দিকে তাকিয়ে মোর্শেদের ধূসর ময়লা চেহারা দেখে বলে, ভাইসাব ওজু বাধিয়া নিয়ত সহি করিয়া বসেন, ওতো টাইম কিছু লাগে গা না। মোর্শেদ দরবার থেকে বের হয়ে ডান দিকে দেখতে পায় তিনটা পানির ড্রামের সঙ্গে ট্যাপ লাগানো, সামনে টুলের মতো পাথর বা সিমেন্টের খণ্ড বসার জন্য। ওজু করার আগে মোর্শেদ সিগারেট ধরাতে চায়। পানির ড্রামের পিছনে কাদা প্যাচপেচে ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালে একজন লাল খাদেম এসে দাঁড়ায়। মোর্শেদ সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে গোল্ড লিফের প্যাকেট এগিয়ে ধরে, নেন ভাই। খাদেম মোর্শেদের চোখের দিকে তাকিয়ে সিগারেট নেয়, ধন্যবাদ। ধন্যবাদ শব্দ মোর্শেদের কানে লাগে। লাল খাদেমের সিগারেটে আগুন ধরিয়ে দিতে দিতে বলে, সব খবর ভালো, এদিকে তো কোনো ঝামেলা নাই? খাদেম অনেকক্ষণ ধরে ঠোঁট সরু করে ধীরে ধীরে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দুইদিকে মাথা নাড়ায়। না ঝামেলা নাই। মোর্শেদ আবার বলে, আপনি কোথা থেকে আসছেন?

আমি পিরের খাদেম গোলাম কুদ্দুস।

কুদ্দুস ভাই আপনার বাসা কোথায় ?

পিরের পাক দরবারেই আমার বাড়ি, তবে বাসা কোথাও নাই, বাসা হয় পাখিদের।

মোর্শেদ হজম করে নেয়, মুখে এলেও বলে না, পিরের দরবার আস্তানা হতে পারে, বাড়ি কখনো নয়। বলে,

ভালো বলছেন, আমরা কাজকে কাম বলি, এই দেশের মানুষদের বুলিই আলাদা।

গোলাম কুদ্দুস আর কথা বলে না, মনোযোগ দিয়ে সিগারেট টানে। মোর্শেদ হাতের সিগারেট দ্রুত শেষ করে বলে,

কুদ্দুস ভাই, মালিশ হুজুর কতদিন হইলো আইছে?

কুদ্দুস বলে না। মোর্শেদ সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে ধরে, আর একটা নিতে পারেন ভাই।

আর একটা সিগারেট নিয়ে গোলাম কুদ্দুস পাঞ্জাবির পকেটে রাখে। মোর্শেদ এগিয়ে এসে একটা রেখে বাকি সিগারেটসহ প্যাকেটটাই তার লাল পাঞ্জাবির পকেটে ভরে দিয়ে বলে,

আমার ছোটভাইয়ের পোলিও, আম্মা তারে নিয়ে আইছে। শুনছি হুজুর মরা মানুষের তেল দেন মালিশের জন্য। গোলাম কুদ্দুস সিগারেটের গোড়া মাটিতে ফেলে স্যান্ডেলের নিচে চেপে ধরে বলে, অন্যরকম তদ্বিরও হুজুর করেন।

যেমন?

ভষ্ম পড়া, তাবিজ, এইসব আর কী, তবে আপনের খোড়া ভাইয়ের জন্য তেল পড়াই দিবেন।

মরা মানুষের তেল কোথায় পান হুজুর?

অবাক কথা, মরা মানুষের তেলের অভাব হবে কেন? তেলের অনেক সাপ্লাই। তবে সাপ্লাই কোম হলে হুজুর সাত রকম বীজের তেলে চার ভাগের এক ভাগ বস্তু মিলায় দেন।

বস্তু কী?

ওই, মৃত দেহের চর্বি পুড়িয়ে যে তেল।

গন্ধ হয় না?

গরম মসল্লা, তেজপাতা, বড় লং দিয়ে বেশি করে জ্বালিয়ে নেয়। গন্ধ একটা হয়, তবে তা সুগন্ধ। মনে হয় হাতে পায়ে মাখি।

মোর্শেদ লম্বা শ্বাস ফেলে। বাঁশের খুঁটিতে টানা বিদ্যুতের আলো মোর্শেদের মুখে সামান্য পড়েছে, তার খয়েরি ধূসর চোখের পরিসরে চিকন পানির ধারা গোলাম কুদ্দুসের চোখে পড়ে না। মোর্শেদও বুঝতে পারে না, দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে চোখে কেন জ্বালাপোড়া বাড়ে। বলে, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু তিন-চারদিন হলো নিখোঁজ...। গোলাম কুদ্দুস সঙ্গে সঙ্গে বলে, মেডিকেল বা সলিমুল্লাহর মর্গে খোঁজ করেন। আমারও সোর্স আছে, কী নাম, দেখতে কেমন আপনের বন্ধু? মোর্শেদ বলে, কোন্ সোর্সের কথা বলছেন ভাই? মর্গের, মরা মানুষের চর্বির যোগান ওরাই দেয়। ও, মোর্শেদ আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। গোলাম কুদ্দুস আর একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বলে, ফটো থাকলে দিয়ে যাবেন, আমাকে তো মর্গে যেতে হয়। মোর্শেদ খসখসে গলায় বলে, আপনেকে কেন যাইতে হয়? বুঝেন না, ওদের সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায় না, মানুষের বদলে যদি জানোয়ারের চর্বি দেয়, বলা যায় না। হুজুরের আদেশ মতো আমিই দেখে আসি কোন কোন মরার ওজুরি কেটে সাদা সাদা চর্বি ছাড়ানো হয়েছে। মোর্শেদের মুখে পানি আসে, বমি বমি ভাব হয়, পেটের ভিতর হাল্কা অস্বস্তি। থুতু ফেলে সিগারেট ধরায়। কয়েক টান দিয়ে বলে, মালিশ হুজুর কোনো তদ্বির করতে পারবে না? পারবে নিশ্চয়, তবে মরে গেলে আর কোন তদ্বিরে কাজ হবে বলেন, তখন উল্টো মরার তেলেই অন্যদের তদ্বির করবেন হুজুর হেঃ হেঃ হেঃ!

মালিশ পিরের কাছে আর সুমনের কথা বলেনি মোর্শেদ। মেরাজের পোলিও আক্রান্ত পায়ের জন্য পাঁচশত এক টাকা দিয়ে এক লিটার কালো রঙের তেল কিনে রাত এগারটার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসে। আম্মা দ্রুত কাপড় বদল করে নামাজ পড়ে খাবার আয়োজন করে। মোর্শেদ খাবে না। শরীরে বমি বমি ভাব, বুক জ্বলছে। মুখের ভিতর দুটা অ্যান্টাসিড ফেলে কিছুক্ষণ চুষে এক গ্লাস পানি খেয়ে নেয়। মেরাজ অল্প খেলো। মোর্শেদের আম্মাও বড় এক গ্লাস পানি খেল শুধু।

মোর্শেদ অফিসে পৌঁছার আগেই সুজন সুমনের ছবি এনে অপেক্ষা করছে। মোর্শেদ আর না বসে মেরাজকে নিয়ে বাইরে এসে লাইট পোস্টের নিচে ছোট সিগারেটের দোকান থেকে খুচরা একটা সিগারেট নিয়ে মুখে বসিয়ে দুটি চায়ের অর্ডার দেয়। সুজনের থেকে ছবির খাম হাতে নিয়েও খুলে দেখে না। মুখেও তেমন কিছু বলে না।

সুজন বলে, ছবি কি থানাতে দিবেন? মোর্শেদ হ্যাঁ বলতে যেয়েও থেমে যায়। সুজন বলে, পারলে একবার আম্মার কাছে আসবেন, রাত থেকে তার জ্বর। মোর্শেদ মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বলে।

নিজের টেবিলে বসে দিনের কাগজ, অন্যসব দৈনিক দেখার আগে সাদা খাম থেকে সুমনের ছবিটা বের করে। টেলিভিশনের সামনে দাঁড়ানো রঙিন একটা ছবি, হাসছে। মোর্শেদের ঠোঁটেও হাসি ফোটে, এই ছবি থানায় দিয়ে আসবে না মুর্শিদাবাদের মালিশ পিরের খাদেম গোলাম কুদ্দুসের কাছে রেখে আসবে? লম্বা শ্বাস ফেলে মোর্শেদ ছবিটি আবার সাদা খামের ভিতর ভরে পাশের ড্রয়ারে রাখে।

মর্গের মতো ড্রয়ারের শীতল ঠাণ্ডা অন্ধকারে সাদা খামের ভিতর সুমনের ছবি নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকে


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত