সংবাদ

জ্বালানি সংকট

সরকার সমস্যা ‘লুকাচ্ছে’: ক্ষুব্ধ চালকদের অভিযোগ


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম

সরকার সমস্যা ‘লুকাচ্ছে’: ক্ষুব্ধ চালকদের অভিযোগ

রাজধানীর জিয়া উদ্যানের লেকপাড়ের সেতুর সামনে নিজের হিরো হাংক মোটরসাইকেল নিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে তেলের লাইনে দাঁড়ান মো. ইস্রাফিল। শুক্রবার সকাল ৭টায় তিনি যখন সংসদ ভবনের ফটকে তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ভেতরে গেলেন, সামনে আর মাত্র তিনটি বাইক। তখনই জানিয়ে দেয়া হল, তেল শেষ। সে সময় ফিলিং স্টেশনের ভেতরে ছিল ৩০টির মতো মোটরসাইকেল। তাদেরকে জুম্মার নামাজের পরে আসতে বলে ফটক লাগিয়ে দেন কর্মীরা। 

দুপুর দেড়টার দিকে সেখানে দেখা যায় অপেক্ষমাণ ওই চালকদের জটলা, তারা সবাই ক্ষুব্ধ-বিরক্ত। সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে ঢুকে শুনলেন তেল শেষ, জুমার পর আসতে হবে। সেজন্য মোটরসাইকেল রেখে গাছের নিজে চালকদের জটলা। তারা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে একবারও বলা হচ্ছে না তেল অপর্যাপ্ত। তাহলে সংকটটা কোথায়? সেটাই চিহ্নিত করছে না কেউ।

একমাসের বেশি সময় ধরে তেলের জন্য যে চরম ভোগান্তি সইতে হচ্ছে, সে কথা তুলে ধরে এই চালকরা বলছেন, নিশ্চিতভাবে সরকার সমস্যালুকাচ্ছেঅথবা সরকারের লোকেরাই কোনোকারসাজি করে তেল মজুদ করছে তালুকদার ফিলিং স্টেশনের লাইনে গত ১৫-১৬ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে এই মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে বেশ একটাভাই-বেরাদরসম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে।

সেখানেই মোটরসাইকেল রেখেই কেউ বাসায় গেছেন, কেউ কাজ সেরে ফিরেও এসেছেন, আবার কেউ বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নিয়ে বাজার করে এসেছেন। তখনো এই ফিলিং স্টেশনে তেলের লরি ঢোকেনি। কিন্তু তেল নিতে আসা গাড়ির সারি জিয়া উদ্যান পার হয়ে খেজুর বাগানের দিকে বাঁক নিয়েছে।

শাহীন সরকার নামে একজন বলছিলেন, ‘আমিও রাত ৮টার কিছু পরে লাইনে দাঁড়ালাম। ভোরের দিকেই পাম্পের লোকজন মাইকিং করা শুরু করছে যে তেল শেষ হয়ে যাবে। তারা সর্বোচ্চ আর দুইশ বাইকে তেল দিতে পারবে। সকাল সাতটায় পাম্পের সীমানার ভেতরে ঢুকলাম। আমার সামনে তখন ২৮টা মোটরসাইকেল। এই সময় তেল দেয়া বন্ধ হয়ে গেল।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সারা রাত নির্ঘুম থাকার কষ্ট, মশার কামড়, গরম, ধুলাবালি সবকিছু সয়ে যখন এখানে ঢুকলাম, তখন বলল তেল শেষ। কেমনটা লাগে বলেন।ভেতরে যে বাইকগুলো ছিল তারা নিজেরাই আলোচনা করে সেগুলো সারিবদ্ধভাবে রাখার কথা তুলে ধরে শাহীন বলছিলেন, ‘এরপর কেউ বাসায় গেছেন, কেউ ডিউটিতে। কয়েকজন ফিরে আসার পর আবার কয়েকজন বাসায় গেছেন।একজন যখন এসেছেন অন্যদের জন্য খাবার পানি নিয়ে এসেছেন। এভাবেই সময় পার করছি। একেবারে যুদ্ধ পরিস্থিতি।

ইস্রাফিল বলছিলেন, ‘আমি মিরপুর, গাবতলীর ওই পাশে অনেকগুলো পাম্প ঘুরে তেল পাইনি। এখানে লাইনে দাঁড়িয়েছি। সরকার দেখি বড় গলায় বলছে, তেল মজুদ আছে, তেলের সরবরাহ ঠিক আছে, পেট্রোল-অক্টেন দেশেই উৎপাদিত হয়। তাহলে আমাদের কেন এই কষ্ট করতে হচ্ছে?’

ইস্রাফিলের সাথে গলা মেলান অন্যরা। তাদের একজন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ইউরোপসহ নানা দেশে তেলের সংকট দেখা দিচ্ছে। কোনো দেশে দাম বাড়িয়েছে। আমরা তো সেগুলো টিভিতে, পেপারে দেখছি। কিন্তু আমাদের এখানে বলা হচ্ছে তেলের মজুদ আছে, আরও তেল কেনা হচ্ছে, সরবরাহও ঠিক আছে-তাহলে সংকটটা কোথায়।

নিজের নাম বলতে না চাওয়া ওই ব্যক্তি বলেন,‘সরকার তেলের সরবরাহ ঠিকমতো দিলে সেই তেল কোথায় যায়? যদি ধরা যায়, ১০-২০ বা ৩০ শতাংশ তেল কম সরবরাহ করা হচ্ছে। তবুও তো এমন পরিস্থিতি হওয়ার কথা না।বেশিরভাগ পাম্পে তেল নেই বলা হচ্ছে। যেখানে তেল আছে সেখানে হাজারো মানুষের ভিড়। নিশ্চিত কোথাও একটা বড় ফুটো আছে, যেখানে সব তেল চলে যাচ্ছে। সেই সমস্যাটাই আমাদের কাছ থেকে লুকোচ্ছে সরকার।

ফেইসবুক গ্রুপট্রাফিক এলার্ট দুপুর ১টার দিকে মোহাম্মদ জয় নামের একজন লিখেছেন, ‘১৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিলাম ১০ লিটার। বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে শুক্রবার দুপুর ১১টা। ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন।ওই পোস্টের নিচে রিয়াদ বখত নামে একজন লিখেছেন, ‘এখনো সরকার নিশ্চুপ। কোন সমস্যা আছে বলতে শুনলাম না।

কাওসার আহমেদ শাকিল মন্তব্য করেছেন, ‘যারা তেল মজুদ করে আমাদের সীমাহীন কষ্ট দিচ্ছে, আল্লাহ যেন তাদের সীমাহীন কষ্ট দিয়ে জুমার দিন এই দোয়াই করি।আসাদগেটে তালুকদার পাম্পের উল্টোদিকে সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনেও দীর্ঘ সারি। দুপুর ১টার দিকে ইফতেখার মাহাবুব নামে একজন তেল নিয়ে বের হওয়ার সময় বললেন, ‘প্রায় ১০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল পেলাম এক হাজার টাকার। রাতেই এই পাম্পের অক্টেন শেষ হয়ে যায়। তবে তারা পেট্রোল সরবরাহ করে গেছে। লোকজন তাই নিয়ে গেছে খুশিমনে।

বাইক চালকেরা বলছেন, ঢাকার হাতে গোনা বড় পাম্পগুলো ছাড়া ছোট পাম্পগুলো একেবারেই বন্ধ করে রেখেছে। দুপুরে ঢাকা কলেজের উল্টোপাশে নিওয়েজ সার্ভিস স্টেশনে গিয়ে দেখা গেল, তারা তেল দেওয়ার ডিসপেন্সার মেশিনগুলো শাটার নামিয়ে তালা মেরে রেখেছে। এখানে এলপিজি পাওয়া যায়, সে জন্য কেবল ফটকটা খোলা রয়েছে।

একই চিত্র দেখা গেল নীলক্ষেত মোড়ের পথের বন্ধু ফিলিং স্টেশনেও। তারা পাম্পের মুখ দড়ি দিয়ে বন্ধ করে তেল দেওয়ার ডিসপেন্সারগুলো শাটার নামিয়ে তালা মেরে রেখেছে। তবে নীলক্ষেত মোড়ের কিউজি স্পন্দন ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল ডিজেল দেয়া হয়েছে। এখানেও মোটরসাইকেল ডিজেলচালিত ট্রাক-পিকাপের বেশ বড় লাইন রয়েছে। আর পরীবাগের ইন্টারকন্টিনেন্টালের মোড়ে দুটো পাম্পেই তেল দেয়া হচ্ছে। তেল নিতে আসা লোকজনের হুড়োহুড়িতে রাস্তাই বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এখানে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন কোম্পানি মেঘনার তেলের পাম্পে গাড়ির লাইন সাপের মতো পেঁচিয়ে হাতিরপুল বাজার ছাড়িয়েছে। আর পাশের পূর্বাচল পাম্পে দুপুর বেলায় হঠাৎ তেলের লরি ঢুকতে দেখে লোকজন লাইন ভেঙে হুড়োহুড়ি শুরু করলে রাস্তা আটকে যায়।

আব্বাসউদ্দীন নামে কারওয়ান বাজারের এক ব্যবসায়ী মোটরসাইকেল নিয়ে পূর্বাচল পাম্প থেকে তেল নিয়ে আসার পর বলেন, ‘আমি ভোর ৫টায় দাঁড়াইছি মেঘনার লাইনে। দুপুর পর্যন্ত তখনো অনেক দূরে। হঠাৎ পূর্বাচল পাম্পে তেল আসার পর সেখানে একটা নতুন লাইন হল। সেই লাইনে গিয়েই তেলটা এতো দ্রুত পেলাম। নাহলে আরও কয়েকঘণ্টা লাগতো।ইরান যুদ্ধের কারণে দেশের জ্বালানি সরবরাহে যে সংকট চলছে, নানা পদক্ষেপ নিয়েও সরকার তা নিরসন করতে পারেনি। কিন্তু সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, জ্বালানি সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুদ আছে।

মজুদ নিয়ে যা বলেছেন প্রতিমন্ত্রী অমিত

শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শনে এসে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমি অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে এবং গর্বের সাথে বলতে পারি বাংলাদেশের ইতিহাসে যেটি কখনোই হয়নি, বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচাইতে বেশি পরিশোধিত জ্বালানি আমাদের মজুদ আছে।আপনারা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেখেছেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পর্যন্ত আশঙ্কা করছে যে তাদের হাতে মাত্র ছয় সপ্তাহের জেট ফুয়েল রয়েছে। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এই বাংলাদেশেও ছয় সপ্তাহ সমপরিমাণ জেট ফুয়েল রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে অপরিশোধ জ্বালানি তেল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল পরিশোধন কোম্পানি ইস্টান রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধের পর্যায়ে রয়েছে বলে খবর এসেছে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এপ্রিল মে মাসের যে জ্বালানি চাহিদা, সেটি আমরা সংগ্রহ করেছি এবং যেটি নিশ্চিত সরবরাহ লাইনে আছে এবং সেটিকে বিবেচনায় নিয়ে বলতে পারি এপ্রিল এবং মে মাসে যে চাহিদা, সেটি পূরণের পূর্ণ সক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে।সেটি আমরা নিশ্চিত করতে সক্ষম হওয়ায় এখন মূলত জুন মাসের প্রয়োজন মেটাবার জন্য আমরা কাজ করছি।তেলের মজুদ থাকার পরেও কেন সংকট সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য আসেনি প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


সরকার সমস্যা ‘লুকাচ্ছে’: ক্ষুব্ধ চালকদের অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

রাজধানীর জিয়া উদ্যানের লেকপাড়ের সেতুর সামনে নিজের হিরো হাংক মোটরসাইকেল নিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে তেলের লাইনে দাঁড়ান মো. ইস্রাফিল। শুক্রবার সকাল ৭টায় তিনি যখন সংসদ ভবনের ফটকে তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ভেতরে গেলেন, সামনে আর মাত্র তিনটি বাইক। তখনই জানিয়ে দেয়া হল, তেল শেষ। সে সময় ফিলিং স্টেশনের ভেতরে ছিল ৩০টির মতো মোটরসাইকেল। তাদেরকে জুম্মার নামাজের পরে আসতে বলে ফটক লাগিয়ে দেন কর্মীরা। 

দুপুর দেড়টার দিকে সেখানে দেখা যায় অপেক্ষমাণ ওই চালকদের জটলা, তারা সবাই ক্ষুব্ধ-বিরক্ত। সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে ঢুকে শুনলেন তেল শেষ, জুমার পর আসতে হবে। সেজন্য মোটরসাইকেল রেখে গাছের নিজে চালকদের জটলা। তারা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে একবারও বলা হচ্ছে না তেল অপর্যাপ্ত। তাহলে সংকটটা কোথায়? সেটাই চিহ্নিত করছে না কেউ।

একমাসের বেশি সময় ধরে তেলের জন্য যে চরম ভোগান্তি সইতে হচ্ছে, সে কথা তুলে ধরে এই চালকরা বলছেন, নিশ্চিতভাবে সরকার সমস্যালুকাচ্ছেঅথবা সরকারের লোকেরাই কোনোকারসাজি করে তেল মজুদ করছে তালুকদার ফিলিং স্টেশনের লাইনে গত ১৫-১৬ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে এই মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে বেশ একটাভাই-বেরাদরসম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে।

সেখানেই মোটরসাইকেল রেখেই কেউ বাসায় গেছেন, কেউ কাজ সেরে ফিরেও এসেছেন, আবার কেউ বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নিয়ে বাজার করে এসেছেন। তখনো এই ফিলিং স্টেশনে তেলের লরি ঢোকেনি। কিন্তু তেল নিতে আসা গাড়ির সারি জিয়া উদ্যান পার হয়ে খেজুর বাগানের দিকে বাঁক নিয়েছে।

শাহীন সরকার নামে একজন বলছিলেন, ‘আমিও রাত ৮টার কিছু পরে লাইনে দাঁড়ালাম। ভোরের দিকেই পাম্পের লোকজন মাইকিং করা শুরু করছে যে তেল শেষ হয়ে যাবে। তারা সর্বোচ্চ আর দুইশ বাইকে তেল দিতে পারবে। সকাল সাতটায় পাম্পের সীমানার ভেতরে ঢুকলাম। আমার সামনে তখন ২৮টা মোটরসাইকেল। এই সময় তেল দেয়া বন্ধ হয়ে গেল।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সারা রাত নির্ঘুম থাকার কষ্ট, মশার কামড়, গরম, ধুলাবালি সবকিছু সয়ে যখন এখানে ঢুকলাম, তখন বলল তেল শেষ। কেমনটা লাগে বলেন।ভেতরে যে বাইকগুলো ছিল তারা নিজেরাই আলোচনা করে সেগুলো সারিবদ্ধভাবে রাখার কথা তুলে ধরে শাহীন বলছিলেন, ‘এরপর কেউ বাসায় গেছেন, কেউ ডিউটিতে। কয়েকজন ফিরে আসার পর আবার কয়েকজন বাসায় গেছেন।একজন যখন এসেছেন অন্যদের জন্য খাবার পানি নিয়ে এসেছেন। এভাবেই সময় পার করছি। একেবারে যুদ্ধ পরিস্থিতি।

ইস্রাফিল বলছিলেন, ‘আমি মিরপুর, গাবতলীর ওই পাশে অনেকগুলো পাম্প ঘুরে তেল পাইনি। এখানে লাইনে দাঁড়িয়েছি। সরকার দেখি বড় গলায় বলছে, তেল মজুদ আছে, তেলের সরবরাহ ঠিক আছে, পেট্রোল-অক্টেন দেশেই উৎপাদিত হয়। তাহলে আমাদের কেন এই কষ্ট করতে হচ্ছে?’

ইস্রাফিলের সাথে গলা মেলান অন্যরা। তাদের একজন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ইউরোপসহ নানা দেশে তেলের সংকট দেখা দিচ্ছে। কোনো দেশে দাম বাড়িয়েছে। আমরা তো সেগুলো টিভিতে, পেপারে দেখছি। কিন্তু আমাদের এখানে বলা হচ্ছে তেলের মজুদ আছে, আরও তেল কেনা হচ্ছে, সরবরাহও ঠিক আছে-তাহলে সংকটটা কোথায়।

নিজের নাম বলতে না চাওয়া ওই ব্যক্তি বলেন,‘সরকার তেলের সরবরাহ ঠিকমতো দিলে সেই তেল কোথায় যায়? যদি ধরা যায়, ১০-২০ বা ৩০ শতাংশ তেল কম সরবরাহ করা হচ্ছে। তবুও তো এমন পরিস্থিতি হওয়ার কথা না।বেশিরভাগ পাম্পে তেল নেই বলা হচ্ছে। যেখানে তেল আছে সেখানে হাজারো মানুষের ভিড়। নিশ্চিত কোথাও একটা বড় ফুটো আছে, যেখানে সব তেল চলে যাচ্ছে। সেই সমস্যাটাই আমাদের কাছ থেকে লুকোচ্ছে সরকার।

ফেইসবুক গ্রুপট্রাফিক এলার্ট দুপুর ১টার দিকে মোহাম্মদ জয় নামের একজন লিখেছেন, ‘১৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিলাম ১০ লিটার। বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে শুক্রবার দুপুর ১১টা। ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন।ওই পোস্টের নিচে রিয়াদ বখত নামে একজন লিখেছেন, ‘এখনো সরকার নিশ্চুপ। কোন সমস্যা আছে বলতে শুনলাম না।

কাওসার আহমেদ শাকিল মন্তব্য করেছেন, ‘যারা তেল মজুদ করে আমাদের সীমাহীন কষ্ট দিচ্ছে, আল্লাহ যেন তাদের সীমাহীন কষ্ট দিয়ে জুমার দিন এই দোয়াই করি।আসাদগেটে তালুকদার পাম্পের উল্টোদিকে সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনেও দীর্ঘ সারি। দুপুর ১টার দিকে ইফতেখার মাহাবুব নামে একজন তেল নিয়ে বের হওয়ার সময় বললেন, ‘প্রায় ১০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল পেলাম এক হাজার টাকার। রাতেই এই পাম্পের অক্টেন শেষ হয়ে যায়। তবে তারা পেট্রোল সরবরাহ করে গেছে। লোকজন তাই নিয়ে গেছে খুশিমনে।

বাইক চালকেরা বলছেন, ঢাকার হাতে গোনা বড় পাম্পগুলো ছাড়া ছোট পাম্পগুলো একেবারেই বন্ধ করে রেখেছে। দুপুরে ঢাকা কলেজের উল্টোপাশে নিওয়েজ সার্ভিস স্টেশনে গিয়ে দেখা গেল, তারা তেল দেওয়ার ডিসপেন্সার মেশিনগুলো শাটার নামিয়ে তালা মেরে রেখেছে। এখানে এলপিজি পাওয়া যায়, সে জন্য কেবল ফটকটা খোলা রয়েছে।

একই চিত্র দেখা গেল নীলক্ষেত মোড়ের পথের বন্ধু ফিলিং স্টেশনেও। তারা পাম্পের মুখ দড়ি দিয়ে বন্ধ করে তেল দেওয়ার ডিসপেন্সারগুলো শাটার নামিয়ে তালা মেরে রেখেছে। তবে নীলক্ষেত মোড়ের কিউজি স্পন্দন ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল ডিজেল দেয়া হয়েছে। এখানেও মোটরসাইকেল ডিজেলচালিত ট্রাক-পিকাপের বেশ বড় লাইন রয়েছে। আর পরীবাগের ইন্টারকন্টিনেন্টালের মোড়ে দুটো পাম্পেই তেল দেয়া হচ্ছে। তেল নিতে আসা লোকজনের হুড়োহুড়িতে রাস্তাই বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এখানে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন কোম্পানি মেঘনার তেলের পাম্পে গাড়ির লাইন সাপের মতো পেঁচিয়ে হাতিরপুল বাজার ছাড়িয়েছে। আর পাশের পূর্বাচল পাম্পে দুপুর বেলায় হঠাৎ তেলের লরি ঢুকতে দেখে লোকজন লাইন ভেঙে হুড়োহুড়ি শুরু করলে রাস্তা আটকে যায়।

আব্বাসউদ্দীন নামে কারওয়ান বাজারের এক ব্যবসায়ী মোটরসাইকেল নিয়ে পূর্বাচল পাম্প থেকে তেল নিয়ে আসার পর বলেন, ‘আমি ভোর ৫টায় দাঁড়াইছি মেঘনার লাইনে। দুপুর পর্যন্ত তখনো অনেক দূরে। হঠাৎ পূর্বাচল পাম্পে তেল আসার পর সেখানে একটা নতুন লাইন হল। সেই লাইনে গিয়েই তেলটা এতো দ্রুত পেলাম। নাহলে আরও কয়েকঘণ্টা লাগতো।ইরান যুদ্ধের কারণে দেশের জ্বালানি সরবরাহে যে সংকট চলছে, নানা পদক্ষেপ নিয়েও সরকার তা নিরসন করতে পারেনি। কিন্তু সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, জ্বালানি সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুদ আছে।

মজুদ নিয়ে যা বলেছেন প্রতিমন্ত্রী অমিত

শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শনে এসে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমি অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে এবং গর্বের সাথে বলতে পারি বাংলাদেশের ইতিহাসে যেটি কখনোই হয়নি, বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচাইতে বেশি পরিশোধিত জ্বালানি আমাদের মজুদ আছে।আপনারা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেখেছেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পর্যন্ত আশঙ্কা করছে যে তাদের হাতে মাত্র ছয় সপ্তাহের জেট ফুয়েল রয়েছে। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এই বাংলাদেশেও ছয় সপ্তাহ সমপরিমাণ জেট ফুয়েল রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে অপরিশোধ জ্বালানি তেল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল পরিশোধন কোম্পানি ইস্টান রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধের পর্যায়ে রয়েছে বলে খবর এসেছে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এপ্রিল মে মাসের যে জ্বালানি চাহিদা, সেটি আমরা সংগ্রহ করেছি এবং যেটি নিশ্চিত সরবরাহ লাইনে আছে এবং সেটিকে বিবেচনায় নিয়ে বলতে পারি এপ্রিল এবং মে মাসে যে চাহিদা, সেটি পূরণের পূর্ণ সক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে।সেটি আমরা নিশ্চিত করতে সক্ষম হওয়ায় এখন মূলত জুন মাসের প্রয়োজন মেটাবার জন্য আমরা কাজ করছি।তেলের মজুদ থাকার পরেও কেন সংকট সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য আসেনি প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত