বিশ্বয়ানের যুগে প্রতারণার ধরণ পাল্টেছে। চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে প্রতারণা, জমি নিয়ে প্রতারণা, ভুয়া, জাল কাগজপত্র দেখিয়ে প্রতারণা, অনলাইন প্রতারণা, ব্যাংকিং প্রতারণা ইত্যাদি।
দণ্ডবিধির ৪১৭ ধারায় প্রতারণার শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, যদি কোন ব্যক্তি প্রতারণা করে তাহলে সেই ব্যক্তি এক বৎসর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে কিংবা অর্থদণ্ডে কিংবা উভয়দন্ডেই দণ্ডিত হবে।
আমাদের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা কথা বা ভুল তথ্য দিয়ে অন্যকে বিভ্রান্ত করে তার কাছ থেকে টাকা, সম্পদ, মালামাল বা কোনও সুবিধা আদায় করাকে সাধারণত প্রতারণা বলা হয়।
আরও সহজ করে বলতে গেলে কারও বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাকে ক্ষতির মুখে ফেলা মানেই প্রতারণা। যেমন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেয়া, চাকরি দেয়ার নাম করে টাকা নেয়া, সরকারি প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়া, ভিসা, ইমিগ্রেশন দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়া ইত্যাদি।
আবার অনেকে পণ্য বা সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণা করে থাকে। যেমন ভুল তথ্য দিয়ে জমি বিক্রি করা, ভাড়া বাড়ি দিতে গিয়ে ডাবল বুকিং করা, নকল পণ্যকে আসল বলে বিক্রি করা। অনেকে নথিপত্র জাল করে থাকে। যেমন-ভুয়া সনদ, ভুয়া পাসপোর্ট, ভুয়া কাগজ দেখিয়ে ব্যবসা বা লেনদেন করা, জাল স্বাক্ষর ব্যবহার ইত্যাদি।
অনলাইনে প্রতারণার মধ্যে রয়েছে বিকাশ/নগদ/রকেট অটিপি নিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়া, অনলাইন শপে টাকা নিয়ে পণ্য না পাঠানো, ফেইসবুকে লটারি, গিফট বা অফারের নাম করে টাকা নেয়া ইত্যাদি।
আর ব্যাংকিং বা আর্থিক প্রতারণার মধ্যে রয়েছে চেক জাল করা, হঠাৎ ‘আপনি লোন পেয়েছেন’ বলে টাকা হাতিয়ে নেয়া ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতারণা। যেমন পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা, অন্যের নাম বা আইডি ব্যবহার করে সুবিধা নেয়া। ভুয়া আইনজীবী, ভুয়া ডাক্তার পরিচয় ইত্যাদি।
আপনি এ জাতীয় প্রতারণার শিকার হলে প্রতিকার চাওয়ার প্রধান উপায় হচ্ছে নিকটস্থ থানা। প্রতারণার প্রমাণ সংগ্রহ করে নিকটস্থ থানায় লিখিতভাবে এজাহার দায়ের করুন। আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে থানা কোনো অভিযোগ পেলে মামলা নিতে আইনত বাধ্য, কারণ এ ধরনের গুরুতর অপরাধে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই তদন্ত ও গ্রেপ্তার করতে পারে। পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি), ১৯৪৩ এর ২৪৩, ২৪৩ (চ), ২৪৪ (ক) ও ২৪৫ প্রবিধান এবং ফৌজদারি কার্যবিধির, ১৮৯৮’র ১৫৪ ধারানুযায়ী, ‘আমলযোগ্য প্রত্যেক অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের সামনে প্রদত্ত প্রথম তথ্য রেকর্ড করতে হবে সেটা প্রাথমিকভাবে সত্য হোক বা মিথ্যা হোক কিংবা গুরুতর হোক বা ক্ষুদ্র হোক অথবা দণ্ডবিধি বা অন্য কোন স্পেশাল বা আঞ্চলিক আইনের অধীন শাস্তিযোগ্য যাহাই হোক না কেন। আবার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৭ (১) (গ) ধারায় বলা হয়েছে যে, থানার ওসি কাছে যদি এটা প্রতীয়মান হয় যে, মামলাটির পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই, তাহলে তিনি মামলাটির তদন্ত করবেন না।
আবার দণ্ডবিধিতে উল্লেখিত ২১১ ধারায় মিথ্যা মামলা দায়েরের পাল্টা ব্যবস্থা রাখার ফলে থানায় মামলা রেকর্ড করার বিষয়টিকে ভারসাম্য করা হয়েছে। কোন কারণে থানা মামলা না নিলে আপনি সংশ্লিষ্ট জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে সরাসরি অভিযোগপত্র সি.আর মামলা দায়ের করতে পারবেন। আর অনলাইন প্রতারণার ক্ষেত্রে সাইবার ক্রাইম ইউনিট সিআইডি, সাইবার পুলিশের ওয়েবসাইটেও গিয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন। ব্যাংক, মোবাইল বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আপনি প্রতারিত হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইনে সাইবার ট্রাইবুনালে মামলা করে প্রতিকার পেতে পারেন। তবে মামলা করতে হলে অবশ্যই প্রমাণপত্র সংগ্রহ করতে হবে। প্রতারণার প্রমাণ হিসেবে স্ক্রিনশর্ট, রেকর্ডিং, চুক্তি, মেসেজ, টাকা লেনদেনের প্রমাণ (বিকাশ/ব্যাংক/চেক), ব্যক্তির নাম ঠিকানা, মোবাইল নম্বর (যতটুকু জানা হয়), সঙ্গে উপযুক্ত সাক্ষী-তাহলেই আপনি প্রতারককে শাস্তি দিতে পারবেন।
[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ এপ্রিল ২০২৬
বিশ্বয়ানের যুগে প্রতারণার ধরণ পাল্টেছে। চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে প্রতারণা, জমি নিয়ে প্রতারণা, ভুয়া, জাল কাগজপত্র দেখিয়ে প্রতারণা, অনলাইন প্রতারণা, ব্যাংকিং প্রতারণা ইত্যাদি।
দণ্ডবিধির ৪১৭ ধারায় প্রতারণার শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, যদি কোন ব্যক্তি প্রতারণা করে তাহলে সেই ব্যক্তি এক বৎসর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে কিংবা অর্থদণ্ডে কিংবা উভয়দন্ডেই দণ্ডিত হবে।
আমাদের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা কথা বা ভুল তথ্য দিয়ে অন্যকে বিভ্রান্ত করে তার কাছ থেকে টাকা, সম্পদ, মালামাল বা কোনও সুবিধা আদায় করাকে সাধারণত প্রতারণা বলা হয়।
আরও সহজ করে বলতে গেলে কারও বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাকে ক্ষতির মুখে ফেলা মানেই প্রতারণা। যেমন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেয়া, চাকরি দেয়ার নাম করে টাকা নেয়া, সরকারি প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়া, ভিসা, ইমিগ্রেশন দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়া ইত্যাদি।
আবার অনেকে পণ্য বা সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণা করে থাকে। যেমন ভুল তথ্য দিয়ে জমি বিক্রি করা, ভাড়া বাড়ি দিতে গিয়ে ডাবল বুকিং করা, নকল পণ্যকে আসল বলে বিক্রি করা। অনেকে নথিপত্র জাল করে থাকে। যেমন-ভুয়া সনদ, ভুয়া পাসপোর্ট, ভুয়া কাগজ দেখিয়ে ব্যবসা বা লেনদেন করা, জাল স্বাক্ষর ব্যবহার ইত্যাদি।
অনলাইনে প্রতারণার মধ্যে রয়েছে বিকাশ/নগদ/রকেট অটিপি নিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়া, অনলাইন শপে টাকা নিয়ে পণ্য না পাঠানো, ফেইসবুকে লটারি, গিফট বা অফারের নাম করে টাকা নেয়া ইত্যাদি।
আর ব্যাংকিং বা আর্থিক প্রতারণার মধ্যে রয়েছে চেক জাল করা, হঠাৎ ‘আপনি লোন পেয়েছেন’ বলে টাকা হাতিয়ে নেয়া ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতারণা। যেমন পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা, অন্যের নাম বা আইডি ব্যবহার করে সুবিধা নেয়া। ভুয়া আইনজীবী, ভুয়া ডাক্তার পরিচয় ইত্যাদি।
আপনি এ জাতীয় প্রতারণার শিকার হলে প্রতিকার চাওয়ার প্রধান উপায় হচ্ছে নিকটস্থ থানা। প্রতারণার প্রমাণ সংগ্রহ করে নিকটস্থ থানায় লিখিতভাবে এজাহার দায়ের করুন। আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে থানা কোনো অভিযোগ পেলে মামলা নিতে আইনত বাধ্য, কারণ এ ধরনের গুরুতর অপরাধে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই তদন্ত ও গ্রেপ্তার করতে পারে। পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি), ১৯৪৩ এর ২৪৩, ২৪৩ (চ), ২৪৪ (ক) ও ২৪৫ প্রবিধান এবং ফৌজদারি কার্যবিধির, ১৮৯৮’র ১৫৪ ধারানুযায়ী, ‘আমলযোগ্য প্রত্যেক অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের সামনে প্রদত্ত প্রথম তথ্য রেকর্ড করতে হবে সেটা প্রাথমিকভাবে সত্য হোক বা মিথ্যা হোক কিংবা গুরুতর হোক বা ক্ষুদ্র হোক অথবা দণ্ডবিধি বা অন্য কোন স্পেশাল বা আঞ্চলিক আইনের অধীন শাস্তিযোগ্য যাহাই হোক না কেন। আবার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৭ (১) (গ) ধারায় বলা হয়েছে যে, থানার ওসি কাছে যদি এটা প্রতীয়মান হয় যে, মামলাটির পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই, তাহলে তিনি মামলাটির তদন্ত করবেন না।
আবার দণ্ডবিধিতে উল্লেখিত ২১১ ধারায় মিথ্যা মামলা দায়েরের পাল্টা ব্যবস্থা রাখার ফলে থানায় মামলা রেকর্ড করার বিষয়টিকে ভারসাম্য করা হয়েছে। কোন কারণে থানা মামলা না নিলে আপনি সংশ্লিষ্ট জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে সরাসরি অভিযোগপত্র সি.আর মামলা দায়ের করতে পারবেন। আর অনলাইন প্রতারণার ক্ষেত্রে সাইবার ক্রাইম ইউনিট সিআইডি, সাইবার পুলিশের ওয়েবসাইটেও গিয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন। ব্যাংক, মোবাইল বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আপনি প্রতারিত হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইনে সাইবার ট্রাইবুনালে মামলা করে প্রতিকার পেতে পারেন। তবে মামলা করতে হলে অবশ্যই প্রমাণপত্র সংগ্রহ করতে হবে। প্রতারণার প্রমাণ হিসেবে স্ক্রিনশর্ট, রেকর্ডিং, চুক্তি, মেসেজ, টাকা লেনদেনের প্রমাণ (বিকাশ/ব্যাংক/চেক), ব্যক্তির নাম ঠিকানা, মোবাইল নম্বর (যতটুকু জানা হয়), সঙ্গে উপযুক্ত সাক্ষী-তাহলেই আপনি প্রতারককে শাস্তি দিতে পারবেন।
[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

আপনার মতামত লিখুন