হাইকোর্টে কোনো মামলা দায়েরের ৪৫ দিনের মধ্যে শুনানি না হলে তা বাতিল হয়ে যাওয়ার ‘অলিখিত’ নিয়ম, হঠাৎ করে বেঞ্চ ভেঙে দেওয়া এবং মামলার কার্যতালিকা (কজলিস্ট) ছোট করার তীব্র সমালোচনা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা। তারা বলছেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এখন ‘অনিয়মই নিয়মে’ পরিণত হয়েছে; যার ফলে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবী উভয়ই চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (৬ মে) সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন প্রাঙ্গণে সাধারণ আইনজীবীদের এক প্রতিবাদ সমাবেশে এ ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর মামলার কজলিস্ট ছোট করার প্রতিবাদ জানিয়ে আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস বলেন, “বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর আমরা দেখলাম আমাদের কজলিস্টের পেইজ কমানো হলো। বলা হলো, প্রত্যেকটা কোর্ট পেইজ পাবে দুটো। সুতরাং দুই পাতার মধ্যে হয়তো ২০ বা ৩০টি মামলা মাননীয় বিচারপতি মহোদয় দিতে পারেন। সেই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যখন কোর্টে মামলা জমা দিই, দেখা যায় যে আমাদের মামলা লিস্টেই আসে না।”
কজলিস্ট ছোট করার পেছনে রাষ্ট্রের অর্থ খরচের অজুহাত নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, “আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা আইনজীবীরা যে পরিমাণে রেভিনিউ সরকারকে দিই, তার ১০০ ভাগের এক ভাগও এই কজলিস্ট ছাপাতে ব্যয় হয় না। সুতরাং এই সমস্ত খোঁড়া অজুহাতে কজলিস্ট ছোট করা যাবে না। কজলিস্ট ছোট করে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এটা সম্পূর্ণভাবে সংবিধান বিরোধী।”
প্রধান বিচারপতির প্রতি অনুরোধ জানিয়ে আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস বলেন, “আমাদের দৈনন্দিন মামলার কার্যতালিকা আপনারা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেবেন। কার্যতালিকা বড় হলে আমাদের এই সমস্যা আর থাকবে না। খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে কজলিস্ট ছোট করে ১৮ কোটি মানুষের বিচারের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে যে প্রহসন হচ্ছে, আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”
আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির বিধিনিষেধেরও সমালোচনা করেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, “আমাদের মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয় সাংবাদিকদের কোর্টরুমে ঢুকতে দেন না, যেটা এর আগে কখনোই ছিল না। আমরা এটারও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। কারণ বিচার সবসময় পাবলিকলি (উন্মুক্তভাবে) হওয়া উচিত।”
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে আইনজীবী চঞ্চল বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি মহোদয় এই কজলিস্টের সুরাহা না করবেন, ততক্ষণ আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।”
সমাবেশে ৪৫ দিনের নতুন নিয়মের কথা উল্লেখ করে আইনজীবীরা জানান, নিয়ম ছিল- একবার কোনো মামলা ফাইল করা হলে শুনানি না হওয়া পর্যন্ত তা কোর্টে থাকবে। কিন্তু কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, ৪৫ দিন পার হলেই মামলা আর শোনা হচ্ছে না।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. মো শাহজাহান বলেন, “দেশের গরিব বিচারপ্রার্থীরা অনেক কষ্ট ও প্রচুর খরচ করে একটি এফিডেভিট করেন। সেটি কোর্টে জমা দেওয়ার পর যদি বেঞ্চ পুনর্গঠন হয় বা কোর্ট না থাকে, তার দায় বিচারপ্রার্থীর নয়। কোর্টে জমা দেওয়ার পর তিন-পাঁচটি কোর্ট ঘুরতে যদি ছয় মাস বা এক বছরও সময় লাগে, সেখানে কেন ৪৫ দিন গণনা করা হবে?”
আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকার পরও সময়সীমা চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সমস্যাটা আদালতের। কোর্টের সংখ্যা কম হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে বিচার দেওয়া যায় না। এতে বিচারপ্রার্থীদের কোনো অপরাধ নেই। মামলা কোর্টের প্রসেসের মধ্যে থাকার পরও ৪৫ দিন গণনা করাটা খুবই অন্যায় ও অবিচার হবে। কোর্টে দাখিল করার পর যেন আর ৪৫ দিন গণনা করা না হয়, প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারপতিদের কাছে আমি সেই বিনীত অনুরোধ জানাই।”
আইনজীবী ব্যারিস্টার সানাউল্লাহ নুরী বলেন, “নিম্ন আদালতে জামিন নামঞ্জুরের পর হাই কোর্টে আসতে অনেক কষ্ট করে মামলার সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু মামলা জমা নেওয়ার পর হঠাৎ করেই মাঝখানে কোর্টের বেঞ্চ ভেঙে দেওয়া হয়। বেঞ্চ ভেঙে দেওয়ার পর ওইসব মামলার ফাইল আমাদের বারান্দা থেকে কুড়িয়ে নিতে হয়। একটি মামলা নেওয়া মানে একজন মানুষের জীবন-মরণের দায়িত্ব নেওয়া। কিন্তু ৪৫ দিনের নিয়মে মামলা বাতিল হওয়ার পর অন্য কোর্টে তা আর ফাইল করা যায় না।”
এ নিয়মের কারণে সাধারণ আইনজীবীদের সম্মান ও পেশাদারিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “তখন ক্লায়েন্ট মনে করেন যে আইনজীবী অসফল, কোনো দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন অথবা টাকা নিয়ে কাজ করছেন না। সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবী হিসেবে এতে আমাদের ডিগনিটি ও সম্মান নষ্ট হচ্ছে।”
৪৫ দিনের এই নিয়মের কারণে সৃষ্ট জটিলতা এবং বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে একই ধরনের ক্ষোভ ও সমালোচনা করেন আইনজীবী সুব্রত কুণ্ডু এবং আইনজীবী চৈতালি চক্রবর্তী চৈতীও। তারা প্রধান বিচারপতি এবং অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার এবং দ্রুত সুরাহা করার আহ্বান জানান। বিক্ষোভ সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন আইনমন্ত্রী আসলাম মিঞা। দাবি না মানা পর্যন্ত তাদের এই আন্দোলন চলবে বলেও জানান এই আইনজীবী।

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬
হাইকোর্টে কোনো মামলা দায়েরের ৪৫ দিনের মধ্যে শুনানি না হলে তা বাতিল হয়ে যাওয়ার ‘অলিখিত’ নিয়ম, হঠাৎ করে বেঞ্চ ভেঙে দেওয়া এবং মামলার কার্যতালিকা (কজলিস্ট) ছোট করার তীব্র সমালোচনা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা। তারা বলছেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এখন ‘অনিয়মই নিয়মে’ পরিণত হয়েছে; যার ফলে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবী উভয়ই চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (৬ মে) সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন প্রাঙ্গণে সাধারণ আইনজীবীদের এক প্রতিবাদ সমাবেশে এ ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর মামলার কজলিস্ট ছোট করার প্রতিবাদ জানিয়ে আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস বলেন, “বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর আমরা দেখলাম আমাদের কজলিস্টের পেইজ কমানো হলো। বলা হলো, প্রত্যেকটা কোর্ট পেইজ পাবে দুটো। সুতরাং দুই পাতার মধ্যে হয়তো ২০ বা ৩০টি মামলা মাননীয় বিচারপতি মহোদয় দিতে পারেন। সেই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যখন কোর্টে মামলা জমা দিই, দেখা যায় যে আমাদের মামলা লিস্টেই আসে না।”
কজলিস্ট ছোট করার পেছনে রাষ্ট্রের অর্থ খরচের অজুহাত নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, “আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা আইনজীবীরা যে পরিমাণে রেভিনিউ সরকারকে দিই, তার ১০০ ভাগের এক ভাগও এই কজলিস্ট ছাপাতে ব্যয় হয় না। সুতরাং এই সমস্ত খোঁড়া অজুহাতে কজলিস্ট ছোট করা যাবে না। কজলিস্ট ছোট করে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এটা সম্পূর্ণভাবে সংবিধান বিরোধী।”
প্রধান বিচারপতির প্রতি অনুরোধ জানিয়ে আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস বলেন, “আমাদের দৈনন্দিন মামলার কার্যতালিকা আপনারা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেবেন। কার্যতালিকা বড় হলে আমাদের এই সমস্যা আর থাকবে না। খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে কজলিস্ট ছোট করে ১৮ কোটি মানুষের বিচারের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে যে প্রহসন হচ্ছে, আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”
আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির বিধিনিষেধেরও সমালোচনা করেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, “আমাদের মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয় সাংবাদিকদের কোর্টরুমে ঢুকতে দেন না, যেটা এর আগে কখনোই ছিল না। আমরা এটারও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। কারণ বিচার সবসময় পাবলিকলি (উন্মুক্তভাবে) হওয়া উচিত।”
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে আইনজীবী চঞ্চল বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি মহোদয় এই কজলিস্টের সুরাহা না করবেন, ততক্ষণ আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।”
সমাবেশে ৪৫ দিনের নতুন নিয়মের কথা উল্লেখ করে আইনজীবীরা জানান, নিয়ম ছিল- একবার কোনো মামলা ফাইল করা হলে শুনানি না হওয়া পর্যন্ত তা কোর্টে থাকবে। কিন্তু কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, ৪৫ দিন পার হলেই মামলা আর শোনা হচ্ছে না।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. মো শাহজাহান বলেন, “দেশের গরিব বিচারপ্রার্থীরা অনেক কষ্ট ও প্রচুর খরচ করে একটি এফিডেভিট করেন। সেটি কোর্টে জমা দেওয়ার পর যদি বেঞ্চ পুনর্গঠন হয় বা কোর্ট না থাকে, তার দায় বিচারপ্রার্থীর নয়। কোর্টে জমা দেওয়ার পর তিন-পাঁচটি কোর্ট ঘুরতে যদি ছয় মাস বা এক বছরও সময় লাগে, সেখানে কেন ৪৫ দিন গণনা করা হবে?”
আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকার পরও সময়সীমা চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সমস্যাটা আদালতের। কোর্টের সংখ্যা কম হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে বিচার দেওয়া যায় না। এতে বিচারপ্রার্থীদের কোনো অপরাধ নেই। মামলা কোর্টের প্রসেসের মধ্যে থাকার পরও ৪৫ দিন গণনা করাটা খুবই অন্যায় ও অবিচার হবে। কোর্টে দাখিল করার পর যেন আর ৪৫ দিন গণনা করা না হয়, প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারপতিদের কাছে আমি সেই বিনীত অনুরোধ জানাই।”
আইনজীবী ব্যারিস্টার সানাউল্লাহ নুরী বলেন, “নিম্ন আদালতে জামিন নামঞ্জুরের পর হাই কোর্টে আসতে অনেক কষ্ট করে মামলার সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু মামলা জমা নেওয়ার পর হঠাৎ করেই মাঝখানে কোর্টের বেঞ্চ ভেঙে দেওয়া হয়। বেঞ্চ ভেঙে দেওয়ার পর ওইসব মামলার ফাইল আমাদের বারান্দা থেকে কুড়িয়ে নিতে হয়। একটি মামলা নেওয়া মানে একজন মানুষের জীবন-মরণের দায়িত্ব নেওয়া। কিন্তু ৪৫ দিনের নিয়মে মামলা বাতিল হওয়ার পর অন্য কোর্টে তা আর ফাইল করা যায় না।”
এ নিয়মের কারণে সাধারণ আইনজীবীদের সম্মান ও পেশাদারিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “তখন ক্লায়েন্ট মনে করেন যে আইনজীবী অসফল, কোনো দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন অথবা টাকা নিয়ে কাজ করছেন না। সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবী হিসেবে এতে আমাদের ডিগনিটি ও সম্মান নষ্ট হচ্ছে।”
৪৫ দিনের এই নিয়মের কারণে সৃষ্ট জটিলতা এবং বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে একই ধরনের ক্ষোভ ও সমালোচনা করেন আইনজীবী সুব্রত কুণ্ডু এবং আইনজীবী চৈতালি চক্রবর্তী চৈতীও। তারা প্রধান বিচারপতি এবং অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার এবং দ্রুত সুরাহা করার আহ্বান জানান। বিক্ষোভ সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন আইনমন্ত্রী আসলাম মিঞা। দাবি না মানা পর্যন্ত তাদের এই আন্দোলন চলবে বলেও জানান এই আইনজীবী।

আপনার মতামত লিখুন