সংবাদ

প্রবন্ধ

“অরণ্যে বাস-নেকড়ের ত্রাস...”


জাঁ-নেসার ওসমান
জাঁ-নেসার ওসমান
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ০৭:১৭ এএম

“অরণ্যে বাস-নেকড়ের ত্রাস...”
শওকত ওসমান

কথাশিল্পী শওকত ওসমান তাঁর মৃত্যুর প্রায় আট মাস আগে লিখছেন— “অরণ্যে বাস/ নেকড়ের ত্রাস/ কুয়ার জলে শুধু/ হেরি আকাশ|” তারিখ: ২৭/০৭/১৯৯৭| 

জীবন সায়াহ্নে কথাশিল্পী শওকত ওসমানের মনে হচ্ছে তাঁর বাস, যেন এক অরণ্যে, যেথা জন্তু জানোয়াররা সমাজপতির দায়িত্ব প্রাপ্ত|

অথচ ২৫.০৯.১৯৭০ সালে, পাকিস্তানি আমলে তাঁর, এক অপ্রকাশিত “কোনো জন্তুর উক্তি” কবিতায় তিনি লিখছেন, “...তবে সান্ত্বনা বহু দিন পরে/ এবার হাঁফ ছাড়া যাক প্রাণ ভরে/ আমাদের বলবে জানোয়ার/ এমন থাকল না কেউ আর|”

সমাজে এখন আর বনের পশুকে, জানোয়ার বলার মতো কোনো প্রণির অস্তিত্ব নেই| কারণ এখন সকলেই জন্তু-জানোয়ার সমকক্ষ| 

এই পাকিস্তানে, মাত্র ছ’মাসের মাথায় ভাঙনের কলরব শোনা গেল| ১৯৭১, ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় মাত্র নয় মাসে পাকিস্তান ভেঙে দু’টুকরো|

যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেয়া বীর মুক্তিযোদ্ধাটি, যিনি বাংলাদেশ বেতারে তাঁর পঠিত কথিকায় বলেন, “যে পথ দিয়ে পাঠান এসেছিলো/ সে পথ দিয়ে ফিরলোনাকো তারা, জয় বাংলা|”

জীবন সায়াহ্নে বলছেন, “অরণ্যে বাস/ নেকড়ের ত্রাস...” তাহলে, কী হলো!! এ কোন স্বাধীনতা অর্জন করলেন মুক্তবুদ্ধির সন্তানরা!! নিজেদের পরিচালিত নিজেদের দেশকে অরণ্য বলে আক্ষায়িত করছেন!!

বিগত চুয়ান্ন বছরে বাংলার বুকে কথাশিল্পী শওকত ওসমান হয়তো বহু নেকড়ের কারণে পদে পদে বিব্রত হয়েছেন| বিখ্যাত সাহিত্যিক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তাঁর লেখা, “আপনারা কি জানেন” প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন, শওকত ওসমানকেই জাতীয় অধ্যাপক করার জন্য| সেই নির্দেশ উপেক্ষিত হয়েছে| কারণ ছিলো ঠুঁটে, শওকত ওসমান, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগে, সংক্ষেপে, বাকশালে সই করেননি, তিনি বাকশালে যোগ দেননি! শওকত ভাই হয়তো জানতেন এমন হবে| শেক্সপীয়র-প্রেমিক শওকত ভাই ৬ই জানুয়ারি ১৯৭৭ ম্যাকবেথের উক্তি উচ্চারণ করেন, ‘হে স্বদেশ ভূমি তোমাকে মা ডাকতে ভয় হয়| বলতে ইচ্ছে করে তুমি আমাদের গোরস্থান|’”

বিখ্যাত সাহিত্যিক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর আরও লিখছেন, “শওকত ভাই চিরকালই বিদ্রোহীদের পক্ষে ছিলেন| সেই অবস্থান থেকে কখনও সরে আসেননি|”

তাহলে বাংলা সাহিত্যে জনজীবনের ভাষা যারা শিল্পসম্মত রূপে উপস্থাপন করলেন সেইসব ক্ষণজন্মা কথাশিল্পীরা নিজ হাতে গড়া স্বাধীন বাংলাদেশকে অরণ্যের সাথে তুলনা করছেন! ধিক ধিক সেই সমাজের সন্তানদের যারা স্বাধীন বাংলাদেশের পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে দেশটাকে অরণ্যে পরিণত করছেন| এই অরণ্যে বসবাসের জন্য কি কথাশিল্পী শওকত ওসমানদের মতো সৎ সুন্দর বুদ্ধিজীবীরা লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার মতো লড়াই করেছিলেন!! তাদের উৎসর্গিত প্রাণের বিনিময়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে তা কি কেবলই অরণ্য সৃষ্টির জন্য!!

কথাশিল্পী শওকত ওসমান পাকিস্তান আমলে পঞ্চাশের দশকে ঐতিহাসিক কাগমারী সন্মেলনের এক আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক| আজীবন যাঁরা শোষকের বিরুদ্ধে আর শোষিতের পক্ষে কলম ধরেছেন, যিনি পাকিস্তান আমলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে, পাকিস্তানি জান্তার বিরুদ্ধে “ক্রীতদাসের হাসির” মতো প্রতিবাদী উপন্যাস লিখলেন যা তৎকালীন সাত কোটি নিপীড়িত বাঙালির প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর রূপে বিবেচিত, আজ নিজ স্বাধীন দেশকেই তাঁরাই গহীন অরণ্যের সাথে তুলনা করছেন!! এ-লজ্জাকার? আপনার, আমার, আমাদের দেশ পরিচালনার সুযোগ পাওয়া বঙ্গসন্তানের!!

তাহলে!!

আজ কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ২৮তম, মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের এই নপুংশক দক্ষতার জন্য আমরা কি সামান্যতম লজ্জাপাবো??

ভাবতে পারেন কথাশিল্পী শওকত ওসমান ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের পর, পূর্বপাকিস্তানে চট্টগ্রাম কর্মাস কলেজে অধ্যাপনার সময় তাঁর একার রোজগারে, কথাশিল্পীর মা, স্ত্রী, ছয় সন্তান, দু’জন ভ্রাতসপুত্র, দু’জন গৃহকর্ম সহায়ক ও আপন সহদোর জিলানী ওসমান সব নিয়ে চৌদ্দজনের সংসার পরিচালিত হচ্ছে| কোনো প্রকার লোভ লালসা উপরি ইনকাম কোনো কিছুই কথাশিল্পী শওকত ওসমানদের স্পর্শ করতে পারেনি| 

পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান, তৎকালীন প্রায় সব বুদ্ধিজীবীদের ঢাকার বর্তমান চেয়ারম্যান বাড়িতে দশ কাঠার প্লট বরাদ্দ করলেন| বরাদ্দ কৃতদের মাঝে একমাত্র কথাশিল্পী শওকত ওসমান শাষক শ্রেণির উৎকোচ রূপে প্রদত্ত দশ কাঠার প্লট প্রত্যাখান করলেন| বললেন আমি শোষকের দেওয়া উৎকোচ গ্রহণ করবোনা| আমি ছোটবেলায় দেখেছি, যে সব অফিসাররা জমি বরাদ্দের দায়িত্বে রয়েছেন তারা আমাদের ৭নং রাজারবাগের বাসায় এসে আব্বাকে বোঝাচ্ছেন, “শওকত তুমি জমিটা নাও, তোমার ছেলেদের কাজে লাগবে|” কিন্তু কথাশিল্পী শওকত ওসমান শাষক শ্রেণীর উৎকোচ রূপে প্রদত্ত দশ কাঠার প্লট গ্রহণ করবেন না|

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রামের “রাধিকা ভবন” যে বাসায় কথাশিল্পী শওকত ওসমান প্রায় পনের বছর বসবাস করেছিলেন, সেই বাসাটি সাতচল্লিশের দাঙ্গার সময় দুদু গুণ্ডারা পোড়াতে চেয়েছিলো তখন শওকত ওসমান তাদের বাড়ি না পোড়ানোর জন্য রাজি করান এবং ওই বাসায় দুদুদের থাকার ব্যবস্থা করেন| আমার ছোটবেলায় আমি ওই বাড়ির কিছু কিছু কাঠের জানালা আধপোড়া অবস্থায় দেখেছি|

পাকিস্তান সরকার যখন ষাটের দশকে “রাধিকা ভবন” শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ঘোষনা করতে যেয়ে দেখে যে, না “রাধিকা ভবন”কে শত্রু সম্পত্তি বলা যাচ্ছেনা কারণ কথাশিল্পী শওকত ওসমান প্রায় বার বছর ধরে সরকারি খাজনা প্রদান করেছেন| ফলে “রাধিকা ভবন” শত্রু সম্পত্তির হাত থেকে রক্ষা পেলো| পরে কথাশিল্পী শওকত ওসমান যখন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা কলেজে বদলি হয়ে চলে আসবেন, তখন কলকাতায় যেয়ে “রাধিকা ভবন”-এর প্রকৃত মালিককে খুঁজে এনে এক মুসলিম ব্যবসায়ির কাছে “রাধিকা ভবন” বিক্রি করে, মূল মালিককে অর্থ বুঝিয়ে দেন|   

এখন এই নির্লোভ মানুষদের হাতে গড়া বাংলাদেশকে যদি বর্তমানে অরণ্যের সাথে তুলনা করা হয় তখন সে লজ্জার কিছুটা ভাগ আমাদেরও গ্রহণ করতে হয়|

অরণ্যের সাথে তুলনা করবোইবা না কেন? 

এ কোন বাংলাদেশ যেখানে অন্তঃস্বত্তা মাকে অত্যাচারের পর তার গর্ভের সন্তানকে টুকরো টুকরো করা হয়!! এ-কোন পৈশাচিকতা!!

কাকে কী বলবো, আমেরিকার সাথে ড. ইউনূসের নন ডিসক্লোসার এ্যাগ্রিমেন্ট কার স্বার্থে!!

বর্তমানে আমরা বলতে পারি না যে আমরা কি বাঙালি না আমরা ভিন প্রজাতির কোনো প্রাণি!!

এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম বুঝি!!

কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ২৮তম, মৃত্যুবার্ষিকীতে বড় বেদনার সাথে কথাশিল্পী শওকত ওসমানের কথার প্রতিধ্বনি করে বলতে হয়, “অরণ্যে বাস/ নেকড়ের ত্রাস/ কুয়ার জলে শুধু / হেরি আকাশ| তারিখ, ২৭/০৭/১৯৯৭| কথাশিল্পী শওকত ওসমান...” 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬


“অরণ্যে বাস-নেকড়ের ত্রাস...”

প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬

featured Image

কথাশিল্পী শওকত ওসমান তাঁর মৃত্যুর প্রায় আট মাস আগে লিখছেন— “অরণ্যে বাস/ নেকড়ের ত্রাস/ কুয়ার জলে শুধু/ হেরি আকাশ|” তারিখ: ২৭/০৭/১৯৯৭| 

জীবন সায়াহ্নে কথাশিল্পী শওকত ওসমানের মনে হচ্ছে তাঁর বাস, যেন এক অরণ্যে, যেথা জন্তু জানোয়াররা সমাজপতির দায়িত্ব প্রাপ্ত|

অথচ ২৫.০৯.১৯৭০ সালে, পাকিস্তানি আমলে তাঁর, এক অপ্রকাশিত “কোনো জন্তুর উক্তি” কবিতায় তিনি লিখছেন, “...তবে সান্ত্বনা বহু দিন পরে/ এবার হাঁফ ছাড়া যাক প্রাণ ভরে/ আমাদের বলবে জানোয়ার/ এমন থাকল না কেউ আর|”

সমাজে এখন আর বনের পশুকে, জানোয়ার বলার মতো কোনো প্রণির অস্তিত্ব নেই| কারণ এখন সকলেই জন্তু-জানোয়ার সমকক্ষ| 

এই পাকিস্তানে, মাত্র ছ’মাসের মাথায় ভাঙনের কলরব শোনা গেল| ১৯৭১, ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় মাত্র নয় মাসে পাকিস্তান ভেঙে দু’টুকরো|

যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেয়া বীর মুক্তিযোদ্ধাটি, যিনি বাংলাদেশ বেতারে তাঁর পঠিত কথিকায় বলেন, “যে পথ দিয়ে পাঠান এসেছিলো/ সে পথ দিয়ে ফিরলোনাকো তারা, জয় বাংলা|”

জীবন সায়াহ্নে বলছেন, “অরণ্যে বাস/ নেকড়ের ত্রাস...” তাহলে, কী হলো!! এ কোন স্বাধীনতা অর্জন করলেন মুক্তবুদ্ধির সন্তানরা!! নিজেদের পরিচালিত নিজেদের দেশকে অরণ্য বলে আক্ষায়িত করছেন!!

বিগত চুয়ান্ন বছরে বাংলার বুকে কথাশিল্পী শওকত ওসমান হয়তো বহু নেকড়ের কারণে পদে পদে বিব্রত হয়েছেন| বিখ্যাত সাহিত্যিক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তাঁর লেখা, “আপনারা কি জানেন” প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন, শওকত ওসমানকেই জাতীয় অধ্যাপক করার জন্য| সেই নির্দেশ উপেক্ষিত হয়েছে| কারণ ছিলো ঠুঁটে, শওকত ওসমান, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগে, সংক্ষেপে, বাকশালে সই করেননি, তিনি বাকশালে যোগ দেননি! শওকত ভাই হয়তো জানতেন এমন হবে| শেক্সপীয়র-প্রেমিক শওকত ভাই ৬ই জানুয়ারি ১৯৭৭ ম্যাকবেথের উক্তি উচ্চারণ করেন, ‘হে স্বদেশ ভূমি তোমাকে মা ডাকতে ভয় হয়| বলতে ইচ্ছে করে তুমি আমাদের গোরস্থান|’”

বিখ্যাত সাহিত্যিক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর আরও লিখছেন, “শওকত ভাই চিরকালই বিদ্রোহীদের পক্ষে ছিলেন| সেই অবস্থান থেকে কখনও সরে আসেননি|”

তাহলে বাংলা সাহিত্যে জনজীবনের ভাষা যারা শিল্পসম্মত রূপে উপস্থাপন করলেন সেইসব ক্ষণজন্মা কথাশিল্পীরা নিজ হাতে গড়া স্বাধীন বাংলাদেশকে অরণ্যের সাথে তুলনা করছেন! ধিক ধিক সেই সমাজের সন্তানদের যারা স্বাধীন বাংলাদেশের পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে দেশটাকে অরণ্যে পরিণত করছেন| এই অরণ্যে বসবাসের জন্য কি কথাশিল্পী শওকত ওসমানদের মতো সৎ সুন্দর বুদ্ধিজীবীরা লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার মতো লড়াই করেছিলেন!! তাদের উৎসর্গিত প্রাণের বিনিময়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে তা কি কেবলই অরণ্য সৃষ্টির জন্য!!

কথাশিল্পী শওকত ওসমান পাকিস্তান আমলে পঞ্চাশের দশকে ঐতিহাসিক কাগমারী সন্মেলনের এক আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক| আজীবন যাঁরা শোষকের বিরুদ্ধে আর শোষিতের পক্ষে কলম ধরেছেন, যিনি পাকিস্তান আমলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে, পাকিস্তানি জান্তার বিরুদ্ধে “ক্রীতদাসের হাসির” মতো প্রতিবাদী উপন্যাস লিখলেন যা তৎকালীন সাত কোটি নিপীড়িত বাঙালির প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর রূপে বিবেচিত, আজ নিজ স্বাধীন দেশকেই তাঁরাই গহীন অরণ্যের সাথে তুলনা করছেন!! এ-লজ্জাকার? আপনার, আমার, আমাদের দেশ পরিচালনার সুযোগ পাওয়া বঙ্গসন্তানের!!

তাহলে!!

আজ কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ২৮তম, মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের এই নপুংশক দক্ষতার জন্য আমরা কি সামান্যতম লজ্জাপাবো??

ভাবতে পারেন কথাশিল্পী শওকত ওসমান ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের পর, পূর্বপাকিস্তানে চট্টগ্রাম কর্মাস কলেজে অধ্যাপনার সময় তাঁর একার রোজগারে, কথাশিল্পীর মা, স্ত্রী, ছয় সন্তান, দু’জন ভ্রাতসপুত্র, দু’জন গৃহকর্ম সহায়ক ও আপন সহদোর জিলানী ওসমান সব নিয়ে চৌদ্দজনের সংসার পরিচালিত হচ্ছে| কোনো প্রকার লোভ লালসা উপরি ইনকাম কোনো কিছুই কথাশিল্পী শওকত ওসমানদের স্পর্শ করতে পারেনি| 

পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান, তৎকালীন প্রায় সব বুদ্ধিজীবীদের ঢাকার বর্তমান চেয়ারম্যান বাড়িতে দশ কাঠার প্লট বরাদ্দ করলেন| বরাদ্দ কৃতদের মাঝে একমাত্র কথাশিল্পী শওকত ওসমান শাষক শ্রেণির উৎকোচ রূপে প্রদত্ত দশ কাঠার প্লট প্রত্যাখান করলেন| বললেন আমি শোষকের দেওয়া উৎকোচ গ্রহণ করবোনা| আমি ছোটবেলায় দেখেছি, যে সব অফিসাররা জমি বরাদ্দের দায়িত্বে রয়েছেন তারা আমাদের ৭নং রাজারবাগের বাসায় এসে আব্বাকে বোঝাচ্ছেন, “শওকত তুমি জমিটা নাও, তোমার ছেলেদের কাজে লাগবে|” কিন্তু কথাশিল্পী শওকত ওসমান শাষক শ্রেণীর উৎকোচ রূপে প্রদত্ত দশ কাঠার প্লট গ্রহণ করবেন না|

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রামের “রাধিকা ভবন” যে বাসায় কথাশিল্পী শওকত ওসমান প্রায় পনের বছর বসবাস করেছিলেন, সেই বাসাটি সাতচল্লিশের দাঙ্গার সময় দুদু গুণ্ডারা পোড়াতে চেয়েছিলো তখন শওকত ওসমান তাদের বাড়ি না পোড়ানোর জন্য রাজি করান এবং ওই বাসায় দুদুদের থাকার ব্যবস্থা করেন| আমার ছোটবেলায় আমি ওই বাড়ির কিছু কিছু কাঠের জানালা আধপোড়া অবস্থায় দেখেছি|

পাকিস্তান সরকার যখন ষাটের দশকে “রাধিকা ভবন” শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ঘোষনা করতে যেয়ে দেখে যে, না “রাধিকা ভবন”কে শত্রু সম্পত্তি বলা যাচ্ছেনা কারণ কথাশিল্পী শওকত ওসমান প্রায় বার বছর ধরে সরকারি খাজনা প্রদান করেছেন| ফলে “রাধিকা ভবন” শত্রু সম্পত্তির হাত থেকে রক্ষা পেলো| পরে কথাশিল্পী শওকত ওসমান যখন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা কলেজে বদলি হয়ে চলে আসবেন, তখন কলকাতায় যেয়ে “রাধিকা ভবন”-এর প্রকৃত মালিককে খুঁজে এনে এক মুসলিম ব্যবসায়ির কাছে “রাধিকা ভবন” বিক্রি করে, মূল মালিককে অর্থ বুঝিয়ে দেন|   

এখন এই নির্লোভ মানুষদের হাতে গড়া বাংলাদেশকে যদি বর্তমানে অরণ্যের সাথে তুলনা করা হয় তখন সে লজ্জার কিছুটা ভাগ আমাদেরও গ্রহণ করতে হয়|

অরণ্যের সাথে তুলনা করবোইবা না কেন? 

এ কোন বাংলাদেশ যেখানে অন্তঃস্বত্তা মাকে অত্যাচারের পর তার গর্ভের সন্তানকে টুকরো টুকরো করা হয়!! এ-কোন পৈশাচিকতা!!

কাকে কী বলবো, আমেরিকার সাথে ড. ইউনূসের নন ডিসক্লোসার এ্যাগ্রিমেন্ট কার স্বার্থে!!

বর্তমানে আমরা বলতে পারি না যে আমরা কি বাঙালি না আমরা ভিন প্রজাতির কোনো প্রাণি!!

এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম বুঝি!!

কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ২৮তম, মৃত্যুবার্ষিকীতে বড় বেদনার সাথে কথাশিল্পী শওকত ওসমানের কথার প্রতিধ্বনি করে বলতে হয়, “অরণ্যে বাস/ নেকড়ের ত্রাস/ কুয়ার জলে শুধু / হেরি আকাশ| তারিখ, ২৭/০৭/১৯৯৭| কথাশিল্পী শওকত ওসমান...” 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত