সংবাদ

অনার কিলিং: সভ্যতার অন্ধকার মুখ


জিয়াউদ্দীন আহমেদ
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম

অনার কিলিং: সভ্যতার অন্ধকার মুখ
দেশে দেশে অনার কিলিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও হয়

টাঙ্গাইলের কালিহাতীর পারুল আক্তার নিখোঁজ হয় ২০১৫ সনে। মেয়ের খোঁজ না থাকায় বাবা কুদ্দুছ মিয়া টানা সাত বছর ধরে থানা, পুলিশ, ডিবি, সিআইডি এবং আদালতে ছোটাছুটি করেছেন, কিন্তু সব সংস্থাই তদন্ত করে পারুলের নিখোঁজ সম্পর্কিত নিশ্চিত কোন তথ্য না পেয়ে আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে দেয়। ফাইনাল রিপোর্ট মানে তদন্ত শেষ, তদন্ত সংস্থার আর কিছু করার নেই। কিন্তু মামলার বাদী কুদ্দুছ মিয়া বারবার ‘নারাজি’ দেন, নারাজি মানে তদন্তে সন্তুষ্ট না হওয়া। এক সময় তিনি বলতে থাকেন, মেয়ের নিখোঁজের পেছনে মেয়ের স্বামীর হাত রয়েছে। আদালত সর্বশেষে তদন্তের দায়িত্ব দেয় পিবিআইকে। কয়েকদিন আগে পিআইবির তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, বাবার অমতে প্রেম করে বিয়ে করায় কুদ্দুছ মিয়া নিজেই তার মেয়েকে হত্যা করেছে। কৌশলে পারুলকে নিয়ে যায় জয়পুরহাটের পাঁচবিবির কলন্দপুর এলাকায়, সেখানে ভাড়াটে খুনিসহ মেয়েকে কুদ্দুছ মিয়া খুন করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়। কুদ্দুস মিয়া জেদ করে বারবার আদালতে নারাজি দেয়াতেই হত্যার রহস্য উন্মোচিত হলো, নতুবা পারুলের মৃত্য রহস্য অন্ধকারেই থেকে যেত।

পারুলের এই হত্যাকে বলা হয় ‘অনার কিলিং’। পরিবারের অমতে পারুল প্রেম ও বিয়ে করায় পরিবারের সম্মানহানি হয়েছিল, পারুলকে হত্যা করে সমাজে হারানো সন্মান ফেরত পেল কুদ্দুছ মিয়া। পরিবারের সন্মান ক্ষুণ্ন হয় ভিন্ন ধর্মের কাউকে বিয়ে করলে, কুমারী মেয়ে গর্ভবতী হলে, হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের শিশু জন্ম নিলে, ধর্ষিতা হলে, ধর্ম পরিবর্তন করলে, পরকীয়ায় জড়িত হলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভিকটিম হয় নারী, আর খুনি হয় বাবা, ভাই, স্বামী বা চাচা। এমন কাজের জন্য পাকিস্তান ও ভারতে সংশ্লিষ্টদের প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশ তত সাহসী হয়ে ওঠতে পারেনি, বাংলাদেশে এসব কাজের জন্য নিজের মেয়েকে বিষ খাইয়ে বা শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়, তারপর গাছ বা সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। কুমারী বা বিধবা মা তার ও পরিবারের সম্মান বাঁচানোর জন্য প্রসব করেই নবজাত শিশুকে ডাস্টবিনে ফেলে দেয় বা নবজাতকের মুখে লবন ঠুসে দিয়ে মেরে ফেলে- এটাও অনার কিলিং।

অনার কিলিং পাকিস্তানে এক সময় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রেম করে কোর্ট ম্যারেজ করায় ১৯ বছরের মেয়ে সাবাকে তার পিতা গুলি করে নদীতে ফেলে দেয়ার ঘটনা নিয়ে নির্মিত শর্ট ডকুমেন্টারি ‘অ্যা গার্ল ইন দ্য রিভার: দ্য প্রাইস অব ফরগিভনেস’ ২০১৬ সনে জিতে নিয়েছে অস্কার। বাবার নিষেধ থাকা সত্বেও প্রতিপক্ষ পরিবারের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করার কারণে পাকিস্তানে ছেলের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে বাবা খুব শান্তভাবে তার ছেলে গানি রেহমানকে শেষবারের মতো পরিবারের সবার সাথে রাতের খাবার খেতে আহবান করেন। মৃত্যুক্ষণ সন্নিকটে জেনে গানি খাওয়ার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে তার কক্ষে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে। বাবা খেয়ে এসে ছেলের হাত-পা বেঁধে জবাই করলো, মা ও বোনেরা সন্তানের গলা থেকে ফিনকি দিয়ে ওঠা রক্তস্রোত দেখল এবং মৃত্যু-কষ্টের গোঙানির শব্দ শুনল। পরিবারের অমতে বিয়ে করার অপরাধে পাকিস্তানের লাহোরে ফারজানা পারভিন নামের একটি মেয়েকে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে, পাথর ছুঁড়ে হত্যা করে তারই বাবা, ভাই, চাচাত ভাই মিলে প্রায় ২০ জনের একটি দল।

পাকিস্তানে অনার কিলিং মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ সেই দেশের শরিয়া আইন। শরিয়া আইনের কারণেই ৯০ শতাংশেরও বেশি অনার কিলিং হয় মুসলিম পরিবারে। শরিয়া আইনে ‘কতল-ই-আমদ’ বা ইচ্ছাকৃত খুনের শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড, কিন্তু নিহতের ওয়ারিশগণ হত্যাকারীকে ক্ষমা করলে বা অর্থের বিনিময়ে খুনির সঙ্গে সন্ধি করলে কিসাস রহিত হয়ে যায়। অনার কিলিং একই পরিবারের মধ্যেই সংগঠিত হয় বিধায় খুনিকে পরিবারের অন্য সদস্যরা ক্ষমা করে দেয়, কারণ কোন পরিবারই তাদের আরেকজন সদস্যকে হারাতে চায় না। এছাড়াও রক্তমূল্য বা ব্লাড মানির লেনদেনও হয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে, বোনকে খুন করার জন্য খুনি ভাইয়ের পক্ষে ব্লাড মানি দেয় পিতা, আর সেই ব্লাড মানি গ্রহণ করে খুনির মা। বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে পাকিস্তান ২০১৬ সনে অনার কিলিং বিরোধী আরেকটি আইন পাস করে, শরিয়া আইনে খুনিকে ক্ষমা করা হলেও নতুন আইনে খুনিকে বাধ্যতামূলক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়।

ভারতেও অনার কিলিং হয়। উত্তর ভারতের ভাগলপুর অনার কিলিংয়ের জন্য পাকিস্তানের মতোই কুখ্যাত, ২০০৮ সনে এই ভাগলপুরেই পরিবারের সন্মান রক্ষার্থে এক বাবা কুড়াল দিয়ে তার মেয়ের শিরোচ্ছেদ করে। হিন্দু-মুসলিম পরিবারের ছেলে-মেয়ের মধ্যে প্রেম বা বিয়ের পর ধর্মান্তর হলে তাকে বলে ‘লাভ জিহাদ’। ইসলাম ধর্ম যেহেতু ধর্মান্তর ছাড়া হিন্দু পরিবারে বিয়ে অনুমোদন দেয় না, সেহেতু হিন্দু কনে বা বরকে ধর্মান্তরিত হতে হয়। তাই ‘লাভ জিহাদ’ অধিকাংশ হিন্দু সহ্য করতে পারে না, এমন বিয়ের কারণে তাদের পরিবারের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়, সম্মান ক্ষুণ্ন হয় বলেই ধর্মান্তরিত পুত্র বা কন্যাকে হত্যা করা তাদের নিকট অনিবার্য হয়ে ওঠে। মুসলিম মেয়ে শাহজাদির সঙ্গে প্রেম করার কারণে হিন্দু ছেলে অঙ্কিত সাক্সেনাকে প্রকাশ্য দিবালোকে দিল্লির রাস্তায় জবাই করেছিল শাহজাদির বাবা ও কাকা। মেয়ে শাহজাদি পালিয়ে না গেলে তাকেও হত্যা করা হতো।

স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে জোর করে চিতায় তুলে স্বামীর সঙ্গে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলাও ছিল এক ধরনের অনার কিলিং। গোঁড়া হিন্দুরা অবশ্য সতীদাহকে অনার কিলিং বলতে নারাজ; তাদের মতে সতী স্ত্রীরা স্বামীর মরদেহের সঙ্গে স্বেচ্ছায় সহমরণে চিতায় ওঠতো। কিন্তু সব স্ত্রীরা স্বেচ্ছায় সহমরণে উদ্বুদ্ধ হতো না, স্বেচ্ছায় উদ্বুদ্ধ হলে স্ত্রীদের বেঁধে চিতায় নিক্ষেপ করার প্রয়োজন হতো না এবং তাদের মরণের ভয়ার্ত চিৎকার ঢোল বাজিয়ে চাপা দেয়ার চেষ্টাও হতো না। বৃটিশ রাজ পরিবারেও একটি অনার কিলিং হওয়ার কথা চাউর হয়েছে, যদিও রিটিশ রাজবধু প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর কারণ নিছক সড়ক দুর্ঘটনা, না অনার কিলিং তার রহস্য এখনও উদ্ঘাটন হয়নি। সউদি আরবের বহু মেয়ে অনার কিলিং থেকে বাঁচার জন্য বিদেশে পালিয়ে গেছে। অনার কিলিং উন্নত দেশগুলোতেও হয়, তবে তাদের বেশিরভাগ হয় অভিবাসী মুসলমান পরিবারে।

কী অদ্ভুত পৃথিবী! দুনিয়ার সর্বত্র বিপদের আশঙ্কা থাকলেও সন্তানেরা তাদের মা-বাবার আশ্রয়ে নিশ্চিত নিরাপদ বোধ করে, ক্রন্দনরত শিশু তার কান্না থামায় মায়ের কোলে মাথা গুঁজে। মায়ের কোলে এই নিরাপত্তা পশুর বাচ্চারাও অনুভব করে। বিপদে-আপদে সন্তানদের এমন নির্ভরশীলতার বিপরীতে মা-বাবার শত্রুসম এমন আচরণ শুধু চরম নির্মমতা আর নিষ্ঠুরতার পরিচায়ক নয়, বরং বিশ্বাসঘাতকতাও। আমার ধারণা, প্রতিটি সন্তান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার পূর্ব মুহুর্তেও মনে করে তার জন্মদাতা মা খুন করতে এলে বাবা বাঁচাবে, বাবা খুন করতে এলে মা বাঁচাবে। মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন গৃহকর্মী শিশুরাও অন্যের ঘরে বিপদ-আপদে শুধু মাকেই স্মরণ করে। একাত্তরে পরিত্যক্ত যে সব শিশুকে বিদেশিরা নিয়ে অঢেল ধন-সম্পদের মধ্যে বড় করেছে তাদেরও অনেকে তাদের মা-বাবার খোঁজে বাংলাদেশে এসেছে, কেউ পেয়েছে, কেউ পায়নি।

অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, এই সন্তানদেরই তাদের পিতা-মাতা, ভাইরা হত্যা করে সেই হত্যার নাম দিয়েছে ‘অনার কিলিং’, আর এই হত্যার মাধ্যমে মা-বাবা মনে করে তাদের সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার হলো। মনুষ্য সমাজে সামাজিক মর্যাদা এখনও নিজ সন্তানের জীবনের চেয়ে বেশি- কবে আর আমরা ডারউইনের হোমো স্যাপিয়েন্স থেকে ‘মানুষ’ হবো!

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬


অনার কিলিং: সভ্যতার অন্ধকার মুখ

প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬

featured Image

টাঙ্গাইলের কালিহাতীর পারুল আক্তার নিখোঁজ হয় ২০১৫ সনে। মেয়ের খোঁজ না থাকায় বাবা কুদ্দুছ মিয়া টানা সাত বছর ধরে থানা, পুলিশ, ডিবি, সিআইডি এবং আদালতে ছোটাছুটি করেছেন, কিন্তু সব সংস্থাই তদন্ত করে পারুলের নিখোঁজ সম্পর্কিত নিশ্চিত কোন তথ্য না পেয়ে আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে দেয়। ফাইনাল রিপোর্ট মানে তদন্ত শেষ, তদন্ত সংস্থার আর কিছু করার নেই। কিন্তু মামলার বাদী কুদ্দুছ মিয়া বারবার ‘নারাজি’ দেন, নারাজি মানে তদন্তে সন্তুষ্ট না হওয়া। এক সময় তিনি বলতে থাকেন, মেয়ের নিখোঁজের পেছনে মেয়ের স্বামীর হাত রয়েছে। আদালত সর্বশেষে তদন্তের দায়িত্ব দেয় পিবিআইকে। কয়েকদিন আগে পিআইবির তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, বাবার অমতে প্রেম করে বিয়ে করায় কুদ্দুছ মিয়া নিজেই তার মেয়েকে হত্যা করেছে। কৌশলে পারুলকে নিয়ে যায় জয়পুরহাটের পাঁচবিবির কলন্দপুর এলাকায়, সেখানে ভাড়াটে খুনিসহ মেয়েকে কুদ্দুছ মিয়া খুন করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়। কুদ্দুস মিয়া জেদ করে বারবার আদালতে নারাজি দেয়াতেই হত্যার রহস্য উন্মোচিত হলো, নতুবা পারুলের মৃত্য রহস্য অন্ধকারেই থেকে যেত।

পারুলের এই হত্যাকে বলা হয় ‘অনার কিলিং’। পরিবারের অমতে পারুল প্রেম ও বিয়ে করায় পরিবারের সম্মানহানি হয়েছিল, পারুলকে হত্যা করে সমাজে হারানো সন্মান ফেরত পেল কুদ্দুছ মিয়া। পরিবারের সন্মান ক্ষুণ্ন হয় ভিন্ন ধর্মের কাউকে বিয়ে করলে, কুমারী মেয়ে গর্ভবতী হলে, হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের শিশু জন্ম নিলে, ধর্ষিতা হলে, ধর্ম পরিবর্তন করলে, পরকীয়ায় জড়িত হলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভিকটিম হয় নারী, আর খুনি হয় বাবা, ভাই, স্বামী বা চাচা। এমন কাজের জন্য পাকিস্তান ও ভারতে সংশ্লিষ্টদের প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশ তত সাহসী হয়ে ওঠতে পারেনি, বাংলাদেশে এসব কাজের জন্য নিজের মেয়েকে বিষ খাইয়ে বা শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়, তারপর গাছ বা সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। কুমারী বা বিধবা মা তার ও পরিবারের সম্মান বাঁচানোর জন্য প্রসব করেই নবজাত শিশুকে ডাস্টবিনে ফেলে দেয় বা নবজাতকের মুখে লবন ঠুসে দিয়ে মেরে ফেলে- এটাও অনার কিলিং।

অনার কিলিং পাকিস্তানে এক সময় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রেম করে কোর্ট ম্যারেজ করায় ১৯ বছরের মেয়ে সাবাকে তার পিতা গুলি করে নদীতে ফেলে দেয়ার ঘটনা নিয়ে নির্মিত শর্ট ডকুমেন্টারি ‘অ্যা গার্ল ইন দ্য রিভার: দ্য প্রাইস অব ফরগিভনেস’ ২০১৬ সনে জিতে নিয়েছে অস্কার। বাবার নিষেধ থাকা সত্বেও প্রতিপক্ষ পরিবারের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করার কারণে পাকিস্তানে ছেলের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে বাবা খুব শান্তভাবে তার ছেলে গানি রেহমানকে শেষবারের মতো পরিবারের সবার সাথে রাতের খাবার খেতে আহবান করেন। মৃত্যুক্ষণ সন্নিকটে জেনে গানি খাওয়ার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে তার কক্ষে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে। বাবা খেয়ে এসে ছেলের হাত-পা বেঁধে জবাই করলো, মা ও বোনেরা সন্তানের গলা থেকে ফিনকি দিয়ে ওঠা রক্তস্রোত দেখল এবং মৃত্যু-কষ্টের গোঙানির শব্দ শুনল। পরিবারের অমতে বিয়ে করার অপরাধে পাকিস্তানের লাহোরে ফারজানা পারভিন নামের একটি মেয়েকে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে, পাথর ছুঁড়ে হত্যা করে তারই বাবা, ভাই, চাচাত ভাই মিলে প্রায় ২০ জনের একটি দল।

পাকিস্তানে অনার কিলিং মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ সেই দেশের শরিয়া আইন। শরিয়া আইনের কারণেই ৯০ শতাংশেরও বেশি অনার কিলিং হয় মুসলিম পরিবারে। শরিয়া আইনে ‘কতল-ই-আমদ’ বা ইচ্ছাকৃত খুনের শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড, কিন্তু নিহতের ওয়ারিশগণ হত্যাকারীকে ক্ষমা করলে বা অর্থের বিনিময়ে খুনির সঙ্গে সন্ধি করলে কিসাস রহিত হয়ে যায়। অনার কিলিং একই পরিবারের মধ্যেই সংগঠিত হয় বিধায় খুনিকে পরিবারের অন্য সদস্যরা ক্ষমা করে দেয়, কারণ কোন পরিবারই তাদের আরেকজন সদস্যকে হারাতে চায় না। এছাড়াও রক্তমূল্য বা ব্লাড মানির লেনদেনও হয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে, বোনকে খুন করার জন্য খুনি ভাইয়ের পক্ষে ব্লাড মানি দেয় পিতা, আর সেই ব্লাড মানি গ্রহণ করে খুনির মা। বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে পাকিস্তান ২০১৬ সনে অনার কিলিং বিরোধী আরেকটি আইন পাস করে, শরিয়া আইনে খুনিকে ক্ষমা করা হলেও নতুন আইনে খুনিকে বাধ্যতামূলক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়।

ভারতেও অনার কিলিং হয়। উত্তর ভারতের ভাগলপুর অনার কিলিংয়ের জন্য পাকিস্তানের মতোই কুখ্যাত, ২০০৮ সনে এই ভাগলপুরেই পরিবারের সন্মান রক্ষার্থে এক বাবা কুড়াল দিয়ে তার মেয়ের শিরোচ্ছেদ করে। হিন্দু-মুসলিম পরিবারের ছেলে-মেয়ের মধ্যে প্রেম বা বিয়ের পর ধর্মান্তর হলে তাকে বলে ‘লাভ জিহাদ’। ইসলাম ধর্ম যেহেতু ধর্মান্তর ছাড়া হিন্দু পরিবারে বিয়ে অনুমোদন দেয় না, সেহেতু হিন্দু কনে বা বরকে ধর্মান্তরিত হতে হয়। তাই ‘লাভ জিহাদ’ অধিকাংশ হিন্দু সহ্য করতে পারে না, এমন বিয়ের কারণে তাদের পরিবারের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়, সম্মান ক্ষুণ্ন হয় বলেই ধর্মান্তরিত পুত্র বা কন্যাকে হত্যা করা তাদের নিকট অনিবার্য হয়ে ওঠে। মুসলিম মেয়ে শাহজাদির সঙ্গে প্রেম করার কারণে হিন্দু ছেলে অঙ্কিত সাক্সেনাকে প্রকাশ্য দিবালোকে দিল্লির রাস্তায় জবাই করেছিল শাহজাদির বাবা ও কাকা। মেয়ে শাহজাদি পালিয়ে না গেলে তাকেও হত্যা করা হতো।

স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে জোর করে চিতায় তুলে স্বামীর সঙ্গে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলাও ছিল এক ধরনের অনার কিলিং। গোঁড়া হিন্দুরা অবশ্য সতীদাহকে অনার কিলিং বলতে নারাজ; তাদের মতে সতী স্ত্রীরা স্বামীর মরদেহের সঙ্গে স্বেচ্ছায় সহমরণে চিতায় ওঠতো। কিন্তু সব স্ত্রীরা স্বেচ্ছায় সহমরণে উদ্বুদ্ধ হতো না, স্বেচ্ছায় উদ্বুদ্ধ হলে স্ত্রীদের বেঁধে চিতায় নিক্ষেপ করার প্রয়োজন হতো না এবং তাদের মরণের ভয়ার্ত চিৎকার ঢোল বাজিয়ে চাপা দেয়ার চেষ্টাও হতো না। বৃটিশ রাজ পরিবারেও একটি অনার কিলিং হওয়ার কথা চাউর হয়েছে, যদিও রিটিশ রাজবধু প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর কারণ নিছক সড়ক দুর্ঘটনা, না অনার কিলিং তার রহস্য এখনও উদ্ঘাটন হয়নি। সউদি আরবের বহু মেয়ে অনার কিলিং থেকে বাঁচার জন্য বিদেশে পালিয়ে গেছে। অনার কিলিং উন্নত দেশগুলোতেও হয়, তবে তাদের বেশিরভাগ হয় অভিবাসী মুসলমান পরিবারে।

কী অদ্ভুত পৃথিবী! দুনিয়ার সর্বত্র বিপদের আশঙ্কা থাকলেও সন্তানেরা তাদের মা-বাবার আশ্রয়ে নিশ্চিত নিরাপদ বোধ করে, ক্রন্দনরত শিশু তার কান্না থামায় মায়ের কোলে মাথা গুঁজে। মায়ের কোলে এই নিরাপত্তা পশুর বাচ্চারাও অনুভব করে। বিপদে-আপদে সন্তানদের এমন নির্ভরশীলতার বিপরীতে মা-বাবার শত্রুসম এমন আচরণ শুধু চরম নির্মমতা আর নিষ্ঠুরতার পরিচায়ক নয়, বরং বিশ্বাসঘাতকতাও। আমার ধারণা, প্রতিটি সন্তান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার পূর্ব মুহুর্তেও মনে করে তার জন্মদাতা মা খুন করতে এলে বাবা বাঁচাবে, বাবা খুন করতে এলে মা বাঁচাবে। মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন গৃহকর্মী শিশুরাও অন্যের ঘরে বিপদ-আপদে শুধু মাকেই স্মরণ করে। একাত্তরে পরিত্যক্ত যে সব শিশুকে বিদেশিরা নিয়ে অঢেল ধন-সম্পদের মধ্যে বড় করেছে তাদেরও অনেকে তাদের মা-বাবার খোঁজে বাংলাদেশে এসেছে, কেউ পেয়েছে, কেউ পায়নি।

অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, এই সন্তানদেরই তাদের পিতা-মাতা, ভাইরা হত্যা করে সেই হত্যার নাম দিয়েছে ‘অনার কিলিং’, আর এই হত্যার মাধ্যমে মা-বাবা মনে করে তাদের সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার হলো। মনুষ্য সমাজে সামাজিক মর্যাদা এখনও নিজ সন্তানের জীবনের চেয়ে বেশি- কবে আর আমরা ডারউইনের হোমো স্যাপিয়েন্স থেকে ‘মানুষ’ হবো!

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত