সংবাদ

চামড়াশিল্পের সংকট


রেজাউল করিম খোকন
রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম

চামড়াশিল্পের সংকট
সঠিকভাবে চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর কোরবানির পশুর ১৫-৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়

চামড়াশিল্পের সংকট কাটাতে সরকার আসন্ন  ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে শৃঙ্খলা আনতেও নতুন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রতিবছর চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়া, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং সংরক্ষণ সংকট নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা কাটাতেই এবার আগাম প্রস্তুতি ও কঠোর ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়ার নতুন দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। এবারের সিদ্ধান্তে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা এবং খাসির চামড়ায় ৩ টাকা করে দাম বাড়ানো হয়েছে। এ বছর ঢাকা মহানগরে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২-৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে এ দাম ৫৭-৬২ টাকা। গত বছর ঢাকায় গরুর চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৬০-৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫-৬০ টাকা। সেই হিসাবে এ বছর প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২২-২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া এ খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণনীতিতে বড় ধরনের শিথিলতা এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি জারি করা এক বিশেষ সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এখন থেকে চামড়া ব্যবসায়ীরা আগের ঋণের বকেয়া কিস্তি পরিশোধ ছাড়াই নতুন ঋণ নেয়ার সুযোগ পাবেন। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম সচল রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, যেসব ব্যবসায়ীর ঋণ পুনঃতফসিল বা রিশিডিউল করা রয়েছে, তাদের নতুন ঋণ পেতে আগের বকেয়ার নির্দিষ্ট অংশ পরিশোধের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এ বিশেষ সুবিধা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, চামড়াশিল্প দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী খাত। যেহেতু এ খাতের প্রধান কাঁচামাল কোরবানির ঈদকে ঘিরেই সংগ্রহ করা হয়, তাই এ সময়ে ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের জোগান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে চামড়া খাতের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চলতি মূলধন ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এবারের নির্দেশনায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র সংগ্রাহকদের ওপর। যাতে ঋণসুবিধা শুধু বড় শিল্পপতি বা ট্যানারি মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য হাটবাজার ও গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এ সুবিধার আওতায় আসবেন বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোকে ২০২৬ সালের জন্য চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যা কোনোভাবেই গত বছরের তুলনায় কম রাখা যাবে না। ঋণের লক্ষ্যমাত্রা এবং তার বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয়ার সময়সীমাও বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের ফলে কোরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হওয়া রোধ হবে এবং মাঠপর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার ন্যায্য দাম পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চামড়া শিল্প রক্ষায় কিছু উদ্যোগ নিলেও তাতে কাঙ্ক্ষিত সুফল আসেনি। গত বছর কওমি মাদরাসাগুলোকে চামড়া সংরক্ষণের জন্য কাঁচা লবণ দেয়া হয়েছিল, কিন্তু সেটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সরকারের উচিত ছিল চামড়া শিল্পের দেশীয় বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবান এই কাঁচামালকে দেশীয় বাজারে মূল্যহীনতার অবস্থা থেকে মুক্ত করতে আগের সরকার ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের প্রকল্পে চামড়া শিল্প নিয়ে দৃশ্যমান কোনো পরিকল্পনা নেই, অথচ এটি রাষ্ট্রের বড় আয়ের একটি খাত। আগের সেই সিন্ডিকেটও এখনো পুরোপুরি ভাঙা যায়নি।  

কোরবানির সময় দেশের মোট চামড়ার প্রায় ৭১ শতাংশ কওমি মাদরাসার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। দ্রুত সিন্ডিকেট ভেঙে কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে গত বছর প্রথমবারের মতো দেশের মসজিদ-মাদরাসায় লবণ বরাদ্দ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সে ধারাবাহিকতায় এবারও বিভিন্ন মাদরাসায় বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে ২০ কোটি টাকার লবণ। তবে এবার প্রথমবারের মতো চামড়া সংরক্ষণে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। 

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সঠিকভাবে চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর কোরবানির পশুর ১৫-৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়। এর মধ্যে ২০ শতাংশেরও বেশি চামড়ায় কাটা-ছেঁড়া বা পক্সের মতো ক্ষত থাকে। এতে এসব চামড়ার গুণগত মান ও বাজারমূল্য কমে যায়।

কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে প্রস্তুতিমূলক নানা কার্যক্রম চলছে। সংস্কারকাজ চলছে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি)। অকেজো ও পুরনো যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে মোটর ও পাম্পগুলোর মেরামত ও প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। কঠিন বর্জ্য রাখার ডাম্পিং স্টেশনও সংস্কার করা হচ্ছে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল মজুত করা হচ্ছে। তবে যুদ্ধের কারণে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া ও জ্বালানি সংকটে প্রায় ১৫ দিন ট্যানারিতে উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে প্রস্তুতিতে কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চামড়া শিল্পনগরীর প্রস্তুতি ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এখনও শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বৈঠক বাকি রয়েছে। এসব বৈঠকের পরই সামগ্রিক প্রস্তুতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।

গত বছরের মতো এবারও প্রায় ২০ কোটি টাকার লবণ মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানায় বিনা মূল্যে বিতরণ করা হবে। এর লক্ষ্য হলো, এসব প্রতিষ্ঠান যেন কোরবানির চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারে এবং ন্যায্য মূল্য পায়। গত বছর প্রথমবার এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এবার সেটিকে আরও কার্যকর করতে লবণ বিতরণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে।

গত বছর প্রথমবারের মতো চামড়া সংগ্রহে বিভিন্ন মাদ্রাসায় লবণ দেয়া হলেও উদ্যোগটির পুরো সুফল পাওয়া যায়নি। এমন কিছু মাদ্রাসায় লবণ দেয়া হয়েছিল, যেসব মাদ্রাসা চামড়া সংগ্রহ করে না। পরে সেসব মাদরাসা বরাদ্দকৃত লবণ বিক্রি করে দেয়। এসব বিবেচনায় এ বছর মাদ্রাসা, মসজিদ ও লিল্লাহ বোর্ডিং নির্ধারণে আরও সতর্কতা অবল¤^ন করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সে জন্য এবার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে।

সরকার লবণ বিতরণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীরা চামড়া সংগ্রহ করলেও লবণ প্রয়োগে তাদের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। ফলে সময়মতো ও সঠিকভাবে লবণ দেয়া হয় না। এতে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়।

 [লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬


চামড়াশিল্পের সংকট

প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬

featured Image

চামড়াশিল্পের সংকট কাটাতে সরকার আসন্ন  ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে শৃঙ্খলা আনতেও নতুন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রতিবছর চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়া, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং সংরক্ষণ সংকট নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা কাটাতেই এবার আগাম প্রস্তুতি ও কঠোর ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়ার নতুন দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। এবারের সিদ্ধান্তে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা এবং খাসির চামড়ায় ৩ টাকা করে দাম বাড়ানো হয়েছে। এ বছর ঢাকা মহানগরে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২-৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে এ দাম ৫৭-৬২ টাকা। গত বছর ঢাকায় গরুর চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৬০-৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫-৬০ টাকা। সেই হিসাবে এ বছর প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২২-২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া এ খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণনীতিতে বড় ধরনের শিথিলতা এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি জারি করা এক বিশেষ সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এখন থেকে চামড়া ব্যবসায়ীরা আগের ঋণের বকেয়া কিস্তি পরিশোধ ছাড়াই নতুন ঋণ নেয়ার সুযোগ পাবেন। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম সচল রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, যেসব ব্যবসায়ীর ঋণ পুনঃতফসিল বা রিশিডিউল করা রয়েছে, তাদের নতুন ঋণ পেতে আগের বকেয়ার নির্দিষ্ট অংশ পরিশোধের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এ বিশেষ সুবিধা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, চামড়াশিল্প দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী খাত। যেহেতু এ খাতের প্রধান কাঁচামাল কোরবানির ঈদকে ঘিরেই সংগ্রহ করা হয়, তাই এ সময়ে ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের জোগান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে চামড়া খাতের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চলতি মূলধন ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এবারের নির্দেশনায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র সংগ্রাহকদের ওপর। যাতে ঋণসুবিধা শুধু বড় শিল্পপতি বা ট্যানারি মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য হাটবাজার ও গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এ সুবিধার আওতায় আসবেন বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোকে ২০২৬ সালের জন্য চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যা কোনোভাবেই গত বছরের তুলনায় কম রাখা যাবে না। ঋণের লক্ষ্যমাত্রা এবং তার বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয়ার সময়সীমাও বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের ফলে কোরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হওয়া রোধ হবে এবং মাঠপর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার ন্যায্য দাম পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চামড়া শিল্প রক্ষায় কিছু উদ্যোগ নিলেও তাতে কাঙ্ক্ষিত সুফল আসেনি। গত বছর কওমি মাদরাসাগুলোকে চামড়া সংরক্ষণের জন্য কাঁচা লবণ দেয়া হয়েছিল, কিন্তু সেটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সরকারের উচিত ছিল চামড়া শিল্পের দেশীয় বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবান এই কাঁচামালকে দেশীয় বাজারে মূল্যহীনতার অবস্থা থেকে মুক্ত করতে আগের সরকার ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের প্রকল্পে চামড়া শিল্প নিয়ে দৃশ্যমান কোনো পরিকল্পনা নেই, অথচ এটি রাষ্ট্রের বড় আয়ের একটি খাত। আগের সেই সিন্ডিকেটও এখনো পুরোপুরি ভাঙা যায়নি।  

কোরবানির সময় দেশের মোট চামড়ার প্রায় ৭১ শতাংশ কওমি মাদরাসার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। দ্রুত সিন্ডিকেট ভেঙে কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে গত বছর প্রথমবারের মতো দেশের মসজিদ-মাদরাসায় লবণ বরাদ্দ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সে ধারাবাহিকতায় এবারও বিভিন্ন মাদরাসায় বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে ২০ কোটি টাকার লবণ। তবে এবার প্রথমবারের মতো চামড়া সংরক্ষণে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। 

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সঠিকভাবে চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর কোরবানির পশুর ১৫-৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়। এর মধ্যে ২০ শতাংশেরও বেশি চামড়ায় কাটা-ছেঁড়া বা পক্সের মতো ক্ষত থাকে। এতে এসব চামড়ার গুণগত মান ও বাজারমূল্য কমে যায়।

কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে প্রস্তুতিমূলক নানা কার্যক্রম চলছে। সংস্কারকাজ চলছে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি)। অকেজো ও পুরনো যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে মোটর ও পাম্পগুলোর মেরামত ও প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। কঠিন বর্জ্য রাখার ডাম্পিং স্টেশনও সংস্কার করা হচ্ছে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল মজুত করা হচ্ছে। তবে যুদ্ধের কারণে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া ও জ্বালানি সংকটে প্রায় ১৫ দিন ট্যানারিতে উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে প্রস্তুতিতে কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চামড়া শিল্পনগরীর প্রস্তুতি ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এখনও শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বৈঠক বাকি রয়েছে। এসব বৈঠকের পরই সামগ্রিক প্রস্তুতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।

গত বছরের মতো এবারও প্রায় ২০ কোটি টাকার লবণ মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানায় বিনা মূল্যে বিতরণ করা হবে। এর লক্ষ্য হলো, এসব প্রতিষ্ঠান যেন কোরবানির চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারে এবং ন্যায্য মূল্য পায়। গত বছর প্রথমবার এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এবার সেটিকে আরও কার্যকর করতে লবণ বিতরণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে।

গত বছর প্রথমবারের মতো চামড়া সংগ্রহে বিভিন্ন মাদ্রাসায় লবণ দেয়া হলেও উদ্যোগটির পুরো সুফল পাওয়া যায়নি। এমন কিছু মাদ্রাসায় লবণ দেয়া হয়েছিল, যেসব মাদ্রাসা চামড়া সংগ্রহ করে না। পরে সেসব মাদরাসা বরাদ্দকৃত লবণ বিক্রি করে দেয়। এসব বিবেচনায় এ বছর মাদ্রাসা, মসজিদ ও লিল্লাহ বোর্ডিং নির্ধারণে আরও সতর্কতা অবল¤^ন করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সে জন্য এবার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে।

সরকার লবণ বিতরণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীরা চামড়া সংগ্রহ করলেও লবণ প্রয়োগে তাদের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। ফলে সময়মতো ও সঠিকভাবে লবণ দেয়া হয় না। এতে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়।

 [লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত