অতি সম্প্রতিকালের কিছু ধর্ষণ ঘটনা। টাঙ্গাইল পৌরসভা এনায়েতপুর বইল্যা বাজারের পূর্ব পাশের একটি মহিলা মাদ্রাসার ৪০ জনের বেশি কন্যা শিশুকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। যৌন নির্যাতন করা হতো ছাত্রীদের চোখ বেঁধে। ছাত্রীদের বাথরুম গোপনে ভিডিও করে তা প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন চালানো হতো। নেত্রকোণার মদন উপজেলায় একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকের ধর্ষণে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা। গর্ভবতী হওয়া নিয়ে শিশুটির কোনো জ্ঞান নেই, পেটের ভেতর নড়াচড়া সে অনুভব করেছে, কিন্তু কী নড়াচড়া করে তা সে জানে না। তার শারীরে পরিবর্তন আসার পর তার পরিবার তাকে প্রশ্ন করে ধর্ষণের বিষয়টি জানতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের ‘আল হিদায়াত হিফজুল কুরআন মডেল মাদ্রাসায়’ ৯ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে শিক্ষক সাকির আলী প্রথমে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছেন, পরে গলা চেপে শূন্যে তুলে মাটিতে আছাড় দিয়েছেন, শিশুটি যন্ত্রণায় যতবেশি কান্নাকাটি করেছে, শিক্ষকের নির্যাতন ততবেশি বেড়েছে। সহপাঠিরা আতঙ্কিত অবস্থায় এই দৃশ্য দেখেছে। এই নির্যাতন হচ্ছে যৌনকর্মের পূর্ব প্রস্তুতি।এমন ঘটনা শত শত।
ধর্ষণ শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতে কমবেশি আছে, কিন্তু বাংলাদেশে মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্ষণ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জিম্মি করে ধর্ষণ করা হয়, যৌনকর্মে রাজি না হলে ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। কিন্তু মাদ্রাসায় ধর্ষণের চিত্র ভিন্ন, সেখানে ধর্ষিত প্রায় সবাই শিশু। মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের বলাৎকারের নানা কাহিনী রূপকথার গল্পের মতো অবিশ্বাস্য মনে হয়। মাদ্রাসার শিক্ষকদের ধর্ষণ ও বলাৎকারে বহু শিশু মারাও গেছে। শুধু কী মাদ্রাসার শিক্ষক ? না, মসজিদের অনেক ইমাম ও মুয়াজ্জিনও ধর্ষণ এবং বলাৎকারের অপকর্মে লিপ্ত। এরা বহু ঘটনায় ধরা পড়েছে, সাধারণ জনগণের হাতে নিগৃতও হয়েছে, তারপরও ধর্ষণ আর বলাৎকার থামছে না। ধর্ম এবং রাষ্ট্রও এদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখেছে, কিন্তু এরা ভয় পায় না। লুত জাতির ধ্বংস বা দোজখের আগুনে দগ্ধ হওয়ার ভীতিজনক শাস্তির ভয়ও তাদের কুৎসিত প্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখতে পারে না। এরা ধর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল বলেই সম্ভবত ধর্মের নিষেধাজ্ঞা এদের ভীত করে না।
একশ্রেণীর মাওলানা, ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বলাৎকার ও ধর্ষণের ধরন শুধু বিকৃত নয়, অভিনবও। শিশুর মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে, হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ ও বলাৎকার করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চকোলেট দিয়ে, কোন কোন ক্ষেত্রে গোসল বা গায়ে তেল মাখানোর ফজিলত বর্ণনা করতে করতে, কখনো কখনো সওয়াব কামানোর বানী দিয়ে, আবার কখনো কখনো বেহেস্ত পাওয়ার আশ্বাসবানী শুনিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এমনও দেখা গেছে, নির্যাতিত শিশুর যন্ত্রণার চিৎকার শুনে ধর্ষক মাওলানারা বেশি বেশি যৌন উত্তেজনা অনুভব করেছে। শয়তান আছর করে বলেই তাদের ধর্ষণশক্তি বেড়ে যায়, সব দোষ শয়তানের ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা। ধর্ষণের আরও একটি অভিনব কৌশল তারা অনুসরণ করে থাকে, তারা শিশুদের মনে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাদের যৌনকর্মকে সহজ করে তোলে। শিক্ষকের কথা না শুনলে অন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়, হাতের আঙুলে পচন ধরার ভয়, কবরে বিষধর সাপের দংশনের ভয়, আর দোজখের ভয়। এইসব ভয় কাজ না করলে বেত আর লাঠির ভয়। মাদ্রাসার এমন অমানুষিক নির্যাতনের কথা সবাই জানে। শিশুর হাত-পা রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়, তারপর শুরু হয় পিটানো। শিশুর বাবাগো, মাগো চিৎকারে চারিদিক প্রকম্পিত হলেও শিক্ষকের মন গলে না, যতক্ষণ দেহে শক্তি থাকে ততক্ষণ পিটায়। মাঝে মাঝে হাত-পা বেঁধে টাঙ্গিয়ে পিটানো হয়। বাকি ছাত্র-ছাত্রীরা এই রোমহর্ষক নির্যাতনের মধ্যেও জোরে জোরে কোরআন পড়তে থাকে। এমন আতঙ্ক ও ভীতিজনক অবস্থা দেখার পর কোন শিক্ষার্থীর পক্ষে শিক্ষকের আহবানে যৌনকর্মে সাড়া না দেয়ার সাহস থাকে না। তাদের নালিশ করারও কোনো স্থান নেই, মা-বাবা ধর্মীয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগকে গুরুত্ব দেন না। অবশ্য মা-বাবার সীমাবদ্ধতাও আছে, মাদ্রাসা থেকে এনে সন্তানদের স্কুলে দেয়ার সামর্থ তাদের নেই। গরীব ঘরের শিশুরা মাদ্রাসায় শুধু পড়তে যায় না, খাবারও পায়। তাই কোন মা-বাবা চায় না তাদের সন্তান মাদ্রাসা থেকে বিতাড়িত হোক, বিতাড়িত হলে শুধু লেখাপড়া বন্ধ হবে না, হস্টেলে অবস্থান করে বিনে পয়সায় খাবারটাও হারাবে।
দেশে কতগুলো মাদ্রাসা আছে তার সঠিক হিসাব বের করাও কঠিন, কারণ কওমী মাদ্রাসা করতে সরকারের অনুমতি লাগে না। দেশের যেখানেই চোখ পড়বে সেখানেই মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা, কওমী মাদ্রাসা, মহিলা মাদ্রাসা, মহিলা ক্যাডেট মাদ্রাসা। ধর্মীয় রক্ষণশীল অংশের সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্য আওয়ামী লীগ সরকার দেশের আনাচেকানাচে কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর সরকারগুলোর চরম ব্যর্থতায় দরিদ্র ও হত দরিদ্র পরিবারগুলো সাধারণ শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, হচ্ছে। সমাজে যারা এককালে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন তাদেরই নাতিপুতি সন্তানেরা এখন মাদ্রাসা তৈরি করছেন। গণতন্ত্রের নামে আমাদের দেশে যে নির্বাচন হয় তাও মাদ্রাসার সম্প্রসারণে বিরাট ভূমিকা পালন করছে, আস্তিক-নাস্তিক-ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজ সব প্রার্থীই নির্বাচনের সময় অকাতরে মাদ্রাসায় দান করে যাচ্ছেন। আর যারা মাদ্রাসা থেকে পাস করছেন তাদের ইহকালে টিকে থাকার কোন কর্মজ্ঞান নেই, তাই কর্মসংস্থানের জন্য আরেকটি মাদ্রাসা খুলতে হয়।
গরীবের ইহকাল কষ্টের, তাই পরকালে বেহেশতের প্রত্যাশা অত্যধিক। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সব মুসলমানের একটি ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে, কোরআনে হাফেজ হলে তার মা-বাবা বেহেশতে যাবে। শুধু তাই নয়, একজন হাফেজ যে তার চৌদ্দ গোষ্ঠীকে বেহেশতে নিতে পারবেন সেই ধারণা আমাদের দেয়া হয়েছে মক্তবে। কিন্তু এ সম্পর্কে কোরআনে কোনো বক্তব্য নেই, এমন কী এ সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিসও নেই। একটি দুর্বল হাদিসে বলা হয়েছে যে, একজন কোরআনে হাফেজ তার গোষ্ঠীর ১০ জন জাহান্নামী ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। কিন্তু দুর্বল হওয়ায় অধিকাংশ আলেম এই হাদিসটি অগ্রহণযোগ্য বলে মতামত দিয়েছেন। তবুও পরিবারের একজন সদস্যকে হাফেজ বানানোর তীব্র আগ্রহ রয়েছে। এই আগ্রহ থেকেই গরীব পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের মাদ্রায় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায়। হাফেজ মাওলানা দ্বারা হাফেজ শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ আর বলাৎকার নিয়ে আলেম সমাজে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া নেই, ওয়াজে মাদ্রাসার কোন ধর্ষক শিক্ষককে ভর্ৎসনা করার নজিরও খুব বেশি নেই।
শুধু দেশে নয়, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতেও অহরহ ধর্ষণ হচ্ছে। সউদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো প্রভৃতি দেশে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলো থেকে নারী গৃহকর্মী নিয়ে গৃহকর্তা ও গৃহকর্তার ছেলে মিলে শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গৃহকর্মী গর্ভবতী হয়ে দেশে ফেরত আসে, দেশে আসার পর শিশু জন্ম নিলে তাদের বলা হয় ‘জারজ’। এমন নিষ্পাপ ‘জারজ’ সন্তানের জন্ম হয়েছে একাত্তরেও। গণিমতের মাল গণ্য করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার মিলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দুই থেকে চার লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছে। সেনাদের এই ধর্ষণ শুধু যৌনক্ষুধা মেটানোর তাগিদে হয়নি, হয়েছে একটি জাতি, সম্প্রদায়কে কলুষিত ও অপমানিত করার জিঘাংসাজাত আক্রোশ থেকে। তাদের গর্ভে জন্ম নেয়া শিশুদের অধিকাংশ বাংলাদেশে ঠাঁই পায়নি, তাদের স্থান হয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বাকি যারা ছিল তাদের স্কুলে ভর্তির সময় বাবার নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ লিখতে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর গৃকর্মীরাও একাত্তরের মতো অসহায়, তাদের নালিশ শোনার মতো কোন আপনজন ওখানে নেই; তাছাড়া সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ক্ষমতা এবং সাহস কোনটাই বাংলাদেশের নেই। বিদেশে গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন ও তাদের ধর্ষণ করার কারণে অদ্যাবধি কোনো ব্যক্তির শাস্তি হয়নি। ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, নেপাল, ফিলিপিন্স মাঝে মাঝে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ রাখে। কিন্তু অভাব তাদের আবার পাঠাতে বাধ্য করে।
সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই খারাপ, ৫ আগস্টের পর দেশের সর্বত্র এমন একটি প্রতীতির জন্ম হয়েছে যে, সংঘবদ্ধ হয়ে যাই করুক না কেন তা আমলে নেয়া হবে না। চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী এবং মব সন্ত্রাসের মতো ধর্ষকেরাও নিজেদের ‘বিপ্লবী’ ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায়, নিশ্চয়ই এই সরকার মোহাম্মদ ইউনূসের মতো ইনডেমনিটির চর্চা করবে না, জিরো টলারেন্সের একটি কঠোর বার্তা দিয়ে ধর্ষকদের মনে ভয় ধরিয়ে দেবে। এছাড়াও মাদ্রাসার ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আলেম সমাজ সোচ্চার হলে ধর্ষণ ও বলাৎকার থামানো হয়তো সম্ভব হবে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
অতি সম্প্রতিকালের কিছু ধর্ষণ ঘটনা। টাঙ্গাইল পৌরসভা এনায়েতপুর বইল্যা বাজারের পূর্ব পাশের একটি মহিলা মাদ্রাসার ৪০ জনের বেশি কন্যা শিশুকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। যৌন নির্যাতন করা হতো ছাত্রীদের চোখ বেঁধে। ছাত্রীদের বাথরুম গোপনে ভিডিও করে তা প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন চালানো হতো। নেত্রকোণার মদন উপজেলায় একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকের ধর্ষণে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা। গর্ভবতী হওয়া নিয়ে শিশুটির কোনো জ্ঞান নেই, পেটের ভেতর নড়াচড়া সে অনুভব করেছে, কিন্তু কী নড়াচড়া করে তা সে জানে না। তার শারীরে পরিবর্তন আসার পর তার পরিবার তাকে প্রশ্ন করে ধর্ষণের বিষয়টি জানতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের ‘আল হিদায়াত হিফজুল কুরআন মডেল মাদ্রাসায়’ ৯ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে শিক্ষক সাকির আলী প্রথমে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছেন, পরে গলা চেপে শূন্যে তুলে মাটিতে আছাড় দিয়েছেন, শিশুটি যন্ত্রণায় যতবেশি কান্নাকাটি করেছে, শিক্ষকের নির্যাতন ততবেশি বেড়েছে। সহপাঠিরা আতঙ্কিত অবস্থায় এই দৃশ্য দেখেছে। এই নির্যাতন হচ্ছে যৌনকর্মের পূর্ব প্রস্তুতি।এমন ঘটনা শত শত।
ধর্ষণ শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতে কমবেশি আছে, কিন্তু বাংলাদেশে মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্ষণ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জিম্মি করে ধর্ষণ করা হয়, যৌনকর্মে রাজি না হলে ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। কিন্তু মাদ্রাসায় ধর্ষণের চিত্র ভিন্ন, সেখানে ধর্ষিত প্রায় সবাই শিশু। মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের বলাৎকারের নানা কাহিনী রূপকথার গল্পের মতো অবিশ্বাস্য মনে হয়। মাদ্রাসার শিক্ষকদের ধর্ষণ ও বলাৎকারে বহু শিশু মারাও গেছে। শুধু কী মাদ্রাসার শিক্ষক ? না, মসজিদের অনেক ইমাম ও মুয়াজ্জিনও ধর্ষণ এবং বলাৎকারের অপকর্মে লিপ্ত। এরা বহু ঘটনায় ধরা পড়েছে, সাধারণ জনগণের হাতে নিগৃতও হয়েছে, তারপরও ধর্ষণ আর বলাৎকার থামছে না। ধর্ম এবং রাষ্ট্রও এদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখেছে, কিন্তু এরা ভয় পায় না। লুত জাতির ধ্বংস বা দোজখের আগুনে দগ্ধ হওয়ার ভীতিজনক শাস্তির ভয়ও তাদের কুৎসিত প্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখতে পারে না। এরা ধর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল বলেই সম্ভবত ধর্মের নিষেধাজ্ঞা এদের ভীত করে না।
একশ্রেণীর মাওলানা, ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বলাৎকার ও ধর্ষণের ধরন শুধু বিকৃত নয়, অভিনবও। শিশুর মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে, হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ ও বলাৎকার করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চকোলেট দিয়ে, কোন কোন ক্ষেত্রে গোসল বা গায়ে তেল মাখানোর ফজিলত বর্ণনা করতে করতে, কখনো কখনো সওয়াব কামানোর বানী দিয়ে, আবার কখনো কখনো বেহেস্ত পাওয়ার আশ্বাসবানী শুনিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এমনও দেখা গেছে, নির্যাতিত শিশুর যন্ত্রণার চিৎকার শুনে ধর্ষক মাওলানারা বেশি বেশি যৌন উত্তেজনা অনুভব করেছে। শয়তান আছর করে বলেই তাদের ধর্ষণশক্তি বেড়ে যায়, সব দোষ শয়তানের ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা। ধর্ষণের আরও একটি অভিনব কৌশল তারা অনুসরণ করে থাকে, তারা শিশুদের মনে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাদের যৌনকর্মকে সহজ করে তোলে। শিক্ষকের কথা না শুনলে অন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়, হাতের আঙুলে পচন ধরার ভয়, কবরে বিষধর সাপের দংশনের ভয়, আর দোজখের ভয়। এইসব ভয় কাজ না করলে বেত আর লাঠির ভয়। মাদ্রাসার এমন অমানুষিক নির্যাতনের কথা সবাই জানে। শিশুর হাত-পা রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়, তারপর শুরু হয় পিটানো। শিশুর বাবাগো, মাগো চিৎকারে চারিদিক প্রকম্পিত হলেও শিক্ষকের মন গলে না, যতক্ষণ দেহে শক্তি থাকে ততক্ষণ পিটায়। মাঝে মাঝে হাত-পা বেঁধে টাঙ্গিয়ে পিটানো হয়। বাকি ছাত্র-ছাত্রীরা এই রোমহর্ষক নির্যাতনের মধ্যেও জোরে জোরে কোরআন পড়তে থাকে। এমন আতঙ্ক ও ভীতিজনক অবস্থা দেখার পর কোন শিক্ষার্থীর পক্ষে শিক্ষকের আহবানে যৌনকর্মে সাড়া না দেয়ার সাহস থাকে না। তাদের নালিশ করারও কোনো স্থান নেই, মা-বাবা ধর্মীয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগকে গুরুত্ব দেন না। অবশ্য মা-বাবার সীমাবদ্ধতাও আছে, মাদ্রাসা থেকে এনে সন্তানদের স্কুলে দেয়ার সামর্থ তাদের নেই। গরীব ঘরের শিশুরা মাদ্রাসায় শুধু পড়তে যায় না, খাবারও পায়। তাই কোন মা-বাবা চায় না তাদের সন্তান মাদ্রাসা থেকে বিতাড়িত হোক, বিতাড়িত হলে শুধু লেখাপড়া বন্ধ হবে না, হস্টেলে অবস্থান করে বিনে পয়সায় খাবারটাও হারাবে।
দেশে কতগুলো মাদ্রাসা আছে তার সঠিক হিসাব বের করাও কঠিন, কারণ কওমী মাদ্রাসা করতে সরকারের অনুমতি লাগে না। দেশের যেখানেই চোখ পড়বে সেখানেই মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা, কওমী মাদ্রাসা, মহিলা মাদ্রাসা, মহিলা ক্যাডেট মাদ্রাসা। ধর্মীয় রক্ষণশীল অংশের সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্য আওয়ামী লীগ সরকার দেশের আনাচেকানাচে কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর সরকারগুলোর চরম ব্যর্থতায় দরিদ্র ও হত দরিদ্র পরিবারগুলো সাধারণ শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, হচ্ছে। সমাজে যারা এককালে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন তাদেরই নাতিপুতি সন্তানেরা এখন মাদ্রাসা তৈরি করছেন। গণতন্ত্রের নামে আমাদের দেশে যে নির্বাচন হয় তাও মাদ্রাসার সম্প্রসারণে বিরাট ভূমিকা পালন করছে, আস্তিক-নাস্তিক-ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজ সব প্রার্থীই নির্বাচনের সময় অকাতরে মাদ্রাসায় দান করে যাচ্ছেন। আর যারা মাদ্রাসা থেকে পাস করছেন তাদের ইহকালে টিকে থাকার কোন কর্মজ্ঞান নেই, তাই কর্মসংস্থানের জন্য আরেকটি মাদ্রাসা খুলতে হয়।
গরীবের ইহকাল কষ্টের, তাই পরকালে বেহেশতের প্রত্যাশা অত্যধিক। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সব মুসলমানের একটি ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে, কোরআনে হাফেজ হলে তার মা-বাবা বেহেশতে যাবে। শুধু তাই নয়, একজন হাফেজ যে তার চৌদ্দ গোষ্ঠীকে বেহেশতে নিতে পারবেন সেই ধারণা আমাদের দেয়া হয়েছে মক্তবে। কিন্তু এ সম্পর্কে কোরআনে কোনো বক্তব্য নেই, এমন কী এ সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিসও নেই। একটি দুর্বল হাদিসে বলা হয়েছে যে, একজন কোরআনে হাফেজ তার গোষ্ঠীর ১০ জন জাহান্নামী ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। কিন্তু দুর্বল হওয়ায় অধিকাংশ আলেম এই হাদিসটি অগ্রহণযোগ্য বলে মতামত দিয়েছেন। তবুও পরিবারের একজন সদস্যকে হাফেজ বানানোর তীব্র আগ্রহ রয়েছে। এই আগ্রহ থেকেই গরীব পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের মাদ্রায় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায়। হাফেজ মাওলানা দ্বারা হাফেজ শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ আর বলাৎকার নিয়ে আলেম সমাজে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া নেই, ওয়াজে মাদ্রাসার কোন ধর্ষক শিক্ষককে ভর্ৎসনা করার নজিরও খুব বেশি নেই।
শুধু দেশে নয়, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতেও অহরহ ধর্ষণ হচ্ছে। সউদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো প্রভৃতি দেশে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলো থেকে নারী গৃহকর্মী নিয়ে গৃহকর্তা ও গৃহকর্তার ছেলে মিলে শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গৃহকর্মী গর্ভবতী হয়ে দেশে ফেরত আসে, দেশে আসার পর শিশু জন্ম নিলে তাদের বলা হয় ‘জারজ’। এমন নিষ্পাপ ‘জারজ’ সন্তানের জন্ম হয়েছে একাত্তরেও। গণিমতের মাল গণ্য করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার মিলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দুই থেকে চার লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছে। সেনাদের এই ধর্ষণ শুধু যৌনক্ষুধা মেটানোর তাগিদে হয়নি, হয়েছে একটি জাতি, সম্প্রদায়কে কলুষিত ও অপমানিত করার জিঘাংসাজাত আক্রোশ থেকে। তাদের গর্ভে জন্ম নেয়া শিশুদের অধিকাংশ বাংলাদেশে ঠাঁই পায়নি, তাদের স্থান হয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বাকি যারা ছিল তাদের স্কুলে ভর্তির সময় বাবার নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ লিখতে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর গৃকর্মীরাও একাত্তরের মতো অসহায়, তাদের নালিশ শোনার মতো কোন আপনজন ওখানে নেই; তাছাড়া সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ক্ষমতা এবং সাহস কোনটাই বাংলাদেশের নেই। বিদেশে গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন ও তাদের ধর্ষণ করার কারণে অদ্যাবধি কোনো ব্যক্তির শাস্তি হয়নি। ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, নেপাল, ফিলিপিন্স মাঝে মাঝে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ রাখে। কিন্তু অভাব তাদের আবার পাঠাতে বাধ্য করে।
সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই খারাপ, ৫ আগস্টের পর দেশের সর্বত্র এমন একটি প্রতীতির জন্ম হয়েছে যে, সংঘবদ্ধ হয়ে যাই করুক না কেন তা আমলে নেয়া হবে না। চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী এবং মব সন্ত্রাসের মতো ধর্ষকেরাও নিজেদের ‘বিপ্লবী’ ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায়, নিশ্চয়ই এই সরকার মোহাম্মদ ইউনূসের মতো ইনডেমনিটির চর্চা করবে না, জিরো টলারেন্সের একটি কঠোর বার্তা দিয়ে ধর্ষকদের মনে ভয় ধরিয়ে দেবে। এছাড়াও মাদ্রাসার ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আলেম সমাজ সোচ্চার হলে ধর্ষণ ও বলাৎকার থামানো হয়তো সম্ভব হবে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন