সংবাদ

কৃত্রিম জনমত তৈরির ধারা ও বট বাহিনী


শেখর ভট্টাচার্য
শেখর ভট্টাচার্য
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম

কৃত্রিম জনমত তৈরির ধারা ও বট বাহিনী
ভার্চুয়াল সমাজে এই যে বিরামহীন যুদ্ধ চলছে এই যুদ্ধের সব চেয়ে বড় শক্তি হলো বট বাহিনী। কারা এই বট বাহিনী ?


আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক গতিপথ নির্ধারণে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে বট বাহিনী। কথাটি শুনে অনেকেই চমকে যেতে পারেন। বিমান বাহিনী, সেনা বাহিনী, নৌবাহিনীর থেকেও কখনো কখনো শক্তিশালী মনে হয় বট বাহিনীকে’! উন্নত পেশাদার বাহিনীগুলো সমাজের মতামত তৈরিতে ভূমিকা রাখে না। তবে বট বাহিনী সামাজিক মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট মতামতের পক্ষে মুহুর্তে লক্ষাধিক মানুষের কৃত্রিম মতামত সৃষ্টি করতে সক্ষম। 

সকলেই ‘এক-মত’ তাহলে বিষয়টি ‘সত্য’, এরকম ভেবে যারা নিজেদের মতামত পরিবর্তন করে থাকেন তাদের উপর বট বাহিনীর প্রভাব অসীম। সমাজে আজকাল প্রতিনিয়ত কিছুটা হলেও এই ধারাতে কৃত্রিম জনমত তৈরি হচ্ছে। কৃত্রিম ভাবে সৃষ্ট এসব মতামত ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত করছে ব্যক্তি, সমাজ এবং সরকারের মতামত এবং নীতি নির্ধারণে। মতামত তৈরির এই প্রক্রিয়া আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিকে গভীর সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জগতের অভিভাবকেরা কী এই অশুভ মতামত তৈরির প্রক্রিয়ার বিষয়ে সচেতন আছেন নাগরিক সমাজের সদস্য হিসেবে আমরা ঠিক বুঝতে পারিনা। 

‘রোবট’ থেকে ‘বট’ শব্দটি এসেছে। এটি এমন একটি প্রযুক্তি নির্ভর সফটওয়্যার, যা মানুষের মতো আচরণ করতে সক্ষম। এর কর্মক্ষেত্র হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বট বাহিনী কিংবা বটকে ব্যবহার করা হয় একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রচারনা চালিয়ে নিজেদের পক্ষে একটি কৃত্রিম মতামত তৈরি করা হলো বটবাহিনীর লক্ষ্য। রাজনীতির স্বাভাবিক গতিকে একটি নির্দিষ্ট দল বা মতাদর্শের দিকে টেনে নিতে বট বাহিনীর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। রাজনৈতিক প্রচারণা চালাতে, কখনো প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে, আবার কখনো কৃত্রিম জনপ্রিয়তা তৈরির জন্য বট বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়। বটবাহিনী হলো ছদ্ম বা গুপ্ত বাহিনী। মেঘনাদের মতো মেঘের আড়ালে এখানে প্রযুক্তির পর্দা টানিয়ে যুদ্ধ করে থাকে বটবাহিনী, যেহেতু বাহিনীটি ছদ্মবেশ ধারণ করে মতামত প্রচার করে থাকে তাই বটবাহিনী কোন ভাবেই ˆনতিক কোন শক্তি নয়। অনৈতিক ছদ্মবেশ ধারণকারীরা কখনোই সমাজে শুভ শক্তি হিসেবে গণ্য হতে পারেনা। 

ভার্চুয়াল সমাজে এই যে বিরামহীন যুদ্ধ চলছে এই যুদ্ধের সব চেয়ে বড় শক্তি হলো বট বাহিনী। কারা এই বট বাহিনী? বট কিন্তু শ্যামল ছায়া দিয়ে সবাইকে আগলে রাখা বটবৃক্ষ নয়। কৃত্রিম উত্তাপ ছড়িয়ে সমাজ ও রাজনীতির অলি-গলিতে প্রবেশ করে তথ্য বিকৃতি করে একটি ছদ্ম শক্তির পক্ষে মতামত তৈরি করে থাকে। এমন ভাবে মতামত তৈরি হয় সাধারণের কাছে মনে হয় এটিই প্রকৃত মতামত। 

আমরা গণতন্ত্র নিয়ে অষ্ট প্রহর কথা বলে থাকি। গণতন্ত্র কিন্তু নির্মিত হয় ‘গণের’ মতামতের ওপর। এই গণ বা জনগণ যে মতামত দিতে চান সে মতামত কী স্বাভাবিক ভাবে প্রকাশিত হতে পারছে নাকি পৃষ্ট হচ্ছে বট বাহিণীর মতামতের নিচে। সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতিতে ব্যাপক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। ভারসাম্য-হীনতা তৈরির জন্য বটবাহিনীর ভূমিকা কতোটুকু এসব বিষয়ে আমাদের গবেষণা যে খুব বেশি হচ্ছেনা, তা আমরা আঁচ করতে পারি। মনে রাখতে হবে গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি দাঁড়িয়ে থাকে মুক্ত মতপ্রকাশ, সত্য তথ্য এবং সচেতন নাগরিকের ওপর। সহিংসতা বা প্রতিপক্ষের কণ্ঠরোধ যেমন গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি কৃত্রিম জনমত তৈরির এই ডিজিটাল সংস্কৃতিও সমান বিপজ্জনক। সমাজ, রাজনীতির স্বাভাবিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করে এটি একটি কৃত্রিম, অবাস্তব, অযৌক্তিক পথে একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করে এবং বিভ্রান্তিকে সত্যের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বহুমুখী উন্নতির ফলে বটবাহিনী দিনেদিনে মানুষের মতো করে ভাষা ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। এ কারণেই মানুষ আর বটের মধ্যে পার্থক্য করা খুব কঠিন কাজ হয়ে পড়ছে। বট বাহিনী মূলত দু’ভাবে কাজ করে থাকে। বট বাহিনীকে মোতা দাগে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো প্রযুক্তি নির্ভর অর্থাৎ সফটওয়্যার নির্ভর বট আর অন্যটি হলো মানব নিয়ন্ত্রিত বট। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বট, নির্দিষ্ট শব্দ বা পোস্ট শনাক্ত করার ক্ষমতা রাখে। তাদের এতোই ক্ষমতা যে মুহূর্তের মধ্যে মন্তব্য, শেয়ার বা প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে মানবিক সুরে মানুষের মতো কথা বলতে সক্ষম হচ্ছে বট বাহিনী। মানবসদৃশ ভাষা ব্যবহারে তারা এতোই সক্ষম যে তাদের মতামতকে সমাজের কণ্ঠ হিসেবে বিবেচনা না করে পারা যায়না। স্বল্পশিক্ষিত অতিসাধারণ, কিংবা শিক্ষিত মানুষের পক্ষে প্রকৃত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী আর কৃত্রিম বটের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা দুরুহ হয়ে পড়ে।  মানব নিয়ন্ত্রিত বট কোন কোন ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নির্ভর বটের থেকে বিপদজনক। বাস্তব ক্ষেত্রে এরা মানুষ হলেও ছদ্ম পরিচয়ে এরা অগণন অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে থাকে। রাজনৈতিক দল, করপোরেট গোষ্ঠী কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের নির্দেশে তারা সংঘবদ্ধভাবে অপপ্রচার, গালাগালি, চরিত্রহনন ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালায়। একজন অপারেটর কখনো কখনো ত্রিশ, চল্লিশটি পর্যন্ত অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ করে। নির্দিষ্ট ভাবে ইশারা পেলেই তারা যে কোনো পোস্টে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমন্বিত আক্রমণ শুরু করে। বাস্তব সেনা সদস্যরাও এতো নিষ্ঠুর আক্রমণ করতে পারেনা। ছদ্ম প্রভুর ছদ্ম সেনারা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিরতিহীন ভাবে আক্রমন শানিয়ে যায়। 

বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তাপ যত বেড়েছে, বট বাহিনীর সক্রিয়তাও তত দৃশ্যমান হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক ঘটনা, আন্দোলন কিংবা সংবেদনশীল সংবাদ প্রকাশের পর মুহূর্তেই হাজার হাজার অভিন্ন মন্তব্য, একই ধরনের ভাষা ও একই সুরের প্রচারণা চোখে পড়ে। এতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের অনেকেই মনে করেন, যেন পুরো সমাজ একটি নির্দিষ্ট মতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অথচ বাস্তবে এই জনমতের ঢেউয়ের বড় অংশই কৃত্রিম। 

একটি বিষয় অত্যন্ত আশা জাগানিয়া। সেটি হলো কৃত্রিম মতামত সর্বস্তরের মানুষকে স্পর্শ করতে পারেনি। কৃত্রিম মতামত কিছুটা প্রভাবিত করতে পারে সামাজিক, রাজনৈতিক গতি প্রবাহ তবে প্রকৃত বা বাস্তব মতামতকে যথেষ্ট ভাবে প্রভাবিত করতে পারেনা। ফেসবুকের জনমত আর মাঠের বাস্তবতা যে এক নয়, তা প্রমাণিত হয়েছে ভোটের ফলাফলে। অনলাইনে যে পক্ষকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখানো হয়েছে, বাস্তবে নির্বাচনী ফলাফল ছিল তার ঠিক বিপরীত। এতে প্রমাণ হয়েছে, বটের তৈরি করা কৃত্রিম জনপ্রিয়তা সব সময় বাস্তব রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে না। মাঝে মধ্যে মীমাংসিত বিষয়কে মিথ্যা বানানোর চেষ্টা কিংবা টাইমিংয়ের হেরফেরে বট নিজেই হাসির পাত্রে পরিণত হয় এবং মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়। তবু ক্ষতি কম হচ্ছে না। কারণ, এই বট সংস্কৃতি সমাজে বিষাক্ততা বাড়াচ্ছে, মতপ্রকাশের পরিবেশ সংকুচিত করছে এবং তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস করছে। 

কৃত্রিম মতামত তৈরির এই প্রবাহকে রুখতে হলে প্রয়োজন ডিজিটাল লিটারেসি জ্ঞান। নাগরিক সমাজের এই দক্ষতার অভাবে কৃত্রিম মতামত তৈরির প্রক্রিয়া সবল হচ্ছে ক্রমাগত। আমাদের সমাজে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বা তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এখনও দুর্বল হওয়ায় বট নির্ভর প্রচারণা খুব সহজেই মানুষের আবেগ, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সামাজিক বিভাজনকে প্রভাবিত করতে পারে। 

সামজিক রাজনৈতিক গতিধারার স্বাভাবিক প্রবাহকে বহমান রাখাটা খুব জরুরি। কৃত্রিম মতামত আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের নিয়ন্ত্রক হতে পারেনা। ঘুণপোকা যেমন ভেতর থেকে একটি কাঠামোকে অকার্যকর করে ফেলে কৃত্রিম মতামতও এক সময় আমাদের জাতীয় পথ চলাকে অর্থহীন করে তুলতে পারে। সময় হয়েছে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধন এবং সামজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল লিটারেসির জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির। এ বিষয়ে নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তিবিদ এবং রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠন গুলোকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। 

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬


কৃত্রিম জনমত তৈরির ধারা ও বট বাহিনী

প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬

featured Image


আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক গতিপথ নির্ধারণে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে বট বাহিনী। কথাটি শুনে অনেকেই চমকে যেতে পারেন। বিমান বাহিনী, সেনা বাহিনী, নৌবাহিনীর থেকেও কখনো কখনো শক্তিশালী মনে হয় বট বাহিনীকে’! উন্নত পেশাদার বাহিনীগুলো সমাজের মতামত তৈরিতে ভূমিকা রাখে না। তবে বট বাহিনী সামাজিক মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট মতামতের পক্ষে মুহুর্তে লক্ষাধিক মানুষের কৃত্রিম মতামত সৃষ্টি করতে সক্ষম। 

সকলেই ‘এক-মত’ তাহলে বিষয়টি ‘সত্য’, এরকম ভেবে যারা নিজেদের মতামত পরিবর্তন করে থাকেন তাদের উপর বট বাহিনীর প্রভাব অসীম। সমাজে আজকাল প্রতিনিয়ত কিছুটা হলেও এই ধারাতে কৃত্রিম জনমত তৈরি হচ্ছে। কৃত্রিম ভাবে সৃষ্ট এসব মতামত ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত করছে ব্যক্তি, সমাজ এবং সরকারের মতামত এবং নীতি নির্ধারণে। মতামত তৈরির এই প্রক্রিয়া আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিকে গভীর সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জগতের অভিভাবকেরা কী এই অশুভ মতামত তৈরির প্রক্রিয়ার বিষয়ে সচেতন আছেন নাগরিক সমাজের সদস্য হিসেবে আমরা ঠিক বুঝতে পারিনা। 

‘রোবট’ থেকে ‘বট’ শব্দটি এসেছে। এটি এমন একটি প্রযুক্তি নির্ভর সফটওয়্যার, যা মানুষের মতো আচরণ করতে সক্ষম। এর কর্মক্ষেত্র হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বট বাহিনী কিংবা বটকে ব্যবহার করা হয় একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রচারনা চালিয়ে নিজেদের পক্ষে একটি কৃত্রিম মতামত তৈরি করা হলো বটবাহিনীর লক্ষ্য। রাজনীতির স্বাভাবিক গতিকে একটি নির্দিষ্ট দল বা মতাদর্শের দিকে টেনে নিতে বট বাহিনীর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। রাজনৈতিক প্রচারণা চালাতে, কখনো প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে, আবার কখনো কৃত্রিম জনপ্রিয়তা তৈরির জন্য বট বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়। বটবাহিনী হলো ছদ্ম বা গুপ্ত বাহিনী। মেঘনাদের মতো মেঘের আড়ালে এখানে প্রযুক্তির পর্দা টানিয়ে যুদ্ধ করে থাকে বটবাহিনী, যেহেতু বাহিনীটি ছদ্মবেশ ধারণ করে মতামত প্রচার করে থাকে তাই বটবাহিনী কোন ভাবেই ˆনতিক কোন শক্তি নয়। অনৈতিক ছদ্মবেশ ধারণকারীরা কখনোই সমাজে শুভ শক্তি হিসেবে গণ্য হতে পারেনা। 

ভার্চুয়াল সমাজে এই যে বিরামহীন যুদ্ধ চলছে এই যুদ্ধের সব চেয়ে বড় শক্তি হলো বট বাহিনী। কারা এই বট বাহিনী? বট কিন্তু শ্যামল ছায়া দিয়ে সবাইকে আগলে রাখা বটবৃক্ষ নয়। কৃত্রিম উত্তাপ ছড়িয়ে সমাজ ও রাজনীতির অলি-গলিতে প্রবেশ করে তথ্য বিকৃতি করে একটি ছদ্ম শক্তির পক্ষে মতামত তৈরি করে থাকে। এমন ভাবে মতামত তৈরি হয় সাধারণের কাছে মনে হয় এটিই প্রকৃত মতামত। 

আমরা গণতন্ত্র নিয়ে অষ্ট প্রহর কথা বলে থাকি। গণতন্ত্র কিন্তু নির্মিত হয় ‘গণের’ মতামতের ওপর। এই গণ বা জনগণ যে মতামত দিতে চান সে মতামত কী স্বাভাবিক ভাবে প্রকাশিত হতে পারছে নাকি পৃষ্ট হচ্ছে বট বাহিণীর মতামতের নিচে। সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতিতে ব্যাপক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। ভারসাম্য-হীনতা তৈরির জন্য বটবাহিনীর ভূমিকা কতোটুকু এসব বিষয়ে আমাদের গবেষণা যে খুব বেশি হচ্ছেনা, তা আমরা আঁচ করতে পারি। মনে রাখতে হবে গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি দাঁড়িয়ে থাকে মুক্ত মতপ্রকাশ, সত্য তথ্য এবং সচেতন নাগরিকের ওপর। সহিংসতা বা প্রতিপক্ষের কণ্ঠরোধ যেমন গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি কৃত্রিম জনমত তৈরির এই ডিজিটাল সংস্কৃতিও সমান বিপজ্জনক। সমাজ, রাজনীতির স্বাভাবিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করে এটি একটি কৃত্রিম, অবাস্তব, অযৌক্তিক পথে একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করে এবং বিভ্রান্তিকে সত্যের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বহুমুখী উন্নতির ফলে বটবাহিনী দিনেদিনে মানুষের মতো করে ভাষা ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। এ কারণেই মানুষ আর বটের মধ্যে পার্থক্য করা খুব কঠিন কাজ হয়ে পড়ছে। বট বাহিনী মূলত দু’ভাবে কাজ করে থাকে। বট বাহিনীকে মোতা দাগে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো প্রযুক্তি নির্ভর অর্থাৎ সফটওয়্যার নির্ভর বট আর অন্যটি হলো মানব নিয়ন্ত্রিত বট। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বট, নির্দিষ্ট শব্দ বা পোস্ট শনাক্ত করার ক্ষমতা রাখে। তাদের এতোই ক্ষমতা যে মুহূর্তের মধ্যে মন্তব্য, শেয়ার বা প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে মানবিক সুরে মানুষের মতো কথা বলতে সক্ষম হচ্ছে বট বাহিনী। মানবসদৃশ ভাষা ব্যবহারে তারা এতোই সক্ষম যে তাদের মতামতকে সমাজের কণ্ঠ হিসেবে বিবেচনা না করে পারা যায়না। স্বল্পশিক্ষিত অতিসাধারণ, কিংবা শিক্ষিত মানুষের পক্ষে প্রকৃত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী আর কৃত্রিম বটের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা দুরুহ হয়ে পড়ে।  মানব নিয়ন্ত্রিত বট কোন কোন ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নির্ভর বটের থেকে বিপদজনক। বাস্তব ক্ষেত্রে এরা মানুষ হলেও ছদ্ম পরিচয়ে এরা অগণন অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে থাকে। রাজনৈতিক দল, করপোরেট গোষ্ঠী কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের নির্দেশে তারা সংঘবদ্ধভাবে অপপ্রচার, গালাগালি, চরিত্রহনন ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালায়। একজন অপারেটর কখনো কখনো ত্রিশ, চল্লিশটি পর্যন্ত অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ করে। নির্দিষ্ট ভাবে ইশারা পেলেই তারা যে কোনো পোস্টে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমন্বিত আক্রমণ শুরু করে। বাস্তব সেনা সদস্যরাও এতো নিষ্ঠুর আক্রমণ করতে পারেনা। ছদ্ম প্রভুর ছদ্ম সেনারা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিরতিহীন ভাবে আক্রমন শানিয়ে যায়। 

বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তাপ যত বেড়েছে, বট বাহিনীর সক্রিয়তাও তত দৃশ্যমান হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক ঘটনা, আন্দোলন কিংবা সংবেদনশীল সংবাদ প্রকাশের পর মুহূর্তেই হাজার হাজার অভিন্ন মন্তব্য, একই ধরনের ভাষা ও একই সুরের প্রচারণা চোখে পড়ে। এতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের অনেকেই মনে করেন, যেন পুরো সমাজ একটি নির্দিষ্ট মতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অথচ বাস্তবে এই জনমতের ঢেউয়ের বড় অংশই কৃত্রিম। 

একটি বিষয় অত্যন্ত আশা জাগানিয়া। সেটি হলো কৃত্রিম মতামত সর্বস্তরের মানুষকে স্পর্শ করতে পারেনি। কৃত্রিম মতামত কিছুটা প্রভাবিত করতে পারে সামাজিক, রাজনৈতিক গতি প্রবাহ তবে প্রকৃত বা বাস্তব মতামতকে যথেষ্ট ভাবে প্রভাবিত করতে পারেনা। ফেসবুকের জনমত আর মাঠের বাস্তবতা যে এক নয়, তা প্রমাণিত হয়েছে ভোটের ফলাফলে। অনলাইনে যে পক্ষকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখানো হয়েছে, বাস্তবে নির্বাচনী ফলাফল ছিল তার ঠিক বিপরীত। এতে প্রমাণ হয়েছে, বটের তৈরি করা কৃত্রিম জনপ্রিয়তা সব সময় বাস্তব রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে না। মাঝে মধ্যে মীমাংসিত বিষয়কে মিথ্যা বানানোর চেষ্টা কিংবা টাইমিংয়ের হেরফেরে বট নিজেই হাসির পাত্রে পরিণত হয় এবং মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়। তবু ক্ষতি কম হচ্ছে না। কারণ, এই বট সংস্কৃতি সমাজে বিষাক্ততা বাড়াচ্ছে, মতপ্রকাশের পরিবেশ সংকুচিত করছে এবং তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস করছে। 

কৃত্রিম মতামত তৈরির এই প্রবাহকে রুখতে হলে প্রয়োজন ডিজিটাল লিটারেসি জ্ঞান। নাগরিক সমাজের এই দক্ষতার অভাবে কৃত্রিম মতামত তৈরির প্রক্রিয়া সবল হচ্ছে ক্রমাগত। আমাদের সমাজে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বা তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এখনও দুর্বল হওয়ায় বট নির্ভর প্রচারণা খুব সহজেই মানুষের আবেগ, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সামাজিক বিভাজনকে প্রভাবিত করতে পারে। 

সামজিক রাজনৈতিক গতিধারার স্বাভাবিক প্রবাহকে বহমান রাখাটা খুব জরুরি। কৃত্রিম মতামত আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের নিয়ন্ত্রক হতে পারেনা। ঘুণপোকা যেমন ভেতর থেকে একটি কাঠামোকে অকার্যকর করে ফেলে কৃত্রিম মতামতও এক সময় আমাদের জাতীয় পথ চলাকে অর্থহীন করে তুলতে পারে। সময় হয়েছে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধন এবং সামজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল লিটারেসির জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির। এ বিষয়ে নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তিবিদ এবং রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠন গুলোকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। 

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত