অসংখ্য খাল আর নদী বেষ্টিত ঢাকায় মোঘল আমলে নৌকাই ছিল প্রধান যাতায়াত মাধ্যম। যে কারণে ঢাকা পরিচিতি পেয়েছিল “প্রাচ্যের ভেনিস” হিসেবে। সদরঘাট ও বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এই শহরের অভ্যন্তরে ছিল ভূগর্ভস্থ খালের বিশাল নেটওয়ার্ক।
তবে সাড়ে চারশ বছর আগে যখন মোগল সুবাদার ইসলাম খান ঢাকাকে বাংলার রাজধানী বানান, তখন শহরের রূপ ছিল একদম ভিন্ন। ১৬৬৬ সালে ফরাসি পরিব্রাজক জঁ-ব্যাপটিস্ট তাভার্নিয়ে মুগ্ধ হয়ে ঢাকাকে বলেছিলেন ‘প্রাচ্যের ভেনিস’।
৫২টি বাজার আর ৫৩টি গলির শহর ঢাকার বুক চিরে বয়ে যেত সুতিখাল, দেবদোলাই খাল, বেগুনবাড়ি খাল, ধোলাইখাল- জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য রূপালি জলরেখা।
কীভাবে সেদিনের সেই জলজ নগরী আজ পানির নিচে বাসা বাঁধা দুর্ভোগের শহরে পরিণত হলো? উত্তর খুঁজতে গেলে পৌঁছাতে হবে প্রায় দেড়শত বছর আগে, ব্রিটিশ আমলে।
মোগল নগর পরিকল্পনাবিদেরা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেননি, বরং প্রকৃতিকে সঙ্গী করে এঁকেছিলেন শহরের নকশা। তখন ঘরবাড়ি তৈরির জন্য মাটি কাটা হতো। আর চারপাশ উঁচু করে মাঝের অংশটি পরিণত হতো পুকুর বা দিঘিতে। বৃষ্টি নামলে সেই পানি জমা হতো এসব জলাশয়ে- প্রাকৃতিক জলাধার।
১৬১০ সালে খনন করা হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী ধোলাইখাল। এটি ছিল শহরের জীবনরেখা। কেবল নৌপথই নয়, এটি ছিল পানির প্রধান নিষ্কাশন ব্যবস্থা। এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধোলাইখাল ও তার শাখা খালগুলো সেই পানি টেনে নিয়ে যেত বুড়িগঙ্গা আর শীতলক্ষ্যার বুকে। মধ্যযুগের ঢাকায় বৃষ্টিতে রাস্তা ডুবে যাওয়ার ইতিহাস নেই বললেই চলে।
এই সুন্দর ব্যবস্থায় কুঠারাঘাত হয় ব্রিটিশদের হাতে। ১৮৬৪ সালে গঠিত হয় ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি। ব্রিটিশ শাসকেরা ঢাকাকে গড়তে চাইলেন ইউরোপীয় ছাঁচে। তাদের প্রথম অগ্রাধিকার ছিল স্থলপথ। গাড়ি আর ঘোড়ার গাড়ি চলবে, তাই দরকার পাকা রাস্তা। আর রাস্তা বানাতে গিয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ালো ঢাকার পুরোনো খালগুলো।
ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দম্ভে খালের ওপর কালভার্ট বা সেতু না বানিয়ে অনেক জায়গায় খাল ভরাট করে রাস্তা বানানো হলো। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ পেল অবরোধ।
আজ থেকে ১৫৭ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৬৯ সালে ঢাকার তৎকালীন সিভিল সার্জন ড. হেনরি চার্লস কটক্লিফ মিউনিসিপ্যালিটিকে এক রিপোর্ট দেন। তিনি স্পষ্ট লিখেছিলেন-
“ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আর খালগুলো দিন দিন আবর্জনা ও মাটি দিয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বৃষ্টির পানি আর নদীতে নামতে পারছে না, যা শহরের ভেতরে জমে দুর্গন্ধ ও নানা মরণব্যাধির জন্ম দিচ্ছে।"
অর্থাৎ, আজ থেকে ১৫৭ বছর আগেই ব্রিটিশদের অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকার জলাবদ্ধতার বিষবৃক্ষটি রোপিত হয়েছিল। সেই ড. কটক্লিফের উদ্বেগের মতো আজও আমরা একই সমস্যায় ভুগছি- শুধু মাত্রায় বেড়েছে।
ব্রিটিশরা যা শুরু করেছিল, পাকিস্তান আমলে তা পায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। ১৯৬০-এর দশকে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) ধোলাইখাল পুরোপুরি ভরাট করে ওপর বক্স কালভার্ট ও রাস্তা বানানোর পরিকল্পনা নেয়। একসময় যেটি পুরো শহরের ফুসফুসের মতো কাজ করত, সেটি পরিণত হয় ভূগর্ভস্থ এক বদ্ধ নর্দমায়।
স্বাধীনতার পর নব্বইয়ের দশকে সেই বক্স কালভার্টের ওপর গড়ে ওঠে লোহার মার্কেট। বাকি ইতিহাস সবার জানা।
আজ ঢাকা সিটির মতিঝিল, ধোলাইখাল, সূত্রাপুরের রাস্তায় সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে কোমর সমান। নর্দমার পানি ওঠে রাস্তায়। সেই পানিতে ভেসে আসে আবর্জনা আর দুর্গন্ধ। মানুষ ঘরবন্দি। শিশু-বৃদ্ধের কষ্টের শেষ নেই। আর তখনই আমরা বুঝতে পারি, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের ভুল নগর পরিকল্পনার কত বড় মাশুল গুনতে হচ্ছে আজ।
যে খাল আর জলাশয়গুলো একসময় পানির প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করত, সেগুলো আজ কংক্রিট আর ইটের নিচে চাপা পড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ ঢাকাকে বাঁচাতে চাইলে ফিরে যেতে হবে মোগল আমলের সেই শিক্ষায়। কংক্রিটের আধুনিকতার মোহ ছেড়ে প্রাকৃতিক জলাধার আর খালগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে।নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, খাল খনন ও পুনরুদ্ধার করতে হবে। বক্স কালভার্টের ভেতরে আটকে থাকা পানির প্রবাহ খুলে দিতে হবে। নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে মোগল আমলের মতো প্রাকৃতিক ও কার্যকর করতে হবে। তবেই একদিন হয়তো সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকা ডুবে যাবে না।
ঢাকার জলাবদ্ধতা শুধু ইতিহাসের তালিকাভুক্ত একটি সমস্যা নয়; এটি প্রতিদিনের দুর্ভোগের বাস্তবতা। অথচ এই বাস্তবতার গোড়ায় আছে দেড়শ বছরের পুরোনো ভুল সিদ্ধান্ত।

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
অসংখ্য খাল আর নদী বেষ্টিত ঢাকায় মোঘল আমলে নৌকাই ছিল প্রধান যাতায়াত মাধ্যম। যে কারণে ঢাকা পরিচিতি পেয়েছিল “প্রাচ্যের ভেনিস” হিসেবে। সদরঘাট ও বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এই শহরের অভ্যন্তরে ছিল ভূগর্ভস্থ খালের বিশাল নেটওয়ার্ক।
তবে সাড়ে চারশ বছর আগে যখন মোগল সুবাদার ইসলাম খান ঢাকাকে বাংলার রাজধানী বানান, তখন শহরের রূপ ছিল একদম ভিন্ন। ১৬৬৬ সালে ফরাসি পরিব্রাজক জঁ-ব্যাপটিস্ট তাভার্নিয়ে মুগ্ধ হয়ে ঢাকাকে বলেছিলেন ‘প্রাচ্যের ভেনিস’।
৫২টি বাজার আর ৫৩টি গলির শহর ঢাকার বুক চিরে বয়ে যেত সুতিখাল, দেবদোলাই খাল, বেগুনবাড়ি খাল, ধোলাইখাল- জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য রূপালি জলরেখা।
কীভাবে সেদিনের সেই জলজ নগরী আজ পানির নিচে বাসা বাঁধা দুর্ভোগের শহরে পরিণত হলো? উত্তর খুঁজতে গেলে পৌঁছাতে হবে প্রায় দেড়শত বছর আগে, ব্রিটিশ আমলে।
মোগল নগর পরিকল্পনাবিদেরা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেননি, বরং প্রকৃতিকে সঙ্গী করে এঁকেছিলেন শহরের নকশা। তখন ঘরবাড়ি তৈরির জন্য মাটি কাটা হতো। আর চারপাশ উঁচু করে মাঝের অংশটি পরিণত হতো পুকুর বা দিঘিতে। বৃষ্টি নামলে সেই পানি জমা হতো এসব জলাশয়ে- প্রাকৃতিক জলাধার।
১৬১০ সালে খনন করা হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী ধোলাইখাল। এটি ছিল শহরের জীবনরেখা। কেবল নৌপথই নয়, এটি ছিল পানির প্রধান নিষ্কাশন ব্যবস্থা। এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধোলাইখাল ও তার শাখা খালগুলো সেই পানি টেনে নিয়ে যেত বুড়িগঙ্গা আর শীতলক্ষ্যার বুকে। মধ্যযুগের ঢাকায় বৃষ্টিতে রাস্তা ডুবে যাওয়ার ইতিহাস নেই বললেই চলে।
এই সুন্দর ব্যবস্থায় কুঠারাঘাত হয় ব্রিটিশদের হাতে। ১৮৬৪ সালে গঠিত হয় ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি। ব্রিটিশ শাসকেরা ঢাকাকে গড়তে চাইলেন ইউরোপীয় ছাঁচে। তাদের প্রথম অগ্রাধিকার ছিল স্থলপথ। গাড়ি আর ঘোড়ার গাড়ি চলবে, তাই দরকার পাকা রাস্তা। আর রাস্তা বানাতে গিয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ালো ঢাকার পুরোনো খালগুলো।
ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দম্ভে খালের ওপর কালভার্ট বা সেতু না বানিয়ে অনেক জায়গায় খাল ভরাট করে রাস্তা বানানো হলো। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ পেল অবরোধ।
আজ থেকে ১৫৭ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৬৯ সালে ঢাকার তৎকালীন সিভিল সার্জন ড. হেনরি চার্লস কটক্লিফ মিউনিসিপ্যালিটিকে এক রিপোর্ট দেন। তিনি স্পষ্ট লিখেছিলেন-
“ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আর খালগুলো দিন দিন আবর্জনা ও মাটি দিয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বৃষ্টির পানি আর নদীতে নামতে পারছে না, যা শহরের ভেতরে জমে দুর্গন্ধ ও নানা মরণব্যাধির জন্ম দিচ্ছে।"
অর্থাৎ, আজ থেকে ১৫৭ বছর আগেই ব্রিটিশদের অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকার জলাবদ্ধতার বিষবৃক্ষটি রোপিত হয়েছিল। সেই ড. কটক্লিফের উদ্বেগের মতো আজও আমরা একই সমস্যায় ভুগছি- শুধু মাত্রায় বেড়েছে।
ব্রিটিশরা যা শুরু করেছিল, পাকিস্তান আমলে তা পায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। ১৯৬০-এর দশকে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) ধোলাইখাল পুরোপুরি ভরাট করে ওপর বক্স কালভার্ট ও রাস্তা বানানোর পরিকল্পনা নেয়। একসময় যেটি পুরো শহরের ফুসফুসের মতো কাজ করত, সেটি পরিণত হয় ভূগর্ভস্থ এক বদ্ধ নর্দমায়।
স্বাধীনতার পর নব্বইয়ের দশকে সেই বক্স কালভার্টের ওপর গড়ে ওঠে লোহার মার্কেট। বাকি ইতিহাস সবার জানা।
আজ ঢাকা সিটির মতিঝিল, ধোলাইখাল, সূত্রাপুরের রাস্তায় সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে কোমর সমান। নর্দমার পানি ওঠে রাস্তায়। সেই পানিতে ভেসে আসে আবর্জনা আর দুর্গন্ধ। মানুষ ঘরবন্দি। শিশু-বৃদ্ধের কষ্টের শেষ নেই। আর তখনই আমরা বুঝতে পারি, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের ভুল নগর পরিকল্পনার কত বড় মাশুল গুনতে হচ্ছে আজ।
যে খাল আর জলাশয়গুলো একসময় পানির প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করত, সেগুলো আজ কংক্রিট আর ইটের নিচে চাপা পড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ ঢাকাকে বাঁচাতে চাইলে ফিরে যেতে হবে মোগল আমলের সেই শিক্ষায়। কংক্রিটের আধুনিকতার মোহ ছেড়ে প্রাকৃতিক জলাধার আর খালগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে।নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, খাল খনন ও পুনরুদ্ধার করতে হবে। বক্স কালভার্টের ভেতরে আটকে থাকা পানির প্রবাহ খুলে দিতে হবে। নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে মোগল আমলের মতো প্রাকৃতিক ও কার্যকর করতে হবে। তবেই একদিন হয়তো সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকা ডুবে যাবে না।
ঢাকার জলাবদ্ধতা শুধু ইতিহাসের তালিকাভুক্ত একটি সমস্যা নয়; এটি প্রতিদিনের দুর্ভোগের বাস্তবতা। অথচ এই বাস্তবতার গোড়ায় আছে দেড়শ বছরের পুরোনো ভুল সিদ্ধান্ত।

আপনার মতামত লিখুন