কেন্দ্রে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স(NDA) সরকারের ১২ বছর পূর্তি ঘিরে শাসক জোট নতুন করে রাজনৈতিক ময়দানে নিজেদের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরতে সক্রিয় হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র Modi-র নেতৃত্বে এই সময়কালকে ‘কল্যাণমূলক শাসন’, ‘স্বচ্ছতা বৃদ্ধি’ এবং ‘বিশ্বমঞ্চে ভারতের উত্থান’-এর যুগ হিসেবে তুলে ধরছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) তবে এই দাবির পেছনে বাস্তবতা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের মিশ্রণ কতটা—সেটাই এখন মূল আলোচ্য।
গত এক দশকের বেশি সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করেছে, যার লক্ষ্য ছিল সমাজের নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক শ্রেণির উন্নয়ন। খাদ্য নিরাপত্তা, বিনামূল্যে রেশন, আবাসন, শৌচাগার নির্মাণ, স্বাস্থ্যবিমা এই সমস্ত ক্ষেত্রেই বিস্তৃত কর্মসূচির কথা বলা হচ্ছে। সরকার দাবি করছে, এই প্রকল্পগুলি সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করেছে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্নীতি কমানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই প্রকল্পগুলির অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়নের ঘাটতি, তথ্যের অস্পষ্টতা এবং রাজনৈতিক প্রচারের প্রবণতা রয়েছে, যা এগুলিকে আংশিকভাবে ভোটকেন্দ্রিক পদক্ষেপে পরিণত করেছে।
পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে পরিবর্তন দৃশ্যমান—জাতীয় সড়ক, রেলপথ, বিমানবন্দর, ডিজিটাল পরিষেবা সব ক্ষেত্রেই উন্নয়নের গতি বেড়েছে। ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ বা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-র মতো উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচিত হয়েছে। তবে অর্থনীতির ভেতরে একাধিক চাপও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, বিশেষ করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, এবং মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ এই বিষয়গুলি জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ফলে উন্নয়ন এবং দৈনন্দিন আর্থিক চাপ এই দুইয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে এমনটাই দাবি সরকারের। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় দেশগুলির পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি চালানো হয়েছে। বৈশ্বিক সংঘাতের মধ্যেও ভারত একটি নিরপেক্ষ এবং গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই কূটনৈতিক ভারসাম্য অনেকটাই পরিস্থিতিনির্ভর এবং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এই ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে ৫ জুন থেকে ২১ জুন পর্যন্ত দেশজুড়ে যে জনসংযোগ কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। শাসক দল চায় তাদের সাফল্যের বর্ণনা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এবং আসন্ন নির্বাচনের আগে একটি ইতিবাচক জনমত গড়ে তুলতে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সবাই এই প্রচারে অংশ নেবেন।
সব মিলিয়ে, মোদী সরকারের ১২ বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়, যেখানে উন্নয়ন, কল্যাণ এবং শক্তিশালী নেতৃত্বের পাশাপাশি বিতর্ক, সমালোচনা এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সবই সহাবস্থান করছে। নরেন্দ্র মোদী-র এই দীর্ঘ শাসনকালকে মূল্যায়ন করতে গেলে শুধু পরিসংখ্যান নয়, সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং দৈনন্দিন জীবনের পরিবর্তনকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই থেকে যায় এই ১২ বছরের সাফল্য কি সরকারের দাবি অনুযায়ী সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন, নাকি তার আড়ালে রয়ে গেছে কিছু অমীমাংসিত বাস্তবতা?

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
কেন্দ্রে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স(NDA) সরকারের ১২ বছর পূর্তি ঘিরে শাসক জোট নতুন করে রাজনৈতিক ময়দানে নিজেদের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরতে সক্রিয় হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র Modi-র নেতৃত্বে এই সময়কালকে ‘কল্যাণমূলক শাসন’, ‘স্বচ্ছতা বৃদ্ধি’ এবং ‘বিশ্বমঞ্চে ভারতের উত্থান’-এর যুগ হিসেবে তুলে ধরছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) তবে এই দাবির পেছনে বাস্তবতা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের মিশ্রণ কতটা—সেটাই এখন মূল আলোচ্য।
গত এক দশকের বেশি সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করেছে, যার লক্ষ্য ছিল সমাজের নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক শ্রেণির উন্নয়ন। খাদ্য নিরাপত্তা, বিনামূল্যে রেশন, আবাসন, শৌচাগার নির্মাণ, স্বাস্থ্যবিমা এই সমস্ত ক্ষেত্রেই বিস্তৃত কর্মসূচির কথা বলা হচ্ছে। সরকার দাবি করছে, এই প্রকল্পগুলি সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করেছে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্নীতি কমানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই প্রকল্পগুলির অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়নের ঘাটতি, তথ্যের অস্পষ্টতা এবং রাজনৈতিক প্রচারের প্রবণতা রয়েছে, যা এগুলিকে আংশিকভাবে ভোটকেন্দ্রিক পদক্ষেপে পরিণত করেছে।
পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে পরিবর্তন দৃশ্যমান—জাতীয় সড়ক, রেলপথ, বিমানবন্দর, ডিজিটাল পরিষেবা সব ক্ষেত্রেই উন্নয়নের গতি বেড়েছে। ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ বা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-র মতো উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচিত হয়েছে। তবে অর্থনীতির ভেতরে একাধিক চাপও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, বিশেষ করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, এবং মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ এই বিষয়গুলি জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ফলে উন্নয়ন এবং দৈনন্দিন আর্থিক চাপ এই দুইয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে এমনটাই দাবি সরকারের। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় দেশগুলির পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি চালানো হয়েছে। বৈশ্বিক সংঘাতের মধ্যেও ভারত একটি নিরপেক্ষ এবং গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই কূটনৈতিক ভারসাম্য অনেকটাই পরিস্থিতিনির্ভর এবং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এই ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে ৫ জুন থেকে ২১ জুন পর্যন্ত দেশজুড়ে যে জনসংযোগ কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। শাসক দল চায় তাদের সাফল্যের বর্ণনা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এবং আসন্ন নির্বাচনের আগে একটি ইতিবাচক জনমত গড়ে তুলতে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সবাই এই প্রচারে অংশ নেবেন।
সব মিলিয়ে, মোদী সরকারের ১২ বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়, যেখানে উন্নয়ন, কল্যাণ এবং শক্তিশালী নেতৃত্বের পাশাপাশি বিতর্ক, সমালোচনা এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সবই সহাবস্থান করছে। নরেন্দ্র মোদী-র এই দীর্ঘ শাসনকালকে মূল্যায়ন করতে গেলে শুধু পরিসংখ্যান নয়, সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং দৈনন্দিন জীবনের পরিবর্তনকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই থেকে যায় এই ১২ বছরের সাফল্য কি সরকারের দাবি অনুযায়ী সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন, নাকি তার আড়ালে রয়ে গেছে কিছু অমীমাংসিত বাস্তবতা?

আপনার মতামত লিখুন