সংবাদ

তামাকের নীল বিষে বিপন্ন তারুণ্য


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম

তামাকের নীল বিষে বিপন্ন তারুণ্য

  • চার কোটিরও বেশি মানুষ আসক্ত
  • ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস
  • তামাক ও ধোঁয়ায় ৭ হাজারেও বেশী ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে
  • মেট্রোরেলের নিচে নামলে তামাকের দোকান বন্ধের দাবি
  • মৃত্যুদূতের ছদ্মবেশ ও দুই আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত আত্মহনন

একটি জ্বলন্ত কাঠি, এক টুকরো সাদা কাগজ, আর তার ভেতরে মোড়ানো কিছু শুকনো পাতা। প্রথম প্রথম এটি হয়তো শুরু হয় নিছক কৌতুহল, বন্ধুদের প্ররোচনা, কিংবা কৈশোরের অহেতুক খেয়ালিপনায়। কেউবা আবার নিসঙ্গতা দূর করতে, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কিংবা আধুনিকতার ভুল চিন্তায় মগ্ন হয়ে দুই আঙুলের ফাঁকে তুলে নেয় এই মৃত্যুবান। কিন্তু এই সাময়িক ভালো লাগার আড়ালে যে কত বড় অন্ধকার লুকিয়ে আছে, তা যখন একজন তামাকসেবী বুঝতে পারেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

তামাক আজ কোনো সাধারণ নেশা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রতিদিন আমাদের চারপাশে কতশত তরুণের স্বপ্ন, সম্ভাবনা আর তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে এই তামাকের নীল বিষে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

রবিবার দেশব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হলোবিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস প্রতিবছরের মতো এবারও স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে দিবসটি উদযাপন করেছে। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি

এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখেই দেশজুড়ে তামাক বর্জনের নানা উদ্যোগ, প্রচারণা, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, আইন আর প্রচারণার আড়ালে তামাকের মরণ থাবা দিন দিন আরও বিস্তার লাভ করছে।

তামাকের আদি ইতিহাস এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত রসায়ন

তামাক মূলত একটি কৃষিজাত পণ্য, যানিকোটিনা টাবাকামবানিকোটিনা রাসটিকাশ্রেণীভূক্ত উদ্ভিদ। যার পাতা, ফসল, শিকড়, ডাল বা যেকোনো অংশ বিশেষ তামাক হিসেবে মানুষ নানাভাবে ব্যবহার করছে। এর আদি উৎস সুদূর আমেরিকা হলেও আজ এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ কখনো ধোঁয়া তৈরি করে, আবার কখনো চিবিয়ে এই মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদানটি গ্রহণ করছে।

বাংলাদেশের জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের তথ্য অত্যন্ত চমকপ্রদ ভয়াবহ। তামাক এবং বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ায় হাজারেরও বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭০টি রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি মানুষের শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টিতে সক্ষম। এই বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে রয়েছে নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, বেনজোপাইরিন, ফরমালডিহাইড, অ্যামোনিয়া এবং পোলোনিয়ামের মতো বিপজ্জনক উপাদান।

তামাকজাত দ্রব্যের মধ্যে ধোঁয়াযুক্ত ধোঁয়াবিহীন, দুই ধরনের তামাকই মানবদেহের জন্য সমান ক্ষতিকর। ধোঁয়াযুক্ত তামাকের মধ্যে রয়েছে সিগারেট, বিড়ি, চুরুট, পাইপ হুক্কা। অন্যদিকে, ধোঁয়াবিহীন তামাকের মধ্যে জর্দা, সাদাপাতা, গুল, নস্যি খৈনী অন্যতম। তামাকের এই বহুমুখী রূপ সমাজের সর্বস্তরে বিষ ছড়াচ্ছে।

পরিসংখ্যানের ভয়ানক চিত্র

আমাদের দেশে তামাক ব্যবহারের ব্যাপকতা চোখ কপালে তোলার মতো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোটি ১৩ লাখের এক বিশাল অংশ কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করছে। এর মধ্যে কোটি ১২ লাখ পুরুষ এবং লাখ নারী সরাসরি ধূমপান করছেন। অন্যদিকে, ধোঁয়াবিহীন চর্বণযোগ্য তামাক ব্যবহার করছেন কোটি ২৫ লাখ পুরুষ এবং কোটি ৩৪ লাখ নারী।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, যারা নিজেরা ধূমপান করেন না, তারাও এর ভয়ানক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে কোটি ১৫ লাখের বেশি মানুষ প্রতিদিন পরোক্ষ ধূমপানের (সেকেন্ড হ্যান্ড স্মোকিং) শিকার হচ্ছেন।

অর্থাৎ, অন্যের আনন্দের খেসারত দিতে হচ্ছে নিরপরাধ অধূমপায়ীদের। এই তামাক ব্যবহারের কারণে মানুষের হৃদরোগ, মস্তিষ্কে স্ট্রোক, পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস, ফুসফুসের ক্যান্সার, ফুসফুসে যক্ষ্মা, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, হাঁপানি এবং মুখের স্বরতন্ত্র, শ্বাসনালী বা খাদ্যনালীর ক্যান্সার হচ্ছে। এছাড়াও বিবর্ণ ক্ষয়প্রাপ্ত দাঁত, ক্ষতিগ্রস্ত মাড়ি, গর্ভবতী নারীদের সময়ের আগে সন্তানের জন্ম দেওয়া, কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়া কিংবা গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যুর মতো বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।

ধ্বংসের মুখে খাদ্য নিরাপত্তা পরিবেশের ভারসাম্য

তামাক কেবল মানুষের শরীরই ধ্বংস করছে না, এটি গ্রাস করছে আমাদের প্রকৃতি, খাদ্য নিরাপত্তা দেশের অর্থনীতিকেও। খাদ্য উৎপাদনের উর্বর জমিতে তামাক চাষ করার ফলে দেশে খাদ্য ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। জমিতে দীর্ঘদিন তামাক চাষের কারণে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা হ্রাস পায়।

তামাক চাষে ব্যাপকভাবে রাসায়নিক সার বিপজ্জনক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদীর দু'ধারে তামাক চাষ করায় বর্ষাকালে সেই ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে সরাসরি নদীতে মিশে পানি দূষিত করছে। এর ফলে জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ছে।

তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ আরও এক বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে। মাত্র এক টন তামাক পাতা পোড়াতে শুকাতে প্রয়োজন হয় প্রায় টন জ্বালানি কাঠ। এই বিপুল পরিমাণ কাঠ সংগ্রহের জন্য নির্বিচারে কাটা হচ্ছে বনের গাছপালা, যার ফলে দেশের বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

অর্থনীতিতে তামাকের নেতিবাচক প্রভাব কর বৃদ্ধির দাবি

সিগারেট কেনা ধূমপানের কারণে দেশের অর্থনীতিতে এর এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতি বছর শুধু সিগারেট ক্রয়ের পেছনেই দেশের মোট উৎপাদনের শতকরা ভাগ (%) অর্থ অপচয় হয়। আর প্রতি বছর বিড়ি ক্রয়ের পেছনে ব্যয় হয় দেশের মোট জিডিপির জিরো পয়েন্ট ভাগ (.%)

দেশে প্রতি বছর প্রায় ,০০০ কোটি শলাকা সিগারেট এবং প্রায় ,০০০ কোটি শলাকা বিড়ি উৎপাদিত হচ্ছে। এই বিশাল খরচের কারণে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় কমছে এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের বোঝা বাড়ছে। এই ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে দেশের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ লোক তামাকের ওপর উচ্চহারে কর বৃদ্ধি করার পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন।

দুই আঙুলের ফাঁকে সিগারেট: তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গের গল্প

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষ আজ তামাকের নেশায় আসক্ত। বিশেষ করে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ধূমপানের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৈশোরের অহেতুক খেয়ালিপনা, বন্ধুদের চাপ, জীবনে কোনো ব্যর্থতা কিংবা একাকীত্ব থেকে রক্ষা পেতে অনেকেই অজান্তে সিগারেটের নেশায় জড়িয়ে পড়ে। কিছুদিন পর এই অভ্যাসই পরিণত হয় এক দুর্ভেদ্য দেয়ালে, যা ভাঙা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

ধূমপান দিয়ে মূলত তামাক সেবন শুরু হলেও পরবর্তীতে এই তরুণদের অনেকেই পর্যায়ক্রমে গাঁজা, চরস, ফেনসিডিল, হেরোইন এবং পেথিডিনের মতো মারাত্মক মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেইয়াবাট্যাবলেট নামক আরেকটি মাদক তরুণ সমাজকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছে।

ধনী উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদের কাছে ইয়াবা বেশ পরিচিতি পেলেও এর ভয়াবহ ক্ষতি ইতোমধ্যে অনেকের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে। যে তরুণ সমাজের আগামী দিনে দেশের হাল ধরার কথা, তারা আজ তামাক মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে নিজেদের সোনালী ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে।

তামাক ছাড়লে শরীরে যে জাদুকরী পরিবর্তন ঘটে

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক কখনো মানুষের বন্ধু হতে পারে না এবং সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে কোনো রোমাঞ্চ বা আধুনিকতা থাকতে পারে না। তবে আশার কথা হলো, একজন মানুষ যখনই তামাক বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন, তার শরীর অত্যন্ত দ্রুত ইতিবাচক সাড়া দিতে শুরু করে।

বিশেষ করে ২০ মিনিট পর শরীর থেকে তামাকের প্রভাব কমতে শুরু করায় রক্তচাপ শিরার গতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। ৮ ঘণ্টা পর রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা একদম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমতে থাকে। ২৪ ঘণ্টা পর শরীর ক্ষতিকর কার্বন মনোক্সাইড থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। ৪৮ ঘণ্টা পর রক্তে নিকোটিনের মাত্রা শূন্যে নেমে আসে, ফলে মুখ শরীরের তামাকের দুর্গন্ধ দূর হয়ে যায়।

৭২ ঘণ্টা পর ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়ায় শ্বাসকষ্ট কিছুটা কমে এবং শরীরের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। থেকে মাস পর মানুষ স্বাভাবিকভাবে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে। বছর পর হৃদরোগের বড় কোনো সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি একজন নিয়মিত ধূমপায়ীর তুলনায় অর্ধেক হয়ে যায়। বছর পর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি একজন অধূমপায়ীর সমপর্যায়ে নেমে আসে।

১০ বছর পর ফুসফুসে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার ধূমপায়ীদের তুলনায় অর্ধেক হয়ে যায় এবং অন্যান্য ক্যান্সারের ঝুঁকিও হ্রাস পায়। ১৫ বছর পর হৃদরোগ ক্যান্সারের সামগ্রিক ঝুঁকি একজন সাধারণ অধূমপায়ীর মতো সমপর্যায়ে চলে আসে।

তাছাড়া তামাক ত্যাগ করলে খাবারের আসল স্বাদ গন্ধের অনুভূতি স্বাভাবিক হয়, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার মতো দৈনন্দিন কাজগুলো সহজেই করা যায়। তামাক পরিত্যাগকারীরা ক্রমাগত তামাক ব্যবহারকারীদের চেয়ে অনেক দীর্ঘায়ু লাভ করেন। এমনকি গর্ভবতী মায়েরা তামাক পরিত্যাগ করলে সুস্থ স্বাভাবিক ওজনের শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। তামাক ছাড়ার প্রথম থেকে সপ্তাহ কিছু শারীরিক মানসিক অস্বস্তি (উইথড্রয়াল সিম্পটম) থাকলেও থেকে দিনের মধ্যে এর অধিকাংশ উপসর্গ কেটে যায়।

আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগের অভাব বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

দেশে তামাকের ব্যবহার কমাতে এবং এর বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করতে কঠোর আইন করা হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। তামাকের ক্ষতিকর দিকগুলো সিগারেটের প্যাকেটে বাধ্যতামূলকভাবে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হলেও আসক্তদের ওপর এর প্রভাব পড়ছে কম।

রাস্তায় চলতে ফিরতে অনেকেরই হেটে হেটে সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে। এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সাধারণ পথচারীরা বলেন, "অনেকে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে। সেই বিষাক্ত ধোঁয়া পেছনে থাকা অন্যদের মুখে-নাকে ঢোকে। এর প্রতিবাদ করলে উল্টো অনেকেই ক্ষেপে যান। রাস্তায় এভাবে প্রকাশ্যে ধূমপান করা পুরোপুরি বন্ধ হওয়া উচিত।"

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। একজন প্রখ্যাত বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ বলেন, "তামাকমুক্ত আইন আছে কিন্তু তা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তামাকের কারণে ফুসফুস, মুখমণ্ডল শ্বাসনালীতে ক্যান্সারসহ নানা রোগ হয়। ধূমপানজনিত কারণে শ্বাসনালীতে স্থায়ী বাধা বা সিওপিডির মতো রোগ হয়। এই রোগগুলোর চিকিৎসা করে মানুষকে পুরোপুরি সুস্থ করা সম্ভব হয় না। তাই প্রথম কাজ হলো ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।"

একই সুর মেলালেন একজন সিনিয়র মেডিসিন বিশেষজ্ঞও। তিনি বলেন, "ধূমপানকারী কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলে তার অপারেশন এবং অপারেশনের পরবর্তীতে নানা জটিলতা দেখা দেয়। এর মধ্যে শ্বাসনালীতে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। এছাড়া ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, লিভার খাদ্যনালীতেও মারাত্মক সমস্যা হয়। এই ভয়ানক পরিণতি থেকে বাঁচতে হলে ধূমপান বন্ধ করার কোনো বিকল্প নেই।"

বাংলাদেশের প্রচলিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোর শাস্তির বিধান

তামাকের ক্ষয়ক্ষতি থেকে জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে বাংলাদেশ সরকারধূমপান তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনপ্রণয়ন করেছে। এই আইন অনুযায়ী, দেশের সব পাবলিক প্লেস পাবলিক পরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি এই আইন অমান্য করে এসব স্থানে ধূমপান করেন, তবে তিনি অনধিক ৩০০ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আইনের আওতাভুক্ত পাবলিক প্লেসগুলোর মধ্যে রয়েছে: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি, আধা-সরকারি স্বায়ত্তশাসিত অফিস এবং বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, লিফট এবং আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল ক্লিনিক ভবন, আদালত ভবন, রেলওয়ে স্টেশন ভবন, বাস টার্মিনাল ভবন, যাত্রীদের অপেক্ষার নির্দিষ্ট সারি, সিনেমা হল, প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল বিপণী ভবন (শপিং মল), চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেস্তোরাঁ, পাবলিক টয়লেট, শিশু পার্ক, মেলা বা জনসাধারনের সম্মিলিতভাবে ব্যবহার্য অন্য যেকোনো স্থান।

একইভাবে মোটর গাড়ি, বাস, রেল গাড়ি, জাহাজ, লঞ্চসহ সব ধরনের যাত্রীবাহী জনযানবাহনে ধূমপান নিষিদ্ধ। আইনের শাসন বজায় রাখতে পাবলিক প্লেস বা পাবলিক পরিবহনের মালিক, তত্ত্বাবধায়ক বা ম্যানেজারকে তাদের আওতাধীন এলাকা ধূমপানমুক্ত রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা যদি এই ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, তবে অনধিক ৫০০ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়াও নিজ নিজ নিয়ন্ত্রনাধীন স্থানেধূমপান হতে বিরত থাকুন, ইহা শাস্তিযোগ্য অপরাধসম্বলিত সতর্কীকরণ নোটিশ বাংলা ইংরেজিতে প্রদর্শন না করলে ,০০০ টাকা দণ্ডের বিধান রয়েছে। ধূমপানমুক্ত এলাকায় কোনো ধরনের ছাইদানি (অ্যাশট্রে) রাখাও আইনত অপরাধ।

বিজ্ঞাপন নাবালকদের কাছে বিক্রি নিষিদ্ধ

আইনে তামাকজাত দ্রব্যের যেকোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিজ্ঞাপন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তামাক ব্যবহারে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোনো প্রকার দান, পুরস্কার, বৃত্তি প্রদান, কোনো টুর্নামেন্ট বা খেলার আয়োজন করা কিংবা বিনামূল্যে নমুনা প্রদান করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই আইন লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।

একই সঙ্গে, তামাকজাত দ্রব্যের মোড়ক বা প্যাকেটে কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ (৫০%) জায়গা জুড়ে ছবিসহ বিধিবদ্ধ সতর্কবাণী মুদ্রণ করা বাধ্যতামূলক। এই নিয়ম না মানলে অনূর্ধ্ব মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে। দেশের কোমলমতি শিশুদের সুরক্ষায় ১৮ বছর বয়সের নিচে কারো কাছে বা কারো দ্বারা তামাকজাত দ্রব্য বিপণন বা বিক্রয় করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই আইন অমান্য করলে অনধিক ,০০০ টাকা অর্থদণ্ড দিতে হবে। এই আইনের অধীনে কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা বারবার একই অপরাধ করলে, প্রতিবারের জন্য দণ্ডের পরিমাণ দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পাবে।

তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত সরকারি টাস্কফোর্স তামাকমুক্ত থানা

আইন বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল নিয়মিত জাতীয়, জেলা উপজেলা পর্যায়ে টাস্কফোর্সের সভা এবং দেশব্যাপী মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। আইন বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভাগীয় জেলা পর্যায়ে কর্মকর্তাদের নিয়ে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে।

ধূমপানমুক্ত এলাকার পরিধি বাড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০১০ সালের আগস্ট মাসে দেশের সব থানায়ধূমপানমুক্ত সাইন বোর্ডস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে সারাদেশের প্রতিটি থানা পুলিশ ফাঁড়িতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদকে ধূমপানমুক্ত এলাকা ঘোষণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর ফলে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে সতর্কতামূলক নোটিশ প্রদর্শনের কাজ চলছে। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত ইউনিয়ন পর্যন্ত এই আইন আদেশের শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব হলে দেশ বহুলাংশে ক্যান্সারসহ তামাকজনিত মারাত্মক রোগ থেকে মুক্ত থাকবে।

তামাকমুক্ত সমাজ গঠনে পরিবারের ভূমিকাই প্রধান

আইন, মোবাইল কোর্ট কিংবা সরকারি প্রজ্ঞাপন দিয়ে সাময়িকভাবে তামাকের গতি কমানো গেলেও, একে সমাজ থেকে চিরতরে উপড়ে ফেলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো পরিবার।

চিকিৎসা বিজ্ঞান সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, তামাকের এই মরণ থাবা থেকে একজন তরুণকে সবার আগে ফেরাতে পারে তার নিজের পরিবার। অনেক পরিবারে দেখা যায়, বাবা বা বড় ভাইদের প্রকাশ্যে সিগারেট টানতে দেখে সন্তান বা ছোট ভাইয়েরা অনায়াসে এই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে। এভাবে একটি পুরো পরিবার পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সিগারেটের বিষাক্ত জালে জড়িয়ে যায়।

তাই পরিবারের প্রবীণ জ্যেষ্ঠ সদস্যরা যদি একটু সচেতন হন এবং নিজেরা ধূমপান ত্যাগ করে কঠোর অবস্থান নেন, তবে পুরো পরিবারকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, তাদের মানসিক হতাশা বা নিঃসঙ্গতার সময়ে পাশে দাঁড়ানো এবং বন্ধুদের খোঁজখবর রাখার মাধ্যমেই তরুণ সমাজকে এই অন্ধকারের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তামাক নামক এই বৈশ্বিক মহামারি মৃত্যুদূতের মুখোশ উন্মোচন করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে আজ সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসতখনই সফল সার্থক হবে, যখন দেশের প্রতিটি নাগরিক মন থেকে তামাককেনাবলবেন এবং প্রতিটি পরিবার হবে সম্পূর্ণ ধূমপানমুক্ত। দুই আঙুলের ফাঁকে জ্বলতে থাকা সিগারেটটি নিভিয়ে দেওয়ার এখনই সময়, কারণ এই আগুন শুধু তামাক পোড়ায় না, পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় একটি জীবন, একটি পরিবার এবং একটি দেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ৩১ মে ২০২৬


তামাকের নীল বিষে বিপন্ন তারুণ্য

প্রকাশের তারিখ : ৩১ মে ২০২৬

featured Image

  • চার কোটিরও বেশি মানুষ আসক্ত
  • ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস
  • তামাক ও ধোঁয়ায় ৭ হাজারেও বেশী ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে
  • মেট্রোরেলের নিচে নামলে তামাকের দোকান বন্ধের দাবি
  • মৃত্যুদূতের ছদ্মবেশ ও দুই আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত আত্মহনন

একটি জ্বলন্ত কাঠি, এক টুকরো সাদা কাগজ, আর তার ভেতরে মোড়ানো কিছু শুকনো পাতা। প্রথম প্রথম এটি হয়তো শুরু হয় নিছক কৌতুহল, বন্ধুদের প্ররোচনা, কিংবা কৈশোরের অহেতুক খেয়ালিপনায়। কেউবা আবার নিসঙ্গতা দূর করতে, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কিংবা আধুনিকতার ভুল চিন্তায় মগ্ন হয়ে দুই আঙুলের ফাঁকে তুলে নেয় এই মৃত্যুবান। কিন্তু এই সাময়িক ভালো লাগার আড়ালে যে কত বড় অন্ধকার লুকিয়ে আছে, তা যখন একজন তামাকসেবী বুঝতে পারেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

তামাক আজ কোনো সাধারণ নেশা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রতিদিন আমাদের চারপাশে কতশত তরুণের স্বপ্ন, সম্ভাবনা আর তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে এই তামাকের নীল বিষে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

রবিবার দেশব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হলোবিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস প্রতিবছরের মতো এবারও স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে দিবসটি উদযাপন করেছে। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি

এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখেই দেশজুড়ে তামাক বর্জনের নানা উদ্যোগ, প্রচারণা, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, আইন আর প্রচারণার আড়ালে তামাকের মরণ থাবা দিন দিন আরও বিস্তার লাভ করছে।

তামাকের আদি ইতিহাস এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত রসায়ন

তামাক মূলত একটি কৃষিজাত পণ্য, যানিকোটিনা টাবাকামবানিকোটিনা রাসটিকাশ্রেণীভূক্ত উদ্ভিদ। যার পাতা, ফসল, শিকড়, ডাল বা যেকোনো অংশ বিশেষ তামাক হিসেবে মানুষ নানাভাবে ব্যবহার করছে। এর আদি উৎস সুদূর আমেরিকা হলেও আজ এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ কখনো ধোঁয়া তৈরি করে, আবার কখনো চিবিয়ে এই মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদানটি গ্রহণ করছে।

বাংলাদেশের জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের তথ্য অত্যন্ত চমকপ্রদ ভয়াবহ। তামাক এবং বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ায় হাজারেরও বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭০টি রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি মানুষের শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টিতে সক্ষম। এই বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে রয়েছে নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, বেনজোপাইরিন, ফরমালডিহাইড, অ্যামোনিয়া এবং পোলোনিয়ামের মতো বিপজ্জনক উপাদান।

তামাকজাত দ্রব্যের মধ্যে ধোঁয়াযুক্ত ধোঁয়াবিহীন, দুই ধরনের তামাকই মানবদেহের জন্য সমান ক্ষতিকর। ধোঁয়াযুক্ত তামাকের মধ্যে রয়েছে সিগারেট, বিড়ি, চুরুট, পাইপ হুক্কা। অন্যদিকে, ধোঁয়াবিহীন তামাকের মধ্যে জর্দা, সাদাপাতা, গুল, নস্যি খৈনী অন্যতম। তামাকের এই বহুমুখী রূপ সমাজের সর্বস্তরে বিষ ছড়াচ্ছে।

পরিসংখ্যানের ভয়ানক চিত্র

আমাদের দেশে তামাক ব্যবহারের ব্যাপকতা চোখ কপালে তোলার মতো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোটি ১৩ লাখের এক বিশাল অংশ কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করছে। এর মধ্যে কোটি ১২ লাখ পুরুষ এবং লাখ নারী সরাসরি ধূমপান করছেন। অন্যদিকে, ধোঁয়াবিহীন চর্বণযোগ্য তামাক ব্যবহার করছেন কোটি ২৫ লাখ পুরুষ এবং কোটি ৩৪ লাখ নারী।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, যারা নিজেরা ধূমপান করেন না, তারাও এর ভয়ানক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে কোটি ১৫ লাখের বেশি মানুষ প্রতিদিন পরোক্ষ ধূমপানের (সেকেন্ড হ্যান্ড স্মোকিং) শিকার হচ্ছেন।

অর্থাৎ, অন্যের আনন্দের খেসারত দিতে হচ্ছে নিরপরাধ অধূমপায়ীদের। এই তামাক ব্যবহারের কারণে মানুষের হৃদরোগ, মস্তিষ্কে স্ট্রোক, পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস, ফুসফুসের ক্যান্সার, ফুসফুসে যক্ষ্মা, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, হাঁপানি এবং মুখের স্বরতন্ত্র, শ্বাসনালী বা খাদ্যনালীর ক্যান্সার হচ্ছে। এছাড়াও বিবর্ণ ক্ষয়প্রাপ্ত দাঁত, ক্ষতিগ্রস্ত মাড়ি, গর্ভবতী নারীদের সময়ের আগে সন্তানের জন্ম দেওয়া, কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়া কিংবা গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যুর মতো বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।

ধ্বংসের মুখে খাদ্য নিরাপত্তা পরিবেশের ভারসাম্য

তামাক কেবল মানুষের শরীরই ধ্বংস করছে না, এটি গ্রাস করছে আমাদের প্রকৃতি, খাদ্য নিরাপত্তা দেশের অর্থনীতিকেও। খাদ্য উৎপাদনের উর্বর জমিতে তামাক চাষ করার ফলে দেশে খাদ্য ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। জমিতে দীর্ঘদিন তামাক চাষের কারণে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা হ্রাস পায়।

তামাক চাষে ব্যাপকভাবে রাসায়নিক সার বিপজ্জনক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদীর দু'ধারে তামাক চাষ করায় বর্ষাকালে সেই ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে সরাসরি নদীতে মিশে পানি দূষিত করছে। এর ফলে জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ছে।

তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ আরও এক বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে। মাত্র এক টন তামাক পাতা পোড়াতে শুকাতে প্রয়োজন হয় প্রায় টন জ্বালানি কাঠ। এই বিপুল পরিমাণ কাঠ সংগ্রহের জন্য নির্বিচারে কাটা হচ্ছে বনের গাছপালা, যার ফলে দেশের বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

অর্থনীতিতে তামাকের নেতিবাচক প্রভাব কর বৃদ্ধির দাবি

সিগারেট কেনা ধূমপানের কারণে দেশের অর্থনীতিতে এর এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতি বছর শুধু সিগারেট ক্রয়ের পেছনেই দেশের মোট উৎপাদনের শতকরা ভাগ (%) অর্থ অপচয় হয়। আর প্রতি বছর বিড়ি ক্রয়ের পেছনে ব্যয় হয় দেশের মোট জিডিপির জিরো পয়েন্ট ভাগ (.%)

দেশে প্রতি বছর প্রায় ,০০০ কোটি শলাকা সিগারেট এবং প্রায় ,০০০ কোটি শলাকা বিড়ি উৎপাদিত হচ্ছে। এই বিশাল খরচের কারণে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় কমছে এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের বোঝা বাড়ছে। এই ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে দেশের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ লোক তামাকের ওপর উচ্চহারে কর বৃদ্ধি করার পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন।

দুই আঙুলের ফাঁকে সিগারেট: তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গের গল্প

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষ আজ তামাকের নেশায় আসক্ত। বিশেষ করে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ধূমপানের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৈশোরের অহেতুক খেয়ালিপনা, বন্ধুদের চাপ, জীবনে কোনো ব্যর্থতা কিংবা একাকীত্ব থেকে রক্ষা পেতে অনেকেই অজান্তে সিগারেটের নেশায় জড়িয়ে পড়ে। কিছুদিন পর এই অভ্যাসই পরিণত হয় এক দুর্ভেদ্য দেয়ালে, যা ভাঙা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

ধূমপান দিয়ে মূলত তামাক সেবন শুরু হলেও পরবর্তীতে এই তরুণদের অনেকেই পর্যায়ক্রমে গাঁজা, চরস, ফেনসিডিল, হেরোইন এবং পেথিডিনের মতো মারাত্মক মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেইয়াবাট্যাবলেট নামক আরেকটি মাদক তরুণ সমাজকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছে।

ধনী উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদের কাছে ইয়াবা বেশ পরিচিতি পেলেও এর ভয়াবহ ক্ষতি ইতোমধ্যে অনেকের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে। যে তরুণ সমাজের আগামী দিনে দেশের হাল ধরার কথা, তারা আজ তামাক মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে নিজেদের সোনালী ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে।

তামাক ছাড়লে শরীরে যে জাদুকরী পরিবর্তন ঘটে

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক কখনো মানুষের বন্ধু হতে পারে না এবং সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে কোনো রোমাঞ্চ বা আধুনিকতা থাকতে পারে না। তবে আশার কথা হলো, একজন মানুষ যখনই তামাক বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন, তার শরীর অত্যন্ত দ্রুত ইতিবাচক সাড়া দিতে শুরু করে।

বিশেষ করে ২০ মিনিট পর শরীর থেকে তামাকের প্রভাব কমতে শুরু করায় রক্তচাপ শিরার গতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। ৮ ঘণ্টা পর রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা একদম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমতে থাকে। ২৪ ঘণ্টা পর শরীর ক্ষতিকর কার্বন মনোক্সাইড থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। ৪৮ ঘণ্টা পর রক্তে নিকোটিনের মাত্রা শূন্যে নেমে আসে, ফলে মুখ শরীরের তামাকের দুর্গন্ধ দূর হয়ে যায়।

৭২ ঘণ্টা পর ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়ায় শ্বাসকষ্ট কিছুটা কমে এবং শরীরের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। থেকে মাস পর মানুষ স্বাভাবিকভাবে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে। বছর পর হৃদরোগের বড় কোনো সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি একজন নিয়মিত ধূমপায়ীর তুলনায় অর্ধেক হয়ে যায়। বছর পর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি একজন অধূমপায়ীর সমপর্যায়ে নেমে আসে।

১০ বছর পর ফুসফুসে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার ধূমপায়ীদের তুলনায় অর্ধেক হয়ে যায় এবং অন্যান্য ক্যান্সারের ঝুঁকিও হ্রাস পায়। ১৫ বছর পর হৃদরোগ ক্যান্সারের সামগ্রিক ঝুঁকি একজন সাধারণ অধূমপায়ীর মতো সমপর্যায়ে চলে আসে।

তাছাড়া তামাক ত্যাগ করলে খাবারের আসল স্বাদ গন্ধের অনুভূতি স্বাভাবিক হয়, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার মতো দৈনন্দিন কাজগুলো সহজেই করা যায়। তামাক পরিত্যাগকারীরা ক্রমাগত তামাক ব্যবহারকারীদের চেয়ে অনেক দীর্ঘায়ু লাভ করেন। এমনকি গর্ভবতী মায়েরা তামাক পরিত্যাগ করলে সুস্থ স্বাভাবিক ওজনের শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। তামাক ছাড়ার প্রথম থেকে সপ্তাহ কিছু শারীরিক মানসিক অস্বস্তি (উইথড্রয়াল সিম্পটম) থাকলেও থেকে দিনের মধ্যে এর অধিকাংশ উপসর্গ কেটে যায়।

আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগের অভাব বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

দেশে তামাকের ব্যবহার কমাতে এবং এর বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করতে কঠোর আইন করা হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। তামাকের ক্ষতিকর দিকগুলো সিগারেটের প্যাকেটে বাধ্যতামূলকভাবে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হলেও আসক্তদের ওপর এর প্রভাব পড়ছে কম।

রাস্তায় চলতে ফিরতে অনেকেরই হেটে হেটে সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে। এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সাধারণ পথচারীরা বলেন, "অনেকে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে। সেই বিষাক্ত ধোঁয়া পেছনে থাকা অন্যদের মুখে-নাকে ঢোকে। এর প্রতিবাদ করলে উল্টো অনেকেই ক্ষেপে যান। রাস্তায় এভাবে প্রকাশ্যে ধূমপান করা পুরোপুরি বন্ধ হওয়া উচিত।"

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। একজন প্রখ্যাত বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ বলেন, "তামাকমুক্ত আইন আছে কিন্তু তা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তামাকের কারণে ফুসফুস, মুখমণ্ডল শ্বাসনালীতে ক্যান্সারসহ নানা রোগ হয়। ধূমপানজনিত কারণে শ্বাসনালীতে স্থায়ী বাধা বা সিওপিডির মতো রোগ হয়। এই রোগগুলোর চিকিৎসা করে মানুষকে পুরোপুরি সুস্থ করা সম্ভব হয় না। তাই প্রথম কাজ হলো ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।"

একই সুর মেলালেন একজন সিনিয়র মেডিসিন বিশেষজ্ঞও। তিনি বলেন, "ধূমপানকারী কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলে তার অপারেশন এবং অপারেশনের পরবর্তীতে নানা জটিলতা দেখা দেয়। এর মধ্যে শ্বাসনালীতে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। এছাড়া ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, লিভার খাদ্যনালীতেও মারাত্মক সমস্যা হয়। এই ভয়ানক পরিণতি থেকে বাঁচতে হলে ধূমপান বন্ধ করার কোনো বিকল্প নেই।"

বাংলাদেশের প্রচলিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোর শাস্তির বিধান

তামাকের ক্ষয়ক্ষতি থেকে জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে বাংলাদেশ সরকারধূমপান তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনপ্রণয়ন করেছে। এই আইন অনুযায়ী, দেশের সব পাবলিক প্লেস পাবলিক পরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি এই আইন অমান্য করে এসব স্থানে ধূমপান করেন, তবে তিনি অনধিক ৩০০ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আইনের আওতাভুক্ত পাবলিক প্লেসগুলোর মধ্যে রয়েছে: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি, আধা-সরকারি স্বায়ত্তশাসিত অফিস এবং বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, লিফট এবং আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল ক্লিনিক ভবন, আদালত ভবন, রেলওয়ে স্টেশন ভবন, বাস টার্মিনাল ভবন, যাত্রীদের অপেক্ষার নির্দিষ্ট সারি, সিনেমা হল, প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল বিপণী ভবন (শপিং মল), চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেস্তোরাঁ, পাবলিক টয়লেট, শিশু পার্ক, মেলা বা জনসাধারনের সম্মিলিতভাবে ব্যবহার্য অন্য যেকোনো স্থান।

একইভাবে মোটর গাড়ি, বাস, রেল গাড়ি, জাহাজ, লঞ্চসহ সব ধরনের যাত্রীবাহী জনযানবাহনে ধূমপান নিষিদ্ধ। আইনের শাসন বজায় রাখতে পাবলিক প্লেস বা পাবলিক পরিবহনের মালিক, তত্ত্বাবধায়ক বা ম্যানেজারকে তাদের আওতাধীন এলাকা ধূমপানমুক্ত রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা যদি এই ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, তবে অনধিক ৫০০ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়াও নিজ নিজ নিয়ন্ত্রনাধীন স্থানেধূমপান হতে বিরত থাকুন, ইহা শাস্তিযোগ্য অপরাধসম্বলিত সতর্কীকরণ নোটিশ বাংলা ইংরেজিতে প্রদর্শন না করলে ,০০০ টাকা দণ্ডের বিধান রয়েছে। ধূমপানমুক্ত এলাকায় কোনো ধরনের ছাইদানি (অ্যাশট্রে) রাখাও আইনত অপরাধ।

বিজ্ঞাপন নাবালকদের কাছে বিক্রি নিষিদ্ধ

আইনে তামাকজাত দ্রব্যের যেকোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিজ্ঞাপন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তামাক ব্যবহারে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোনো প্রকার দান, পুরস্কার, বৃত্তি প্রদান, কোনো টুর্নামেন্ট বা খেলার আয়োজন করা কিংবা বিনামূল্যে নমুনা প্রদান করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই আইন লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।

একই সঙ্গে, তামাকজাত দ্রব্যের মোড়ক বা প্যাকেটে কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ (৫০%) জায়গা জুড়ে ছবিসহ বিধিবদ্ধ সতর্কবাণী মুদ্রণ করা বাধ্যতামূলক। এই নিয়ম না মানলে অনূর্ধ্ব মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে। দেশের কোমলমতি শিশুদের সুরক্ষায় ১৮ বছর বয়সের নিচে কারো কাছে বা কারো দ্বারা তামাকজাত দ্রব্য বিপণন বা বিক্রয় করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই আইন অমান্য করলে অনধিক ,০০০ টাকা অর্থদণ্ড দিতে হবে। এই আইনের অধীনে কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা বারবার একই অপরাধ করলে, প্রতিবারের জন্য দণ্ডের পরিমাণ দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পাবে।

তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত সরকারি টাস্কফোর্স তামাকমুক্ত থানা

আইন বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল নিয়মিত জাতীয়, জেলা উপজেলা পর্যায়ে টাস্কফোর্সের সভা এবং দেশব্যাপী মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। আইন বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভাগীয় জেলা পর্যায়ে কর্মকর্তাদের নিয়ে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে।

ধূমপানমুক্ত এলাকার পরিধি বাড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০১০ সালের আগস্ট মাসে দেশের সব থানায়ধূমপানমুক্ত সাইন বোর্ডস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে সারাদেশের প্রতিটি থানা পুলিশ ফাঁড়িতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদকে ধূমপানমুক্ত এলাকা ঘোষণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর ফলে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে সতর্কতামূলক নোটিশ প্রদর্শনের কাজ চলছে। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত ইউনিয়ন পর্যন্ত এই আইন আদেশের শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব হলে দেশ বহুলাংশে ক্যান্সারসহ তামাকজনিত মারাত্মক রোগ থেকে মুক্ত থাকবে।

তামাকমুক্ত সমাজ গঠনে পরিবারের ভূমিকাই প্রধান

আইন, মোবাইল কোর্ট কিংবা সরকারি প্রজ্ঞাপন দিয়ে সাময়িকভাবে তামাকের গতি কমানো গেলেও, একে সমাজ থেকে চিরতরে উপড়ে ফেলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো পরিবার।

চিকিৎসা বিজ্ঞান সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, তামাকের এই মরণ থাবা থেকে একজন তরুণকে সবার আগে ফেরাতে পারে তার নিজের পরিবার। অনেক পরিবারে দেখা যায়, বাবা বা বড় ভাইদের প্রকাশ্যে সিগারেট টানতে দেখে সন্তান বা ছোট ভাইয়েরা অনায়াসে এই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে। এভাবে একটি পুরো পরিবার পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সিগারেটের বিষাক্ত জালে জড়িয়ে যায়।

তাই পরিবারের প্রবীণ জ্যেষ্ঠ সদস্যরা যদি একটু সচেতন হন এবং নিজেরা ধূমপান ত্যাগ করে কঠোর অবস্থান নেন, তবে পুরো পরিবারকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, তাদের মানসিক হতাশা বা নিঃসঙ্গতার সময়ে পাশে দাঁড়ানো এবং বন্ধুদের খোঁজখবর রাখার মাধ্যমেই তরুণ সমাজকে এই অন্ধকারের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তামাক নামক এই বৈশ্বিক মহামারি মৃত্যুদূতের মুখোশ উন্মোচন করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে আজ সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসতখনই সফল সার্থক হবে, যখন দেশের প্রতিটি নাগরিক মন থেকে তামাককেনাবলবেন এবং প্রতিটি পরিবার হবে সম্পূর্ণ ধূমপানমুক্ত। দুই আঙুলের ফাঁকে জ্বলতে থাকা সিগারেটটি নিভিয়ে দেওয়ার এখনই সময়, কারণ এই আগুন শুধু তামাক পোড়ায় না, পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় একটি জীবন, একটি পরিবার এবং একটি দেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত