"আমি মাদক খাইনা, গাঁজাই খাই। আমার কাছে গাঁজাই আছে।" তল্লাশিকালে পুলিশের ক্যামেরার সামনে এভাবেই অবলীলায় নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করছিল এক মাদকসেবী। অন্য এক যুবকের পকেট থেকে যখন একের পর এক মাদকের পুরিয়া বের করা হচ্ছিল, তখন তার ফ্যাকাশে মুখ বলে দিচ্ছিল এই মরণনেশার গভীরতা কতটা সর্বগ্রাসী।
এটি কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়, বরং দেশের
উত্তরবঙ্গের সীমান্ত ঘেঁষা জনপদগুলোর বর্তমান নির্মম বাস্তবতা। মাদকের এই ভয়াল থাবা
থেকে সমাজকে রক্ষা করতে এবার এক歩ও
ছাড় না দেওয়ার নীতিতে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আট জেলায় চিরুনি অভিযান
রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় একযোগে শুরু হয়েছে পুলিশের মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। গত এক মাসে কুখ্যাত মাদক কারবারি ও সেবীদের ধরতে দিন-রাত টানা অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। এই বিশেষ অভিযানে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলা থেকে প্রায় দেড় হাজার মাদকসেবী ও বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাদক কারবারিদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে যেখানেই মাদকের খবর মিলছে, সেখানেই হানা দিচ্ছে পুলিশ।
এবারের অভিযানে
সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে পাবনা জেলায়। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে কোটি কোটি
টাকা মূল্যের ইয়াবা, গাঁজা, ট্যাপেন্টাডল, চোলাই মদ, হেরোইন, ফায়ারড্রিনসহ হরেক রকমের
মরণঘাতী মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু মাদকই নয়, অপরাধীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে
ধারালো বার্মিজ চাকুসহ দেশীয় অস্ত্র। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মাদকদ্রব্য
নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মাদকের টাকা জোগাতে অপরাধের বিস্তার
স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর চোরাচালান সিন্ডিকেটকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো প্রতিনিয়ত দেশে মাদক ঢোকাচ্ছে। একসময় যা কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে। তরুণ ও যুবসমাজ দলে দলে এই মরণনেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে।
প্রকাশ্যে জনসমক্ষে মাদক সেবনের পাশাপাশি পকেটে ও কোমরে লুকিয়ে মাদক বহন
করছে তারা। মাদকের এই নীল দংশন কেবল একজন ব্যক্তিকে শেষ করছে না, ধ্বংস করে দিচ্ছে
পুরো পরিবারকে। নেশার টাকা জোগাড় করতে আসক্তরা ঘরের জিনিসপত্র চুরি করা থেকে শুরু করে
জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই, ডাকাতির মতো মারাত্মক সব সামাজিক অপরাধে।
শাহজাদপুরে ত্রাস বন্ধ করতে মাঠে পুলিশ, মাদকসেবীদের চোখ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা
বিশেষ এই অভিযানের
অংশ হিসেবে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানা এলাকায় ব্যাপক তৎপরতা চালানো হয়েছে। সেখানে
মাদকবিরোধী অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩০ জনকে তাৎক্ষণিক জেলহাজতে পাঠানো
হয়েছে এবং ১২টি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের এই আকস্মিক ও কঠোর অভিযানের
মুখে চতুর মাদক কারবারি ও সেবীদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছে। এ বিষয়ে শাহজাদপুর
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, "অভিযানের মুখে কিছু
মাদক সেবী গা ঢাকা দিয়েছে। তাদেরকে খুঁজে বের করতে অভিযান চালানো হচ্ছে।"
'মাদক নির্মূল
না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে'
উত্তরবঙ্গকে মাদকমুক্ত করতে এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার কথা পুনর্ব্যক্ত করে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহ্জাহান বলেন, "মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। তা অব্যাহত থাকবে। টার্গেট রাজশাহী বিভাগের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো মাদক নির্মূল করা। এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার গ্রেপ্তার হয়েছে। মাদক উদ্ধার হয়েছে।"
মাদক নির্মূলের এই মহাযজ্ঞে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টানা অভিযান কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। সীমান্ত গলিয়ে আসা এই বিষাক্ত ছোবল থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬
"আমি মাদক খাইনা, গাঁজাই খাই। আমার কাছে গাঁজাই আছে।" তল্লাশিকালে পুলিশের ক্যামেরার সামনে এভাবেই অবলীলায় নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করছিল এক মাদকসেবী। অন্য এক যুবকের পকেট থেকে যখন একের পর এক মাদকের পুরিয়া বের করা হচ্ছিল, তখন তার ফ্যাকাশে মুখ বলে দিচ্ছিল এই মরণনেশার গভীরতা কতটা সর্বগ্রাসী।
এটি কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়, বরং দেশের
উত্তরবঙ্গের সীমান্ত ঘেঁষা জনপদগুলোর বর্তমান নির্মম বাস্তবতা। মাদকের এই ভয়াল থাবা
থেকে সমাজকে রক্ষা করতে এবার এক歩ও
ছাড় না দেওয়ার নীতিতে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আট জেলায় চিরুনি অভিযান
রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় একযোগে শুরু হয়েছে পুলিশের মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। গত এক মাসে কুখ্যাত মাদক কারবারি ও সেবীদের ধরতে দিন-রাত টানা অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। এই বিশেষ অভিযানে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলা থেকে প্রায় দেড় হাজার মাদকসেবী ও বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাদক কারবারিদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে যেখানেই মাদকের খবর মিলছে, সেখানেই হানা দিচ্ছে পুলিশ।
এবারের অভিযানে
সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে পাবনা জেলায়। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে কোটি কোটি
টাকা মূল্যের ইয়াবা, গাঁজা, ট্যাপেন্টাডল, চোলাই মদ, হেরোইন, ফায়ারড্রিনসহ হরেক রকমের
মরণঘাতী মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু মাদকই নয়, অপরাধীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে
ধারালো বার্মিজ চাকুসহ দেশীয় অস্ত্র। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মাদকদ্রব্য
নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মাদকের টাকা জোগাতে অপরাধের বিস্তার
স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর চোরাচালান সিন্ডিকেটকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো প্রতিনিয়ত দেশে মাদক ঢোকাচ্ছে। একসময় যা কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে। তরুণ ও যুবসমাজ দলে দলে এই মরণনেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে।
প্রকাশ্যে জনসমক্ষে মাদক সেবনের পাশাপাশি পকেটে ও কোমরে লুকিয়ে মাদক বহন
করছে তারা। মাদকের এই নীল দংশন কেবল একজন ব্যক্তিকে শেষ করছে না, ধ্বংস করে দিচ্ছে
পুরো পরিবারকে। নেশার টাকা জোগাড় করতে আসক্তরা ঘরের জিনিসপত্র চুরি করা থেকে শুরু করে
জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই, ডাকাতির মতো মারাত্মক সব সামাজিক অপরাধে।
শাহজাদপুরে ত্রাস বন্ধ করতে মাঠে পুলিশ, মাদকসেবীদের চোখ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা
বিশেষ এই অভিযানের
অংশ হিসেবে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানা এলাকায় ব্যাপক তৎপরতা চালানো হয়েছে। সেখানে
মাদকবিরোধী অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩০ জনকে তাৎক্ষণিক জেলহাজতে পাঠানো
হয়েছে এবং ১২টি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের এই আকস্মিক ও কঠোর অভিযানের
মুখে চতুর মাদক কারবারি ও সেবীদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছে। এ বিষয়ে শাহজাদপুর
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, "অভিযানের মুখে কিছু
মাদক সেবী গা ঢাকা দিয়েছে। তাদেরকে খুঁজে বের করতে অভিযান চালানো হচ্ছে।"
'মাদক নির্মূল
না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে'
উত্তরবঙ্গকে মাদকমুক্ত করতে এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার কথা পুনর্ব্যক্ত করে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহ্জাহান বলেন, "মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। তা অব্যাহত থাকবে। টার্গেট রাজশাহী বিভাগের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো মাদক নির্মূল করা। এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার গ্রেপ্তার হয়েছে। মাদক উদ্ধার হয়েছে।"
মাদক নির্মূলের এই মহাযজ্ঞে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টানা অভিযান কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। সীমান্ত গলিয়ে আসা এই বিষাক্ত ছোবল থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন