সংবাদ

নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বাস্তবতা ও বাধা


নাজমুল হুদা খান
নাজমুল হুদা খান
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম

নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বাস্তবতা ও বাধা
নার্সিং এবং মিডওয়াইফারি খাতে নারী স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাধিক্য থাকলেও, লিঙ্গবৈষম্য, বেতন বৈষম্য এবং পেশাগত প্রতিবন্ধকতার মতো সমস্যাগুলো এখনো দৃশ্যমান

সম্প্রতি ঘোষিত জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেয়ার ইতিহাস বাংলাদেশের এই প্রথম। গত অর্থবছরের (২০২৫-২৬) সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে থাকে, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা উচিত। তবে এই প্রথমবার ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে এবার স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অতীতে এমনও দেখা যায়নি। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। সর্বশেষ সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী দেশের সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে প্রায় ১, ১৫,০০০-১, ২৫,০০০ নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছেন। নার্স ও মিডওয়াইফের সংখ্যা প্রায় ১, ১০,০০০-১, ২০,০০০ জন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট,

রেডিওগ্রাফার, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার কল্যাণ সহকারী এবং অন্যান্য প্যারামেডিকসহ কয়েক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩,০০০-এর বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক, ৪৯০-এর বেশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৬৪টি জেলা হাসপাতাল এবং জাতীয় ও বিশেষায়িত হাসপাতালসহ বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে এসব জনবল স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। দেশের স্বাস্থ্যখাতে জনবল কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো জনবলের ঘাটতি ও অসম বণ্টন। শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি হলেও গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় চিকিৎসক, নার্স ও বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট এখনও উল্লেখযোগ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্য ব্যাবস্থার উন্নয়নে প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেটে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী হবে- এমন ঘোষণা সত্যিই চমকপ্রদ। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নের বাস্তবিক উদ্যোগ। তবে এর বাস্তবতা ও সম্ভাবনার সঙ্গে এবং বহুবিধ চ্যালেঞ্জ সম্পর্কিত। বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কর্মী, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী, মিডওয়াইফ, পুষ্টিকর্মী এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের বড় অংশই নারী। নতুন নিয়োগের অধিকাংশ যদি এসব পদে হয়, তাহলে ৮০ শতাংশ নারী নিয়োগ অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশে নার্সদের মধ্যে নারী ও পুরুষের অনুপাত প্রায় ৯০:১০। অর্থাৎ, নার্সিং পেশায় শতকরা ৯০ ভাগের বেশি নারী এবং পুরুষ নার্স রয়েছেন প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ। উপরন্তু দেশের নিবন্ধিত নার্সদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক নারী। নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে যদি নার্স ও মিডওয়াইফদের বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে নারী অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য খাতে নারীরা বৈশ্বিক কর্মীবাহিনীর প্রায় ৬৭% এবং চিকিৎসা শিক্ষা গ্র্যাজুয়েটদের ৫৯% হলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বা শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ মাত্র ২৫%। নার্সিং এবং মিডওয়াইফারি খাতে নারী স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাধিক্য থাকলেও, লিঙ্গবৈষম্য, বেতন বৈষম্য এবং পেশাগত প্রতিবন্ধকতার মতো সমস্যাগুলো এখনো দৃশ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক কর্মীবাহিনীর বেশিরভাগ অংশই নারী, যা তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে বৃহৎ বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোতে প্রধান পদে নারীদের উপস্থিতি বেশ কম (প্রায় ৩০%)। তাছাড়া, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো থেকে শীর্ষ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৫%। স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা খাতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২৪% কম উপার্জন করেন। স্বাস্থ্য খাতে নারীরা অবৈতনিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সিংহভাগই সম্পন্ন করে থাকেন। এছাড়া নারীরা তুলনামূলকভাবে কম বেতনভুক্ত নার্সিং ও মিডওয়াইফারি পেশায় বেশি নিয়োজিত। নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রায়শই কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হন, যা তাদের কর্মদক্ষতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাজেটে ঘোষিত স্বাস্থ্যকর্মী বলতে কি চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, টেকনোলজিস্ট, স্বাস্থ্য সহকারী, নাকি সব মিলিয়ে বোঝানো হয়েছে- এটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। যদি ১ লাখের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ চিকিৎসক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও বিশেষায়িত জনবল হয়, তাহলে ৮০ শতাংশ নারী নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। ১ লাখ জনবল নিয়োগের পূর্বে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, শিক্ষক, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং মানসম্মত কারিকুলাম। দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করলে দক্ষতার প্রশ্ন উঠতে পারে। নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পর তাদের নিরাপদ আবাসন, যাতায়াত ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করলে প্রত্যন্ত গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি পদায়ন কঠিন হবে। শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশাসনিক, ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। ১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ৮০ শতাংশ নারী করার লক্ষ্য অসম্ভব নয়, তবে এটি মূলত সম্ভব হবে যদি নিয়োগের বড় অংশ নার্স, মিডওয়াইফ, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী পদে হয়। অন্যদিকে, যদি এই সংখ্যা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য পেশাজীবীদেরও সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে লক্ষ্য অর্জন অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে যদি পরিকল্পনাটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে-মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে সহায়ক হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হবে। গ্রামীণ নারীদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হার বাড়বে। নারী কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে এবং স্বাস্থ্য খাতে লিঙ্গ বৈষম্য কমাতে সাহায্য করবে। অতএব, ঘোষণাটি প্রশংসনীয় হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে কোন পদে নিয়োগ হবে, কীভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে এবং কোথায় তাদের কাজে লাগানো হবে-তার ওপর।

[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬


নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বাস্তবতা ও বাধা

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬

featured Image

সম্প্রতি ঘোষিত জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেয়ার ইতিহাস বাংলাদেশের এই প্রথম। গত অর্থবছরের (২০২৫-২৬) সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে থাকে, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা উচিত। তবে এই প্রথমবার ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে এবার স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অতীতে এমনও দেখা যায়নি। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। সর্বশেষ সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী দেশের সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে প্রায় ১, ১৫,০০০-১, ২৫,০০০ নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছেন। নার্স ও মিডওয়াইফের সংখ্যা প্রায় ১, ১০,০০০-১, ২০,০০০ জন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট,

রেডিওগ্রাফার, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার কল্যাণ সহকারী এবং অন্যান্য প্যারামেডিকসহ কয়েক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩,০০০-এর বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক, ৪৯০-এর বেশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৬৪টি জেলা হাসপাতাল এবং জাতীয় ও বিশেষায়িত হাসপাতালসহ বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে এসব জনবল স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। দেশের স্বাস্থ্যখাতে জনবল কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো জনবলের ঘাটতি ও অসম বণ্টন। শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি হলেও গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় চিকিৎসক, নার্স ও বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট এখনও উল্লেখযোগ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্য ব্যাবস্থার উন্নয়নে প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেটে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী হবে- এমন ঘোষণা সত্যিই চমকপ্রদ। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নের বাস্তবিক উদ্যোগ। তবে এর বাস্তবতা ও সম্ভাবনার সঙ্গে এবং বহুবিধ চ্যালেঞ্জ সম্পর্কিত। বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কর্মী, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী, মিডওয়াইফ, পুষ্টিকর্মী এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের বড় অংশই নারী। নতুন নিয়োগের অধিকাংশ যদি এসব পদে হয়, তাহলে ৮০ শতাংশ নারী নিয়োগ অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশে নার্সদের মধ্যে নারী ও পুরুষের অনুপাত প্রায় ৯০:১০। অর্থাৎ, নার্সিং পেশায় শতকরা ৯০ ভাগের বেশি নারী এবং পুরুষ নার্স রয়েছেন প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ। উপরন্তু দেশের নিবন্ধিত নার্সদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক নারী। নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে যদি নার্স ও মিডওয়াইফদের বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে নারী অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য খাতে নারীরা বৈশ্বিক কর্মীবাহিনীর প্রায় ৬৭% এবং চিকিৎসা শিক্ষা গ্র্যাজুয়েটদের ৫৯% হলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বা শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ মাত্র ২৫%। নার্সিং এবং মিডওয়াইফারি খাতে নারী স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাধিক্য থাকলেও, লিঙ্গবৈষম্য, বেতন বৈষম্য এবং পেশাগত প্রতিবন্ধকতার মতো সমস্যাগুলো এখনো দৃশ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক কর্মীবাহিনীর বেশিরভাগ অংশই নারী, যা তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে বৃহৎ বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোতে প্রধান পদে নারীদের উপস্থিতি বেশ কম (প্রায় ৩০%)। তাছাড়া, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো থেকে শীর্ষ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৫%। স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা খাতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২৪% কম উপার্জন করেন। স্বাস্থ্য খাতে নারীরা অবৈতনিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সিংহভাগই সম্পন্ন করে থাকেন। এছাড়া নারীরা তুলনামূলকভাবে কম বেতনভুক্ত নার্সিং ও মিডওয়াইফারি পেশায় বেশি নিয়োজিত। নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রায়শই কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হন, যা তাদের কর্মদক্ষতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাজেটে ঘোষিত স্বাস্থ্যকর্মী বলতে কি চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, টেকনোলজিস্ট, স্বাস্থ্য সহকারী, নাকি সব মিলিয়ে বোঝানো হয়েছে- এটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। যদি ১ লাখের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ চিকিৎসক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও বিশেষায়িত জনবল হয়, তাহলে ৮০ শতাংশ নারী নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। ১ লাখ জনবল নিয়োগের পূর্বে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, শিক্ষক, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং মানসম্মত কারিকুলাম। দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করলে দক্ষতার প্রশ্ন উঠতে পারে। নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পর তাদের নিরাপদ আবাসন, যাতায়াত ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করলে প্রত্যন্ত গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি পদায়ন কঠিন হবে। শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশাসনিক, ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। ১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ৮০ শতাংশ নারী করার লক্ষ্য অসম্ভব নয়, তবে এটি মূলত সম্ভব হবে যদি নিয়োগের বড় অংশ নার্স, মিডওয়াইফ, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী পদে হয়। অন্যদিকে, যদি এই সংখ্যা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য পেশাজীবীদেরও সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে লক্ষ্য অর্জন অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে যদি পরিকল্পনাটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে-মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে সহায়ক হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হবে। গ্রামীণ নারীদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হার বাড়বে। নারী কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে এবং স্বাস্থ্য খাতে লিঙ্গ বৈষম্য কমাতে সাহায্য করবে। অতএব, ঘোষণাটি প্রশংসনীয় হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে কোন পদে নিয়োগ হবে, কীভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে এবং কোথায় তাদের কাজে লাগানো হবে-তার ওপর।

[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত