সংবাদ

ব্ল্যাঙ্ক চেক বা সিকিউরিটি চেক কি গলার ফাঁস?


সিরাজ প্রামাণিক
সিরাজ প্রামাণিক
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম

ব্ল্যাঙ্ক চেক বা সিকিউরিটি চেক কি গলার ফাঁস?

ব্যবসায়িক লেনদেন, ব্যাংক লোন কিংবা ব্যক্তিগত ধারদেনার ক্ষেত্রে ‘সিকিউরিটি চেক’ বা ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দেয়ার প্রচলন আমাদের সমাজে বেশ পুরোনো। অনেকেই বিশ্বাসের খাতিরে শুধু একটা স্বাক্ষর করে ফাঁকা চেক অন্য পক্ষের হাতে তুলে দেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখন, যখন সেই বিশ্বাসের অপব্যবহার করে চেকে ইচ্ছামতো মোটা অঙ্কের টাকা ও তারিখ বসিয়ে আদালতে এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা ঠুকে দেয়া হয়।

হঠাৎ এমন আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে অনেকেই দিশেহারা হয়ে যান। কিন্তু আইন কাউকে অন্ধভাবে শাস্তি দেয় না। আপনার দেয়া চেকটি যদি সত্যিই কেবল ‘সিকিউরিটি’ বা ‘নিরাপত্তা স্মারক’ হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে এবং সেখানে যদি জালিয়াতি করা হয়, তবে আদালতে মুখের কথায় নয়, আইনি ও ˆবজ্ঞানিক যুক্তিতে লড়াই করতে হবে।

আদালতে আসামিপক্ষে লড়াই করার এবং খালাস পাওয়ার প্রধান ৫টি আইনি অস্ত্র নিচে আলোচনা করা হলো:

১. চেকের ভিন্ন হাতের লেখা ও ভিন্ন কালি (ধারা ৮৭)

একটি চেকের মূল চরিত্র হচ্ছে এর সত্যতা। হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ৮৭ ধারা অনুযায়ী, চেকে যদি ড্রয়ারের (চেক দাতা) সম্মতি ছাড়া কোনো মৌলিক পরিবর্তন করা হয়, তবে সেই চেকটি বাতিল বলে গণ্য হবে। আপনার স্বাক্ষর যদি সঠিকও হয়, কিন্তু চেকের ভেতরের তারিখ, টাকার অঙ্ক এবং নাম যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন হাতের লেখায় এবং ভিন্ন কালিতে লেখা হয়, তবে তা আদালতে বড় একটি ডিফেন্স। বাদীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, এই ভিন্ন লেখার পেছনে চেক দাতার সম্মতি ছিল।

২. স্বাক্ষর থাকলেই কি তা ‘ইস্যু করা চেক’?

আমাদের দেশের উচ্চ আদালতের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত রয়েছে এম.এ মজিদ বনাম মো. আব্দুল মোতালেব (৫৬ ডিএলআর, ৬৩৬) মামলায়। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট বলেছেন:

‘আসামির স্বাক্ষর, টাকার অঙ্ক এবং পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখায় থাকলে এর ধারা ৩ (ন) অনুসারে উহাকে ‘ইস্যুয়েন্স অব চেক’ বলা যাইবে না।’ অর্থাৎ, আপনি শুধু স্বাক্ষর দিয়েছেন মানেই এই নয় যে আপনি পুরো চেকটি ওই টাকা বসিয়ে আইনসম্মতভাবে ইস্যু করেছেন।

৩. প্রমাণের দায় কার? (৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭):

সাম্প্রতিক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির হলো এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র (৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭) মামলা। এই সিদ্ধান্তে মহামান্য হাইকোর্ট আরও কঠোরভাবে বলেছেন যদি ড্রয়ার নিজে চেক সম্পূর্ণ পূরণ না করেন এবং হস্তাক্ষরে স্পষ্ট অসঙ্গতি থাকে, তবে বাদীকে (যিনি মামলা করেছেন) অবশ্যই আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে, অন্যের দ্বারা চেকটি পূরণের ক্ষেত্রে চেক দাতার স্পষ্ট অনুমতি বা সম্মতি ছিল। বাদী এই ব্যাখ্যার সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারলে মামলার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়।

৪. ফরেনসিক পরীক্ষা: আসামির মৌলিক অধিকার

অনেকেই ভাবেন, চেকে স্বাক্ষর যখন মিলে গেছে, তখন আর বাঁচার উপায় নেই। এটি ভুল ধারণা। সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী, চেকের লেখার বয়স এবং কালির ভিন্নতা পরীক্ষার জন্য সরকারি ফরেনসিক ল্যাবে (যেমন সিআইডি বা পিবিআই-এর হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞ) চেকটি পাঠানোর আবেদন করা আসামির আইনগত অধিকার।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের দু’টি বিখ্যাত সিদ্ধান্তত্ম কল্যাণী ভাস্কর বনাম এম.এস. সম্পূর্ণম (২০০৭) এবং টি. নাগাপ্পা (২০০৮) মামলায় বলা হয়েছে, আইনে বাদীর পক্ষে প্রাথমিক অনুমানের সুযোগ থাকলেও, আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ বা ন্যায়বিচারের অধিকার কেড়ে নেয়া যাবে না। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যদি প্রমাণ হয় যে স্বাক্ষরটি ৫ বছর আগের আর ভেতরের লেখাগুলো ২ মাস আগের তবে জালিয়াতি সহজেই ধরা পড়বে।

৫. সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার অপরাধ নয়

মহামান্য আপিল বিভাগের একটি লিডিং জাজমেন্ট হলো হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ (৭১ ডিএলআর (এডি))। এই মামলার মূল নীতি হলো কোনো ব্ল্যাঙ্ক চেক যদি শুধুমাত্র সিকিউরিটি বা জামানত হিসেবে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে পাওনাদার যদি নিজের ইচ্ছামতো বড় অঙ্ক বসিয়ে তার অপব্যবহার করে মামলা করে, তবে এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার অধীনে কোনো অপরাধ গঠিত হয় না।

শেষ কথা

আইন সচেতনতাই আইনি ফাঁদ থেকে বাঁচার প্রধান উপায়। কারো বিরুদ্ধে সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার করে মিথ্যা মামলা হলে, ভয় না পেয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে শুরুতেই চেকটি ফরেনসিক পরীক্ষার আবেদন করা উচিত এবং উচ্চ আদালতের এই চমৎকার নজিরগুলো যুক্তিতর্কের সময় উপস্থাপন করা উচিত। আইন যেমন অপরাধীকে সাজা দেয়, তেমনি কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যাতে জালিয়াতির শিকার না হন, তার সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।

সতর্কতা: যেকোনো আইনি লেনদেনে ব্ল্যাঙ্ক চেক দেয়া থেকে বিরত থাকুন। যদি দিতেই হয়, তবে চেকে ‘সিকিউরিটি চেক’ লিখে দিন এবং কোনো চুক্তির অধীনে দিচ্ছেন তা লিখিত আকারে রাখুন।

[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬


ব্ল্যাঙ্ক চেক বা সিকিউরিটি চেক কি গলার ফাঁস?

প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬

featured Image

ব্যবসায়িক লেনদেন, ব্যাংক লোন কিংবা ব্যক্তিগত ধারদেনার ক্ষেত্রে ‘সিকিউরিটি চেক’ বা ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দেয়ার প্রচলন আমাদের সমাজে বেশ পুরোনো। অনেকেই বিশ্বাসের খাতিরে শুধু একটা স্বাক্ষর করে ফাঁকা চেক অন্য পক্ষের হাতে তুলে দেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখন, যখন সেই বিশ্বাসের অপব্যবহার করে চেকে ইচ্ছামতো মোটা অঙ্কের টাকা ও তারিখ বসিয়ে আদালতে এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা ঠুকে দেয়া হয়।

হঠাৎ এমন আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে অনেকেই দিশেহারা হয়ে যান। কিন্তু আইন কাউকে অন্ধভাবে শাস্তি দেয় না। আপনার দেয়া চেকটি যদি সত্যিই কেবল ‘সিকিউরিটি’ বা ‘নিরাপত্তা স্মারক’ হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে এবং সেখানে যদি জালিয়াতি করা হয়, তবে আদালতে মুখের কথায় নয়, আইনি ও ˆবজ্ঞানিক যুক্তিতে লড়াই করতে হবে।

আদালতে আসামিপক্ষে লড়াই করার এবং খালাস পাওয়ার প্রধান ৫টি আইনি অস্ত্র নিচে আলোচনা করা হলো:

১. চেকের ভিন্ন হাতের লেখা ও ভিন্ন কালি (ধারা ৮৭)

একটি চেকের মূল চরিত্র হচ্ছে এর সত্যতা। হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ৮৭ ধারা অনুযায়ী, চেকে যদি ড্রয়ারের (চেক দাতা) সম্মতি ছাড়া কোনো মৌলিক পরিবর্তন করা হয়, তবে সেই চেকটি বাতিল বলে গণ্য হবে। আপনার স্বাক্ষর যদি সঠিকও হয়, কিন্তু চেকের ভেতরের তারিখ, টাকার অঙ্ক এবং নাম যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন হাতের লেখায় এবং ভিন্ন কালিতে লেখা হয়, তবে তা আদালতে বড় একটি ডিফেন্স। বাদীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, এই ভিন্ন লেখার পেছনে চেক দাতার সম্মতি ছিল।

২. স্বাক্ষর থাকলেই কি তা ‘ইস্যু করা চেক’?

আমাদের দেশের উচ্চ আদালতের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত রয়েছে এম.এ মজিদ বনাম মো. আব্দুল মোতালেব (৫৬ ডিএলআর, ৬৩৬) মামলায়। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট বলেছেন:

‘আসামির স্বাক্ষর, টাকার অঙ্ক এবং পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখায় থাকলে এর ধারা ৩ (ন) অনুসারে উহাকে ‘ইস্যুয়েন্স অব চেক’ বলা যাইবে না।’ অর্থাৎ, আপনি শুধু স্বাক্ষর দিয়েছেন মানেই এই নয় যে আপনি পুরো চেকটি ওই টাকা বসিয়ে আইনসম্মতভাবে ইস্যু করেছেন।

৩. প্রমাণের দায় কার? (৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭):

সাম্প্রতিক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির হলো এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র (৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭) মামলা। এই সিদ্ধান্তে মহামান্য হাইকোর্ট আরও কঠোরভাবে বলেছেন যদি ড্রয়ার নিজে চেক সম্পূর্ণ পূরণ না করেন এবং হস্তাক্ষরে স্পষ্ট অসঙ্গতি থাকে, তবে বাদীকে (যিনি মামলা করেছেন) অবশ্যই আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে, অন্যের দ্বারা চেকটি পূরণের ক্ষেত্রে চেক দাতার স্পষ্ট অনুমতি বা সম্মতি ছিল। বাদী এই ব্যাখ্যার সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারলে মামলার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়।

৪. ফরেনসিক পরীক্ষা: আসামির মৌলিক অধিকার

অনেকেই ভাবেন, চেকে স্বাক্ষর যখন মিলে গেছে, তখন আর বাঁচার উপায় নেই। এটি ভুল ধারণা। সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী, চেকের লেখার বয়স এবং কালির ভিন্নতা পরীক্ষার জন্য সরকারি ফরেনসিক ল্যাবে (যেমন সিআইডি বা পিবিআই-এর হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞ) চেকটি পাঠানোর আবেদন করা আসামির আইনগত অধিকার।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের দু’টি বিখ্যাত সিদ্ধান্তত্ম কল্যাণী ভাস্কর বনাম এম.এস. সম্পূর্ণম (২০০৭) এবং টি. নাগাপ্পা (২০০৮) মামলায় বলা হয়েছে, আইনে বাদীর পক্ষে প্রাথমিক অনুমানের সুযোগ থাকলেও, আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ বা ন্যায়বিচারের অধিকার কেড়ে নেয়া যাবে না। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যদি প্রমাণ হয় যে স্বাক্ষরটি ৫ বছর আগের আর ভেতরের লেখাগুলো ২ মাস আগের তবে জালিয়াতি সহজেই ধরা পড়বে।

৫. সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার অপরাধ নয়

মহামান্য আপিল বিভাগের একটি লিডিং জাজমেন্ট হলো হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ (৭১ ডিএলআর (এডি))। এই মামলার মূল নীতি হলো কোনো ব্ল্যাঙ্ক চেক যদি শুধুমাত্র সিকিউরিটি বা জামানত হিসেবে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে পাওনাদার যদি নিজের ইচ্ছামতো বড় অঙ্ক বসিয়ে তার অপব্যবহার করে মামলা করে, তবে এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার অধীনে কোনো অপরাধ গঠিত হয় না।

শেষ কথা

আইন সচেতনতাই আইনি ফাঁদ থেকে বাঁচার প্রধান উপায়। কারো বিরুদ্ধে সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার করে মিথ্যা মামলা হলে, ভয় না পেয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে শুরুতেই চেকটি ফরেনসিক পরীক্ষার আবেদন করা উচিত এবং উচ্চ আদালতের এই চমৎকার নজিরগুলো যুক্তিতর্কের সময় উপস্থাপন করা উচিত। আইন যেমন অপরাধীকে সাজা দেয়, তেমনি কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যাতে জালিয়াতির শিকার না হন, তার সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।

সতর্কতা: যেকোনো আইনি লেনদেনে ব্ল্যাঙ্ক চেক দেয়া থেকে বিরত থাকুন। যদি দিতেই হয়, তবে চেকে ‘সিকিউরিটি চেক’ লিখে দিন এবং কোনো চুক্তির অধীনে দিচ্ছেন তা লিখিত আকারে রাখুন।

[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত