সংবাদ

সুশাসনের চাবিকাঠি: নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়, চাই নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ


মতিউর রহমান
মতিউর রহমান
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

সুশাসনের চাবিকাঠি: নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়, চাই নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ
রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিকরা যদি কেবল পাঁচ বছর পর পর ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আঙুলে কালির দাগ লাগিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করেন এবং বাকি সময়টা নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকেন, তবে পৃথিবীর কোনো সরকারের পক্ষেই একা সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়

আজকের পরিবর্তনশীল বিশ্বে ‘সুশাসন’ বা ‘গভর্ন্যান্স’ শব্দবন্ধটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যখনই কোনো রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা নিয়ে কথা ওঠে, তখনই অবধারিতভাবে সুশাসনের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আমরা সাধারণত সুশাসনকে পরিমাপ করি স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব, দক্ষ আমলাতন্ত্র, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং আইনের কঠোর শাসনের পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু এই পুরো সমীকরণ বা কাঠামোর ভেতরের সবচেয়ে প্রাণবন্ত এবং অপরিহার্য উপাদানটি প্রায়শই আমাদের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় উপেক্ষিত থেকে যায়; আর তা হলো সাধারণ নাগরিকের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। 

রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিকরা যদি কেবল পাঁচ বছর পর পর ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আঙুলে কালির দাগ লাগিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করেন এবং বাকি সময়টা নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকেন, তবে পৃথিবীর কোনো সরকারের পক্ষেই একা সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গণতন্ত্র বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তখনই সবচেয়ে কার্যকর হয়, যখন সাধারণ মানুষ জনজীবনে অংশ নেয়, প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ওপর কড়া নজর রাখে এবং নীতি নির্ধারণে নিজের কণ্ঠস্বরকে যুক্ত করে। নাগরিক সম্পৃক্ততা মূলত শাসনব্যবস্থাকে একটি ওপর-থেকে-নিচ প্রশাসনিক আদেশের বৃত্ত থেকে বের করে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার একটি দ্বিমুখী সহযোগিতামূলক সামাজিক চুক্তিতে রূপান্তরিত করে। 

নাগরিক সম্পৃক্ততার এই ধারণাটি কোনো আধুনিক বিলাসিতা নয়, এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত গভীর তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ফরাসি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অ্যালেক্সিস ডি টকভিল তার যুগান্তকারী ‘ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা’ গ্রন্থে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে আমেরিকার তৎকালীন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তির মূল উৎস ছিল সেখানকার মানুষের ছোট ছোট স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও নাগরিক সমিতি। নাগরিকরা যখন নিজেদের উদ্যোগে সংগঠিত হয়ে স্থানীয় সাধারণ সমস্যার সমাধান করতে শেখে, তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও যৌথ দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। টকভিলের মতে, এই সুশীল সমাজই মূলত ব্যক্তি এবং বিশাল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সংযোগকারী সেতু হিসেবে কাজ করে, যা স্বৈরতন্ত্রের উত্থানকে রোধ করে। 

আধুনিক সময়ে এই তত্ত্বকে আরও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট ডি. পুটনাম। তার বিখ্যাত ‘বোলিং অ্যালোন’ এবং ‘মেকিং ডেমোক্রেসি ওয়ার্ক’ গ্রন্থে তিনি ‘সামাজিক পুঁজি’ বা সোশ্যাল ক্যাপিটালের ধারণাটি প্রবর্তন করেন। পুটনামের কাজ দেখায় যে সমাজে পারস্পরিক আস্থা, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং নাগরিক অংশগ্রহণ যত বেশি, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তত বেশি কার্যকর এবং দুর্নীতি তত কম হয়, কারণ সচেতন নাগরিকরা সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করেন এবং ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। 

একইভাবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ এলিনর অস্ট্রম তার ‘গভর্নিং দ্য কমন্স’ গ্রন্থে রাষ্ট্র বা বাজারের বাইরে গিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সাধারণ মানুষ যখন কোনো জনসেবা বা সরকারি সম্পদের নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা না হয়ে এর সহ-উৎপাদক হিসেবে ভূমিকা রাখে, তখন সেই ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায়। 

সমসাময়িক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাই সহযোগিতামূলক শাসনের কোনো বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, জটিল নগর পরিকল্পনা কিংবা বৈশ্বিক মহামারির মতো সংকটগুলো কোনো সরকারের পক্ষে একা আমলাতান্ত্রিক ফাইল চালাচালি করে সমাধান করা সম্ভব নয়। ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নরওয়ের মতো নর্ডিক দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা এর বাস্তব প্রমাণ পাই। এই দেশগুলো বিশ্ব শাসন সূচকে এবং জনগণের আস্থার দিক থেকে প্রতিনিয়ত শীর্ষে অবস্থান করে। এর মূল রহস্য কেবল তাদের শক্তিশালী অর্থনীতি বা দক্ষ আমলাতন্ত্র নয়, বরং নীতিনির্ধারণের প্রতিটি স্তরে সাধারণ মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। 

একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল প্রযুক্তি নাগরিক সম্পৃক্ততার সুযোগকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ই-গভর্নেন্স প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন গণপরামর্শ, অংশগ্রহণমূলক বাজেট, ডিজিটাল পিটিশন এবং উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহের কারণে আজ ঘরে বসেই সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো জনমত গঠনের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এই প্রযুক্তির একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। ভুল তথ্যের অবাধ প্রবাহ, তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ডিজিটাল বিভাজন-অর্থাৎ প্রযুক্তির সুবিধার অসম বণ্টন নাগরিক অংশগ্রহণের গুণগত মানকে অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই প্রযুক্তিকে সুশাসনের হাতিয়ার করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত করা জরুরি। 

উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে নাগরিক সম্পৃক্ততার গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেশি। এসব দেশে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আইনের শাসনের ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষের পক্ষে সরকারি সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সামাজিক জবাবদিহিতার উদ্যোগগুলো দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও ওইসিডির বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার যেসব দেশে সাধারণ নাগরিকদের সামাজিক নিরীক্ষা, কমিউনিটি স্কোরকার্ড এবং অংশগ্রহণমূলক বাজেট প্রণয়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেখানে সরকারি ব্যয়ে অপচয় ও দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এটি স্থানীয় পর্যায়ে একচেটিয়া ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা রুখে দিতে সাহায্য করে। 

বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল সুশাসনের ক্ষেত্রে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে কিছু প্রশংসনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে। আইনগতভাবেই ইউনিয়ন পরিষদের উন্মুক্ত বাজেট সভা, ওয়ার্ড সভা এবং অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার বিধান রাখা হয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি এবং কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা দলগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সুশীল সমাজ, যুব সংগঠন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠী সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্যোগ মোকাবিলা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশ আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো থাকা সত্ত্বেও বাস্তব ক্ষেত্রে নাগরিক সম্পৃক্ততার গভীরতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। আমাদের দেশের শাসনব্যবস্থায় এখনও কিছু কাঠামোগত অন্তরায় বা চ্যালেঞ্জ প্রকটভাবে দৃশ্যমান। 

অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি গণপরামর্শ বা বাজেট সভাগুলো কেবল কাগজে-কলমে বা আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার জন্য করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিমালার মূল জায়গায় পরিবর্তন আনার নজির বেশ কম, যাকে বলা চলে প্রতীকী অংশগ্রহণ। এর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত তীব্র রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ভিন্নমতাবলম্বী বা সাধারণ নাগরিকদের একটি বড় অংশ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখে। তথ্য অধিকার আইন থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পৌঁছায় না এবং তথ্যের এই অসামঞ্জস্যতা নাগরিক তদারকিকে দুর্বল করে দেয়। সবচেয়ে বড় কথা, নারী, যুবসমাজ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর অনেক সময়ই এসব আনুষ্ঠানিক সভায় উপেক্ষিত থেকে যায়। 

এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই একটি সুশাসিত রাষ্ট্র গঠন করতে চাই, তবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত, সরকারকে নাগরিক সমালোচনা বা ভিন্নমতকে হুমকি হিসেবে না দেখে নীতি সংশোধনের একটি অত্যন্ত মূল্যবান এবং নিখরচায় পাওয়া উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রশাসন যখন নাগরিকদের উদ্বেগের প্রতি স্বচ্ছভাবে ও দ্রুত সাড়া দেবে, তখনই রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নাগরিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একজন নাগরিক যদি তার সাংবিধানিক অধিকার, রাষ্ট্রের প্রতি তার কর্তব্য এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে না জানেন, তবে তার পক্ষে গঠনমূলক অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রম থেকেই এই সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং অনুসন্ধিৎসু গণমাধ্যমই পারে প্রশাসনের ভেতরের ত্রুটিগুলো সামনে এনে নাগরিক সমাজকে সচেতন করতে এবং জনবিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করতে। 

নাগরিক অংশগ্রহণের সুফল কেবল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের গভীরের সংহতিকে শক্তিশালী করে। যেসব দেশে নাগরিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী, তারা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক ধাক্কা কিংবা জাতীয় সংকটে অনেক বেশি সহনশীলতা প্রদর্শন করে, কারণ সেখানে মানুষ সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে পারস্পরিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। একবিংশ শতাব্দীর এই জটিল সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো দেশের সুশাসনের মানদণ্ড কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে মাপা যাবে না। শাসনব্যবস্থা তখনই সফল হবে যখন রাষ্ট্র জনগণের কথা শুনবে, প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের প্রয়োজনে সাড়া দেবে এবং নাগরিকরা অধিকার আদায়ের পাশাপাশি দায়িত্বশীলভাবে রাষ্ট্রের চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। নিষ্ক্রিয় প্রজা নয়, বরং সচেতন ও সংগঠিত নাগরিক সমাজই হলো একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্থায়ী গণতান্ত্রিক সুশাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর। 

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬


সুশাসনের চাবিকাঠি: নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়, চাই নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬

featured Image

আজকের পরিবর্তনশীল বিশ্বে ‘সুশাসন’ বা ‘গভর্ন্যান্স’ শব্দবন্ধটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যখনই কোনো রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা নিয়ে কথা ওঠে, তখনই অবধারিতভাবে সুশাসনের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আমরা সাধারণত সুশাসনকে পরিমাপ করি স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব, দক্ষ আমলাতন্ত্র, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং আইনের কঠোর শাসনের পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু এই পুরো সমীকরণ বা কাঠামোর ভেতরের সবচেয়ে প্রাণবন্ত এবং অপরিহার্য উপাদানটি প্রায়শই আমাদের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় উপেক্ষিত থেকে যায়; আর তা হলো সাধারণ নাগরিকের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। 

রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিকরা যদি কেবল পাঁচ বছর পর পর ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আঙুলে কালির দাগ লাগিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করেন এবং বাকি সময়টা নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকেন, তবে পৃথিবীর কোনো সরকারের পক্ষেই একা সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গণতন্ত্র বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তখনই সবচেয়ে কার্যকর হয়, যখন সাধারণ মানুষ জনজীবনে অংশ নেয়, প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ওপর কড়া নজর রাখে এবং নীতি নির্ধারণে নিজের কণ্ঠস্বরকে যুক্ত করে। নাগরিক সম্পৃক্ততা মূলত শাসনব্যবস্থাকে একটি ওপর-থেকে-নিচ প্রশাসনিক আদেশের বৃত্ত থেকে বের করে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার একটি দ্বিমুখী সহযোগিতামূলক সামাজিক চুক্তিতে রূপান্তরিত করে। 

নাগরিক সম্পৃক্ততার এই ধারণাটি কোনো আধুনিক বিলাসিতা নয়, এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত গভীর তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ফরাসি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অ্যালেক্সিস ডি টকভিল তার যুগান্তকারী ‘ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা’ গ্রন্থে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে আমেরিকার তৎকালীন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তির মূল উৎস ছিল সেখানকার মানুষের ছোট ছোট স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও নাগরিক সমিতি। নাগরিকরা যখন নিজেদের উদ্যোগে সংগঠিত হয়ে স্থানীয় সাধারণ সমস্যার সমাধান করতে শেখে, তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও যৌথ দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। টকভিলের মতে, এই সুশীল সমাজই মূলত ব্যক্তি এবং বিশাল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সংযোগকারী সেতু হিসেবে কাজ করে, যা স্বৈরতন্ত্রের উত্থানকে রোধ করে। 

আধুনিক সময়ে এই তত্ত্বকে আরও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট ডি. পুটনাম। তার বিখ্যাত ‘বোলিং অ্যালোন’ এবং ‘মেকিং ডেমোক্রেসি ওয়ার্ক’ গ্রন্থে তিনি ‘সামাজিক পুঁজি’ বা সোশ্যাল ক্যাপিটালের ধারণাটি প্রবর্তন করেন। পুটনামের কাজ দেখায় যে সমাজে পারস্পরিক আস্থা, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং নাগরিক অংশগ্রহণ যত বেশি, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তত বেশি কার্যকর এবং দুর্নীতি তত কম হয়, কারণ সচেতন নাগরিকরা সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করেন এবং ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। 

একইভাবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ এলিনর অস্ট্রম তার ‘গভর্নিং দ্য কমন্স’ গ্রন্থে রাষ্ট্র বা বাজারের বাইরে গিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সাধারণ মানুষ যখন কোনো জনসেবা বা সরকারি সম্পদের নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা না হয়ে এর সহ-উৎপাদক হিসেবে ভূমিকা রাখে, তখন সেই ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায়। 

সমসাময়িক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাই সহযোগিতামূলক শাসনের কোনো বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, জটিল নগর পরিকল্পনা কিংবা বৈশ্বিক মহামারির মতো সংকটগুলো কোনো সরকারের পক্ষে একা আমলাতান্ত্রিক ফাইল চালাচালি করে সমাধান করা সম্ভব নয়। ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নরওয়ের মতো নর্ডিক দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা এর বাস্তব প্রমাণ পাই। এই দেশগুলো বিশ্ব শাসন সূচকে এবং জনগণের আস্থার দিক থেকে প্রতিনিয়ত শীর্ষে অবস্থান করে। এর মূল রহস্য কেবল তাদের শক্তিশালী অর্থনীতি বা দক্ষ আমলাতন্ত্র নয়, বরং নীতিনির্ধারণের প্রতিটি স্তরে সাধারণ মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। 

একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল প্রযুক্তি নাগরিক সম্পৃক্ততার সুযোগকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ই-গভর্নেন্স প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন গণপরামর্শ, অংশগ্রহণমূলক বাজেট, ডিজিটাল পিটিশন এবং উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহের কারণে আজ ঘরে বসেই সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো জনমত গঠনের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এই প্রযুক্তির একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। ভুল তথ্যের অবাধ প্রবাহ, তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ডিজিটাল বিভাজন-অর্থাৎ প্রযুক্তির সুবিধার অসম বণ্টন নাগরিক অংশগ্রহণের গুণগত মানকে অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই প্রযুক্তিকে সুশাসনের হাতিয়ার করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত করা জরুরি। 

উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে নাগরিক সম্পৃক্ততার গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেশি। এসব দেশে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আইনের শাসনের ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষের পক্ষে সরকারি সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সামাজিক জবাবদিহিতার উদ্যোগগুলো দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও ওইসিডির বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার যেসব দেশে সাধারণ নাগরিকদের সামাজিক নিরীক্ষা, কমিউনিটি স্কোরকার্ড এবং অংশগ্রহণমূলক বাজেট প্রণয়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেখানে সরকারি ব্যয়ে অপচয় ও দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এটি স্থানীয় পর্যায়ে একচেটিয়া ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা রুখে দিতে সাহায্য করে। 

বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল সুশাসনের ক্ষেত্রে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে কিছু প্রশংসনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে। আইনগতভাবেই ইউনিয়ন পরিষদের উন্মুক্ত বাজেট সভা, ওয়ার্ড সভা এবং অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার বিধান রাখা হয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি এবং কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা দলগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সুশীল সমাজ, যুব সংগঠন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠী সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্যোগ মোকাবিলা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশ আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো থাকা সত্ত্বেও বাস্তব ক্ষেত্রে নাগরিক সম্পৃক্ততার গভীরতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। আমাদের দেশের শাসনব্যবস্থায় এখনও কিছু কাঠামোগত অন্তরায় বা চ্যালেঞ্জ প্রকটভাবে দৃশ্যমান। 

অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি গণপরামর্শ বা বাজেট সভাগুলো কেবল কাগজে-কলমে বা আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার জন্য করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিমালার মূল জায়গায় পরিবর্তন আনার নজির বেশ কম, যাকে বলা চলে প্রতীকী অংশগ্রহণ। এর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত তীব্র রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ভিন্নমতাবলম্বী বা সাধারণ নাগরিকদের একটি বড় অংশ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখে। তথ্য অধিকার আইন থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পৌঁছায় না এবং তথ্যের এই অসামঞ্জস্যতা নাগরিক তদারকিকে দুর্বল করে দেয়। সবচেয়ে বড় কথা, নারী, যুবসমাজ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর অনেক সময়ই এসব আনুষ্ঠানিক সভায় উপেক্ষিত থেকে যায়। 

এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই একটি সুশাসিত রাষ্ট্র গঠন করতে চাই, তবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত, সরকারকে নাগরিক সমালোচনা বা ভিন্নমতকে হুমকি হিসেবে না দেখে নীতি সংশোধনের একটি অত্যন্ত মূল্যবান এবং নিখরচায় পাওয়া উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রশাসন যখন নাগরিকদের উদ্বেগের প্রতি স্বচ্ছভাবে ও দ্রুত সাড়া দেবে, তখনই রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নাগরিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একজন নাগরিক যদি তার সাংবিধানিক অধিকার, রাষ্ট্রের প্রতি তার কর্তব্য এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে না জানেন, তবে তার পক্ষে গঠনমূলক অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রম থেকেই এই সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং অনুসন্ধিৎসু গণমাধ্যমই পারে প্রশাসনের ভেতরের ত্রুটিগুলো সামনে এনে নাগরিক সমাজকে সচেতন করতে এবং জনবিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করতে। 

নাগরিক অংশগ্রহণের সুফল কেবল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের গভীরের সংহতিকে শক্তিশালী করে। যেসব দেশে নাগরিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী, তারা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক ধাক্কা কিংবা জাতীয় সংকটে অনেক বেশি সহনশীলতা প্রদর্শন করে, কারণ সেখানে মানুষ সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে পারস্পরিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। একবিংশ শতাব্দীর এই জটিল সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো দেশের সুশাসনের মানদণ্ড কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে মাপা যাবে না। শাসনব্যবস্থা তখনই সফল হবে যখন রাষ্ট্র জনগণের কথা শুনবে, প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের প্রয়োজনে সাড়া দেবে এবং নাগরিকরা অধিকার আদায়ের পাশাপাশি দায়িত্বশীলভাবে রাষ্ট্রের চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। নিষ্ক্রিয় প্রজা নয়, বরং সচেতন ও সংগঠিত নাগরিক সমাজই হলো একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্থায়ী গণতান্ত্রিক সুশাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর। 

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত