ওকে
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আট
মনসুর
পাগলাকে পুলিশে নিয়ে যাওয়ার পর
কমলা খাতুন সেই যে ঘরে
দাওয়ায় একটা চৌকাঠে হেলান
দিয়ে বসেছে, আর ওঠার নাম
নেয়নি| এদিকে বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে| বিকেলের রোদটা পশ্চিমের ভেরেণ্ডা গাছের পাতার ফাঁক গলে দিঘল
উঠোনে হেলান দিয়ে পড়েছে| ভেরেণ্ডা
পাতার কাঁপুনিতে রোদটাও কাঁপছে| একটা লাল মুরগি
কয়েকটা ছা নিয়ে সেই
দিঘল রোদ ধরে হাঁটছে|
ছানাগুলোর সমস্বরে ডাক— কিচ কিচ,
চিক চিক| মুরগিটা মাঝেমধ্যে
ছানাগুলোর ডাকে সাড়া দিচ্ছে—
কিক কিক, কিক কিক|
কোনো একটা গাছ থেকে
একটা ঘুঘু ডাকছে— কুরু
কুরু, কুরু কুরু| পশ্চিমের
কোনো এক বাড়ি থেকে
গরুর ডাক আসছে— হাম্বা-অ-অ, হাম্বা-অ-অ|
কতক্ষণ
আগে বিভিন্ন বাড়ি থেকে সেসব
বউঝিয়ারিরা এসেছিল, ওরা যার যার
বাড়িতে চলে গেছে| মমিনা
অবশ্য একটু পরপর আসা-যাওয়া করছে| কিছু ন্যাংটো ছেলেমেয়ে
গোপাটের ধারে বুইদ্দার খালের
জলে লাফিয়ে পড়ছে| কিছু ছেলেমেয়ে আবার
ওদের তামাশা দেখছে| মমিনার বাপ কেরামত আলী
নৌকা নিয়ে জাল বাঁধার
জন্য নাইলনের সুতা আনতে মীরবহরি
বাজারে গিয়েছিল| তার পাঁচটা টানা
জালের মধ্যে দুটোই স্থানে স্থানে ছিঁড়ে গেছে| এরই মধ্যে পুলিশ
বাড়িতে এসে মনসুর পাগলাকে
থানায় ধরে নিয়ে গেছে,
সেটা সে জানত না|
বাড়িতে এসে জেনে সে
তো খুবই ক্ষুব্ধ| মনসুর
পাগলার সঙ্গে সেতারা বেগমের লাশটা নিয়ে গেছে, এতেও
সে ক্ষুণ্ন| সে রাগে ঘড়ঘড়
করতে বলে, ‘এত বড় কথা,
ব্যাপারি বাড়িতে ছালেক মেম্বর পুলিশ ডাইকা আনছে? ব্যাপারির পোলারে পুলিশ দিয়া ধইরা লইয়া
গেছে? এই ছালেক মেম্বরের
একসময় নাক টিপলে দুধ
বাইর হইত| তার বাপ-চাচারা একসময় ভাইজানের আড়তে কামলা দিত|
হের এমন বাড়! মেম্বরি
পাস কইরা যেন লাটে
উইঠা গেছে...!’
কেরামত
আলী জোর আশ্বাস দিয়ে
গেছে, আগামীকাল সে থানায় গিয়ে
মনসুর পাগলার জন্য কোনো একটা
ব্যবস্থা করবে| এমনও বলে গেছে,
আজ রাতেই সে পশ্চিমপাড়ায় ছালেক
মেম্বরের বাড়িতে যাবে| একটা রফাদফা আগামীকালের
মধ্যেই হয়ে যাবে| কিন্তু
কমলা খাতুন জানে, কেরামত আলী এর কিছুই
করবে না| আগামীকাল অত
দূর সেই থানায় যাবে
দূরের কথা, আজ রাতে
সে এই উত্তরপাড়ায় গিয়ে
ছালেক মেম্বরের সঙ্গেই দেখা করতে যাবে
না| সে বরং খুশি
যে মনসুর পাগলাকে পুলিশে নিয়ে গেছে| মনসুর
পাগলা মরলে যেন সে
আরও খুশি হবে| এই
পুরো বাড়িটা, বুইদ্দার বিলের সব সম্পত্তি ও
পুকুরের অংশ সে দখল
করতে পারবে|
কমলা
খাতুন নিশ্চিত, কেরামত আলী বাড়িতে পা
দিয়েই মনসুরের চিন্তা মাথা থেকে দূর
করে দিয়েছে| এখন নিশ্চয়ই সে
পা ছড়িয়ে জাল বাঁধতে বসেছে|
আর গুনগুন করে গান ধরেছে,
‘গুপিজনা ময়নার মা’গো, কইলে
বিশ্বাস করবা না তো,
গরু কাইট্যা বেড়া নিল চোরে...|’
কেরামত আলীর দীর্ঘদিনের অভ্যাস,
নৌকা নিয়ে সন্ধ্যায় বুইদ্দার
বিলে টানা জাল পাতা|
মাছ জালে আটকা পড়ুক
আর না-ই পড়ুক,
সে বর্ষার মওসুমে টানা জাল পাতবেই|
কমলা
খাতুন দিঘল দৃষ্টি মেলে
আবার উঠোনে তাকাল| উঠোনের রোদটা আরেকটু হেলে পড়েছে| ফাঁকা
উঠোনের উত্তরপাশে একটা রশিতে মনসুর
পাগলার একটা বোতাম ছাড়া
শার্ট ঝুলছে| আর ঝুলছে সেতারা
বেগমের খয়েরি সায়া| এই কাপড় দুটো
রশিতে ঝুলছে গত দু’দিন
ধরেই, ঘরে আনার মানুষ
নেই| সে নিজেও আনছে
না|
প্রায়
তিন যুগ আগে এই
বাড়িতে বউ হয়ে আসার
পর প্রথম কয়েক বছর বাদে
তার মধ্যে সেই যে একটা
নির্মোহতা এসে বাসা বেঁধেছে,
সেটা ক্রমে ক্রমে তার মনের ভেতর
গভীর থেকে আরও গভীরতর
হয়ে সেঁটে গেছে| প্রথমে স্বামী আসমত আলী ব্যাপারির
জন্য নির্মোহতা বাসা বাঁধে| এরপর
ছেলে মনসুর পাগলার জন্য| আসমত আলীর ব্যাপারির
বিষয়টা গত হয়েছে কুড়ি
বছর আগে| কিন্তু তার
ছেলে মনসুর পাগলা?
কমলা
খাতুন নিজে নিজে মাথা
ঝাঁকাল| ছেলের জন্য তার সত্যি
পরাণ টানে| একটা মাত্র ছেলে|
সে একা কত কাঁদে!
কিছু কিছু কান্না বাইরের
মানুষ বোঝে না, শুধুমাত্র
যে কাঁদে সে-ই বোঝে|
তার কান্নাটা সেরকমই| মনসুর পাগলা তার সঙ্গে কখনও
ভালো ব্যবহারটা করে দেখেনি| দেখলেই
কেমন রাগে ঘড়ঘড় করে|
তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলে|
কয়েকবার গায়েও হাত তুলেছে| ছেলের
এহেন ব্যবহার সহ্য করে আসছে
গত কুড়ি বছর ধরে,
ছেলের বয়স যখন দশ
বছর তখন থেকেই|
কমলা
খাতুন গোপাটের দিকে আবার তাকাল|
এখন গোপাটটাও ফাঁকা হয়ে গেছে| ন্যাংটো
ছেলেমেয়েরা কিছুক্ষণ বুইদ্দার খালে ডুব সাঁতার
দিয়ে তাদের মা’দের তাড়া
খেয়ে যার যার বাড়ি
চলে গেছে| এমনিতে বাড়িটা তো ফাঁকাই| এমন
ফাঁকা বাড়ি যে কমলা
খাতুন আগে এমন করে
পায়নি, তা নয়| এই
বাড়িতে তিন যুগ আগে
সে বউ হয়ে আসে|
বাড়িতে শাশুড়ি ছিল না| তার
বিয়ের আগেই মারা যায়|
একটা দেবর আর শ্বশুর
ছিল| শ্বশুর মারা যায় তার
বিয়ের দুই বছরের মাথায়|
দেবর কেরামত আলী বিয়ে করে
এর পরপরই| দেবরের বউ ছেনোয়ার বেগমের
সঙ্গে বছরখানেক মিলেমিশে থাকতে পারলেও পরে একটার পর
একটা অমিল দেখা দেয়|
কমলা খাতুন একটু চুপচাপ ধরনের
মহিলা, কিন্তু ছেনোয়ারা বেগম তার পুরো
উল্টো| খুব মুখরা| ফলে
একদিন বড়ভাই আসমত আলী ব্যাপারি
ও ছোটভাই কেরামত আলী বোঝাপড়ার মাধ্যমে
বাড়ি ভাগ করে| আসমত
আলী ব্যাপারি মূল বাড়িতে থেকে
যায়| আর কেরামত আলী
বাড়ির দক্ষিণে, দিঘল পুকুরের পশ্চিম
অংশ নিয়ে আলাদা বাড়ি
করে|
তারপর
থেকেই এই বাড়িতে কমলা
খাতুনের প্রায়শ একা থাকা শুরু|
স্বামী আসমত আলী ব্যাপারির
ছিল মীরবহরি বাজারে চালের আড়ত| স্বামী বর্ষার
মওসুমে চাল বোঝাই বড়
নৌকা নিয়ে চলে যেত
দূরের গঞ্জে ও শহরে| মাঝেমধ্যে
এক-দেড় মাস বাড়ি
ফিরত না| ছেলে মনসুরের
জন্ম হওয়ার পর বাড়িতে তার
একাকীত্ব খানিকটা কাটে| ছেলেটা বেড়ে ওঠে|
কিন্তু
মনসুরের বয়স যখন দশ,
একরাতে স্বামী আসমত আলী ব্যাপারি
খুন হয়| সেরাতে গোমতীর
ভরাট ঢেউয়ের বান ছিল| উত্তরের
জোয়ারের জল ছিল প্রতিটা
বাড়ির উঠোন ছুঁইছুঁই| পরদিন
সকালে আঁধারিয়া গ্রামের মানুষ মাছ ধরতে গিয়ে
বুইদ্দার খালের মুখে আসমত আলী
ব্যাপারির লোহাকাঠের নৌকাটা পায়| নৌকার স্থানে
স্থানে জমাট রক্তের ছাপ|
আসমত আলী ব্যাপারির বজরার
মতো যে নৌকাটা ছিল,
সেটা দেখতে পায় মীরবহরি বাজারের
ঘাটে| তখনই গ্রামে চাউর
হয়ে যায়, আসমত আলী
ব্যাপারি নাকি মীরবহরি বাজারে
নৌকা রেখে টাকা ভরতি
খুলতি নিয়ে বাড়ি ফিরতে
গিয়ে গোমতী ও বুইদ্দার খালের
মুখ ডাকাতের কবলে পড়ে| ডাকাত
নাকি আগে থেকে ওঁত
পেতে ছিল|
আসমত
আলী ব্যাপারি যে খুন হয়েছে,
সেটা একটা কথার কথা|
কেউ তার লাশ খুঁজে
পায়নি| একদিন, দুইদিন, তিনদিন, ˆথথৈ বুইদ্দার বিলে,
ভরাট গোমতী নদীতে, উত্তরের জোয়ারে ভেসে যাওয়া বুইদ্দার
খালে, কোথাও লাশ খুঁজে না
পেয়ে গ্রামের সবাই নিশ্চিত হয়,
আসমত আলী ব্যাপারির লাশ
হয় বোয়াল মাছে খেয়ে ফেলেছে,
না হয় ভাসতে ভাসতে
মেঘনায় চলে গেছে| আঁধারিয়া,
ছল্লাকান্দি, মোল্লাকান্দি ও মীরবহরি সহ
এই ভাটি অঞ্চলের বিভিন্ন
গ্রাম থেকে বহুজনের লাশই
তো ডাকাতের কবলে পড়ে গোমতী
নদী ধরে ভেসে মেঘনায়
চলে গেছে! কিন্তু সবার মনে সেদিন
একটা ব্যাপার খটকা লাগে, ডাকাতরা
ডাকাতি করে আসমত আলী
ব্যাপারির সঙ্গে থাকা সব টাকাপয়সা
নিয়ে গেলেও নৌকাটা কেন নেয়নি? লোহাকাঠের
নৌকা| তিনদিন পর গ্রামে পুলিশ
আসে| মোল্লাকান্দি ও মীরবহরির তিনজনকে
ডাকাত সন্দেহে ধরে নিয়ে যায়|
থানায় নিয়ে পুলিশ অনেক
চেষ্টা করেও সেই তিনজনের
কাছ থেকে আসমত আলী
ব্যাপারির খুনের বিষয়ে কোনো সঠিক তথ্য
পায়নি| পরে ওরা আদালতের
মাধ্যমে ছাড়া পেয়ে যায়|
তারপর
কুড়ি বছর| আজও আসমত
আলী ব্যাপারির লাশ কেউ খুঁজে
পায়নি| কিন্তু আসমত আলী ব্যাপারির
লাশ গ্রামবাসী কেউ খুঁজে না
পেলেও কমলা খাতুন যে
কখনও স্বামীর জন্য অপেক্ষায় ছিল,
তা নয়| সে আসল
সত্যটা জানত| তাকে বাদে আরেকজন
এই আসল সত্যটা জানত,
সেটা সুন্দর ভুঁইয়া| আর মনসুর পাগলারও
কেন জানি সেই থেকে
মাথায় ছিট ধরা পড়ে|
কমলা
খাতুনের মাঝেমধ্যে সন্দেহ জাগে, তার ছেলে কি
সেই আসল সত্যটা জানে?
কিন্তু সেটা সে জানবে
কীভাবে? আর যদি না
জানে, তাহলে তার মাথায় হঠাৎ
করে ছিট ধরা পড়ে
পাগল হলো কেন?
মমিনা
এক হাতে ভাতের থালা,
অন্যহাতে টাকি মাছের ঝুলের
বাটি নিয়ে ঘরের দাওয়ার
আরেকটা পাটাতনে বসতে বসতে বলল,
‘ও বড়চাচি, এত কী চিন্তা
করতাছ?’
মমিনা
পিছদোর ধরে ঘরের সামনের
দরজায় এসেছে বলে কমলা খাতুন
তাকে খেয়াল করেনি| সে কিছুটা চমকে
উঠল| পরক্ষণই সামলে নিয়ে বলল, ‘ও,
তুই?’
মমিনা
বলল, ‘হ, আর কেডা
হইব? ভাইজানের লাইগা তুমি চিন্তা করতাছ?
হের লাইগা এত চিন্তা কইর
না| সব ঠিক হইয়া
যাইব| দেখবা দুইদিন পরই ভাইজান ছাড়া
পাইয়া গেছে| হেয় তো কোনো
অন্যায় করে নাই|’
কমলা
খাতুন এ ব্যাপারে কিছু
বলল না| সে মমিনার
হাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস
করল, ‘তোর হাতে এইগুলা
কী?’
মমিনা
বলল, ‘তোমার লাইগা ভাত আনছি| মা
পাঠাইছে|’
‘তোর
মা পাঠাইছে?’
‘হ,
বড়চাচি|’
‘মমিনা,
তুই মিছা কথা কস
ক্যান? তোর মা’য়
নিশ্চয়ই বাড়িত নাই| এই সুযোগে
তুই আমার লাইগা ভাত-ছালুন লইয়া আইছস?
মমিনা
একটু হেসে ফেলল| লজ্জার
হাসি| বলল, ‘হ, বড়চাচি| মা
পান খাইতে পশ্চিমের ইশায় গেছে| তুমি
বিহানবেলা থাইকা কিচ্ছু খাও নাই| তাই
লইয়া আইছি|’
কমলা
খাতুন কিছু বলল না|
মমিনা
আবার ভাতের থালাটা বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
‘বড়চাচি, তুমি না খাইলে
যে পইড়া যাইবা| এমনিতেই
তোমার শরীলে বারো রকমের অসুখ|’
কমলা
খাতুন এবার হাত বাড়িয়ে
থালাটা নিল| টাকি মাছের
ঝুল দেখে সে খুশিই
হলো| তার সত্যি খুব
ক্ষুধা লেগেছে| সেই সকালে একমুঠো
মুড়ি মুখে দিয়েছিল| এখন
প্রায় বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে|
ভাতের
সঙ্গে টাকি মাছের ঝুল
ঢেলে কয়চ-কয়চ করে
মাখতে মাখতে কমলা খাতুন মমিনার
দিকে নরম দৃষ্টিতে তাকাল|
কেরামত আলীর চার ছেলেমেয়ের
মধ্যে ছোট মেয়ে মমিনা
আলাদা| সবসময় এই ইশায় আসে|
বড়চাচি বলে আহলাদ করে
ডাকে| সময়-সময় তার
খোঁজখবর নেয়| বেশ ডাঙর
হয়ে উঠেছে| বিয়ের কাজ আসছে বেশ|
এরই মধ্যে একটা বিয়ে প্রায়
পাকাপোক্ত হয়ে আছে| গোমতীর
খানিকটা উজানে হোসেনপুর গ্রামে পাত্রের বাড়ি| পাত্রের একটা স্টেশনারির দোকান
আছে হোসেনপুর বাজারে| একটা চৌচালা ঘরও
নাকি আছে| মমিনা বেশ
সুন্দর বলে পাত্রপক্ষ তেমন
কিছু চায় না|
কমলা
খাতুন ভাবল, মমিনার বিয়ে হয়ে গেলে
সে আরও একা হয়ে
যাবে| অবশ্য একাকীত্ব জীবন নিয়ে তার
যে খুব একটা চিন্তা
আছে, তা নয়| সারাজীবনই
তো সে একাকীত্বকে সঙ্গী
করেছে| তার একাকীত্ব যেন
জিয়ল গাছের আঠা| সেই আঠায়
আটকে সুন্দর ভুঁইয়া নামের একজনকে নিয়ে সেই যে
যুবতীকালে স্তব্ধ হয়ে গেছে, তারপর
তার কুল গেছে, কালও
গেছে| ক্রমশ...
***

বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬
ওকে
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আট
মনসুর
পাগলাকে পুলিশে নিয়ে যাওয়ার পর
কমলা খাতুন সেই যে ঘরে
দাওয়ায় একটা চৌকাঠে হেলান
দিয়ে বসেছে, আর ওঠার নাম
নেয়নি| এদিকে বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে| বিকেলের রোদটা পশ্চিমের ভেরেণ্ডা গাছের পাতার ফাঁক গলে দিঘল
উঠোনে হেলান দিয়ে পড়েছে| ভেরেণ্ডা
পাতার কাঁপুনিতে রোদটাও কাঁপছে| একটা লাল মুরগি
কয়েকটা ছা নিয়ে সেই
দিঘল রোদ ধরে হাঁটছে|
ছানাগুলোর সমস্বরে ডাক— কিচ কিচ,
চিক চিক| মুরগিটা মাঝেমধ্যে
ছানাগুলোর ডাকে সাড়া দিচ্ছে—
কিক কিক, কিক কিক|
কোনো একটা গাছ থেকে
একটা ঘুঘু ডাকছে— কুরু
কুরু, কুরু কুরু| পশ্চিমের
কোনো এক বাড়ি থেকে
গরুর ডাক আসছে— হাম্বা-অ-অ, হাম্বা-অ-অ|
কতক্ষণ
আগে বিভিন্ন বাড়ি থেকে সেসব
বউঝিয়ারিরা এসেছিল, ওরা যার যার
বাড়িতে চলে গেছে| মমিনা
অবশ্য একটু পরপর আসা-যাওয়া করছে| কিছু ন্যাংটো ছেলেমেয়ে
গোপাটের ধারে বুইদ্দার খালের
জলে লাফিয়ে পড়ছে| কিছু ছেলেমেয়ে আবার
ওদের তামাশা দেখছে| মমিনার বাপ কেরামত আলী
নৌকা নিয়ে জাল বাঁধার
জন্য নাইলনের সুতা আনতে মীরবহরি
বাজারে গিয়েছিল| তার পাঁচটা টানা
জালের মধ্যে দুটোই স্থানে স্থানে ছিঁড়ে গেছে| এরই মধ্যে পুলিশ
বাড়িতে এসে মনসুর পাগলাকে
থানায় ধরে নিয়ে গেছে,
সেটা সে জানত না|
বাড়িতে এসে জেনে সে
তো খুবই ক্ষুব্ধ| মনসুর
পাগলার সঙ্গে সেতারা বেগমের লাশটা নিয়ে গেছে, এতেও
সে ক্ষুণ্ন| সে রাগে ঘড়ঘড়
করতে বলে, ‘এত বড় কথা,
ব্যাপারি বাড়িতে ছালেক মেম্বর পুলিশ ডাইকা আনছে? ব্যাপারির পোলারে পুলিশ দিয়া ধইরা লইয়া
গেছে? এই ছালেক মেম্বরের
একসময় নাক টিপলে দুধ
বাইর হইত| তার বাপ-চাচারা একসময় ভাইজানের আড়তে কামলা দিত|
হের এমন বাড়! মেম্বরি
পাস কইরা যেন লাটে
উইঠা গেছে...!’
কেরামত
আলী জোর আশ্বাস দিয়ে
গেছে, আগামীকাল সে থানায় গিয়ে
মনসুর পাগলার জন্য কোনো একটা
ব্যবস্থা করবে| এমনও বলে গেছে,
আজ রাতেই সে পশ্চিমপাড়ায় ছালেক
মেম্বরের বাড়িতে যাবে| একটা রফাদফা আগামীকালের
মধ্যেই হয়ে যাবে| কিন্তু
কমলা খাতুন জানে, কেরামত আলী এর কিছুই
করবে না| আগামীকাল অত
দূর সেই থানায় যাবে
দূরের কথা, আজ রাতে
সে এই উত্তরপাড়ায় গিয়ে
ছালেক মেম্বরের সঙ্গেই দেখা করতে যাবে
না| সে বরং খুশি
যে মনসুর পাগলাকে পুলিশে নিয়ে গেছে| মনসুর
পাগলা মরলে যেন সে
আরও খুশি হবে| এই
পুরো বাড়িটা, বুইদ্দার বিলের সব সম্পত্তি ও
পুকুরের অংশ সে দখল
করতে পারবে|
কমলা
খাতুন নিশ্চিত, কেরামত আলী বাড়িতে পা
দিয়েই মনসুরের চিন্তা মাথা থেকে দূর
করে দিয়েছে| এখন নিশ্চয়ই সে
পা ছড়িয়ে জাল বাঁধতে বসেছে|
আর গুনগুন করে গান ধরেছে,
‘গুপিজনা ময়নার মা’গো, কইলে
বিশ্বাস করবা না তো,
গরু কাইট্যা বেড়া নিল চোরে...|’
কেরামত আলীর দীর্ঘদিনের অভ্যাস,
নৌকা নিয়ে সন্ধ্যায় বুইদ্দার
বিলে টানা জাল পাতা|
মাছ জালে আটকা পড়ুক
আর না-ই পড়ুক,
সে বর্ষার মওসুমে টানা জাল পাতবেই|
কমলা
খাতুন দিঘল দৃষ্টি মেলে
আবার উঠোনে তাকাল| উঠোনের রোদটা আরেকটু হেলে পড়েছে| ফাঁকা
উঠোনের উত্তরপাশে একটা রশিতে মনসুর
পাগলার একটা বোতাম ছাড়া
শার্ট ঝুলছে| আর ঝুলছে সেতারা
বেগমের খয়েরি সায়া| এই কাপড় দুটো
রশিতে ঝুলছে গত দু’দিন
ধরেই, ঘরে আনার মানুষ
নেই| সে নিজেও আনছে
না|
প্রায়
তিন যুগ আগে এই
বাড়িতে বউ হয়ে আসার
পর প্রথম কয়েক বছর বাদে
তার মধ্যে সেই যে একটা
নির্মোহতা এসে বাসা বেঁধেছে,
সেটা ক্রমে ক্রমে তার মনের ভেতর
গভীর থেকে আরও গভীরতর
হয়ে সেঁটে গেছে| প্রথমে স্বামী আসমত আলী ব্যাপারির
জন্য নির্মোহতা বাসা বাঁধে| এরপর
ছেলে মনসুর পাগলার জন্য| আসমত আলীর ব্যাপারির
বিষয়টা গত হয়েছে কুড়ি
বছর আগে| কিন্তু তার
ছেলে মনসুর পাগলা?
কমলা
খাতুন নিজে নিজে মাথা
ঝাঁকাল| ছেলের জন্য তার সত্যি
পরাণ টানে| একটা মাত্র ছেলে|
সে একা কত কাঁদে!
কিছু কিছু কান্না বাইরের
মানুষ বোঝে না, শুধুমাত্র
যে কাঁদে সে-ই বোঝে|
তার কান্নাটা সেরকমই| মনসুর পাগলা তার সঙ্গে কখনও
ভালো ব্যবহারটা করে দেখেনি| দেখলেই
কেমন রাগে ঘড়ঘড় করে|
তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলে|
কয়েকবার গায়েও হাত তুলেছে| ছেলের
এহেন ব্যবহার সহ্য করে আসছে
গত কুড়ি বছর ধরে,
ছেলের বয়স যখন দশ
বছর তখন থেকেই|
কমলা
খাতুন গোপাটের দিকে আবার তাকাল|
এখন গোপাটটাও ফাঁকা হয়ে গেছে| ন্যাংটো
ছেলেমেয়েরা কিছুক্ষণ বুইদ্দার খালে ডুব সাঁতার
দিয়ে তাদের মা’দের তাড়া
খেয়ে যার যার বাড়ি
চলে গেছে| এমনিতে বাড়িটা তো ফাঁকাই| এমন
ফাঁকা বাড়ি যে কমলা
খাতুন আগে এমন করে
পায়নি, তা নয়| এই
বাড়িতে তিন যুগ আগে
সে বউ হয়ে আসে|
বাড়িতে শাশুড়ি ছিল না| তার
বিয়ের আগেই মারা যায়|
একটা দেবর আর শ্বশুর
ছিল| শ্বশুর মারা যায় তার
বিয়ের দুই বছরের মাথায়|
দেবর কেরামত আলী বিয়ে করে
এর পরপরই| দেবরের বউ ছেনোয়ার বেগমের
সঙ্গে বছরখানেক মিলেমিশে থাকতে পারলেও পরে একটার পর
একটা অমিল দেখা দেয়|
কমলা খাতুন একটু চুপচাপ ধরনের
মহিলা, কিন্তু ছেনোয়ারা বেগম তার পুরো
উল্টো| খুব মুখরা| ফলে
একদিন বড়ভাই আসমত আলী ব্যাপারি
ও ছোটভাই কেরামত আলী বোঝাপড়ার মাধ্যমে
বাড়ি ভাগ করে| আসমত
আলী ব্যাপারি মূল বাড়িতে থেকে
যায়| আর কেরামত আলী
বাড়ির দক্ষিণে, দিঘল পুকুরের পশ্চিম
অংশ নিয়ে আলাদা বাড়ি
করে|
তারপর
থেকেই এই বাড়িতে কমলা
খাতুনের প্রায়শ একা থাকা শুরু|
স্বামী আসমত আলী ব্যাপারির
ছিল মীরবহরি বাজারে চালের আড়ত| স্বামী বর্ষার
মওসুমে চাল বোঝাই বড়
নৌকা নিয়ে চলে যেত
দূরের গঞ্জে ও শহরে| মাঝেমধ্যে
এক-দেড় মাস বাড়ি
ফিরত না| ছেলে মনসুরের
জন্ম হওয়ার পর বাড়িতে তার
একাকীত্ব খানিকটা কাটে| ছেলেটা বেড়ে ওঠে|
কিন্তু
মনসুরের বয়স যখন দশ,
একরাতে স্বামী আসমত আলী ব্যাপারি
খুন হয়| সেরাতে গোমতীর
ভরাট ঢেউয়ের বান ছিল| উত্তরের
জোয়ারের জল ছিল প্রতিটা
বাড়ির উঠোন ছুঁইছুঁই| পরদিন
সকালে আঁধারিয়া গ্রামের মানুষ মাছ ধরতে গিয়ে
বুইদ্দার খালের মুখে আসমত আলী
ব্যাপারির লোহাকাঠের নৌকাটা পায়| নৌকার স্থানে
স্থানে জমাট রক্তের ছাপ|
আসমত আলী ব্যাপারির বজরার
মতো যে নৌকাটা ছিল,
সেটা দেখতে পায় মীরবহরি বাজারের
ঘাটে| তখনই গ্রামে চাউর
হয়ে যায়, আসমত আলী
ব্যাপারি নাকি মীরবহরি বাজারে
নৌকা রেখে টাকা ভরতি
খুলতি নিয়ে বাড়ি ফিরতে
গিয়ে গোমতী ও বুইদ্দার খালের
মুখ ডাকাতের কবলে পড়ে| ডাকাত
নাকি আগে থেকে ওঁত
পেতে ছিল|
আসমত
আলী ব্যাপারি যে খুন হয়েছে,
সেটা একটা কথার কথা|
কেউ তার লাশ খুঁজে
পায়নি| একদিন, দুইদিন, তিনদিন, ˆথথৈ বুইদ্দার বিলে,
ভরাট গোমতী নদীতে, উত্তরের জোয়ারে ভেসে যাওয়া বুইদ্দার
খালে, কোথাও লাশ খুঁজে না
পেয়ে গ্রামের সবাই নিশ্চিত হয়,
আসমত আলী ব্যাপারির লাশ
হয় বোয়াল মাছে খেয়ে ফেলেছে,
না হয় ভাসতে ভাসতে
মেঘনায় চলে গেছে| আঁধারিয়া,
ছল্লাকান্দি, মোল্লাকান্দি ও মীরবহরি সহ
এই ভাটি অঞ্চলের বিভিন্ন
গ্রাম থেকে বহুজনের লাশই
তো ডাকাতের কবলে পড়ে গোমতী
নদী ধরে ভেসে মেঘনায়
চলে গেছে! কিন্তু সবার মনে সেদিন
একটা ব্যাপার খটকা লাগে, ডাকাতরা
ডাকাতি করে আসমত আলী
ব্যাপারির সঙ্গে থাকা সব টাকাপয়সা
নিয়ে গেলেও নৌকাটা কেন নেয়নি? লোহাকাঠের
নৌকা| তিনদিন পর গ্রামে পুলিশ
আসে| মোল্লাকান্দি ও মীরবহরির তিনজনকে
ডাকাত সন্দেহে ধরে নিয়ে যায়|
থানায় নিয়ে পুলিশ অনেক
চেষ্টা করেও সেই তিনজনের
কাছ থেকে আসমত আলী
ব্যাপারির খুনের বিষয়ে কোনো সঠিক তথ্য
পায়নি| পরে ওরা আদালতের
মাধ্যমে ছাড়া পেয়ে যায়|
তারপর
কুড়ি বছর| আজও আসমত
আলী ব্যাপারির লাশ কেউ খুঁজে
পায়নি| কিন্তু আসমত আলী ব্যাপারির
লাশ গ্রামবাসী কেউ খুঁজে না
পেলেও কমলা খাতুন যে
কখনও স্বামীর জন্য অপেক্ষায় ছিল,
তা নয়| সে আসল
সত্যটা জানত| তাকে বাদে আরেকজন
এই আসল সত্যটা জানত,
সেটা সুন্দর ভুঁইয়া| আর মনসুর পাগলারও
কেন জানি সেই থেকে
মাথায় ছিট ধরা পড়ে|
কমলা
খাতুনের মাঝেমধ্যে সন্দেহ জাগে, তার ছেলে কি
সেই আসল সত্যটা জানে?
কিন্তু সেটা সে জানবে
কীভাবে? আর যদি না
জানে, তাহলে তার মাথায় হঠাৎ
করে ছিট ধরা পড়ে
পাগল হলো কেন?
মমিনা
এক হাতে ভাতের থালা,
অন্যহাতে টাকি মাছের ঝুলের
বাটি নিয়ে ঘরের দাওয়ার
আরেকটা পাটাতনে বসতে বসতে বলল,
‘ও বড়চাচি, এত কী চিন্তা
করতাছ?’
মমিনা
পিছদোর ধরে ঘরের সামনের
দরজায় এসেছে বলে কমলা খাতুন
তাকে খেয়াল করেনি| সে কিছুটা চমকে
উঠল| পরক্ষণই সামলে নিয়ে বলল, ‘ও,
তুই?’
মমিনা
বলল, ‘হ, আর কেডা
হইব? ভাইজানের লাইগা তুমি চিন্তা করতাছ?
হের লাইগা এত চিন্তা কইর
না| সব ঠিক হইয়া
যাইব| দেখবা দুইদিন পরই ভাইজান ছাড়া
পাইয়া গেছে| হেয় তো কোনো
অন্যায় করে নাই|’
কমলা
খাতুন এ ব্যাপারে কিছু
বলল না| সে মমিনার
হাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস
করল, ‘তোর হাতে এইগুলা
কী?’
মমিনা
বলল, ‘তোমার লাইগা ভাত আনছি| মা
পাঠাইছে|’
‘তোর
মা পাঠাইছে?’
‘হ,
বড়চাচি|’
‘মমিনা,
তুই মিছা কথা কস
ক্যান? তোর মা’য়
নিশ্চয়ই বাড়িত নাই| এই সুযোগে
তুই আমার লাইগা ভাত-ছালুন লইয়া আইছস?
মমিনা
একটু হেসে ফেলল| লজ্জার
হাসি| বলল, ‘হ, বড়চাচি| মা
পান খাইতে পশ্চিমের ইশায় গেছে| তুমি
বিহানবেলা থাইকা কিচ্ছু খাও নাই| তাই
লইয়া আইছি|’
কমলা
খাতুন কিছু বলল না|
মমিনা
আবার ভাতের থালাটা বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
‘বড়চাচি, তুমি না খাইলে
যে পইড়া যাইবা| এমনিতেই
তোমার শরীলে বারো রকমের অসুখ|’
কমলা
খাতুন এবার হাত বাড়িয়ে
থালাটা নিল| টাকি মাছের
ঝুল দেখে সে খুশিই
হলো| তার সত্যি খুব
ক্ষুধা লেগেছে| সেই সকালে একমুঠো
মুড়ি মুখে দিয়েছিল| এখন
প্রায় বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে|
ভাতের
সঙ্গে টাকি মাছের ঝুল
ঢেলে কয়চ-কয়চ করে
মাখতে মাখতে কমলা খাতুন মমিনার
দিকে নরম দৃষ্টিতে তাকাল|
কেরামত আলীর চার ছেলেমেয়ের
মধ্যে ছোট মেয়ে মমিনা
আলাদা| সবসময় এই ইশায় আসে|
বড়চাচি বলে আহলাদ করে
ডাকে| সময়-সময় তার
খোঁজখবর নেয়| বেশ ডাঙর
হয়ে উঠেছে| বিয়ের কাজ আসছে বেশ|
এরই মধ্যে একটা বিয়ে প্রায়
পাকাপোক্ত হয়ে আছে| গোমতীর
খানিকটা উজানে হোসেনপুর গ্রামে পাত্রের বাড়ি| পাত্রের একটা স্টেশনারির দোকান
আছে হোসেনপুর বাজারে| একটা চৌচালা ঘরও
নাকি আছে| মমিনা বেশ
সুন্দর বলে পাত্রপক্ষ তেমন
কিছু চায় না|
কমলা
খাতুন ভাবল, মমিনার বিয়ে হয়ে গেলে
সে আরও একা হয়ে
যাবে| অবশ্য একাকীত্ব জীবন নিয়ে তার
যে খুব একটা চিন্তা
আছে, তা নয়| সারাজীবনই
তো সে একাকীত্বকে সঙ্গী
করেছে| তার একাকীত্ব যেন
জিয়ল গাছের আঠা| সেই আঠায়
আটকে সুন্দর ভুঁইয়া নামের একজনকে নিয়ে সেই যে
যুবতীকালে স্তব্ধ হয়ে গেছে, তারপর
তার কুল গেছে, কালও
গেছে| ক্রমশ...
***

আপনার মতামত লিখুন