হাঙ্গেরির
নোবেলজয়ী কথাশিল্পী লাসলো ক্রাসনাহোরকাই বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে মহাজাগতিক অস্থিরতা ও মানবিক অবক্ষয়ের
প্রলয়ংকরী ধ্বনি, রাজনৈতিক পচন, সভ্যতার ক্ষয়
ও আধ্যাত্মিক শূন্যতার চিত্রায়ণ নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন|
আর তাঁর গল্প-উপন্যাসের
পাতাজুড়ে এমন চিত্রায়ণের কারণেই
তাকে বিশ্বসাহিত্যে ‘অ্যাপোক্যালিপসের মহাগাথাকার’ হিসেবে দেখা হয়| বিখ্যাত
আমেরিকান চিন্তাবিদ সুসান সোনতাগ এ কারণেই তাকে
‘মাস্টার অব অ্যাপোক্যালিপস’ হিসেবে
অভিহিত করেছেন| তার মতে, লাসলো
এমন একজন লেখক, যিনি
বর্তমান জগৎকে তার চূড়ান্ত পতনের
মুহূর্তে দাঁড়িয়ে দেখতে সক্ষম| জেমস উড লাসলোর
এই অ্যাপোক্যালিপ্টিক চিত্রবিস্ফোরণকে ‘মহাজাগতিক উদ্বেগ’ বলে বর্ণনা করেছেন|
তাঁর মতে, লাসলোর গদ্য
আমাদের সেই ভয়ংকর সত্যের
মুখোমুখি করে, যা আমরা
সচরাচর এড়িয়ে চলি|
‘ডিস্টোপিয়ান’—
কেবল এই শব্দ দিয়েই
লাসলোর সাহিত্যরূপকে ধরা যায় না,
বরং তার সাহিত্য একধরনের
মেটাফিজিক্যাল অ্যাপোক্যালিপস, যেখানে পৃথিবী শুধু ধ্বংসের দিকে
যাচ্ছে না, মানুষ ধ্বংসের
মধ্যেই, প্রলয়ের মধ্যেই বসবাস করছে| এখানে লাসলোর নিজের বক্তব্যই প্রণিধানযোগ্য, ‘অ্যাপোক্যালিপস কোনো ভবিষ্যৎ মহাবিপর্যয়
বা কিয়ামত নয়... এর অস্তিত্ব বর্তমানেই
বিরাজমান|’ আরেক জায়গায় তিনি
বলেন, আমরা সব সময়ই
অ্যাপোক্যালিপসের ভেতরেই বাস করছি| অর্থাৎ
তার মতে, মানবসভ্যতা কখনোই
পুরোপুরি সুস্থ ছিল না, বরং
তা উত্থান-পতন, ধ্বংস-গড়া,
মহাবিপর্যয়-মহাজাগরণ— এই চক্রের মধ্যেই
আবদ্ধ ছিল, আছে| লাসলো
মিউজিক অ্যান্ড লিটারেচারে নিজেই বলেছেন, ‘অ্যাপোক্যালিপস কখনো পুরোপুরি ঘটে
না; বরং পৃথিবী যেন
এক অনন্ত বিপর্যয়ের মধ্যেই আটকে আছে|’ ফলে
মানুষ মানবযাত্রা থেকেই হয়তো একজন ত্রাণকর্তার
অপেক্ষায় থাকে, যিনি তাদের এই
মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করবেন|
কিন্তু বাস্তবতা হলো, মসিহ হয়তো
মাঝে মাঝে আসেন, কিন্তু
সেটা বিভ্রম— ভুয়া মসিহ, আর
মানুষ মরীচিকায় হাবুডুবু খায়, কিন্তু মুক্তি
আর মেলে না| কাছে
গেলেই সব মুক্তিকেন্দ্রই শূন্য,
এক ভেলকি| এ জন্যই দ্য
নিউ ইয়র্কারে জেমস উড বলেছেন,
‘ক্রাসনাহোরকাইকে পড়া যেন এমন
একদল লোককে দেখা, যারা আগুন পোহাচ্ছে,
কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা
যায়, সেখানে কোনো আগুনই নেই|’
লাসলোর এ জগৎকে ঈশ্বর-পরিত্যক্ত এক দস্তয়েভস্কিয়ান পৃথিবী
হিসেবে অনেকে দেখে|
লাসলোর
উপন্যাসগুলোতে মহাপ্রলয়ের চূড়ান্ত দৃশ্য দেখা না গেলেও
মহাজাগতিক বিপর্যয়ের আগমুহূর্তের এক শ্বাসরুদ্ধকর, হৃৎস্পন্দন
বাড়িয়ে দেওয়া পরিস্থিতির আবহ তৈরি করা
হয়, যেন সামনেই আকাশ
আঁধার করে নামা ভয়ংকর
বিপর্যয় আসছে| এই যে দুনিয়া
শৃঙ্খলা হারিয়ে ধীরে ধীরে বিশৃঙ্খলার
শিঙামুখী হচ্ছে, এটা এমন এক
এন্ট্রোপিক রিয়ালিজম, যেখানে মানুষ হাজারো বছরের স্থবির সময়ের ঘূর্ণিপাকে আটকে থাকে, মুক্তির
অপেক্ষায় সময় ফুরায় না|
যেমন লাসলোর ‘শাতানতাঙ্গো’ উপন্যাসে এক ভুয়া মসিহ
গ্রামের মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করেন; ‘দ্য মেলানকলি অব
রেজিস্ট্যান্স’ বইয়ে একটি মৃত
তিমি ও সার্কাসের আগমন
পুরো শহরকে উন্মত্ততা ও সহিংসতার দিকে
ঠেলে দেয়; ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’
উপন্যাসে মহাপ্রলয় থেকে সভ্যতার স্মৃতি
সংরক্ষণের ব্যর্থ প্রচেষ্টা করতে দেখা যায়|
মানে তার উপন্যাসগুলোতে অনিবার্য
ধ্বংসের অনুভূতিটাই মুখ্য হয়ে ওঠে, যেখানে
মানুষ ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় মমির মতো হয়ে
যেতে থাকে| আর এই ধ্বংসোন্মুখ
শ্বাসরুদ্ধকর মানব সভ্যতাকে দারুণভাবে
চিত্রিত করতে তিনি ব্যবহার
করেন তার বাগ&ভঙ্গির
মোক্ষম অস্ত্র শ্বাসরুদ্ধকর দিঘল বাক্যের অপ্রতিরোধ্য-অবাধ্য প্রবাহ|
লাসলোর
বাক্য যেন দীর্ঘ প্যাঁচানো
সিঁড়ি
লাসলো
ক্রাসনাহোরকাইয়ের টেক্সটে বাক্য আসে উপচে পড়া
ঝরনাধারার মতো, বাঁক খেয়ে
খেয়ে যার যাত্রা সমুদ্রের
দিকে| ফলে পাঠকের কাছে
এই প্রবাহ ঠেকে একধরনের মনোলজিক্যাল
ফ্লুইডিটির মতো| তার বাক্যের
ভেতর অসংখ্য উপবাক্য, উপবাক্যের ভেতরেও অনেক উপবাক্য— যেন
চিন্তার স্তরবিন্যাস| তার এ ধরনের
সিনট্যাক্সকে সুইডিশ একাডেমি ‘পূর্ণচ্ছেদহীন দীর্ঘ ও পাক খাওয়া
বাক্যের প্রবাহ’ বলে মত দিয়েছিল|
লাসলোর বাক্যের চলনভঙ্গি সম্পর্কে ব্রিটিশ-হাঙ্গেরীয় কবি ও অনুবাদক
জর্জ সির্তেশের ‘আ স্লো লাভা-ফ্লো অব ন্যারেটিভ’
কথাটি বেশ মানানসই| লাসলোর
বাক্যগঠনরীতি সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত বললে বলতে হয়,
তার বাক্যপ্রণালি অনেকটা এমন— দিঘল, সর্পিল,
অবিরাম প্রবাহ, চেতনার স্রোত, ধীর পাঠোপযোগী, অনুচ্ছেদহীন,
জটিল বিন্যাস, যার বুনন হয়
কমা-সেমিকোলন দিয়ে| কখনো কখনো দেখা
যায়, পুরো পৃষ্ঠায়, এমনকি
কয়েক পৃষ্ঠাজুড়ে তিনি কেবল একটি
বাক্যই লিখে চলেন| অসংখ্য
শট মিলে যেমন একটা
সিন হয়, তেমনি অসংখ্য
উপবাক্য বা খণ্ডবাক্য একের
সঙ্গে অন্য যুক্ত হয়ে
একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্যসেতু তৈরি করে| ফলে
এমন ধ্বনি-সমবায় তৈরি হয়, যাকে
বলা যায় ‘হিপটোনিক অডিটরি
ফ্লো’| মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত কথোপকথনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়েই লাসলো
এমন বাক-প্রণালি বেছে
নিয়েছেন, যেখানে ক্যাওসও বহুকণ্ঠের এক সম্মিলিত ছন্দে
রূপ নেয়| তবে কারও
কারও কাছে লাসলোর এ
ধরনের কথনশৈলীকে ভাষাতাত্ত্বিক সন্ত্রাস হিসেবেও দেখতে পারে| কারণ, তিনি এমন বাক্যরীতি
দিয়ে পাঠককে প্রচলিত পাঠ্যাভ্যাস থেকে হয়তো জোরপূর্বক
বের করে আনেন|
নোবেল
পুরস্কার পাওয়ার পর লাসলো ক্রাসনাহোরকাই
বলেছিলেন, ‘মানুষ কমা দিয়ে কথা
বলে, দাড়ি দিয়ে নয়;
দাড়ি ঈশ্বরের জন্য বরাদ্দ|’ অর্থাৎ
তিনি বলতে চেয়েছেন, জীবন,
চিন্তা বা অভিজ্ঞতা ছোট
ছোট প্যাকেট বা আলাদা আলাদা
হয়ে আসে না; বরং
একটি অনুভূতি আরেকটির ভেতর মিশে যায়
এবং সেখানে কোনো দাড়ি থাকে
না| বরং দাড়ি দিয়ে
আমরা চিন্তার প্রবাহকে থামিয়ে দিই, যা আসলে
কৃত্রিম| প্রকৃতিতে বা মানুষের চেতনায়
আদতে কোনো ‘ফুল স্টপ’ নেই—
সবই এক অনন্ত প্রবাহ|
তার মতে, মানুষ কোনো
কিছুর ‘চূড়ান্ত সমাপ্তি’ টানার যোগ্য নয়, বরং তার
কাজ পর্যবেক্ষণ বা বর্ণনা করা,
যা কমা, সেমিকোলন দিয়ে
চলতে থাকে| আর তার বাক্যগুলো
এমনভাবে বাঁক নেয়, যেখানে
ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির মতো ছোট ছোট
অংশ মিলে বিশাল ও
জটিল এক নকশা তৈরি
করে| আর এই বাক&-উন্মাদনা পাঠককে একধরনের মেটাফিজিক্যাল ভার্টিগোর (মহাজাগতিক বিভ্রম) মধ্যে ফেলে দেয়|
আর ঈশ্বরের কাজ হচ্ছে ফুল
স্টপ বা দাড়ি টানা,
অর্থাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া| লাসলো দাড়িকে অনেকটা মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে দেখেন| তাই তো তিনি
জীবনের মতো প্রবহমান জায়গায়
দাড়ির মতো সমাপ্তিসূচক জিনিসটা
সহজে ব্যবহার করতে চান না|
এ জন্য তিনি তার
বাক্যকে এমন গঠন দিয়েছেন,
যাতে সেটা একটা রেজিস্ট্যান্স
হিসেবে কাজ করে প্রচলিত
ব্যাকরণের বিরুদ্ধে, মৃত্যুর মতো স্থবিরতার বিরুদ্ধে|
তার এই বাগ&ভঙ্গি
ভাষার বিরুদ্ধে একধরনের চোরাবালি| ফলে তার বাক্যে
প্রবেশ সহজ, কিন্তু প্রস্থান
অনিশ্চিত| তার এ বাক্যগঠনের
মূল দর্শন হলো— জীবন কোনো
পূর্ণবিরামবিশিষ্ট কিছু নয়, বরং
এক অনির্দিষ্ট কমার সমাবেশ| পূর্ণবিরাম
আসে জীবনের অনন্তকালীন বিশ্রামে|
লাসলোর
এই দীর্ঘল বিরল সিনট্যাক্স সমকালীন
বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য
হিসেবে আলোচিত হচ্ছে| কেউ কেউ এই
রীতিকে ‘অসহনীয় দীর্ঘশ্বাস’ বলছেন| কেউ আবার একে
আধুনিক সাহিত্যের গভীরতম ধ্যানমগ্নতা হিসেবে দেখছেন| কারও কাছে তাঁর
প্রতিটি দীর্ঘ বাক্য যেন একটি বিশাল
ক্যাথেড্রাল বা স্থাপত্যের মতো,
যেখানে অসংখ্য উপবাক্য স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে পুরো
কাঠামোটিকে ধরে রাখে| অ্যাডাম
থার্লওয়েল দ্য গার্ডিয়ানে লাসলোর
বাক্যকে ‘স্মৃতি ও উপলব্ধির এক
মহাজাগতিক ঘূর্ণি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন| নিকোলাস লেজার্ড দ্য গার্ডিয়ানে লাসলোর
গদ্যশৈলীকে ‘একটি তুষারঝড়ের মতো’
বলে বর্ণনা করেছেন, যা পাঠককে ঢেকে
ফেলে এবং দিশেহারা করে
দেয়, কিন্তু তার ভেতর লুকিয়ে
থাকে এক পরম সৌন্দর্য|
অনেক
সমালোচক লাসলোর ঝরনাধারার মতো অবিরাম বয়ে
চলা বাক্যরীতিকে ধীর লয়ের মনোযোগ
দাবি করা রীতি হিসেবে
চিহ্নিত করেছেন| তবে এই ‘স্লো-রাইটিং’ পদ্ধতি তার গদ্যে দীর্ঘ
ও গম্ভীর মহিমা যুক্ত করে| দ্য ইমাজিনেটিভ
কনজারভেটিভে জন হরভাটের লেখায়
একে ‘অপাঠ্য ও দীর্ঘায়িত’ বলে
সমালোচনা করা হয়েছে| দ্য
নিউ রিপাবলিকে স্টিফেন লুরি বলেছেন, ‘এই
হাঙ্গেরীয় লেখকের অত্যন্ত জটিল ও প্যাঁচানো
লিখনশৈলী কিছু পাঠককে যেমন
বিরক্ত করেছে, তেমনি অনেককে দূরেও ঠেলে দিয়েছে|’ তবে
এটাও ঠিক, ভিন্নতর স্বাদপিপাসু
অনুরাগীরা এ শৈলীকে অনন্য
সৌন্দর্য ও মগ্নকর হিসেবেই
দেখেন|
লাসলোর
এই বাক্যরীতিকে বিপজ্জনক হিসেবেও দেখা যায়| কারণ,
চরম সহিংসতাপূর্ণ এই দুনিয়াকে যখন
এমন এক অরাজকতাময় সিনট্যাক্সে
দেখানো হয়, তখন মানুষের
মনস্তত্ত্ব আরও অস্থির হয়ে
ওঠে, দুনিয়ার শৃঙ্খলাবদ্ধ পিলারগুলো কেঁপে ওঠে| কি বই
কি বাস্তব দুনিয়া— কোথাও সে বাতাসের মতো
শ্রান্তি দূর করা সরল
পথ পায় না| তবে
হ্যাঁ, মনোযোগ ও ধ্যানমগ্নতায় ফাটল
ধরা এই মানবজাতি লাসলোর
বইয়ে ঢুকলে সেই মনোযোগ ও
ধ্যানাচ্ছন্নতা ছাড়া শেষ করতে
পারবে না| ফলে তার
বই একধরনের আত্মমগ্নতার গভীর মাধ্যম|

বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬
হাঙ্গেরির
নোবেলজয়ী কথাশিল্পী লাসলো ক্রাসনাহোরকাই বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে মহাজাগতিক অস্থিরতা ও মানবিক অবক্ষয়ের
প্রলয়ংকরী ধ্বনি, রাজনৈতিক পচন, সভ্যতার ক্ষয়
ও আধ্যাত্মিক শূন্যতার চিত্রায়ণ নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন|
আর তাঁর গল্প-উপন্যাসের
পাতাজুড়ে এমন চিত্রায়ণের কারণেই
তাকে বিশ্বসাহিত্যে ‘অ্যাপোক্যালিপসের মহাগাথাকার’ হিসেবে দেখা হয়| বিখ্যাত
আমেরিকান চিন্তাবিদ সুসান সোনতাগ এ কারণেই তাকে
‘মাস্টার অব অ্যাপোক্যালিপস’ হিসেবে
অভিহিত করেছেন| তার মতে, লাসলো
এমন একজন লেখক, যিনি
বর্তমান জগৎকে তার চূড়ান্ত পতনের
মুহূর্তে দাঁড়িয়ে দেখতে সক্ষম| জেমস উড লাসলোর
এই অ্যাপোক্যালিপ্টিক চিত্রবিস্ফোরণকে ‘মহাজাগতিক উদ্বেগ’ বলে বর্ণনা করেছেন|
তাঁর মতে, লাসলোর গদ্য
আমাদের সেই ভয়ংকর সত্যের
মুখোমুখি করে, যা আমরা
সচরাচর এড়িয়ে চলি|
‘ডিস্টোপিয়ান’—
কেবল এই শব্দ দিয়েই
লাসলোর সাহিত্যরূপকে ধরা যায় না,
বরং তার সাহিত্য একধরনের
মেটাফিজিক্যাল অ্যাপোক্যালিপস, যেখানে পৃথিবী শুধু ধ্বংসের দিকে
যাচ্ছে না, মানুষ ধ্বংসের
মধ্যেই, প্রলয়ের মধ্যেই বসবাস করছে| এখানে লাসলোর নিজের বক্তব্যই প্রণিধানযোগ্য, ‘অ্যাপোক্যালিপস কোনো ভবিষ্যৎ মহাবিপর্যয়
বা কিয়ামত নয়... এর অস্তিত্ব বর্তমানেই
বিরাজমান|’ আরেক জায়গায় তিনি
বলেন, আমরা সব সময়ই
অ্যাপোক্যালিপসের ভেতরেই বাস করছি| অর্থাৎ
তার মতে, মানবসভ্যতা কখনোই
পুরোপুরি সুস্থ ছিল না, বরং
তা উত্থান-পতন, ধ্বংস-গড়া,
মহাবিপর্যয়-মহাজাগরণ— এই চক্রের মধ্যেই
আবদ্ধ ছিল, আছে| লাসলো
মিউজিক অ্যান্ড লিটারেচারে নিজেই বলেছেন, ‘অ্যাপোক্যালিপস কখনো পুরোপুরি ঘটে
না; বরং পৃথিবী যেন
এক অনন্ত বিপর্যয়ের মধ্যেই আটকে আছে|’ ফলে
মানুষ মানবযাত্রা থেকেই হয়তো একজন ত্রাণকর্তার
অপেক্ষায় থাকে, যিনি তাদের এই
মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করবেন|
কিন্তু বাস্তবতা হলো, মসিহ হয়তো
মাঝে মাঝে আসেন, কিন্তু
সেটা বিভ্রম— ভুয়া মসিহ, আর
মানুষ মরীচিকায় হাবুডুবু খায়, কিন্তু মুক্তি
আর মেলে না| কাছে
গেলেই সব মুক্তিকেন্দ্রই শূন্য,
এক ভেলকি| এ জন্যই দ্য
নিউ ইয়র্কারে জেমস উড বলেছেন,
‘ক্রাসনাহোরকাইকে পড়া যেন এমন
একদল লোককে দেখা, যারা আগুন পোহাচ্ছে,
কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা
যায়, সেখানে কোনো আগুনই নেই|’
লাসলোর এ জগৎকে ঈশ্বর-পরিত্যক্ত এক দস্তয়েভস্কিয়ান পৃথিবী
হিসেবে অনেকে দেখে|
লাসলোর
উপন্যাসগুলোতে মহাপ্রলয়ের চূড়ান্ত দৃশ্য দেখা না গেলেও
মহাজাগতিক বিপর্যয়ের আগমুহূর্তের এক শ্বাসরুদ্ধকর, হৃৎস্পন্দন
বাড়িয়ে দেওয়া পরিস্থিতির আবহ তৈরি করা
হয়, যেন সামনেই আকাশ
আঁধার করে নামা ভয়ংকর
বিপর্যয় আসছে| এই যে দুনিয়া
শৃঙ্খলা হারিয়ে ধীরে ধীরে বিশৃঙ্খলার
শিঙামুখী হচ্ছে, এটা এমন এক
এন্ট্রোপিক রিয়ালিজম, যেখানে মানুষ হাজারো বছরের স্থবির সময়ের ঘূর্ণিপাকে আটকে থাকে, মুক্তির
অপেক্ষায় সময় ফুরায় না|
যেমন লাসলোর ‘শাতানতাঙ্গো’ উপন্যাসে এক ভুয়া মসিহ
গ্রামের মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করেন; ‘দ্য মেলানকলি অব
রেজিস্ট্যান্স’ বইয়ে একটি মৃত
তিমি ও সার্কাসের আগমন
পুরো শহরকে উন্মত্ততা ও সহিংসতার দিকে
ঠেলে দেয়; ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’
উপন্যাসে মহাপ্রলয় থেকে সভ্যতার স্মৃতি
সংরক্ষণের ব্যর্থ প্রচেষ্টা করতে দেখা যায়|
মানে তার উপন্যাসগুলোতে অনিবার্য
ধ্বংসের অনুভূতিটাই মুখ্য হয়ে ওঠে, যেখানে
মানুষ ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় মমির মতো হয়ে
যেতে থাকে| আর এই ধ্বংসোন্মুখ
শ্বাসরুদ্ধকর মানব সভ্যতাকে দারুণভাবে
চিত্রিত করতে তিনি ব্যবহার
করেন তার বাগ&ভঙ্গির
মোক্ষম অস্ত্র শ্বাসরুদ্ধকর দিঘল বাক্যের অপ্রতিরোধ্য-অবাধ্য প্রবাহ|
লাসলোর
বাক্য যেন দীর্ঘ প্যাঁচানো
সিঁড়ি
লাসলো
ক্রাসনাহোরকাইয়ের টেক্সটে বাক্য আসে উপচে পড়া
ঝরনাধারার মতো, বাঁক খেয়ে
খেয়ে যার যাত্রা সমুদ্রের
দিকে| ফলে পাঠকের কাছে
এই প্রবাহ ঠেকে একধরনের মনোলজিক্যাল
ফ্লুইডিটির মতো| তার বাক্যের
ভেতর অসংখ্য উপবাক্য, উপবাক্যের ভেতরেও অনেক উপবাক্য— যেন
চিন্তার স্তরবিন্যাস| তার এ ধরনের
সিনট্যাক্সকে সুইডিশ একাডেমি ‘পূর্ণচ্ছেদহীন দীর্ঘ ও পাক খাওয়া
বাক্যের প্রবাহ’ বলে মত দিয়েছিল|
লাসলোর বাক্যের চলনভঙ্গি সম্পর্কে ব্রিটিশ-হাঙ্গেরীয় কবি ও অনুবাদক
জর্জ সির্তেশের ‘আ স্লো লাভা-ফ্লো অব ন্যারেটিভ’
কথাটি বেশ মানানসই| লাসলোর
বাক্যগঠনরীতি সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত বললে বলতে হয়,
তার বাক্যপ্রণালি অনেকটা এমন— দিঘল, সর্পিল,
অবিরাম প্রবাহ, চেতনার স্রোত, ধীর পাঠোপযোগী, অনুচ্ছেদহীন,
জটিল বিন্যাস, যার বুনন হয়
কমা-সেমিকোলন দিয়ে| কখনো কখনো দেখা
যায়, পুরো পৃষ্ঠায়, এমনকি
কয়েক পৃষ্ঠাজুড়ে তিনি কেবল একটি
বাক্যই লিখে চলেন| অসংখ্য
শট মিলে যেমন একটা
সিন হয়, তেমনি অসংখ্য
উপবাক্য বা খণ্ডবাক্য একের
সঙ্গে অন্য যুক্ত হয়ে
একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্যসেতু তৈরি করে| ফলে
এমন ধ্বনি-সমবায় তৈরি হয়, যাকে
বলা যায় ‘হিপটোনিক অডিটরি
ফ্লো’| মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত কথোপকথনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়েই লাসলো
এমন বাক-প্রণালি বেছে
নিয়েছেন, যেখানে ক্যাওসও বহুকণ্ঠের এক সম্মিলিত ছন্দে
রূপ নেয়| তবে কারও
কারও কাছে লাসলোর এ
ধরনের কথনশৈলীকে ভাষাতাত্ত্বিক সন্ত্রাস হিসেবেও দেখতে পারে| কারণ, তিনি এমন বাক্যরীতি
দিয়ে পাঠককে প্রচলিত পাঠ্যাভ্যাস থেকে হয়তো জোরপূর্বক
বের করে আনেন|
নোবেল
পুরস্কার পাওয়ার পর লাসলো ক্রাসনাহোরকাই
বলেছিলেন, ‘মানুষ কমা দিয়ে কথা
বলে, দাড়ি দিয়ে নয়;
দাড়ি ঈশ্বরের জন্য বরাদ্দ|’ অর্থাৎ
তিনি বলতে চেয়েছেন, জীবন,
চিন্তা বা অভিজ্ঞতা ছোট
ছোট প্যাকেট বা আলাদা আলাদা
হয়ে আসে না; বরং
একটি অনুভূতি আরেকটির ভেতর মিশে যায়
এবং সেখানে কোনো দাড়ি থাকে
না| বরং দাড়ি দিয়ে
আমরা চিন্তার প্রবাহকে থামিয়ে দিই, যা আসলে
কৃত্রিম| প্রকৃতিতে বা মানুষের চেতনায়
আদতে কোনো ‘ফুল স্টপ’ নেই—
সবই এক অনন্ত প্রবাহ|
তার মতে, মানুষ কোনো
কিছুর ‘চূড়ান্ত সমাপ্তি’ টানার যোগ্য নয়, বরং তার
কাজ পর্যবেক্ষণ বা বর্ণনা করা,
যা কমা, সেমিকোলন দিয়ে
চলতে থাকে| আর তার বাক্যগুলো
এমনভাবে বাঁক নেয়, যেখানে
ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির মতো ছোট ছোট
অংশ মিলে বিশাল ও
জটিল এক নকশা তৈরি
করে| আর এই বাক&-উন্মাদনা পাঠককে একধরনের মেটাফিজিক্যাল ভার্টিগোর (মহাজাগতিক বিভ্রম) মধ্যে ফেলে দেয়|
আর ঈশ্বরের কাজ হচ্ছে ফুল
স্টপ বা দাড়ি টানা,
অর্থাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া| লাসলো দাড়িকে অনেকটা মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে দেখেন| তাই তো তিনি
জীবনের মতো প্রবহমান জায়গায়
দাড়ির মতো সমাপ্তিসূচক জিনিসটা
সহজে ব্যবহার করতে চান না|
এ জন্য তিনি তার
বাক্যকে এমন গঠন দিয়েছেন,
যাতে সেটা একটা রেজিস্ট্যান্স
হিসেবে কাজ করে প্রচলিত
ব্যাকরণের বিরুদ্ধে, মৃত্যুর মতো স্থবিরতার বিরুদ্ধে|
তার এই বাগ&ভঙ্গি
ভাষার বিরুদ্ধে একধরনের চোরাবালি| ফলে তার বাক্যে
প্রবেশ সহজ, কিন্তু প্রস্থান
অনিশ্চিত| তার এ বাক্যগঠনের
মূল দর্শন হলো— জীবন কোনো
পূর্ণবিরামবিশিষ্ট কিছু নয়, বরং
এক অনির্দিষ্ট কমার সমাবেশ| পূর্ণবিরাম
আসে জীবনের অনন্তকালীন বিশ্রামে|
লাসলোর
এই দীর্ঘল বিরল সিনট্যাক্স সমকালীন
বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য
হিসেবে আলোচিত হচ্ছে| কেউ কেউ এই
রীতিকে ‘অসহনীয় দীর্ঘশ্বাস’ বলছেন| কেউ আবার একে
আধুনিক সাহিত্যের গভীরতম ধ্যানমগ্নতা হিসেবে দেখছেন| কারও কাছে তাঁর
প্রতিটি দীর্ঘ বাক্য যেন একটি বিশাল
ক্যাথেড্রাল বা স্থাপত্যের মতো,
যেখানে অসংখ্য উপবাক্য স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে পুরো
কাঠামোটিকে ধরে রাখে| অ্যাডাম
থার্লওয়েল দ্য গার্ডিয়ানে লাসলোর
বাক্যকে ‘স্মৃতি ও উপলব্ধির এক
মহাজাগতিক ঘূর্ণি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন| নিকোলাস লেজার্ড দ্য গার্ডিয়ানে লাসলোর
গদ্যশৈলীকে ‘একটি তুষারঝড়ের মতো’
বলে বর্ণনা করেছেন, যা পাঠককে ঢেকে
ফেলে এবং দিশেহারা করে
দেয়, কিন্তু তার ভেতর লুকিয়ে
থাকে এক পরম সৌন্দর্য|
অনেক
সমালোচক লাসলোর ঝরনাধারার মতো অবিরাম বয়ে
চলা বাক্যরীতিকে ধীর লয়ের মনোযোগ
দাবি করা রীতি হিসেবে
চিহ্নিত করেছেন| তবে এই ‘স্লো-রাইটিং’ পদ্ধতি তার গদ্যে দীর্ঘ
ও গম্ভীর মহিমা যুক্ত করে| দ্য ইমাজিনেটিভ
কনজারভেটিভে জন হরভাটের লেখায়
একে ‘অপাঠ্য ও দীর্ঘায়িত’ বলে
সমালোচনা করা হয়েছে| দ্য
নিউ রিপাবলিকে স্টিফেন লুরি বলেছেন, ‘এই
হাঙ্গেরীয় লেখকের অত্যন্ত জটিল ও প্যাঁচানো
লিখনশৈলী কিছু পাঠককে যেমন
বিরক্ত করেছে, তেমনি অনেককে দূরেও ঠেলে দিয়েছে|’ তবে
এটাও ঠিক, ভিন্নতর স্বাদপিপাসু
অনুরাগীরা এ শৈলীকে অনন্য
সৌন্দর্য ও মগ্নকর হিসেবেই
দেখেন|
লাসলোর
এই বাক্যরীতিকে বিপজ্জনক হিসেবেও দেখা যায়| কারণ,
চরম সহিংসতাপূর্ণ এই দুনিয়াকে যখন
এমন এক অরাজকতাময় সিনট্যাক্সে
দেখানো হয়, তখন মানুষের
মনস্তত্ত্ব আরও অস্থির হয়ে
ওঠে, দুনিয়ার শৃঙ্খলাবদ্ধ পিলারগুলো কেঁপে ওঠে| কি বই
কি বাস্তব দুনিয়া— কোথাও সে বাতাসের মতো
শ্রান্তি দূর করা সরল
পথ পায় না| তবে
হ্যাঁ, মনোযোগ ও ধ্যানমগ্নতায় ফাটল
ধরা এই মানবজাতি লাসলোর
বইয়ে ঢুকলে সেই মনোযোগ ও
ধ্যানাচ্ছন্নতা ছাড়া শেষ করতে
পারবে না| ফলে তার
বই একধরনের আত্মমগ্নতার গভীর মাধ্যম|

আপনার মতামত লিখুন