দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী, ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা, শিল্প নির্দেশক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নির্মাতা মুস্তাফা মনোয়ার বাঙালির শিল্পচর্চার নান্দনিক ভুবনে এক আইকনিক উদাহরণ হয়ে থাকবেন— তাঁর কর্ম, ব্যক্তিত্ব ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে| দীর্ঘ ৯০ বছরের জীবনে তিনি তাঁর শিল্পচর্চা থেকে এতটুকু বিচ্যুত হননি| নিরবচ্ছিন্ন কর্মময় জীবনের যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই লেগেছে শিল্পের নিবিড় স্পর্শ| তিনি যতগুলো শাখায় কাজ করেছেন, প্রত্যেকটি শাখাই পরবর্তীতে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে| বিশেষ করে শিশুমনে তিনি যেভাবে শিল্পের রঙ ছড়াতে পেরেছেন, তাঁর আগে আর কোনো শিল্পী বাঙালি শিশুহৃদয় এভাবে জয় করার দৃষ্টান্ত বিরল| এছাড়া টেলিভিশন অনুষ্ঠানে শিল্প নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় তাঁর অসামান্য বাগ্মীতা ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে এক-একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে| কবি পরিবারে জন্ম হওয়ায় সেই শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে এসব গুণ ভর করেছিল| এলোমেলো ছবি আঁকার মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল তাঁর শিল্প জীবন| পরবর্তীতে ভাষা সংগ্রাম, সঙ্গীত চর্চা, পাপেট চর্চা, শিল্প চর্চা, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ— সবই যেন তাঁর বেলায় অনায়াসসাধ্য ঘটনার মাতোই ঘটেছে|
শিল্পী
মুস্তাফা মনোয়ার একবার ছাত্রাবস্থায় বেড়াতে যান দার্জিলিংয়ে| মুগ্ধ
হন এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
দেখে| জেগে ওঠে তাঁর
প্রকৃতিমুগ্ধ শিল্পী মন| আঁকেন বেশ
কিছু ছবি| যেখানে জীবন্ত
হয়ে ওঠে এক অপার
সৌন্দর্যের পাহাড়ী ভূমি দার্জিলিং| এই
ছবিগুলোই তাঁর জীবনের গল্পকে
নতুন দিকে ধাবিত করে|
শিল্পবোদ্ধাদের অবাক করে দেওয়া
এই ছবিগুলোই তাঁর জীবনে প্রথম
খ্যাতি এনে দেয়| তাঁর
ছবি নিয়ে ঢাকায় প্রদর্শনী
হয়| শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের সেই যাত্রা আর
কখনো অধোগামী হয়নি|
আবার
যখন তিনি মাত্র নবম
শ্রেণির ছাত্র, নারায়ণগঞ্জ থেকে শুনতে পান
ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছে| ঢাকায়
ভাষার জন্য প্রাণ দিচ্ছে
ছাত্ররা, বাংলা ভাষাকে কেড়ে নিতে শুরু
হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের অপরাজনীতি; তখন তিনি দেশপ্রেম
চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আঁকতে শুরু
করেন একের পর এক
ছবি| নারায়ণগঞ্জের দেয়ালে দেয়ালে শোভা পেতে থাকে
ভাষা আন্দোলনকে উপলক্ষ করে মুস্তাফা মনোয়ারের
আঁকা নানা চিত্রকর্ম| তৎকালীন
শাসকের চোখে তা ভাল
না ঠেকায় গ্রেফতার করা হয় শিল্পীকে,
সঙ্গে তাঁর ভগ্নিপতিকেও ধরে
নিয়ে যাওয়া হয়| দু’জনকেই
পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকার কেন্দ্রীয়
কারাগারে| সেই থেকে তাঁর
স্বদেশ ও মাতৃভাষার প্রতি
প্রেম— যা আমৃত্যু শিরোধার্য
করে রেখেছিলেন|
১৯৭১
সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান
দিবসে টেলিভিশনে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শন করে রাত দশটায়
অনুষ্ঠান শেষ করাই ছিল
নির্ধারিত নিয়ম| কিন্তু শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুষ্ঠান মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা হয়| এরপর
পতাকাপ্রদর্শন ব্যতীতই অনুষ্ঠান শেষ করে দেন|
এই ঘটনা ছিল স্বাধীনতাকামী
বাঙালির জন্য সাহসী প্রতিবাদ|
এ ঘটনা তাঁর সহকর্মীদের
মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে|
“১৯৭১-এর মার্চে অসহযোগ
আন্দোলন চলাকালে টেলিভিশন থেকে ফজল-এ-খোদা রচিত ও
আজাদ রহমান সুরারোপিত ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’
গণসংগীতের পরিচালনায় ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার| গানটি দশজন শিল্পী গেয়েছিলেন,
কিন্তু যখন গানটি প্রচারিত
হয় তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের
দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল
যেন কয়েক শ’ শিল্পী
একত্রে গানটি গাইছেন| এটি সম্ভব হয়েছিল
মুস্তাফা মনোয়ারের অসাধারণ নির্দেশনার কারণে| কোনো গানকে একটি
অনন্য শৈল্পিক রূপ দেয়ার এটা
প্রকৃষ্ট উদাহরণ| টেলিভিশনে সেই গানটির প্রচারের
ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে শহীদ জননী জাহানারা
ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতে|” [উইকিপিডিয়া]
বাংলাদেশের
স্বাধীনতাযুদ্ধে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ|
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করার সময় তিনি
মুজিবনগর সরকারের সাংস্কৃতিক দলের অন্যতম নেতৃত্ব
প্রদান করেন| ভারতের নানা জায়গায় সাংস্কৃতিক
কর্মসূচি ও প্রদর্শনী করে
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে বিশেষ
ভূমিকা পালন করেন| পাকিস্তানি
বাহিনীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে ভারতে
আশ্রয় নেওয়া ভীত-সন্ত্রস্ত বাঙালি
শরণার্থীদের মানসিক শক্তি বাড়াতে তিনি প্রথম পাপেট
শো-এর আয়োজন করেন|
তিনি পাপেটের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসক ও সৈন্যদের
ব্যঙ্গ করে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের
বীরত্ব তুলে ধরে শরণার্থী
শিবিরের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন|
এই কারণে শরণার্থীরা তাঁকে ভালোবেসে ‘পুতুলওয়ালা’ নামে ডাকতে শুরু
করে| মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর এই অসামান্য
কীর্তি ও পাপেট শো’র দৃশ্য মার্কিন
চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিনের ধারণকৃত ফুটেজে এবং পরবর্তীতে তারেক
মাসুদের বিখ্যাত ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রেও প্রামাণ্য
দলিল হিসেবে রয়েছে|
শিল্পী
মুস্তাফা মনোয়ার শিশুদের নিয়ে কাজ করতেন
বলে এদেশের বেশ কয়েকটি প্রজন্ম
তাঁকে কোনোদিন ভুলতে পারবে না| একসময় এদেশের
একমাত্র দূরদর্শন ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন|
মুস্তাফা মনোয়ার জীবনের দীর্ঘ একটা সময় কাটিয়েছেন
বিটিভিতে চাকরি করে| আর সেখান
থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশুরা
তাঁর কাজ দেখে মুগ্ধ
হয়ে তাঁর অনুরাগী হয়ে
ওঠে| বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিশুদের ছবি আঁকা শেখানোর
মতো মহত্তম কাজের সঙ্গে জড়িত থাকাকে তিনি
দায়িত্ব মনে করতেন| অগণিত
শিশু প্রথম রংতুলির আঁচড় শিখেছে মুস্তাফা
মনোয়ারের কাছ থেকে! বাংলাদেশে
পাপেট চর্চায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন তিনি| বাংলাদেশের নতুন শিল্পআঙ্গিক পাপেটের
বিকাশে সারা জীবন কাজ
করে গেছেন| এটি ছিল তাঁর
অত্যন্ত প্রিয় শিল্পমাধ্যম| লোকঐহিত্য বা ফোক কালচারের
ওপর গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন
তাঁর পাপেটধারা| তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি
‘পারুল’ চরিত্র| ‘পারুল’ নামটির সঙ্গে সঙ্গে সেই সাত ভাই
জাগানো লোকগল্পের কথা মনে হয়|
পারুল সাত ভাইয়ের একমাত্র
বোন; সেই-ই তো
একদিন সাত ভাইকে জাগিয়েছিল|
এই পৃথিবীতে আবার নবজাগরণের ঘটনাটা
খুব সম্ভবত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার সেই ‘পারুল’ বোনটির
মাধ্যমেই ঘটাতে চান| পাপেট নিয়ে
রয়েছে তাঁর বহুদেশ ভ্রমণের
অভিজ্ঞতা| প্রথমবার তিনি তাঁর নিজের
পাপেট দলসহ বাংলাদেশের ফোক
পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে
মস্কো ও তাসখন্দ সফর
করেন| সেখানে বাংলাদেশের ফোক পাপেট ব্যাপক
প্রশংসা অর্জন করে|
টেলিভিশন
নাটকে তাঁর শিল্পভাবনার প্রতিফলন
নাটকগুলোকে নবপ্রাণ সঞ্চার করেছে| তিনি শুধু ছবি
আঁকা কিংবা শিল্পভাবনায়ই নিমজ্জিত ছিলেন না; ছিলেন শিল্পকলার
একজন মহৎ শিক্ষক| তাঁর
উদার ও প্রগতিশীল মানসিকতার
স্বাক্ষর রেখেছেন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে| ঢাকা কেন্দ্রীয় শহিদ
মিনারের পিছনের লালবৃত্তটি ছিলই তাঁরই ভাবনাজাত|
দ্বিতীয় সাফ গেমসের জন্য
মিশুক নির্মাণ তার কাজের উল্লেখযোগ্য
উদাহরণ| তাঁর পরিকল্পনা ও
নির্দেশনায় ‘রক্তকরবী’, ‘মনের কথা’, ‘নতুন
কুঁড়ি’ ও ‘মুখরা রমণী
বশীকরণ’-এর মতো নাটক
ও অনুষ্ঠানমালা দর্শকের মনে গভীরভাবে রেখাপাত
করেছে| ইউনিসেফের বিখ্যাত ‘মীনা’ কার্টুন প্রজেক্ট এবং দক্ষিণ এশিয়ার
শিশুদের সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে তাঁর ব্যাপক ভূমিকা
ছিল| শিশুদের জন্য বিশ্বখ্যাত অনুষ্ঠান
‘সিসিমপুর’ তৈরিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান
রাখেন|
মুস্তাফা
মনোয়ার জলরঙে প্রচুর কাজ করেছেন| তাঁর
তুলিতে বাংলার চিরন্তন রূপপ্রকৃতি, নদী, গণমানুষের জীবন
এবং লোকজ ঐতিহ্য অনন্য
ভাষা পেয়েছে| তাঁর নির্মিত অসংখ্য
ভাস্কর্য সাধারণ ও শিল্পবোদ্ধাদের নজর
কেড়েছে|
তিনি
ছিলেন সব্যসাচী শিল্পী| তাঁর শিল্প ভাবনা
অত্যন্ত গভীর, জীবন ও জনমুখী
এবং মানবিক চেতনাসমৃদ্ধ| তিনি মনে করতেন,
শিল্প মানুষের জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা
এক জীবন্ত মাধ্যম| একে কেবল দেয়ালে
টাঙিয়ে রাখলে শিল্পের প্রতি যথার্থ মূল্যায়ন হয় না| যখন
সাধারণ মানুষ অন্যায় বা শোষণের বিরুদ্ধে
মুখ খুলতে পারে না, তখন
শিল্পকে কথা বলতে হয়|
এই বিশ্বাসের প্রমাণ মেলে ১৯৫২ সালের
ভাষা আন্দোলনে কার্টুন এঁকে তাঁর কারাবরণ
এবং ১৯৭১ সালের মহান
মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী শিবিরে পাপেটের মাধ্যমে অবরুদ্ধ মানুষের মনে সাহস ও
আশার আলো জাগানোর মধ্য
দিয়ে|
কলকাতা
আর্ট কলেজ থেকে স্বর্ণপদকসহ
প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েও তিনি কেবল
ক্যানভাস আর গ্যালারির ড্রয়িংরুমে
নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, কাজের মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনকে বেছে নিয়েছিলেন| কেননা
তিনি বুঝেছিলেন এর মাধ্যমে শিল্পকে
কোটি কোটি সাধারণ মানুষের
কাছে অনায়াসে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব| তিনি নন্দনতত্ত্বের সাথে
সাধারণ মানুষের ভাষা ও অনুভূতির
সমš^য় ঘটিয়েছিলেন| তাঁর
শিল্প ভাবনার সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে
ছিল শিশুরা| তিনি মনে করতেন,
ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুদের শিল্পের
সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়, তবে তারা
মানবিক গুণসম্পন্ন ও সৃজনশীল মানুষ
হিসেবে গড়ে উঠবে| তিনি
শিশুদের ‘দার্শনিক সততা’য় মূল্যায়ন
করতেন বলে তাদেরকে শুধু
সাধারণ দর্শক মনে করতেন না|
সহজ গল্প, পাপেট শো এবং ছবি
আঁকার মাধ্যমে তিনি শিশুদের কল্পনাশক্তিকে
ডানা মেলতে শিখিয়েছেন| তাঁর কাছে পাপেট
কেবল শিশুদের সস্তা বিনোদন ছিল না| তিনি
বলতেন, “পাপেটের মধ্যেই সব শিল্পকলা আছে|”
কারণ পাপেট প্রদর্শনের মাধ্যমে ভাস্কর্য, চিত্রকলা, নাটক, সঙ্গীত এবং নৃত্যের এক
অনন্য সমাহার ঘটে| তিনি সম্পূর্ণ
স্বদেশীয় লোকজ উপাদান ও
ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে পাপেটের নতুনতর
রূপ দিয়েছিলেন| তিনি তাঁর সহকর্মী
ও শিক্ষার্থীদের সবসময় একটি মৌলিক কথা
বলতেন— “দেখতে শিখতে হবে|” তিনি মেঘ, বাতাস,
নদী এবং প্রকৃতির রূপকে
গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বলতেন| তাঁর
মতে, প্রকৃতিকে নিজের কল্পনায় ধারণ করে তবেই
সেটিকে নিজস্ব সৃজনশীলতায় রূপ দিতে হয়|
তাঁর জলরং ও ড্রয়িংয়ে
এই প্রাকৃতিক ও লোকজ ঐতিহ্যের
গভীর প্রভাব ছিল| তাঁর প্রয়াণে
শিল্প জগৎ একজন অভিভাবককে
হারাল| তাঁর চলে যাওয়ায়
যে ক্ষতি হলো, তা অন্য
কাউকে দিয়ে পূরণ সম্ভব
নয়|
মুস্তাফা
মনোয়ার কর্মজীবন শুরু করেন পূর্বপাকিস্তান
চারু ও কারুকলার মহাবিদ্যালয়ে
প্রভাষক হিসেবে| এরপর শিল্পকলা একাডেমির
মহাপরিচাক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার ও এফডিসির ব্যবস্থাপনা
পরিচালক এবং শিশু একাডেমির
চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন|
মুাস্তাফা
মনোয়ার ১৯৩৫ সালের পহেলা
সেপ্টেম্বর মাগুরা শ্রীপুর থানার অন্তর্গত নাকোল গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন| তাঁর ˆপতৃক নিবাস ঝিনাইদহ
জেলার শৈলকূপা থানার মনোহরপুর গ্রামে| তাঁর বাবা ছিলেন
বিখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা|
মাতা জামিলা খাতুন ছিলেন একজন গৃহিণী| ছয়
ভাইবোনের মধ্যে মুস্তাফা মনোয়ার সর্বকনিষ্ঠ| ছোটবেলায় মাত্র পাঁচ বছর বয়সে
তাঁর মা মারা যান|
তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু কলকাতায়|
প্রথম ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতার একটি শিশু বিদ্যাপীঠে|
পরবর্তীতে তাঁর বাবা হুগলি
জেলা থেকে বাকুড়া হয়ে
বাংলাদেশে ফিরে আসেন| দেশে
এসে প্রথমে ফরিদপুর তারপর স্থায়ীভাবে ঢাকায় শান্তিনগরে বাড়ি ক্রয় করে
থাকতে শুরু করেন| মাতৃহীন
হওয়ায় নারায়ণঞ্জে মেজ বোনের বাড়িতে
আশ্রয় নেন| সেখানে নারায়ণগঞ্জ
সরকারি স্কুলে তাঁকে ভর্তি করা হয়| নারায়ণগঞ্জ
গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস
করে কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন| কিন্তু সেখানে
তিনি পড়াশোনা না করে কলকাতা
চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে
ভর্তি হন| ১৯৫৯ সালে
কলকাতা চারু ও কারুকলা
মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে
প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন|
কাজের
স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার| ২০০৪ সালে তিনি
শিল্পকলায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার
প্রদত্ত একুশে পদকে ভূষিত হন|
১৯৫৭ সালে কলকাতার একাডেমি
অফ ফাইন আর্টস আয়োজিত
নিখিল ভারত চারু ও
কারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স শাখায় শ্রেষ্ঠ কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন| ২০১৯
সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রদত্ত ‘সুলতান স্বর্ণ পদক’সহ আরও
অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন| তাঁর মতো
একজন মহত্তম শিল্পীর প্রয়াণে গভীর শোক ও
শ্রদ্ধা রইল|

বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬
দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী, ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা, শিল্প নির্দেশক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নির্মাতা মুস্তাফা মনোয়ার বাঙালির শিল্পচর্চার নান্দনিক ভুবনে এক আইকনিক উদাহরণ হয়ে থাকবেন— তাঁর কর্ম, ব্যক্তিত্ব ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে| দীর্ঘ ৯০ বছরের জীবনে তিনি তাঁর শিল্পচর্চা থেকে এতটুকু বিচ্যুত হননি| নিরবচ্ছিন্ন কর্মময় জীবনের যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই লেগেছে শিল্পের নিবিড় স্পর্শ| তিনি যতগুলো শাখায় কাজ করেছেন, প্রত্যেকটি শাখাই পরবর্তীতে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে| বিশেষ করে শিশুমনে তিনি যেভাবে শিল্পের রঙ ছড়াতে পেরেছেন, তাঁর আগে আর কোনো শিল্পী বাঙালি শিশুহৃদয় এভাবে জয় করার দৃষ্টান্ত বিরল| এছাড়া টেলিভিশন অনুষ্ঠানে শিল্প নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় তাঁর অসামান্য বাগ্মীতা ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে এক-একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে| কবি পরিবারে জন্ম হওয়ায় সেই শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে এসব গুণ ভর করেছিল| এলোমেলো ছবি আঁকার মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল তাঁর শিল্প জীবন| পরবর্তীতে ভাষা সংগ্রাম, সঙ্গীত চর্চা, পাপেট চর্চা, শিল্প চর্চা, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ— সবই যেন তাঁর বেলায় অনায়াসসাধ্য ঘটনার মাতোই ঘটেছে|
শিল্পী
মুস্তাফা মনোয়ার একবার ছাত্রাবস্থায় বেড়াতে যান দার্জিলিংয়ে| মুগ্ধ
হন এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
দেখে| জেগে ওঠে তাঁর
প্রকৃতিমুগ্ধ শিল্পী মন| আঁকেন বেশ
কিছু ছবি| যেখানে জীবন্ত
হয়ে ওঠে এক অপার
সৌন্দর্যের পাহাড়ী ভূমি দার্জিলিং| এই
ছবিগুলোই তাঁর জীবনের গল্পকে
নতুন দিকে ধাবিত করে|
শিল্পবোদ্ধাদের অবাক করে দেওয়া
এই ছবিগুলোই তাঁর জীবনে প্রথম
খ্যাতি এনে দেয়| তাঁর
ছবি নিয়ে ঢাকায় প্রদর্শনী
হয়| শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের সেই যাত্রা আর
কখনো অধোগামী হয়নি|
আবার
যখন তিনি মাত্র নবম
শ্রেণির ছাত্র, নারায়ণগঞ্জ থেকে শুনতে পান
ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছে| ঢাকায়
ভাষার জন্য প্রাণ দিচ্ছে
ছাত্ররা, বাংলা ভাষাকে কেড়ে নিতে শুরু
হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের অপরাজনীতি; তখন তিনি দেশপ্রেম
চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আঁকতে শুরু
করেন একের পর এক
ছবি| নারায়ণগঞ্জের দেয়ালে দেয়ালে শোভা পেতে থাকে
ভাষা আন্দোলনকে উপলক্ষ করে মুস্তাফা মনোয়ারের
আঁকা নানা চিত্রকর্ম| তৎকালীন
শাসকের চোখে তা ভাল
না ঠেকায় গ্রেফতার করা হয় শিল্পীকে,
সঙ্গে তাঁর ভগ্নিপতিকেও ধরে
নিয়ে যাওয়া হয়| দু’জনকেই
পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকার কেন্দ্রীয়
কারাগারে| সেই থেকে তাঁর
স্বদেশ ও মাতৃভাষার প্রতি
প্রেম— যা আমৃত্যু শিরোধার্য
করে রেখেছিলেন|
১৯৭১
সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান
দিবসে টেলিভিশনে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শন করে রাত দশটায়
অনুষ্ঠান শেষ করাই ছিল
নির্ধারিত নিয়ম| কিন্তু শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুষ্ঠান মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা হয়| এরপর
পতাকাপ্রদর্শন ব্যতীতই অনুষ্ঠান শেষ করে দেন|
এই ঘটনা ছিল স্বাধীনতাকামী
বাঙালির জন্য সাহসী প্রতিবাদ|
এ ঘটনা তাঁর সহকর্মীদের
মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে|
“১৯৭১-এর মার্চে অসহযোগ
আন্দোলন চলাকালে টেলিভিশন থেকে ফজল-এ-খোদা রচিত ও
আজাদ রহমান সুরারোপিত ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’
গণসংগীতের পরিচালনায় ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার| গানটি দশজন শিল্পী গেয়েছিলেন,
কিন্তু যখন গানটি প্রচারিত
হয় তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের
দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল
যেন কয়েক শ’ শিল্পী
একত্রে গানটি গাইছেন| এটি সম্ভব হয়েছিল
মুস্তাফা মনোয়ারের অসাধারণ নির্দেশনার কারণে| কোনো গানকে একটি
অনন্য শৈল্পিক রূপ দেয়ার এটা
প্রকৃষ্ট উদাহরণ| টেলিভিশনে সেই গানটির প্রচারের
ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে শহীদ জননী জাহানারা
ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতে|” [উইকিপিডিয়া]
বাংলাদেশের
স্বাধীনতাযুদ্ধে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ|
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করার সময় তিনি
মুজিবনগর সরকারের সাংস্কৃতিক দলের অন্যতম নেতৃত্ব
প্রদান করেন| ভারতের নানা জায়গায় সাংস্কৃতিক
কর্মসূচি ও প্রদর্শনী করে
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে বিশেষ
ভূমিকা পালন করেন| পাকিস্তানি
বাহিনীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে ভারতে
আশ্রয় নেওয়া ভীত-সন্ত্রস্ত বাঙালি
শরণার্থীদের মানসিক শক্তি বাড়াতে তিনি প্রথম পাপেট
শো-এর আয়োজন করেন|
তিনি পাপেটের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসক ও সৈন্যদের
ব্যঙ্গ করে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের
বীরত্ব তুলে ধরে শরণার্থী
শিবিরের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন|
এই কারণে শরণার্থীরা তাঁকে ভালোবেসে ‘পুতুলওয়ালা’ নামে ডাকতে শুরু
করে| মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর এই অসামান্য
কীর্তি ও পাপেট শো’র দৃশ্য মার্কিন
চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিনের ধারণকৃত ফুটেজে এবং পরবর্তীতে তারেক
মাসুদের বিখ্যাত ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রেও প্রামাণ্য
দলিল হিসেবে রয়েছে|
শিল্পী
মুস্তাফা মনোয়ার শিশুদের নিয়ে কাজ করতেন
বলে এদেশের বেশ কয়েকটি প্রজন্ম
তাঁকে কোনোদিন ভুলতে পারবে না| একসময় এদেশের
একমাত্র দূরদর্শন ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন|
মুস্তাফা মনোয়ার জীবনের দীর্ঘ একটা সময় কাটিয়েছেন
বিটিভিতে চাকরি করে| আর সেখান
থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশুরা
তাঁর কাজ দেখে মুগ্ধ
হয়ে তাঁর অনুরাগী হয়ে
ওঠে| বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিশুদের ছবি আঁকা শেখানোর
মতো মহত্তম কাজের সঙ্গে জড়িত থাকাকে তিনি
দায়িত্ব মনে করতেন| অগণিত
শিশু প্রথম রংতুলির আঁচড় শিখেছে মুস্তাফা
মনোয়ারের কাছ থেকে! বাংলাদেশে
পাপেট চর্চায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন তিনি| বাংলাদেশের নতুন শিল্পআঙ্গিক পাপেটের
বিকাশে সারা জীবন কাজ
করে গেছেন| এটি ছিল তাঁর
অত্যন্ত প্রিয় শিল্পমাধ্যম| লোকঐহিত্য বা ফোক কালচারের
ওপর গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন
তাঁর পাপেটধারা| তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি
‘পারুল’ চরিত্র| ‘পারুল’ নামটির সঙ্গে সঙ্গে সেই সাত ভাই
জাগানো লোকগল্পের কথা মনে হয়|
পারুল সাত ভাইয়ের একমাত্র
বোন; সেই-ই তো
একদিন সাত ভাইকে জাগিয়েছিল|
এই পৃথিবীতে আবার নবজাগরণের ঘটনাটা
খুব সম্ভবত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার সেই ‘পারুল’ বোনটির
মাধ্যমেই ঘটাতে চান| পাপেট নিয়ে
রয়েছে তাঁর বহুদেশ ভ্রমণের
অভিজ্ঞতা| প্রথমবার তিনি তাঁর নিজের
পাপেট দলসহ বাংলাদেশের ফোক
পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে
মস্কো ও তাসখন্দ সফর
করেন| সেখানে বাংলাদেশের ফোক পাপেট ব্যাপক
প্রশংসা অর্জন করে|
টেলিভিশন
নাটকে তাঁর শিল্পভাবনার প্রতিফলন
নাটকগুলোকে নবপ্রাণ সঞ্চার করেছে| তিনি শুধু ছবি
আঁকা কিংবা শিল্পভাবনায়ই নিমজ্জিত ছিলেন না; ছিলেন শিল্পকলার
একজন মহৎ শিক্ষক| তাঁর
উদার ও প্রগতিশীল মানসিকতার
স্বাক্ষর রেখেছেন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে| ঢাকা কেন্দ্রীয় শহিদ
মিনারের পিছনের লালবৃত্তটি ছিলই তাঁরই ভাবনাজাত|
দ্বিতীয় সাফ গেমসের জন্য
মিশুক নির্মাণ তার কাজের উল্লেখযোগ্য
উদাহরণ| তাঁর পরিকল্পনা ও
নির্দেশনায় ‘রক্তকরবী’, ‘মনের কথা’, ‘নতুন
কুঁড়ি’ ও ‘মুখরা রমণী
বশীকরণ’-এর মতো নাটক
ও অনুষ্ঠানমালা দর্শকের মনে গভীরভাবে রেখাপাত
করেছে| ইউনিসেফের বিখ্যাত ‘মীনা’ কার্টুন প্রজেক্ট এবং দক্ষিণ এশিয়ার
শিশুদের সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে তাঁর ব্যাপক ভূমিকা
ছিল| শিশুদের জন্য বিশ্বখ্যাত অনুষ্ঠান
‘সিসিমপুর’ তৈরিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান
রাখেন|
মুস্তাফা
মনোয়ার জলরঙে প্রচুর কাজ করেছেন| তাঁর
তুলিতে বাংলার চিরন্তন রূপপ্রকৃতি, নদী, গণমানুষের জীবন
এবং লোকজ ঐতিহ্য অনন্য
ভাষা পেয়েছে| তাঁর নির্মিত অসংখ্য
ভাস্কর্য সাধারণ ও শিল্পবোদ্ধাদের নজর
কেড়েছে|
তিনি
ছিলেন সব্যসাচী শিল্পী| তাঁর শিল্প ভাবনা
অত্যন্ত গভীর, জীবন ও জনমুখী
এবং মানবিক চেতনাসমৃদ্ধ| তিনি মনে করতেন,
শিল্প মানুষের জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা
এক জীবন্ত মাধ্যম| একে কেবল দেয়ালে
টাঙিয়ে রাখলে শিল্পের প্রতি যথার্থ মূল্যায়ন হয় না| যখন
সাধারণ মানুষ অন্যায় বা শোষণের বিরুদ্ধে
মুখ খুলতে পারে না, তখন
শিল্পকে কথা বলতে হয়|
এই বিশ্বাসের প্রমাণ মেলে ১৯৫২ সালের
ভাষা আন্দোলনে কার্টুন এঁকে তাঁর কারাবরণ
এবং ১৯৭১ সালের মহান
মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী শিবিরে পাপেটের মাধ্যমে অবরুদ্ধ মানুষের মনে সাহস ও
আশার আলো জাগানোর মধ্য
দিয়ে|
কলকাতা
আর্ট কলেজ থেকে স্বর্ণপদকসহ
প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েও তিনি কেবল
ক্যানভাস আর গ্যালারির ড্রয়িংরুমে
নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, কাজের মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনকে বেছে নিয়েছিলেন| কেননা
তিনি বুঝেছিলেন এর মাধ্যমে শিল্পকে
কোটি কোটি সাধারণ মানুষের
কাছে অনায়াসে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব| তিনি নন্দনতত্ত্বের সাথে
সাধারণ মানুষের ভাষা ও অনুভূতির
সমš^য় ঘটিয়েছিলেন| তাঁর
শিল্প ভাবনার সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে
ছিল শিশুরা| তিনি মনে করতেন,
ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুদের শিল্পের
সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়, তবে তারা
মানবিক গুণসম্পন্ন ও সৃজনশীল মানুষ
হিসেবে গড়ে উঠবে| তিনি
শিশুদের ‘দার্শনিক সততা’য় মূল্যায়ন
করতেন বলে তাদেরকে শুধু
সাধারণ দর্শক মনে করতেন না|
সহজ গল্প, পাপেট শো এবং ছবি
আঁকার মাধ্যমে তিনি শিশুদের কল্পনাশক্তিকে
ডানা মেলতে শিখিয়েছেন| তাঁর কাছে পাপেট
কেবল শিশুদের সস্তা বিনোদন ছিল না| তিনি
বলতেন, “পাপেটের মধ্যেই সব শিল্পকলা আছে|”
কারণ পাপেট প্রদর্শনের মাধ্যমে ভাস্কর্য, চিত্রকলা, নাটক, সঙ্গীত এবং নৃত্যের এক
অনন্য সমাহার ঘটে| তিনি সম্পূর্ণ
স্বদেশীয় লোকজ উপাদান ও
ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে পাপেটের নতুনতর
রূপ দিয়েছিলেন| তিনি তাঁর সহকর্মী
ও শিক্ষার্থীদের সবসময় একটি মৌলিক কথা
বলতেন— “দেখতে শিখতে হবে|” তিনি মেঘ, বাতাস,
নদী এবং প্রকৃতির রূপকে
গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বলতেন| তাঁর
মতে, প্রকৃতিকে নিজের কল্পনায় ধারণ করে তবেই
সেটিকে নিজস্ব সৃজনশীলতায় রূপ দিতে হয়|
তাঁর জলরং ও ড্রয়িংয়ে
এই প্রাকৃতিক ও লোকজ ঐতিহ্যের
গভীর প্রভাব ছিল| তাঁর প্রয়াণে
শিল্প জগৎ একজন অভিভাবককে
হারাল| তাঁর চলে যাওয়ায়
যে ক্ষতি হলো, তা অন্য
কাউকে দিয়ে পূরণ সম্ভব
নয়|
মুস্তাফা
মনোয়ার কর্মজীবন শুরু করেন পূর্বপাকিস্তান
চারু ও কারুকলার মহাবিদ্যালয়ে
প্রভাষক হিসেবে| এরপর শিল্পকলা একাডেমির
মহাপরিচাক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার ও এফডিসির ব্যবস্থাপনা
পরিচালক এবং শিশু একাডেমির
চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন|
মুাস্তাফা
মনোয়ার ১৯৩৫ সালের পহেলা
সেপ্টেম্বর মাগুরা শ্রীপুর থানার অন্তর্গত নাকোল গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন| তাঁর ˆপতৃক নিবাস ঝিনাইদহ
জেলার শৈলকূপা থানার মনোহরপুর গ্রামে| তাঁর বাবা ছিলেন
বিখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা|
মাতা জামিলা খাতুন ছিলেন একজন গৃহিণী| ছয়
ভাইবোনের মধ্যে মুস্তাফা মনোয়ার সর্বকনিষ্ঠ| ছোটবেলায় মাত্র পাঁচ বছর বয়সে
তাঁর মা মারা যান|
তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু কলকাতায়|
প্রথম ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতার একটি শিশু বিদ্যাপীঠে|
পরবর্তীতে তাঁর বাবা হুগলি
জেলা থেকে বাকুড়া হয়ে
বাংলাদেশে ফিরে আসেন| দেশে
এসে প্রথমে ফরিদপুর তারপর স্থায়ীভাবে ঢাকায় শান্তিনগরে বাড়ি ক্রয় করে
থাকতে শুরু করেন| মাতৃহীন
হওয়ায় নারায়ণঞ্জে মেজ বোনের বাড়িতে
আশ্রয় নেন| সেখানে নারায়ণগঞ্জ
সরকারি স্কুলে তাঁকে ভর্তি করা হয়| নারায়ণগঞ্জ
গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস
করে কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন| কিন্তু সেখানে
তিনি পড়াশোনা না করে কলকাতা
চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে
ভর্তি হন| ১৯৫৯ সালে
কলকাতা চারু ও কারুকলা
মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে
প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন|
কাজের
স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার| ২০০৪ সালে তিনি
শিল্পকলায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার
প্রদত্ত একুশে পদকে ভূষিত হন|
১৯৫৭ সালে কলকাতার একাডেমি
অফ ফাইন আর্টস আয়োজিত
নিখিল ভারত চারু ও
কারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স শাখায় শ্রেষ্ঠ কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন| ২০১৯
সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রদত্ত ‘সুলতান স্বর্ণ পদক’সহ আরও
অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন| তাঁর মতো
একজন মহত্তম শিল্পীর প্রয়াণে গভীর শোক ও
শ্রদ্ধা রইল|

আপনার মতামত লিখুন