যেমন নীরবে নিভৃতে ছিলেন, তেমন নীরবেই চলে গেলেন আশির দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি ও কথাসাহিত্যিক ভাস্কর চৌধুরী| কবিতা ছিল তাঁর সাহিত্যচর্চার প্রধান বিষয়| সাহিত্যমহলে তাঁর বিশেষ পরিচিতি তৈরি করে দেয় ‘আমার বন্ধু নিরঞ্জন’ শীর্ষক কবিতাটি| দুই বাংলার বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত আবৃত্তি শিল্পীর কণ্ঠে অনেকের শোনা এই কবিতাটি|
তবে
ভাস্কর চৌধুরীকে আমার ব্যক্তিগত চেনা
তাঁর কথাসাহিত্য দিয়ে| তাঁর লেখার মূল
বিষয়বস্তু বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি ও মানুষ|
আদিবাসীদের সুখ-দুঃখ| জন্মশহর
চাঁপাইনবাবগঞ্জ| শিক্ষাজীবন কেটেছে রাজশাহী শহরে| তাই বরেন্দ্রভূমি এবং
এই ভূমির আদিবাসীদের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক
ছিল| তিনি নানা সময়
সাঁওতাল পল্লীতে থেকেছেন| তাদের দৈনন্দিন জীবনপ্রবাহ, বিশ্বাস, রীতিনীতি, আচার-আচরণ সবই
তিনি ভেতর থেকে পর্যবেক্ষণ
করেছেন| নিজেও আত্মস্থ করেছেন এর অনেক কিছু|
সেই
অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখেছেন
তাঁর সিগনেচার উপন্যাস ‘ধনসা মাতি ও
তার জীবনবৃক্ষ’| প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে|
সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় ও নৃতত্ত্ব নিয়ে
এই এপিকধর্মী উপন্যাসটি নানা কারণে গুরুত্ব
পাওয়ার দাবিদার|
উপন্যাসের
কেন্দ্রীয় চরিত্র ধনসা মাতি| ধনসার
মধ্যে দিয়ে লেখক সাঁওতাল
জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস ও অস্তিত্ব টিকিয়ে
রাখার সংগ্রাম উপস্থাপন করেছেন| উপন্যাসটি শুরু হয়েছে একটি
মহাবয়ানের ভেতর দিয়ে| শুরুটা
হয়েছে এভাবে, ‘ধনসা মাতি এক
দুপুরে, যখন আদিগন্ত বরেন্দ্রে
খরা, খাঁ খাঁ করছে
চারদিক, বাউরি বাতাসে ধুলো আসমানমুখো— তখন
সেই কালো গুমোট শূন্যতায়
বায়ু ধুলোকে পাক দিয়ে উড়িয়ে
জনপদের দিকে আসছিল, ল্যাংটা
কিছু কালো বাদুর বাচ্চার
মতো ছেলেমেয়ে দৌড়ে দৌড়ে বলছিল,
‘বাপো, বাঁড়ুল আলছে|’ ঠিক এসময় ধনসা
মাতি গভীর ধ্যান থেকে
চোখ মুঁদে বলেছিল, ‘এ বছর প্যাটে
যা পাবি বাঁন্ধিস| ফসল
হইবে না|’
ধনসা
যৌবনে লেঠেল ছিল| ঢিবিকাটা দলের
সর্দার হয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে
শতশত ঢিবি কেটে চাষের
জমি বানিয়েছে| তার স্ত্রী আর
উপপত্নীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানে
এলাকাটা সাঁওতালে ভরে ওঠে| ধনসা
মাতির নেতৃত্বে সাঁওতাল পল্লীর পত্তন ঘটল| ধনসা এই
জনপদ দেখে অবাক হয়|
সে ঠাওর করতে পারে
না কোথায় কার ঘরে তার
কত ছেলেমেয়ের জন্ম হয়েছে| ধনসা
এখন কয়েক প্রজন্মের পিতৃপুরুষ|
তাঁর বেঁচে থাকার কাল রহস্যময়| সে
কয়েকশ’ বছর আগের ইতিহাসও
এমন করে বর্ণনা করে
যে তখন সে উদ্দীপ্ত
তরুণ| ঝাপসা স্মৃতি দিয়ে ধরে রাখে
জাতির ইতিহাস| সে বলে, ‘এইঠে
সমাজটা তো হামার ছোট
নাগপুর বুলো আর মিদনাপুর
বাঁকুড়া বুলো, ঐঠে পাথর জমি
আর না খাওয়া মড়কের
জীবন ছিল বটেক| তো
সমাজ যুদি থাকে তো
ভগবানও আসে| আর ভগবানের
জাইত গোইত্র সগাই তো ঐ
সাদা ঠাকুর| ই এক জ্বালা|
ভগবানটা একটা পৃথিবী চালাইলে
পারে না| তার নাকি
ঠাউর দেবতা লাগে| তারা ভোগ খাইলে
যে পন্তাটা থাকার কথা সেই পন্তা
আর পাছার কাপড় উধাও হয়
বাপো| তাই হামাদের সমাজে
নেংটি আছে|’
ধনসা
যখন রাজশাহীর মিশন হাসপাতালে শুয়ে,
সেই রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, নীলফামারী, ডোমার, পার্বতীপুর, এমনকি ভারতের মিদনাপুর থেকেও লোক এসেছে তাকে
দেখতে| তারা জেনেছে তাদের
পূর্বপুরুষদের কালের একজন বেঁচে আছে|
তার কাছে নিজেদের অতীত
সময়ের কথা জানতে এসেছে|
উপন্যাসটি
সাঁওতালদের জাতিসত্তা, তাদের নৃতত্ত্ব, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, বাংলাদেশ অংশে তাদের আগমন
ও দীর্ঘ ৮৫ বছর পর
এদেশ ত্যাগের অমানবিক কারণ এবং বিদ্রোহের
কাহিনিসহ একটি জাতি গড়ে
ওঠা ও বিনাশের ইতিহাস
আমাদের সামনে তুলে ধরেছে|
এই উপন্যাস লেখার পেছনের গল্প বলতে গিয়ে
ভাস্কর চৌধুরী তাঁর এক সাক্ষাৎকারে
বলেছেন, ‘১৯৯৭ থেকেই আদিবাসী
চরিত্র চিত্রণের চেষ্টা চলছে আমার লেখায়|
‘লালমাটি কালো মানুষ’, ‘গন্তব্যহীন
যাত্রা’ বা ‘ঘোরলাগা ঘোর’
উপন্যাসে আমি বরেন্দ্রের আদিবাসীদের
নিয়ে কিছু চরিত্রচিত্রণে চেষ্টা
করেছি| ‘ধনসা মাতি ও
তার জীবনবৃক্ষ’ উপন্যাসে বরেন্দ্রের জমিনে আরম্ভ করতে গিয়ে আমি
হঠাৎ এক ধনসাকে দিয়েই
গোটা সাঁওতাল জাতি সম্পর্কে লিখে
যেতে মনস্থ করলাম|’
এ কারণে উপন্যাসটির নৃতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক মূল্য তৈরি হয়েছে| ঐতিহাসিক
সূত্রের সাথে সাঁওতালদের বাস্তব
চিন্তাকে ধনসা মাতির মাধ্যমে
বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছে| উপন্যাসের শক্তিমত্তা প্রকাশ পেয়েছে এর আঞ্চলিক ভাষা
ব্যবহারের মধ্য দিয়ে| লেখক
এখানে দু ধরনের গান
ব্যবহার করেছেন| সাঁওতাল জাতি তাদের নানা
অনুষ্ঠানে হাজার বছরের সাঁওতালি ভাষার গান ব্যবহার করে|
লেখক বিবাহ, জন্ম, মৃত্যু, এসবে সাঁওতালি ভাষার
গান ব্যবহার করেছেন| আর দৈনন্দিন জীবনে
হাড়িয়া খেয়ে নাচের তালে
তালে তারা যে গান
করে সেগুলিতে ব্যবহার করেছেন স্থানীয় কথ্য বাংলা| কিন্তু
সুর সাঁওতালী| উপন্যাসের প্রয়োজনে এরকম প্রায় চল্লিশটি
গান লিখেছেন লেখক ভাস্কর চৌধুরী|
বাংলা সাহিত্যে এটি একটি বাড়তি
সংযোজন বলে আমি মনে
করি| লেখকের সংগৃহীত ও রচিত গানের
একটি করে নমুনা নিচে
তুলে ধরছি:
লেখকের
সংগ্রহ থেকে:
গান-১
বালাম
রেগে রড় মেনাঃক লান্দা
মেনাক কাথা
মেনাঃক
মনিরে, তিরিয়ো রেগে মুনি মনদো
মেনাঃক
আমাঃক
মনে মুন ইঞরে ইঞাঃক
মনে মনি আমরে
মনে
মনে মনি তড়ে সুতামতে
তল ইনারে|
লেখকের
রচনা থেকে:
গান-১
ধনসা
মাতি ভগবানে বুলিছে,
শালের
পাতা ক্যানে আজি কান্দে রে,
ধনসা
তুমি ই কথাটা কহ
সালের
পাতা ক্যানে আজি কান্দে রে
ওরে
হামার রূপার খাঁচার
সোনার
পাখি ই ই ই
ই
আঁখি
যুদি বুনজে রে এ এ
এ ধনসা
তুমি
কাঁদনের কথা কহ
জীবন
হামার জনম দুঃখী
বাপের
ঘরে নাইরে পাখি
পাখি
রে ছাড়িলো কে রে ধনসা,
তুমি
পাখির কথা কহ
শাল
পাতা পাঠাইলা মুদাইল আর কাঁকনে
শাল
ডাল পাঠাইলা তানোর আর রহনপুরে
শাল
ছড়া পাঠাইলা বদলগাছি রে এ এ
এ
ধনসা
তুমি শালগাছের গুপ্ত কথা কহ ও
ও ও
এমন
একজন শক্তিমান লেখকের যথার্থ মূল্যায়ন আমরা করতে পারিরি|
হিসেব করলে দেখা যাবে
কম লেখেননি তিনি| গল্প, উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ মিলে প্রায় ৪০টি
বই| লেখক হিসেবে তাঁর
সময়ের অনেক লেখকের চেয়ে
অগ্রবর্তী মানুষ ছিলেন| কিন্তু সেই অর্থে তাঁর
প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি তাঁকে
দেওয়া হয়নি| এর কারণ মূলত
সাহিত্যের রাজনীতি| এক্ষেত্রে ভাস্কর চৌধুরীর কোনো ব্যর্থতা নেই,
ব্যর্থতা আমাদের সাহিত্যসমাজের| ভাস্কর চৌধুরী একেবারে লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন না| তিনি রাজধানীতেই
থাকতেন| আশি ও নব্বইয়ের
দশকের প্রভাবশালী কবিরা তাঁকে শুধু চিনতেনই না,
কারো কারো ঘনিষ্ঠ বন্ধুও
ছিলেন| কিন্তু তারপরও কেউ ভাস্কর চৌধুরীকে
তাঁর উপযুক্ত সম্মানটুকু প্রাপ্তিতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ
করেননি| দেশে বাংলা একাডেমিসহ
বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কারের প্রচলন আছে| তিনি যোগ্য
দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও তাঁর
নাম কোথাও উচ্চারিত হতে শুনিনি| অবশ্য
এ নিয়ে কিছুটা হতাশা
থাকলেও কখনো কোনো লেখকবন্ধুর
কাছে সেটা প্রকাশ করেননি
তিনি| সাহিত্যের সভা-সমিতি এড়িয়ে
বছরের পর বছর নিজের
কক্ষে বসে থেকে আপনমনে
কবিতা লিখে গেছেন| প্রার্থনার মতো প্রতিদিন নিয়ম
করে কবিতাচর্চা করে গেছেন| লিখেছেন
উপন্যাস ‘শামুক’| ‘ধনসা মাতি ও
তার জীবনবৃক্ষ’ যেখানে একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর
ইতিহাস উপন্যাস, ‘শামুক’ সেখানে ভারতবর্ষ অতিক্রম করে বিশ্বের আখ্যান
হয়ে উঠেছে|
প্রায়
৫৩০পৃষ্ঠার উপন্যাস ‘স্বপ্নজাল’, পঞ্চাশের দশকে ঘরপালানো এক
যুবকের গল্প| ষোল বছর বয়সে
ভারত-বাংলাদেশে চোরাচালানে মুটে থেকে তার
উত্থান| এরপর ভারববর্ষের শীর্ষ
ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে| তার
কর্মের পরিধি ও বিস্তার ধরে
আখ্যানে ভারত, থাইল্যান্ড, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, রাশিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব প্রভৃতি
দেশের মানুষ ও রাজনীতি ঢুকে
পড়েছে|
ধর্ষণের
শিকার তনুকে উৎসর্গ করে লিখেছেন ‘চার্জশীট’
নামের আরেকটি একটি উপন্যাস| এর
আগে তিনি লেখেন ‘লাল
মাটি কালো মানুষ’ (১৯৯৮),
‘স্বপ্নপুরুষ’ (১৯৯৮), ‘মীমাংসা পর্ব’ (১৯৯৮), ‘আষাড়ুর জীবনদর্শন’ (১৯৯৯), ‘ভূমি’ (২০১১), ‘কৃষ্ণপুরাণ’ (২০১১), ‘কখনও কখনও এরকম
ঘটে’ (২০১২), ‘যুদ্ধে যাবার সময়’ (২০১৩), ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম’ (২০১৫),
‘গন্তব্যহীন যাত্রা’ (২০১৫), ঘোরলাগা ঘোর (২০১৫) প্রভৃতি
উপন্যাস|
‘রক্তপাতের
ব্যাকরণ’ নামে তাঁর যে
ছোটগল্পের বই, সেটা বাংলা
ছোটগল্পে অনন্য গ্রন্থের মর্যাদা পেতে পারে| তাঁর
অন্যান্য গল্পগ্রন্থ হলো: বাষট্টি বিঘা
নদী (১৯৮৭), কোথায় নিবাস (১৯৮৭), পণের সময় (১৯৮৮),
শনিবারের বৃষ্টি (১৯৯৯)| ছোটগল্পের পাশাপাশি ছিখেছেন অণুগল্পও| সংখ্যার বিচারে নিতান্তই কম না| বাছাই
করে ‘বনসাই গল্প’ নামে অণুগল্পের একটি
গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে| অন্যান্য গদ্যগ্রন্থের মধ্যে লিখেছেন ষাট ও সত্তর
দশকের স্মৃতিকথামূলকগ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’ এবং
প্রবন্ধগ্রন্থ ‘সাহিত্য তত্ত্ব ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’|
ভাস্কর
চৌধুরীর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আছে: আমার কেবলই
সমর্পণ (১৯৮৬), নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম
(২০১২), আমার ভেতরে আঁধার
(২০১২), পরানের গহীন (২০১২), গেরিলার মুখ (২০১৩), আমার
যতো ভালোবাসা (২০১৩), ভোরের কবিতা (২০১৩), আঁধার নেমে আসে (২০১৩),
এলোমেলো (২০১৩), হেমন্ত কাব্য (২০১৬), টান (২০১৬), আমার
মা কবি ছিলেন (২০১৬),
এ কোনো সুখের সময়
নয় (২০১৭), শব্দের সারি শব্দের বাড়ি
(২০১৮) এবং হাফপকেটে সন্ধ্যা
বুকপকেটে তুমি (২০১৯)| কয়েকখণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে বছরভিত্তিক লেখা কবিতাসমূহ| অগ্রন্থিত
আছে অসংখ্য কবিতা|
কবি
ভাস্কর চৌধুরী কথাসাহিত্যিক ও গদ্যলেখক হিসেবেও
আমাদের মনোযোগ পাওয়ার দাবিদার| তিনি
সশরীরে আর আমাদের মাঝে
নেই, তিনি এখন তাঁর
সৃষ্টির ভেতর দিয়ে আমাদের
ভাষা ও সাহিত্যে বেঁচে
থাকবেন|

বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬
যেমন নীরবে নিভৃতে ছিলেন, তেমন নীরবেই চলে গেলেন আশির দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি ও কথাসাহিত্যিক ভাস্কর চৌধুরী| কবিতা ছিল তাঁর সাহিত্যচর্চার প্রধান বিষয়| সাহিত্যমহলে তাঁর বিশেষ পরিচিতি তৈরি করে দেয় ‘আমার বন্ধু নিরঞ্জন’ শীর্ষক কবিতাটি| দুই বাংলার বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত আবৃত্তি শিল্পীর কণ্ঠে অনেকের শোনা এই কবিতাটি|
তবে
ভাস্কর চৌধুরীকে আমার ব্যক্তিগত চেনা
তাঁর কথাসাহিত্য দিয়ে| তাঁর লেখার মূল
বিষয়বস্তু বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি ও মানুষ|
আদিবাসীদের সুখ-দুঃখ| জন্মশহর
চাঁপাইনবাবগঞ্জ| শিক্ষাজীবন কেটেছে রাজশাহী শহরে| তাই বরেন্দ্রভূমি এবং
এই ভূমির আদিবাসীদের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক
ছিল| তিনি নানা সময়
সাঁওতাল পল্লীতে থেকেছেন| তাদের দৈনন্দিন জীবনপ্রবাহ, বিশ্বাস, রীতিনীতি, আচার-আচরণ সবই
তিনি ভেতর থেকে পর্যবেক্ষণ
করেছেন| নিজেও আত্মস্থ করেছেন এর অনেক কিছু|
সেই
অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখেছেন
তাঁর সিগনেচার উপন্যাস ‘ধনসা মাতি ও
তার জীবনবৃক্ষ’| প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে|
সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় ও নৃতত্ত্ব নিয়ে
এই এপিকধর্মী উপন্যাসটি নানা কারণে গুরুত্ব
পাওয়ার দাবিদার|
উপন্যাসের
কেন্দ্রীয় চরিত্র ধনসা মাতি| ধনসার
মধ্যে দিয়ে লেখক সাঁওতাল
জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস ও অস্তিত্ব টিকিয়ে
রাখার সংগ্রাম উপস্থাপন করেছেন| উপন্যাসটি শুরু হয়েছে একটি
মহাবয়ানের ভেতর দিয়ে| শুরুটা
হয়েছে এভাবে, ‘ধনসা মাতি এক
দুপুরে, যখন আদিগন্ত বরেন্দ্রে
খরা, খাঁ খাঁ করছে
চারদিক, বাউরি বাতাসে ধুলো আসমানমুখো— তখন
সেই কালো গুমোট শূন্যতায়
বায়ু ধুলোকে পাক দিয়ে উড়িয়ে
জনপদের দিকে আসছিল, ল্যাংটা
কিছু কালো বাদুর বাচ্চার
মতো ছেলেমেয়ে দৌড়ে দৌড়ে বলছিল,
‘বাপো, বাঁড়ুল আলছে|’ ঠিক এসময় ধনসা
মাতি গভীর ধ্যান থেকে
চোখ মুঁদে বলেছিল, ‘এ বছর প্যাটে
যা পাবি বাঁন্ধিস| ফসল
হইবে না|’
ধনসা
যৌবনে লেঠেল ছিল| ঢিবিকাটা দলের
সর্দার হয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে
শতশত ঢিবি কেটে চাষের
জমি বানিয়েছে| তার স্ত্রী আর
উপপত্নীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানে
এলাকাটা সাঁওতালে ভরে ওঠে| ধনসা
মাতির নেতৃত্বে সাঁওতাল পল্লীর পত্তন ঘটল| ধনসা এই
জনপদ দেখে অবাক হয়|
সে ঠাওর করতে পারে
না কোথায় কার ঘরে তার
কত ছেলেমেয়ের জন্ম হয়েছে| ধনসা
এখন কয়েক প্রজন্মের পিতৃপুরুষ|
তাঁর বেঁচে থাকার কাল রহস্যময়| সে
কয়েকশ’ বছর আগের ইতিহাসও
এমন করে বর্ণনা করে
যে তখন সে উদ্দীপ্ত
তরুণ| ঝাপসা স্মৃতি দিয়ে ধরে রাখে
জাতির ইতিহাস| সে বলে, ‘এইঠে
সমাজটা তো হামার ছোট
নাগপুর বুলো আর মিদনাপুর
বাঁকুড়া বুলো, ঐঠে পাথর জমি
আর না খাওয়া মড়কের
জীবন ছিল বটেক| তো
সমাজ যুদি থাকে তো
ভগবানও আসে| আর ভগবানের
জাইত গোইত্র সগাই তো ঐ
সাদা ঠাকুর| ই এক জ্বালা|
ভগবানটা একটা পৃথিবী চালাইলে
পারে না| তার নাকি
ঠাউর দেবতা লাগে| তারা ভোগ খাইলে
যে পন্তাটা থাকার কথা সেই পন্তা
আর পাছার কাপড় উধাও হয়
বাপো| তাই হামাদের সমাজে
নেংটি আছে|’
ধনসা
যখন রাজশাহীর মিশন হাসপাতালে শুয়ে,
সেই রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, নীলফামারী, ডোমার, পার্বতীপুর, এমনকি ভারতের মিদনাপুর থেকেও লোক এসেছে তাকে
দেখতে| তারা জেনেছে তাদের
পূর্বপুরুষদের কালের একজন বেঁচে আছে|
তার কাছে নিজেদের অতীত
সময়ের কথা জানতে এসেছে|
উপন্যাসটি
সাঁওতালদের জাতিসত্তা, তাদের নৃতত্ত্ব, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, বাংলাদেশ অংশে তাদের আগমন
ও দীর্ঘ ৮৫ বছর পর
এদেশ ত্যাগের অমানবিক কারণ এবং বিদ্রোহের
কাহিনিসহ একটি জাতি গড়ে
ওঠা ও বিনাশের ইতিহাস
আমাদের সামনে তুলে ধরেছে|
এই উপন্যাস লেখার পেছনের গল্প বলতে গিয়ে
ভাস্কর চৌধুরী তাঁর এক সাক্ষাৎকারে
বলেছেন, ‘১৯৯৭ থেকেই আদিবাসী
চরিত্র চিত্রণের চেষ্টা চলছে আমার লেখায়|
‘লালমাটি কালো মানুষ’, ‘গন্তব্যহীন
যাত্রা’ বা ‘ঘোরলাগা ঘোর’
উপন্যাসে আমি বরেন্দ্রের আদিবাসীদের
নিয়ে কিছু চরিত্রচিত্রণে চেষ্টা
করেছি| ‘ধনসা মাতি ও
তার জীবনবৃক্ষ’ উপন্যাসে বরেন্দ্রের জমিনে আরম্ভ করতে গিয়ে আমি
হঠাৎ এক ধনসাকে দিয়েই
গোটা সাঁওতাল জাতি সম্পর্কে লিখে
যেতে মনস্থ করলাম|’
এ কারণে উপন্যাসটির নৃতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক মূল্য তৈরি হয়েছে| ঐতিহাসিক
সূত্রের সাথে সাঁওতালদের বাস্তব
চিন্তাকে ধনসা মাতির মাধ্যমে
বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছে| উপন্যাসের শক্তিমত্তা প্রকাশ পেয়েছে এর আঞ্চলিক ভাষা
ব্যবহারের মধ্য দিয়ে| লেখক
এখানে দু ধরনের গান
ব্যবহার করেছেন| সাঁওতাল জাতি তাদের নানা
অনুষ্ঠানে হাজার বছরের সাঁওতালি ভাষার গান ব্যবহার করে|
লেখক বিবাহ, জন্ম, মৃত্যু, এসবে সাঁওতালি ভাষার
গান ব্যবহার করেছেন| আর দৈনন্দিন জীবনে
হাড়িয়া খেয়ে নাচের তালে
তালে তারা যে গান
করে সেগুলিতে ব্যবহার করেছেন স্থানীয় কথ্য বাংলা| কিন্তু
সুর সাঁওতালী| উপন্যাসের প্রয়োজনে এরকম প্রায় চল্লিশটি
গান লিখেছেন লেখক ভাস্কর চৌধুরী|
বাংলা সাহিত্যে এটি একটি বাড়তি
সংযোজন বলে আমি মনে
করি| লেখকের সংগৃহীত ও রচিত গানের
একটি করে নমুনা নিচে
তুলে ধরছি:
লেখকের
সংগ্রহ থেকে:
গান-১
বালাম
রেগে রড় মেনাঃক লান্দা
মেনাক কাথা
মেনাঃক
মনিরে, তিরিয়ো রেগে মুনি মনদো
মেনাঃক
আমাঃক
মনে মুন ইঞরে ইঞাঃক
মনে মনি আমরে
মনে
মনে মনি তড়ে সুতামতে
তল ইনারে|
লেখকের
রচনা থেকে:
গান-১
ধনসা
মাতি ভগবানে বুলিছে,
শালের
পাতা ক্যানে আজি কান্দে রে,
ধনসা
তুমি ই কথাটা কহ
সালের
পাতা ক্যানে আজি কান্দে রে
ওরে
হামার রূপার খাঁচার
সোনার
পাখি ই ই ই
ই
আঁখি
যুদি বুনজে রে এ এ
এ ধনসা
তুমি
কাঁদনের কথা কহ
জীবন
হামার জনম দুঃখী
বাপের
ঘরে নাইরে পাখি
পাখি
রে ছাড়িলো কে রে ধনসা,
তুমি
পাখির কথা কহ
শাল
পাতা পাঠাইলা মুদাইল আর কাঁকনে
শাল
ডাল পাঠাইলা তানোর আর রহনপুরে
শাল
ছড়া পাঠাইলা বদলগাছি রে এ এ
এ
ধনসা
তুমি শালগাছের গুপ্ত কথা কহ ও
ও ও
এমন
একজন শক্তিমান লেখকের যথার্থ মূল্যায়ন আমরা করতে পারিরি|
হিসেব করলে দেখা যাবে
কম লেখেননি তিনি| গল্প, উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ মিলে প্রায় ৪০টি
বই| লেখক হিসেবে তাঁর
সময়ের অনেক লেখকের চেয়ে
অগ্রবর্তী মানুষ ছিলেন| কিন্তু সেই অর্থে তাঁর
প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি তাঁকে
দেওয়া হয়নি| এর কারণ মূলত
সাহিত্যের রাজনীতি| এক্ষেত্রে ভাস্কর চৌধুরীর কোনো ব্যর্থতা নেই,
ব্যর্থতা আমাদের সাহিত্যসমাজের| ভাস্কর চৌধুরী একেবারে লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন না| তিনি রাজধানীতেই
থাকতেন| আশি ও নব্বইয়ের
দশকের প্রভাবশালী কবিরা তাঁকে শুধু চিনতেনই না,
কারো কারো ঘনিষ্ঠ বন্ধুও
ছিলেন| কিন্তু তারপরও কেউ ভাস্কর চৌধুরীকে
তাঁর উপযুক্ত সম্মানটুকু প্রাপ্তিতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ
করেননি| দেশে বাংলা একাডেমিসহ
বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কারের প্রচলন আছে| তিনি যোগ্য
দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও তাঁর
নাম কোথাও উচ্চারিত হতে শুনিনি| অবশ্য
এ নিয়ে কিছুটা হতাশা
থাকলেও কখনো কোনো লেখকবন্ধুর
কাছে সেটা প্রকাশ করেননি
তিনি| সাহিত্যের সভা-সমিতি এড়িয়ে
বছরের পর বছর নিজের
কক্ষে বসে থেকে আপনমনে
কবিতা লিখে গেছেন| প্রার্থনার মতো প্রতিদিন নিয়ম
করে কবিতাচর্চা করে গেছেন| লিখেছেন
উপন্যাস ‘শামুক’| ‘ধনসা মাতি ও
তার জীবনবৃক্ষ’ যেখানে একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর
ইতিহাস উপন্যাস, ‘শামুক’ সেখানে ভারতবর্ষ অতিক্রম করে বিশ্বের আখ্যান
হয়ে উঠেছে|
প্রায়
৫৩০পৃষ্ঠার উপন্যাস ‘স্বপ্নজাল’, পঞ্চাশের দশকে ঘরপালানো এক
যুবকের গল্প| ষোল বছর বয়সে
ভারত-বাংলাদেশে চোরাচালানে মুটে থেকে তার
উত্থান| এরপর ভারববর্ষের শীর্ষ
ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে| তার
কর্মের পরিধি ও বিস্তার ধরে
আখ্যানে ভারত, থাইল্যান্ড, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, রাশিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব প্রভৃতি
দেশের মানুষ ও রাজনীতি ঢুকে
পড়েছে|
ধর্ষণের
শিকার তনুকে উৎসর্গ করে লিখেছেন ‘চার্জশীট’
নামের আরেকটি একটি উপন্যাস| এর
আগে তিনি লেখেন ‘লাল
মাটি কালো মানুষ’ (১৯৯৮),
‘স্বপ্নপুরুষ’ (১৯৯৮), ‘মীমাংসা পর্ব’ (১৯৯৮), ‘আষাড়ুর জীবনদর্শন’ (১৯৯৯), ‘ভূমি’ (২০১১), ‘কৃষ্ণপুরাণ’ (২০১১), ‘কখনও কখনও এরকম
ঘটে’ (২০১২), ‘যুদ্ধে যাবার সময়’ (২০১৩), ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম’ (২০১৫),
‘গন্তব্যহীন যাত্রা’ (২০১৫), ঘোরলাগা ঘোর (২০১৫) প্রভৃতি
উপন্যাস|
‘রক্তপাতের
ব্যাকরণ’ নামে তাঁর যে
ছোটগল্পের বই, সেটা বাংলা
ছোটগল্পে অনন্য গ্রন্থের মর্যাদা পেতে পারে| তাঁর
অন্যান্য গল্পগ্রন্থ হলো: বাষট্টি বিঘা
নদী (১৯৮৭), কোথায় নিবাস (১৯৮৭), পণের সময় (১৯৮৮),
শনিবারের বৃষ্টি (১৯৯৯)| ছোটগল্পের পাশাপাশি ছিখেছেন অণুগল্পও| সংখ্যার বিচারে নিতান্তই কম না| বাছাই
করে ‘বনসাই গল্প’ নামে অণুগল্পের একটি
গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে| অন্যান্য গদ্যগ্রন্থের মধ্যে লিখেছেন ষাট ও সত্তর
দশকের স্মৃতিকথামূলকগ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’ এবং
প্রবন্ধগ্রন্থ ‘সাহিত্য তত্ত্ব ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’|
ভাস্কর
চৌধুরীর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আছে: আমার কেবলই
সমর্পণ (১৯৮৬), নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম
(২০১২), আমার ভেতরে আঁধার
(২০১২), পরানের গহীন (২০১২), গেরিলার মুখ (২০১৩), আমার
যতো ভালোবাসা (২০১৩), ভোরের কবিতা (২০১৩), আঁধার নেমে আসে (২০১৩),
এলোমেলো (২০১৩), হেমন্ত কাব্য (২০১৬), টান (২০১৬), আমার
মা কবি ছিলেন (২০১৬),
এ কোনো সুখের সময়
নয় (২০১৭), শব্দের সারি শব্দের বাড়ি
(২০১৮) এবং হাফপকেটে সন্ধ্যা
বুকপকেটে তুমি (২০১৯)| কয়েকখণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে বছরভিত্তিক লেখা কবিতাসমূহ| অগ্রন্থিত
আছে অসংখ্য কবিতা|
কবি
ভাস্কর চৌধুরী কথাসাহিত্যিক ও গদ্যলেখক হিসেবেও
আমাদের মনোযোগ পাওয়ার দাবিদার| তিনি
সশরীরে আর আমাদের মাঝে
নেই, তিনি এখন তাঁর
সৃষ্টির ভেতর দিয়ে আমাদের
ভাষা ও সাহিত্যে বেঁচে
থাকবেন|

আপনার মতামত লিখুন