সবাইকে কি পরীক্ষায় পাস করতেই হবে?
পাস কর, নইলে মর!প্রথম কথাটি উচ্চারিত হলেও পরের কথাটি অনুচ্চারিত। অথচ বাস্তবে তা যথেষ্ট সত্য। একজন পরীক্ষার্থী কত কারণে খারাপ ফল করতে পারে, তা সমাজের অনেকেই জানেন না। যেসব বাবা-মায়ের নিজের কোনো সনদ নেই, তাদেরও সন্তানকে নিয়ে আশা আকাশছোঁয়া! একটি পরীক্ষা যেকোনো কারণে খারাপ হতে পারে। এমনকি কোনো কারণে অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।আমার মেয়ে এবার জিপিএ-৫ পায়নি। আত্মীয়স্বজনের আড়চোখে তাকানো দেখেছি। অনেকে মুখে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে নেতিবাচক মন্তব্য করে ঢোক গিলে ফেলেছেন। আবার কেউ কেউ প্রচণ্ড সমালোচনাও করেছেন। বুঝেও চুপ থেকেছি। আরেকটু দেখে নিয়েছি মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।কিন্তু এরপরও আমি জানি, আমার সন্তান ভালো ফল করেছে। এটাই তার সত্যিকারের ফলাফল। শিক্ষামন্ত্রীও চেয়েছেন প্রকৃত ফলাফল বেরিয়ে আসুক। আমরা যেন অনেক বেশি নম্বর পাওয়া বা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো ফল দেখে আপ্লুত না হই!আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঠিক করতে হলে সত্যিকার অর্থেই মানসম্মত শিক্ষার দিকে যেতে হবে। আমার সন্তানের মা বলেছেন, তুমি অনেক কিছু করতে পারবে। কারণ, তুমি পরীক্ষা শেষ করে এখন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তুলেছ। আমাদের কাছে যোগ্যতা অর্জনই অনেক বড় বিষয়।তিনি আরও বলেছেন, তুমি যদি অকৃতকার্যও হতে, তবে মানুষকে কী বলব, সেটাও আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম। তোমাকে ছোট করে এমন কোনো কথা অন্তত পরিবার থেকে উচ্চারণ করব না।আত্মহত্যার ঘটনাগুলো বরাবরের মতোই কানে আসছে। গাজীপুরের শ্রীপুরে সিয়াম নামে এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর শুনলাম। চিরকুটে লিখেছে, ‘মা, আমি তোমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারলাম না।’ কথাটির ওজন অনেক। সন্তানেরও হয়তো স্বপ্ন অনেক বড় ছিল। ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে পানি ঝরেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই অনেক কিছু মিথ্যা মনে হয়েছে। ভেবেছি, আমরা পেরে উঠছি না। আমরা শুধু শিক্ষিত বানানোর নামে একটি প্রতিযোগিতায় নেমেছি! এ খেলা অসম, এ খেলা নিজেদের শেষ করে দেওয়ার!সমাজে এমন সব রোগ ছড়িয়ে পড়েছে, যার কারণে আমাদের মনোজগতে একধরনের মৃত্যু ঘটছে। প্রতিযোগিতা চলছে নম্বরে নম্বরে। বাবা-মায়েরা ঘেমে যান সন্তানের প্লে-শ্রেণির ফল প্রকাশের দিন থেকেই। আধা নম্বর কম পেলেও শিক্ষকের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেন, কেন কম পেল!শিক্ষকেরাও আধা নম্বর বাড়িয়ে সন্তানকে পাস করিয়ে মায়েদের মুখে অমলিন হাসি দেখার অভ্যাস করে ফেলেছেন!আমরা যারা সামাজিক মানুষ, কোনো শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে আগেই বলে দিই, ‘আগেই জানতাম, এমনই হবে!’যে শিক্ষার্থীর মা-বাবা তাকে খোঁটা দেন, তার ওপর সামাজিকভাবেও এমন আচরণ করা হলে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে বাধ্য। তার কাছে তখন এ কথাটিই সত্য হয়ে ওঠে—‘পাস কর, অথবা মর!’পাসের প্রতিযোগিতায় আমরা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছি যে গত বছরগুলোতে আমাদের পাসের ফল কিনতেও বাধ্য করা হয়েছে! এবার অন্তত ক্ষান্ত দিন। মানসম্মত শিক্ষার দিকে আসুন। সন্তান সবাই পাস করবে, পড়বে, সনদ নেবে, চাকরি করবে, টাকা আনবে—শুধু এটাই কি জীবনের লক্ষ্য?সেদিন কক্সবাজারে একটি ছেলের সঙ্গে দেখা হলো। দারুণ গান গায়। ছেলেটি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। পড়াশোনায় খুব ভালো ফল করে না। কিন্তু সে ভালো গান গায়। সে যদি শুধু গানই গায়, তবুও কি জীবিকা অর্জন করতে পারবে না? যদি শুধু জীবিকার জন্যই পড়াশোনা করতে হয়, তবে যেকোনো সৎ উপায়েই সে তা করতে পারে। যাই হোক, সবাই একই পথে হাঁটবে না।আমাদের বাচ্চাদের একটু শান্তিতে পড়াশোনা করার সুযোগ দিন। পাস-ফেল পাশাপাশি শব্দ। আবার ‘ব্যর্থতাই সাফল্যের স্তম্ভ’—কথাটিও পরীক্ষিত সত্য। তাদের প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দিন।যে শিক্ষার্থী ফেল করেছে, তার বাবা-মা হিসেবে তার পাশে গিয়ে বলুন, জীবনটা এমনই। এবার তুমি খারাপ করেছ, তার মানে এই নয় যে তুমি আর ভালো করতে পারবে না। পরেরবার তুমি সবার চেয়ে ভালো করবে। আর পড়াশোনায় ভালো না করলেও জীবনে ভালো মানুষ হবে।কষ্টের সময় তাকে জাপটে ধরে ছোটবেলার মতো বলুন, ‘বাবা/মা, চলো ঘুরতে যাই। দূরে কোথাও ঘুরে আসি। শক্তি নিয়ে আসি, আবার পড়বে!’পড়াশোনা তো বাঁচার জন্যই, সুন্দরভাবে বাঁচার জন্যই। পড়তে গিয়ে মৃত্যুর শিক্ষা কে দিল এই জগতে! সন্তানকে মানসিক নিরাপত্তা দেওয়াও আপনার দায়িত্ব।শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও এ বিষয়ে কিছু নীতিমালা জারি করা প্রয়োজন। আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয় কারা, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রকাশ করা দরকার।অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষার জন্য কীভাবে সহায়তা দেওয়া যায়, সবাই মিলে তার একটি কাঠামো তৈরির সময় এসেছে।সন্তানেরা বাঁচার জন্য পড়ুক। মানুষের মতো মানুষ হওয়ার জন্য পড়ুক!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: রসায়নবিদ]