সংবাদ

আমি দেশপ্রেমিক, কিন্তু জাতীয়তাবাদী নই


মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
প্রকাশ: ২ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৪ এএম

আমি দেশপ্রেমিক, কিন্তু জাতীয়তাবাদী নই
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হতে পারে যে ‘দেশপ্রেম’ (patriotism)  ও ‘জাতীয়তাবাদ’(nationalism)  এ দু’টো শব্দের অর্থ একই এবং তার দ্বারা একই কথা বোঝানো হয়। কিন্তু সেটি মোটেও সত্য নয়। আমি মার্কসবাদে দীক্ষিত একজন কমিউনিস্ট। আমি নিজেকে একজন ‘দেশপ্রেমিক’ বলে ভাবি, কিন্তু নিজেকে কখনোই একজন ‘জাতীয়তাবাদী’ বলে মনে করি না। কেন? এর কারণটি আমি এখানে সংক্ষেপে ব্যক্ত  করব।

তার আগে, এ বিষয়ে যে ক্ষেত্রে গুরুতর ভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয় সেটি প্রথমে পরিস্কার করে নেয়া প্রয়োজন। আগেই বলেছি যে আমি ‘জাতীয়তাবাদী’ নই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ‘জাতীয়তাবাদ’ অথবা ‘জাতীয়তাবাদীদের’ প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি হলো শত্রুমূলক ও বৈরী। বরঞ্চ একথা আমি দৃঢ় প্রত্যয়ে বলবো যে—অনেক ক্ষেত্রেই, বিশেষতঃ একটি নিপীড়িত জাতির ক্ষেত্রে, জাতীয়তাবাদ প্রায়সই রাজনীতিতে ইতিবাচক এবং এমনকি কখনো কখনো প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করে। সুতরাং, এমন ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতি কমিউনিস্টদের মনোভাব যে বন্ধুসুলভ হবে সেটিই স্বাভাবিক। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যেই সম্পর্ক গড়ে উঠতে পেরেছিল।

কিন্তু এ তো গেলো জাতীয়তাবাদের প্রতি কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কি হবে, সে বিষয়ে কথা। তার মানে কি তবে এই যে ‘কমিউনিস্ট’ আদর্শ ও ‘জাতীয়তাবাদের’ আদর্শ একই চরিত্রের? না! কারণ একটি হলো ভিন্ন আদর্শের প্রতি ‘দৃষ্টিভঙ্গির’ বিষয় এবং অপরটি হলো আদর্শগত ‘আত্মপরিচয়ের বিষয়। এই দু’টি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলার কারণে অনেক বিভ্রান্তির জন্ম হয়। ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রতি কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে যতো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই থাকুক না কেন, আদর্শগত আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে একজন কমিউনিস্ট কখনই ‘জাতীয়তাবাদী’ হতে পারে না। কেউ কেউ আবার বলছেন যে আমরা ‘জাতীয়তাবাদী’ নই ঠিকই, কিন্তু ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের মতো রণধ্বনি করে আমাদেরকে এখন লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পরতে হবে। কমিউনিস্টরা যেমন তাদের আত্মপরিচয়কে ‘জাতীয়তাবাদের’ দ্বারা চিহ্নিত করতে পারে না, তেমনি তারা তাদের সংগ্রামের মূল রণধ্বনিকে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দ্বারা নির্ধারণ করতে পারে না। কারণ তা হবে তার কমিউনিস্ট আত্মপরিচয় বিসর্জন দিয়ে ‘জাতীয়তাবাদী’ আদর্শ গ্রহণ করার মতো বিষয়।

এবার তবে মূল কথায় ফেরা যাক। যেকোনো মানুষের জন্য দেশপ্রেম হলো একটি মহৎ গুণ। এটি হলো তার পরম গর্ব ও অহঙ্কারের বিষয়। নিজের জাতি ও নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসাই হলো দেশপ্রেম। দেশপ্রেমিক মানুষের স্বার্থবোধ ও চিন্তার পরিমণ্ডল ক্ষুদ্র ব্যক্তিসত্তার গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। ব্যক্তি ও পরিবারের সংকীর্ণ জগতকে অতিক্রম করে সে দেশ ও জাতির স্বার্থ ও সত্তার সাথে নিজেকে একাকার করে ফেলে। বিশ্ব জগতে সে তখন আর একক একটি ব্যক্তি মাত্র হয়ে থাকে না, সে হয়ে ওঠে সমষ্টির অঙ্গীভূত। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকের ক্ষেত্রে এই উত্তরণের প্রক্রিয়া ও সমষ্টি-বোধ তার স্বাভাবিক ধারায় তাকে পৌঁছে দেয় বিশ্ব মানবতার চেতনায়। এ কারণে তার নিজের দেশপ্রেম কখনোই অন্য আরেক ভিন্ন দেশ ও জাতির মানুষের দেশপ্রেমের বৈরী বা প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে না। সব জাতির মানুষের নিজ নিজ দেশপ্রেম হয়ে ওঠে একে অপরের পরিপূরক। একজন ‘প্রকৃত’ দেশপ্রেমিকের কাছে তার স্বদেশ ও স্বজাতি হয়ে ওঠে বিশ্বলোকের মহামানবের একটি অংশ, তারই সৌরভিত পুষ্পকাননের অন্যতম অলঙ্কার। দেশপ্রেমিকের স্বদেশ-প্রেমের স্বরূপ ঠিক এমনটাই।

কবিগুরু তাই আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন—

‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া

 বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘জাতীয়তাবাদের’ তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ্ব-মানবের কবি। তিনি একইসাথে ছিলেন প্রবলভাবে দেশপ্রেমিক। কবিগুরু বলে গেছেন যে, ‘বিশ্ব-মানবের প্রতি ভালোবাসা-বোধের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যেমন কিনা প্রকৃত দেশপ্রেমের নিখুঁত স্ফুরণ ঘটতে পারে না, ঠিক তেমনি প্রগাঢ় দেশপ্রেমকে উপেক্ষা করে সত্যিকার মানবপ্রেম জাগরিত হতে পারে না।’

স্বজাতি ও স্বদেশের প্রতি ভালোবাসাই হলো দেশপ্রেম। এখন প্রশ্ন হলো, এই স্বজাতি ও স্বদেশ ব্যাপারটি আসলে কী? এটা কি মানব জন্মের আদিলগ্ন থেকে মানবসত্তার অন্তর্গত একটি অন্তর্নিহিত উপাদান? নাকি তা ইতিহাসের ধারায় সুনির্দিষ্ট বাস্তবতায় আবির্ভূত একটি সামাজিক উপাদান? পরের কথাটি যদি সত্য হয় তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—কীভাবে ঘটেছে তার এই উদ্ভব?

জাতিসত্তা-বোধ হলো ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা একটি উপলব্ধি, একটি চেতনা। বিস্তৃত ভূমণ্ডলে মানুষের উপস্থিতি বহুকালের। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষরা ক্রমে পরস্পরের সংস্পর্শে এসেছে, জীবন ধারণের প্রয়োজনে গোষ্ঠীবদ্ধ ও সমাজবদ্ধ হয়েছে। ইতিহাসের প্রত্যক্ষ প্রমাণ হলো এই যে, নানা উত্থান-পতন, বাঁধা-বিঘ্ন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত সত্ত্বেও মানুষ ক্রমাগতই একে অপরের নিকটবর্তী হয়েছে ও হচ্ছে। এই ক্রম-ধারাবাহিকতাতেই স্বজাতি-বোধের উদ্ভব। ইতিহাসের ধারাতেই নৃতত্ত্ব, ভূগোল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলবায়ু ও আবহাওয়া, ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনাচার, অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থা— প্রভৃতি নানা উপাদানের যুগ যুগ ব্যাপী ধারাবাহিক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানব সমাজের পৃথক পৃথক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজ নিজ স্বজাতি-বোধ গড়ে ওঠেছে। প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে এই নিবিড় বন্ধন সূত্রটি নাড়ির বন্ধনের মতোই তার জন্মলগ্ন থেকেই স্থাপিত হয়। এই স্বজাতি-বোধটা যেন তার মায়ের কোল, তার স্বাভাবিক শারীরিক-মানসিক আশ্রয়স্থল। নানা সূত্রের এক অদৃশ্য, কিন্তু বস্তুগত গাঁথুনি দ্বারা, স্বজাত্যবোধের এই অনুভূতি সৃষ্টি হয়।

এই স্বজাতি-বোধের উৎপত্তি মানুষের ইচ্ছা নিরপেক্ষ। কিন্তু এই বোধের সৃজন অথবা তার পচন অনেকটাই নির্ভর করে একদিকে যেমন মানুষের নিজের উপর, তেমনি তা নির্ধারিত হয় স্বদেশ ও সমাজের চরিত্রের দ্বারা। চেতনায় এই স্বজাতি-বোধের গড়ে ওঠার ব্যাটারটি অগণন বাস্তব উপাদানের ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত এবং তা সময়ের পরিক্রমায় গভীরতর ভিত্তি পেয়েছে।

এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হলো— বিকাশের বৈচিত্রময়তার কারণেই একেকটি ভৌগলিক গণ্ডির মধ্যে বসবাসরত মানুষদেরকে নিয়েই পৃথক পৃথক স্বজাত্যবোধ বিকশিত হয়েছে। এভাবে জাতি-পরিচয় সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে নির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকার সাথে। রাজ্য-সাম্রাজ্যের ভাঙা-গড়া সত্ত্বেও জাতীয় আত্মপরিচয় নিয়ে পৃথিবীর একেকটি এলাকায় একেকটি জাতিসত্তার মানুষ যুগ যুগ ধরে বসবাস করেছে ও নিজ নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উদ্ভবের পর বিকাশ ঘটেছে জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। এভাবে স্বদেশ অনেকটা পরিমাণে একটি স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক রূপ অর্জন করেছে। স্বজাতির চেতনার সাথে এভাবেই সংযুক্ত হয়েছে স্বদেশের অনুভূতি। “স্বজাতির” প্রতি নিবিড় আকর্ষণ ও ভালোবাসার আবেগ ক্রমেই রূপ পেয়েছে “স্বদেশের” প্রতি ভালোবাসায়। সেই ভালোবাসার নামই হলো দেশপ্রেম।

কিন্তু এই স্বদেশ শুধু চিহ্নিত একটি ভূখণ্ড, তার গাছ-পালা, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, জলবায়ু-মৃত্তিকা প্রভৃতির সমাহারই কেবলমাত্র নয়। স্বদেশের শ্রেষ্ঠতম ও অমূল্য উপাদান হলো স্বদেশের মানুষ। স্বদেশের মানুষ নিয়েই স্বজাতির গঠন। তাই, দেশপ্রেমের প্রধান উপাদান, তার মর্মকথা হলো দেশের আপামর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশকে ভালোবাসতে হলে সর্বাগ্রে দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হয়।

একটি দেশের সব মানুষ কিন্তু কোনো একক ও অখণ্ড সত্তা নয়। আদিম সাম্যবাদী সমাজের সময়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত মানবজাতির ইতিহাস হলো শ্রেণী বিভাজন ও শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। এক সময় সমাজ বিভক্ত ছিল মুষ্টিমেয় দাস মালিক ও অগণিত ক্রীতদাস— এই দুই শ্রেণীতে। তারপরে সমাজ বিভক্ত হয়েছে সামন্তপ্রভু ও ভূমিদাস অথবা প্রজাকুল হিসেবে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতেও সমাজে রয়েছে প্রধানত দুটি পরস্পর স্বার্থবিরোধী শ্রেণী— পুঁজিপতি ও শ্রমজীবী। রয়েছে শোষক শ্রেণী ও শোষিত শ্রেণী। শোষকরা মুষ্টিমেয়, হাতেগোনা গুটিকয়েক। শোষিতরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শোষক আর শোষিত— দু’পক্ষকেই একই সাথে ভালোবাসা যায় না। শোষিত মানুষকে ভালোবাসতে হলে যারা তাদেরকে শোষণ করে, সেই শোষকদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। শোষক শ্রেণীর শোষণকে ঘৃণা করতে হয়।

দেশপ্রেমের অভিপ্রকাশ যদি হয় স্বদেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা, তাহলে তার মূর্ত রূপ হতে হবে এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত দেশবাসীর প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু, সেই ভালোবাসা নিরর্থক ও নিষ্ফল—বন্ধ্যা হয়ে থাকবে যদি সেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী চিরদিন পুঁজিবাদের শোষণ জালে অর্থাৎ মজুরি-দাসত্বের শিকলে বাঁধা পড়ে থাকে। দেশৈর অগণিত মানুষের ওপর চলতে থাকা অমানবিক শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যের জিঞ্জির মেনে নিয়ে দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। চলমান শোষণমূলক সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু থাকতে দিয়ে, সেই ব্যবস্থার গায়ে শুধু উপরভাসা সংস্কারের মলম লাগিয়ে মানুষের জীবন-জীবিকার যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা দিয়েও নির্ভেজাল দেশপ্রেম প্রদর্শিত হতে পারে না। প্রকৃত দেশপ্রেম দাবি করে শোষিত দেশবাসীর প্রতি ভালোবাসা এবং সেই ভালোবাসা দাবি করে শোষণমুক্তির সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা। তাই, প্রকৃত দেশপ্রেম স্বজাতি ও স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার তাড়নাতেই আমাদেরকে একই সাথে বিশ্ব মানবতার প্রতি উদার ভক্তি-শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় জাগরিত করে এবং সাথে সাথে শোষণমুক্তির সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে এবং এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। এসবই হলো প্রকৃত দেশপ্রেমের অন্যতম মর্মবাণী ও উপাদান। তদ্রুপ বিচারে আমি নিজেকে একজন দেশপ্রেমিক বলে বিবেচনা করি।

এখন দেখা যাক, ‘জাতীয়তাবাদ’ কী? জাতীয়তাবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ যেখানে জাতীয় পরিচয়কে সামাজিক ঐক্যের সর্বোচ্চ ও শীর্ষরূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মতাদর্শে একথা ধরে নেয়া হয় যে, ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে এমন কিছু রয়েছে যার কাছে শ্রেণীস্বার্থ, শোষণ ব্যবস্থা থাকা-নাথাকা, সামাজিক বিভাজন জনিত স্বার্থবোধ—ইত্যাদি সবকিছু অধীনস্ত থাকে। তাছাড়া জাতীয়তাবাদী মতাদর্শকে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পটভূমি নির্বিশেষ স্থান-কালের বিবেচনার ঊর্ধ্বে, একটি অনাদিকালের জন্য স্থায়ী ভাবাদর্শ ও ব্যবস্থারূপে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

বস্তুত, জাতীয়তাবাদ ও জাতি-রাষ্ট্রের বিষয়গুলো মানব সভ্যতার ইতিহাসে তুলনামূলকভাবে নতুন সংযোজন। কালক্রমে, যখন মানব সমাজের পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটেছিল, তখন আর্থ-সামাজিক প্রয়োজনে স্বতন্ত্র স্বজাতি-বোধের উপাদানকে নতুন মাত্রিকতা ও গুরুত্ব দেয়াটা বিশেষভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল। এভাবে, ‘স্বজাতি-বোধের’ স্বাভাবিক উপলব্ধি উত্তরণ ঘটেছিল ‘জাতীয়তাবাদের’ মতাদর্শে। এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন জাতিকে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো।

চার-পাঁচশ’ বছর আগেও রাজনীতি ও সমাজে জাতি-রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ভাবাদর্শ বলে তেমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। মানুষের স্বজাতি-বোধের। সাথে ভূ-রাজনীতির অথবা রাজনৈতিক আদর্শের কোনো শক্তিশালি ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না। রাজা-মহারাজারা যে ভূখণ্ড দখল করতে সক্ষম হতো, সেটাই হতো রাজ্যের (অর্থাৎ রাষ্ট্রের) ভূ-সীমানা ও ভৌগলিক গণ্ডি। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা দাস সমাজের ও সামন্তবাদী সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলার রাখার ক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি করত না। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা উদ্ভবের সাথে সাথে পুঁজির নিজস্ব স্বার্থেই বাজার দখল করা নিজ নিজ বাজার সংরক্ষণ এবং তা নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পুঁজিবাদের ‘বাজার-কর্তৃত্বের’ জন্য এই অন্তর্নিহিত তাগিদই জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের উন্মেষ ও জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব অনিবার্য করে তুলেছিল।  

প্রথমাবস্থায় ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রগতিবাদী ভূমিকা ছিল সাধালণভাবে মুখ্য। কিন্তু স্থান-কাল-ভেদে এই ভূমিকা ক্রমেই ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিতে শুরু করেছিল। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতে উত্তরণের ক্ষেত্রে যেসব জাতি ও জাতি-রাষ্ট্র অগ্রবর্তী থাকতে সক্ষম হয়েছিল, তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া জাতিগুলোকে পদানত করে সেখানে তাদের উপনিবেশ বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিল। এসব প্রভু-দেশ তাদের ঔপনিবেশিক শোষণ বিস্তারের জন্য জাতীয়তাবাদের মতাদর্শকে কাজে লাগিয়েছিল। এটি ছিল বৃহৎ শক্তির জাতীয়তাবাদ। আবার অন্যদিকে, পদানত ও ঔপনিবেশিক শাসনে আবদ্ধ জাতিগুলোর ক্ষেত্রে এই জাতীয়তাবাদী মতাদর্শই সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী বন্ধন মোচন করে স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ইতিবাচক আদর্শগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিল। তাই, এভাবে এবং আরো অন্য নানাভাবে “জাতীয়তাবাদের” দ্বিমুখী ভূমিকা ছিল বলে দেখা যায়।

নির্দিষ্ট স্থান, কাল ও ঐতিহাসিক পটভূমিতে জাতীয়তাবাদের ইতিবাচক এবং এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে একটা প্রগতিশীল ভূমিকা ভাবাদর্শ হিসেবে জাতীয়তাবাদের নেতিবাচক ও এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল অভিঘাতের বিপদের আশঙ্কার কথাটিও ভালোভাবে হিসেবে রাখাটাও একান্তভাবে বাঞ্ছনীয়। জাতীয়তাবাদের কতগুলো নেতিবাচক দিক ও সম্ভাব্য বিপদের কথা আমি আবার এখানে উল্লেখ করছি।

জাতীয়তাবাদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো জাত্যাভিমান। জাতি পরিচয়ই যে সহজাত কেন্দ্রিক বিষয়, এই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠার জন্য এবং তার পক্ষে আরও শক্তকরণ তুলে ধরার জন্য অপর আরেকটি তত্ত্বও তার সাথে সাথে হাজির করা হয়। সেই তত্ত্ব হলো-‘জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্ব’। এ ক্ষেত্রে বলা হতে থাকলো যে, যেহেতু ‘আমাদের জাতিই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি’ তাই অন্যান্য ‘অনগ্রসর, অসভ্য জাতিগুলোকে মানুষ করার’ ইতিহাস প্রদত্ত দায়িত্ব এই শ্রেষ্ঠতর বা শ্রেষ্ঠতম জাতির দাবিদারদেরকে নিজেদের হাতে নিতে হবে। এই তত্ত্বের আলোকে একসময় বৃটিশরা ভারতীয়দেরকে ÒWhite mens burdenÓ  বলে আখ্যায়িত করতো। জাতীয়তাবাদের এহেন প্রয়োগ ঔপনিবেশিক মতবাদ ও ব্যবস্থাকে লালন করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছিল। জাত্যাভিমানের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রকাশ হলো ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ, জিয়নবাদ এবং অতি সম্প্রতি সৃষ্ট নয়া-ফ্যাসিবাদ, ‘সাদা মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব’ (White supremacy), America First  (সর্বাগ্রে আমেরিকা)  ইত্যাদি। এসবের অনুকরণে আমাদের দেশের বাঙালিদের মাঝেও জাত্যাভিমানের প্রকাশ দেখা যায়। তা দেখা যায় পার্বত্য এলাকার জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি, এবং এমনকি ভিন্ন কোনো তরিকার অনুসারী আউল-বাউল, মুরশিদ অনুগত সমতলের মুসলিম সম্প্রদায়, সংখ্যাালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি অনুসৃত দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে। জাত্যাভিমানে আচ্ছন্ন জাতি নিজের দোষ-ত্রুটি-দুর্বলতা-ঘাটতি-অপরাধগুলোকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে অন্ধ হয়ে থাকে, আর নিজের শক্তি-সামর্থ্য-ক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করে দেখে। ফলে, জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ও প্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে গিয়ে এরূপ জাত্যাভিমানে আচ্ছন্ন জাতি নানা সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং শেষমেষ অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়ে। জাত্যাভিমান থেকেই উৎসারিত হয় ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’। নিজ জাতির তথাকথিত স্বার্থরক্ষায় কোনো অন্যায় কাজকেই তখন আর অন্যায্য মনে করা হয় না। অন্য জাতির ওপর নিজ জাতির আধিপত্য চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে এই তত্ত্ব ও মতবাদের আশ্রয় নেয়া হয়। পৃথিবীতে জাতিতে জাতিতে সহ-অবস্থান ও শান্তি-ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ নষ্ট হয়।

জাতীয়তাবাদের অন্যতম বড় বিপদ হলো তার অন্তর্নিহিত রক্ষণশীলতা। জাতীয় ঐতিহ্য ও জাতীয় ভাবধারা রক্ষার নামে নানা ধরনের বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও কূপমণ্ডূকতাকে সে লালন করে এবং উস্কে দেয়। জাতীয়তাবাদ এক ধরনের আত্মমুখীনতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার প্রবণতা ধারণ করে, যা কিনা বিশ্ব সভ্যতার অর্জন থেকে জাতির দূরত্বকে বাড়িয়ে দেয়। জাতীয়তাবাদ বিশ্ব সভ্যতার সাধারণ সর্বমানবিক ঐশ্বর্যময় সম্পদ থেকে আধার গ্রহণ করে স্বজাতিকে সমৃদ্ধ করার বদলে, ‘শ্রেষ্ঠ জাতির শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের’ নামে নিজের অতীত ও স্ব-গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখার প্রবণতা ধারণ করে। একটি জাতির মধ্যে তা ‘অতীতে ফিরে যাওয়ার’ (revivalism)  প্রবণতার জন্ম দেয়। এর ফলে, জাতি প্রগতিমুখীন না হয়ে রক্ষণশীল ও এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়ে।

জাতীয়তাবাদ অন্ধ একমুখীনতা ও সংকীর্ণতাবাদী প্রবণতাও লালন করে। জাতীয়তাবাদ দাবি করতে চায় যে— সমাজের মধ্যে শ্রেণী বিভাজন, শ্রেণী সচেতনতা, ইতিহাস ও সমাজ রূপান্তরে শ্রেণীর ভূমিকা, শোষক ও শোষিতের মধ্যে মৌলিক অমোচনীয় দ্বন্দ্ব, শোষিত মানুষের ঐক্য, মানবিক ও শোষণমুক্ত নতুন সভ্যতা নির্মাণে বিশ্বের শ্রমিক সংহতি ও আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি বিষয়গুলোর অন্যান্য সব বিষয়ের ঊর্ধ্বে এবং যা হলো সকলের কাছে সুপ্রিম গুরুত্ব সম্পন্ন বিষয়, তা হলো জাতির সার্বজনীন স্বকীয়তা।

একট পর্যায়ে জাতীয়তাবাদ শ্রমিক শ্রেণীর শোষণমুক্তির সংগ্রামের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। এদেশেও আমরা বহু দিন ধরে দেখে এসেছি জাতীয়তাবাদী শক্তি কীভাবে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ সেøাগানের বিপরীতে ‘বাংলার মজদুর এক হও’ সেøাগান উত্থাপনের জন্য চেষ্টা করেছে। কিংবা তাদের মুখে অতীতে শুনেছি এবং বর্তমানে আবার খুব বেশি করে উচ্চারিত হতে শুনছি ‘শ্রমিক-মালিক ভাই-ভাই, বাঙালির একতার বিনাশ নাই’ ইত্যাদি ধরনের নসিহত। অন্যদিকে, বৃহৎ ও শক্তিমান জাতির ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ যে আগ্রাসী, আধিপত্যবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, উপনিবেশবাদী ও নয়া-উপনিবেশবাদী এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ফ্যাসিবাদী, নাৎসিবাদী, জিয়নবাদী, তালেবানি জঙ্গিবাদী, প্যান-ইসলামবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের চরম প্রতিক্রিয়াশীলতায় পর্যবসিত হতে পারে তা সমসাময়িক ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায়।

এত তাত্ত্বিক কথায় না গিয়েও বাংলাদেশে ‘জাতীয়তাবাদের’ যে বাস্তব চেহারা আমরা দেখে চলেছি তা থেকেও এই আদর্শের স্বরূপ অনেকটাই স্পষ্ট হয়। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’— সেটা তো পাকিস্তানি ভাবাদর্শের একটি নরম সংস্করণ বৈ অন্য কিছু নয়। সে বিষয়ে বেশি আলোচনা না করলেও চলে। আর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ অনেক রকম ভূমিকাই আমরা দেখেছি, দেখে চলেছি। নিঃসন্দেহে একথা সত্য যে, বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় ও মুক্তিযুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আদর্শ ও জাতীয়তাবাদী শক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তার শীর্ষ পর্বে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এই জাতীয়তাবাদী শক্তির কোনো কোনো অংশ ’৭০-’৭১ সালেও হিটলারের মতো করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে বলে প্রচার চালিয়েছে, হিটলার রচিত ‘মেইন ক্যাম্ফ’ (আমার নেতা) বইটির আলোকে মতাদর্শ গ্রহণের ছবক দিয়েছে, আমেরিকা আমাদের স্বাধীনতার পাশে থাকবে বলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মোহগ্রস্ত থেকে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার সহায়তায় ‘স্বাধীনতা’ আনা যায় কিনা সেজন্য চেষ্টা করেছে। ইতিহাস এসব ঘটনার এবং এ ধরনের বহু ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। সাম্রাজ্যবাদের মন যুগিয়ে চলার জন্য জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী বলে দাবিদার বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী, ব্যীক্ত পরস্পরের মধ্যে তাবেদারির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। আর মাঠে-ময়দানে বিভিন্ন ঘরানার জাতীয়তাবাদী নেতা-কর্মী-ক্যাডারদের বাস্তব কার্যকলাপ হিসেবে হালুয়া-রুটির ভাগবাটোয়ারা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবিরবাজি, দখলবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে অসৎ পথে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদ-বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ-ইসলামী জাতীয়তাবাদ প্রভৃতির মধ্যে এবং তার প্রতিটির অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সমঝোতার খেলা চলছে। জাতীয়তাবাদীদের অব্যাহত খাই-খাই তৎপরতায় সাধারণ মানুষের জীবনে আজ নাভিঃশ্বাস উঠছে।

ইতিহাসকে বিকৃত বা মুছে ফেলা যায় না। একথা ঠিক যে ‘জয় বাংলা’ মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ছিল। সাথে সাথে একথাও সত্য যে তা আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শের গর্ভ থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। এই রণধ্বনি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং দেশবাসী তা গ্রহণ করেছিল। ১৯৭০ ও ১৯৭১ সাল ছিল মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত সম্পন্ন পর্ব ও তার তাৎক্ষণিক পূর্বের অধ্যায়। এই দুই বছর ‘জয় বাংলা’ যে আবেগের উৎস ছিল, একাত্তরের পর, স্বাধীন দেশের সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এই শ্লোগানকে ব্যবহার করে অনেক দুষ্কর্ম করেছে। ‘জয় বাংলা’-র সাথে ‘জয় বঙ্গবন্ধু’-কে যুক্ত করে এই রণধ্বনিতে পরিণত করেছে। তাছাড়া সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী অপশক্তির সাথে আপস করে তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে মদত দিয়ছে।

দেশে আজ সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান একটি বড় রকম বিপদ। কিন্তু জনগণের ইহলৌকিক জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধান করার কাজে বাস্তব সাফল্য আনতে না পারলে এই উত্থান রোধ করা যাবে না। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ৈই তা সম্ভব এবং তা প্রতিষ্ঠা করাটা আওয়ামী লীগের বা বিএনপি, জাতীয় পার্পি, জামাতে ইসলামের দ্বারা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তির উত্থান। দেশের সামনে নতুন এজেন্ডা উপস্থিত হয়েছে। সেটিকে এগিয়ে নেয়ার মধ্য দিয়েই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপদ দেউলিয়া হয়ে পরা শোষণ-লুটপাটের বুর্জোয়া শাসনের আশপাশ থেকে মুক্তি অর্জন করতে হবে। তাই, নিজের সম্পর্কে আমার বিনীত উচ্চারণ, আমি দেশপ্রেমিক বেট, কিন্তু জাতীয়তাবাদী নই। আমি ‘জয় বাংলা’-কে রণধ্বনি করে পথ চলার ‘জয় বাংলা’ পন্থী তো নয়ই। এ হলো আমার আদর্শগত আত্মপরিচয়ের প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য। কিন্তু যারা ‘জাতীয়তাবাদী’ অথবা ‘জয় বাংলা’ পন্থী-তাদের মতো করে কাজ করার অধিকার খর্ব করার যেকোনো প্রচেষ্টার আমি বিরোধী। শুধু বিরোধীই নই, তা রুখতে আমরা কমিউনিস্টরা রাজপথে আছি ও থাকবো।

লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬


আমি দেশপ্রেমিক, কিন্তু জাতীয়তাবাদী নই

প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হতে পারে যে ‘দেশপ্রেম’ (patriotism)  ও ‘জাতীয়তাবাদ’(nationalism)  এ দু’টো শব্দের অর্থ একই এবং তার দ্বারা একই কথা বোঝানো হয়। কিন্তু সেটি মোটেও সত্য নয়। আমি মার্কসবাদে দীক্ষিত একজন কমিউনিস্ট। আমি নিজেকে একজন ‘দেশপ্রেমিক’ বলে ভাবি, কিন্তু নিজেকে কখনোই একজন ‘জাতীয়তাবাদী’ বলে মনে করি না। কেন? এর কারণটি আমি এখানে সংক্ষেপে ব্যক্ত  করব।

তার আগে, এ বিষয়ে যে ক্ষেত্রে গুরুতর ভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয় সেটি প্রথমে পরিস্কার করে নেয়া প্রয়োজন। আগেই বলেছি যে আমি ‘জাতীয়তাবাদী’ নই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ‘জাতীয়তাবাদ’ অথবা ‘জাতীয়তাবাদীদের’ প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি হলো শত্রুমূলক ও বৈরী। বরঞ্চ একথা আমি দৃঢ় প্রত্যয়ে বলবো যে—অনেক ক্ষেত্রেই, বিশেষতঃ একটি নিপীড়িত জাতির ক্ষেত্রে, জাতীয়তাবাদ প্রায়সই রাজনীতিতে ইতিবাচক এবং এমনকি কখনো কখনো প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করে। সুতরাং, এমন ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতি কমিউনিস্টদের মনোভাব যে বন্ধুসুলভ হবে সেটিই স্বাভাবিক। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যেই সম্পর্ক গড়ে উঠতে পেরেছিল।

কিন্তু এ তো গেলো জাতীয়তাবাদের প্রতি কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কি হবে, সে বিষয়ে কথা। তার মানে কি তবে এই যে ‘কমিউনিস্ট’ আদর্শ ও ‘জাতীয়তাবাদের’ আদর্শ একই চরিত্রের? না! কারণ একটি হলো ভিন্ন আদর্শের প্রতি ‘দৃষ্টিভঙ্গির’ বিষয় এবং অপরটি হলো আদর্শগত ‘আত্মপরিচয়ের বিষয়। এই দু’টি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলার কারণে অনেক বিভ্রান্তির জন্ম হয়। ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রতি কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে যতো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই থাকুক না কেন, আদর্শগত আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে একজন কমিউনিস্ট কখনই ‘জাতীয়তাবাদী’ হতে পারে না। কেউ কেউ আবার বলছেন যে আমরা ‘জাতীয়তাবাদী’ নই ঠিকই, কিন্তু ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের মতো রণধ্বনি করে আমাদেরকে এখন লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পরতে হবে। কমিউনিস্টরা যেমন তাদের আত্মপরিচয়কে ‘জাতীয়তাবাদের’ দ্বারা চিহ্নিত করতে পারে না, তেমনি তারা তাদের সংগ্রামের মূল রণধ্বনিকে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দ্বারা নির্ধারণ করতে পারে না। কারণ তা হবে তার কমিউনিস্ট আত্মপরিচয় বিসর্জন দিয়ে ‘জাতীয়তাবাদী’ আদর্শ গ্রহণ করার মতো বিষয়।

এবার তবে মূল কথায় ফেরা যাক। যেকোনো মানুষের জন্য দেশপ্রেম হলো একটি মহৎ গুণ। এটি হলো তার পরম গর্ব ও অহঙ্কারের বিষয়। নিজের জাতি ও নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসাই হলো দেশপ্রেম। দেশপ্রেমিক মানুষের স্বার্থবোধ ও চিন্তার পরিমণ্ডল ক্ষুদ্র ব্যক্তিসত্তার গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। ব্যক্তি ও পরিবারের সংকীর্ণ জগতকে অতিক্রম করে সে দেশ ও জাতির স্বার্থ ও সত্তার সাথে নিজেকে একাকার করে ফেলে। বিশ্ব জগতে সে তখন আর একক একটি ব্যক্তি মাত্র হয়ে থাকে না, সে হয়ে ওঠে সমষ্টির অঙ্গীভূত। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকের ক্ষেত্রে এই উত্তরণের প্রক্রিয়া ও সমষ্টি-বোধ তার স্বাভাবিক ধারায় তাকে পৌঁছে দেয় বিশ্ব মানবতার চেতনায়। এ কারণে তার নিজের দেশপ্রেম কখনোই অন্য আরেক ভিন্ন দেশ ও জাতির মানুষের দেশপ্রেমের বৈরী বা প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে না। সব জাতির মানুষের নিজ নিজ দেশপ্রেম হয়ে ওঠে একে অপরের পরিপূরক। একজন ‘প্রকৃত’ দেশপ্রেমিকের কাছে তার স্বদেশ ও স্বজাতি হয়ে ওঠে বিশ্বলোকের মহামানবের একটি অংশ, তারই সৌরভিত পুষ্পকাননের অন্যতম অলঙ্কার। দেশপ্রেমিকের স্বদেশ-প্রেমের স্বরূপ ঠিক এমনটাই।

কবিগুরু তাই আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন—

‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া

 বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘জাতীয়তাবাদের’ তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ্ব-মানবের কবি। তিনি একইসাথে ছিলেন প্রবলভাবে দেশপ্রেমিক। কবিগুরু বলে গেছেন যে, ‘বিশ্ব-মানবের প্রতি ভালোবাসা-বোধের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যেমন কিনা প্রকৃত দেশপ্রেমের নিখুঁত স্ফুরণ ঘটতে পারে না, ঠিক তেমনি প্রগাঢ় দেশপ্রেমকে উপেক্ষা করে সত্যিকার মানবপ্রেম জাগরিত হতে পারে না।’

স্বজাতি ও স্বদেশের প্রতি ভালোবাসাই হলো দেশপ্রেম। এখন প্রশ্ন হলো, এই স্বজাতি ও স্বদেশ ব্যাপারটি আসলে কী? এটা কি মানব জন্মের আদিলগ্ন থেকে মানবসত্তার অন্তর্গত একটি অন্তর্নিহিত উপাদান? নাকি তা ইতিহাসের ধারায় সুনির্দিষ্ট বাস্তবতায় আবির্ভূত একটি সামাজিক উপাদান? পরের কথাটি যদি সত্য হয় তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—কীভাবে ঘটেছে তার এই উদ্ভব?

জাতিসত্তা-বোধ হলো ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা একটি উপলব্ধি, একটি চেতনা। বিস্তৃত ভূমণ্ডলে মানুষের উপস্থিতি বহুকালের। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষরা ক্রমে পরস্পরের সংস্পর্শে এসেছে, জীবন ধারণের প্রয়োজনে গোষ্ঠীবদ্ধ ও সমাজবদ্ধ হয়েছে। ইতিহাসের প্রত্যক্ষ প্রমাণ হলো এই যে, নানা উত্থান-পতন, বাঁধা-বিঘ্ন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত সত্ত্বেও মানুষ ক্রমাগতই একে অপরের নিকটবর্তী হয়েছে ও হচ্ছে। এই ক্রম-ধারাবাহিকতাতেই স্বজাতি-বোধের উদ্ভব। ইতিহাসের ধারাতেই নৃতত্ত্ব, ভূগোল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলবায়ু ও আবহাওয়া, ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনাচার, অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থা— প্রভৃতি নানা উপাদানের যুগ যুগ ব্যাপী ধারাবাহিক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানব সমাজের পৃথক পৃথক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজ নিজ স্বজাতি-বোধ গড়ে ওঠেছে। প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে এই নিবিড় বন্ধন সূত্রটি নাড়ির বন্ধনের মতোই তার জন্মলগ্ন থেকেই স্থাপিত হয়। এই স্বজাতি-বোধটা যেন তার মায়ের কোল, তার স্বাভাবিক শারীরিক-মানসিক আশ্রয়স্থল। নানা সূত্রের এক অদৃশ্য, কিন্তু বস্তুগত গাঁথুনি দ্বারা, স্বজাত্যবোধের এই অনুভূতি সৃষ্টি হয়।

এই স্বজাতি-বোধের উৎপত্তি মানুষের ইচ্ছা নিরপেক্ষ। কিন্তু এই বোধের সৃজন অথবা তার পচন অনেকটাই নির্ভর করে একদিকে যেমন মানুষের নিজের উপর, তেমনি তা নির্ধারিত হয় স্বদেশ ও সমাজের চরিত্রের দ্বারা। চেতনায় এই স্বজাতি-বোধের গড়ে ওঠার ব্যাটারটি অগণন বাস্তব উপাদানের ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত এবং তা সময়ের পরিক্রমায় গভীরতর ভিত্তি পেয়েছে।

এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হলো— বিকাশের বৈচিত্রময়তার কারণেই একেকটি ভৌগলিক গণ্ডির মধ্যে বসবাসরত মানুষদেরকে নিয়েই পৃথক পৃথক স্বজাত্যবোধ বিকশিত হয়েছে। এভাবে জাতি-পরিচয় সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে নির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকার সাথে। রাজ্য-সাম্রাজ্যের ভাঙা-গড়া সত্ত্বেও জাতীয় আত্মপরিচয় নিয়ে পৃথিবীর একেকটি এলাকায় একেকটি জাতিসত্তার মানুষ যুগ যুগ ধরে বসবাস করেছে ও নিজ নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উদ্ভবের পর বিকাশ ঘটেছে জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। এভাবে স্বদেশ অনেকটা পরিমাণে একটি স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক রূপ অর্জন করেছে। স্বজাতির চেতনার সাথে এভাবেই সংযুক্ত হয়েছে স্বদেশের অনুভূতি। “স্বজাতির” প্রতি নিবিড় আকর্ষণ ও ভালোবাসার আবেগ ক্রমেই রূপ পেয়েছে “স্বদেশের” প্রতি ভালোবাসায়। সেই ভালোবাসার নামই হলো দেশপ্রেম।

কিন্তু এই স্বদেশ শুধু চিহ্নিত একটি ভূখণ্ড, তার গাছ-পালা, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, জলবায়ু-মৃত্তিকা প্রভৃতির সমাহারই কেবলমাত্র নয়। স্বদেশের শ্রেষ্ঠতম ও অমূল্য উপাদান হলো স্বদেশের মানুষ। স্বদেশের মানুষ নিয়েই স্বজাতির গঠন। তাই, দেশপ্রেমের প্রধান উপাদান, তার মর্মকথা হলো দেশের আপামর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশকে ভালোবাসতে হলে সর্বাগ্রে দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হয়।

একটি দেশের সব মানুষ কিন্তু কোনো একক ও অখণ্ড সত্তা নয়। আদিম সাম্যবাদী সমাজের সময়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত মানবজাতির ইতিহাস হলো শ্রেণী বিভাজন ও শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। এক সময় সমাজ বিভক্ত ছিল মুষ্টিমেয় দাস মালিক ও অগণিত ক্রীতদাস— এই দুই শ্রেণীতে। তারপরে সমাজ বিভক্ত হয়েছে সামন্তপ্রভু ও ভূমিদাস অথবা প্রজাকুল হিসেবে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতেও সমাজে রয়েছে প্রধানত দুটি পরস্পর স্বার্থবিরোধী শ্রেণী— পুঁজিপতি ও শ্রমজীবী। রয়েছে শোষক শ্রেণী ও শোষিত শ্রেণী। শোষকরা মুষ্টিমেয়, হাতেগোনা গুটিকয়েক। শোষিতরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শোষক আর শোষিত— দু’পক্ষকেই একই সাথে ভালোবাসা যায় না। শোষিত মানুষকে ভালোবাসতে হলে যারা তাদেরকে শোষণ করে, সেই শোষকদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। শোষক শ্রেণীর শোষণকে ঘৃণা করতে হয়।

দেশপ্রেমের অভিপ্রকাশ যদি হয় স্বদেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা, তাহলে তার মূর্ত রূপ হতে হবে এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত দেশবাসীর প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু, সেই ভালোবাসা নিরর্থক ও নিষ্ফল—বন্ধ্যা হয়ে থাকবে যদি সেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী চিরদিন পুঁজিবাদের শোষণ জালে অর্থাৎ মজুরি-দাসত্বের শিকলে বাঁধা পড়ে থাকে। দেশৈর অগণিত মানুষের ওপর চলতে থাকা অমানবিক শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যের জিঞ্জির মেনে নিয়ে দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। চলমান শোষণমূলক সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু থাকতে দিয়ে, সেই ব্যবস্থার গায়ে শুধু উপরভাসা সংস্কারের মলম লাগিয়ে মানুষের জীবন-জীবিকার যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা দিয়েও নির্ভেজাল দেশপ্রেম প্রদর্শিত হতে পারে না। প্রকৃত দেশপ্রেম দাবি করে শোষিত দেশবাসীর প্রতি ভালোবাসা এবং সেই ভালোবাসা দাবি করে শোষণমুক্তির সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা। তাই, প্রকৃত দেশপ্রেম স্বজাতি ও স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার তাড়নাতেই আমাদেরকে একই সাথে বিশ্ব মানবতার প্রতি উদার ভক্তি-শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় জাগরিত করে এবং সাথে সাথে শোষণমুক্তির সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে এবং এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। এসবই হলো প্রকৃত দেশপ্রেমের অন্যতম মর্মবাণী ও উপাদান। তদ্রুপ বিচারে আমি নিজেকে একজন দেশপ্রেমিক বলে বিবেচনা করি।

এখন দেখা যাক, ‘জাতীয়তাবাদ’ কী? জাতীয়তাবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ যেখানে জাতীয় পরিচয়কে সামাজিক ঐক্যের সর্বোচ্চ ও শীর্ষরূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মতাদর্শে একথা ধরে নেয়া হয় যে, ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে এমন কিছু রয়েছে যার কাছে শ্রেণীস্বার্থ, শোষণ ব্যবস্থা থাকা-নাথাকা, সামাজিক বিভাজন জনিত স্বার্থবোধ—ইত্যাদি সবকিছু অধীনস্ত থাকে। তাছাড়া জাতীয়তাবাদী মতাদর্শকে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পটভূমি নির্বিশেষ স্থান-কালের বিবেচনার ঊর্ধ্বে, একটি অনাদিকালের জন্য স্থায়ী ভাবাদর্শ ও ব্যবস্থারূপে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

বস্তুত, জাতীয়তাবাদ ও জাতি-রাষ্ট্রের বিষয়গুলো মানব সভ্যতার ইতিহাসে তুলনামূলকভাবে নতুন সংযোজন। কালক্রমে, যখন মানব সমাজের পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটেছিল, তখন আর্থ-সামাজিক প্রয়োজনে স্বতন্ত্র স্বজাতি-বোধের উপাদানকে নতুন মাত্রিকতা ও গুরুত্ব দেয়াটা বিশেষভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল। এভাবে, ‘স্বজাতি-বোধের’ স্বাভাবিক উপলব্ধি উত্তরণ ঘটেছিল ‘জাতীয়তাবাদের’ মতাদর্শে। এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন জাতিকে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো।

চার-পাঁচশ’ বছর আগেও রাজনীতি ও সমাজে জাতি-রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ভাবাদর্শ বলে তেমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। মানুষের স্বজাতি-বোধের। সাথে ভূ-রাজনীতির অথবা রাজনৈতিক আদর্শের কোনো শক্তিশালি ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না। রাজা-মহারাজারা যে ভূখণ্ড দখল করতে সক্ষম হতো, সেটাই হতো রাজ্যের (অর্থাৎ রাষ্ট্রের) ভূ-সীমানা ও ভৌগলিক গণ্ডি। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা দাস সমাজের ও সামন্তবাদী সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলার রাখার ক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি করত না। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা উদ্ভবের সাথে সাথে পুঁজির নিজস্ব স্বার্থেই বাজার দখল করা নিজ নিজ বাজার সংরক্ষণ এবং তা নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পুঁজিবাদের ‘বাজার-কর্তৃত্বের’ জন্য এই অন্তর্নিহিত তাগিদই জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের উন্মেষ ও জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব অনিবার্য করে তুলেছিল।  

প্রথমাবস্থায় ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রগতিবাদী ভূমিকা ছিল সাধালণভাবে মুখ্য। কিন্তু স্থান-কাল-ভেদে এই ভূমিকা ক্রমেই ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিতে শুরু করেছিল। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতে উত্তরণের ক্ষেত্রে যেসব জাতি ও জাতি-রাষ্ট্র অগ্রবর্তী থাকতে সক্ষম হয়েছিল, তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া জাতিগুলোকে পদানত করে সেখানে তাদের উপনিবেশ বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিল। এসব প্রভু-দেশ তাদের ঔপনিবেশিক শোষণ বিস্তারের জন্য জাতীয়তাবাদের মতাদর্শকে কাজে লাগিয়েছিল। এটি ছিল বৃহৎ শক্তির জাতীয়তাবাদ। আবার অন্যদিকে, পদানত ও ঔপনিবেশিক শাসনে আবদ্ধ জাতিগুলোর ক্ষেত্রে এই জাতীয়তাবাদী মতাদর্শই সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী বন্ধন মোচন করে স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ইতিবাচক আদর্শগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিল। তাই, এভাবে এবং আরো অন্য নানাভাবে “জাতীয়তাবাদের” দ্বিমুখী ভূমিকা ছিল বলে দেখা যায়।

নির্দিষ্ট স্থান, কাল ও ঐতিহাসিক পটভূমিতে জাতীয়তাবাদের ইতিবাচক এবং এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে একটা প্রগতিশীল ভূমিকা ভাবাদর্শ হিসেবে জাতীয়তাবাদের নেতিবাচক ও এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল অভিঘাতের বিপদের আশঙ্কার কথাটিও ভালোভাবে হিসেবে রাখাটাও একান্তভাবে বাঞ্ছনীয়। জাতীয়তাবাদের কতগুলো নেতিবাচক দিক ও সম্ভাব্য বিপদের কথা আমি আবার এখানে উল্লেখ করছি।

জাতীয়তাবাদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো জাত্যাভিমান। জাতি পরিচয়ই যে সহজাত কেন্দ্রিক বিষয়, এই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠার জন্য এবং তার পক্ষে আরও শক্তকরণ তুলে ধরার জন্য অপর আরেকটি তত্ত্বও তার সাথে সাথে হাজির করা হয়। সেই তত্ত্ব হলো-‘জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্ব’। এ ক্ষেত্রে বলা হতে থাকলো যে, যেহেতু ‘আমাদের জাতিই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি’ তাই অন্যান্য ‘অনগ্রসর, অসভ্য জাতিগুলোকে মানুষ করার’ ইতিহাস প্রদত্ত দায়িত্ব এই শ্রেষ্ঠতর বা শ্রেষ্ঠতম জাতির দাবিদারদেরকে নিজেদের হাতে নিতে হবে। এই তত্ত্বের আলোকে একসময় বৃটিশরা ভারতীয়দেরকে ÒWhite mens burdenÓ  বলে আখ্যায়িত করতো। জাতীয়তাবাদের এহেন প্রয়োগ ঔপনিবেশিক মতবাদ ও ব্যবস্থাকে লালন করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছিল। জাত্যাভিমানের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রকাশ হলো ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ, জিয়নবাদ এবং অতি সম্প্রতি সৃষ্ট নয়া-ফ্যাসিবাদ, ‘সাদা মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব’ (White supremacy), America First  (সর্বাগ্রে আমেরিকা)  ইত্যাদি। এসবের অনুকরণে আমাদের দেশের বাঙালিদের মাঝেও জাত্যাভিমানের প্রকাশ দেখা যায়। তা দেখা যায় পার্বত্য এলাকার জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি, এবং এমনকি ভিন্ন কোনো তরিকার অনুসারী আউল-বাউল, মুরশিদ অনুগত সমতলের মুসলিম সম্প্রদায়, সংখ্যাালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি অনুসৃত দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে। জাত্যাভিমানে আচ্ছন্ন জাতি নিজের দোষ-ত্রুটি-দুর্বলতা-ঘাটতি-অপরাধগুলোকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে অন্ধ হয়ে থাকে, আর নিজের শক্তি-সামর্থ্য-ক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করে দেখে। ফলে, জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ও প্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে গিয়ে এরূপ জাত্যাভিমানে আচ্ছন্ন জাতি নানা সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং শেষমেষ অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়ে। জাত্যাভিমান থেকেই উৎসারিত হয় ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’। নিজ জাতির তথাকথিত স্বার্থরক্ষায় কোনো অন্যায় কাজকেই তখন আর অন্যায্য মনে করা হয় না। অন্য জাতির ওপর নিজ জাতির আধিপত্য চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে এই তত্ত্ব ও মতবাদের আশ্রয় নেয়া হয়। পৃথিবীতে জাতিতে জাতিতে সহ-অবস্থান ও শান্তি-ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ নষ্ট হয়।

জাতীয়তাবাদের অন্যতম বড় বিপদ হলো তার অন্তর্নিহিত রক্ষণশীলতা। জাতীয় ঐতিহ্য ও জাতীয় ভাবধারা রক্ষার নামে নানা ধরনের বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও কূপমণ্ডূকতাকে সে লালন করে এবং উস্কে দেয়। জাতীয়তাবাদ এক ধরনের আত্মমুখীনতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার প্রবণতা ধারণ করে, যা কিনা বিশ্ব সভ্যতার অর্জন থেকে জাতির দূরত্বকে বাড়িয়ে দেয়। জাতীয়তাবাদ বিশ্ব সভ্যতার সাধারণ সর্বমানবিক ঐশ্বর্যময় সম্পদ থেকে আধার গ্রহণ করে স্বজাতিকে সমৃদ্ধ করার বদলে, ‘শ্রেষ্ঠ জাতির শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের’ নামে নিজের অতীত ও স্ব-গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখার প্রবণতা ধারণ করে। একটি জাতির মধ্যে তা ‘অতীতে ফিরে যাওয়ার’ (revivalism)  প্রবণতার জন্ম দেয়। এর ফলে, জাতি প্রগতিমুখীন না হয়ে রক্ষণশীল ও এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়ে।

জাতীয়তাবাদ অন্ধ একমুখীনতা ও সংকীর্ণতাবাদী প্রবণতাও লালন করে। জাতীয়তাবাদ দাবি করতে চায় যে— সমাজের মধ্যে শ্রেণী বিভাজন, শ্রেণী সচেতনতা, ইতিহাস ও সমাজ রূপান্তরে শ্রেণীর ভূমিকা, শোষক ও শোষিতের মধ্যে মৌলিক অমোচনীয় দ্বন্দ্ব, শোষিত মানুষের ঐক্য, মানবিক ও শোষণমুক্ত নতুন সভ্যতা নির্মাণে বিশ্বের শ্রমিক সংহতি ও আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি বিষয়গুলোর অন্যান্য সব বিষয়ের ঊর্ধ্বে এবং যা হলো সকলের কাছে সুপ্রিম গুরুত্ব সম্পন্ন বিষয়, তা হলো জাতির সার্বজনীন স্বকীয়তা।

একট পর্যায়ে জাতীয়তাবাদ শ্রমিক শ্রেণীর শোষণমুক্তির সংগ্রামের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। এদেশেও আমরা বহু দিন ধরে দেখে এসেছি জাতীয়তাবাদী শক্তি কীভাবে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ সেøাগানের বিপরীতে ‘বাংলার মজদুর এক হও’ সেøাগান উত্থাপনের জন্য চেষ্টা করেছে। কিংবা তাদের মুখে অতীতে শুনেছি এবং বর্তমানে আবার খুব বেশি করে উচ্চারিত হতে শুনছি ‘শ্রমিক-মালিক ভাই-ভাই, বাঙালির একতার বিনাশ নাই’ ইত্যাদি ধরনের নসিহত। অন্যদিকে, বৃহৎ ও শক্তিমান জাতির ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ যে আগ্রাসী, আধিপত্যবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, উপনিবেশবাদী ও নয়া-উপনিবেশবাদী এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ফ্যাসিবাদী, নাৎসিবাদী, জিয়নবাদী, তালেবানি জঙ্গিবাদী, প্যান-ইসলামবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের চরম প্রতিক্রিয়াশীলতায় পর্যবসিত হতে পারে তা সমসাময়িক ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায়।

এত তাত্ত্বিক কথায় না গিয়েও বাংলাদেশে ‘জাতীয়তাবাদের’ যে বাস্তব চেহারা আমরা দেখে চলেছি তা থেকেও এই আদর্শের স্বরূপ অনেকটাই স্পষ্ট হয়। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’— সেটা তো পাকিস্তানি ভাবাদর্শের একটি নরম সংস্করণ বৈ অন্য কিছু নয়। সে বিষয়ে বেশি আলোচনা না করলেও চলে। আর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ অনেক রকম ভূমিকাই আমরা দেখেছি, দেখে চলেছি। নিঃসন্দেহে একথা সত্য যে, বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় ও মুক্তিযুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আদর্শ ও জাতীয়তাবাদী শক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তার শীর্ষ পর্বে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এই জাতীয়তাবাদী শক্তির কোনো কোনো অংশ ’৭০-’৭১ সালেও হিটলারের মতো করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে বলে প্রচার চালিয়েছে, হিটলার রচিত ‘মেইন ক্যাম্ফ’ (আমার নেতা) বইটির আলোকে মতাদর্শ গ্রহণের ছবক দিয়েছে, আমেরিকা আমাদের স্বাধীনতার পাশে থাকবে বলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মোহগ্রস্ত থেকে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার সহায়তায় ‘স্বাধীনতা’ আনা যায় কিনা সেজন্য চেষ্টা করেছে। ইতিহাস এসব ঘটনার এবং এ ধরনের বহু ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। সাম্রাজ্যবাদের মন যুগিয়ে চলার জন্য জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী বলে দাবিদার বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী, ব্যীক্ত পরস্পরের মধ্যে তাবেদারির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। আর মাঠে-ময়দানে বিভিন্ন ঘরানার জাতীয়তাবাদী নেতা-কর্মী-ক্যাডারদের বাস্তব কার্যকলাপ হিসেবে হালুয়া-রুটির ভাগবাটোয়ারা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবিরবাজি, দখলবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে অসৎ পথে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদ-বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ-ইসলামী জাতীয়তাবাদ প্রভৃতির মধ্যে এবং তার প্রতিটির অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সমঝোতার খেলা চলছে। জাতীয়তাবাদীদের অব্যাহত খাই-খাই তৎপরতায় সাধারণ মানুষের জীবনে আজ নাভিঃশ্বাস উঠছে।

ইতিহাসকে বিকৃত বা মুছে ফেলা যায় না। একথা ঠিক যে ‘জয় বাংলা’ মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ছিল। সাথে সাথে একথাও সত্য যে তা আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শের গর্ভ থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। এই রণধ্বনি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং দেশবাসী তা গ্রহণ করেছিল। ১৯৭০ ও ১৯৭১ সাল ছিল মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত সম্পন্ন পর্ব ও তার তাৎক্ষণিক পূর্বের অধ্যায়। এই দুই বছর ‘জয় বাংলা’ যে আবেগের উৎস ছিল, একাত্তরের পর, স্বাধীন দেশের সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এই শ্লোগানকে ব্যবহার করে অনেক দুষ্কর্ম করেছে। ‘জয় বাংলা’-র সাথে ‘জয় বঙ্গবন্ধু’-কে যুক্ত করে এই রণধ্বনিতে পরিণত করেছে। তাছাড়া সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী অপশক্তির সাথে আপস করে তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে মদত দিয়ছে।

দেশে আজ সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান একটি বড় রকম বিপদ। কিন্তু জনগণের ইহলৌকিক জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধান করার কাজে বাস্তব সাফল্য আনতে না পারলে এই উত্থান রোধ করা যাবে না। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ৈই তা সম্ভব এবং তা প্রতিষ্ঠা করাটা আওয়ামী লীগের বা বিএনপি, জাতীয় পার্পি, জামাতে ইসলামের দ্বারা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তির উত্থান। দেশের সামনে নতুন এজেন্ডা উপস্থিত হয়েছে। সেটিকে এগিয়ে নেয়ার মধ্য দিয়েই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপদ দেউলিয়া হয়ে পরা শোষণ-লুটপাটের বুর্জোয়া শাসনের আশপাশ থেকে মুক্তি অর্জন করতে হবে। তাই, নিজের সম্পর্কে আমার বিনীত উচ্চারণ, আমি দেশপ্রেমিক বেট, কিন্তু জাতীয়তাবাদী নই। আমি ‘জয় বাংলা’-কে রণধ্বনি করে পথ চলার ‘জয় বাংলা’ পন্থী তো নয়ই। এ হলো আমার আদর্শগত আত্মপরিচয়ের প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য। কিন্তু যারা ‘জাতীয়তাবাদী’ অথবা ‘জয় বাংলা’ পন্থী-তাদের মতো করে কাজ করার অধিকার খর্ব করার যেকোনো প্রচেষ্টার আমি বিরোধী। শুধু বিরোধীই নই, তা রুখতে আমরা কমিউনিস্টরা রাজপথে আছি ও থাকবো।

লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত