সংবাদ

সচিবালয়ের স্থান নির্বাচন ও কৃষি গবেষণা


কে বি এম সাইফুল ইসলাম
কে বি এম সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৪ এএম

সচিবালয়ের স্থান নির্বাচন ও কৃষি গবেষণা

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কেন্দ্র সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত স্থান নির্বাচন ও অবকাঠামোগত বিন্যাস সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। তবে যেকোনো বড় প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সেখানে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব, প্রায়োগিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা ইতিমধ্যে তীব্র সংকটে রূপ নিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিকে নিছক কোনো জমি নিয়ে সাধারণ প্রশাসনিক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার ভবিষ্যৎ, একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশ, রাজধানীর পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সাম্প্রতিক উত্তেজনা: মাটি পরীক্ষা প্রতিহত, সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুর

চলমান এই বিরোধ কেবল দাপ্তরিক চিঠি চালাচালি বা প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি তা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। গত ২৭ অক্টোবর আলোচিত মাঠে মাটি পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানান। এ সময় তাঁরা সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও গাড়ি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৮ অক্টোবর শেকৃবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা ‘গবেষণার মাঠ ফেরত চাই, সচিবালয় নয়’ স্লোগান ও ব্যানার নিয়ে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে প্রবেশ করেন। এ সময় সেখানে এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার নির্মাণাধীন ফটক ও অবকাঠামোতেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সচিবালয় নির্মাণের প্রতিবাদে টানা তৃতীয় দিনের মতো চীন-মৈত্রী সিগন্যালে সড়ক অবরোধ করেন শেকৃবির শিক্ষার্থীরা।

অর্থাৎ, আলোচ্য মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূলে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছেন। এতে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীদের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও আস্থার সংকট। তাঁরা বারবার সময় বেঁধে দিলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সমাধান বা ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। একটি অপরিকল্পিত ও একতরফা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কীভাবে একটি সম্ভাবনাময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের মুখে ঠেলে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই প্রমাণ। সংঘাতের পথ প্রশস্ত না করে নীতিগত ভুল সংশোধনের মাধ্যমে সংকট সমাধানে এখনই দূরদর্শী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ঐতিহাসিক শিকড় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির সংকোচন

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন ‘বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ কৃষিবিদ তৈরি করা। প্রতিষ্ঠার সময় এর জন্য প্রায় ২৯৮ একর জমি বরাদ্দ বা অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় ও সরকারি প্রয়োজনে এই ক্যাম্পাসের বড় একটি অংশ অন্যান্য সংস্থাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবহারযোগ্য জমির পরিমাণ ৮৭ একরেরও নিচে নেমে এসেছে।

আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন গবেষণাপ্লট ও খামারের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের প্রয়োজনে অধিগ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেটি ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মূল ক্যাম্পাস থেকে এই উর্বর জমি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকেরা তীব্র স্থানসংকটে ভুগছেন। সরকারের সিদ্ধান্তে ২০২২ সালে বাণিজ্য মেলা পূর্বাচলে স্থানান্তরিত হলে শেকৃবি পরিবারের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। সবাই ভেবেছিলেন, ঐতিহাসিক মাঠটি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সেখানে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে আসায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

কৃষি গবেষণায় জমি ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রের গুরুত্ব

আধুনিক কৃষিশিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হলো মাঠ, খামার ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণ। ফসলের নতুন জাতের কার্যকারিতা যাচাই, মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ, সেচ ব্যবস্থাপনা, সার প্রয়োগের মাত্রা নির্ধারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলক গবেষণার বিকল্প নেই।

‘ওয়ান হেলথ’ বা এক স্বাস্থ্য ধারণা অনুযায়ী মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রাণিসম্পদ উৎপাদন, দুগ্ধবিজ্ঞান, গবাদিপশুর রোগ ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় খামার ও গবেষণার সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। শেকৃবির গবেষণা অবকাঠামো আরও সংকুচিত হলে তার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার ওপর।

উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের স্থাপনা নয়

সচিবালয় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। তবে বড় প্রকল্পের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু দাপ্তরিক সুবিধা বিবেচনা করলে চলে না। এর পরিবেশগত, যানজট ও সামাজিক প্রভাবও গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। ঢাকার মতো জনবহুল ও অপরিকল্পিত নগরে নতুন করে এ ধরনের বড় প্রশাসনিক স্থাপনা তৈরি হলে শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। এতে যানজট, শব্দ ও বায়ুদূষণ বাড়বে। আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণাকেন্দ্রের স্বাভাবিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশও ব্যাহত হতে পারে।

প্রকৃত উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের স্থাপনা ও বড় বড় ভবন নির্মাণ নয়। বিদ্যমান প্রাকৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অংশ। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ এবং জ্ঞানচর্চার উপযোগী পরিসর রক্ষা করতে হবে।

সমাধানের পথ: সংলাপ, স্বচ্ছতা ও বিচক্ষণতা

বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও কর্তৃপক্ষকে কালক্ষেপণ না করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সংকটের স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

প্রথমত, জমির মালিকানা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নথি প্রকাশ করতে হবে। ঐতিহাসিক এই ভূখণ্ডের আইনি মালিকানা, অতীতের জমি বরাদ্দ এবং সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্তসংক্রান্ত সব প্রামাণ্য দলিল প্রকাশ করা উচিত। এতে দীর্ঘদিনের ধোঁয়াশা, ভুল বোঝাবুঝি ও আস্থার সংকট অনেকটাই দূর হবে।

দ্বিতীয়ত, সচিবালয়ের জন্য বিকল্প জায়গা খুঁজতে হবে। একটি ঐতিহ্যবাহী ও গবেষণানির্ভর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উর্বর জমি সংকুচিত না করে ঢাকার আশপাশের খাসজমি কিংবা পূর্বাচলের মতো সম্ভাব্য বিকল্প জায়গাগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব জায়গার সুবিধা-অসুবিধা বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করে তা জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।

তৃতীয়ত, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। সংঘাত, উত্তেজনা বা বলপ্রয়োগের পথ পরিহার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ভিত্তিতে এই আলোচনা হতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগই সংকটের সম্মানজনক ও স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।

শেকৃবির জমি নিয়ে বর্তমান বিতর্ক আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে: আমরা কি উন্নয়ন বলতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণকেই বুঝি, নাকি জ্ঞান, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতাকেও উন্নয়নের অংশ মনে করি? প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই প্রয়োজনে কৃষি গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নষ্ট করা উচিত নয়। উন্নয়ন ও গবেষণার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক ডিন ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


সচিবালয়ের স্থান নির্বাচন ও কৃষি গবেষণা

প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কেন্দ্র সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত স্থান নির্বাচন ও অবকাঠামোগত বিন্যাস সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। তবে যেকোনো বড় প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সেখানে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব, প্রায়োগিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা ইতিমধ্যে তীব্র সংকটে রূপ নিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিকে নিছক কোনো জমি নিয়ে সাধারণ প্রশাসনিক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার ভবিষ্যৎ, একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশ, রাজধানীর পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সাম্প্রতিক উত্তেজনা: মাটি পরীক্ষা প্রতিহত, সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুর

চলমান এই বিরোধ কেবল দাপ্তরিক চিঠি চালাচালি বা প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি তা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। গত ২৭ অক্টোবর আলোচিত মাঠে মাটি পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানান। এ সময় তাঁরা সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও গাড়ি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৮ অক্টোবর শেকৃবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা ‘গবেষণার মাঠ ফেরত চাই, সচিবালয় নয়’ স্লোগান ও ব্যানার নিয়ে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে প্রবেশ করেন। এ সময় সেখানে এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার নির্মাণাধীন ফটক ও অবকাঠামোতেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সচিবালয় নির্মাণের প্রতিবাদে টানা তৃতীয় দিনের মতো চীন-মৈত্রী সিগন্যালে সড়ক অবরোধ করেন শেকৃবির শিক্ষার্থীরা।

অর্থাৎ, আলোচ্য মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূলে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছেন। এতে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীদের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও আস্থার সংকট। তাঁরা বারবার সময় বেঁধে দিলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সমাধান বা ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। একটি অপরিকল্পিত ও একতরফা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কীভাবে একটি সম্ভাবনাময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের মুখে ঠেলে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই প্রমাণ। সংঘাতের পথ প্রশস্ত না করে নীতিগত ভুল সংশোধনের মাধ্যমে সংকট সমাধানে এখনই দূরদর্শী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ঐতিহাসিক শিকড় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির সংকোচন

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন ‘বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ কৃষিবিদ তৈরি করা। প্রতিষ্ঠার সময় এর জন্য প্রায় ২৯৮ একর জমি বরাদ্দ বা অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় ও সরকারি প্রয়োজনে এই ক্যাম্পাসের বড় একটি অংশ অন্যান্য সংস্থাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবহারযোগ্য জমির পরিমাণ ৮৭ একরেরও নিচে নেমে এসেছে।

আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন গবেষণাপ্লট ও খামারের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের প্রয়োজনে অধিগ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেটি ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মূল ক্যাম্পাস থেকে এই উর্বর জমি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকেরা তীব্র স্থানসংকটে ভুগছেন। সরকারের সিদ্ধান্তে ২০২২ সালে বাণিজ্য মেলা পূর্বাচলে স্থানান্তরিত হলে শেকৃবি পরিবারের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। সবাই ভেবেছিলেন, ঐতিহাসিক মাঠটি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সেখানে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে আসায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

কৃষি গবেষণায় জমি ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রের গুরুত্ব

আধুনিক কৃষিশিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হলো মাঠ, খামার ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণ। ফসলের নতুন জাতের কার্যকারিতা যাচাই, মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ, সেচ ব্যবস্থাপনা, সার প্রয়োগের মাত্রা নির্ধারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলক গবেষণার বিকল্প নেই।

‘ওয়ান হেলথ’ বা এক স্বাস্থ্য ধারণা অনুযায়ী মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রাণিসম্পদ উৎপাদন, দুগ্ধবিজ্ঞান, গবাদিপশুর রোগ ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় খামার ও গবেষণার সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। শেকৃবির গবেষণা অবকাঠামো আরও সংকুচিত হলে তার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার ওপর।

উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের স্থাপনা নয়

সচিবালয় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। তবে বড় প্রকল্পের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু দাপ্তরিক সুবিধা বিবেচনা করলে চলে না। এর পরিবেশগত, যানজট ও সামাজিক প্রভাবও গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। ঢাকার মতো জনবহুল ও অপরিকল্পিত নগরে নতুন করে এ ধরনের বড় প্রশাসনিক স্থাপনা তৈরি হলে শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। এতে যানজট, শব্দ ও বায়ুদূষণ বাড়বে। আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণাকেন্দ্রের স্বাভাবিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশও ব্যাহত হতে পারে।

প্রকৃত উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের স্থাপনা ও বড় বড় ভবন নির্মাণ নয়। বিদ্যমান প্রাকৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অংশ। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ এবং জ্ঞানচর্চার উপযোগী পরিসর রক্ষা করতে হবে।

সমাধানের পথ: সংলাপ, স্বচ্ছতা ও বিচক্ষণতা

বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও কর্তৃপক্ষকে কালক্ষেপণ না করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সংকটের স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

প্রথমত, জমির মালিকানা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নথি প্রকাশ করতে হবে। ঐতিহাসিক এই ভূখণ্ডের আইনি মালিকানা, অতীতের জমি বরাদ্দ এবং সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্তসংক্রান্ত সব প্রামাণ্য দলিল প্রকাশ করা উচিত। এতে দীর্ঘদিনের ধোঁয়াশা, ভুল বোঝাবুঝি ও আস্থার সংকট অনেকটাই দূর হবে।

দ্বিতীয়ত, সচিবালয়ের জন্য বিকল্প জায়গা খুঁজতে হবে। একটি ঐতিহ্যবাহী ও গবেষণানির্ভর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উর্বর জমি সংকুচিত না করে ঢাকার আশপাশের খাসজমি কিংবা পূর্বাচলের মতো সম্ভাব্য বিকল্প জায়গাগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব জায়গার সুবিধা-অসুবিধা বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করে তা জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।

তৃতীয়ত, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। সংঘাত, উত্তেজনা বা বলপ্রয়োগের পথ পরিহার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ভিত্তিতে এই আলোচনা হতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগই সংকটের সম্মানজনক ও স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।

শেকৃবির জমি নিয়ে বর্তমান বিতর্ক আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে: আমরা কি উন্নয়ন বলতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণকেই বুঝি, নাকি জ্ঞান, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতাকেও উন্নয়নের অংশ মনে করি? প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই প্রয়োজনে কৃষি গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নষ্ট করা উচিত নয়। উন্নয়ন ও গবেষণার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক ডিন ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত