ইতিহাসের দুই সময়, দুটি কারাগার, দুটি রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৫০ সালে রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে সাত বিপ্লবী বন্দির মৃত্যু, আর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড। সময় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও দুটি ঘটনাই আমাদের ইতিহাসে কারাগারের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় হেফাজত এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের এক নির্মম প্রশ্ন রেখে গেছে।
৩ নভেম্বর। জাতীয় জেলহত্যা দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক শোকাবহ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো একটি সুরক্ষিত স্থানে হত্যা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের চার জাতীয় নেতাকে। তারা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান।
কিন্তু কারাগারের দেয়ালের ভেতরে রাজনৈতিক বন্দিদের রক্ত ঝরার ইতিহাস কি কেবল ১৯৭৫ সালেই সীমাবদ্ধ? ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমাদের ফিরে যেতে হয় আরও ২৫ বছর আগে। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল। স্থান রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ড।
জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের আগে এই খাপড়া ওয়ার্ডেই গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সাত কমিউনিস্ট রাজনৈতিক বন্দিকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যা খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। একে উপমহাদেশের প্রথম জেলহত্যার ঘটনাগুলোর অন্যতম হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
দুটি ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান ২৫ বছর। রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা, শাসনব্যবস্থা আলাদা, হত্যাকাণ্ডের পটভূমিও আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় ভয়াবহ মিল, সেটি হল কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দিদের জীবনও নিরাপদ ছিল না।
খাপড়া ওয়ার্ড: প্রতিবাদ থেকে রক্তাক্ত পরিণতি
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় নানা পরিবর্তন আসে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মী, কৃষক আন্দোলনের সংগঠক, শ্রমিক নেতা ও বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকে কারাবন্দি হন। কিন্তু কারাগারের ভেতরেও তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল অমানবিক পরিবেশ।
কারাবন্দিদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, তামাক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, তেলের ঘানি টানা, গম মাড়াই ও পেষাইয়ের মতো কঠোর শ্রমে বাধ্য করা-এসব ছিল বন্দিদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। সামান্য বিশ্রাম কিংবা কাজে দেরি হলেই নেমে আসত শারীরিক নির্যাতন।
প্রথমে রাজশাহী কারাগারের কমিউনিস্ট বন্দিরা এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। অনশন ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য কারাগারেও। ১৯৪৯ সালে ঢাকা ও রাজশাহী কারাগারে কয়েক দফায় দীর্ঘ অনশন চলে। খুলনা কারাগারে বিষ্ণু বৈরাগী এবং ঢাকা কারাগারে শিবেন রায়ের মৃত্যুর ঘটনাও বন্দিদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাদের মৃত্যুকে ঘিরে আত্মহত্যার প্রচার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে সেসময়।
এই আন্দোলনকে দমাতে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে। হিন্দু, মুসলমান ও আদিবাসী বন্দিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয় বলেও ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে। কিন্তু বন্দিরা সেই বিভাজনের চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেন।
১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বন্দিদের দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কার্যকর কোনো সমাধান না আসায় ৫ এপ্রিল শুরু হয় অনশন। ক্রমেই অনশনকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিরা তাদের দাবি আদায়ে অনড় থাকেন। এরপর আসে ২৪ এপ্রিল। যে দিনটি ইতিহাসে রক্তাক্ত হয়ে আছে।
২৪ এপ্রিল ১৯৫০: খাপড়া ওয়ার্ডে গুলির শব্দ
সেদিন সকাল। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে বন্দিরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ তাদের অন্য একটি সেলে স্থানান্তর করতে চেয়েছিল। কিন্তু বন্দিরা সেই নির্দেশ মানতে রাজি হননি। তাদের আশঙ্কা ছিল, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও সংক্রামক রোগে আক্রান্ত বন্দিদের জন্য নির্ধারিত ১৪ নম্বর সেলে তাদের পাঠানো হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
জেল সুপার ডব্লিউ এফ বিলের সঙ্গে বন্দিদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে তিনি ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে বাইরে চলে যান। এরপর কারারক্ষীরা ওয়ার্ড ঘিরে ফেলে। বন্দিরা ভেতর থেকে দরজা আটকে দেন। চৌকি, তোশক, বালিশ ও শরীরের শক্তি দিয়ে তাঁরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
কিন্তু সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি। কারারক্ষীরা জানালার কাচ ভেঙে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে। মুহূর্তেই গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে কারাগারের পরিবেশ। বন্দিদের আর্তচিৎকার, রক্তাক্ত শরীর আর মৃত্যুর বিভীষিকায় খাপড়া ওয়ার্ড পরিণত হয় এক ভয়াবহ হত্যাক্ষেত্রে।
খাপড়া ওয়ার্ডের হত্যাকাণ্ড শুধু সাতটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, অসংখ্য বন্দির জীবনকেও বিপর্যস্ত করেছিল। আহতদের অনেকেই দীর্ঘদিন শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেন। কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেন। হত্যাকাণ্ডের পর শহীদদের মরদেহ ও ঘটনার বিবরণ গোপন রাখার অভিযোগও ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।
দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের কাছে আড়ালেই থেকে যায় এই রক্তাক্ত অধ্যায়। পরে প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণ, লেখালেখি এবং ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের বিবরণ মানুষের সামনে আসতে শুরু করে। এই ইতিহাস সংরক্ষণে প্রথম আলো সম্পাদক ও লেখক মতিউর রহমানের ‘খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড ১৯৫০’ বইটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২৫ বছর পর আবারও কারাগারে রক্তপাত
খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের ২৫ বছর পর, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, বাংলাদেশের আরেকটি কারাগার হয়ে ওঠে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী। এবার স্থান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকাকালে যে চার নেতা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর তাদেরই একজনের পর একজনকে বন্দি করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে।
এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ভোররাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে সশস্ত্র ঘাতকেরা। হত্যা করা হয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।
মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া চার জাতীয় নেতাকে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা অবস্থায় এভাবে হত্যা করা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত।
ইতিহাসের দায়, স্মৃতির প্রশ্ন
একটি বিষয় লক্ষণীয়, খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড এবং জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ড-দুটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু জাতীয় স্মৃতি ও আলোচনায় দুই ঘটনার অবস্থান সমান নয়। ৩ নভেম্বর জাতীয় পর্যায়ে জেলহত্যা দিবস হিসেবে পরিচিত হলেও ২৪ এপ্রিলের খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড আজও তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।
অথচ খাপড়া ওয়ার্ডের সাত শহীদের আত্মত্যাগকে বাদ দিয়ে এ ভূখণ্ডের রাজনৈতিক আন্দোলন, শ্রমিক অধিকার, কৃষক সংগ্রাম ও বামপন্থি রাজনীতির ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা সম্ভব নয়। তাদের রাজনৈতিক আদর্শ বা মতাদর্শের সঙ্গে কারও দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু বন্দি অবস্থায় তাদের ওপর গুলিবর্ষণ এবং প্রাণহানির ঘটনাকে ইতিহাস থেকে আড়াল করার সুযোগ নেই।
একইভাবে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডও কেবল চারটি প্রাণহানির ঘটনা নয়। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, স্বাধীনতার রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার ওপর ভয়াবহ আঘাত।
প্রশ্ন হচ্ছে, যে কারাগার বন্দিদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেই কারাগার কীভাবে হত্যাকাণ্ডের স্থানে পরিণত হয়? রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা মানুষের জীবন রক্ষার দায় কার? কারাগারের দেয়ালের ভেতরে সংঘটিত অপরাধের বিচার ও ইতিহাস সংরক্ষণের দায়িত্বই বা কার? ইতিহাসের এই দুটি অধ্যায় আমাদের সেই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায়।
কারাগারের দেয়াল হয়তো অনেক ঘটনা আড়াল করতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের রক্তের দাগ মুছে দিতে পারে না। খাপড়া ওয়ার্ড থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার-দুটি সময়, দুটি হত্যাকাণ্ড। ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কারাগারের দরজা বন্ধ থাকলেই বন্দির জীবন নিরাপদ হয়ে যায় না।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬
ইতিহাসের দুই সময়, দুটি কারাগার, দুটি রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৫০ সালে রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে সাত বিপ্লবী বন্দির মৃত্যু, আর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড। সময় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও দুটি ঘটনাই আমাদের ইতিহাসে কারাগারের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় হেফাজত এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের এক নির্মম প্রশ্ন রেখে গেছে।
৩ নভেম্বর। জাতীয় জেলহত্যা দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক শোকাবহ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো একটি সুরক্ষিত স্থানে হত্যা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের চার জাতীয় নেতাকে। তারা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান।
কিন্তু কারাগারের দেয়ালের ভেতরে রাজনৈতিক বন্দিদের রক্ত ঝরার ইতিহাস কি কেবল ১৯৭৫ সালেই সীমাবদ্ধ? ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমাদের ফিরে যেতে হয় আরও ২৫ বছর আগে। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল। স্থান রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ড।
জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের আগে এই খাপড়া ওয়ার্ডেই গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সাত কমিউনিস্ট রাজনৈতিক বন্দিকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যা খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। একে উপমহাদেশের প্রথম জেলহত্যার ঘটনাগুলোর অন্যতম হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
দুটি ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান ২৫ বছর। রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা, শাসনব্যবস্থা আলাদা, হত্যাকাণ্ডের পটভূমিও আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় ভয়াবহ মিল, সেটি হল কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দিদের জীবনও নিরাপদ ছিল না।
খাপড়া ওয়ার্ড: প্রতিবাদ থেকে রক্তাক্ত পরিণতি
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় নানা পরিবর্তন আসে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মী, কৃষক আন্দোলনের সংগঠক, শ্রমিক নেতা ও বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকে কারাবন্দি হন। কিন্তু কারাগারের ভেতরেও তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল অমানবিক পরিবেশ।
কারাবন্দিদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, তামাক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, তেলের ঘানি টানা, গম মাড়াই ও পেষাইয়ের মতো কঠোর শ্রমে বাধ্য করা-এসব ছিল বন্দিদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। সামান্য বিশ্রাম কিংবা কাজে দেরি হলেই নেমে আসত শারীরিক নির্যাতন।
প্রথমে রাজশাহী কারাগারের কমিউনিস্ট বন্দিরা এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। অনশন ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য কারাগারেও। ১৯৪৯ সালে ঢাকা ও রাজশাহী কারাগারে কয়েক দফায় দীর্ঘ অনশন চলে। খুলনা কারাগারে বিষ্ণু বৈরাগী এবং ঢাকা কারাগারে শিবেন রায়ের মৃত্যুর ঘটনাও বন্দিদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাদের মৃত্যুকে ঘিরে আত্মহত্যার প্রচার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে সেসময়।
এই আন্দোলনকে দমাতে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে। হিন্দু, মুসলমান ও আদিবাসী বন্দিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয় বলেও ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে। কিন্তু বন্দিরা সেই বিভাজনের চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেন।
১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বন্দিদের দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কার্যকর কোনো সমাধান না আসায় ৫ এপ্রিল শুরু হয় অনশন। ক্রমেই অনশনকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিরা তাদের দাবি আদায়ে অনড় থাকেন। এরপর আসে ২৪ এপ্রিল। যে দিনটি ইতিহাসে রক্তাক্ত হয়ে আছে।
২৪ এপ্রিল ১৯৫০: খাপড়া ওয়ার্ডে গুলির শব্দ
সেদিন সকাল। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে বন্দিরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ তাদের অন্য একটি সেলে স্থানান্তর করতে চেয়েছিল। কিন্তু বন্দিরা সেই নির্দেশ মানতে রাজি হননি। তাদের আশঙ্কা ছিল, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও সংক্রামক রোগে আক্রান্ত বন্দিদের জন্য নির্ধারিত ১৪ নম্বর সেলে তাদের পাঠানো হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
জেল সুপার ডব্লিউ এফ বিলের সঙ্গে বন্দিদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে তিনি ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে বাইরে চলে যান। এরপর কারারক্ষীরা ওয়ার্ড ঘিরে ফেলে। বন্দিরা ভেতর থেকে দরজা আটকে দেন। চৌকি, তোশক, বালিশ ও শরীরের শক্তি দিয়ে তাঁরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
কিন্তু সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি। কারারক্ষীরা জানালার কাচ ভেঙে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে। মুহূর্তেই গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে কারাগারের পরিবেশ। বন্দিদের আর্তচিৎকার, রক্তাক্ত শরীর আর মৃত্যুর বিভীষিকায় খাপড়া ওয়ার্ড পরিণত হয় এক ভয়াবহ হত্যাক্ষেত্রে।
খাপড়া ওয়ার্ডের হত্যাকাণ্ড শুধু সাতটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, অসংখ্য বন্দির জীবনকেও বিপর্যস্ত করেছিল। আহতদের অনেকেই দীর্ঘদিন শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেন। কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেন। হত্যাকাণ্ডের পর শহীদদের মরদেহ ও ঘটনার বিবরণ গোপন রাখার অভিযোগও ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।
দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের কাছে আড়ালেই থেকে যায় এই রক্তাক্ত অধ্যায়। পরে প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণ, লেখালেখি এবং ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের বিবরণ মানুষের সামনে আসতে শুরু করে। এই ইতিহাস সংরক্ষণে প্রথম আলো সম্পাদক ও লেখক মতিউর রহমানের ‘খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড ১৯৫০’ বইটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২৫ বছর পর আবারও কারাগারে রক্তপাত
খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের ২৫ বছর পর, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, বাংলাদেশের আরেকটি কারাগার হয়ে ওঠে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী। এবার স্থান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকাকালে যে চার নেতা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর তাদেরই একজনের পর একজনকে বন্দি করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে।
এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ভোররাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে সশস্ত্র ঘাতকেরা। হত্যা করা হয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।
মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া চার জাতীয় নেতাকে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা অবস্থায় এভাবে হত্যা করা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত।
ইতিহাসের দায়, স্মৃতির প্রশ্ন
একটি বিষয় লক্ষণীয়, খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড এবং জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ড-দুটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু জাতীয় স্মৃতি ও আলোচনায় দুই ঘটনার অবস্থান সমান নয়। ৩ নভেম্বর জাতীয় পর্যায়ে জেলহত্যা দিবস হিসেবে পরিচিত হলেও ২৪ এপ্রিলের খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড আজও তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।
অথচ খাপড়া ওয়ার্ডের সাত শহীদের আত্মত্যাগকে বাদ দিয়ে এ ভূখণ্ডের রাজনৈতিক আন্দোলন, শ্রমিক অধিকার, কৃষক সংগ্রাম ও বামপন্থি রাজনীতির ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা সম্ভব নয়। তাদের রাজনৈতিক আদর্শ বা মতাদর্শের সঙ্গে কারও দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু বন্দি অবস্থায় তাদের ওপর গুলিবর্ষণ এবং প্রাণহানির ঘটনাকে ইতিহাস থেকে আড়াল করার সুযোগ নেই।
একইভাবে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডও কেবল চারটি প্রাণহানির ঘটনা নয়। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, স্বাধীনতার রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার ওপর ভয়াবহ আঘাত।
প্রশ্ন হচ্ছে, যে কারাগার বন্দিদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেই কারাগার কীভাবে হত্যাকাণ্ডের স্থানে পরিণত হয়? রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা মানুষের জীবন রক্ষার দায় কার? কারাগারের দেয়ালের ভেতরে সংঘটিত অপরাধের বিচার ও ইতিহাস সংরক্ষণের দায়িত্বই বা কার? ইতিহাসের এই দুটি অধ্যায় আমাদের সেই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায়।
কারাগারের দেয়াল হয়তো অনেক ঘটনা আড়াল করতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের রক্তের দাগ মুছে দিতে পারে না। খাপড়া ওয়ার্ড থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার-দুটি সময়, দুটি হত্যাকাণ্ড। ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কারাগারের দরজা বন্ধ থাকলেই বন্দির জীবন নিরাপদ হয়ে যায় না।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

আপনার মতামত লিখুন