সংবাদ

বিষাদ বসুধার মোহিনী: চারিত্র্যবিচার


রকিবুল হাসান
রকিবুল হাসান
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৯ এএম

বিষাদ বসুধার মোহিনী: চারিত্র্যবিচার

মোস্তফা কামালের ‘বিষাদ বসুধা’ উপন্যাসের মূল বিষয় করোনা| করোনাকালে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সাংবাদিকতার ভেতর-বাইরের চিত্র, জীবনযাপনের বিপর্যস্ত অবস্থা, একশ্রেণির মানুষের অর্থপিপাসু চরিত্র, সমাজ ও ব্যক্তিক চারিত্রিক অবক্ষয়— প্রভূত বিষয় এ-উপন্যাসের উপজীব্য| 

‘বিষাদ বসুধা’ উপন্যাসে বিষয়বীক্ষা ও সমাজ-সমকালচেতনা চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে| উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটেছে| গুরুত্বপূর্ণ-অগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ধরনের চরিত্র রয়েছে| মোহিনীকে মূল চরিত্র বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে| মোহিনীর পাশে শাহবাজ খান ও আসিফ আহমেদ আছেন| অনেকটা ‘গৃহদাহ’ উপন্যাসের অচলার চরিত্রকে ঘিরে যেভাবে মহিম ও সুরেশ আছে|  লেখকের সযত্ন সৃষ্টি মোহিনী| ফলে আর কোনো চরিত্র মোহিনীর কাছাকাছিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি| ¯^াভাবিকভাবেই মোহিনী উপন্যাসের প্রধান চরিত্র| নায়কও মোহিনী| নায়ক হওয়ার জন্য যে ধরনের সাহস, সততা,  দূরদর্শিতা ও মহৎ হওয়া প্রয়োজন, তা মোহিনীর মধ্যে সম্পূর্ণভাবেই আছে| অন্য আর কোনো চরিত্রে তা পরিলক্ষিত হয়নি| মোহিনীর থেকেও এ উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে করোনা| উপন্যাসটির সর্বত্র জুড়ে করোনা আছে| কিন্তু মোহিনী সর্বত্র নেই| শাহবাজ খান কিংবা আসিফ আহমেদও নেই| এসব বিবেচনায় নিলে উপন্যাসটির মূল চরিত্র মোহিনী নয়, করোনা| কারণ করোনা ঘিরেই মোহিনী, শাহবাজ খান ও আসিফ আহমেদ অছে| কিন্তু করোনাকে বাদ দিয়ে তাদের জীবনপ্রবাহ সেভাবে লক্ষ করা যায় না| ফলে উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র কে— করোনা নাকি মোহিনী? প্রশ্ন উঠতেই পারে| যেমন প্রশ্ন আছে অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের নায়ক কে তিতাস নদী নিজেই নাকি কিশোর অথবা বাসন্তি? অমীমাংসিত| ‘বিষাদ বসুধা’র ক্ষেত্রেও এ প্রশ্ন অস্বাভাবিক নয়|

উপন্যাসটিতে অনেক চরিত্রের সমাহার ঘটলেও মূলত প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর মধ্যে মোহিনী ছাড়াও আছে আরেফিন, শাহবাজ খান, আসিফ আহমেদ, মুনমুন আহমেদ, ¯^াস্থৗমন্ত্রী, ˆবরম খান, দিলরুবা খান, মোহসীন আহমেদ, আনোয়ারা বেগম, নীলিমা, রুবিনা, মেহেরুন্নেসা, আবদুর রহমান, আয়শা বেগম, শাওলী খান, ডাক্তার চ্যাঙ, ইকবাল সাহেব, ˆতল মিলন, তেলবাজ তুষার, শ্যামল পাল, মোমিন, ইমদাদুল হক, রোকেয়া, ম্যাক, আবদুল হারিস, লিয়াকত খান, সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম, রুচিতা, ¯^রাষ্ট্রমন্ত্রী, রহিমা বিবি, আব্দুর রহমান আয়শাসহ আরও চরিত্র| এ চরিত্রগুলো যে সবই গুরুত্বপূর্ণ তা বলা ঠিক হবে না| চরিত্র এসেছে চরিত্রের প্রয়োজনেই, কাহিনীর প্রাসঙ্গিকতার অপরিহার্যতায়| তা হয়তো কখনো ¯^ল্প গুরুত্বে, কখনো অধিক গুরুত্বে| কিন্তু সব চরিত্রই কমবেশি গুরুত্বপূর্ণ| অধ্যায় বিভাজনে যেমন নতুনত্ব আছে, বিষয়েও নতুনত্ব আছে, আর সেসব কারণেই নতুন নতুন চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটেছে| সব চরিত্র সমান আয়ু প্রাপ্ত হয়নি| সম-গুরুত্বপূর্ণও নয়| কিন্তু সেসব চরিত্রের প্রয়োজন অসম্পূণ কাজ করার সুযোগ নেই| অধ্যায় বিভাজনে বিষয়বস্তুর নতুনত্ব আনয়নে, বর্ণনায় লেখক যেন একটু বেশি তাড়াহুড়া করেছেন| কোনো কোনো অধ্যায় অনেকটা প্রতিবেদনের মতো হয়ে উঠেছে| এর ভেতর দিয়ে সাংবাদিক মোস্তফা কামালের ছায়া বেশি স্পষ্টতর হয়েছে| যেমন ‘মৃত্যুক্ষুধা’ কিংবা ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসে আনসার কিংবা জাহাঙ্গীর চরিত্রে নজরুলের মানস-রূপ অনুভূত হয়| ‘বিষাদ বসুধা’র প্রধান কয়েকটি চরিত্র আলোচনা সাপেক্ষে অনুধাবনের প্রয়াস পাবো চারিত্র্য-নির্মাণে লেখকের দক্ষতা ও সফলতা কতোটা! 

লেখকের সযত্ন সৃষ্টি মোহিনী চরিত্র| প্রথম খণ্ডে মোহিনীর ভার্সিটি জীবন, আরেফিনের সঙ্গে প্রেম-বিয়ে, দাম্পত্য সংকট, ˆবধব্যবরণ, মানবসেবায় আত্মনিবেদন, করোনার ভয়াহতা এং দায়িত্বশীল এক নারীর ¯^রূপ আবিষ্কৃত হয়েছে| দ্বিতীয় খণ্ডে সেই ধারাবাহিকতায় কাহিনী অগ্রসরমান| মোহিনীর ব্যক্তিত্ব তার চরিত্রকে বিশেষত্ব দান করেছে| মোহিনী বিধবা হওয়ার পরে তার মধ্যে কখনো কখনো হতাশা ˆতরি হয়েছে| কিন্তু ব্যক্তিক দৃঢ়তা তাকে কখনোই ভেঙে পড়তে দেয়নি| মোহিনীর বয়স কতোই আর! এখনো পূর্ণ যৌবনা| এ বয়সে ˆবধব্যবরণের পরও তিনি আরেফিনের বাইরে জীবনে আর কাউকে ভাবতে পারেননি| ভাবেনও নি| শাহবাজ খান তার জীবনে আসার জন্য বহুভাবে চেষ্টা করেছে| ছোটবেলা থেকে তাদের বন্ধুত্ব| মোহিনীর প্রতি তার দুর্বলতা তখন থেকেই| মাঝে পড়ালেখার কারণে শাহবাজ খানের বিদেশ অবস্থান, তাদের মধ্যে সেই সময়ে দেখা-সাক্ষাৎ ঘটেনি| যোগাযোগও ছিল না| করোনাকালীন সময়ে তাদের মধ্যে হুট করেই আবার যোগাযোগ স্থাপন হয়| শাহবাজ খান ধনীপুত্র| নিজেও পিতার শিল্পসাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে| মোহিনীও শিল্পদ্যোক্তা— ধনী ব্যবসায়ী| আরেফিনের মৃত্যুর পরে মোহিনীর জীবনে শাহবাজ খান আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা করে| কিন্তু মোহিনী অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সুকৌশলে শাহবাজ খানের ফাঁদে পা দেননি| বন্ধুত্বের সীমা লঙ্ঘন করেননি| করতেও দেননি| আরেফিন মৃত্যুবরণ করলেও মোহিনীর মস্তিষ্কের কোষে কোষে বেঁেচ আছে আরেফিন| তার সঙ্গে যাপিত অসংখ্য স্মৃতি মোহিনী নিজের ভেতর লালন করেন| আরেফিন না থেকেও পুরো আরেফিনই তার জীবনে জীবন্ত হয়ে আছে| সেখান থেকে মোহিনীর মুক্তি ঘটেনি, মুক্তি ঘটাতে চানও নি| মোহিনীর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা ও সততা তার চরিত্রকে উচ্চমার্গের করেছে| শাহবাজ খানের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের কোনো ঘাটতি ছিলো না| কিন্তু যখন তিনি জানলেন শাহবাজ খানের সঙ্গে রুবিনা নাম্নী এক কলেজ ছাত্রীর অনৈতিক সম্পর্ক ছিল| রুবিনাকে গুলশানে নিজে বাসা ভাড়া করে রাখতেন| রক্ষিতার মতো| অনেকটা ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’র জমিদার গোবিন্দলাল আর রোহিনীর অবস্থা| গোবিন্দলাল রোহিনাকে বিয়ের আশ^াসে রক্ষিতা করে রেখেছিল এবং শেষে বিয়ে তো করেইনি, গুলি করে হত্যা করেছিল| রুবিনার ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনাই ঘটেছে| একালের ‘জমিদার’ শাহবাজ খান বিয়ের আশ^াসে রুবিনাকে রক্ষিতা করে রেখেছিল এবং শেষে হত্যা করেছে| রুবিনার মনে রোহিনীর মতোই আশা ছিল ¯^প্ন ছিল শাহবাজ খান তাকে বিয়ে করবে, তার সংসার হবে, সন্তান হবে| কিন্তু শাহবাজ খান ছিলেন পুরোটাই ভোগবাদী মানসিকতাসম্পন্ন| সে কারণে একপর্যায়ে রুবিনাকে হত্যা করে সে| রুবিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিল| অর্থাৎ ভ্রূণসহ হত্যার শিকার হয় রুবিনা| এটা মোহিনী জানার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অফিসে জানিয়ে দেন, শাহবাজ খান যেন তার অফিসে কখনোই আসতে না পারে| তার জন্য এ অফিস নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়| মোহিনীর চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ করে| কারণ তিনি রুবিনার বিষয় নিয়ে শাহবাজ খানের সঙ্গে কোনো কথা বলা বা আলোচনা করারই প্রয়োজন মনে করেননি| এরকম একজন নষ্টকীটের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব থাকতে পারে না, কোনো রকম আর যোগাযোগ হতে পারে না| তিনি মুহূর্তেই মানসিক দৃঢ়তা, সততা ও আদর্শে এরকম কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছেন| অথচ শাহবাজ খানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছোটবেলা থেকে| শাহবাজ খান তাকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরুর কথা সরাসরি বলেছে— যা বিনয়ের সঙ্গে মোহিনী প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করেছে| কিন্তু বন্ধুত্বের জায়গাটি তো তাদের মধ্যে ছিল| শাহবাজ খানের রুবিনা হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা জানার পরই তিনি মুহূর্তেই তার জীবন থেকে শাহবাজ খানকে উপড়ে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন| চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব কতোটা শক্তিশালী হলে মুহূর্তেই দীর্ঘদিনের বন্ধুকে এভাবে ছুঁড়ে ফেলতে পারা যায়, তা সহজেই অনুমিত হতে পারে| এখানে শাহবাজ খানের অর্থ-ক্ষমতা-বন্ধুত্ব কোনো কিছুই মুহূর্তের জন্যও মোহিনীকে ভাবাতে পারেনি| মোহিনী এমনই এক নির্লোভ, নির্মোহ, সত্যের ও আদর্শের ধারক হয়ে ওঠেন| 

মোহিনীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আসিফ আহমেদ| প্রখ্যাত সাংবাদিক তিনি| মোহিনীর আসিফ আহমেদের প্রতি প্রচ্ছন্নভাবে মানসিক দুর্বলতা থাকলেও কখনো তা প্রকাশ করেননি| বন্ধুত্বকে অতিক্রম করে অন্য কোনো সম্পর্কে আগাননি|আসিফ আহমেদকে তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার কথা বলেছেন| তার পাশে সহযোগিতার হাত বাড়াতে চয়েছেন| এমনকি আসিফ আহমেদকে মাথায় রেখেই পত্রিকা প্রকাশনার কথাও ভেবেছেন| আসিফ আহমেদ তাকে না জনিয়ে অনলাইন পত্রিকা ‘ঢাকাপ্রকাশ’ করলে মোহিনীর কণ্ঠে অভিমান ও অনুযোগের প্রকাশ ঘটেছে| বন্ধুত্বের প্রতি তার যে সম্মান ও দায়িত্ববোধ তা অসাধারণ| আসিফ আহমেদ বন্ধুত্বের সীমানা কখনোই অতিক্রম করেননি| তার শান্ত-স্নিগ্ধ কিন্তু ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ মোহিনীকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছে| বন্ধু হয়েও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আত্মসস্মানবোধ এবং হৃদয়গত উপলব্ধি— মোহিনী চরিত্রে অপূর্ব সুঘ্রাণ ˆতরি করেছে| আরেফিনের দরিদ্র পরিবারের প্রতি তার যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ তা বাঙালি নারীর চিরকালীন যে ব্যক্তিক-সৌন্দর্য ও দায়িত্ববোধ তা চমৎকারভাবে লেখক তুলির আঁচড়ের মতো কয়েকটা টানেই জীবন্ত করে এঁেকছেন| আরেফিনের বাবা আলী আকবর যখন অফিসে এসে মোহিনীকে না পেয়ে ফিরে গেছেন, রেখে গেছেন অসহায় আকুতিভরা পত্র, সেই পত্র পড়ে মোহিনীর ভেতর যে মানসিক কষ্ট-যন্ত্রণা হয়েছে, নিজের ভেতর বেদনার্ত আর্তনাদ হয়েছে, মানসিক কষ্টে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে| অফিসের কর্মকর্তার প্রতি তার এ বিষয়ে নির্মোহ আচরণ এবং দ্রুত দ্বিগুণ পরিমাণে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন| এর ভেতর দিয়ে মানবিক ও দায়িত্বশীল মোহিনীকে পাই| বাঙালির নারীর জীবনে স্বামী-পরিবার যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা মোহিনী চরিত্রে পরিলক্ষিত হয়| তিনি ধনীকন্যা| নিজেও ধনী শিল্পোদ্যোক্তা| ¯^ামী মৃত| নিজে কখনো শ^শুর বাড়ি যাননি| তিনি অনায়াসে এসব এড়িয়ে চলতে পারতেন| তিনি তা করেননি| বরং আরেফিনের মৃত্যুর পর থেকেই তার পরিবারের দায়িত্ব বহন করছেন| তিনি জানেন আরেফিনের টাকাতেই সংসার চলতো| আরেফিনের মৃত্যুতে পরিবারটা অসহায়| তাই তিনি নিজেই বাড়ির যেন পুত্রবধূ নয়, নিজেই সংসারের দায়িত্ব পালনে আরেফিন হয়ে ওঠেন| মোহিনী যেন ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র প্রমীলাকেই মনে করিয়ে দেয়| স্বামী মেঘনাদ যখন বিপদগ্রস্ত তখন তিনি চুপ থাকতে পারেন নি| তিনি মুহূর্তেই যুদ্ধসাজে ˆতরি হয়ে স্বামী মেঘনাদকে উদ্ধারের জন্য ছুটে গেছেন| মোহিনীর প্রেক্ষিত ভিন্ন| কিন্তু দায়িত্বের জায়গা অনেকখানিই এক| বিশেষ করে বাঙালি নারীর কাছে স্বামীর পরিবার বিপদগ্রস্ত হওয়া মানে সে বিপদ তার নিজেরই| সেখানে তার হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার উপায় নেই| শ্বাড়ির প্রতি বাঙালি নারীর হৃদয়সত্য ও দায়িত্ববোধে মোহিনী চরিত্র অসামান্য হয়ে উঠেছে| 

মোহিনী দেড় বছরের ব্যবধানে বাবা মোহসীন আহমেদ ও মা আনোয়ারা বেগমকে হারিয়ে দিশেহারা| বাবা মৃত্যুর আগে স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও কন্যা মোহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে ‘আনোয়ারা-মোহসীন ট্রাস্ট’ ট্রাস্ট গঠন করেন| মোহিনী সেই ট্রাস্টের প্রধান| নিজের কোম্পানিও ট্রাস্টের অন্তর্ভুক্ত করেন| যাতে তাদের মৃত্যুর পরে কোম্পানিগুলো কোনো সমস্যার শিকার না হয়ে স্ভাবিকভাবে চলতে পারে| ট্রাস্ট থেকে মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়| হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রকাশনাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান| করোনায় বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে সাহায্য নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেন| কারণ তিনি জানেন মৃত্যু অবধারিত| আরেফিন ও বাবা-মায়ের মতো একদিন তাকেও চলে যেতে হবে| সেকারণে উপার্জিত অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন| ব্যক্তি মোহিনী নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেননি| ভেবেছেন দেশের অসহায় মানুষের কথা| নিজেকে নিজেই অতিক্রম করার অসাধারণ চরিত্র মোহিনী| 

উপন্যাসের মোহিনীর গুরুত্ব বিবেচনা করে যে বিষয়টি ভাবনায় আসে তাহলো, প্রধান চরিত্র মোহিনী হওয়া সত্ত্বেও কিছু অধ্যায়ে মোহিনী বাদেই স্বতন্ত গতিতে এগিয়েছে| এমনকি করোনাও সব অধ্যায়ে নেই| ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে কিশোর বা বাসন্তী সব জায়গায় না থাকলেও তিতাস নদী কিন্তু সর্বত্র বিরাজিত, প্রবাহিত, জীবনের সঙ্গে যুক্ত| ‘বিষাদ বসুধা’তে করোনা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সর্বত্র আছে| মোহিনী সর্বত্র নেই| মোহিনী সর্বক্ষেত্রে অনিবার্য হয়ে উঠলে আরও গুরুত্ববহ হতে পারতো| শেষের দিকে মোহিনী ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে| তার চরিত্র নির্মাণে বয়স ও অবস্থান বিবেচনায় থাকলে ভালো হতো| যদিও বহুবিধ বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত মোহিনী| তবুও এর ভেতর দিয়েই মোহিনী মানসিক শক্তি অর্জন করে আরও তেজ¯^ী শক্তিমত্তায় বৃহৎ কল্যাণে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন| ব্রত ধারণ করতে পারতেন আরও ব্যাপক বৃহৎ মানবসেবা, যেহেতু তিনি আরেফিনের বাইরে ব্যক্তিগত নতুনজীবন গ্রহণ করেননি, করতে আগ্রহীও নন| সেক্ষেত্রে মোহিনীর আত্মনিবেদন হতে পারতো আরও বৃহৎ কল্যাণে, সক্রিয় ভূমিকাতে| তিনি সে-পথেরই অগ্রগামী পথিক ছিলেন| সেটাকে আরও ব্যাপক বিস্তৃত করে অনন্য এক চরিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন| লেখক সেক্ষেত্রে আর একটু ভাবতেই পারতেন|

‘বিষাদ বসুধা’ উপন্যাসের বিষয়বস্তু, চরিত্র নির্মাণ, সংলাপ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা, লেখকের নিজস্ব দর্শন এবং রচনাশৈলী— সবকিছু মিলিয়ে অসামান্য শিল্পকর্ম| কালের যাত্রায় উপন্যাসটি দালিলিক প্রমাণ হয়ে থাকবে| মোস্তফা কামাল বিষয়বস্তু নির্বাচন থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে সচেতনতা ও মুন্সিয়ানা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন| এ ধরনের উপন্যাস লিখতে সাহসের প্রয়োজন হয়, শুধু শুধু শিল্পকুশলী হলেই হয় না| সমাজের স্পর্শকাতর এমন সব বিষয় উপন্যাসের প্রাসঙ্গিকতায় উঠে এসেছে, যা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো| সর্বদিক বিবেচনায় রেখে ‘বিষাদ বসুধা’ সমকালীন প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম তা স্বীকার করতেই হয়| 

 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬


বিষাদ বসুধার মোহিনী: চারিত্র্যবিচার

প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মোস্তফা কামালের ‘বিষাদ বসুধা’ উপন্যাসের মূল বিষয় করোনা| করোনাকালে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সাংবাদিকতার ভেতর-বাইরের চিত্র, জীবনযাপনের বিপর্যস্ত অবস্থা, একশ্রেণির মানুষের অর্থপিপাসু চরিত্র, সমাজ ও ব্যক্তিক চারিত্রিক অবক্ষয়— প্রভূত বিষয় এ-উপন্যাসের উপজীব্য| 

‘বিষাদ বসুধা’ উপন্যাসে বিষয়বীক্ষা ও সমাজ-সমকালচেতনা চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে| উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটেছে| গুরুত্বপূর্ণ-অগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ধরনের চরিত্র রয়েছে| মোহিনীকে মূল চরিত্র বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে| মোহিনীর পাশে শাহবাজ খান ও আসিফ আহমেদ আছেন| অনেকটা ‘গৃহদাহ’ উপন্যাসের অচলার চরিত্রকে ঘিরে যেভাবে মহিম ও সুরেশ আছে|  লেখকের সযত্ন সৃষ্টি মোহিনী| ফলে আর কোনো চরিত্র মোহিনীর কাছাকাছিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি| ¯^াভাবিকভাবেই মোহিনী উপন্যাসের প্রধান চরিত্র| নায়কও মোহিনী| নায়ক হওয়ার জন্য যে ধরনের সাহস, সততা,  দূরদর্শিতা ও মহৎ হওয়া প্রয়োজন, তা মোহিনীর মধ্যে সম্পূর্ণভাবেই আছে| অন্য আর কোনো চরিত্রে তা পরিলক্ষিত হয়নি| মোহিনীর থেকেও এ উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে করোনা| উপন্যাসটির সর্বত্র জুড়ে করোনা আছে| কিন্তু মোহিনী সর্বত্র নেই| শাহবাজ খান কিংবা আসিফ আহমেদও নেই| এসব বিবেচনায় নিলে উপন্যাসটির মূল চরিত্র মোহিনী নয়, করোনা| কারণ করোনা ঘিরেই মোহিনী, শাহবাজ খান ও আসিফ আহমেদ অছে| কিন্তু করোনাকে বাদ দিয়ে তাদের জীবনপ্রবাহ সেভাবে লক্ষ করা যায় না| ফলে উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র কে— করোনা নাকি মোহিনী? প্রশ্ন উঠতেই পারে| যেমন প্রশ্ন আছে অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের নায়ক কে তিতাস নদী নিজেই নাকি কিশোর অথবা বাসন্তি? অমীমাংসিত| ‘বিষাদ বসুধা’র ক্ষেত্রেও এ প্রশ্ন অস্বাভাবিক নয়|

উপন্যাসটিতে অনেক চরিত্রের সমাহার ঘটলেও মূলত প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর মধ্যে মোহিনী ছাড়াও আছে আরেফিন, শাহবাজ খান, আসিফ আহমেদ, মুনমুন আহমেদ, ¯^াস্থৗমন্ত্রী, ˆবরম খান, দিলরুবা খান, মোহসীন আহমেদ, আনোয়ারা বেগম, নীলিমা, রুবিনা, মেহেরুন্নেসা, আবদুর রহমান, আয়শা বেগম, শাওলী খান, ডাক্তার চ্যাঙ, ইকবাল সাহেব, ˆতল মিলন, তেলবাজ তুষার, শ্যামল পাল, মোমিন, ইমদাদুল হক, রোকেয়া, ম্যাক, আবদুল হারিস, লিয়াকত খান, সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম, রুচিতা, ¯^রাষ্ট্রমন্ত্রী, রহিমা বিবি, আব্দুর রহমান আয়শাসহ আরও চরিত্র| এ চরিত্রগুলো যে সবই গুরুত্বপূর্ণ তা বলা ঠিক হবে না| চরিত্র এসেছে চরিত্রের প্রয়োজনেই, কাহিনীর প্রাসঙ্গিকতার অপরিহার্যতায়| তা হয়তো কখনো ¯^ল্প গুরুত্বে, কখনো অধিক গুরুত্বে| কিন্তু সব চরিত্রই কমবেশি গুরুত্বপূর্ণ| অধ্যায় বিভাজনে যেমন নতুনত্ব আছে, বিষয়েও নতুনত্ব আছে, আর সেসব কারণেই নতুন নতুন চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটেছে| সব চরিত্র সমান আয়ু প্রাপ্ত হয়নি| সম-গুরুত্বপূর্ণও নয়| কিন্তু সেসব চরিত্রের প্রয়োজন অসম্পূণ কাজ করার সুযোগ নেই| অধ্যায় বিভাজনে বিষয়বস্তুর নতুনত্ব আনয়নে, বর্ণনায় লেখক যেন একটু বেশি তাড়াহুড়া করেছেন| কোনো কোনো অধ্যায় অনেকটা প্রতিবেদনের মতো হয়ে উঠেছে| এর ভেতর দিয়ে সাংবাদিক মোস্তফা কামালের ছায়া বেশি স্পষ্টতর হয়েছে| যেমন ‘মৃত্যুক্ষুধা’ কিংবা ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসে আনসার কিংবা জাহাঙ্গীর চরিত্রে নজরুলের মানস-রূপ অনুভূত হয়| ‘বিষাদ বসুধা’র প্রধান কয়েকটি চরিত্র আলোচনা সাপেক্ষে অনুধাবনের প্রয়াস পাবো চারিত্র্য-নির্মাণে লেখকের দক্ষতা ও সফলতা কতোটা! 

লেখকের সযত্ন সৃষ্টি মোহিনী চরিত্র| প্রথম খণ্ডে মোহিনীর ভার্সিটি জীবন, আরেফিনের সঙ্গে প্রেম-বিয়ে, দাম্পত্য সংকট, ˆবধব্যবরণ, মানবসেবায় আত্মনিবেদন, করোনার ভয়াহতা এং দায়িত্বশীল এক নারীর ¯^রূপ আবিষ্কৃত হয়েছে| দ্বিতীয় খণ্ডে সেই ধারাবাহিকতায় কাহিনী অগ্রসরমান| মোহিনীর ব্যক্তিত্ব তার চরিত্রকে বিশেষত্ব দান করেছে| মোহিনী বিধবা হওয়ার পরে তার মধ্যে কখনো কখনো হতাশা ˆতরি হয়েছে| কিন্তু ব্যক্তিক দৃঢ়তা তাকে কখনোই ভেঙে পড়তে দেয়নি| মোহিনীর বয়স কতোই আর! এখনো পূর্ণ যৌবনা| এ বয়সে ˆবধব্যবরণের পরও তিনি আরেফিনের বাইরে জীবনে আর কাউকে ভাবতে পারেননি| ভাবেনও নি| শাহবাজ খান তার জীবনে আসার জন্য বহুভাবে চেষ্টা করেছে| ছোটবেলা থেকে তাদের বন্ধুত্ব| মোহিনীর প্রতি তার দুর্বলতা তখন থেকেই| মাঝে পড়ালেখার কারণে শাহবাজ খানের বিদেশ অবস্থান, তাদের মধ্যে সেই সময়ে দেখা-সাক্ষাৎ ঘটেনি| যোগাযোগও ছিল না| করোনাকালীন সময়ে তাদের মধ্যে হুট করেই আবার যোগাযোগ স্থাপন হয়| শাহবাজ খান ধনীপুত্র| নিজেও পিতার শিল্পসাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে| মোহিনীও শিল্পদ্যোক্তা— ধনী ব্যবসায়ী| আরেফিনের মৃত্যুর পরে মোহিনীর জীবনে শাহবাজ খান আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা করে| কিন্তু মোহিনী অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সুকৌশলে শাহবাজ খানের ফাঁদে পা দেননি| বন্ধুত্বের সীমা লঙ্ঘন করেননি| করতেও দেননি| আরেফিন মৃত্যুবরণ করলেও মোহিনীর মস্তিষ্কের কোষে কোষে বেঁেচ আছে আরেফিন| তার সঙ্গে যাপিত অসংখ্য স্মৃতি মোহিনী নিজের ভেতর লালন করেন| আরেফিন না থেকেও পুরো আরেফিনই তার জীবনে জীবন্ত হয়ে আছে| সেখান থেকে মোহিনীর মুক্তি ঘটেনি, মুক্তি ঘটাতে চানও নি| মোহিনীর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা ও সততা তার চরিত্রকে উচ্চমার্গের করেছে| শাহবাজ খানের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের কোনো ঘাটতি ছিলো না| কিন্তু যখন তিনি জানলেন শাহবাজ খানের সঙ্গে রুবিনা নাম্নী এক কলেজ ছাত্রীর অনৈতিক সম্পর্ক ছিল| রুবিনাকে গুলশানে নিজে বাসা ভাড়া করে রাখতেন| রক্ষিতার মতো| অনেকটা ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’র জমিদার গোবিন্দলাল আর রোহিনীর অবস্থা| গোবিন্দলাল রোহিনাকে বিয়ের আশ^াসে রক্ষিতা করে রেখেছিল এবং শেষে বিয়ে তো করেইনি, গুলি করে হত্যা করেছিল| রুবিনার ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনাই ঘটেছে| একালের ‘জমিদার’ শাহবাজ খান বিয়ের আশ^াসে রুবিনাকে রক্ষিতা করে রেখেছিল এবং শেষে হত্যা করেছে| রুবিনার মনে রোহিনীর মতোই আশা ছিল ¯^প্ন ছিল শাহবাজ খান তাকে বিয়ে করবে, তার সংসার হবে, সন্তান হবে| কিন্তু শাহবাজ খান ছিলেন পুরোটাই ভোগবাদী মানসিকতাসম্পন্ন| সে কারণে একপর্যায়ে রুবিনাকে হত্যা করে সে| রুবিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিল| অর্থাৎ ভ্রূণসহ হত্যার শিকার হয় রুবিনা| এটা মোহিনী জানার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অফিসে জানিয়ে দেন, শাহবাজ খান যেন তার অফিসে কখনোই আসতে না পারে| তার জন্য এ অফিস নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়| মোহিনীর চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ করে| কারণ তিনি রুবিনার বিষয় নিয়ে শাহবাজ খানের সঙ্গে কোনো কথা বলা বা আলোচনা করারই প্রয়োজন মনে করেননি| এরকম একজন নষ্টকীটের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব থাকতে পারে না, কোনো রকম আর যোগাযোগ হতে পারে না| তিনি মুহূর্তেই মানসিক দৃঢ়তা, সততা ও আদর্শে এরকম কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছেন| অথচ শাহবাজ খানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছোটবেলা থেকে| শাহবাজ খান তাকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরুর কথা সরাসরি বলেছে— যা বিনয়ের সঙ্গে মোহিনী প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করেছে| কিন্তু বন্ধুত্বের জায়গাটি তো তাদের মধ্যে ছিল| শাহবাজ খানের রুবিনা হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা জানার পরই তিনি মুহূর্তেই তার জীবন থেকে শাহবাজ খানকে উপড়ে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন| চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব কতোটা শক্তিশালী হলে মুহূর্তেই দীর্ঘদিনের বন্ধুকে এভাবে ছুঁড়ে ফেলতে পারা যায়, তা সহজেই অনুমিত হতে পারে| এখানে শাহবাজ খানের অর্থ-ক্ষমতা-বন্ধুত্ব কোনো কিছুই মুহূর্তের জন্যও মোহিনীকে ভাবাতে পারেনি| মোহিনী এমনই এক নির্লোভ, নির্মোহ, সত্যের ও আদর্শের ধারক হয়ে ওঠেন| 

মোহিনীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আসিফ আহমেদ| প্রখ্যাত সাংবাদিক তিনি| মোহিনীর আসিফ আহমেদের প্রতি প্রচ্ছন্নভাবে মানসিক দুর্বলতা থাকলেও কখনো তা প্রকাশ করেননি| বন্ধুত্বকে অতিক্রম করে অন্য কোনো সম্পর্কে আগাননি|আসিফ আহমেদকে তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার কথা বলেছেন| তার পাশে সহযোগিতার হাত বাড়াতে চয়েছেন| এমনকি আসিফ আহমেদকে মাথায় রেখেই পত্রিকা প্রকাশনার কথাও ভেবেছেন| আসিফ আহমেদ তাকে না জনিয়ে অনলাইন পত্রিকা ‘ঢাকাপ্রকাশ’ করলে মোহিনীর কণ্ঠে অভিমান ও অনুযোগের প্রকাশ ঘটেছে| বন্ধুত্বের প্রতি তার যে সম্মান ও দায়িত্ববোধ তা অসাধারণ| আসিফ আহমেদ বন্ধুত্বের সীমানা কখনোই অতিক্রম করেননি| তার শান্ত-স্নিগ্ধ কিন্তু ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ মোহিনীকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছে| বন্ধু হয়েও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আত্মসস্মানবোধ এবং হৃদয়গত উপলব্ধি— মোহিনী চরিত্রে অপূর্ব সুঘ্রাণ ˆতরি করেছে| আরেফিনের দরিদ্র পরিবারের প্রতি তার যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ তা বাঙালি নারীর চিরকালীন যে ব্যক্তিক-সৌন্দর্য ও দায়িত্ববোধ তা চমৎকারভাবে লেখক তুলির আঁচড়ের মতো কয়েকটা টানেই জীবন্ত করে এঁেকছেন| আরেফিনের বাবা আলী আকবর যখন অফিসে এসে মোহিনীকে না পেয়ে ফিরে গেছেন, রেখে গেছেন অসহায় আকুতিভরা পত্র, সেই পত্র পড়ে মোহিনীর ভেতর যে মানসিক কষ্ট-যন্ত্রণা হয়েছে, নিজের ভেতর বেদনার্ত আর্তনাদ হয়েছে, মানসিক কষ্টে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে| অফিসের কর্মকর্তার প্রতি তার এ বিষয়ে নির্মোহ আচরণ এবং দ্রুত দ্বিগুণ পরিমাণে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন| এর ভেতর দিয়ে মানবিক ও দায়িত্বশীল মোহিনীকে পাই| বাঙালির নারীর জীবনে স্বামী-পরিবার যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা মোহিনী চরিত্রে পরিলক্ষিত হয়| তিনি ধনীকন্যা| নিজেও ধনী শিল্পোদ্যোক্তা| ¯^ামী মৃত| নিজে কখনো শ^শুর বাড়ি যাননি| তিনি অনায়াসে এসব এড়িয়ে চলতে পারতেন| তিনি তা করেননি| বরং আরেফিনের মৃত্যুর পর থেকেই তার পরিবারের দায়িত্ব বহন করছেন| তিনি জানেন আরেফিনের টাকাতেই সংসার চলতো| আরেফিনের মৃত্যুতে পরিবারটা অসহায়| তাই তিনি নিজেই বাড়ির যেন পুত্রবধূ নয়, নিজেই সংসারের দায়িত্ব পালনে আরেফিন হয়ে ওঠেন| মোহিনী যেন ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র প্রমীলাকেই মনে করিয়ে দেয়| স্বামী মেঘনাদ যখন বিপদগ্রস্ত তখন তিনি চুপ থাকতে পারেন নি| তিনি মুহূর্তেই যুদ্ধসাজে ˆতরি হয়ে স্বামী মেঘনাদকে উদ্ধারের জন্য ছুটে গেছেন| মোহিনীর প্রেক্ষিত ভিন্ন| কিন্তু দায়িত্বের জায়গা অনেকখানিই এক| বিশেষ করে বাঙালি নারীর কাছে স্বামীর পরিবার বিপদগ্রস্ত হওয়া মানে সে বিপদ তার নিজেরই| সেখানে তার হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার উপায় নেই| শ্বাড়ির প্রতি বাঙালি নারীর হৃদয়সত্য ও দায়িত্ববোধে মোহিনী চরিত্র অসামান্য হয়ে উঠেছে| 

মোহিনী দেড় বছরের ব্যবধানে বাবা মোহসীন আহমেদ ও মা আনোয়ারা বেগমকে হারিয়ে দিশেহারা| বাবা মৃত্যুর আগে স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও কন্যা মোহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে ‘আনোয়ারা-মোহসীন ট্রাস্ট’ ট্রাস্ট গঠন করেন| মোহিনী সেই ট্রাস্টের প্রধান| নিজের কোম্পানিও ট্রাস্টের অন্তর্ভুক্ত করেন| যাতে তাদের মৃত্যুর পরে কোম্পানিগুলো কোনো সমস্যার শিকার না হয়ে স্ভাবিকভাবে চলতে পারে| ট্রাস্ট থেকে মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়| হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রকাশনাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান| করোনায় বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে সাহায্য নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেন| কারণ তিনি জানেন মৃত্যু অবধারিত| আরেফিন ও বাবা-মায়ের মতো একদিন তাকেও চলে যেতে হবে| সেকারণে উপার্জিত অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন| ব্যক্তি মোহিনী নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেননি| ভেবেছেন দেশের অসহায় মানুষের কথা| নিজেকে নিজেই অতিক্রম করার অসাধারণ চরিত্র মোহিনী| 

উপন্যাসের মোহিনীর গুরুত্ব বিবেচনা করে যে বিষয়টি ভাবনায় আসে তাহলো, প্রধান চরিত্র মোহিনী হওয়া সত্ত্বেও কিছু অধ্যায়ে মোহিনী বাদেই স্বতন্ত গতিতে এগিয়েছে| এমনকি করোনাও সব অধ্যায়ে নেই| ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে কিশোর বা বাসন্তী সব জায়গায় না থাকলেও তিতাস নদী কিন্তু সর্বত্র বিরাজিত, প্রবাহিত, জীবনের সঙ্গে যুক্ত| ‘বিষাদ বসুধা’তে করোনা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সর্বত্র আছে| মোহিনী সর্বত্র নেই| মোহিনী সর্বক্ষেত্রে অনিবার্য হয়ে উঠলে আরও গুরুত্ববহ হতে পারতো| শেষের দিকে মোহিনী ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে| তার চরিত্র নির্মাণে বয়স ও অবস্থান বিবেচনায় থাকলে ভালো হতো| যদিও বহুবিধ বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত মোহিনী| তবুও এর ভেতর দিয়েই মোহিনী মানসিক শক্তি অর্জন করে আরও তেজ¯^ী শক্তিমত্তায় বৃহৎ কল্যাণে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন| ব্রত ধারণ করতে পারতেন আরও ব্যাপক বৃহৎ মানবসেবা, যেহেতু তিনি আরেফিনের বাইরে ব্যক্তিগত নতুনজীবন গ্রহণ করেননি, করতে আগ্রহীও নন| সেক্ষেত্রে মোহিনীর আত্মনিবেদন হতে পারতো আরও বৃহৎ কল্যাণে, সক্রিয় ভূমিকাতে| তিনি সে-পথেরই অগ্রগামী পথিক ছিলেন| সেটাকে আরও ব্যাপক বিস্তৃত করে অনন্য এক চরিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন| লেখক সেক্ষেত্রে আর একটু ভাবতেই পারতেন|

‘বিষাদ বসুধা’ উপন্যাসের বিষয়বস্তু, চরিত্র নির্মাণ, সংলাপ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা, লেখকের নিজস্ব দর্শন এবং রচনাশৈলী— সবকিছু মিলিয়ে অসামান্য শিল্পকর্ম| কালের যাত্রায় উপন্যাসটি দালিলিক প্রমাণ হয়ে থাকবে| মোস্তফা কামাল বিষয়বস্তু নির্বাচন থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে সচেতনতা ও মুন্সিয়ানা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন| এ ধরনের উপন্যাস লিখতে সাহসের প্রয়োজন হয়, শুধু শুধু শিল্পকুশলী হলেই হয় না| সমাজের স্পর্শকাতর এমন সব বিষয় উপন্যাসের প্রাসঙ্গিকতায় উঠে এসেছে, যা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো| সর্বদিক বিবেচনায় রেখে ‘বিষাদ বসুধা’ সমকালীন প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম তা স্বীকার করতেই হয়| 

 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত