সংবাদ

গ্রন্থালোচনা

বাছাই বারো : সমাজ, মনস্তত্ত্ব ও প্রান্তিক জীবনের আখ্যান


লাবণী মণ্ডল
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১১ এএম

বাছাই বারো : সমাজ, মনস্তত্ত্ব ও প্রান্তিক জীবনের আখ্যান

কথাসাহিত্যিক দিলারা মেসবাহ বাংলা সাহিত্যের এক নিভৃতচারী সাধক| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর সাহিত্যসাধনায় তিনি নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন| দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রায় কবিতা, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্যসহ তিনি ৪৩টি গ্রন্থ রচনা এবং ৫টি গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন| সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি জসীম উদ&দীন স্বর্ণপদক, লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কারসহ নানাবিধ সম্মাননা অর্জন করেছেন|

জলধি প্রকাশনী থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিতবাছাই বারোদিলারা মেসবাহর সাহিত্যযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন| বারোটি নির্বাচিত গল্পের এই সংকলন কেবল নিছক কাহিনির সমাহার নয়; বরং মানবচরিত্রের জটিল মনস্তত্ত্ব, পিতৃতন্ত্রের নীরব আগ্রাসন, প্রান্তিক কৃষকের মৃত্তিকা-প্রেম এবং সমকালীন সামাজিক অবক্ষয়ের এক প্রামাণ্য দলিল|

গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত বারোটি গল্প ভিন্ন ভিন্ন পটভূমিতে রচিত হলেও অস্তিত্বের সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এদের মূল যোগসূত্র| সমাজের নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণির যাপিত জীবনের দ্বন্দ্ব এবং আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে লেখক গল্পের ক্যানভাসে তুলে এনেছেন| বাংলাদেশ বেতারের স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর সংলাপে এনেছে সাবলীল নাটকীয়তা| গল্পগুলোতে মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভূতির ব্যবচ্ছেদ এবং পরিবেশের সাথে চরিত্রের মিথস্ক্রিয়া গভীরভাবে ফুটে উঠেছে|

দিলারা মেসবাহর সাহিত্যকর্মের প্রধান শক্তি মানবমনের জটিল মনস্তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ| ‘মোম জোছনার সিলসিলাগল্পে জাগতিক মোহ এবং আধ্যাত্মিক নিরাসক্তির বৈপরীত্য দেখা যায়| মধ্যবিত্ত পরিবারের রোমান্টিক কল্পনাবিলাসী তরুণী নিশির জীবনে ফানাফিল্লাহ বাকাবিল্লাহ তরিকার সাধক সোলেমানের উপস্থিতি প্রবল আলোড়ন তোলে| পার্থিব প্রেমের আকাঙ্ক্ষায় নিশি যখন উন্মুখ, ঠিক তখনই তার বান্ধবী মরিয়ম সোলেমানের আধ্যাত্মিক সাধনার বাস্তবতায় তাকে ফিরিয়ে আনে| সোমপুর বিহারের প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের পটভূমিতে নিশির এই মোহভঙ্গ তার ভেতর এক অসীম শূন্যতার জন্ম দেয়| কুলুঙ্গির ভেতর থেকে বাদুড়ের উড়ে যাওয়ার দৃশ্যটি এখানে স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে|

অন্যদিকে, মনস্তাত্ত্বিক ভীতি অপরাধবোধের চিত্র ফুটে উঠেছেজলপাই বাগানের ইন্ধনগল্পে| সম্পদের লোভে বৃদ্ধ স্বামী সাধু মণ্ডলের পুত্রবধূ আঙ্গুরিকে ভাতের সাথে ইঁদুর মারার বিষ প্রয়োগে হত্যা করে রূপবান| হত্যার পর লাশ গুম করার প্রক্রিয়ায় তার বাহ্যিক অনুশোচনা না থাকলেও, অবচেতন মনে সে ভয়ংকর হ্যালুসিনেশনের শিকার হয়| তার মনে হতে থাকে, নিহত আঙ্গুরি গোলাপি আঁচল উড়িয়ে ফিরে এসেছে এবং জলপাই গাছের পাতাগুলো ক্রন্দনরত অবস্থায় তাকে অভিশাপ দিচ্ছে| অবদমিত অপরাধবোধ কীভাবে স্নায়ুতন্ত্রে চাপ সৃষ্টি করে চরম পরিণতি ডেকে আনে, লেখক তা নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন|

আবার, ‘অন্ধকার অপরূপ ডানাগল্পে উঠে এসেছে সাংস্কৃতিক জগতের বুদ্ধিবৃত্তিক ভণ্ডামির আখ্যান| প্রখ্যাত আবৃত্তিকার অনুপম সরকারের প্রতি মুগ্ধ নিশি যখন বাস্তবে তার চরম আত্মকেন্দ্রিক রূঢ় রূপটি দেখে, তখন তার ঘোর কাটে| এই আকস্মিক প্রত্যাখ্যান নিশির মানসিক জগতে প্রচণ্ড ধাক্কা দিলেও, চরম হতাশার মুহূর্তেই সে নিজের ভেতরের প্রকৃত শক্তির সন্ধান পায়| অন্যের মোহজাল থেকে বেরিয়ে এসে নিশি তারঅপরূপ ডানাবা আত্মশক্তির বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়|

গ্রামীণ মফস্বল সমাজের গভীরে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং নারীর নীরব বঞ্চনা দিলারা মেসবাহর গল্পের অন্যতম অনুষঙ্গ| ‘ব্যাপারী বাড়ির পাঁচডুরিগল্পটি মাতৃত্বের শূন্যতা এবং শাশুড়ির নিষ্ঠুর আধিপত্যের মর্মান্তিক আখ্যান| নিঃসন্তান কাজলি একটি কাঠবিড়ালির ছানাকে সন্তানের স্নেহে লালন করে| ফিডারে দুধ খাওয়ানো বা লেজে নেইলপলিশ পরানোর আচরণগুলো তার অবদমিত মাতৃসত্তারই বহিঃপ্রকাশ| কিন্তু পরিবারের কর্ত্রী মরিয়ম বিবিযিনি নিজেই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক নারী প্রতিনিধিনির্মমভাবে প্রাণিটিকে হত্যা করেন| এই ঘটনা কাজলির মানসিক ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট করে দেয় এবং সে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে|

গার্হস্থ্য নির্যাতনের আরেক চরম রূপ দেখা যায়পালঙ্ক পুরাণগল্পে| দীর্ঘ মানসিক বঞ্চনায় ভারসাম্যহীন হয়ে মীরবাড়ির রাঙামামি গোয়ালঘরের পাশে শেকলবন্দি জীবন কাটান| তাঁর প্রলাপে মীরবাড়ির পালঙ্ক পুড়িয়ে ফেলার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়, যা মূলত পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য বৈবাহিক অধিকারের প্রতীকী ধ্বংসের ডাক| মরা খালের পাড়ে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধারের পর নতুন ধাতব খাটিয়ায় তা বহনের দৃশ্যটি সমাজের চরম অমানবিকতাকে নির্দেশ করে|

অন্যদিকে, ‘কার্নিশের কুহকগল্পে ধর্মীয় কুসংস্কারের মোড়কে নারীমনের বিদ্রোহকে ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল চিত্রিত হয়েছে| ষাটোর্ধ্ব সদরুদ্দিনের সাথে অসম বিবাহে বাধ্য হওয়া তরুণী চুমকির মানসিক বিচ্ছিন্নতাকে সমাজজিনের আছরবলে আখ্যা দেয়| প্রকৃত অর্থে, সমবয়সী নূরে আলেমের সাথে তার যে মানসিক সংযুক্তি ছিল, তার মৃত্যুর পর চুমকির নিরুদ্দেশ হওয়া এবং সদরুদ্দিনের চোখে তাদের একত্রে উড়ে যাওয়ার পরাবাস্তব দৃশ্যটি মূলত নারীর অবদমিত প্রেম মুক্তির আকাঙ্ক্ষারই বহিঃপ্রকাশ|

প্রান্তিক কৃষক এবং মাটির সাথে তাদের নাড়ির সম্পর্ক দিলারা মেসবাহর কলমে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে উঠে এসেছে| ‘খুরপি কাহিনিগল্পে রংপুরের বৃদ্ধ কৃষক পোড়াখাটিয়ার (সবেদ আলী) কাছে জমি নিড়ানো কেবল জীবিকা নয়, এটি তার কাছে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমতুল্য| তার এই মাটির প্রতি টানকে শহুরে সাংবাদিক বা তার আধুনিক সন্তানেরা পাগলামি ভাবলেও, লেখক মূলত নগরসভ্যতার ভোগবাদী মানসিকতার বিপরীতে কৃষকের অকৃত্রিম মৃত্তিকা-প্রেমকে দাঁড় করিয়েছেন|

জগা মাইতির ভূঁই বিলাসগল্পে ভূমিহীন কৃষকের জমি-ক্ষুধা শ্রেণিসংগ্রামের চিত্র দৃশ্যমান| রায়বাবুদের জমিতে কামলা খাটা জগা যখন প্রচলিত সংস্কার ভীতি উপেক্ষা করে প্রাচীন কালীমন্দিরের পতিত জমিতে কোদাল চালায়, তখন তা নিছক জমি আবাদ থাকে না| বিশাল গোখরো সাপ বের হয়ে আসার ভয়কে জয় করে জগার এই পদক্ষেপ শোষিতশ্রেণির আত্মজাগরণের প্রতীকে পরিণত হয়|

কাচু আলুটারি কুনির ঘাসবনগল্পে কৃষি, মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধ মিলেমিশে একাকার হয়েছে| সাবেক মুক্তিযোদ্ধা খাইরুলের সাথে জাপানি নাগরিকের সখ্য এবং দুর্বৃত্তদের হাতে জাপানি খুন হলে ঘাসবন আবাদের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে খাইরুলের প্রতিবাদের শপথ এক সর্বজনীন রূপ লাভ করে| ভোরে শূন্যে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে দাঁড়ানো খাইরুল যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত ভাস্কর্য|

সমকালীন সমাজের নৈতিক অবক্ষয় মহামারি সৃষ্ট সংকটও এই গ্রন্থের গল্পগুলোতে তীক্ষ্ণভাবে বিশ্লেষিত| ‘জয়নুদ্দিনের পুত্রধনগল্পে কিশোর অপরাধের ভয়াবহতার বিপরীতে এক মায়ের চরম আত্মত্যাগের চিত্র পাওয়া যায়| ছেলে মুকুট যখন এক নিষ্পাপ মেয়েকে তুলে আনার পরিকল্পনা করে, তখন মা কোকিলা বিবি সমাজের সম্ভ্রম রক্ষার্থে নিজের সন্তানের খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়| বৃহত্তর সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বার্থে এক মায়ের এই সিদ্ধান্ত প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডিকেও হার মানায়|

সাধন মাস্টার ক্যানেস্তারাগল্পে করোনা মহামারির অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিঃসঙ্গ সাধন মাস্টার এবং বিধবা ননীবালার মাঝে এক অনুক্ত প্রেমের স্ফুরণ ঘটে| স্ত্রীর আত্মহত্যার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সাধন মাস্টারের জীবনে ননীবালার নিঃস্বার্থ সেবা এক পশলা বৃষ্টির মতো হাজির হয়| চরম বিচ্ছিন্নতার মাঝেও মানবিক সম্পর্কের এই রূপায়ণ গল্পটিকে অনন্য মাত্রা দেয়|

আবারছবিঘরে আখেরি যাত্রাগল্পে চরম বস্তুতান্ত্রিক সফলতার অন্তরালে মানুষের আবেগশূন্য হওয়ার ট্র্যাজেডি চিত্রিত হয়েছে| সারাজীবন হিসাব-নিকাশ শোষণে মগ্ন জোতদার মতলুব সওদাগর আমেরিকায় থাকা মেয়ের জন্য স্টুডিওতে গিয়ে ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিকভাবে হাসতে ভুলে যায়| অবশেষ পিতার স্নেহময় মুখের কথা স্মরণ করে তার ঠোঁটে হাসি ফোটে, যা প্রমাণ করে অত্যধিক সম্পদ ক্ষমতা মানুষকে কতটা যান্ত্রিক করে তোলে|

দিলারা মেসবাহর নির্মাণশৈলী মেদহীন এবং ঋজু| শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে কেবল কাহিনির বিস্তার ঘটানো তাঁর উদ্দেশ্য নয়, প্রতিটি বাক্যের অন্তরালে তিনি মনস্তাত্ত্বিক ব্যঞ্জনা ˆতরি করেন| তাঁর গল্পে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের মানুষের মুখের ভাষা চরিত্রগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে| ‘খুরপি কাহিনিতে পোড়াখাটিয়ার রংপুরি সংলাপ (‘হামার খুরপি দ্যাও...’) চরিত্রটিকে জীবন্ত করেছে| রূপক প্রতীকের ব্যবহারে তিনি পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন| ‘পালঙ্ক’, ‘খুরপিবাকার্নিশ’-এর মতো বিষয়গুলো তাঁর গল্পে শক্তিশালী মেটাফোর হিসেবে কাজ করেছে|

বাংলাদেশের সমকালীন ছোটগল্পের ধারায়বাছাই বারোএকটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন| গ্রন্থটি কেবল আমাদের ক্ষয়িষ্ণু সমাজব্যবস্থা বা প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার দলিল নয়; বরং মানবমনের গহীনে লুকিয়ে থাকা অবদমন তা থেকে উত্তরণের পথও নির্দেশ করে| দিলারা মেসবাহ তাঁর গল্পে কোনো চূড়ান্ত রায় বা সমাধান চাপিয়ে দেননি, বরং জীবনের নিরাবরণ সত্যগুলোকে পাঠকের সামনে মেলে ধরেছেন| সমাজকাঠামোর অন্তর্নিহিত অসংগতি মানবমনের গহীন অরণ্যে পরিভ্রমণের এক নির্ভরযোগ্য মানচিত্র হিসেবেবাছাই বারোবাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নিজস্ব জায়গা করে নেওয়ার দাবি রাখে|

বাছাই বারো| দিলারা মেসবাহ| ছোটগল্প সংকলন| প্রকাশক : জলধি প্রকাশন| প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৫| প্রচ্ছদ: তাইফ আদনান| মূল্য : ৩০০ টাকা

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬


বাছাই বারো : সমাজ, মনস্তত্ত্ব ও প্রান্তিক জীবনের আখ্যান

প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

কথাসাহিত্যিক দিলারা মেসবাহ বাংলা সাহিত্যের এক নিভৃতচারী সাধক| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর সাহিত্যসাধনায় তিনি নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন| দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রায় কবিতা, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্যসহ তিনি ৪৩টি গ্রন্থ রচনা এবং ৫টি গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন| সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি জসীম উদ&দীন স্বর্ণপদক, লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কারসহ নানাবিধ সম্মাননা অর্জন করেছেন|

জলধি প্রকাশনী থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিতবাছাই বারোদিলারা মেসবাহর সাহিত্যযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন| বারোটি নির্বাচিত গল্পের এই সংকলন কেবল নিছক কাহিনির সমাহার নয়; বরং মানবচরিত্রের জটিল মনস্তত্ত্ব, পিতৃতন্ত্রের নীরব আগ্রাসন, প্রান্তিক কৃষকের মৃত্তিকা-প্রেম এবং সমকালীন সামাজিক অবক্ষয়ের এক প্রামাণ্য দলিল|

গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত বারোটি গল্প ভিন্ন ভিন্ন পটভূমিতে রচিত হলেও অস্তিত্বের সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এদের মূল যোগসূত্র| সমাজের নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণির যাপিত জীবনের দ্বন্দ্ব এবং আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে লেখক গল্পের ক্যানভাসে তুলে এনেছেন| বাংলাদেশ বেতারের স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর সংলাপে এনেছে সাবলীল নাটকীয়তা| গল্পগুলোতে মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভূতির ব্যবচ্ছেদ এবং পরিবেশের সাথে চরিত্রের মিথস্ক্রিয়া গভীরভাবে ফুটে উঠেছে|

দিলারা মেসবাহর সাহিত্যকর্মের প্রধান শক্তি মানবমনের জটিল মনস্তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ| ‘মোম জোছনার সিলসিলাগল্পে জাগতিক মোহ এবং আধ্যাত্মিক নিরাসক্তির বৈপরীত্য দেখা যায়| মধ্যবিত্ত পরিবারের রোমান্টিক কল্পনাবিলাসী তরুণী নিশির জীবনে ফানাফিল্লাহ বাকাবিল্লাহ তরিকার সাধক সোলেমানের উপস্থিতি প্রবল আলোড়ন তোলে| পার্থিব প্রেমের আকাঙ্ক্ষায় নিশি যখন উন্মুখ, ঠিক তখনই তার বান্ধবী মরিয়ম সোলেমানের আধ্যাত্মিক সাধনার বাস্তবতায় তাকে ফিরিয়ে আনে| সোমপুর বিহারের প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের পটভূমিতে নিশির এই মোহভঙ্গ তার ভেতর এক অসীম শূন্যতার জন্ম দেয়| কুলুঙ্গির ভেতর থেকে বাদুড়ের উড়ে যাওয়ার দৃশ্যটি এখানে স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে|

অন্যদিকে, মনস্তাত্ত্বিক ভীতি অপরাধবোধের চিত্র ফুটে উঠেছেজলপাই বাগানের ইন্ধনগল্পে| সম্পদের লোভে বৃদ্ধ স্বামী সাধু মণ্ডলের পুত্রবধূ আঙ্গুরিকে ভাতের সাথে ইঁদুর মারার বিষ প্রয়োগে হত্যা করে রূপবান| হত্যার পর লাশ গুম করার প্রক্রিয়ায় তার বাহ্যিক অনুশোচনা না থাকলেও, অবচেতন মনে সে ভয়ংকর হ্যালুসিনেশনের শিকার হয়| তার মনে হতে থাকে, নিহত আঙ্গুরি গোলাপি আঁচল উড়িয়ে ফিরে এসেছে এবং জলপাই গাছের পাতাগুলো ক্রন্দনরত অবস্থায় তাকে অভিশাপ দিচ্ছে| অবদমিত অপরাধবোধ কীভাবে স্নায়ুতন্ত্রে চাপ সৃষ্টি করে চরম পরিণতি ডেকে আনে, লেখক তা নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন|

আবার, ‘অন্ধকার অপরূপ ডানাগল্পে উঠে এসেছে সাংস্কৃতিক জগতের বুদ্ধিবৃত্তিক ভণ্ডামির আখ্যান| প্রখ্যাত আবৃত্তিকার অনুপম সরকারের প্রতি মুগ্ধ নিশি যখন বাস্তবে তার চরম আত্মকেন্দ্রিক রূঢ় রূপটি দেখে, তখন তার ঘোর কাটে| এই আকস্মিক প্রত্যাখ্যান নিশির মানসিক জগতে প্রচণ্ড ধাক্কা দিলেও, চরম হতাশার মুহূর্তেই সে নিজের ভেতরের প্রকৃত শক্তির সন্ধান পায়| অন্যের মোহজাল থেকে বেরিয়ে এসে নিশি তারঅপরূপ ডানাবা আত্মশক্তির বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়|

গ্রামীণ মফস্বল সমাজের গভীরে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং নারীর নীরব বঞ্চনা দিলারা মেসবাহর গল্পের অন্যতম অনুষঙ্গ| ‘ব্যাপারী বাড়ির পাঁচডুরিগল্পটি মাতৃত্বের শূন্যতা এবং শাশুড়ির নিষ্ঠুর আধিপত্যের মর্মান্তিক আখ্যান| নিঃসন্তান কাজলি একটি কাঠবিড়ালির ছানাকে সন্তানের স্নেহে লালন করে| ফিডারে দুধ খাওয়ানো বা লেজে নেইলপলিশ পরানোর আচরণগুলো তার অবদমিত মাতৃসত্তারই বহিঃপ্রকাশ| কিন্তু পরিবারের কর্ত্রী মরিয়ম বিবিযিনি নিজেই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক নারী প্রতিনিধিনির্মমভাবে প্রাণিটিকে হত্যা করেন| এই ঘটনা কাজলির মানসিক ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট করে দেয় এবং সে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে|

গার্হস্থ্য নির্যাতনের আরেক চরম রূপ দেখা যায়পালঙ্ক পুরাণগল্পে| দীর্ঘ মানসিক বঞ্চনায় ভারসাম্যহীন হয়ে মীরবাড়ির রাঙামামি গোয়ালঘরের পাশে শেকলবন্দি জীবন কাটান| তাঁর প্রলাপে মীরবাড়ির পালঙ্ক পুড়িয়ে ফেলার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়, যা মূলত পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য বৈবাহিক অধিকারের প্রতীকী ধ্বংসের ডাক| মরা খালের পাড়ে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধারের পর নতুন ধাতব খাটিয়ায় তা বহনের দৃশ্যটি সমাজের চরম অমানবিকতাকে নির্দেশ করে|

অন্যদিকে, ‘কার্নিশের কুহকগল্পে ধর্মীয় কুসংস্কারের মোড়কে নারীমনের বিদ্রোহকে ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল চিত্রিত হয়েছে| ষাটোর্ধ্ব সদরুদ্দিনের সাথে অসম বিবাহে বাধ্য হওয়া তরুণী চুমকির মানসিক বিচ্ছিন্নতাকে সমাজজিনের আছরবলে আখ্যা দেয়| প্রকৃত অর্থে, সমবয়সী নূরে আলেমের সাথে তার যে মানসিক সংযুক্তি ছিল, তার মৃত্যুর পর চুমকির নিরুদ্দেশ হওয়া এবং সদরুদ্দিনের চোখে তাদের একত্রে উড়ে যাওয়ার পরাবাস্তব দৃশ্যটি মূলত নারীর অবদমিত প্রেম মুক্তির আকাঙ্ক্ষারই বহিঃপ্রকাশ|

প্রান্তিক কৃষক এবং মাটির সাথে তাদের নাড়ির সম্পর্ক দিলারা মেসবাহর কলমে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে উঠে এসেছে| ‘খুরপি কাহিনিগল্পে রংপুরের বৃদ্ধ কৃষক পোড়াখাটিয়ার (সবেদ আলী) কাছে জমি নিড়ানো কেবল জীবিকা নয়, এটি তার কাছে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমতুল্য| তার এই মাটির প্রতি টানকে শহুরে সাংবাদিক বা তার আধুনিক সন্তানেরা পাগলামি ভাবলেও, লেখক মূলত নগরসভ্যতার ভোগবাদী মানসিকতার বিপরীতে কৃষকের অকৃত্রিম মৃত্তিকা-প্রেমকে দাঁড় করিয়েছেন|

জগা মাইতির ভূঁই বিলাসগল্পে ভূমিহীন কৃষকের জমি-ক্ষুধা শ্রেণিসংগ্রামের চিত্র দৃশ্যমান| রায়বাবুদের জমিতে কামলা খাটা জগা যখন প্রচলিত সংস্কার ভীতি উপেক্ষা করে প্রাচীন কালীমন্দিরের পতিত জমিতে কোদাল চালায়, তখন তা নিছক জমি আবাদ থাকে না| বিশাল গোখরো সাপ বের হয়ে আসার ভয়কে জয় করে জগার এই পদক্ষেপ শোষিতশ্রেণির আত্মজাগরণের প্রতীকে পরিণত হয়|

কাচু আলুটারি কুনির ঘাসবনগল্পে কৃষি, মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধ মিলেমিশে একাকার হয়েছে| সাবেক মুক্তিযোদ্ধা খাইরুলের সাথে জাপানি নাগরিকের সখ্য এবং দুর্বৃত্তদের হাতে জাপানি খুন হলে ঘাসবন আবাদের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে খাইরুলের প্রতিবাদের শপথ এক সর্বজনীন রূপ লাভ করে| ভোরে শূন্যে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে দাঁড়ানো খাইরুল যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত ভাস্কর্য|

সমকালীন সমাজের নৈতিক অবক্ষয় মহামারি সৃষ্ট সংকটও এই গ্রন্থের গল্পগুলোতে তীক্ষ্ণভাবে বিশ্লেষিত| ‘জয়নুদ্দিনের পুত্রধনগল্পে কিশোর অপরাধের ভয়াবহতার বিপরীতে এক মায়ের চরম আত্মত্যাগের চিত্র পাওয়া যায়| ছেলে মুকুট যখন এক নিষ্পাপ মেয়েকে তুলে আনার পরিকল্পনা করে, তখন মা কোকিলা বিবি সমাজের সম্ভ্রম রক্ষার্থে নিজের সন্তানের খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়| বৃহত্তর সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বার্থে এক মায়ের এই সিদ্ধান্ত প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডিকেও হার মানায়|

সাধন মাস্টার ক্যানেস্তারাগল্পে করোনা মহামারির অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিঃসঙ্গ সাধন মাস্টার এবং বিধবা ননীবালার মাঝে এক অনুক্ত প্রেমের স্ফুরণ ঘটে| স্ত্রীর আত্মহত্যার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সাধন মাস্টারের জীবনে ননীবালার নিঃস্বার্থ সেবা এক পশলা বৃষ্টির মতো হাজির হয়| চরম বিচ্ছিন্নতার মাঝেও মানবিক সম্পর্কের এই রূপায়ণ গল্পটিকে অনন্য মাত্রা দেয়|

আবারছবিঘরে আখেরি যাত্রাগল্পে চরম বস্তুতান্ত্রিক সফলতার অন্তরালে মানুষের আবেগশূন্য হওয়ার ট্র্যাজেডি চিত্রিত হয়েছে| সারাজীবন হিসাব-নিকাশ শোষণে মগ্ন জোতদার মতলুব সওদাগর আমেরিকায় থাকা মেয়ের জন্য স্টুডিওতে গিয়ে ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিকভাবে হাসতে ভুলে যায়| অবশেষ পিতার স্নেহময় মুখের কথা স্মরণ করে তার ঠোঁটে হাসি ফোটে, যা প্রমাণ করে অত্যধিক সম্পদ ক্ষমতা মানুষকে কতটা যান্ত্রিক করে তোলে|

দিলারা মেসবাহর নির্মাণশৈলী মেদহীন এবং ঋজু| শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে কেবল কাহিনির বিস্তার ঘটানো তাঁর উদ্দেশ্য নয়, প্রতিটি বাক্যের অন্তরালে তিনি মনস্তাত্ত্বিক ব্যঞ্জনা ˆতরি করেন| তাঁর গল্পে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের মানুষের মুখের ভাষা চরিত্রগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে| ‘খুরপি কাহিনিতে পোড়াখাটিয়ার রংপুরি সংলাপ (‘হামার খুরপি দ্যাও...’) চরিত্রটিকে জীবন্ত করেছে| রূপক প্রতীকের ব্যবহারে তিনি পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন| ‘পালঙ্ক’, ‘খুরপিবাকার্নিশ’-এর মতো বিষয়গুলো তাঁর গল্পে শক্তিশালী মেটাফোর হিসেবে কাজ করেছে|

বাংলাদেশের সমকালীন ছোটগল্পের ধারায়বাছাই বারোএকটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন| গ্রন্থটি কেবল আমাদের ক্ষয়িষ্ণু সমাজব্যবস্থা বা প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার দলিল নয়; বরং মানবমনের গহীনে লুকিয়ে থাকা অবদমন তা থেকে উত্তরণের পথও নির্দেশ করে| দিলারা মেসবাহ তাঁর গল্পে কোনো চূড়ান্ত রায় বা সমাধান চাপিয়ে দেননি, বরং জীবনের নিরাবরণ সত্যগুলোকে পাঠকের সামনে মেলে ধরেছেন| সমাজকাঠামোর অন্তর্নিহিত অসংগতি মানবমনের গহীন অরণ্যে পরিভ্রমণের এক নির্ভরযোগ্য মানচিত্র হিসেবেবাছাই বারোবাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নিজস্ব জায়গা করে নেওয়ার দাবি রাখে|

বাছাই বারো| দিলারা মেসবাহ| ছোটগল্প সংকলন| প্রকাশক : জলধি প্রকাশন| প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৫| প্রচ্ছদ: তাইফ আদনান| মূল্য : ৩০০ টাকা


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত