কথাসাহিত্যিক দিলারা মেসবাহ বাংলা সাহিত্যের এক নিভৃতচারী সাধক|
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা
ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর সাহিত্যসাধনায় তিনি
নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন| দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রায় কবিতা, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্যসহ তিনি ৪৩টি গ্রন্থ
রচনা এবং ৫টি গ্রন্থ
সম্পাদনা করেছেন| সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি জসীম উদ&দীন স্বর্ণপদক, লেখিকা
সংঘ সাহিত্য পুরস্কারসহ নানাবিধ সম্মাননা অর্জন করেছেন|
জলধি প্রকাশনী থেকে ২০২৫ সালের
ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ‘বাছাই বারো’ দিলারা মেসবাহর সাহিত্যযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন|
বারোটি নির্বাচিত গল্পের এই সংকলন কেবল
নিছক কাহিনির সমাহার নয়; বরং মানবচরিত্রের
জটিল মনস্তত্ত্ব, পিতৃতন্ত্রের নীরব আগ্রাসন, প্রান্তিক
কৃষকের মৃত্তিকা-প্রেম এবং সমকালীন সামাজিক
অবক্ষয়ের এক প্রামাণ্য দলিল|
গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত বারোটি গল্প ভিন্ন ভিন্ন
পটভূমিতে রচিত হলেও অস্তিত্বের
সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন
এদের মূল যোগসূত্র| সমাজের
নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির
যাপিত জীবনের দ্বন্দ্ব এবং আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে
লেখক গল্পের ক্যানভাসে তুলে এনেছেন| বাংলাদেশ
বেতারের স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর সংলাপে এনেছে
সাবলীল নাটকীয়তা| গল্পগুলোতে মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভূতির ব্যবচ্ছেদ এবং পরিবেশের সাথে
চরিত্রের মিথস্ক্রিয়া গভীরভাবে ফুটে উঠেছে|
দিলারা মেসবাহর সাহিত্যকর্মের প্রধান শক্তি মানবমনের জটিল মনস্তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ|
‘মোম জোছনার সিলসিলা’ গল্পে জাগতিক মোহ এবং আধ্যাত্মিক
নিরাসক্তির বৈপরীত্য দেখা যায়| মধ্যবিত্ত
পরিবারের রোমান্টিক কল্পনাবিলাসী তরুণী নিশির জীবনে ফানাফিল্লাহ ও বাকাবিল্লাহ তরিকার
সাধক সোলেমানের উপস্থিতি প্রবল আলোড়ন তোলে| পার্থিব প্রেমের আকাঙ্ক্ষায় নিশি যখন উন্মুখ,
ঠিক তখনই তার বান্ধবী
মরিয়ম সোলেমানের আধ্যাত্মিক সাধনার বাস্তবতায় তাকে ফিরিয়ে আনে|
সোমপুর বিহারের প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের পটভূমিতে নিশির এই মোহভঙ্গ তার
ভেতর এক অসীম শূন্যতার
জন্ম দেয়| কুলুঙ্গির ভেতর
থেকে বাদুড়ের উড়ে যাওয়ার দৃশ্যটি
এখানে স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে|
অন্যদিকে, মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও অপরাধবোধের
চিত্র ফুটে উঠেছে ‘জলপাই
বাগানের ইন্ধন’ গল্পে| সম্পদের লোভে বৃদ্ধ স্বামী
সাধু মণ্ডলের পুত্রবধূ আঙ্গুরিকে ভাতের সাথে ইঁদুর মারার
বিষ প্রয়োগে হত্যা করে রূপবান| হত্যার
পর লাশ গুম করার
প্রক্রিয়ায় তার বাহ্যিক অনুশোচনা
না থাকলেও, অবচেতন মনে সে ভয়ংকর
হ্যালুসিনেশনের শিকার হয়| তার মনে
হতে থাকে, নিহত আঙ্গুরি গোলাপি
আঁচল উড়িয়ে ফিরে এসেছে এবং
জলপাই গাছের পাতাগুলো ক্রন্দনরত অবস্থায় তাকে অভিশাপ দিচ্ছে|
অবদমিত অপরাধবোধ কীভাবে স্নায়ুতন্ত্রে চাপ সৃষ্টি করে
চরম পরিণতি ডেকে আনে, লেখক
তা নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন|
আবার, ‘অন্ধকার ও অপরূপ ডানা’
গল্পে উঠে এসেছে সাংস্কৃতিক
জগতের বুদ্ধিবৃত্তিক ভণ্ডামির আখ্যান| প্রখ্যাত আবৃত্তিকার অনুপম সরকারের প্রতি মুগ্ধ নিশি যখন বাস্তবে
তার চরম আত্মকেন্দ্রিক ও
রূঢ় রূপটি দেখে, তখন তার ঘোর
কাটে| এই আকস্মিক প্রত্যাখ্যান
নিশির মানসিক জগতে প্রচণ্ড ধাক্কা
দিলেও, চরম হতাশার মুহূর্তেই
সে নিজের ভেতরের প্রকৃত শক্তির সন্ধান পায়| অন্যের মোহজাল
থেকে বেরিয়ে এসে নিশি তার
‘অপরূপ ডানা’ বা আত্মশক্তির বিকাশ
ঘটাতে সক্ষম হয়|
গ্রামীণ ও মফস্বল সমাজের
গভীরে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং নারীর নীরব
বঞ্চনা দিলারা মেসবাহর গল্পের অন্যতম অনুষঙ্গ| ‘ব্যাপারী বাড়ির পাঁচডুরি’ গল্পটি মাতৃত্বের শূন্যতা এবং শাশুড়ির নিষ্ঠুর
আধিপত্যের মর্মান্তিক আখ্যান| নিঃসন্তান কাজলি একটি কাঠবিড়ালির ছানাকে
সন্তানের স্নেহে লালন করে| ফিডারে
দুধ খাওয়ানো বা লেজে নেইলপলিশ
পরানোর আচরণগুলো তার অবদমিত মাতৃসত্তারই
বহিঃপ্রকাশ| কিন্তু পরিবারের কর্ত্রী মরিয়ম বিবি— যিনি নিজেই পিতৃতান্ত্রিক
ব্যবস্থার এক নারী প্রতিনিধি—
নির্মমভাবে প্রাণিটিকে হত্যা করেন| এই ঘটনা কাজলির
মানসিক ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়
এবং সে পুকুরে ঝাঁপ
দিয়ে আত্মহত্যা করে|
গার্হস্থ্য নির্যাতনের আরেক চরম রূপ
দেখা যায় ‘পালঙ্ক পুরাণ’
গল্পে| দীর্ঘ মানসিক বঞ্চনায় ভারসাম্যহীন হয়ে মীরবাড়ির রাঙামামি
গোয়ালঘরের পাশে শেকলবন্দি জীবন
কাটান| তাঁর প্রলাপে মীরবাড়ির
পালঙ্ক পুড়িয়ে ফেলার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়, যা মূলত
পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য ও বৈবাহিক অধিকারের
প্রতীকী ধ্বংসের ডাক| মরা খালের
পাড়ে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধারের
পর নতুন ধাতব খাটিয়ায়
তা বহনের দৃশ্যটি সমাজের চরম অমানবিকতাকে নির্দেশ
করে|
অন্যদিকে, ‘কার্নিশের কুহক’ গল্পে ধর্মীয় কুসংস্কারের মোড়কে নারীমনের বিদ্রোহকে ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল চিত্রিত হয়েছে|
ষাটোর্ধ্ব সদরুদ্দিনের সাথে অসম বিবাহে
বাধ্য হওয়া তরুণী চুমকির
মানসিক বিচ্ছিন্নতাকে সমাজ ‘জিনের আছর’ বলে আখ্যা
দেয়| প্রকৃত অর্থে, সমবয়সী নূরে আলেমের সাথে
তার যে মানসিক সংযুক্তি
ছিল, তার মৃত্যুর পর
চুমকির নিরুদ্দেশ হওয়া এবং সদরুদ্দিনের
চোখে তাদের একত্রে উড়ে যাওয়ার পরাবাস্তব
দৃশ্যটি মূলত নারীর অবদমিত
প্রেম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষারই
বহিঃপ্রকাশ|
প্রান্তিক কৃষক এবং মাটির
সাথে তাদের নাড়ির সম্পর্ক দিলারা মেসবাহর কলমে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার
সাথে উঠে এসেছে| ‘খুরপি
কাহিনি’ গল্পে রংপুরের বৃদ্ধ কৃষক পোড়াখাটিয়ার (সবেদ
আলী) কাছে জমি নিড়ানো
কেবল জীবিকা নয়, এটি তার
কাছে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমতুল্য| তার এই মাটির
প্রতি টানকে শহুরে সাংবাদিক বা তার আধুনিক
সন্তানেরা পাগলামি ভাবলেও, লেখক মূলত নগরসভ্যতার
ভোগবাদী মানসিকতার বিপরীতে কৃষকের অকৃত্রিম মৃত্তিকা-প্রেমকে দাঁড় করিয়েছেন|
‘জগা মাইতির ভূঁই বিলাস’ গল্পে
ভূমিহীন কৃষকের জমি-ক্ষুধা ও
শ্রেণিসংগ্রামের চিত্র দৃশ্যমান| রায়বাবুদের জমিতে কামলা খাটা জগা যখন
প্রচলিত সংস্কার ও ভীতি উপেক্ষা
করে প্রাচীন কালীমন্দিরের পতিত জমিতে কোদাল
চালায়, তখন তা নিছক
জমি আবাদ থাকে না|
বিশাল গোখরো সাপ বের হয়ে
আসার ভয়কে জয় করে
জগার এই পদক্ষেপ শোষিতশ্রেণির
আত্মজাগরণের প্রতীকে পরিণত হয়|
‘কাচু আলুটারি ও কুনির ঘাসবন’
গল্পে কৃষি, মুক্তিযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধ
মিলেমিশে একাকার হয়েছে| সাবেক মুক্তিযোদ্ধা খাইরুলের সাথে জাপানি নাগরিকের
সখ্য এবং দুর্বৃত্তদের হাতে
জাপানি খুন হলে ঘাসবন
আবাদের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে খাইরুলের
প্রতিবাদের শপথ এক সর্বজনীন
রূপ লাভ করে| ভোরে
শূন্যে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে দাঁড়ানো
খাইরুল যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে
এক জীবন্ত ভাস্কর্য|
সমকালীন সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও মহামারি সৃষ্ট
সংকটও এই গ্রন্থের গল্পগুলোতে
তীক্ষ্ণভাবে বিশ্লেষিত| ‘জয়নুদ্দিনের পুত্রধন’ গল্পে কিশোর অপরাধের ভয়াবহতার বিপরীতে এক মায়ের চরম
আত্মত্যাগের চিত্র পাওয়া যায়| ছেলে মুকুট
যখন এক নিষ্পাপ মেয়েকে
তুলে আনার পরিকল্পনা করে,
তখন মা কোকিলা বিবি
সমাজের সম্ভ্রম রক্ষার্থে নিজের সন্তানের খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়|
বৃহত্তর সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বার্থে এক মায়ের এই
সিদ্ধান্ত প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডিকেও হার মানায়|
‘সাধন মাস্টার ও ক্যানেস্তারা’ গল্পে
করোনা মহামারির অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিঃসঙ্গ সাধন মাস্টার এবং
বিধবা ননীবালার মাঝে এক অনুক্ত
প্রেমের স্ফুরণ ঘটে| স্ত্রীর আত্মহত্যার
কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সাধন মাস্টারের জীবনে
ননীবালার নিঃস্বার্থ সেবা এক পশলা
বৃষ্টির মতো হাজির হয়|
চরম বিচ্ছিন্নতার মাঝেও মানবিক সম্পর্কের এই রূপায়ণ গল্পটিকে
অনন্য মাত্রা দেয়|
আবার ‘ছবিঘরে আখেরি যাত্রা’ গল্পে চরম বস্তুতান্ত্রিক সফলতার
অন্তরালে মানুষের আবেগশূন্য হওয়ার ট্র্যাজেডি চিত্রিত হয়েছে| সারাজীবন হিসাব-নিকাশ ও শোষণে মগ্ন
জোতদার মতলুব সওদাগর আমেরিকায় থাকা মেয়ের জন্য
স্টুডিওতে গিয়ে ক্যামেরার সামনে
স্বাভাবিকভাবে হাসতে ভুলে যায়| অবশেষ
পিতার স্নেহময় মুখের কথা স্মরণ করে
তার ঠোঁটে হাসি ফোটে, যা
প্রমাণ করে অত্যধিক সম্পদ
ও ক্ষমতা মানুষকে কতটা যান্ত্রিক করে
তোলে|
দিলারা মেসবাহর নির্মাণশৈলী মেদহীন এবং ঋজু| শব্দের
পর শব্দ সাজিয়ে কেবল
কাহিনির বিস্তার ঘটানো তাঁর উদ্দেশ্য নয়,
প্রতিটি বাক্যের অন্তরালে তিনি মনস্তাত্ত্বিক ব্যঞ্জনা
ˆতরি করেন| তাঁর গল্পে আঞ্চলিক
ভাষার প্রয়োগ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের মানুষের
মুখের ভাষা চরিত্রগুলোর আর্থসামাজিক
অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে| ‘খুরপি কাহিনি’তে পোড়াখাটিয়ার রংপুরি
সংলাপ (‘হামার খুরপি দ্যাও...’) চরিত্রটিকে জীবন্ত করেছে| রূপক ও প্রতীকের
ব্যবহারে তিনি পরিমিতিবোধের পরিচয়
দিয়েছেন| ‘পালঙ্ক’, ‘খুরপি’ বা ‘কার্নিশ’-এর
মতো বিষয়গুলো তাঁর গল্পে শক্তিশালী
মেটাফোর হিসেবে কাজ করেছে|
বাংলাদেশের সমকালীন ছোটগল্পের ধারায় ‘বাছাই বারো’ একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন|
গ্রন্থটি কেবল আমাদের ক্ষয়িষ্ণু
সমাজব্যবস্থা বা প্রান্তিক মানুষের
বেঁচে থাকার দলিল নয়; বরং
মানবমনের গহীনে লুকিয়ে থাকা অবদমন ও
তা থেকে উত্তরণের পথও
নির্দেশ করে| দিলারা মেসবাহ
তাঁর গল্পে কোনো চূড়ান্ত রায়
বা সমাধান চাপিয়ে দেননি, বরং জীবনের নিরাবরণ
সত্যগুলোকে পাঠকের সামনে মেলে ধরেছেন| সমাজকাঠামোর
অন্তর্নিহিত অসংগতি ও মানবমনের গহীন
অরণ্যে পরিভ্রমণের এক নির্ভরযোগ্য মানচিত্র
হিসেবে ‘বাছাই বারো’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নিজস্ব জায়গা করে নেওয়ার দাবি
রাখে|
বাছাই বারো| দিলারা মেসবাহ| ছোটগল্প সংকলন| প্রকাশক : জলধি প্রকাশন| প্রকাশকাল
: ফেব্রুয়ারি ২০২৫| প্রচ্ছদ: তাইফ আদনান| মূল্য
: ৩০০ টাকা

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
কথাসাহিত্যিক দিলারা মেসবাহ বাংলা সাহিত্যের এক নিভৃতচারী সাধক|
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা
ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর সাহিত্যসাধনায় তিনি
নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন| দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রায় কবিতা, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্যসহ তিনি ৪৩টি গ্রন্থ
রচনা এবং ৫টি গ্রন্থ
সম্পাদনা করেছেন| সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি জসীম উদ&দীন স্বর্ণপদক, লেখিকা
সংঘ সাহিত্য পুরস্কারসহ নানাবিধ সম্মাননা অর্জন করেছেন|
জলধি প্রকাশনী থেকে ২০২৫ সালের
ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ‘বাছাই বারো’ দিলারা মেসবাহর সাহিত্যযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন|
বারোটি নির্বাচিত গল্পের এই সংকলন কেবল
নিছক কাহিনির সমাহার নয়; বরং মানবচরিত্রের
জটিল মনস্তত্ত্ব, পিতৃতন্ত্রের নীরব আগ্রাসন, প্রান্তিক
কৃষকের মৃত্তিকা-প্রেম এবং সমকালীন সামাজিক
অবক্ষয়ের এক প্রামাণ্য দলিল|
গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত বারোটি গল্প ভিন্ন ভিন্ন
পটভূমিতে রচিত হলেও অস্তিত্বের
সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন
এদের মূল যোগসূত্র| সমাজের
নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির
যাপিত জীবনের দ্বন্দ্ব এবং আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে
লেখক গল্পের ক্যানভাসে তুলে এনেছেন| বাংলাদেশ
বেতারের স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর সংলাপে এনেছে
সাবলীল নাটকীয়তা| গল্পগুলোতে মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভূতির ব্যবচ্ছেদ এবং পরিবেশের সাথে
চরিত্রের মিথস্ক্রিয়া গভীরভাবে ফুটে উঠেছে|
দিলারা মেসবাহর সাহিত্যকর্মের প্রধান শক্তি মানবমনের জটিল মনস্তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ|
‘মোম জোছনার সিলসিলা’ গল্পে জাগতিক মোহ এবং আধ্যাত্মিক
নিরাসক্তির বৈপরীত্য দেখা যায়| মধ্যবিত্ত
পরিবারের রোমান্টিক কল্পনাবিলাসী তরুণী নিশির জীবনে ফানাফিল্লাহ ও বাকাবিল্লাহ তরিকার
সাধক সোলেমানের উপস্থিতি প্রবল আলোড়ন তোলে| পার্থিব প্রেমের আকাঙ্ক্ষায় নিশি যখন উন্মুখ,
ঠিক তখনই তার বান্ধবী
মরিয়ম সোলেমানের আধ্যাত্মিক সাধনার বাস্তবতায় তাকে ফিরিয়ে আনে|
সোমপুর বিহারের প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের পটভূমিতে নিশির এই মোহভঙ্গ তার
ভেতর এক অসীম শূন্যতার
জন্ম দেয়| কুলুঙ্গির ভেতর
থেকে বাদুড়ের উড়ে যাওয়ার দৃশ্যটি
এখানে স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে|
অন্যদিকে, মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও অপরাধবোধের
চিত্র ফুটে উঠেছে ‘জলপাই
বাগানের ইন্ধন’ গল্পে| সম্পদের লোভে বৃদ্ধ স্বামী
সাধু মণ্ডলের পুত্রবধূ আঙ্গুরিকে ভাতের সাথে ইঁদুর মারার
বিষ প্রয়োগে হত্যা করে রূপবান| হত্যার
পর লাশ গুম করার
প্রক্রিয়ায় তার বাহ্যিক অনুশোচনা
না থাকলেও, অবচেতন মনে সে ভয়ংকর
হ্যালুসিনেশনের শিকার হয়| তার মনে
হতে থাকে, নিহত আঙ্গুরি গোলাপি
আঁচল উড়িয়ে ফিরে এসেছে এবং
জলপাই গাছের পাতাগুলো ক্রন্দনরত অবস্থায় তাকে অভিশাপ দিচ্ছে|
অবদমিত অপরাধবোধ কীভাবে স্নায়ুতন্ত্রে চাপ সৃষ্টি করে
চরম পরিণতি ডেকে আনে, লেখক
তা নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন|
আবার, ‘অন্ধকার ও অপরূপ ডানা’
গল্পে উঠে এসেছে সাংস্কৃতিক
জগতের বুদ্ধিবৃত্তিক ভণ্ডামির আখ্যান| প্রখ্যাত আবৃত্তিকার অনুপম সরকারের প্রতি মুগ্ধ নিশি যখন বাস্তবে
তার চরম আত্মকেন্দ্রিক ও
রূঢ় রূপটি দেখে, তখন তার ঘোর
কাটে| এই আকস্মিক প্রত্যাখ্যান
নিশির মানসিক জগতে প্রচণ্ড ধাক্কা
দিলেও, চরম হতাশার মুহূর্তেই
সে নিজের ভেতরের প্রকৃত শক্তির সন্ধান পায়| অন্যের মোহজাল
থেকে বেরিয়ে এসে নিশি তার
‘অপরূপ ডানা’ বা আত্মশক্তির বিকাশ
ঘটাতে সক্ষম হয়|
গ্রামীণ ও মফস্বল সমাজের
গভীরে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং নারীর নীরব
বঞ্চনা দিলারা মেসবাহর গল্পের অন্যতম অনুষঙ্গ| ‘ব্যাপারী বাড়ির পাঁচডুরি’ গল্পটি মাতৃত্বের শূন্যতা এবং শাশুড়ির নিষ্ঠুর
আধিপত্যের মর্মান্তিক আখ্যান| নিঃসন্তান কাজলি একটি কাঠবিড়ালির ছানাকে
সন্তানের স্নেহে লালন করে| ফিডারে
দুধ খাওয়ানো বা লেজে নেইলপলিশ
পরানোর আচরণগুলো তার অবদমিত মাতৃসত্তারই
বহিঃপ্রকাশ| কিন্তু পরিবারের কর্ত্রী মরিয়ম বিবি— যিনি নিজেই পিতৃতান্ত্রিক
ব্যবস্থার এক নারী প্রতিনিধি—
নির্মমভাবে প্রাণিটিকে হত্যা করেন| এই ঘটনা কাজলির
মানসিক ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়
এবং সে পুকুরে ঝাঁপ
দিয়ে আত্মহত্যা করে|
গার্হস্থ্য নির্যাতনের আরেক চরম রূপ
দেখা যায় ‘পালঙ্ক পুরাণ’
গল্পে| দীর্ঘ মানসিক বঞ্চনায় ভারসাম্যহীন হয়ে মীরবাড়ির রাঙামামি
গোয়ালঘরের পাশে শেকলবন্দি জীবন
কাটান| তাঁর প্রলাপে মীরবাড়ির
পালঙ্ক পুড়িয়ে ফেলার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়, যা মূলত
পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য ও বৈবাহিক অধিকারের
প্রতীকী ধ্বংসের ডাক| মরা খালের
পাড়ে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধারের
পর নতুন ধাতব খাটিয়ায়
তা বহনের দৃশ্যটি সমাজের চরম অমানবিকতাকে নির্দেশ
করে|
অন্যদিকে, ‘কার্নিশের কুহক’ গল্পে ধর্মীয় কুসংস্কারের মোড়কে নারীমনের বিদ্রোহকে ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল চিত্রিত হয়েছে|
ষাটোর্ধ্ব সদরুদ্দিনের সাথে অসম বিবাহে
বাধ্য হওয়া তরুণী চুমকির
মানসিক বিচ্ছিন্নতাকে সমাজ ‘জিনের আছর’ বলে আখ্যা
দেয়| প্রকৃত অর্থে, সমবয়সী নূরে আলেমের সাথে
তার যে মানসিক সংযুক্তি
ছিল, তার মৃত্যুর পর
চুমকির নিরুদ্দেশ হওয়া এবং সদরুদ্দিনের
চোখে তাদের একত্রে উড়ে যাওয়ার পরাবাস্তব
দৃশ্যটি মূলত নারীর অবদমিত
প্রেম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষারই
বহিঃপ্রকাশ|
প্রান্তিক কৃষক এবং মাটির
সাথে তাদের নাড়ির সম্পর্ক দিলারা মেসবাহর কলমে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার
সাথে উঠে এসেছে| ‘খুরপি
কাহিনি’ গল্পে রংপুরের বৃদ্ধ কৃষক পোড়াখাটিয়ার (সবেদ
আলী) কাছে জমি নিড়ানো
কেবল জীবিকা নয়, এটি তার
কাছে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমতুল্য| তার এই মাটির
প্রতি টানকে শহুরে সাংবাদিক বা তার আধুনিক
সন্তানেরা পাগলামি ভাবলেও, লেখক মূলত নগরসভ্যতার
ভোগবাদী মানসিকতার বিপরীতে কৃষকের অকৃত্রিম মৃত্তিকা-প্রেমকে দাঁড় করিয়েছেন|
‘জগা মাইতির ভূঁই বিলাস’ গল্পে
ভূমিহীন কৃষকের জমি-ক্ষুধা ও
শ্রেণিসংগ্রামের চিত্র দৃশ্যমান| রায়বাবুদের জমিতে কামলা খাটা জগা যখন
প্রচলিত সংস্কার ও ভীতি উপেক্ষা
করে প্রাচীন কালীমন্দিরের পতিত জমিতে কোদাল
চালায়, তখন তা নিছক
জমি আবাদ থাকে না|
বিশাল গোখরো সাপ বের হয়ে
আসার ভয়কে জয় করে
জগার এই পদক্ষেপ শোষিতশ্রেণির
আত্মজাগরণের প্রতীকে পরিণত হয়|
‘কাচু আলুটারি ও কুনির ঘাসবন’
গল্পে কৃষি, মুক্তিযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধ
মিলেমিশে একাকার হয়েছে| সাবেক মুক্তিযোদ্ধা খাইরুলের সাথে জাপানি নাগরিকের
সখ্য এবং দুর্বৃত্তদের হাতে
জাপানি খুন হলে ঘাসবন
আবাদের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে খাইরুলের
প্রতিবাদের শপথ এক সর্বজনীন
রূপ লাভ করে| ভোরে
শূন্যে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে দাঁড়ানো
খাইরুল যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে
এক জীবন্ত ভাস্কর্য|
সমকালীন সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও মহামারি সৃষ্ট
সংকটও এই গ্রন্থের গল্পগুলোতে
তীক্ষ্ণভাবে বিশ্লেষিত| ‘জয়নুদ্দিনের পুত্রধন’ গল্পে কিশোর অপরাধের ভয়াবহতার বিপরীতে এক মায়ের চরম
আত্মত্যাগের চিত্র পাওয়া যায়| ছেলে মুকুট
যখন এক নিষ্পাপ মেয়েকে
তুলে আনার পরিকল্পনা করে,
তখন মা কোকিলা বিবি
সমাজের সম্ভ্রম রক্ষার্থে নিজের সন্তানের খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়|
বৃহত্তর সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বার্থে এক মায়ের এই
সিদ্ধান্ত প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডিকেও হার মানায়|
‘সাধন মাস্টার ও ক্যানেস্তারা’ গল্পে
করোনা মহামারির অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিঃসঙ্গ সাধন মাস্টার এবং
বিধবা ননীবালার মাঝে এক অনুক্ত
প্রেমের স্ফুরণ ঘটে| স্ত্রীর আত্মহত্যার
কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সাধন মাস্টারের জীবনে
ননীবালার নিঃস্বার্থ সেবা এক পশলা
বৃষ্টির মতো হাজির হয়|
চরম বিচ্ছিন্নতার মাঝেও মানবিক সম্পর্কের এই রূপায়ণ গল্পটিকে
অনন্য মাত্রা দেয়|
আবার ‘ছবিঘরে আখেরি যাত্রা’ গল্পে চরম বস্তুতান্ত্রিক সফলতার
অন্তরালে মানুষের আবেগশূন্য হওয়ার ট্র্যাজেডি চিত্রিত হয়েছে| সারাজীবন হিসাব-নিকাশ ও শোষণে মগ্ন
জোতদার মতলুব সওদাগর আমেরিকায় থাকা মেয়ের জন্য
স্টুডিওতে গিয়ে ক্যামেরার সামনে
স্বাভাবিকভাবে হাসতে ভুলে যায়| অবশেষ
পিতার স্নেহময় মুখের কথা স্মরণ করে
তার ঠোঁটে হাসি ফোটে, যা
প্রমাণ করে অত্যধিক সম্পদ
ও ক্ষমতা মানুষকে কতটা যান্ত্রিক করে
তোলে|
দিলারা মেসবাহর নির্মাণশৈলী মেদহীন এবং ঋজু| শব্দের
পর শব্দ সাজিয়ে কেবল
কাহিনির বিস্তার ঘটানো তাঁর উদ্দেশ্য নয়,
প্রতিটি বাক্যের অন্তরালে তিনি মনস্তাত্ত্বিক ব্যঞ্জনা
ˆতরি করেন| তাঁর গল্পে আঞ্চলিক
ভাষার প্রয়োগ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের মানুষের
মুখের ভাষা চরিত্রগুলোর আর্থসামাজিক
অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে| ‘খুরপি কাহিনি’তে পোড়াখাটিয়ার রংপুরি
সংলাপ (‘হামার খুরপি দ্যাও...’) চরিত্রটিকে জীবন্ত করেছে| রূপক ও প্রতীকের
ব্যবহারে তিনি পরিমিতিবোধের পরিচয়
দিয়েছেন| ‘পালঙ্ক’, ‘খুরপি’ বা ‘কার্নিশ’-এর
মতো বিষয়গুলো তাঁর গল্পে শক্তিশালী
মেটাফোর হিসেবে কাজ করেছে|
বাংলাদেশের সমকালীন ছোটগল্পের ধারায় ‘বাছাই বারো’ একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন|
গ্রন্থটি কেবল আমাদের ক্ষয়িষ্ণু
সমাজব্যবস্থা বা প্রান্তিক মানুষের
বেঁচে থাকার দলিল নয়; বরং
মানবমনের গহীনে লুকিয়ে থাকা অবদমন ও
তা থেকে উত্তরণের পথও
নির্দেশ করে| দিলারা মেসবাহ
তাঁর গল্পে কোনো চূড়ান্ত রায়
বা সমাধান চাপিয়ে দেননি, বরং জীবনের নিরাবরণ
সত্যগুলোকে পাঠকের সামনে মেলে ধরেছেন| সমাজকাঠামোর
অন্তর্নিহিত অসংগতি ও মানবমনের গহীন
অরণ্যে পরিভ্রমণের এক নির্ভরযোগ্য মানচিত্র
হিসেবে ‘বাছাই বারো’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নিজস্ব জায়গা করে নেওয়ার দাবি
রাখে|
বাছাই বারো| দিলারা মেসবাহ| ছোটগল্প সংকলন| প্রকাশক : জলধি প্রকাশন| প্রকাশকাল
: ফেব্রুয়ারি ২০২৫| প্রচ্ছদ: তাইফ আদনান| মূল্য
: ৩০০ টাকা

আপনার মতামত লিখুন