নিতাই সেন কবি হিসেবেই
সমধিক পরিচিত| তাঁর কবিতার সাথে
আমার পরিচয় সেই নব্বইয়ের দশকের
শুরু থেকে| কবিতার পাশাপাশি তিনি চমৎকার সব
ছড়াও লেখেন| শব্দগাঁথুনিতে কাব্যিক ভাবব্যঞ্জনা তৈরিতে সিদ্ধহস্ত এই কবি গদ্যতেও
যে পারঙ্গম এর প্রমাণ মিললো
তাঁর ‘স্মৃতির সম্ভার’ নামের গদ্যগ্রন্থে| নিতাই সেনের এই গ্রন্থটি আত্মস্মৃতিরই
খণ্ড খণ্ড কিছু উপাখ্যান
বটে| এটি পড়তে পড়তে
মনে আসে পণ্ডিত জওহরলাল
নেহরু সম্পর্কে সিলেটের প্রখ্যাত জমিদার ও রাজনীতিবিদ শ্রীব্রজেন্দ্রনারায়ণ
চৌধুরীর কথা| নেহরু সম্পর্কে
ব্রজেন্দ্রনারায়ণ লিখেছিলেন— ‘...আহারের সময় ভিন্ন তাঁহার
(জওহরলাল) অবসরই ছিল না| কথা
জমাইবার চেষ্টা করিয়া দেখিলাম, জওহরলাল অসম্ভব চাপা স্বভাবের... সকালসন্ধ্যা
এক মিনিটও বিশ্রাম না করিয়া রাত্রি
দুইটার সময় গৃহে ফিরিয়া
অটোগ্রাফ লিখা শেষ করিয়া
শয়ন| পরদিন প্রাতে ছয়টায় উঠিয়া আবার কাজ| এইরূপ
কয়েক মাস তিনি সফর
করিয়াছেন| মনের বল ও
সময়ানুবর্তীতা এবং স্বল্পাহারই এর
মূল রহস্য|...’ ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনের
সময় এবং এর আগে
আরেকবার জওহরলাল নেহরু অতিথি হয়ে সিলেট আসেন
এবং শ্রী ব্রজেন্দ্রনারায়ণের আতিথ্য গ্রহণ
করেন|
ফিরে আসি নিতাই সেনের
আলোচনায়| নিতাই সেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন| কর্মসূত্রে দীর্ঘসময় তিনি মাঠপর্যায়ে সরকারের
অতি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকরি করেছেন| যেখানেই চাকরি করেছেন সেখানকার আলো-হাওয়া ও
পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে মিশে পড়েন|
জড়িত হয়ে পড়েন সেখানকার
শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে| মজে যান ঐসব
এলাকার ভূপ্রকৃতির সাথেও| কবি-লেখক হিসাবে
অনুসন্ধিৎসু মনে নিতাই সেন
ঐসব স্থানের বিভিন্ন তথ্য হয়তো সংগ্রহ
করে রেখেছিলেন| সেসব তথ্যের সাথে
স্মৃতির মিশেলে নিতাই সেন রচনা করেছেন
অসাধারণ একটি গদ্যগ্রন্থ ‘স্মৃতির
সম্ভার’-যা প্রকাশিত হয়েছে
বইমেলা ২০২৬-এ| এই
গ্রন্থে সিলেট, ফেনী, নোয়াখালী, মাগুরা, খাগড়াছড়ি, ব্রাম্মণবাড়িয়া এবং সেন্টমার্টিনের বিচিত্র
অভিজ্ঞতা সহজ সরল বর্ণনাশৈলিতে
তুলে ধরেন কাব্যিকগদ্যে|
‘স্মৃতির সম্ভার’ গ্রন্থে রয়েছে সাতটি অধ্যায়| এগুলো হচ্ছে ১. শ্রীভূমি সিলেটে
কিছুদিন, ২. প্রাচীন ভুলুয়া
নগরীতে কিছু দিন: ফেনীপর্ব,
৩. প্রাচীন ভুলুয়া নগরীতে কিছুদিন: নোয়াখালীপর্ব,
৮. নবগঙ্গা পাড়ের মাগুড়ায়, ৫. স্মৃতিময় খাগড়াছড়ি,
৬. গানের শহর, ফুলের শহর-ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ৭. বাংলাদেশের
একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, সেন্টমার্টিন্সের সম্ভাবনা ও অন্তরায়| সূচিপত্রের
দিকে তাকালে মনে হয় নিতাই
সেন ঐ সব এলাকার
সবকিছুকে কবিমনের দরদী আকুলতা নিয়ে
অনুপঙ্খ বর্ণনা করেছেন তাঁর ‘স্মৃতির সম্ভার’ গ্রন্থে|
কবি-লেখক নিতাই সেন
কর্মসূত্রে বেশ কিছুদিন কাটিয়েছেন
সিলেটে| এখানকার আলো-হাওয়া পরিবেশ
পরিস্থিতির সাথে তিনি একাত্ম
হয়ে যান| তাঁর ভাগ্য
সুপ্রসন্ন হওয়ায় বিশিষ্ট কবি, গবেষক ও
সাহিত্য সংগঠক এ কে শেরামসহ
আরো অনেকের আন্তরিক সাহচর্য পেয়েছিলেন| কবি এ কে
শেরামের প্রাণজ সাহচর্য তাঁকে এতটাই বিমোহিত করেছে ‘স্মৃতির সম্ভার’ বইটি কবি এ
কে শেরামকে উৎসর্গ করে বন্ধুত্বের সুমহান
মর্যাদা দিয়েছেন|
সিলেটকে বলা হয় বাংলাদেশের
আধ্যাত্মিক রাজধানী| এই অঞ্চল ইতিহাসের
আলোয় উদ্ভাসিতও| হযরত শাহজালাল ও
তিনশ ষাট আউলিয়ার স্মৃতিধন্য
পূণ্যভূমি সিলেটকে নিতাই সেন চমৎকারভাবে লেখেন:
‘একজন শহযরত শাহজালাল (রা.)/লাউর গৌড়
আর রাজ্য ˆজয়ন্তিয়া/ তিন পুণ্যভূমি সিলেটের
ঠিকানা,/ তেরশত তিন সালে শাহজালাল
(রা.) আউলিয়া/ সিলেট এসেই তিনি গড়েন
আস্তানা|’
ছড়া-কবিতা লেখায় নিতাই সেন যে দারুণভাবে
পারঙ্গম তা আর বলার
অপেক্ষা রাখে না|
সিলেটে চাকরি করার সময় এ
এলাকা নিয়ে নিতাই সেনের
জবানী শুনলে অনুধাবন করা যাবে এতদঅঞ্চল
নিয়ে তাঁর ভালোবাসার বিষয়টি|
সিলেটকে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উল্লেখ করেছেন ‘শ্রীভূমি শ্রীহট্ট’ বলে| নিতাই সেনের
‘স্মৃতির সম্ভার’ গ্রন্থের শুরু হয়েছে ‘শ্রীভূমি
সিলেটে কিছুদিন’ শিরোনাম দিয়ে| এই অধ্যায়ের আলাদা
আলাদা শিরোনামে সিলেটে তাঁর চাকরিজীবনের সুদীর্ঘকালের
স্মৃতির বয়ান তুলে ধরেছেন
সহজসরল সাবলীল ভাষায়| তিনি বলেন, “০৪.০৮.১৯৯২-এ
আমি সিলেটে যোগদান করি| নতুনভাবে প্রকৃতিকন্যা
সিলেটকে দেখে বিমোহিত হই|
এপারে পাহাড়, ওপারে নদী| পাহাড়ের বুক
চিড়ে বয়ে চলেছে ঝরনা|
আর নদীর স্তরে স্তরে
সাজানো নানা রঙের নুড়ি
পাথর কবি মনে জাগিয়ে
তোলে অলৌকিক এক বিস্মরণ| নিজের
ভেতর ডুব দিয়ে চলে
যাই অপার্থিব এক স্বপ্নলোকে| ঐন্দ্রিয়াতীত,
ইহজাগতিক এক কল্পলোকে| দূরে
থেকে তাকালে মনে হয়, আকাশের
গাঁয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
অসংখ্য পাহাড়| প্রকৃতির অনবদ্য এক রহস্যময় সৃষ্টি|
পাহাড়ের গাঁয়ে নরম তুলার মাঝে
ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘদল| নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি
সিলেট| বর্ষা, বসন্ত, শীত, হেমন্তে এক
একরূপে সাজে সিলেটের প্রকৃতি|
সমতল, চা-বাগান, মণিপুরী,
খাসিয়া প্রভৃতি ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠীর ˆবচিত্র্যময়
জীবন-সংস্কৃতির স্বর্গীয় সম্মেলন| নদী, পাথর, পাহাড়,
জলপ্রপাত আর চা বাগানের
অপূর্ব সমন্বয়ে সিলেটকে দিয়েছে ‘প্রকৃতির কন্যা’র সম্মান| জীবনের
পড়ন্ত বেলায় এ কর্মময় জীবনের
স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার
জন্য লিখতে বসেছি আধ্যাত্মিক পুণ্যভূমি সিলেটের সেসব দিনের কথা|
স্মৃতি-নির্ভর লেখার মাঝে মাঝেই ফোন
করে সাহায্য নিয়েছি, আমার কবি বন্ধু
এ. কে. শেরাম আর
সহকর্মী বিজয় চন্দের| কর্মসময়ে
আমাকে আন্তরিক সহযোগিতার জন্য তাঁদেরসহ সিলেটের
মাটি ও মানুষের কাছে
আমি কৃতজ্ঞ| যেহেতু এটি আমার ব্যক্তিগত
ডায়েরি নয়, তাই সিলেটে
অবস্থানসময়ে উল্লেখযোগ্য কিছু স্মৃতিবহ ঘটনার
বর্ণনাপূর্বক লেখাটির ইতি টানবো|” এটা
পড়ার পর আর সবিস্তারে
তেমন বলার কিছু থাকে
না|
নিপুণভাবে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সংক্ষিপ্তভাবে সিলেট অঞ্চলের বর্ণনা তিনি তুলে ধরেন
আশ্চর্যজনক দক্ষতায়| যেমন, ‘বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বকোণে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় সিলেটের অবস্থান| ১৭৫৭ সালে পলাশী
যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা বাংলায়
রাজনৈতিক এবং সামরিক আধিপত্য
বিস্তার করে| ১৭৬৫ সালে
মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ
থেকে তারা বাংলা, বিহার
ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে— রাজস্ব
আদায়ের দায়িত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়|
ঐ সালেই সিলেট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির
শাসনাধীনে আসে| সে-সময়
মুহম্মদ আলী খান কুইমজঙ্গ
সিলেটের ফৌজদার ছিলেন| ১৭৫২ সালে ১৭
মার্চ সিলেট জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়|
এর বিচার প্রশাসনের দায়িত্বও ইংরেজদের হাতে চলে আসে|
১৮৭৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত সিলেট ছিলো ঢাকা বিভাগের
অন্তর্ভুক্ত| ১৮৭৪ সালের ১২
সেপ্টে¤^র সিলেটকে নবসৃষ্ট
আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়| ১৯০৫
সালে বাংলাকে ভাগ করে পূর্ববঙ্গ
ও আসাম প্রদেশ গঠন
করা হয়| তখন সিলেটকে
পূর্ববঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করা হয়| কিন্তু
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ
করা হলে সিলেটকে পুনরায়
আসাম প্রদেশে রাখা হয়| ১৯৪৭
সালের পূর্ব পর্যন্ত সিলেট আসামেরই একটি জেলা হিসেবে
কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে| ১৯৪৭ সালে
গণভোটের মাধ্যমে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়| প্রাচীন ইতিহাস
ঐতিহ্যে ভরপুর সিলেট ১৩০৩ সালে হযরত
শাহ& জালাল (রা.) (১২৭১-১৩৪৬) কর্তৃক
বিজয়ের মাধ্যমে নবরূপে আধ্যাত্যিক পুণ্যভূমি হিসেবে ঐ অঞ্চলে পরিচিতি
লাভ করে| শাহজালাল (রা.)
সিলেট আগমন সময়ে সিলেট
ছিলো রাজা গৌড়গোবিন্দের রাজধানী|’
এরকম আঞ্চলিক ইতিহাসের পাঠ নিতে নিতে
একজন নিতাই সেনের পঠনপাঠনের গভীরতা বুঝতে পেরে অবাক হই|
তাঁর অসাধারণ বর্ণনা ˆশলির গুণে ছবির
মতো ভেসে ওঠে সিলেট,
ফেনী, নোয়াখালী, মাগুরা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং অনন্য সুন্দর
সেন্টমার্টিনের দৃশ্যপটসমেত সংশ্লিষ্ট অঞ্চলসমূহের বিভিন্ন দিক| অত্যন্ত নিঁখুতভাবে
ঐ সব এলাকার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও এর সাথে
যুক্ত বরেণ্যদের সম্পর্কে আলোকপাত করে আমাদর সামনে
তুলে ধরেছেন নানা অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত| ভাবগম্ভীর পরিবেশে মাজার এলাকা পরিদর্শন এবং সকল আনুষ্ঠানিকতা
শেষ করে মাজারের পাদদেশে
বসে পরম করুণাময় এবং
হযরত শাহজালাল (রা.) নিকট প্রার্থনা
জানাই, সিলেট অবস্থান সময় যেন আমার
ভালোভাবে কাটে| এরপরে অন্যদিন খাদিম নগরে অবস্থিত শাহপরাণ
(রা.) মাজারও পরিদর্শন ও জিয়ারত করেন|
ঐদিন রাতে বসেই লিখে
ফেলেন একটি শিশুতোষ ছড়া,
যা তাঁর ‘সিলেটের ছড়া’ গ্রন্থে সংকলিত
হয়| ছড়াটি নিম্নরূপ:
হযরত শাহপরাণ (রা.)
‘শাহজালাল শাহপরাণ মামা ভাগ্নে দুই
আইতে সালাম যাইতে সালাম কী বাহারী ভূঁই,
ফকিরেরে সবাই চেনে সবাই
জানে একনামে
মামুর জোরে ভাগিনা চলে
সব কিছু হয় সব
কামে|’
এবারে আসি ফেনীসহ অন্যান্য
এলাকার বর্ণনায়ও লেখক অসাধারণ মুন্সিয়ানার
পরিচয় দিয়েছেন| বিশেষ করে ‘স্মৃতির সম্ভার’
গ্রন্থের ৪৭ ন¤^র
পৃষ্ঠায় এসে চোখ থমকে
দাঁড়ায়| লেখক নিতাই সেন
অপূর্ব কূশলতায় তুলে ধরেন কিছু
কথা| তিনি বলেন,
‘আধুনিক ফেনীর স্থপতি কবি নবীন চন্দ্রসেন
১৮৮৩ সালের ২৩ মে নভে¤^র ফেনীর মহকুমা
হাকিম হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন| রাজারঝির দিঘিকে সংস্কার করে দৃষ্টিনন্দন প্রশাসনিক
ভবনসহ ফেনীতে বিভিন্ন বাজার প্রতিষ্ঠা, যোগাযোগ ব্যবহার উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষার বিস্তার এবং উন্নয়নে তাঁর
অবদান অপরিসীম| দুঃখের বিষয় ফেনীবাসী তাঁর
অবদানকে আজো যথাযথভাবে মূল্যায়ন
করতে পারেনি| নতুন প্রজন্ম নবীন
চন্দ্র সেন সম্পর্কে কিছুই
জানেন না| ফেনী পাবলিক
লাইব্রেরিতে আমি বহুচেষ্টা করেও
খুঁজে পাইনি তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার
জীবন’ বইটি| ইতিহাস ঐত্যিহ্য সচেতন ফেনীর বর্তমান প্রজন্ম এ বিষয়ে গবেষণামূলক
বিবিধ মৌলিক কাজের মাধ্যমে ফেনীকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরবেন
এটাই আমার একমাত্র প্রত্যাশা|’
একজন সত্যিকারের লেখকের এই দৃষ্টিভঙ্গিজাত লেখা
আমাদেরকে দারুণভাবে পরিতৃপ্ত করে|
নিতাই সেন ১৯৮২ সালের
নিয়মিত বিসিএস পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে ১৯৮৩ সালে
প্রশাসন: খাদ্য ক্যাডারের সরকারি চাকরিতে যোগাদান করেন| সুদীর্ঘ ২৮ বছরের বর্ণাঢ্য
চাকরিজীবনে তিনি সুনামের সাথে
২৮ বছর চাকরি করে
২০১১ সালের ১১ নভেম্বর সরকারের
যুগ্মসচিব হিসাবে অবসরে যান| যেখানে যেখানে
চাকরি করেছেন সেসব জনপদের নদী-হাওর, গাছ-বৃক্ষ এবং
পরিযায়ী পাখিদের সাথে কথা বলেছেন|
তিনি মনে করেন, ‘আকাশ
তো হতে হবে সুবিশাল
প্রকৃতির রহস্যঘেরা অন্য এক জগৎ|
পাহাড়, নদী, হাওর-বাওর
এবং জলজ সংস্কৃতির ভুবন
জুড়েই তো সৃষ্টি হবে
শত শত মরমি গান...
অবস্থান সময়ে মেধা ও
মননে যে বাউল বাতাস
দোলা দিয়েছে তার সংক্ষিপ্ত রূপ
আমি দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর পর স্মৃতি
হাতড়ে উপস্থাপন করলাম| আমার কর্মসময়ের কর্মী,
সহযোদ্ধা বন্ধুরা যাদের নাম বাদ পড়েছে
বা কোনো তথ্য বাদ
পড়েছে মনে করলে আমাকে
জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো, এবং পরবর্তী সংস্করণে
সংযুক্ত করবো| আমি আমৃত্যু ঋণী
থাকবো-সিলেটের পুণ্যমাটি এবং পুণ্যবান মানুষের
কাছে| জয়তু শাহ জালাল
(রা.), শাহ পরাণ (রা.),
শ্রী চৈতন্যদেব সহ পুণ্যবান সকল
সাধক, জ্ঞানী-গুণী, ঋষি মহাপুরুষদেরকে আমার
সহস্র প্রণাম|’
শিল্পী সাগর আহমেদের নান্দনিক
প্রচ্ছদ সম্বলিত গ্রন্থটি বের হয়েছে নয়নজুলি,
কাঁটাবন, ঢাকা থেকে| ৯৬
পৃষ্ঠার ঝকঝকে ছাপায় গ্রন্থটির মূল্য তিনশ’ টাকা| আমরা নিতাই সেনের
অমর সৃষ্টি ‘স্মৃতির সম্ভার’ গ্রন্থের বহুল প্রচার কামনা
করে লেখকের জন্য শুভ কামনা
জানাই|

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
নিতাই সেন কবি হিসেবেই
সমধিক পরিচিত| তাঁর কবিতার সাথে
আমার পরিচয় সেই নব্বইয়ের দশকের
শুরু থেকে| কবিতার পাশাপাশি তিনি চমৎকার সব
ছড়াও লেখেন| শব্দগাঁথুনিতে কাব্যিক ভাবব্যঞ্জনা তৈরিতে সিদ্ধহস্ত এই কবি গদ্যতেও
যে পারঙ্গম এর প্রমাণ মিললো
তাঁর ‘স্মৃতির সম্ভার’ নামের গদ্যগ্রন্থে| নিতাই সেনের এই গ্রন্থটি আত্মস্মৃতিরই
খণ্ড খণ্ড কিছু উপাখ্যান
বটে| এটি পড়তে পড়তে
মনে আসে পণ্ডিত জওহরলাল
নেহরু সম্পর্কে সিলেটের প্রখ্যাত জমিদার ও রাজনীতিবিদ শ্রীব্রজেন্দ্রনারায়ণ
চৌধুরীর কথা| নেহরু সম্পর্কে
ব্রজেন্দ্রনারায়ণ লিখেছিলেন— ‘...আহারের সময় ভিন্ন তাঁহার
(জওহরলাল) অবসরই ছিল না| কথা
জমাইবার চেষ্টা করিয়া দেখিলাম, জওহরলাল অসম্ভব চাপা স্বভাবের... সকালসন্ধ্যা
এক মিনিটও বিশ্রাম না করিয়া রাত্রি
দুইটার সময় গৃহে ফিরিয়া
অটোগ্রাফ লিখা শেষ করিয়া
শয়ন| পরদিন প্রাতে ছয়টায় উঠিয়া আবার কাজ| এইরূপ
কয়েক মাস তিনি সফর
করিয়াছেন| মনের বল ও
সময়ানুবর্তীতা এবং স্বল্পাহারই এর
মূল রহস্য|...’ ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনের
সময় এবং এর আগে
আরেকবার জওহরলাল নেহরু অতিথি হয়ে সিলেট আসেন
এবং শ্রী ব্রজেন্দ্রনারায়ণের আতিথ্য গ্রহণ
করেন|
ফিরে আসি নিতাই সেনের
আলোচনায়| নিতাই সেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন| কর্মসূত্রে দীর্ঘসময় তিনি মাঠপর্যায়ে সরকারের
অতি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকরি করেছেন| যেখানেই চাকরি করেছেন সেখানকার আলো-হাওয়া ও
পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে মিশে পড়েন|
জড়িত হয়ে পড়েন সেখানকার
শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে| মজে যান ঐসব
এলাকার ভূপ্রকৃতির সাথেও| কবি-লেখক হিসাবে
অনুসন্ধিৎসু মনে নিতাই সেন
ঐসব স্থানের বিভিন্ন তথ্য হয়তো সংগ্রহ
করে রেখেছিলেন| সেসব তথ্যের সাথে
স্মৃতির মিশেলে নিতাই সেন রচনা করেছেন
অসাধারণ একটি গদ্যগ্রন্থ ‘স্মৃতির
সম্ভার’-যা প্রকাশিত হয়েছে
বইমেলা ২০২৬-এ| এই
গ্রন্থে সিলেট, ফেনী, নোয়াখালী, মাগুরা, খাগড়াছড়ি, ব্রাম্মণবাড়িয়া এবং সেন্টমার্টিনের বিচিত্র
অভিজ্ঞতা সহজ সরল বর্ণনাশৈলিতে
তুলে ধরেন কাব্যিকগদ্যে|
‘স্মৃতির সম্ভার’ গ্রন্থে রয়েছে সাতটি অধ্যায়| এগুলো হচ্ছে ১. শ্রীভূমি সিলেটে
কিছুদিন, ২. প্রাচীন ভুলুয়া
নগরীতে কিছু দিন: ফেনীপর্ব,
৩. প্রাচীন ভুলুয়া নগরীতে কিছুদিন: নোয়াখালীপর্ব,
৮. নবগঙ্গা পাড়ের মাগুড়ায়, ৫. স্মৃতিময় খাগড়াছড়ি,
৬. গানের শহর, ফুলের শহর-ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ৭. বাংলাদেশের
একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, সেন্টমার্টিন্সের সম্ভাবনা ও অন্তরায়| সূচিপত্রের
দিকে তাকালে মনে হয় নিতাই
সেন ঐ সব এলাকার
সবকিছুকে কবিমনের দরদী আকুলতা নিয়ে
অনুপঙ্খ বর্ণনা করেছেন তাঁর ‘স্মৃতির সম্ভার’ গ্রন্থে|
কবি-লেখক নিতাই সেন
কর্মসূত্রে বেশ কিছুদিন কাটিয়েছেন
সিলেটে| এখানকার আলো-হাওয়া পরিবেশ
পরিস্থিতির সাথে তিনি একাত্ম
হয়ে যান| তাঁর ভাগ্য
সুপ্রসন্ন হওয়ায় বিশিষ্ট কবি, গবেষক ও
সাহিত্য সংগঠক এ কে শেরামসহ
আরো অনেকের আন্তরিক সাহচর্য পেয়েছিলেন| কবি এ কে
শেরামের প্রাণজ সাহচর্য তাঁকে এতটাই বিমোহিত করেছে ‘স্মৃতির সম্ভার’ বইটি কবি এ
কে শেরামকে উৎসর্গ করে বন্ধুত্বের সুমহান
মর্যাদা দিয়েছেন|
সিলেটকে বলা হয় বাংলাদেশের
আধ্যাত্মিক রাজধানী| এই অঞ্চল ইতিহাসের
আলোয় উদ্ভাসিতও| হযরত শাহজালাল ও
তিনশ ষাট আউলিয়ার স্মৃতিধন্য
পূণ্যভূমি সিলেটকে নিতাই সেন চমৎকারভাবে লেখেন:
‘একজন শহযরত শাহজালাল (রা.)/লাউর গৌড়
আর রাজ্য ˆজয়ন্তিয়া/ তিন পুণ্যভূমি সিলেটের
ঠিকানা,/ তেরশত তিন সালে শাহজালাল
(রা.) আউলিয়া/ সিলেট এসেই তিনি গড়েন
আস্তানা|’
ছড়া-কবিতা লেখায় নিতাই সেন যে দারুণভাবে
পারঙ্গম তা আর বলার
অপেক্ষা রাখে না|
সিলেটে চাকরি করার সময় এ
এলাকা নিয়ে নিতাই সেনের
জবানী শুনলে অনুধাবন করা যাবে এতদঅঞ্চল
নিয়ে তাঁর ভালোবাসার বিষয়টি|
সিলেটকে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উল্লেখ করেছেন ‘শ্রীভূমি শ্রীহট্ট’ বলে| নিতাই সেনের
‘স্মৃতির সম্ভার’ গ্রন্থের শুরু হয়েছে ‘শ্রীভূমি
সিলেটে কিছুদিন’ শিরোনাম দিয়ে| এই অধ্যায়ের আলাদা
আলাদা শিরোনামে সিলেটে তাঁর চাকরিজীবনের সুদীর্ঘকালের
স্মৃতির বয়ান তুলে ধরেছেন
সহজসরল সাবলীল ভাষায়| তিনি বলেন, “০৪.০৮.১৯৯২-এ
আমি সিলেটে যোগদান করি| নতুনভাবে প্রকৃতিকন্যা
সিলেটকে দেখে বিমোহিত হই|
এপারে পাহাড়, ওপারে নদী| পাহাড়ের বুক
চিড়ে বয়ে চলেছে ঝরনা|
আর নদীর স্তরে স্তরে
সাজানো নানা রঙের নুড়ি
পাথর কবি মনে জাগিয়ে
তোলে অলৌকিক এক বিস্মরণ| নিজের
ভেতর ডুব দিয়ে চলে
যাই অপার্থিব এক স্বপ্নলোকে| ঐন্দ্রিয়াতীত,
ইহজাগতিক এক কল্পলোকে| দূরে
থেকে তাকালে মনে হয়, আকাশের
গাঁয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
অসংখ্য পাহাড়| প্রকৃতির অনবদ্য এক রহস্যময় সৃষ্টি|
পাহাড়ের গাঁয়ে নরম তুলার মাঝে
ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘদল| নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি
সিলেট| বর্ষা, বসন্ত, শীত, হেমন্তে এক
একরূপে সাজে সিলেটের প্রকৃতি|
সমতল, চা-বাগান, মণিপুরী,
খাসিয়া প্রভৃতি ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠীর ˆবচিত্র্যময়
জীবন-সংস্কৃতির স্বর্গীয় সম্মেলন| নদী, পাথর, পাহাড়,
জলপ্রপাত আর চা বাগানের
অপূর্ব সমন্বয়ে সিলেটকে দিয়েছে ‘প্রকৃতির কন্যা’র সম্মান| জীবনের
পড়ন্ত বেলায় এ কর্মময় জীবনের
স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার
জন্য লিখতে বসেছি আধ্যাত্মিক পুণ্যভূমি সিলেটের সেসব দিনের কথা|
স্মৃতি-নির্ভর লেখার মাঝে মাঝেই ফোন
করে সাহায্য নিয়েছি, আমার কবি বন্ধু
এ. কে. শেরাম আর
সহকর্মী বিজয় চন্দের| কর্মসময়ে
আমাকে আন্তরিক সহযোগিতার জন্য তাঁদেরসহ সিলেটের
মাটি ও মানুষের কাছে
আমি কৃতজ্ঞ| যেহেতু এটি আমার ব্যক্তিগত
ডায়েরি নয়, তাই সিলেটে
অবস্থানসময়ে উল্লেখযোগ্য কিছু স্মৃতিবহ ঘটনার
বর্ণনাপূর্বক লেখাটির ইতি টানবো|” এটা
পড়ার পর আর সবিস্তারে
তেমন বলার কিছু থাকে
না|
নিপুণভাবে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সংক্ষিপ্তভাবে সিলেট অঞ্চলের বর্ণনা তিনি তুলে ধরেন
আশ্চর্যজনক দক্ষতায়| যেমন, ‘বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বকোণে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় সিলেটের অবস্থান| ১৭৫৭ সালে পলাশী
যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা বাংলায়
রাজনৈতিক এবং সামরিক আধিপত্য
বিস্তার করে| ১৭৬৫ সালে
মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ
থেকে তারা বাংলা, বিহার
ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে— রাজস্ব
আদায়ের দায়িত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়|
ঐ সালেই সিলেট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির
শাসনাধীনে আসে| সে-সময়
মুহম্মদ আলী খান কুইমজঙ্গ
সিলেটের ফৌজদার ছিলেন| ১৭৫২ সালে ১৭
মার্চ সিলেট জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়|
এর বিচার প্রশাসনের দায়িত্বও ইংরেজদের হাতে চলে আসে|
১৮৭৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত সিলেট ছিলো ঢাকা বিভাগের
অন্তর্ভুক্ত| ১৮৭৪ সালের ১২
সেপ্টে¤^র সিলেটকে নবসৃষ্ট
আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়| ১৯০৫
সালে বাংলাকে ভাগ করে পূর্ববঙ্গ
ও আসাম প্রদেশ গঠন
করা হয়| তখন সিলেটকে
পূর্ববঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করা হয়| কিন্তু
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ
করা হলে সিলেটকে পুনরায়
আসাম প্রদেশে রাখা হয়| ১৯৪৭
সালের পূর্ব পর্যন্ত সিলেট আসামেরই একটি জেলা হিসেবে
কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে| ১৯৪৭ সালে
গণভোটের মাধ্যমে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়| প্রাচীন ইতিহাস
ঐতিহ্যে ভরপুর সিলেট ১৩০৩ সালে হযরত
শাহ& জালাল (রা.) (১২৭১-১৩৪৬) কর্তৃক
বিজয়ের মাধ্যমে নবরূপে আধ্যাত্যিক পুণ্যভূমি হিসেবে ঐ অঞ্চলে পরিচিতি
লাভ করে| শাহজালাল (রা.)
সিলেট আগমন সময়ে সিলেট
ছিলো রাজা গৌড়গোবিন্দের রাজধানী|’
এরকম আঞ্চলিক ইতিহাসের পাঠ নিতে নিতে
একজন নিতাই সেনের পঠনপাঠনের গভীরতা বুঝতে পেরে অবাক হই|
তাঁর অসাধারণ বর্ণনা ˆশলির গুণে ছবির
মতো ভেসে ওঠে সিলেট,
ফেনী, নোয়াখালী, মাগুরা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং অনন্য সুন্দর
সেন্টমার্টিনের দৃশ্যপটসমেত সংশ্লিষ্ট অঞ্চলসমূহের বিভিন্ন দিক| অত্যন্ত নিঁখুতভাবে
ঐ সব এলাকার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও এর সাথে
যুক্ত বরেণ্যদের সম্পর্কে আলোকপাত করে আমাদর সামনে
তুলে ধরেছেন নানা অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত| ভাবগম্ভীর পরিবেশে মাজার এলাকা পরিদর্শন এবং সকল আনুষ্ঠানিকতা
শেষ করে মাজারের পাদদেশে
বসে পরম করুণাময় এবং
হযরত শাহজালাল (রা.) নিকট প্রার্থনা
জানাই, সিলেট অবস্থান সময় যেন আমার
ভালোভাবে কাটে| এরপরে অন্যদিন খাদিম নগরে অবস্থিত শাহপরাণ
(রা.) মাজারও পরিদর্শন ও জিয়ারত করেন|
ঐদিন রাতে বসেই লিখে
ফেলেন একটি শিশুতোষ ছড়া,
যা তাঁর ‘সিলেটের ছড়া’ গ্রন্থে সংকলিত
হয়| ছড়াটি নিম্নরূপ:
হযরত শাহপরাণ (রা.)
‘শাহজালাল শাহপরাণ মামা ভাগ্নে দুই
আইতে সালাম যাইতে সালাম কী বাহারী ভূঁই,
ফকিরেরে সবাই চেনে সবাই
জানে একনামে
মামুর জোরে ভাগিনা চলে
সব কিছু হয় সব
কামে|’
এবারে আসি ফেনীসহ অন্যান্য
এলাকার বর্ণনায়ও লেখক অসাধারণ মুন্সিয়ানার
পরিচয় দিয়েছেন| বিশেষ করে ‘স্মৃতির সম্ভার’
গ্রন্থের ৪৭ ন¤^র
পৃষ্ঠায় এসে চোখ থমকে
দাঁড়ায়| লেখক নিতাই সেন
অপূর্ব কূশলতায় তুলে ধরেন কিছু
কথা| তিনি বলেন,
‘আধুনিক ফেনীর স্থপতি কবি নবীন চন্দ্রসেন
১৮৮৩ সালের ২৩ মে নভে¤^র ফেনীর মহকুমা
হাকিম হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন| রাজারঝির দিঘিকে সংস্কার করে দৃষ্টিনন্দন প্রশাসনিক
ভবনসহ ফেনীতে বিভিন্ন বাজার প্রতিষ্ঠা, যোগাযোগ ব্যবহার উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষার বিস্তার এবং উন্নয়নে তাঁর
অবদান অপরিসীম| দুঃখের বিষয় ফেনীবাসী তাঁর
অবদানকে আজো যথাযথভাবে মূল্যায়ন
করতে পারেনি| নতুন প্রজন্ম নবীন
চন্দ্র সেন সম্পর্কে কিছুই
জানেন না| ফেনী পাবলিক
লাইব্রেরিতে আমি বহুচেষ্টা করেও
খুঁজে পাইনি তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার
জীবন’ বইটি| ইতিহাস ঐত্যিহ্য সচেতন ফেনীর বর্তমান প্রজন্ম এ বিষয়ে গবেষণামূলক
বিবিধ মৌলিক কাজের মাধ্যমে ফেনীকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরবেন
এটাই আমার একমাত্র প্রত্যাশা|’
একজন সত্যিকারের লেখকের এই দৃষ্টিভঙ্গিজাত লেখা
আমাদেরকে দারুণভাবে পরিতৃপ্ত করে|
নিতাই সেন ১৯৮২ সালের
নিয়মিত বিসিএস পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে ১৯৮৩ সালে
প্রশাসন: খাদ্য ক্যাডারের সরকারি চাকরিতে যোগাদান করেন| সুদীর্ঘ ২৮ বছরের বর্ণাঢ্য
চাকরিজীবনে তিনি সুনামের সাথে
২৮ বছর চাকরি করে
২০১১ সালের ১১ নভেম্বর সরকারের
যুগ্মসচিব হিসাবে অবসরে যান| যেখানে যেখানে
চাকরি করেছেন সেসব জনপদের নদী-হাওর, গাছ-বৃক্ষ এবং
পরিযায়ী পাখিদের সাথে কথা বলেছেন|
তিনি মনে করেন, ‘আকাশ
তো হতে হবে সুবিশাল
প্রকৃতির রহস্যঘেরা অন্য এক জগৎ|
পাহাড়, নদী, হাওর-বাওর
এবং জলজ সংস্কৃতির ভুবন
জুড়েই তো সৃষ্টি হবে
শত শত মরমি গান...
অবস্থান সময়ে মেধা ও
মননে যে বাউল বাতাস
দোলা দিয়েছে তার সংক্ষিপ্ত রূপ
আমি দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর পর স্মৃতি
হাতড়ে উপস্থাপন করলাম| আমার কর্মসময়ের কর্মী,
সহযোদ্ধা বন্ধুরা যাদের নাম বাদ পড়েছে
বা কোনো তথ্য বাদ
পড়েছে মনে করলে আমাকে
জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো, এবং পরবর্তী সংস্করণে
সংযুক্ত করবো| আমি আমৃত্যু ঋণী
থাকবো-সিলেটের পুণ্যমাটি এবং পুণ্যবান মানুষের
কাছে| জয়তু শাহ জালাল
(রা.), শাহ পরাণ (রা.),
শ্রী চৈতন্যদেব সহ পুণ্যবান সকল
সাধক, জ্ঞানী-গুণী, ঋষি মহাপুরুষদেরকে আমার
সহস্র প্রণাম|’
শিল্পী সাগর আহমেদের নান্দনিক
প্রচ্ছদ সম্বলিত গ্রন্থটি বের হয়েছে নয়নজুলি,
কাঁটাবন, ঢাকা থেকে| ৯৬
পৃষ্ঠার ঝকঝকে ছাপায় গ্রন্থটির মূল্য তিনশ’ টাকা| আমরা নিতাই সেনের
অমর সৃষ্টি ‘স্মৃতির সম্ভার’ গ্রন্থের বহুল প্রচার কামনা
করে লেখকের জন্য শুভ কামনা
জানাই|

আপনার মতামত লিখুন