সংবাদ

গ্রন্থপাঠ

জীবনের গোধূলিবেলা ও মানবিক সম্পর্কের বহুমাত্রিক পাঠ


লাবণী মণ্ডল
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ৬ মে ২০২৬, ১১:৫৮ পিএম

জীবনের গোধূলিবেলা ও মানবিক সম্পর্কের বহুমাত্রিক পাঠ

ছোটগল্প সাহিত্যের এক আশ্চর্য আয়না| এই আয়নায় মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের আনন্দ, বেদনা, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, অবদমন ও স্বপ্নগুলো নিপুণভাবে প্রতিফলিত হয়| বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক আন্তন চেখভ মনে করতেন, একজন লেখকের কাজ মানুষের জীবনের সমস্যাগুলো সমাধান করা নয়, বরং সমস্যাগুলোকে নিখুঁতভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরা|

বিদ্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘গোধূলিমায়ার গন্তব্যে’ লেখক পিওনা আফরোজ জীবনের অতি পরিচিত দৃশ্যপটগুলোকে গভীর সংবেদনশীলতায় বিশ্লেষণ করেছেন| দৈনন্দিন জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানসিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সামাজিক অবক্ষয় এবং অস্তিত্বের সংকট তাঁর কলমে মূর্ত হয়ে উঠেছে| লেখকের নিজস্ব এক ভাষাশৈলী রয়েছে| তিনি অকারণে শব্দের বাহুল্য  তৈরি করেন না| মেদহীন, নির্ভার ও তীক্ষ্ণ ভাষায় তিনি মানুষের অন্তর্নিহিত বেদনার ছবি আঁকেন| তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো আমাদের চারপাশের অতি চেনা মানুষ| তাদের আনন্দ-বেদনার সাথে পাঠক সহজেই একাত্মতা অনুভব করতে পারেন|

স্মৃতির মায়াজাল এবং হারানো প্রেমের দহন: গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘হঠাৎ দেখা’ মানবমনের এক চিরন্তন হাহাকারকে ধারণ করে| গল্পের শুরুতেই এক স্বপ্নময় পরিবেশের অবতারণা ঘটে| মাঝরাতে এক বৃদ্ধার হাতভর্তি শিউলি ফুল নিয়ে উপস্থিত হওয়া এবং চারদিকে সুবাস ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্যটি মূলত নায়কের অবচেতন মনের আকাঙ্ক্ষারই প্রতীক| প্রখ্যাত মনঃসমীক্ষক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, মানুষের অবদমিত বাসনাগুলোই স্বপ্নে রূপকের আড়ালে ধরা দেয়| নায়কের ছোটবেলার শিউলি কুড়ানোর স্মৃতি এবং এক অধরা প্রেমের প্রতি আকুলতা এই স্বপ্নের জন্ম দিয়েছে|

পরবর্তীতে বাস্তব জগতে নায়কের সাথে মাধবীর দেখা হয়| মাধবী নায়কের অতীত জীবনের এক অসম্পূর্ণ প্রেমের নাম| মাধবীর পরনে গোলাপি পাড়ের সবুজ শাড়ি, হাতে শিউলি ফুলের মালা| অতীত যেন সশরীরে এসে দাঁড়িয়েছে বর্তমানের ব্যস্ত ফুটপাতে| দুজনের কথোপকথনে উঠে আসে এক চরম বাস্তবতা| নায়ক তার মধ্যবিত্ত জীবনের কঠিন দায়িত্ববোধের যূপকাষ্ঠে নিজের প্রেমকে বলি দিয়েছিল| মানসিক ভারসাম্যহীন বড় ভাই এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার তাগিদে সে মাধবীকে আপন করে নেওয়ার সাহস সঞ্চয় করতে পারেনি|

এই গল্পে লেখক খুব সাবলীলভাবে দেখিয়েছেন সময়ের সাথে সাথে মানুষের অনুভূতির পরিবর্তন হয় না, শুধু পরিস্থিতি বদলে যায়| মাধবী নতুন জীবন পেয়েছে, নতুন সংসার সাজিয়েছে, তথাপি পুরনো দিনের কথা স্মরণ করে তার চোখে-মুখে এক ধরনের বিষণ্নতা নেমে আসে| অন্যদিকে নায়ক আজও তার দায়িত্ববোধের শৃঙ্খলে আবদ্ধ| সময়ের স্রোতে মানুষ ভেসে যায়, স্মৃতিগুলো কেবল মনের গভীরে নোঙর ফেলে থাকে|

‘বাড়ি ফেরা’ গল্পটি আধুনিক নাগরিক জীবনের চরম যান্ত্রিকতা এবং শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক করুণ আখ্যান| গল্পের প্রধান চরিত্র হায়দার আলী একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রৌঢ়| তার জীবনের একমাত্র আনন্দ নাতনি জয়া| জয়ার সাথে তার সম্পর্কটি নিছক নানা-নাতনির নয়, বরং দুই প্রজন্মের এক অদ্ভুত আত্মিক মেলবন্ধন|

গ্রামের শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশে জয়া বেড়ে উঠছিল| হঠাৎ একদিন জয়ার বাবা এসে উন্নত শিক্ষার অজুহাতে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়| এখান থেকেই গল্পের মোড় ঘোরে| গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরের পর জয়ার জীবনে নেমে আসে এক চরম অমানবিক অধ্যায়| শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতে জয়া হয়ে ওঠে এক খাঁচায় বন্দি পাখি| তার বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের মানসিক বিকাশের চেয়ে স্কুলের ফলাফল মুখ্য হয়ে ওঠে| অঙ্কে সাতাইশ নম্বর পাওয়ার অপরাধে জয়ার বাবা তাকে বেল্ট দিয়ে পশুর মতো প্রহার করে| জয়ার মা নীরব দর্শকের মতো সেই দৃশ্য উপভোগ করে, উল্টো মেয়েকেই দোষারোপ করে|

এই গল্পে লেখক আধুনিক অভিভাবকত্বের এক ভয়ঙ্কর রূপ তুলে ধরেছেন| সন্তানকে সফল করার অন্ধ প্রতিযোগিতায় বাবা-মা কীভাবে সন্তানের শৈশবকে গলা টিপে হত্যা করছে, তারই এক জ্বলন্ত দলিল এই গল্প| শহরের যান্ত্রিক জীবনে মানুষের স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসাগুলো কীভাবে শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে, জয়ার প্রতি তার পিতামাতার আচরণ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ| জয়া বারবার গ্রামের সেই স্নেহময় পরিবেশে ফিরে যেতে চায়| তার মন কাঁদে নানা-নানির জন্য| এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন লেখক অত্যন্ত সুনিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন| নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বলেছিলেন, ‘জীবন মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়, জীবন মানে স্মৃতি এবং সেই স্মৃতিকে কীভাবে স্মরণ করা হয়|’ জয়ার কাছে তার গ্রামের স্মৃতিই প্রকৃত জীবন, আর শহরের জীবন এক শ্বাসরুদ্ধকর মৃত্যুপুরী|

দাম্পত্যের শূন্যতা এবং নারীর শৃঙ্খল: ‘ছায়ার আলো’ গল্পে পিওনা আফরোজ দাম্পত্য সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়ানক শূন্যতা ও প্রতারণার চিত্র অঙ্কন করেছেন| গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তিথি তার স্বামী নয়নের সাথে এক অর্থহীন জীবনযাপন করছে| তাদের সংসারে প্রাচুর্য আছে, আবেগ নেই| নয়নের লাম্পট্য এবং অবহেলা তিথিকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে|

তিথির এই নিঃসঙ্গতার মাঝে তার পুরনো বন্ধু জয়রিয়ার স্মৃতি ফিরে আসে| জয়রিয়াও দাম্পত্য জীবনের আরেক ভয়ানক প্রতারণার শিকার| তার স্বামী একজন সমকামী| এই সত্য জানার পর জয়রিয়া যখন তার বাবার কাছে আশ্রয় খোঁজে, সমাজ ও পরিবার তাকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেয়| আমাদের সমাজব্যবস্থায় নারীর প্রতি অবিচারের এটি এক চিরায়ত রূপ| মেয়েরা বৈবাহিক জীবনে চরম নির্যাতনের শিকার হলেও পরিবার ও সমাজ তাদের মানিয়ে নেওয়ার চাপ প্রয়োগ করে|

অন্যদিকে তিথির স্বামী নয়ন তার সকল প্রতারণাকে আড়াল করতে তিথির সাথে এক যান্ত্রিক যৌন সম্পর্ক বজায় রাখে| তিথি সবকিছু জেনেও বাধ্য হয়ে এই সম্পর্ক মেনে নেয়| এটি নারীর এক চরম অসহায়ত্ব| শিক্ষিত ও সচেতন হওয়া সত্ত্বেও তিথি তার সামাজিক সংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে বের হতে পারে না| তার সন্তানরা বিদেশে থাকে| তারাও মায়ের মানসিক যন্ত্রণার চেয়ে বাবার অর্থের প্রতি বেশি নির্ভরশীল| তিথি একসময় অনুভব করে তার জীবনে কারও কোনও প্রয়োজন নেই| সে মুক্তি চায়| এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আধুনিক নারীর স্বকীয়তা খোঁজার এক অদম্য প্রয়াস|

সময়ের নির্মমতা এবং ফেরার আকুতি: ‘গোধূলিমায়ার গন্তব্যে’ গ্রন্থটির নামগল্প| লঞ্চের ডেক থেকে নদীর জলের দিকে তাকিয়ে থাকা এক বিষণ্ন মানুষের আত্মবিশ্লেষণের গল্প এটি| মানুষ কেন শেকড়ের কাছে ফেরে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কথক তার অতীতের স্মৃতিচারণ করেন|

তার মনে পড়ে বাবার কথা| ছুটির দিনগুলোতে বাবা তাকে বাড়ি ফেরার জন্য বারবার ফোন করতেন| তখন এই ফোন করাকে তার কাছে চরম বিরক্তিকর মনে হতো| আজ সে নিজে একজন বাবা| সে বুঝতে পারে সন্তানের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকার যন্ত্রণা কত তীব্র| লেখক এখানে মানবজীবনের এক নির্মম সত্যকে তুলে ধরেছেন| কাছের মানুষদের মূল্য আমরা তখন বুঝতে পারি, যখন তারা চিরতরে হারিয়ে যায়|

গল্পে সোবহান চাচার চরিত্রটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ| সোবহান চাচা একজন নিঃসঙ্গ, স্বপ্নবাজ মানুষ| তিনি কথকের মনে বই পড়ার তৃষ্ণা জাগিয়েছিলেন| আজ সেই কথক লেখক হয়েছেন| সোবহান চাচা তার লেখা বই বুকে জড়িয়ে কাঁদেন| এই কান্না একাকীত্বের, প্রাপ্তির এবং জীবনের ফেলে আসা হিসাব মেলানোর| লঞ্চের ঢেউয়ের সাথে কথকের স্মৃতির ঢেউগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়| এই গল্পের দার্শনিক বোধ পাঠককে নিজের জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়|

বইটির একটি অংশে (শিরোনামহীন খণ্ডাংশে) লেখক সমাজের এক ভয়াবহ অন্ধকার রূপ উন্মোচন করেছেন| একজন সহায়-স¤^লহীন নারী তার মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে চাচার বাড়িতে আশ্রয় নেয়| সেই আশ্রয়দাতাই একরাতে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়|

এই চরম মুহূর্তে নারীটি এক প্রবল মানসিক দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হয়| সে প্রতিবাদ করলে তাকে এবং তার মেয়ে রেশমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে| আবার এই জঘন্য অত্যাচার মেনে নিয়ে সেখানে থাকাও তার পক্ষে অসম্ভব| পরিশেষে সে এক নিষ্ঠুর ও হৃদয়বিদারক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে| মেয়ের নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং আর্থিক নিশ্চয়তার কথা ভেবে সে নিজের মাতৃত্বের অধিকার বিসর্জন দেয়| ঘুমন্ত রেশমাকে চাচার বাড়িতে রেখে সে গভীর রাতে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়|

মাতৃত্বের এমন আত্মত্যাগের দৃশ্য সাহিত্যে বিরল| লেখক এখানে কোনো মেলোড্রামার আশ্রয় নেননি| অত্যন্ত নির্লিপ্ত বর্ণনায় তিনি এক মায়ের বুকের চাপা কান্নাকে পাঠকের চেতনায় প্রবিষ্ট করিয়েছেন| সমাজের চোখে হয়তো নারীটি পালিয়েছে, তার ভেতরের রক্তক্ষরণের খবর কেউ রাখেনি| নারীদের জন্য নির্ধারিত তথাকথিত ‘নিরাপদ আশ্রয়’গুলো অনেক সময় কীভাবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়, এই গল্প তার এক অকাট্য প্রমাণ|

অভাবের তাড়না এবং খাঁটি প্রেমের উপাখ্যান: ‘মায়াবী আগুন’ গল্পে নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের অর্থনৈতিক সংগ্রাম এবং এর মাঝেও টিকে থাকা ভালোবাসার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে| সবুজ নামের এক যুবক ঢাকায় একটি ছোট চাকরি করে| বাবার অসুস্থতার সময় দুলাভাইয়ের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে সে চরম অপমানের শিকার হয়|

অর্থের কাছে মানুষের সম্পর্কগুলো কতটা ঠুনকো হয়ে যায়, দুলাভাইয়ের নিষ্ঠুর আচরণের মাধ্যমে লেখক তা স্পষ্ট করেছেন| সবুজের নিজের বোন তার স্বামীর কাছে অপমানিত হয় ভাইয়ের কারণে| সবুজ নিজেকে এক চরম ব্যর্থ ও অপদার্থ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে| জীবনের এই ঘোর অমানিশায় সবুজের পাশে এসে দাঁড়ায় তার প্রেমিকা মায়া|

মায়া দরিদ্র ঘরের মেয়ে| তার কাছে অর্থ নেই, আছে এক বুক খাঁটি ভালোবাসা| সে সবুজের সকল দুশ্চিন্তা নিজের কাঁধে তুলে নিতে চায়| এই স্বার্থপর পৃথিবীতে মায়ার মতো নিঃ স্বার্থ চরিত্রগুলোই মানুষের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন| লেখক এখানে দারিদ্র্যের কদর্য রূপের পাশাপাশি ভালোবাসার এক ঐশ্বরিক স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিয়েছেন|

‘দহন শেষে’ গল্পটি এক মিথ্যা অপবাদে ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হওয়া এক মায়ের গল্প| ঝড়ের রাতে এক আগন্তুক দরজায় কড়া নাড়ে| মা দরজা না খুললেও পরদিন সকালে গ্রাম্য সালিশে তাকে চরিত্রহীনা আখ্যা দেওয়া হয়| চেয়ারম্যানের নির্দেশে সমাজচ্যুত হয়ে সেই মাকে এক কাপড়ে সন্তানসহ গ্রাম ছাড়তে হয়|

এই গল্পে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার এক ভয়ানক ত্রুটি তুলে ধরা হয়েছে| পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর সম্মান কতটা ঠুনকো এবং ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা কীভাবে বিচারের নামে প্রহসন করে, তা এখানে সুস্পষ্ট| বহু বছর পর সন্তান যখন সেই গ্রামে ফিরে আসে, তার মনে পড়ে সেই রাতের কথা| অতীত আর বর্তমানের এই সংযোগ পাঠককে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায়|

পিওনা আফরোজ মূলত একজন আবৃত্তিশিল্পী ছিলেন| এই শিল্পমাধ্যমের প্রভাব তাঁর গদ্যে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান| তাঁর বাক্যের গঠনে এক ধরনের অন্তর্নিহিত ছন্দ রয়েছে| তিনি কঠিন এবং ভারী শব্দের পরিবর্তে অত্যন্ত প্রাঞ্জল, কথ্য ও সাবলীল ভাষা ব্যবহার করেছেন|

গল্পগুলোর সবচেয়ে বড় গুণ হলো এর পরিমিতিবোধ| লেখক কোথাও আবেগের আতিশয্যে ভেসে যাননি| চরিত্রগুলোর দুঃখ, কষ্ট, হতাশা বোঝাতে তিনি দীর্ঘ ব্যাখ্যার আশ্রয় না নিয়ে ছোট ছোট ঘটনার মাধ্যমে তাদের মানসিক অবস্থা ফুটিয়ে তুলেছেন| জয়ার বাবার বেল্ট দিয়ে প্রহার করার দৃশ্য কিংবা রাতের অন্ধকারে চাচার লালসার শিকার হওয়ার দৃশ্যগুলো লেখক নিয়ন্ত্রিত ভাষায় বর্ণনা করেছেন| এই পরিমিতিবোধই গল্পগুলোকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে এসেছে|

তাঁর চরিত্রগুলো সাদাকালো নয়, বরং ধূসর| মানুষের ভেতরে ভালো এবং মন্দের সংমিশ্রণ থাকে, পিওনা আফরোজের চরিত্রগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়| তারা ভুল করে, অনুতপ্ত হয়, সমাজের ভয়ে গুটিয়ে থাকে, আবার সময়বিশেষে বিদ্রোহও করে|

লেখক জীবনের যে গন্তব্যের কথা বলেছেন, তা মূলত মানুষের আত্মানুসন্ধানের গন্তব্য| প্রতিটি চরিত্রই কোনো না কোনোভাবে নিজেদের খুঁজছে| কেউ খুঁজছে হারানো শৈশব, কেউ খুঁজছে মুক্তির স্বাদ, আবার কেউ খুঁজছে একটুখানি মাথা গোঁজার ঠাঁই|

বইটির পাঠ অভিজ্ঞতা সাহিত্যের যেকোনো একনিষ্ঠ পাঠককে ভাবনার জগতে আলোড়িত করবে| পিওনা আফরোজ প্রমাণ করেছেন, চারপাশের সাধারণ ঘটনাগুলোর মাঝেই লুকিয়ে থাকে সাহিত্যের অমূল্য উপাদান| প্রয়োজন শুধু দেখার মতো দৃষ্টি এবং অনুভব করার মতো সংবেদনশীল মন|

গোধূলিমায়ার গন্তব্যে| পিওনা আফরোজ| প্রকাশক: বিদ্যা প্রকাশ| প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ| ফেব্রুয়ারি ২০২৩| মূল্য ; ২২৫ টাকা|

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬


জীবনের গোধূলিবেলা ও মানবিক সম্পর্কের বহুমাত্রিক পাঠ

প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬

featured Image

ছোটগল্প সাহিত্যের এক আশ্চর্য আয়না| এই আয়নায় মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের আনন্দ, বেদনা, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, অবদমন ও স্বপ্নগুলো নিপুণভাবে প্রতিফলিত হয়| বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক আন্তন চেখভ মনে করতেন, একজন লেখকের কাজ মানুষের জীবনের সমস্যাগুলো সমাধান করা নয়, বরং সমস্যাগুলোকে নিখুঁতভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরা|

বিদ্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘গোধূলিমায়ার গন্তব্যে’ লেখক পিওনা আফরোজ জীবনের অতি পরিচিত দৃশ্যপটগুলোকে গভীর সংবেদনশীলতায় বিশ্লেষণ করেছেন| দৈনন্দিন জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানসিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সামাজিক অবক্ষয় এবং অস্তিত্বের সংকট তাঁর কলমে মূর্ত হয়ে উঠেছে| লেখকের নিজস্ব এক ভাষাশৈলী রয়েছে| তিনি অকারণে শব্দের বাহুল্য  তৈরি করেন না| মেদহীন, নির্ভার ও তীক্ষ্ণ ভাষায় তিনি মানুষের অন্তর্নিহিত বেদনার ছবি আঁকেন| তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো আমাদের চারপাশের অতি চেনা মানুষ| তাদের আনন্দ-বেদনার সাথে পাঠক সহজেই একাত্মতা অনুভব করতে পারেন|

স্মৃতির মায়াজাল এবং হারানো প্রেমের দহন: গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘হঠাৎ দেখা’ মানবমনের এক চিরন্তন হাহাকারকে ধারণ করে| গল্পের শুরুতেই এক স্বপ্নময় পরিবেশের অবতারণা ঘটে| মাঝরাতে এক বৃদ্ধার হাতভর্তি শিউলি ফুল নিয়ে উপস্থিত হওয়া এবং চারদিকে সুবাস ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্যটি মূলত নায়কের অবচেতন মনের আকাঙ্ক্ষারই প্রতীক| প্রখ্যাত মনঃসমীক্ষক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, মানুষের অবদমিত বাসনাগুলোই স্বপ্নে রূপকের আড়ালে ধরা দেয়| নায়কের ছোটবেলার শিউলি কুড়ানোর স্মৃতি এবং এক অধরা প্রেমের প্রতি আকুলতা এই স্বপ্নের জন্ম দিয়েছে|

পরবর্তীতে বাস্তব জগতে নায়কের সাথে মাধবীর দেখা হয়| মাধবী নায়কের অতীত জীবনের এক অসম্পূর্ণ প্রেমের নাম| মাধবীর পরনে গোলাপি পাড়ের সবুজ শাড়ি, হাতে শিউলি ফুলের মালা| অতীত যেন সশরীরে এসে দাঁড়িয়েছে বর্তমানের ব্যস্ত ফুটপাতে| দুজনের কথোপকথনে উঠে আসে এক চরম বাস্তবতা| নায়ক তার মধ্যবিত্ত জীবনের কঠিন দায়িত্ববোধের যূপকাষ্ঠে নিজের প্রেমকে বলি দিয়েছিল| মানসিক ভারসাম্যহীন বড় ভাই এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার তাগিদে সে মাধবীকে আপন করে নেওয়ার সাহস সঞ্চয় করতে পারেনি|

এই গল্পে লেখক খুব সাবলীলভাবে দেখিয়েছেন সময়ের সাথে সাথে মানুষের অনুভূতির পরিবর্তন হয় না, শুধু পরিস্থিতি বদলে যায়| মাধবী নতুন জীবন পেয়েছে, নতুন সংসার সাজিয়েছে, তথাপি পুরনো দিনের কথা স্মরণ করে তার চোখে-মুখে এক ধরনের বিষণ্নতা নেমে আসে| অন্যদিকে নায়ক আজও তার দায়িত্ববোধের শৃঙ্খলে আবদ্ধ| সময়ের স্রোতে মানুষ ভেসে যায়, স্মৃতিগুলো কেবল মনের গভীরে নোঙর ফেলে থাকে|

‘বাড়ি ফেরা’ গল্পটি আধুনিক নাগরিক জীবনের চরম যান্ত্রিকতা এবং শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক করুণ আখ্যান| গল্পের প্রধান চরিত্র হায়দার আলী একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রৌঢ়| তার জীবনের একমাত্র আনন্দ নাতনি জয়া| জয়ার সাথে তার সম্পর্কটি নিছক নানা-নাতনির নয়, বরং দুই প্রজন্মের এক অদ্ভুত আত্মিক মেলবন্ধন|

গ্রামের শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশে জয়া বেড়ে উঠছিল| হঠাৎ একদিন জয়ার বাবা এসে উন্নত শিক্ষার অজুহাতে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়| এখান থেকেই গল্পের মোড় ঘোরে| গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরের পর জয়ার জীবনে নেমে আসে এক চরম অমানবিক অধ্যায়| শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতে জয়া হয়ে ওঠে এক খাঁচায় বন্দি পাখি| তার বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের মানসিক বিকাশের চেয়ে স্কুলের ফলাফল মুখ্য হয়ে ওঠে| অঙ্কে সাতাইশ নম্বর পাওয়ার অপরাধে জয়ার বাবা তাকে বেল্ট দিয়ে পশুর মতো প্রহার করে| জয়ার মা নীরব দর্শকের মতো সেই দৃশ্য উপভোগ করে, উল্টো মেয়েকেই দোষারোপ করে|

এই গল্পে লেখক আধুনিক অভিভাবকত্বের এক ভয়ঙ্কর রূপ তুলে ধরেছেন| সন্তানকে সফল করার অন্ধ প্রতিযোগিতায় বাবা-মা কীভাবে সন্তানের শৈশবকে গলা টিপে হত্যা করছে, তারই এক জ্বলন্ত দলিল এই গল্প| শহরের যান্ত্রিক জীবনে মানুষের স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসাগুলো কীভাবে শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে, জয়ার প্রতি তার পিতামাতার আচরণ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ| জয়া বারবার গ্রামের সেই স্নেহময় পরিবেশে ফিরে যেতে চায়| তার মন কাঁদে নানা-নানির জন্য| এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন লেখক অত্যন্ত সুনিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন| নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বলেছিলেন, ‘জীবন মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়, জীবন মানে স্মৃতি এবং সেই স্মৃতিকে কীভাবে স্মরণ করা হয়|’ জয়ার কাছে তার গ্রামের স্মৃতিই প্রকৃত জীবন, আর শহরের জীবন এক শ্বাসরুদ্ধকর মৃত্যুপুরী|

দাম্পত্যের শূন্যতা এবং নারীর শৃঙ্খল: ‘ছায়ার আলো’ গল্পে পিওনা আফরোজ দাম্পত্য সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়ানক শূন্যতা ও প্রতারণার চিত্র অঙ্কন করেছেন| গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তিথি তার স্বামী নয়নের সাথে এক অর্থহীন জীবনযাপন করছে| তাদের সংসারে প্রাচুর্য আছে, আবেগ নেই| নয়নের লাম্পট্য এবং অবহেলা তিথিকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে|

তিথির এই নিঃসঙ্গতার মাঝে তার পুরনো বন্ধু জয়রিয়ার স্মৃতি ফিরে আসে| জয়রিয়াও দাম্পত্য জীবনের আরেক ভয়ানক প্রতারণার শিকার| তার স্বামী একজন সমকামী| এই সত্য জানার পর জয়রিয়া যখন তার বাবার কাছে আশ্রয় খোঁজে, সমাজ ও পরিবার তাকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেয়| আমাদের সমাজব্যবস্থায় নারীর প্রতি অবিচারের এটি এক চিরায়ত রূপ| মেয়েরা বৈবাহিক জীবনে চরম নির্যাতনের শিকার হলেও পরিবার ও সমাজ তাদের মানিয়ে নেওয়ার চাপ প্রয়োগ করে|

অন্যদিকে তিথির স্বামী নয়ন তার সকল প্রতারণাকে আড়াল করতে তিথির সাথে এক যান্ত্রিক যৌন সম্পর্ক বজায় রাখে| তিথি সবকিছু জেনেও বাধ্য হয়ে এই সম্পর্ক মেনে নেয়| এটি নারীর এক চরম অসহায়ত্ব| শিক্ষিত ও সচেতন হওয়া সত্ত্বেও তিথি তার সামাজিক সংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে বের হতে পারে না| তার সন্তানরা বিদেশে থাকে| তারাও মায়ের মানসিক যন্ত্রণার চেয়ে বাবার অর্থের প্রতি বেশি নির্ভরশীল| তিথি একসময় অনুভব করে তার জীবনে কারও কোনও প্রয়োজন নেই| সে মুক্তি চায়| এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আধুনিক নারীর স্বকীয়তা খোঁজার এক অদম্য প্রয়াস|

সময়ের নির্মমতা এবং ফেরার আকুতি: ‘গোধূলিমায়ার গন্তব্যে’ গ্রন্থটির নামগল্প| লঞ্চের ডেক থেকে নদীর জলের দিকে তাকিয়ে থাকা এক বিষণ্ন মানুষের আত্মবিশ্লেষণের গল্প এটি| মানুষ কেন শেকড়ের কাছে ফেরে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কথক তার অতীতের স্মৃতিচারণ করেন|

তার মনে পড়ে বাবার কথা| ছুটির দিনগুলোতে বাবা তাকে বাড়ি ফেরার জন্য বারবার ফোন করতেন| তখন এই ফোন করাকে তার কাছে চরম বিরক্তিকর মনে হতো| আজ সে নিজে একজন বাবা| সে বুঝতে পারে সন্তানের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকার যন্ত্রণা কত তীব্র| লেখক এখানে মানবজীবনের এক নির্মম সত্যকে তুলে ধরেছেন| কাছের মানুষদের মূল্য আমরা তখন বুঝতে পারি, যখন তারা চিরতরে হারিয়ে যায়|

গল্পে সোবহান চাচার চরিত্রটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ| সোবহান চাচা একজন নিঃসঙ্গ, স্বপ্নবাজ মানুষ| তিনি কথকের মনে বই পড়ার তৃষ্ণা জাগিয়েছিলেন| আজ সেই কথক লেখক হয়েছেন| সোবহান চাচা তার লেখা বই বুকে জড়িয়ে কাঁদেন| এই কান্না একাকীত্বের, প্রাপ্তির এবং জীবনের ফেলে আসা হিসাব মেলানোর| লঞ্চের ঢেউয়ের সাথে কথকের স্মৃতির ঢেউগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়| এই গল্পের দার্শনিক বোধ পাঠককে নিজের জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়|

বইটির একটি অংশে (শিরোনামহীন খণ্ডাংশে) লেখক সমাজের এক ভয়াবহ অন্ধকার রূপ উন্মোচন করেছেন| একজন সহায়-স¤^লহীন নারী তার মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে চাচার বাড়িতে আশ্রয় নেয়| সেই আশ্রয়দাতাই একরাতে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়|

এই চরম মুহূর্তে নারীটি এক প্রবল মানসিক দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হয়| সে প্রতিবাদ করলে তাকে এবং তার মেয়ে রেশমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে| আবার এই জঘন্য অত্যাচার মেনে নিয়ে সেখানে থাকাও তার পক্ষে অসম্ভব| পরিশেষে সে এক নিষ্ঠুর ও হৃদয়বিদারক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে| মেয়ের নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং আর্থিক নিশ্চয়তার কথা ভেবে সে নিজের মাতৃত্বের অধিকার বিসর্জন দেয়| ঘুমন্ত রেশমাকে চাচার বাড়িতে রেখে সে গভীর রাতে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়|

মাতৃত্বের এমন আত্মত্যাগের দৃশ্য সাহিত্যে বিরল| লেখক এখানে কোনো মেলোড্রামার আশ্রয় নেননি| অত্যন্ত নির্লিপ্ত বর্ণনায় তিনি এক মায়ের বুকের চাপা কান্নাকে পাঠকের চেতনায় প্রবিষ্ট করিয়েছেন| সমাজের চোখে হয়তো নারীটি পালিয়েছে, তার ভেতরের রক্তক্ষরণের খবর কেউ রাখেনি| নারীদের জন্য নির্ধারিত তথাকথিত ‘নিরাপদ আশ্রয়’গুলো অনেক সময় কীভাবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়, এই গল্প তার এক অকাট্য প্রমাণ|

অভাবের তাড়না এবং খাঁটি প্রেমের উপাখ্যান: ‘মায়াবী আগুন’ গল্পে নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের অর্থনৈতিক সংগ্রাম এবং এর মাঝেও টিকে থাকা ভালোবাসার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে| সবুজ নামের এক যুবক ঢাকায় একটি ছোট চাকরি করে| বাবার অসুস্থতার সময় দুলাভাইয়ের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে সে চরম অপমানের শিকার হয়|

অর্থের কাছে মানুষের সম্পর্কগুলো কতটা ঠুনকো হয়ে যায়, দুলাভাইয়ের নিষ্ঠুর আচরণের মাধ্যমে লেখক তা স্পষ্ট করেছেন| সবুজের নিজের বোন তার স্বামীর কাছে অপমানিত হয় ভাইয়ের কারণে| সবুজ নিজেকে এক চরম ব্যর্থ ও অপদার্থ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে| জীবনের এই ঘোর অমানিশায় সবুজের পাশে এসে দাঁড়ায় তার প্রেমিকা মায়া|

মায়া দরিদ্র ঘরের মেয়ে| তার কাছে অর্থ নেই, আছে এক বুক খাঁটি ভালোবাসা| সে সবুজের সকল দুশ্চিন্তা নিজের কাঁধে তুলে নিতে চায়| এই স্বার্থপর পৃথিবীতে মায়ার মতো নিঃ স্বার্থ চরিত্রগুলোই মানুষের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন| লেখক এখানে দারিদ্র্যের কদর্য রূপের পাশাপাশি ভালোবাসার এক ঐশ্বরিক স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিয়েছেন|

‘দহন শেষে’ গল্পটি এক মিথ্যা অপবাদে ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হওয়া এক মায়ের গল্প| ঝড়ের রাতে এক আগন্তুক দরজায় কড়া নাড়ে| মা দরজা না খুললেও পরদিন সকালে গ্রাম্য সালিশে তাকে চরিত্রহীনা আখ্যা দেওয়া হয়| চেয়ারম্যানের নির্দেশে সমাজচ্যুত হয়ে সেই মাকে এক কাপড়ে সন্তানসহ গ্রাম ছাড়তে হয়|

এই গল্পে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার এক ভয়ানক ত্রুটি তুলে ধরা হয়েছে| পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর সম্মান কতটা ঠুনকো এবং ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা কীভাবে বিচারের নামে প্রহসন করে, তা এখানে সুস্পষ্ট| বহু বছর পর সন্তান যখন সেই গ্রামে ফিরে আসে, তার মনে পড়ে সেই রাতের কথা| অতীত আর বর্তমানের এই সংযোগ পাঠককে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায়|

পিওনা আফরোজ মূলত একজন আবৃত্তিশিল্পী ছিলেন| এই শিল্পমাধ্যমের প্রভাব তাঁর গদ্যে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান| তাঁর বাক্যের গঠনে এক ধরনের অন্তর্নিহিত ছন্দ রয়েছে| তিনি কঠিন এবং ভারী শব্দের পরিবর্তে অত্যন্ত প্রাঞ্জল, কথ্য ও সাবলীল ভাষা ব্যবহার করেছেন|

গল্পগুলোর সবচেয়ে বড় গুণ হলো এর পরিমিতিবোধ| লেখক কোথাও আবেগের আতিশয্যে ভেসে যাননি| চরিত্রগুলোর দুঃখ, কষ্ট, হতাশা বোঝাতে তিনি দীর্ঘ ব্যাখ্যার আশ্রয় না নিয়ে ছোট ছোট ঘটনার মাধ্যমে তাদের মানসিক অবস্থা ফুটিয়ে তুলেছেন| জয়ার বাবার বেল্ট দিয়ে প্রহার করার দৃশ্য কিংবা রাতের অন্ধকারে চাচার লালসার শিকার হওয়ার দৃশ্যগুলো লেখক নিয়ন্ত্রিত ভাষায় বর্ণনা করেছেন| এই পরিমিতিবোধই গল্পগুলোকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে এসেছে|

তাঁর চরিত্রগুলো সাদাকালো নয়, বরং ধূসর| মানুষের ভেতরে ভালো এবং মন্দের সংমিশ্রণ থাকে, পিওনা আফরোজের চরিত্রগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়| তারা ভুল করে, অনুতপ্ত হয়, সমাজের ভয়ে গুটিয়ে থাকে, আবার সময়বিশেষে বিদ্রোহও করে|

লেখক জীবনের যে গন্তব্যের কথা বলেছেন, তা মূলত মানুষের আত্মানুসন্ধানের গন্তব্য| প্রতিটি চরিত্রই কোনো না কোনোভাবে নিজেদের খুঁজছে| কেউ খুঁজছে হারানো শৈশব, কেউ খুঁজছে মুক্তির স্বাদ, আবার কেউ খুঁজছে একটুখানি মাথা গোঁজার ঠাঁই|

বইটির পাঠ অভিজ্ঞতা সাহিত্যের যেকোনো একনিষ্ঠ পাঠককে ভাবনার জগতে আলোড়িত করবে| পিওনা আফরোজ প্রমাণ করেছেন, চারপাশের সাধারণ ঘটনাগুলোর মাঝেই লুকিয়ে থাকে সাহিত্যের অমূল্য উপাদান| প্রয়োজন শুধু দেখার মতো দৃষ্টি এবং অনুভব করার মতো সংবেদনশীল মন|

গোধূলিমায়ার গন্তব্যে| পিওনা আফরোজ| প্রকাশক: বিদ্যা প্রকাশ| প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ| ফেব্রুয়ারি ২০২৩| মূল্য ; ২২৫ টাকা|


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত