সংবাদ

সাহিত্য

জাতীয় কবিকে কতটুকু জানি, কতটুকু ধারণ করি

জাতীয় কবি একটি দেশের অন্যতম জাতীয় পরিচিতি, তার আলোকবর্তিকা, অনুপ্রেরণা ও পথনির্দেশক। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেরই জাতীয় কবি আছে এবং জাতীয় কবির বিশেষ মর্যাদা ও রাষ্ট্রাচার সমুন্নত রাখা হয়। অনেক দেশেই সাংবিধানিকভাব জাতীয় কবির স্বীকৃতি, মর্যাদা ও রাষ্ট্রাচার সুনিশ্চিত করা হয়। পৃথিবীর বহু দেশের মুদ্রায় তাদের জাতীয় কবির ছবি ও কবিতার উদ্ধৃতি রয়েছে। দেশ ও জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে জাতীয় কবির ভূমিকা আলোকবর্তিকার মতো। বাংলাদেশ তার জাতীয় কবিকে কোথায়, কী অবস্থায় রেখেছে সে বিষয়ে একটু নজর দেওয়া আবশ্যক।প্রথমত, কাজী নজরুল ইসলাম যে বাংলাদেশের জাতীয় কবি এ সংক্রান্ত সরকারি কোনো গেজেট প্রজ্ঞাপনই ছিল না। তাঁর গান গেয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাঁর জন্মদিনে তাঁর গান গেয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র উদ্বোধন হয়েছে, স্বাধীনতার পর জাতীয় কবির মর্যাদায় তাঁকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছে, তাঁর জন্য সরকারি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেই বাড়িতে প্রতিদিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে, আবার সেই বাড়ি থেকে ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে তাঁকে সরিয়ে পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কেবিনে ঠাঁয় দেওয়া হয়েছে এবং সেই কেবিন থেকেই ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট পরপারে যাত্রা করেন। ঢাকায় স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জানাজা হয়েছে তাঁর, তিন বাহিনীর প্রধান, বিডিআর প্রধানসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তাঁর লাশ বহন করেছেন, বাংলাদেশে প্রবর্তিত প্রথম একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক তাঁকে প্রদান করা হয়েছে, তাঁর অমর স্মৃতি রক্ষা, তাঁর জীবন, সাহিত্য, সংগীত ও সামগ্রিক অবদান সম্পর্কে গবেষণা পরিচালনা, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রকাশনা ও প্রচার এবং তাঁর ভাব-মূর্তি দেশ-বিদেশে উজ্জ্বলরূপে তুলে ধরার লক্ষ্যে সরকার ১৯৮৫ সালে নজরুল ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে, এসব যেমন সত্য, আবার এ-ও সত্য যে, তাঁর প্রতি অনেক অবিচারও করা হয়েছে সব সময়, এমনকি তাঁর জীবদ্দশায়ও।তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার নজরুলের প্রতি অবিচার করেছে এবং সেটি করাটাও তাদের জন্য স্বাভাবিক ছিল। কারণ, নজরুল ছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণাকারী (১৩ অক্টোবর ১৯২২, ধূমকেতু পত্রিকা)। নজরুলের মিশন ও লড়াই ছিল সব ধরনের বৈষম্য, অত্যাচার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। সে কারণে পুঁজিবাদী, জালিম, গোঁড়া, অত্যাচারী শাসক, জমিদারসহ অনেকেই তাঁর বৈরি পক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর সময় থেকেই। কেউ হয়তো সরাসরি তাঁকে প্রতিহত করতে চেয়েছে, কেউ হয়তো তাঁর বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডা সৃষ্টি করার জন্য রীতিমতো পত্রিকা বের করেছে (যেমন— শনিবারের চিঠি, সজনীকান্ত দাস), আবার কেউ কেউ হয়তো সুকৌশলে তাঁর বিরুদ্ধাচারণ করেছে। এরা সবাই কেবল তাঁর প্রতিই অবিচার করেনি, তারা অবিচার করেছে মানব জাতির প্রতি। কারণ নজরুল ছিলেন মানব জাতির মুক্তির রাহবার। ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’— মানুষের জন্য সাহিত্যে এমন বলিষ্ঠ উচ্চারণ নজরুল ছাড়া আর কে করেছেন? তিনি ছিলেন ‘বিশ্বতোরণে বৈজয়ন্তী মানববিজয়কেতন’। পৃথিবীর প্রত্যেক ব্যথিত মানুষের ব্যথা তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন, সকলের অধিকার আদায় ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে একটি অভিন্ন সুন্দর মানব পরিবার গড়তে চেয়েছেন:‘সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসিএক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী।একজনে দিলে ব্যথা—সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।একের অসম্মাননিখিল মানব-জাতির লজ্জা-সকলের অপমান!’আর এ কারণেই ইংরেজ সাহিত্য সমালোচক উলিয়াম রাদিচে নজরুল সম্পর্কে বলেছেন:‘He was non-communal, and in this he compares well with Tagore who, despite his bid for universality, conspicuously failed to incorporate Muslim tradition into his writing. Nazrul will be found wherever poetry has been used to fight against oppression... his appeals were general' (Sampling the poetry of Nazrul: William Radice, Nazrul: An Evaluation, Nazrul Institute (2000), page 102)মানব জাতির বিশ্বস্ত ও দায়িত্বশীল কাণ্ডারি নজরুল নিজেও এজন্যেই বলতে পেরেছেন— ‘যাহারা আমার বিচার করিয়াছে, ভুল করিয়াছে জানি’। নজরুলের প্রতি অবিচার তখনও হয়েছে, পরেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল বাদ দিয়ে কেবল বাংলাদেশ আমলের কয়েকটি উদাহরণ দেব।চিরস্বাধীন কবি বাঙালি জাতির একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুনেছেন এভাবে: ‘নমঃ নমঃ নমো/বাংলাদেশ মম/চির-মনোরম/চির মধুর।/... এই দেশের মাটি/জল ও ফুলে ফলে/যে রস যে সুধা/নাহি ভূমণ্ডলে,/ এই মায়ের বুকে/ হেসেখেলে সুখে/ঘুমাব এই বুকে/স্বপ্নাতুর॥’কবির স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং স্বাধীন দেশেই তিনি চিরশয্যা গ্রহণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরম সৌভাগ্য যে, কাজী নজরুল ইসলামের চিরশয্যার জায়গাটি বিধাতা সেখানে নির্ধারণ করেছেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ভাষায়: ‘বিধাতার এক সুর/করেছিল বুঝি পথ ভুল/তারই নাম জানি নজরুল।/ মলিন মাটির দেশে সে সুরের দেখেছি আগুন/দিকে দিকে অনির্বাণ শিখা/তাহারে বরিতে আজ মহাকাল আপনার হাতে/আঁকে জয়টিকা।কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বিধাতার সেই সুর নজরুলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো মূল্যায়ন করতে পারেনি। তাঁকে নিয়ে সেখানে কতটুকু আলোচনা, পর্যালোচনা, গবেষণা হয়, সে প্রসঙ্গটি তো রয়েছেই। সেখানকার নজরুল চেয়ার, নজরুল গবেষণা কেন্দ্র কী অবস্থায় আছে, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করা যাবে। এখন পর্যন্ত নজরুলের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন বা কোনো স্থাপনার নামকরণ করা হয়নি। নজরুল সমাধিসৌধ নামটি এককভাবে তাঁর নামে না রেখে ২০০৯ সালে তা ভাগাভাগি করা হয়েছে এভাবে: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমাধিসৌধ, শহীদ বুদ্ধিজীবী সমাধিসৌধ ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সমাধিসৌধ। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে, এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সমাধি রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ)-এর মাজারেও কিন্তু অনেক বড় বড় ব্যক্তির কবর রয়েছে। কিন্তু ঐ স্থানটির নাম কেবল হজরত শাহজালাল (রহ)-এর নামেই। নামকরণের এটিই স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস। কিন্তু নজরুল সমাধিসৌধের নাম এককভাবে নজরুলের নামে রাখা হয়নি। এর কারণ, নজরুলের উচ্চতা আমরা পরিমাপ করতে ব্যর্থ হয়েছি। নজরুলকে অবমূল্যায়নের মূল কারণও এটিই।নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশে সপরিবারে নিয়ে আসা হয় ১৯৭২ সালের ২৪ মে খ্রি.। কিন্তু তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়েছে ১৯৭৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ার খ্রি.। কেন এত বছর সময় নিতে হলো? ধানমণ্ডির কবি ভবনে কবি শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশ ভালোই ছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫-এর জুলাই মাসে তাঁকে স্থায়ীভাবে কেন হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হলো? কবির ধানমণ্ডি বাসভবনটি কেন ভেঙে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো? আমরা যুক্তরাজ্যে গেলে শেক্সপিয়ারের বসতবাড়ির দেখতে যাই, কিন্তু আমাদের জাতীয় কবির বসতবাড়ি আমরা গুঁড়িয়ে দিয়েছি!শুধু নজরুলের বসতবাড়ি নয়, বাংলাদেশে নজরুলের কোনো স্মৃতিচিহ্নই ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। ত্রিশালে কিছু কাজ হয়েছে। অন্য কোথাও কোনো স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা হয়নি। এখনও উদ্যোগ নিলে হয়তো কিছু উদ্ধার/রক্ষা করা যাবে। কিন্তু সে উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়।একটি ছোট্ট উদাহরণ দেব।ঢাকার কারওয়ান বাজারে সার্ক ফোয়ারা সংলগ্ন বর্তমানে মেট্রো স্টেশনের পশ্চিম গেটের সাথে ব্রাক ব্যাংকের (বোরাক জহির টাওয়ার) সামনে একটি নজরুল স্মৃতিফলক ছিল। নজরুলের জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে শাহবাগ ও কারওয়ানবাজারে দু’টি ফলক স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু টাওয়ারের নির্মাণ কাজের সময় নজরুল স্মৃতিফলকটি ভেঙে ফেলা হয়। এটি ভেঙে ফেলার পর অনেক বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ভবন মালিক নজরুল স্মৃতিফলকটি পুনঃস্থাপন করেনি। নজরুল ফলক ও স্মৃতিচিহ্নসমূহের প্রতি এমন অবজ্ঞা ও অবহেলার অসংখ্য নজির রয়েছে।১৯৭৪ সালে নজরুলের জীবদ্দশায় বাংলা একাডেমি বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করেছিল। সেখানে নজরুলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমনকি তাঁর নামও নেয়া হয়নি। পরে গণপ্রতিবাদের মুখে দ্বিতীয় দিন নজরুলকে সভায় আনা হয়। ২০১৮ সালের ১৩-১৫ জানুয়ারি বাংলা একাডেমি আবারও ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন’-এর আয়োজন করে। সেখানেও নজরুলের নাম নেয়া হয়নি।পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ হলে তার জাতীয় কবিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেই এ ধরনের আয়োজন করত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সকল অনুষ্ঠান শুরু করত জাতীয় কবির গান/কবিতা দিয়ে। করি না কেবল আমরা!সিলেবাসে নজরুলকে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। এমনকি নজরুল ঠিকভাবে না পড়েও কিংবা নামমাত্র পড়েই বাংলা সাহিত্যে অনার্স/মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করা যায়। নজরুলের মানবমুক্তির দর্শন আমাদের দর্শন বিভাগে পড়ানো হয় না। অথচ কোনো কোনো কবি-সাহিত্যিকের দর্শন কেবল দর্শন বিভাগেই নয়, এমনকি সমাজিবিজ্ঞান বা অন্য বিভাগেও পড়ানো হয়। নজরুল ছিলেন গণমুখি গণমাধ্যমের পথিকৃৎ। চলচ্চিত্র, নাটক, মঞ্চনাটক, বেতার— এ সব ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অতুলনীয়। অথচ তাঁর এই দিকগুলো সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টসমূহেরর সিলেবাসে রীতিমতো অনুপস্থিত। গণমাধ্যমেও তিনি মারাত্মক অবহেলার শিকার।নজরুল স্মৃতিধন্য ঢাকার ধানমণ্ডি লেক। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। তার বাসভবন এই লেকের পাশে ধানমণ্ডি ২৮ নম্বর সড়কে। লেকের আলো-বাতাস-জল কবির স্মৃতির সাক্ষ্য প্রদান করে। তাই এই লেকটির নাম নজরুল লেক বা নজরুল সরোবর হওয়াটাই বাঞ্চনীয়— যা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।বাংলাদেশে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে রবীন্দ্রনাথের নামে। এগুলো হলো— ১. রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজাদপুর, কুষ্টিয়া; ২. রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা এবং ৩. রবীন্দ্র মৈত্রি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।অথচ বাংলাদেশের জাতীয় কবির নামে বিশ্ববিদ্যালয় আছে একটি। কিন্তু সেটিও সাধারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়। রবীন্দ্র চর্চার জন্য ভারতের শান্তিনিকেতনের মতো করে বাংলাদেশে নজরুল চর্চা ও গবেষণার জন্য বিশেষায়িত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ১০০ নম্বর নজরুল স্টাডি পড়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা কতটুকু আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতার সাথে পড়ানো হচ্ছে তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।নজরুল কেবল বাংলাদেশের নন। ৬ এপ্রিল ১৯৪১ খ্রি. কলকাতার মুসলিম ইন্সটিটিউট হলে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির রজত জয়ন্তী উৎসবের সভাপতি হিসেবে জীবনের শেষ অভিভাষণে কবি বলেছিলেন, ‘আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশের, এই সমাজেরই নই, আমি সকল দেশের সকল মানুষের।’ তিনি বিশ্বের কবি, তিনি ‘মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়’। কিন্তু তাঁকে আমরা অনুবাদের মাধ্যমে এখনও বিশ্ববাসীর কাছে নিয়ে যেতে পারিনি।নজরুলকে ঠিকভাবে না পড়ার কারণে, না বোঝার কারণে আমরা তাঁর প্রতি সুবিচার করতে পারছি না এবং প্রকারান্তরে আমরা নিজেদেরও প্রতিও সুবিচার করছি না। আমরা কথায় কথায় অমুকের উদ্ধৃতি দেই, তমুকের উদ্ধৃতি দেই, কিন্তু নজরুলকে উদ্ধৃত করতে ব্যর্থ হই। অতি সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ দেব।২১ জুলাই ২০২৫। রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনের সামনে বিধ্বস্ত হয় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমান। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়তে থাকে আমাদের শিশুরা। সেই মহাদুঃখভারাক্রান্ত ঘটনায় শোক প্রকাশের ভাষা আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমাদেরকে ভাষা দিয়েছেন নজরুল। প্রতিটি রক্তকণিকায় তখন বেজে উঠেছে নজরুলীয় বেদনার সুর:ঝরল যে-ফুল ফোটার আগেই তারি তরে কাঁদি, হায়!মুকুলে যার মুখের হাসি চোখের জলে নিভে যায়।।কিংবা,ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হ’য়ে আমার গানের বুলবুলি—করুণ চোখে চেয়ে আছে সাঁঝের ঝরা ফুলগুলি।।কেবল দুঃখ-কষ্ট, বিরহ-বেদনায় নয়, বিপ্লব, সংগ্রাম, প্রেম, ভালোবাসা, আনন্দ, উদ্দীপনা— সবর্ত্রই নজরুল অনিবার্যভাবেই প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তবুও অনেকে নজরুলকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে উদ্ধৃত করেন এবং এভাবে ‘অনেকটা জাতে ওঠার চেষ্টা’ করেন— যা এক ধরনের সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্ব বৈ কিছু নয়।তবে নজরুল-চেতনায় উদ্দীপ্ত তারুণ্যের বাঁধভাঙা জোয়ার যখন আসে, যখন তাদের কণ্ঠে ঘোষিত হয় ‘ভূতেরা চাহুক গোর ও শ্মশান, আমরা চাহিব গুলবাহার!’— তখন নতুন সূর্যোদয়কে আর ঠেকায় কে? এ বাঁধভাঙা জোয়ার আমরা দেখেছি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে, পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে এবং ’২৪-এর ছাত্র গণঅভ্যুত্থানসহ আমাদের অধিকার আদায়ের সকল লড়াইয়ে।কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, তারপরও নজরুলের সঠিক মূল্যায়ন হয় না। আবার ফিরে আসে ‘ভূতেরা’ আবার ফিরে আসে মানবতার শত্রুরা।তবে একটি আশার কথা হলো, বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকার ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তারিখে জাতীয় কবির গেজেট প্রকাশ করেছে এবং ১৯৭২ সালের ২৪ মে থেকে ভূতাপেক্ষভাবে তা কার্যকর করেছে। ঐতিহাসিক এ কাজের সাথে আমার সম্পৃক্ততা ছিল কেবল নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের একজন সদস্য হিসেবেই নয়, বরং আপাদমস্তক একজন নজরুল-অনুরাগী হিসেবে।কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবির স্বীকৃতি সংক্রান্ত গেজেট কেন এতদিন হয়নি? যিনি ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন; ব্রিটিশ-ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন; যিনি একটি আত্মঘাতি, ঘুমন্ত জাতিকে দেশপ্রেমের চেতনায় জাগিয়ে তুলেছেন; দেশ, জাতি ও বিশ্বমানবতার জন্য যিনি নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছেন; যিনি আমাদের মুক্তি ও অধিকার আদায়ের সকল লড়াইয়ের রাহবার ও তুর্যবাদক, সেই মহামানবের প্রতি কেন আমাদের অবজ্ঞা ও অবহেলা?এ প্রশ্নের উত্তর হতে পারে দু’টি। এক, নজরুলকে বুঝতে না পারা। দুই, নজরুলের আদর্শ ধারণ করার যোগ্যতা ও সদিচ্ছার অভাব।‘নজরুলকে বুঝতে পারলে আমরা মহামানব বা অতি-মানবে পরিণত হব’— এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন বিজ্ঞানাচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে (বর্তমান নাম ‘কফি হাউজ’) বাঙালি জাতি তাঁকে জাতীয় কবি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নিয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির দীর্ঘ ভাষণে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’-কে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠতম জাতীয় সঙ্গীত আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, ‘নজরুল একটি জ্যান্ত মানুষ। তাঁর স্বপ্ন গোটা বাঙালি জাতির স্বপ্ন।’সেই নজরুলকে আমরা আসলেই কতটুকু জানি বা ধারণ করি?

জাতীয় কবিকে কতটুকু জানি, কতটুকু ধারণ করি