সংবাদ

মৃত্যুবার্ষিকী শ্রদ্ধাঞ্জলি

মনে মনে আমি প্রতিষ্ঠানবিরোধী —শামসুর রাহমান


সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ওবায়েদ আকাশ
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ওবায়েদ আকাশ
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৮ এএম

মনে মনে আমি প্রতিষ্ঠানবিরোধী  —শামসুর রাহমান
শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর ১৯২৯ - ১৭ আগস্ট ২০০৬)


[রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী তিরিশের আধুনিক বাংলা কবিতার স্বাতন্ত্র্য এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। অন্যদিকে তিরিশ-পরবর্তী বাংলা কবিতায় নতুনত্ব প্রতিষ্ঠায় পঞ্চাশের দশকের হাতেগনা যে কজন কবি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন; কবি শামসুর রাহমান তাঁদের অন্যতম। গত ১৭ আগস্ট ছিল তাঁর ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী। কেউ কেউ মনে করেন শামসুর রাহমান গত শতকের পঞ্চাশের দশকের প্রধান কবি। আবার অনেকের রয়েছে দ্বিমতও। শামসুর রাহমানের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তিনি বাঙালির একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে প্রচুর কবিতা লিখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় একশ’। ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে তাঁর জন্মদিনকে ঘিরে “সংবাদ সাময়িকী”র পক্ষ থেকে এ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়।] 

ওবায়েদ আকাশ : নিজের জন্মদিন আপনাকে কীভাবে আলোড়িত করে।

শামসুর রাহমান : এক অর্থে জন্মদিন আমাকে আলোড়িত করে, যারা আমাকে ভালবাসে, যেমন আমার পরিবারের লোকজন বা যারা আমার কবিতা পড়ে বা শুভাকাঙ্ক্ষী তারা আমাকে শুভেচ্ছা জানায়। লুকাবো না, আমার কাছে ভালই লাগে। আর এক অর্থে আমার খারাপ লাগে এই ভেবে, আমি মৃত্যুর দিকে আর এক বছর এগিয়ে গেলাম। কিন্তু আনন্দের ভাগটা বোধহয় একটু বেশিই।

ও. আ. : জন্মদিন পালনের প্রথা সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?

শা. রা. : প্রথা, আমার মনে হয় এটা খারাপ না, ভাল। আমাদের জীবনে তো ভাই ভাল দিন পালনের বিশেষ একটা সুযোগ নেই, সেই অর্থে আমার জন্মদিনে কেউ এসে শুভেচ্ছা জানাল বা ফুল দিয়ে অভিবাদন জানাল, এটা ভালই লাগে। আমার মনে পড়ে, কয়েক বছর আগে আমাদের পাড়ার এক ছোট্ট মেয়ে কিছু ফুল এনে আমার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাল। হয়তো তার ফুল কেনার সামর্থ্য নেই, সে গাছতলায় কুড়িয়ে পেয়েছে, তার নাম আমি একটা কবিতায় উল্লেখ করেছি, সেটা কাগজেও ছাপা হয়েছে। এটা যে কত বড় একটা পাওয়া, এর কোনো তুলনা হয় না (এ সময় শামসুর রাহমান কেঁদে ফেলেন) মানুষের ভালবাসা যে কত বড় পাওয়া! এটা আমি পেয়েছি, ভবিষ্যতে হয়তো না-ও পেতে পারি।

ও. আ. : ইদানীং যতবারই আপনার বাসায় আসছি, আপনার সঙ্গে দেখা করছি, প্রায়ই বলছেন, আপনি আর বুঝি বেশিদিন বেঁচে যেতে পারবেন না। মৃত্যুকে কি ভয় করেন? 

শা. রা. : মৃত্যুর কথা তো ভুলে থাকতে চাই। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়। এক হিসেবে ভয় তো এক ধরনের আছেই। সেই ভয়টা আসলে সেই অর্থে নয়, কারণ একদিন আমি মরে তো যাবোই। কিন্তু আমার যে কোন চেতনাই থাকবে না, আজকে আমি যাদের না দেখলে থাকতে পারি না, যাদের না দেখলে খারাপ লাগে, তাদের সাথে কোনো দিন দেখাই হবে না— এগুলো ভাবলে আমার খারাপ লাগে। ভয় কিনা জানি না, তবে লাগেই তো। ভয় মানে এ অর্থে ভয়।

ও. আ. : রবীন্দ্রনাথ তো বলেছেন, ‘সত্য যে কঠিন/কঠিনেরে ভালবাসিলাম’ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তার সঙ্গে আপনার চিন্তার পার্থক্য কোথায়?

শা. রা. : আমি ঠিক মৃত্যুকে ভালবাসব, এত বড় সাহস আমার নেই। মরতে আমি চাই না। রবীন্দ্রনাথও মরতে চাইতেন বলে মনে হয় না। তবে উনি এত বড়মাপের মানুষ, মৃত্যুকে তিনি ভালবাসতেন কিনা আমি জানি না, এবং ওনার ভেতরে কী মনে হয়েছে আমি বলতে পারি না।

ও. আ. : প্রচলিত চিন্তাচেতনার সঙ্গে আপনার মিল বা অমিল কোথায়?

শা. রা. :  সেটা অবশ্য আমি ভেবে দেখিনি। আমি ওইভাবে চিন্তাও করি না। সত্যি কথা বলতে কী, আমি তো এক অর্থে খুবই সাধারণ মানুষ; সেই অর্থে সবাই যা মনে করে, হয়তো আমিও তাই মনে করি। কিংবা করি না। অনেকের সঙ্গে হয়তো মেলে না, এ হতে পারে। এটা বলা মুশকিল আমার পক্ষে, কারণ সবার কথা তো আমি জানি না।

ও. আ. : তাহলে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, প্রতিদিন নিয়ম যে আমাদের তাড়িত করে, আপনি সেভাবেই চলেন? বা আপনি একটা নিয়মের মধ্যেই থাকতে চান?

শা. রা. : আমি তো যা চলছে তা চাই না। আমার দেশের অবস্থা বা দেশ এখন যেভাবে চলছে, সেভাবে আমি চাই না। আমার খুব খারাপ লাগে। মাঝে মাঝে আমার বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মেনে নিতে হচ্ছে। মেনে নিতে হচ্ছে মানে কিছু করতে পারছি না। যারা দেশের এ অবস্থা করছে, তাদের ঘৃণা করছি। কিন্তু মানুষকে ঘৃণা করা তো খারাপ, এক অর্থে। আমার তো ভালবাসা উচিত সবাইকে, কিন্তু ভালবাসতে তো পারছি না। যারা অত্যাচার করে মানুষকে, এই যে মৌলবাদীরা, যারা ধর্মের কথা বলে মানুষকে অত্যাচার করে, তাদের আমি ঘৃণা করি, ভালবাসতে পারি না। যারা ধর্ম বিশ্বাস করেন, আমার মা ধর্ম বিশ্বাস করতেন, নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন। আমার মা তো খুব ভাল মানুষ ছিলেন। আমি আমার মা বলে বলছি না, আমার মা ভাল না হলে বলতাম না। আমার মায়ের কথা উল্লেখই করতাম না। আমি আমার মায়ের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। একটি ঘটনা বলছি। আমি তখন ছোট, খুব ছোট নয়, ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়ি, আমার বাসার যে কাজের মেয়ে, আমার চেয়ে একটু বড়, দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার আগেই সে ঘুমিয়ে পড়েছে। দেখি যে, আমার মা রান্নাঘরে কাজ করছেন, অথচ তাকে জাগাচ্ছেন না। আমি মাকে বললাম, আপনি কাজ করছেন, ও ঘুমাচ্ছে, আমি ওকে জাগিয়ে দিই। মা বললেন, না, ও ঘুমিয়ে পড়েছে, ঘুমাক। আমার কাজ করলে কিচ্ছু হবে না। এ মাত্র একটা উদাহরণ দিলাম। এরকম আরো ঘটনা আছে। আমি অনেক সময় আমার মায়ের কাছে বসে বসে ধর্মের বিরুদ্ধে সামান্য কথা বলেছি, তিনি হেসে হেসে বলতেন, ও সব বলো না। মানে, তিনি ধর্ম বিশ্বাস করলেও খুব সহনশীল ছিলেন। আর আমাদের ধর্মীয় মৌলবাদীরা ঠিক এর বিপরীত চরিত্রের। 

ও. আ. : আপনি বা আমরা একটি রাষ্ট্রে বসবাস করি। রাষ্ট্র একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানে বসবাস করে কি প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করা সম্ভব?

শা. রা. : করেছি তো অনেক। কোনো কোনো সময় তো করেছি।

ও. আ. : প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করে বা নিয়ম ভেঙে জীবনযাপনে সুবিধা কী?

শা. রা. : প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করে সুবিধা হয় না, বরং অসুবিধা হয়। আবার সব সময় তো করি না।

ও. আ. : যুগে যুগে বিভিন্ন আন্দোলন, মতবাদ, চিন্তা পদ্ধতি সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এ সবই ঘটেছে প্রচলিত ব্যবস্থার বিরোধিতা করে, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। একা যখন কেউ প্রতিষ্ঠান বা প্রচলিত ব্যবস্থার বিরোধিতা করে, তখন তাকে আপনি কী উপদেশ দেবেন?

শা. রা. : একা যখন কেউ প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করে, সে তো বীর, তার জন্য কোনো উপদেশের দরকার নেই।

ও. আ. : আপনি কি মনে করেন আপনি অ-প্রাতিষ্ঠানিক জীবনযাপন করেন?

শা. রা. : প্রতিষ্ঠানকে তো আমি পুরোপুরি অস্বীকার করছি না। কিছু কিছু করি না, কিছু কিছু করি। অ-প্রাতিষ্ঠানিক তো আর একেবারে থাকতে পারছি না। তবে আমি অনেকটাই প্রতিষ্ঠানবিরোধী। অনেকটাই। এটা আমার লেখাতেও আছে। জীবনেও আছে। আমি জাহির করি না, আমি প্রতিষ্ঠানবিরোধী। মনে মনে আমি প্রতিষ্ঠানবিরোধী।

ও. আ. : কবিতার পাশাপাশি মূলত প্রতিষ্ঠানই আপনাকে এতদূর নিয়ে এসেছে; আপনি কী বলেন?

শা. রা. : আমি নিমকহারামি করবো না, যদি নিয়ে এসে থাকে, এসেছে; আর যদি নিয়ে না আসে, তো আসেনি।

ও. আ. : প্রতিষ্ঠান বা এস্টাবলিশমেন্ট আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

শা. রা. :  প্রতিষ্ঠান আমাকে যে খুব প্রভাবিত করেছে তা না। কিন্তু আমার উপকার তো করেছে। আমি তো প্রতিষ্ঠানে কাজ করে মাইনে পেয়েছি। ওখানে অনেক বন্ধু অর্জন করেছি। এটা তো কম না।

ও. আ. : ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে কবিতা লিখছেন। আপনার কবিতা সম্বন্ধে আপনি জানেন। আপনার কবিতা তরুণরা কতদিন পাঠ করবে বলে আপনি আশাবাদী?

শা. রা. : আমার কবিতা সম্বন্ধে আমি একেবারেই জানি না। আর তরুণরা আদৌ পাঠ করবে কিনা তা-ও জানি না। তারা পাঠ করতে পারে, না-ও করতে পারে।

ও. আ. : কেউ কেউ বলেন, এখন আর আপনার কবিতা লেখার দরকার নেই। তাদেরকে আপনি কী বলবেন?

শা. রা. : কিছুই বলবো না। আমি যদি লিখতে পারি লিখবো, না লিখতে পারলে লিখবো না।

ও. আ. : বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কবিদের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?

শা. রা. : কবির প্রথম ভূমিকা হওয়া উচিত ভাল কবিতা লেখা। তিনি পারুন না পারুন, চেষ্টা করা উচিত। 

ও. আ. : আপনি কি এই ভূমিকায় আছেন?

শা. রা. : আমি তো চেষ্টা করেই যাচ্ছি, সব সময় আমি সাকসেসফুল হচ্ছি, তা তো দাবি করছি না। আমি তো লিখছি, এবং তোমরা জানো আমি কেমন লিখছি। তোমাদের ভাল লাগলে ভাল লিখছি, খারাপ লাগলে খারাপ লিখছি। তবে এটাও আমার মধ্যে কাজ করে, এটা বুঝতে পারি, আমি কতটা ভাল লিখছি, আর কতটা খারাপ লিখছি। আর নিজের কবিতা সম্পর্কে নিজে বিচার করাটা খুব মুশকিল। অনেক ভাল ভাল কবিও তাঁদের নিজের লেখার বিচার করতে পারেন না।

ও. আ. : সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতা বদলায়। স্বাভাবিক। সমকালীন কবিতা কি বিশেষভাবে বদলেছে?

শা.রা. : এটা আমার পক্ষে বলা মুশকিল। এটা আমি বলতে পারবো না।

ও. আ. : কেন, আপনি কি তরুণদের কবিতা পড়েন না?

শা. রা. : পড়ি, হয়তো সব বুঝি না।

ও. আ. : তাহলে কি তরুণরা দুর্বোধ্য কবিতা লিখছে?

শা. রা. : না, দুর্বোধ্য না। অনেকে লিখছে, তারা নিজেরাও জানে না, কী লিখছে। আবার অনেকে ভাল লিখছে। লিখছে, তবে যে একেবারে এক্সট্রা অর্ডিনারি, তা হয়তো না-ও হতে পারে।

ও. আ. : তো এ সময়ের কবিতাকে আপনি সংক্ষেপে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শা. রা. : একটা সময়ে কবিতা লেখা হবেই। এবং অন্য রকম হবেই। না হলে তো সে আর এ যুগের লোক নয়। আমি তো বিহারীলালের মতো কবিতা লিখতে পারবো না। চেষ্টা করলেও পারবো না। আর আমি লিখবোও না। আমি আমার মতো লিখতে চেষ্টা করবো। সেটা ভাল হতে পারে, খারাপও হতে পারে। মানুষ পছন্দ করতে পারে, না-ও পারে। আমি প্রথমত আমার নিজেকে স্যাটিসফাই করতে চাই। সবসময় স্যাটিসফাই হই না, এবং অনেক সময় খারাপই লাগে, কী লিখছি। আবার কোনো সময় মনে হয় যে, মোটামুটি চলছে তো, খারাপ কী।

ও. আ. : আমি কথা বলছিলাম তরুণদের কবিতা নিয়ে। তরুণদের কবিতা যে আপনি পড়েন, তা কীভাবে সংগ্রহ করেন?

শা. রা. : কাগজে পড়ি।

ও. আ. : দৈনিক কাগজে পড়েন?

শা. রা. : দৈনিক কাগজে পড়ি। অনেক সময় অনেকে বই দেয়, সেটা থেকে পড়ি।

ও. আ. : আপনি একজন অগ্রজ কবি। অতি সাম্প্রতিকের, যেমন গত দশ বছরে যে কবিতা লেখা হয়েছে, এগুলো নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

শা. রা. : শোন, আশাবাদী তো বটেই; তবে কে যে মাথা তুলে দাঁড়াবে, চট করে বলা যাচ্ছে না। হয়তো একাধিক কবি দাঁড়াবে, আবার একাধিক কবি দাঁড়াতে না-ও পারে।

ও. আ. : আপনি কী ধরনের আশাবাদী?

শা. রা. : আশাবাদী, খুবই আশাবাদী।

ও. আ. : এ রকম তো আপনি সব দশক সম্বন্ধেই বলবেন যে আপনি আশাবাদী। এতে আমরা সন্তুষ্ট নই। আপনি একটু নির্মমভাবে বলেন।

শা. রা. : না, আমি নির্মমভাবে বলতে পারবো না। কারণ আমি কোনো জাঁদরেল সমালোচক নই। সমালোচক হওয়ার একটা গুণ থাকা চাই। সবাই মোহিতলাল মজুমদার নয়। সমালোচকও, কবিও। আমি নই। আমি সমালোচক নই। তাহলে তো আমার সমালোচনার বই হতো। কেউ একটু ভাল লিখলেই আমার ভাল লাগে। যার বয়স কম— লিখছে, ভাল হচ্ছে। তাকে দিয়ে সম্ভাবনা আছে। আবার অনেকে তো সম্ভাবনার উপরে চলে গেছে। আমার মন্তব্যের অপেক্ষা তারা করে না। দে আর অলরেডি ফেমাস।

ও. আ. : এবার অন্য প্রসঙ্গে, কথ্য বা আঞ্চলিক বা মানুষের মুখের ভাষা; আর অন্যদিকে লিখিত ভাষা সময়োত্তীর্ণ সাহিত্য সৃষ্টির জন্য কোন ভাষার আবেদন বেশি? কেউ কেউ আবার মধ্যযুগের ভাষায়ও লিখছে।

শা. রা. :  বলা মুশকিল। তো এখন চণ্ডীদাসের ভাষায় লিখলে আমার চলবে না। আমাকে আমার যুগের ভাষায় লিখতে হবে। এবং পরের যুগে যারা আসবে, তারা তাদের যুগের ভাষায় লিখবে। এটাই আসল। আমি আমার যুগে ভাষায় লিখতে চেষ্টা করেছি। আমি লিখিত ভাষায় লিখেছি, আবার কথ্য ভাষায়ও লিখেছি। এখন যে ভাষায় কথা বলছি, এ ভাষায়ও কবিতা লিখেছি। আমি তো ঢাকাইয়া ভাষায়ও কবিতা লিখেছি।

ও. আ. : তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, সময়োত্তীর্ণ সাহিত্য সৃষ্টির জন্য সব ভাষাই দরকারী?

শা. রা. : হ্যাঁ, তবে আমি যে কালের, সেই কালের ভাষায়ই কবিতা লিখতে হবে।

ও. আ. : বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষাই মানুষের মুখের ভাষা। আমরা বইতে পড়ি আরেক রকমের ভাষা। কালোত্তীর্ণ সাহিত্য সৃষ্টির জন্য আমরা কোন ভাষাকে বেছে নেবো?

শা. রা. : কালোত্তীর্ণ সাহিত্য তো আর ভাষার ওপর নির্ভর করে না। অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে।

ও. আ. : ভাষা বিরাট একটা অংশ জুড়ে আছে।

শা. রা. : এটা লেখকের ওপর নির্ভর করে। সে কীভাবে লিখতে পারবে, তার ওপর নির্ভর করে। সে কী লিখল, সেটা সেই ভাল বুঝতে পারে।

ও. আ. : মানে, আপনি লেখককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?

শা. রা. : হ্যাঁ, তবে লেখককে সেরকম হতে হবে। সে তার অভিজ্ঞতা থেকে, চিন্তা থেকে লিখবেন। যা-তা লিখলে তো আর হবে না। এখন আমরা সাধু ভাষায় লিখি না, তবে সাধু ভাষায় লিখে কেউ যদি আবেদন সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে অবশ্যই সে সাধু ভাষায় লিখবে।

ও. আ. : সাহিত্যাঙ্গনে গ্রুপিং প্রথা সবসময় ছিল, এখন তা আরও বেড়েছে। এটাকে কীভাবে দেখেন?

শা. রা. : গ্রুপিং হয় এক অর্থে বয়সের জন্য। যারা তরুণ কবি, তারা বৃদ্ধদের সঙ্গে মেশে না। হয়তো সম্ভ্রমের জন্য মেশে না; ভাবে, শালারা কী লিখবে। ওদের কাছে গিয়ে কী লাভ!

ও. আ. : সমবয়সীদের মধ্যেও তো গ্রুপিং প্রথা আছে।

শা. রা. : এটা আমি বলতে পারবো না, কারণ আমি কোনো গ্রুপ বিলং করি না। আমি আমার মতো করে লিখি, এটা কেউ পড়ুক আর নাই পড়ুক।

ও. আ. : আমার তো মনে হয়, এই গ্রুপিং প্রথার কারণে নানা মতবাদের সৃষ্টি হয়, মতের বৈচিত্র্যায়ন ঘটে।

শা. রা. : হোক না গ্রুপ, ক্ষতি কী! কী বলো! একেবারে শত্রুতা না হলেই হলো— গ্রুপিংয়ে তো কোন সমস্যা দেখছি না।

ও. আ. : একটা গ্রুপ এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে আর একটা গ্রুপ এন্টি এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে, আবার আর একটা গ্রুপ দুটোর সমন্বয় করে। আপনি কোন পক্ষে?

শা. রা. : আমি আমার পক্ষে। আমি কোনো পক্ষেই না। আমি এসব নিয়ে ভাবিই না। আমি আমার মতো করে লিখি। এখনও আমার কাছে অনেকে লেখা চায়, মানে পাঠক পড়তে চায়। আমার মুখ দেখে তো আর চায় না। তবে কিছু কিছু বিরোধ তো হয়ই।

ও. আ. : আপনি একজন সাংবাদিক এবং পরবর্তীকালে সম্পাদক ছিলেন। কবিতার সঙ্গে এর বিরোধ কোথায়?

শা. রা. : সাংবাদিকতা কবিতার শত্রু। আমি বাঁচার জন্য সাংবাদিকতা করেছি। আমি তো সাংবাদিকতা চুজ করিনি। ঘটনাক্রমে আমি সাংবাদিকতায় ঢুকে গেছি। আমি মনে করি, যদি সাংবাদিকতা না করতাম তাহলে আমার কবিতা আরও ডেভেলপ করত। সাংবাদিকতা করতে গেলে অনেক সময় ফাইট করতে হয়। ফাইট করতে গেলে এনার্জি ক্ষয় হয়। ফাইট করতে না হলে, ঐ এনার্জি কবিতায় ব্যয় করলে কবিতা আরও সমৃদ্ধ হয়।

ও. আ. : এরকম কি সব পেশাই কবিতার শত্রু নয়?

শা. রা. : না, সব পেশাই ক্ষতিকর নয়। তবে উপকারী বোধ হয় শিক্ষকতা পেশা।

ও. আ. : আমরা জানি, বরাবরই জগদ্বিখ্যাতরা নিজেদের আড়াল করে রাখতে চাইতেন। কিন্তু ইদানীং এক শ্রেণীর কবি-লেখকদের মধ্যে আত্মপ্রচারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করেন, নিজের লেখায় নিজের কবিতার উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন। নিজেকে স্টার বলে দাবি করেন। তাদের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

শা. রা. : কী বলবো, আমার বলার কিছু নাই। তুমিই তো বলে দিয়েছ। তবে আমি তো কল্পনাও করতে পারি না যে, এ রকম করা উচিত আমার। আমিই বড় বা আমিই শ্রেষ্ঠ— এসব বলা এক ধরনের ইডিওসি। কেউ কেউ যে নিজের লেখায় নিজের কবিতার উদ্ধৃতি ব্যবহার করে— শুনে তো আমি বিস্মিত হচ্ছি। অবশ্য কোনো কোনো প্রতিভাবান ব্যক্তি করেনও মাঝে মাঝে, যেমন বার্নার্ড শ করতেন। তবে তার মতো এত বড় মেধা আমার নেই যে, আমি নিজেকে বড় বলবো। এটা আমি কল্পনাও করতে পারি না। তবে অনেকে যারা করে তাদের কথা শুনে আমি বিস্মিত হই। এটা নির্ভর করে তাদের ক্ষমতার ওপর। তারা যদি তাদের ক্ষমতা বা মেধা সম্বন্ধে নিশ্চিত হয় তাহলে তারা করতে পারে। তবে আত্মপ্রচার চরম নির্বুদ্ধিতা।

ও. আ. : কাউকে কাউকে দেখা যায়, লেখকের সততাকে উপেক্ষা করে বরাবরই কিছু একটা আবোলতাবোল বলে বা বিতর্কিত কিছু একটা লিখে সব সময় আলোচনায় থাকতে চান। আত্মপ্রচারে মশগুল থাকে। তাদেরকে কী বলবেন?

শা. রা. : না, এটা ইডিওসি, এর কোনো মূল্য নেই। অন্যেরা যেটা বলে সেটাই আসল।

ও. আ. : রাহমান ভাই, আপনার মতো বিনয়ী মানুষ জীবনে খুব কম দেখেছি। তারুণ্যের ঔদ্ধত্যকে কী চোখে দেখেন?

শা. রা. : তারুণ্যের ঔদ্ধত্য থাকতেই পারে। তবে তারুণ্যের ঔদ্ধত্যকে আমি খুব একটা এপ্রিশিয়েট করি না। তার মধ্যে একটা উদ্দীপনা থাকতে পারে, সেটা ঔদ্ধত্য নয়। ঔদ্ধত্যের তো কোন দরকার নেই। ঔদ্ধত্য না দেখিয়েও তো কেউ শ্রেষ্ঠ হতে পারে।

ও. আ. : আপনার দৃষ্টিতে কে লেখক আর কে লেখক নন?

শা. রা. : যে ভাল লিখতে পারে, সেই লেখক। যার লেখা হয় না, সে লেখক নয়।

ও. আ. : লেখার ভাল-মন্দ বিচারের মানদণ্ড কী?

শা. রা. : সমস্যায় ফেলে দিলে। কোনো কবিতা পড়ে যদি আমার ভাল লাগে, সেটা এক ধরনের ভাল কবিতা। আবার কোনোটা পড়ে যদি ভাল না লাগে, সেটাও ভাল লেখা হতে পারে। হয়তো সেটা আমি বুঝলাম না। তবে অনেকে আবার এরকম লেখে যে, সে নিজেও বোঝে না।

ও. আ. : কবিরা চিন্তাশীল। কবিদের চিন্তার নান্দনিকতা সম্পর্কে আপনার কাছ থেকে জানতে চাই।

শা. রা. : বড় মুশকিল। এগুলো এত এবস্ট্র্যাক্ট, যে করে সেই জানে। নান্দনিক চিন্তা করার জন্য কবি হওয়ার প্রয়োজন নেই। একজন অ-কবিও নান্দনিক চিন্তা করতে পারেন। আবার একজন কবিও অ-নান্দনিক চিন্তা করতে পারেন। তবে তিনি কবি হবেন না।

ও. আ. : কবিতা নিয়ে কি নতুন কিছু ভাবছেন?

শা. রা. : না, নতুন কিছু ভাবছি না। ভাল লাগছে তাই লিখছি।

ও. আ. : কতদিন বেঁচে থাকতে চান?

শা. রা. : যত দি-ন... বাঁচা যায়।

ও. আ. : ইদানীং আপনার সময়গুলো কেমন কাটছে?

শা. রা. : মূলত ঘরে বসেই কাটাই। এ ঘর ও ঘর করে কাটাই। মাঝেমধ্যে বাইরে যেতে হয়। বন্ধুবান্ধব আসে। প্রিয়জনদের সাথে দেখা হয়। এই তো।

ও. আ. : দেশের বর্তমান সার্বিক অবস্থা সম্বন্ধে আপনার মূল্যায়ন কী?

শা. রা. : দেশের অবস্থা খুব ভাল তো না। খুব খারাপ। এখন যারা তখ্তে বসে আছে তারা তো এই বাংলাদেশ চায়নি। এটা আমার বলার দরকার হয় না। সবাই বুঝতে পারছে। তবে আজ না হয়, কাল না হয়— এ থেকে উত্তরণ আমাদের হবেই। কিছু মানুষই আমাদের মুক্ত করবে। যাদের মধ্যে ভাল অর্থে ঔদ্ধত্য আছে, যাদের মধ্যে ভাল চিন্তা আছে, যারা দেশের উন্নয়ন চায়— তারাই একদিন ঘুরে দাঁড়াবে। হ্যাঁ, তেমন নেতা আসতে হবে— যারা দেশের মানুষকে জাগিয়ে তুলবে, আগুন ভরে দেবে মানুষের মনে। সেদিন হয়তো আমি থাকবো না।


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬


মনে মনে আমি প্রতিষ্ঠানবিরোধী —শামসুর রাহমান

প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬

featured Image


[রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী তিরিশের আধুনিক বাংলা কবিতার স্বাতন্ত্র্য এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। অন্যদিকে তিরিশ-পরবর্তী বাংলা কবিতায় নতুনত্ব প্রতিষ্ঠায় পঞ্চাশের দশকের হাতেগনা যে কজন কবি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন; কবি শামসুর রাহমান তাঁদের অন্যতম। গত ১৭ আগস্ট ছিল তাঁর ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী। কেউ কেউ মনে করেন শামসুর রাহমান গত শতকের পঞ্চাশের দশকের প্রধান কবি। আবার অনেকের রয়েছে দ্বিমতও। শামসুর রাহমানের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তিনি বাঙালির একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে প্রচুর কবিতা লিখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় একশ’। ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে তাঁর জন্মদিনকে ঘিরে “সংবাদ সাময়িকী”র পক্ষ থেকে এ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়।] 

ওবায়েদ আকাশ : নিজের জন্মদিন আপনাকে কীভাবে আলোড়িত করে।

শামসুর রাহমান : এক অর্থে জন্মদিন আমাকে আলোড়িত করে, যারা আমাকে ভালবাসে, যেমন আমার পরিবারের লোকজন বা যারা আমার কবিতা পড়ে বা শুভাকাঙ্ক্ষী তারা আমাকে শুভেচ্ছা জানায়। লুকাবো না, আমার কাছে ভালই লাগে। আর এক অর্থে আমার খারাপ লাগে এই ভেবে, আমি মৃত্যুর দিকে আর এক বছর এগিয়ে গেলাম। কিন্তু আনন্দের ভাগটা বোধহয় একটু বেশিই।

ও. আ. : জন্মদিন পালনের প্রথা সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?

শা. রা. : প্রথা, আমার মনে হয় এটা খারাপ না, ভাল। আমাদের জীবনে তো ভাই ভাল দিন পালনের বিশেষ একটা সুযোগ নেই, সেই অর্থে আমার জন্মদিনে কেউ এসে শুভেচ্ছা জানাল বা ফুল দিয়ে অভিবাদন জানাল, এটা ভালই লাগে। আমার মনে পড়ে, কয়েক বছর আগে আমাদের পাড়ার এক ছোট্ট মেয়ে কিছু ফুল এনে আমার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাল। হয়তো তার ফুল কেনার সামর্থ্য নেই, সে গাছতলায় কুড়িয়ে পেয়েছে, তার নাম আমি একটা কবিতায় উল্লেখ করেছি, সেটা কাগজেও ছাপা হয়েছে। এটা যে কত বড় একটা পাওয়া, এর কোনো তুলনা হয় না (এ সময় শামসুর রাহমান কেঁদে ফেলেন) মানুষের ভালবাসা যে কত বড় পাওয়া! এটা আমি পেয়েছি, ভবিষ্যতে হয়তো না-ও পেতে পারি।

ও. আ. : ইদানীং যতবারই আপনার বাসায় আসছি, আপনার সঙ্গে দেখা করছি, প্রায়ই বলছেন, আপনি আর বুঝি বেশিদিন বেঁচে যেতে পারবেন না। মৃত্যুকে কি ভয় করেন? 

শা. রা. : মৃত্যুর কথা তো ভুলে থাকতে চাই। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়। এক হিসেবে ভয় তো এক ধরনের আছেই। সেই ভয়টা আসলে সেই অর্থে নয়, কারণ একদিন আমি মরে তো যাবোই। কিন্তু আমার যে কোন চেতনাই থাকবে না, আজকে আমি যাদের না দেখলে থাকতে পারি না, যাদের না দেখলে খারাপ লাগে, তাদের সাথে কোনো দিন দেখাই হবে না— এগুলো ভাবলে আমার খারাপ লাগে। ভয় কিনা জানি না, তবে লাগেই তো। ভয় মানে এ অর্থে ভয়।

ও. আ. : রবীন্দ্রনাথ তো বলেছেন, ‘সত্য যে কঠিন/কঠিনেরে ভালবাসিলাম’ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তার সঙ্গে আপনার চিন্তার পার্থক্য কোথায়?

শা. রা. : আমি ঠিক মৃত্যুকে ভালবাসব, এত বড় সাহস আমার নেই। মরতে আমি চাই না। রবীন্দ্রনাথও মরতে চাইতেন বলে মনে হয় না। তবে উনি এত বড়মাপের মানুষ, মৃত্যুকে তিনি ভালবাসতেন কিনা আমি জানি না, এবং ওনার ভেতরে কী মনে হয়েছে আমি বলতে পারি না।

ও. আ. : প্রচলিত চিন্তাচেতনার সঙ্গে আপনার মিল বা অমিল কোথায়?

শা. রা. :  সেটা অবশ্য আমি ভেবে দেখিনি। আমি ওইভাবে চিন্তাও করি না। সত্যি কথা বলতে কী, আমি তো এক অর্থে খুবই সাধারণ মানুষ; সেই অর্থে সবাই যা মনে করে, হয়তো আমিও তাই মনে করি। কিংবা করি না। অনেকের সঙ্গে হয়তো মেলে না, এ হতে পারে। এটা বলা মুশকিল আমার পক্ষে, কারণ সবার কথা তো আমি জানি না।

ও. আ. : তাহলে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, প্রতিদিন নিয়ম যে আমাদের তাড়িত করে, আপনি সেভাবেই চলেন? বা আপনি একটা নিয়মের মধ্যেই থাকতে চান?

শা. রা. : আমি তো যা চলছে তা চাই না। আমার দেশের অবস্থা বা দেশ এখন যেভাবে চলছে, সেভাবে আমি চাই না। আমার খুব খারাপ লাগে। মাঝে মাঝে আমার বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মেনে নিতে হচ্ছে। মেনে নিতে হচ্ছে মানে কিছু করতে পারছি না। যারা দেশের এ অবস্থা করছে, তাদের ঘৃণা করছি। কিন্তু মানুষকে ঘৃণা করা তো খারাপ, এক অর্থে। আমার তো ভালবাসা উচিত সবাইকে, কিন্তু ভালবাসতে তো পারছি না। যারা অত্যাচার করে মানুষকে, এই যে মৌলবাদীরা, যারা ধর্মের কথা বলে মানুষকে অত্যাচার করে, তাদের আমি ঘৃণা করি, ভালবাসতে পারি না। যারা ধর্ম বিশ্বাস করেন, আমার মা ধর্ম বিশ্বাস করতেন, নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন। আমার মা তো খুব ভাল মানুষ ছিলেন। আমি আমার মা বলে বলছি না, আমার মা ভাল না হলে বলতাম না। আমার মায়ের কথা উল্লেখই করতাম না। আমি আমার মায়ের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। একটি ঘটনা বলছি। আমি তখন ছোট, খুব ছোট নয়, ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়ি, আমার বাসার যে কাজের মেয়ে, আমার চেয়ে একটু বড়, দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার আগেই সে ঘুমিয়ে পড়েছে। দেখি যে, আমার মা রান্নাঘরে কাজ করছেন, অথচ তাকে জাগাচ্ছেন না। আমি মাকে বললাম, আপনি কাজ করছেন, ও ঘুমাচ্ছে, আমি ওকে জাগিয়ে দিই। মা বললেন, না, ও ঘুমিয়ে পড়েছে, ঘুমাক। আমার কাজ করলে কিচ্ছু হবে না। এ মাত্র একটা উদাহরণ দিলাম। এরকম আরো ঘটনা আছে। আমি অনেক সময় আমার মায়ের কাছে বসে বসে ধর্মের বিরুদ্ধে সামান্য কথা বলেছি, তিনি হেসে হেসে বলতেন, ও সব বলো না। মানে, তিনি ধর্ম বিশ্বাস করলেও খুব সহনশীল ছিলেন। আর আমাদের ধর্মীয় মৌলবাদীরা ঠিক এর বিপরীত চরিত্রের। 

ও. আ. : আপনি বা আমরা একটি রাষ্ট্রে বসবাস করি। রাষ্ট্র একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানে বসবাস করে কি প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করা সম্ভব?

শা. রা. : করেছি তো অনেক। কোনো কোনো সময় তো করেছি।

ও. আ. : প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করে বা নিয়ম ভেঙে জীবনযাপনে সুবিধা কী?

শা. রা. : প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করে সুবিধা হয় না, বরং অসুবিধা হয়। আবার সব সময় তো করি না।

ও. আ. : যুগে যুগে বিভিন্ন আন্দোলন, মতবাদ, চিন্তা পদ্ধতি সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এ সবই ঘটেছে প্রচলিত ব্যবস্থার বিরোধিতা করে, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। একা যখন কেউ প্রতিষ্ঠান বা প্রচলিত ব্যবস্থার বিরোধিতা করে, তখন তাকে আপনি কী উপদেশ দেবেন?

শা. রা. : একা যখন কেউ প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করে, সে তো বীর, তার জন্য কোনো উপদেশের দরকার নেই।

ও. আ. : আপনি কি মনে করেন আপনি অ-প্রাতিষ্ঠানিক জীবনযাপন করেন?

শা. রা. : প্রতিষ্ঠানকে তো আমি পুরোপুরি অস্বীকার করছি না। কিছু কিছু করি না, কিছু কিছু করি। অ-প্রাতিষ্ঠানিক তো আর একেবারে থাকতে পারছি না। তবে আমি অনেকটাই প্রতিষ্ঠানবিরোধী। অনেকটাই। এটা আমার লেখাতেও আছে। জীবনেও আছে। আমি জাহির করি না, আমি প্রতিষ্ঠানবিরোধী। মনে মনে আমি প্রতিষ্ঠানবিরোধী।

ও. আ. : কবিতার পাশাপাশি মূলত প্রতিষ্ঠানই আপনাকে এতদূর নিয়ে এসেছে; আপনি কী বলেন?

শা. রা. : আমি নিমকহারামি করবো না, যদি নিয়ে এসে থাকে, এসেছে; আর যদি নিয়ে না আসে, তো আসেনি।

ও. আ. : প্রতিষ্ঠান বা এস্টাবলিশমেন্ট আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

শা. রা. :  প্রতিষ্ঠান আমাকে যে খুব প্রভাবিত করেছে তা না। কিন্তু আমার উপকার তো করেছে। আমি তো প্রতিষ্ঠানে কাজ করে মাইনে পেয়েছি। ওখানে অনেক বন্ধু অর্জন করেছি। এটা তো কম না।

ও. আ. : ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে কবিতা লিখছেন। আপনার কবিতা সম্বন্ধে আপনি জানেন। আপনার কবিতা তরুণরা কতদিন পাঠ করবে বলে আপনি আশাবাদী?

শা. রা. : আমার কবিতা সম্বন্ধে আমি একেবারেই জানি না। আর তরুণরা আদৌ পাঠ করবে কিনা তা-ও জানি না। তারা পাঠ করতে পারে, না-ও করতে পারে।

ও. আ. : কেউ কেউ বলেন, এখন আর আপনার কবিতা লেখার দরকার নেই। তাদেরকে আপনি কী বলবেন?

শা. রা. : কিছুই বলবো না। আমি যদি লিখতে পারি লিখবো, না লিখতে পারলে লিখবো না।

ও. আ. : বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কবিদের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?

শা. রা. : কবির প্রথম ভূমিকা হওয়া উচিত ভাল কবিতা লেখা। তিনি পারুন না পারুন, চেষ্টা করা উচিত। 

ও. আ. : আপনি কি এই ভূমিকায় আছেন?

শা. রা. : আমি তো চেষ্টা করেই যাচ্ছি, সব সময় আমি সাকসেসফুল হচ্ছি, তা তো দাবি করছি না। আমি তো লিখছি, এবং তোমরা জানো আমি কেমন লিখছি। তোমাদের ভাল লাগলে ভাল লিখছি, খারাপ লাগলে খারাপ লিখছি। তবে এটাও আমার মধ্যে কাজ করে, এটা বুঝতে পারি, আমি কতটা ভাল লিখছি, আর কতটা খারাপ লিখছি। আর নিজের কবিতা সম্পর্কে নিজে বিচার করাটা খুব মুশকিল। অনেক ভাল ভাল কবিও তাঁদের নিজের লেখার বিচার করতে পারেন না।

ও. আ. : সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতা বদলায়। স্বাভাবিক। সমকালীন কবিতা কি বিশেষভাবে বদলেছে?

শা.রা. : এটা আমার পক্ষে বলা মুশকিল। এটা আমি বলতে পারবো না।

ও. আ. : কেন, আপনি কি তরুণদের কবিতা পড়েন না?

শা. রা. : পড়ি, হয়তো সব বুঝি না।

ও. আ. : তাহলে কি তরুণরা দুর্বোধ্য কবিতা লিখছে?

শা. রা. : না, দুর্বোধ্য না। অনেকে লিখছে, তারা নিজেরাও জানে না, কী লিখছে। আবার অনেকে ভাল লিখছে। লিখছে, তবে যে একেবারে এক্সট্রা অর্ডিনারি, তা হয়তো না-ও হতে পারে।

ও. আ. : তো এ সময়ের কবিতাকে আপনি সংক্ষেপে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শা. রা. : একটা সময়ে কবিতা লেখা হবেই। এবং অন্য রকম হবেই। না হলে তো সে আর এ যুগের লোক নয়। আমি তো বিহারীলালের মতো কবিতা লিখতে পারবো না। চেষ্টা করলেও পারবো না। আর আমি লিখবোও না। আমি আমার মতো লিখতে চেষ্টা করবো। সেটা ভাল হতে পারে, খারাপও হতে পারে। মানুষ পছন্দ করতে পারে, না-ও পারে। আমি প্রথমত আমার নিজেকে স্যাটিসফাই করতে চাই। সবসময় স্যাটিসফাই হই না, এবং অনেক সময় খারাপই লাগে, কী লিখছি। আবার কোনো সময় মনে হয় যে, মোটামুটি চলছে তো, খারাপ কী।

ও. আ. : আমি কথা বলছিলাম তরুণদের কবিতা নিয়ে। তরুণদের কবিতা যে আপনি পড়েন, তা কীভাবে সংগ্রহ করেন?

শা. রা. : কাগজে পড়ি।

ও. আ. : দৈনিক কাগজে পড়েন?

শা. রা. : দৈনিক কাগজে পড়ি। অনেক সময় অনেকে বই দেয়, সেটা থেকে পড়ি।

ও. আ. : আপনি একজন অগ্রজ কবি। অতি সাম্প্রতিকের, যেমন গত দশ বছরে যে কবিতা লেখা হয়েছে, এগুলো নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

শা. রা. : শোন, আশাবাদী তো বটেই; তবে কে যে মাথা তুলে দাঁড়াবে, চট করে বলা যাচ্ছে না। হয়তো একাধিক কবি দাঁড়াবে, আবার একাধিক কবি দাঁড়াতে না-ও পারে।

ও. আ. : আপনি কী ধরনের আশাবাদী?

শা. রা. : আশাবাদী, খুবই আশাবাদী।

ও. আ. : এ রকম তো আপনি সব দশক সম্বন্ধেই বলবেন যে আপনি আশাবাদী। এতে আমরা সন্তুষ্ট নই। আপনি একটু নির্মমভাবে বলেন।

শা. রা. : না, আমি নির্মমভাবে বলতে পারবো না। কারণ আমি কোনো জাঁদরেল সমালোচক নই। সমালোচক হওয়ার একটা গুণ থাকা চাই। সবাই মোহিতলাল মজুমদার নয়। সমালোচকও, কবিও। আমি নই। আমি সমালোচক নই। তাহলে তো আমার সমালোচনার বই হতো। কেউ একটু ভাল লিখলেই আমার ভাল লাগে। যার বয়স কম— লিখছে, ভাল হচ্ছে। তাকে দিয়ে সম্ভাবনা আছে। আবার অনেকে তো সম্ভাবনার উপরে চলে গেছে। আমার মন্তব্যের অপেক্ষা তারা করে না। দে আর অলরেডি ফেমাস।

ও. আ. : এবার অন্য প্রসঙ্গে, কথ্য বা আঞ্চলিক বা মানুষের মুখের ভাষা; আর অন্যদিকে লিখিত ভাষা সময়োত্তীর্ণ সাহিত্য সৃষ্টির জন্য কোন ভাষার আবেদন বেশি? কেউ কেউ আবার মধ্যযুগের ভাষায়ও লিখছে।

শা. রা. :  বলা মুশকিল। তো এখন চণ্ডীদাসের ভাষায় লিখলে আমার চলবে না। আমাকে আমার যুগের ভাষায় লিখতে হবে। এবং পরের যুগে যারা আসবে, তারা তাদের যুগের ভাষায় লিখবে। এটাই আসল। আমি আমার যুগে ভাষায় লিখতে চেষ্টা করেছি। আমি লিখিত ভাষায় লিখেছি, আবার কথ্য ভাষায়ও লিখেছি। এখন যে ভাষায় কথা বলছি, এ ভাষায়ও কবিতা লিখেছি। আমি তো ঢাকাইয়া ভাষায়ও কবিতা লিখেছি।

ও. আ. : তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, সময়োত্তীর্ণ সাহিত্য সৃষ্টির জন্য সব ভাষাই দরকারী?

শা. রা. : হ্যাঁ, তবে আমি যে কালের, সেই কালের ভাষায়ই কবিতা লিখতে হবে।

ও. আ. : বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষাই মানুষের মুখের ভাষা। আমরা বইতে পড়ি আরেক রকমের ভাষা। কালোত্তীর্ণ সাহিত্য সৃষ্টির জন্য আমরা কোন ভাষাকে বেছে নেবো?

শা. রা. : কালোত্তীর্ণ সাহিত্য তো আর ভাষার ওপর নির্ভর করে না। অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে।

ও. আ. : ভাষা বিরাট একটা অংশ জুড়ে আছে।

শা. রা. : এটা লেখকের ওপর নির্ভর করে। সে কীভাবে লিখতে পারবে, তার ওপর নির্ভর করে। সে কী লিখল, সেটা সেই ভাল বুঝতে পারে।

ও. আ. : মানে, আপনি লেখককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?

শা. রা. : হ্যাঁ, তবে লেখককে সেরকম হতে হবে। সে তার অভিজ্ঞতা থেকে, চিন্তা থেকে লিখবেন। যা-তা লিখলে তো আর হবে না। এখন আমরা সাধু ভাষায় লিখি না, তবে সাধু ভাষায় লিখে কেউ যদি আবেদন সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে অবশ্যই সে সাধু ভাষায় লিখবে।

ও. আ. : সাহিত্যাঙ্গনে গ্রুপিং প্রথা সবসময় ছিল, এখন তা আরও বেড়েছে। এটাকে কীভাবে দেখেন?

শা. রা. : গ্রুপিং হয় এক অর্থে বয়সের জন্য। যারা তরুণ কবি, তারা বৃদ্ধদের সঙ্গে মেশে না। হয়তো সম্ভ্রমের জন্য মেশে না; ভাবে, শালারা কী লিখবে। ওদের কাছে গিয়ে কী লাভ!

ও. আ. : সমবয়সীদের মধ্যেও তো গ্রুপিং প্রথা আছে।

শা. রা. : এটা আমি বলতে পারবো না, কারণ আমি কোনো গ্রুপ বিলং করি না। আমি আমার মতো করে লিখি, এটা কেউ পড়ুক আর নাই পড়ুক।

ও. আ. : আমার তো মনে হয়, এই গ্রুপিং প্রথার কারণে নানা মতবাদের সৃষ্টি হয়, মতের বৈচিত্র্যায়ন ঘটে।

শা. রা. : হোক না গ্রুপ, ক্ষতি কী! কী বলো! একেবারে শত্রুতা না হলেই হলো— গ্রুপিংয়ে তো কোন সমস্যা দেখছি না।

ও. আ. : একটা গ্রুপ এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে আর একটা গ্রুপ এন্টি এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে, আবার আর একটা গ্রুপ দুটোর সমন্বয় করে। আপনি কোন পক্ষে?

শা. রা. : আমি আমার পক্ষে। আমি কোনো পক্ষেই না। আমি এসব নিয়ে ভাবিই না। আমি আমার মতো করে লিখি। এখনও আমার কাছে অনেকে লেখা চায়, মানে পাঠক পড়তে চায়। আমার মুখ দেখে তো আর চায় না। তবে কিছু কিছু বিরোধ তো হয়ই।

ও. আ. : আপনি একজন সাংবাদিক এবং পরবর্তীকালে সম্পাদক ছিলেন। কবিতার সঙ্গে এর বিরোধ কোথায়?

শা. রা. : সাংবাদিকতা কবিতার শত্রু। আমি বাঁচার জন্য সাংবাদিকতা করেছি। আমি তো সাংবাদিকতা চুজ করিনি। ঘটনাক্রমে আমি সাংবাদিকতায় ঢুকে গেছি। আমি মনে করি, যদি সাংবাদিকতা না করতাম তাহলে আমার কবিতা আরও ডেভেলপ করত। সাংবাদিকতা করতে গেলে অনেক সময় ফাইট করতে হয়। ফাইট করতে গেলে এনার্জি ক্ষয় হয়। ফাইট করতে না হলে, ঐ এনার্জি কবিতায় ব্যয় করলে কবিতা আরও সমৃদ্ধ হয়।

ও. আ. : এরকম কি সব পেশাই কবিতার শত্রু নয়?

শা. রা. : না, সব পেশাই ক্ষতিকর নয়। তবে উপকারী বোধ হয় শিক্ষকতা পেশা।

ও. আ. : আমরা জানি, বরাবরই জগদ্বিখ্যাতরা নিজেদের আড়াল করে রাখতে চাইতেন। কিন্তু ইদানীং এক শ্রেণীর কবি-লেখকদের মধ্যে আত্মপ্রচারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করেন, নিজের লেখায় নিজের কবিতার উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন। নিজেকে স্টার বলে দাবি করেন। তাদের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

শা. রা. : কী বলবো, আমার বলার কিছু নাই। তুমিই তো বলে দিয়েছ। তবে আমি তো কল্পনাও করতে পারি না যে, এ রকম করা উচিত আমার। আমিই বড় বা আমিই শ্রেষ্ঠ— এসব বলা এক ধরনের ইডিওসি। কেউ কেউ যে নিজের লেখায় নিজের কবিতার উদ্ধৃতি ব্যবহার করে— শুনে তো আমি বিস্মিত হচ্ছি। অবশ্য কোনো কোনো প্রতিভাবান ব্যক্তি করেনও মাঝে মাঝে, যেমন বার্নার্ড শ করতেন। তবে তার মতো এত বড় মেধা আমার নেই যে, আমি নিজেকে বড় বলবো। এটা আমি কল্পনাও করতে পারি না। তবে অনেকে যারা করে তাদের কথা শুনে আমি বিস্মিত হই। এটা নির্ভর করে তাদের ক্ষমতার ওপর। তারা যদি তাদের ক্ষমতা বা মেধা সম্বন্ধে নিশ্চিত হয় তাহলে তারা করতে পারে। তবে আত্মপ্রচার চরম নির্বুদ্ধিতা।

ও. আ. : কাউকে কাউকে দেখা যায়, লেখকের সততাকে উপেক্ষা করে বরাবরই কিছু একটা আবোলতাবোল বলে বা বিতর্কিত কিছু একটা লিখে সব সময় আলোচনায় থাকতে চান। আত্মপ্রচারে মশগুল থাকে। তাদেরকে কী বলবেন?

শা. রা. : না, এটা ইডিওসি, এর কোনো মূল্য নেই। অন্যেরা যেটা বলে সেটাই আসল।

ও. আ. : রাহমান ভাই, আপনার মতো বিনয়ী মানুষ জীবনে খুব কম দেখেছি। তারুণ্যের ঔদ্ধত্যকে কী চোখে দেখেন?

শা. রা. : তারুণ্যের ঔদ্ধত্য থাকতেই পারে। তবে তারুণ্যের ঔদ্ধত্যকে আমি খুব একটা এপ্রিশিয়েট করি না। তার মধ্যে একটা উদ্দীপনা থাকতে পারে, সেটা ঔদ্ধত্য নয়। ঔদ্ধত্যের তো কোন দরকার নেই। ঔদ্ধত্য না দেখিয়েও তো কেউ শ্রেষ্ঠ হতে পারে।

ও. আ. : আপনার দৃষ্টিতে কে লেখক আর কে লেখক নন?

শা. রা. : যে ভাল লিখতে পারে, সেই লেখক। যার লেখা হয় না, সে লেখক নয়।

ও. আ. : লেখার ভাল-মন্দ বিচারের মানদণ্ড কী?

শা. রা. : সমস্যায় ফেলে দিলে। কোনো কবিতা পড়ে যদি আমার ভাল লাগে, সেটা এক ধরনের ভাল কবিতা। আবার কোনোটা পড়ে যদি ভাল না লাগে, সেটাও ভাল লেখা হতে পারে। হয়তো সেটা আমি বুঝলাম না। তবে অনেকে আবার এরকম লেখে যে, সে নিজেও বোঝে না।

ও. আ. : কবিরা চিন্তাশীল। কবিদের চিন্তার নান্দনিকতা সম্পর্কে আপনার কাছ থেকে জানতে চাই।

শা. রা. : বড় মুশকিল। এগুলো এত এবস্ট্র্যাক্ট, যে করে সেই জানে। নান্দনিক চিন্তা করার জন্য কবি হওয়ার প্রয়োজন নেই। একজন অ-কবিও নান্দনিক চিন্তা করতে পারেন। আবার একজন কবিও অ-নান্দনিক চিন্তা করতে পারেন। তবে তিনি কবি হবেন না।

ও. আ. : কবিতা নিয়ে কি নতুন কিছু ভাবছেন?

শা. রা. : না, নতুন কিছু ভাবছি না। ভাল লাগছে তাই লিখছি।

ও. আ. : কতদিন বেঁচে থাকতে চান?

শা. রা. : যত দি-ন... বাঁচা যায়।

ও. আ. : ইদানীং আপনার সময়গুলো কেমন কাটছে?

শা. রা. : মূলত ঘরে বসেই কাটাই। এ ঘর ও ঘর করে কাটাই। মাঝেমধ্যে বাইরে যেতে হয়। বন্ধুবান্ধব আসে। প্রিয়জনদের সাথে দেখা হয়। এই তো।

ও. আ. : দেশের বর্তমান সার্বিক অবস্থা সম্বন্ধে আপনার মূল্যায়ন কী?

শা. রা. : দেশের অবস্থা খুব ভাল তো না। খুব খারাপ। এখন যারা তখ্তে বসে আছে তারা তো এই বাংলাদেশ চায়নি। এটা আমার বলার দরকার হয় না। সবাই বুঝতে পারছে। তবে আজ না হয়, কাল না হয়— এ থেকে উত্তরণ আমাদের হবেই। কিছু মানুষই আমাদের মুক্ত করবে। যাদের মধ্যে ভাল অর্থে ঔদ্ধত্য আছে, যাদের মধ্যে ভাল চিন্তা আছে, যারা দেশের উন্নয়ন চায়— তারাই একদিন ঘুরে দাঁড়াবে। হ্যাঁ, তেমন নেতা আসতে হবে— যারা দেশের মানুষকে জাগিয়ে তুলবে, আগুন ভরে দেবে মানুষের মনে। সেদিন হয়তো আমি থাকবো না।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত