সংবাদ

বরিশালে শত শত মামলা ও গ্রেপ্তার, তবুও থামছে না মাদকের কারবার


জে আই জুয়েল, বরিশাল
জে আই জুয়েল, বরিশাল
প্রকাশ: ৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম

বরিশালে শত শত মামলা ও গ্রেপ্তার, তবুও থামছে না মাদকের কারবার
ছবি : সংবাদ

বরিশালে মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, শত শত মামলা ও হাজারের বেশি গ্রেপ্তারের পরও থামছে না মাদকের কারবার। বরং একই ব্যক্তি বারবার গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বেরিয়ে পুনরায় মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি), আইনজীবী ও আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শুধু অভিযান বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তদন্তের দুর্বলতা, এজাহার ও ফরওয়ার্ডিংয়ের তথ্যগত ঘাটতি এবং আইনি কৌশলের সুযোগে অভিযুক্তরা জামিন পাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াই ফলপ্রসূ হচ্ছে না।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বরিশালে মাদক নিয়ে কেবল বেচাকেনাই নয়, আধিপত্য বিস্তার ও অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও বাড়ছে। সম্প্রতি নগরীর পলাশপুর এলাকায় মাদকের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, মামলার প্রধান আসামিরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। এর আগে বাকেরগঞ্জ ও আগৈলঝাড়াতেও মাদককেন্দ্রিক বিরোধে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

পলাশপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, সিন্ডিকেটগুলো শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করছে। জনৈক বাসিন্দা বলেন, ‘বস্তিতে মাদকের লেনদেন নিয়ে খুনোখুনি হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।’

গত ১৫ মে রাতে এক যুবককে হত্যার ঘটনায় তার মা দাবি করেন, হত্যাকারীরা চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং এলাকায় তাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। কোনো বড় ঘটনা ঘটলে কয়েক দিন প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে, পরে পরিস্থিতি আবার আগের মতোই হয়ে যায়।

গত এক বছরে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রায় তিন হাজার অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ২১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় ৯০৮টি মামলায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিল ও ক্রিস্টাল আইস উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বড় একটি অংশই ‘রিপিট আসামি’ বা পেশাদার কারবারি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. তানভীর হোসেন খান বলেন, ‘বরিশালে গাঁজা ও ইয়াবাই প্রধান মাদক। নিয়মিত অভিযানে ব্যবসায়ীরা গ্রেপ্তার হলেও একই ব্যক্তি বারবার জামিনে ফিরে আসছেন।’

বিএমপির উপপুলিশ কমিশনার ও অপরাধ গবেষক মো. আব্দুল হান্নান বলেন, ‘পুলিশের গবেষণায় দেখা গেছে, দ্রুত ও সহজে অধিক লাভের আশায় অনেকেই মাদক ব্যবসা ছাড়ছেন না। গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি জেনেও তারা এই অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছেন।’

বিএমপি কমিশনার মো. আশিক সাঈদ বলেন, ‘যাদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ কিছুদিন পরই বের হয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়াচ্ছে। বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।’

আইনজীবী ও আদালত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার শুরু তদন্তপর্ব থেকেই। বরিশালের পিপি আবুল কালাম আজাদ জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ‘প্রকৃত দখল’ (Possession) প্রমাণ করা অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি ৬৬ কেজি গাঁজার একটি মামলায় ঘর থেকে মাদক উদ্ধার হলেও তদন্ত প্রতিবেদনে সেটি কার দখলে ছিল, তা স্পষ্ট করা হয়নি। এ ছাড়া অভিযুক্তের পূর্বের অপরাধের তথ্য ফরওয়ার্ডিংয়ে যথাযথভাবে না আসায় তারা জামিন পেয়ে যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। এর জন্য তদন্তের মান উন্নয়ন, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬


বরিশালে শত শত মামলা ও গ্রেপ্তার, তবুও থামছে না মাদকের কারবার

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬

featured Image

বরিশালে মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, শত শত মামলা ও হাজারের বেশি গ্রেপ্তারের পরও থামছে না মাদকের কারবার। বরং একই ব্যক্তি বারবার গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বেরিয়ে পুনরায় মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি), আইনজীবী ও আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শুধু অভিযান বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তদন্তের দুর্বলতা, এজাহার ও ফরওয়ার্ডিংয়ের তথ্যগত ঘাটতি এবং আইনি কৌশলের সুযোগে অভিযুক্তরা জামিন পাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াই ফলপ্রসূ হচ্ছে না।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বরিশালে মাদক নিয়ে কেবল বেচাকেনাই নয়, আধিপত্য বিস্তার ও অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও বাড়ছে। সম্প্রতি নগরীর পলাশপুর এলাকায় মাদকের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, মামলার প্রধান আসামিরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। এর আগে বাকেরগঞ্জ ও আগৈলঝাড়াতেও মাদককেন্দ্রিক বিরোধে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

পলাশপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, সিন্ডিকেটগুলো শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করছে। জনৈক বাসিন্দা বলেন, ‘বস্তিতে মাদকের লেনদেন নিয়ে খুনোখুনি হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।’

গত ১৫ মে রাতে এক যুবককে হত্যার ঘটনায় তার মা দাবি করেন, হত্যাকারীরা চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং এলাকায় তাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। কোনো বড় ঘটনা ঘটলে কয়েক দিন প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে, পরে পরিস্থিতি আবার আগের মতোই হয়ে যায়।

গত এক বছরে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রায় তিন হাজার অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ২১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় ৯০৮টি মামলায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিল ও ক্রিস্টাল আইস উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বড় একটি অংশই ‘রিপিট আসামি’ বা পেশাদার কারবারি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. তানভীর হোসেন খান বলেন, ‘বরিশালে গাঁজা ও ইয়াবাই প্রধান মাদক। নিয়মিত অভিযানে ব্যবসায়ীরা গ্রেপ্তার হলেও একই ব্যক্তি বারবার জামিনে ফিরে আসছেন।’

বিএমপির উপপুলিশ কমিশনার ও অপরাধ গবেষক মো. আব্দুল হান্নান বলেন, ‘পুলিশের গবেষণায় দেখা গেছে, দ্রুত ও সহজে অধিক লাভের আশায় অনেকেই মাদক ব্যবসা ছাড়ছেন না। গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি জেনেও তারা এই অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছেন।’

বিএমপি কমিশনার মো. আশিক সাঈদ বলেন, ‘যাদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ কিছুদিন পরই বের হয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়াচ্ছে। বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।’

আইনজীবী ও আদালত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার শুরু তদন্তপর্ব থেকেই। বরিশালের পিপি আবুল কালাম আজাদ জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ‘প্রকৃত দখল’ (Possession) প্রমাণ করা অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি ৬৬ কেজি গাঁজার একটি মামলায় ঘর থেকে মাদক উদ্ধার হলেও তদন্ত প্রতিবেদনে সেটি কার দখলে ছিল, তা স্পষ্ট করা হয়নি। এ ছাড়া অভিযুক্তের পূর্বের অপরাধের তথ্য ফরওয়ার্ডিংয়ে যথাযথভাবে না আসায় তারা জামিন পেয়ে যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। এর জন্য তদন্তের মান উন্নয়ন, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত