সংবাদ

ওজনে প্রতারণা: প্রতিকার কী?


মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ
মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ
প্রকাশ: ৬ জুলাই ২০২৬, ০২:০৯ পিএম

ওজনে প্রতারণা: প্রতিকার কী?
একসময় ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রে দাঁড়িপাল্লা অপরিহার্য ছিল

একসময় ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রে দাঁড়িপাল্লা অপরিহার্য ছিল। দাঁড়িপাল্লার ঐতিহ্যবাহী যুগ থেকে ডিজিটাল স্কেলের যুগে রূপান্তর পরিমাপের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। যেখানে পুরনো দিনে সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পণ্যদ্রব্যের ওজন পরিমাপের জন্য বাটখারা ও কাঁটার ওপর নির্ভরশীল দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করা হতো, সেখানে এখন নিখুঁত ও দ্রুত ফলাফল প্রদান করে এমন ডিজিটাল সেন্সরযুক্ত স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও দাঁড়িপাল্লা একসময় নির্ভরযোগ্যতা এবং নিরপেক্ষতার প্রতীক ছিল, তবে আধুনিক যুগের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ওজন পরিমাপের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা এবং গতির কারণে ডিজিটাল স্কেল এখন অপরিহার্য। 

অনেক সময় ওজনে কারচুপি করার জন্য ডিজিটাল স্কেলের নিচের অংশে শক্তিশালী চুম্বক লুকিয়ে রাখা হয়। লোহার তৈরি পণ্য ওজন করার সময় চুম্বকের আকর্ষণে ওজন বেশি দেখায়। ডিজিটাল স্কেলের প্লেটের নিচে অদৃশ্য সুতা বা স্প্রিং বেঁধে নিচের দিকে টেনেও পণ্যদ্রব্যের ওজন বাড়ানো হয়। ডিজিটাল স্কেলের ওজন সেটআপ করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ওজন দিয়ে ক্যালিব্রেশন করা হয়, যেমন; ৯০০ গ্রামের একটি বাটখারাকে সফটওয়্যারে ১ কেজি হিসেবে সেট করা হয়। এর ফলে স্কেলটি সবসময় প্রতি কেজিতে ১০০ গ্রাম কম ওজন দেবে। বাতাস ও ফ্যানের বাতাস ব্যবহার করেও ডিজিটাল স্কেলের ওজনে কারচুপি করা হয়। পরিমাপের সময় ডিজিটাল স্কেলের ওপর বা পাশ থেকে তীব্র বাতাস বা ফ্যানের বাতাস দেয়া হয়। বাতাসের চাপের কারণে স্কেলের রিডিংয়ে ওজন বেশি প্রদর্শন করে। ডিজিটাল স্কেলে চার্জ কম থাকলে বা ত্রুটিপূর্ণ ব্যাটারি ব্যবহার করা হলে অথবা অনেক সময় ডিজিটাল স্কেলের ব্যাটারির ভোল্টেজ কমে গেলে রিডিং ভুল দেখায়। অসাধু বিক্রেতারা ইচ্ছাকৃতভাবে কম চার্জে ডিজিটাল স্কেল চালিয়ে ক্রেতাকে ঠকায়। 

অনেক সময় অসাধু বিক্রেতারা ডিজিটাল স্কেলের সামনের স্ক্রিন নষ্ট করে রাখে তখন ক্রেতারা চাইলেও স্কেলের রিডিং দেখতে পারে না। অনেক সময় অসাধু বিক্রেতারা এমন স্থানে ডিজিটাল স্কেল রাখে যেখান থেকে ক্রেতাদের ডিজিটাল স্কেলের রিডিং দেখা সম্ভব হয় না। অসাধু ব্যবসায়ীরা ডিজিটাল স্কেলের কারসাজির মাধ্যমে ওজনে কম দিয়ে সাধারণ জনতাকে প্রতিনিয়ত ঠকাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে ক্যালিব্রেশন পরিবর্তন, রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার বা চতুর কৌশলে ওজন পরিমাপে কম দেয়ার এই প্রতারণা রুখতে সঠিক পরিমাপ ও কারচুপির উপায়গুলো জানা অত্যন্ত জরুরি। 

অসাধু বিক্রেতাদের ডিজিটাল স্কেলের ওজনে কারচুপি মাধ্যমে ঠকতে না চাইলে পণ্যদ্রব্য ক্রয় করার সময় কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে। ডিজিটাল স্কেলের প্রতারণা বা ওজনে কারচুপি থেকে বাঁচতে পণ্য পরিমাপের সময় সোজাসুজি ডিজিটাল স্কেলের ডিসপ্লের দিকে তাকাতে হবে, পণ্য ওজন করার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে, ডিজিটাল স্কেলের রিডিং ‘০.০০’ দেখাচ্ছে কিনা। কোনো পাত্রে পণ্য মাপার সময় পাত্রের ওজন বাদ দেয়ার জন্য 'ঞধৎব' বা 'তবৎড়' বোতাম চেপে স্কেল শূন্য করা হয়েছে কিনা তা দেখতে হবে। বাজারের ব্যাগে একটি আদর্শ ও প্রমাণিত ওজনের বস্তু (যেমন: ৫০০ গ্রাম বা ১ কেজি ওজনের নির্দিষ্ট পাথর বা প্যাকেটজাত পণ্য) রাখা যেতে পারে। প্রয়োজনে সন্দেহ হলে তা দিয়ে ডিজিটাল স্কেলটি পরীক্ষা করে নেয়া যাবে। অনেক সময় ডিজিটাল স্কেলে আগে থেকেই ১০০-১৫০ গ্রাম ওজন বাড়িয়ে বা কমিয়ে সেট করা থাকতে পারে। এটি ধরার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সবসময় নিজের পকেটে থাকা স্মার্টফোনটির ওজন আগে থেকে জেনে রাখা এবং প্রয়োজনে তা মেশিনে মেপে দেখা যেতে পারে। পণ্যদ্রব্য পরিমাপের সময় মেশিনটি যেন কাঠের বা পাথরের সমতল ও শক্ত জায়গায় থাকে তা খেয়াল রাখতে হবে। বাঁকা বা নড়বড়ে জায়গায় ডিজিটাল স্কেল বসালে সঠিক ওজন আসে না। 

মাছ, মাংস বা সবজির ক্ষেত্রে ওজন করার সময় বিক্রেতা যেন তার হাত দিয়ে মেশিন বা বস্তুর ওপর চাপ না দেয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পণ্য কেটে-কুটে পরিষ্কার করার আগে ওজন মেপে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ। পরিমাপে কারচুপি হচ্ছে মনে হলে আশপাশের অন্য কোনো দোকানে বা যাচাই করার জন্য আলাদা ডিজিটাল স্কেলে পণ্যের ওজন পুনরায় মেপে নেয়া যেতে পারে। যে দোকানে বিক্রেতার ডিজিটাল স্কেলের মনিটর নষ্ট বা চার্জ নেই সেই দোকান থেকে পণ্যদ্রব্য না কেনাই ভালো। পণ্যদ্রব্য ক্রয় করার সময় যদি দেখা যায় যে, বিক্রেতার ডিজিটাল স্কেলের মনিটর অন্য দিকে ফেরানো তাহলে বিক্রেতাকে ডিজিটাল স্কেলের মনিটর ক্রেতার দিকে ফেরাতে বলতে হবে। পণ্যদ্রব্য পরিমাপের সময় ডিজিটাল স্কেলের চারপাশ পরিষ্কার আছে কিনা এবং নিচে কোনো অতিরিক্ত তার বা সুতা ঝুলছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। বিক্রেতার ব্যবহৃত ডিজিটাল স্কেলে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন-এর সিল বা ভেরিফিকেশন স্টিকার লাগানো আছে কিনা তা পরিমাপের সময় পরীক্ষা করে দেখতে হবে। 

ডিজিটাল স্কেলে কারসাজি করে ওজনে কম দেয়া হলে তা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ডিজিটাল স্কেল বা ওজনে কারচুপি ও এর মাধ্যমে প্রতারণার বিষয়টি মূলত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন-এর আইন এবং সাধারণ দন্ডবিধির আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ওজন ও পরিমাপ মানদন্ড আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, বাটখারা বা ওজন পরিমাপের যন্ত্রে (যেমন: ডিজিটাল স্কেল) কারচুপি, সিল টেম্পারিং বা ডিজিটাল প্রোগ্রামে পরিবর্তন এনে ওজনে কম দেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রথম বার অপরাধের জন্য শাস্তি ১ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হতে পারে। দ্বিতীয় বা পরবর্তী অপরাধের জন্য শাস্তি সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড, ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডি করা হতে পারে। ডিজিটাল স্কেলে ডিজিটাল ডিভাইস বা প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে প্রতারণার আশ্রয় নিলে তা সাইবার আইনের আওতাভুক্ত অপরাধ হতে পারে। ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করে প্রতারণা করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। ১৮৬০ সালের পেনাল কোডের ৪২০ ধারা অনুযায়ী, প্রতারণার মাধ্যমে কারও থেকে অর্থ বা সম্পত্তি আত্মসাৎ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ওজনে কম দিয়ে পণ্যের বেশি দাম নেয়া এই ধারার অধীনে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ৪৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো বিক্রেতা প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনে পণ্য সরবরাহ করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এতে জেল, জরিমানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার বিধান রয়েছে এবং আরোপকৃত জরিমানার ২৫% তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগকারী ভুক্তভোগীকে প্রদান করা হয়ে থাকে। 

পণ্যদ্রব্য ক্রয়ের সময় বিক্রেতা কর্তৃক ওজনে কম দেওয়া বা ডিজিটাল স্কেলে পণ্যদ্রব্য পরিমাপের ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রমাণ (যেমন- পণ্যের ওজনসহ ছবি, ভিডিও, রসিদ) সংরক্ষণ করতে হবে। ওজন বা পরিমাপের প্রতারণা থেকে প্রতিকার পেতে সরাসরি বিএসটিআই-এর জেলা কার্যালয়ে অথবা বিএসটিআই-এর হটলাইন নম্বর ১৬১১৯ এ যোগাযোগ করে অভিযোগ দাখিল করা যেতে পারে। এছাড়া সরাসরি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর জেলা কার্যালয়ে বা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর হটলাইন নম্বর ১৬১২১ এ যোগাযোগ করে অথবা এই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে অভিযোগ দাখিল করা যেতে পারে

[লেখক: উপপরিচালক, মানিলন্ডারিং শাখা, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রধান কার্যালয়, ঢাকা]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬


ওজনে প্রতারণা: প্রতিকার কী?

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬

featured Image

একসময় ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রে দাঁড়িপাল্লা অপরিহার্য ছিল। দাঁড়িপাল্লার ঐতিহ্যবাহী যুগ থেকে ডিজিটাল স্কেলের যুগে রূপান্তর পরিমাপের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। যেখানে পুরনো দিনে সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পণ্যদ্রব্যের ওজন পরিমাপের জন্য বাটখারা ও কাঁটার ওপর নির্ভরশীল দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করা হতো, সেখানে এখন নিখুঁত ও দ্রুত ফলাফল প্রদান করে এমন ডিজিটাল সেন্সরযুক্ত স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও দাঁড়িপাল্লা একসময় নির্ভরযোগ্যতা এবং নিরপেক্ষতার প্রতীক ছিল, তবে আধুনিক যুগের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ওজন পরিমাপের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা এবং গতির কারণে ডিজিটাল স্কেল এখন অপরিহার্য। 

অনেক সময় ওজনে কারচুপি করার জন্য ডিজিটাল স্কেলের নিচের অংশে শক্তিশালী চুম্বক লুকিয়ে রাখা হয়। লোহার তৈরি পণ্য ওজন করার সময় চুম্বকের আকর্ষণে ওজন বেশি দেখায়। ডিজিটাল স্কেলের প্লেটের নিচে অদৃশ্য সুতা বা স্প্রিং বেঁধে নিচের দিকে টেনেও পণ্যদ্রব্যের ওজন বাড়ানো হয়। ডিজিটাল স্কেলের ওজন সেটআপ করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ওজন দিয়ে ক্যালিব্রেশন করা হয়, যেমন; ৯০০ গ্রামের একটি বাটখারাকে সফটওয়্যারে ১ কেজি হিসেবে সেট করা হয়। এর ফলে স্কেলটি সবসময় প্রতি কেজিতে ১০০ গ্রাম কম ওজন দেবে। বাতাস ও ফ্যানের বাতাস ব্যবহার করেও ডিজিটাল স্কেলের ওজনে কারচুপি করা হয়। পরিমাপের সময় ডিজিটাল স্কেলের ওপর বা পাশ থেকে তীব্র বাতাস বা ফ্যানের বাতাস দেয়া হয়। বাতাসের চাপের কারণে স্কেলের রিডিংয়ে ওজন বেশি প্রদর্শন করে। ডিজিটাল স্কেলে চার্জ কম থাকলে বা ত্রুটিপূর্ণ ব্যাটারি ব্যবহার করা হলে অথবা অনেক সময় ডিজিটাল স্কেলের ব্যাটারির ভোল্টেজ কমে গেলে রিডিং ভুল দেখায়। অসাধু বিক্রেতারা ইচ্ছাকৃতভাবে কম চার্জে ডিজিটাল স্কেল চালিয়ে ক্রেতাকে ঠকায়। 

অনেক সময় অসাধু বিক্রেতারা ডিজিটাল স্কেলের সামনের স্ক্রিন নষ্ট করে রাখে তখন ক্রেতারা চাইলেও স্কেলের রিডিং দেখতে পারে না। অনেক সময় অসাধু বিক্রেতারা এমন স্থানে ডিজিটাল স্কেল রাখে যেখান থেকে ক্রেতাদের ডিজিটাল স্কেলের রিডিং দেখা সম্ভব হয় না। অসাধু ব্যবসায়ীরা ডিজিটাল স্কেলের কারসাজির মাধ্যমে ওজনে কম দিয়ে সাধারণ জনতাকে প্রতিনিয়ত ঠকাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে ক্যালিব্রেশন পরিবর্তন, রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার বা চতুর কৌশলে ওজন পরিমাপে কম দেয়ার এই প্রতারণা রুখতে সঠিক পরিমাপ ও কারচুপির উপায়গুলো জানা অত্যন্ত জরুরি। 

অসাধু বিক্রেতাদের ডিজিটাল স্কেলের ওজনে কারচুপি মাধ্যমে ঠকতে না চাইলে পণ্যদ্রব্য ক্রয় করার সময় কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে। ডিজিটাল স্কেলের প্রতারণা বা ওজনে কারচুপি থেকে বাঁচতে পণ্য পরিমাপের সময় সোজাসুজি ডিজিটাল স্কেলের ডিসপ্লের দিকে তাকাতে হবে, পণ্য ওজন করার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে, ডিজিটাল স্কেলের রিডিং ‘০.০০’ দেখাচ্ছে কিনা। কোনো পাত্রে পণ্য মাপার সময় পাত্রের ওজন বাদ দেয়ার জন্য 'ঞধৎব' বা 'তবৎড়' বোতাম চেপে স্কেল শূন্য করা হয়েছে কিনা তা দেখতে হবে। বাজারের ব্যাগে একটি আদর্শ ও প্রমাণিত ওজনের বস্তু (যেমন: ৫০০ গ্রাম বা ১ কেজি ওজনের নির্দিষ্ট পাথর বা প্যাকেটজাত পণ্য) রাখা যেতে পারে। প্রয়োজনে সন্দেহ হলে তা দিয়ে ডিজিটাল স্কেলটি পরীক্ষা করে নেয়া যাবে। অনেক সময় ডিজিটাল স্কেলে আগে থেকেই ১০০-১৫০ গ্রাম ওজন বাড়িয়ে বা কমিয়ে সেট করা থাকতে পারে। এটি ধরার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সবসময় নিজের পকেটে থাকা স্মার্টফোনটির ওজন আগে থেকে জেনে রাখা এবং প্রয়োজনে তা মেশিনে মেপে দেখা যেতে পারে। পণ্যদ্রব্য পরিমাপের সময় মেশিনটি যেন কাঠের বা পাথরের সমতল ও শক্ত জায়গায় থাকে তা খেয়াল রাখতে হবে। বাঁকা বা নড়বড়ে জায়গায় ডিজিটাল স্কেল বসালে সঠিক ওজন আসে না। 

মাছ, মাংস বা সবজির ক্ষেত্রে ওজন করার সময় বিক্রেতা যেন তার হাত দিয়ে মেশিন বা বস্তুর ওপর চাপ না দেয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পণ্য কেটে-কুটে পরিষ্কার করার আগে ওজন মেপে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ। পরিমাপে কারচুপি হচ্ছে মনে হলে আশপাশের অন্য কোনো দোকানে বা যাচাই করার জন্য আলাদা ডিজিটাল স্কেলে পণ্যের ওজন পুনরায় মেপে নেয়া যেতে পারে। যে দোকানে বিক্রেতার ডিজিটাল স্কেলের মনিটর নষ্ট বা চার্জ নেই সেই দোকান থেকে পণ্যদ্রব্য না কেনাই ভালো। পণ্যদ্রব্য ক্রয় করার সময় যদি দেখা যায় যে, বিক্রেতার ডিজিটাল স্কেলের মনিটর অন্য দিকে ফেরানো তাহলে বিক্রেতাকে ডিজিটাল স্কেলের মনিটর ক্রেতার দিকে ফেরাতে বলতে হবে। পণ্যদ্রব্য পরিমাপের সময় ডিজিটাল স্কেলের চারপাশ পরিষ্কার আছে কিনা এবং নিচে কোনো অতিরিক্ত তার বা সুতা ঝুলছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। বিক্রেতার ব্যবহৃত ডিজিটাল স্কেলে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন-এর সিল বা ভেরিফিকেশন স্টিকার লাগানো আছে কিনা তা পরিমাপের সময় পরীক্ষা করে দেখতে হবে। 

ডিজিটাল স্কেলে কারসাজি করে ওজনে কম দেয়া হলে তা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ডিজিটাল স্কেল বা ওজনে কারচুপি ও এর মাধ্যমে প্রতারণার বিষয়টি মূলত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন-এর আইন এবং সাধারণ দন্ডবিধির আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ওজন ও পরিমাপ মানদন্ড আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, বাটখারা বা ওজন পরিমাপের যন্ত্রে (যেমন: ডিজিটাল স্কেল) কারচুপি, সিল টেম্পারিং বা ডিজিটাল প্রোগ্রামে পরিবর্তন এনে ওজনে কম দেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রথম বার অপরাধের জন্য শাস্তি ১ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হতে পারে। দ্বিতীয় বা পরবর্তী অপরাধের জন্য শাস্তি সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড, ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডি করা হতে পারে। ডিজিটাল স্কেলে ডিজিটাল ডিভাইস বা প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে প্রতারণার আশ্রয় নিলে তা সাইবার আইনের আওতাভুক্ত অপরাধ হতে পারে। ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করে প্রতারণা করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। ১৮৬০ সালের পেনাল কোডের ৪২০ ধারা অনুযায়ী, প্রতারণার মাধ্যমে কারও থেকে অর্থ বা সম্পত্তি আত্মসাৎ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ওজনে কম দিয়ে পণ্যের বেশি দাম নেয়া এই ধারার অধীনে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ৪৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো বিক্রেতা প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনে পণ্য সরবরাহ করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এতে জেল, জরিমানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার বিধান রয়েছে এবং আরোপকৃত জরিমানার ২৫% তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগকারী ভুক্তভোগীকে প্রদান করা হয়ে থাকে। 

পণ্যদ্রব্য ক্রয়ের সময় বিক্রেতা কর্তৃক ওজনে কম দেওয়া বা ডিজিটাল স্কেলে পণ্যদ্রব্য পরিমাপের ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রমাণ (যেমন- পণ্যের ওজনসহ ছবি, ভিডিও, রসিদ) সংরক্ষণ করতে হবে। ওজন বা পরিমাপের প্রতারণা থেকে প্রতিকার পেতে সরাসরি বিএসটিআই-এর জেলা কার্যালয়ে অথবা বিএসটিআই-এর হটলাইন নম্বর ১৬১১৯ এ যোগাযোগ করে অভিযোগ দাখিল করা যেতে পারে। এছাড়া সরাসরি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর জেলা কার্যালয়ে বা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর হটলাইন নম্বর ১৬১২১ এ যোগাযোগ করে অথবা এই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে অভিযোগ দাখিল করা যেতে পারে

[লেখক: উপপরিচালক, মানিলন্ডারিং শাখা, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রধান কার্যালয়, ঢাকা]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত