সংবাদ

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পরিদর্শনে পথে প্রান্তরে


কামরুজ্জামান
কামরুজ্জামান
প্রকাশ: ৫ জুলাই ২০২৬, ১১:১৪ পিএম

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পরিদর্শনে পথে প্রান্তরে
বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এ অঞ্চলের পূর্ব পুরুষদের নগরসভ্যতা, আধুনিক জীবনবোধ ও রুচিশীল সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ জনপদের ইতিহাসকে তুলে ধরে

বাংলাদেশের রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ ভান্ডার। এ ভান্ডার মাটির উপরে যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে মাটির নিচেও। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এ অঞ্চলের পূর্ব পুরুষদের নগরসভ্যতা, আধুনিক জীবনবোধ ও রুচিশীল সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ জনপদের ইতিহাসকে তুলে ধরে।

সুযোগ পেলেই ঘুরতে বের হই। কাছে দূরে যতদূর সুযোগ হয় ভ্রমণ করে আসি। প্রকৃতি ও পরিবেশ দেখতে ভালো লাগে। ভালো লাগে ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করতে। ভ্রমণ মানুষকে আনন্দ দেয়, জ্ঞান অর্জনের পথকে সহজ করে।

গত এক মাসে তিনটি প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গা পরিদর্শন করি। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গা তিনটি হলো- নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলায় অবস্থিত ওয়ারি-বটেশ্বর, আমার নিজ জেলা গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ঈশা খাঁর সমাধি এবং মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলায় অবস্থিত বালিয়াটি জমিদার বাড়ি।

উয়ারী বটেশ্বর : গত ৩১ মে স্থানটি পরিদর্শন করতে যাই। আমার এর আগে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ঈদুল ফিতরের ছুটিতে এবার যাওয়া সম্ভব হলো। উয়ারী ও বটেশ্বর মূলত দুটি গ্রাম। বটেশ্বর গ্রামটি দক্ষিণে অবস্থিত। এবং উয়ারী গ্রামটি উত্তর দিকে অবস্থিত। বটেশ্বর গ্রামে একটি যাদুঘর রয়েছে। উয়ারী ও বটেশ্বরে খনন কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে প্রাথমিক যে সকল মূল্যবান নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলো এই যাদুঘরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখতে পারি, এখানে খনন কার্যক্রম পরিচালনা করার পর যে নগর রাজ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে তা তাম্র যুগের বলে ধারণা করা হয়। এরপর উয়ারী বটেশ্বরে নিয়ে নিজেও গুগুল ঘাটাঘাটি করি। গুগল থেকে জানা যায় - উয়ারী বটেশ্বর হচ্ছে - প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতত্ত্ব স্থল। খননকার্যের মাধ্যমে এখানে একটি সুরক্ষিত নগরকেন্দ্র, পাকা রাস্তা এবং শহরতলির বসতি উন্মোচিত হয়েছে। ধারণা করা হয় এটি মাটির নিচে অবস্থিত একটি দুর্গ-নগরী, যা সাধারণত ভারতীয় উপমহাদেশের তাম্র-পাথর যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে দেখা যায়। প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী, এই স্থানের প্রধান বসতি ছিল লৌহ যুগে, আনুমানিক আড়াই হাজার বছর পূর্বে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ থেকে ১০০ অব্দের মধ্যে। এখান থেকে প্রচুর ছাপাঙ্কিত মুদ্রা এবং উত্তর-ভারতীয় কৃষ্ণ চিক্কণ মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে, যা এই সময়কালের সাক্ষ্য বহন করে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী এটি প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো।

উয়ারী গ্রামের বাসিন্দা রতনের বাড়ির পশ্চিম পাশে পর্যটকদের পরিদর্শনের জন্য একটি উন্মুক্ত যাদুঘর রাখা হয়েছে। এই যাদুঘর রয়েছে - টেরাকোটা দেয়াল, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিমাপের জন্য নির্মিত আবহাওয়া কেন্দ্র, গর্ত বসতি ঘর, আড়াই হাজার বছর পূর্বের বাথটাব, ইট-পাথরের ঢালাই করা রাস্তার অংশ বিশেষ ইত্যাদি। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় - উয়ারী বটেশ্বর গ্রামের পাশ দিয়ে সাগর প্রবাহিত ছিল ( এখনও এই দুই গ্রামের তিন কিলোমিটার পূর্ব পাশ দিয়ে ব্রক্ষ্মপুত্র নদ প্রবাহিত রয়েছে। অর্থাৎ ব্রক্ষ্মপুত্র নদের পাড়ে এই নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল বলে মনে করা হয়।  আরও জানা যায়- বর্তমানে খনন কার্যক্রম সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যাতে নষ্ট না হয় সে জন্য পুরো এলাকাটি মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিক নগর সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এই উয়ারী বটেশ্বর। আমাদের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদেরকে উয়ারী বটেশ্বরের মতো ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ  জায়গা ঘুরে দেখানো উচিত।

ঈশা খাঁর সমাধি : গত পাঁচ জুন সপরিবারে দেখে আসলাম মহাবীর ঈশা খাঁর সমাধি।বার ভূইয়াদের অন্যতম প্রতাপশালী শাসক ছিলেন  ঈশা খাঁ। ঈশা খাঁর রাজধানী ছিল সোনারগাঁও। কিন্তু ঈশা খাঁকে সমাহিত করা হয় গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর গ্রামে। ১৫৯৯ সালে তিনি মারা যান এবং তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী বক্তারপুর দুর্গে সমাহিত করা হয়।

আমাদের কন্যা নুঝহাত জামান রূপকথা আমার কাছে জানতে চাইলো- ঈশা খাঁর রাজধানী ছিল  সোনারগাঁও, তাহলে তিনি এখানে সমাহিত হলেন কেন?

ইতিহাস থেকে যতটুকু জানতে পারি,  সে মোতাবেক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। তাকে বলি, মোঘল শাসকদের সাথে একাধিক যুদ্ধ হয়েছিল ঈশা খাঁর। মোঘল সেনাপতি মানসিংহ ১৫৯৫ সালে কাপাসিয়ার টুকে এক সম্মুখ যুদ্ধে ঈশা খাঁর সাথে পরাজিত হন। পরবর্তীতে আরও যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে এগারো সিন্ধু ও বক্তারপুরে দুর্গ স্থাপন করেন ঈশা খাঁ। জীবনের শেষ দিকে সোনারগাঁও থেকে নৌকা করে কিশোরগঞ্জ যাওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বক্তারপুর দুর্গে চিকিৎসার জন্য অবস্থান নেন এবং এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আর মৃত্যুর পর তাঁকে এখানে সমাহিত করা হয়।

ঈশা খাঁর সমাধিটির খোঁজ  খুব সম্প্রতি সময়ে পাওয়া যায়। সমাধিস্থলে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে লাল সিরামিক ইট ব্যবহার করে একটি সমাধিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। সমাধিস্তম্ভটি প্রায় সাড়ে ১৭ ফুট উচ্চতা এবং প্রায় ২৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থবিশিষ্ট। এতে প্রাচীন নির্মাণ কৌশলের ছাপ রাখা হয়েছে। এ সমাধি স্থলটি দেখার জন্য প্রতিদিন মানুষের আগমন ঘটে থাকে।

বালিয়াটি জমিদার বাড়ি, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ। ৫.৮৮ একর জায়গার উপর বিস্তৃত এই বালিয়াটি জমিদার বাড়ি, যা বালিয়াটি প্রাসাদ নামে পরিচিত। এটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন  জমিদার গোবিন্দ রাম সাহা। তার ছিল চার ছেলে। দধী রাম, পন্ডিত রাম, আনন্দ রাম, গোলাপ রাম। ধারণা করা হয় ছেলেরাই বালিয়াটি প্রাসাদের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। এই প্রাসাদটি ভিতরের দিকে সাতটি খন্ডে বিভক্ত। এই সাতটি খন্ড আবার চার ছেলে আলাদা আলাদা ভবনে বিভক্ত করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতো বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরো প্রাসাদের উত্তর দিকে একটি বিশাল বড় পুকুর রয়েছে। পুকুরে ছিল সাতটি ঘাট। একটি ঘাট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ছয়টি ঘাট এখনও স্পষ্ট রয়েছে। এই জন্য এই পুকুরকে ছয়ঘাট পুকুর বলা হয়। বিশুদ্ধ পানির জন্য পুকুর পাড়ে একটি ইঁদারা তৈরি করা হয়। যেটি এখনও রয়েছে এবং ইঁদারার মুখ লোহার রডের ঘন নেট দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে।


অতি আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে - এই পুকুরের উত্তর-পশ্চিম দিকে একটি সুরঙ্গ বা চ্যানেল ছিল যার মাধ্যমে জোয়ার-ভাটার পানি প্রবাহিত হতো। নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে চ্যানেলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বালিয়াটি জমিদার গোবিন্দ রাম সাহা ছিলেন একজন লবন ব্যবসায়ী। তার ছেলেরাও ব্যবসায়ী ছিলেন। এবং এই প্রাসাদ থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করতেন। প্রাসাদের প্রবেশ পথে প্রথম ভবনের দোতলায় একটি যাদুঘর রয়েছে। জমিদার পরিবারের ব্যবহৃত জিনিসপত্র এই যাদুঘরে সংরক্ষণ রয়েছে। ভবনের নিচ তলায় রয়েছে অনেকগুলো লোহার সিন্ধুক। যেগুলো মূল্যবান জিনিসপত্র রাখার জন্য ব্যবহৃত হতো। বিভিন্ন ভবনে ছিল এই সব সিন্ধুক। পর্যটকদের পরিদর্শনের জন্য সবগুলো একসাথে করা হয়েছে। দোতলার যাদুঘরে রয়েছে - ব্যবসায় ব্যবহৃত লোহার তৈরি ক্যাশবাক্স, হ্যাজাক বাতি, হারিকেন, শ্বেতপাথরের টেবিল, থাকার খাট, আলমারি, বেলজিয়াম আয়না, ডাইনিং টেবিল ইত্যাদি। সর্বত্র চোখে পড়ে কারুকাজ খচিত মেঝে ও দেয়াল। পুরো ভবন জুড়ে রয়েছে থাম ও লোহার বীম। দোতলায় তিনতলায় উঠার জন্য সিড়ির পাশাপাশি রয়েছে ঢালাই করা লোহার পেঁচানো সিড়ি। যা দেখতে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এবং মনোমুগ্ধকর।

গেইট দিয়ে ঢুকলে প্রথমেই চোখে পড়ে শ্বেতপাথরের তৈরি দৃষ্টিনন্দন পানির ফোয়ারা। হাতের বাম পাশে রয়েছে মাঝারি আয়তনের একটি পরিচ্ছন্ন মাঠ ও নাট্যমঞ্চ। এই নাট্যমঞ্চের পাশাপাশি এখানে রয়েছে  বালিয়াটি ক্লাব ও একটি লাইব্রেরি।

গত ২৭ জুন এই জায়গাটি পরিদর্শনে যাই। সবমিলিয়ে বলা যায়, বালিয়াটি জমিদার বাড়ি একদিনের ভ্রমণের জন্য দারুণ একটি জায়গা।

বাংলার পথপ্রান্তরে প্রাচীন আমলের যে সব স্থাপনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সেগুলোই আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গভীর শেকড়। এ সবের মাধ্যমে আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের জীবন ও সংগ্রাম এবং আর্থসামাজিক অবস্থা ও নগর সভ্যতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাই। এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো পরিদর্শন করা প্রয়োজন।

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬


প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পরিদর্শনে পথে প্রান্তরে

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ ভান্ডার। এ ভান্ডার মাটির উপরে যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে মাটির নিচেও। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এ অঞ্চলের পূর্ব পুরুষদের নগরসভ্যতা, আধুনিক জীবনবোধ ও রুচিশীল সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ জনপদের ইতিহাসকে তুলে ধরে।

সুযোগ পেলেই ঘুরতে বের হই। কাছে দূরে যতদূর সুযোগ হয় ভ্রমণ করে আসি। প্রকৃতি ও পরিবেশ দেখতে ভালো লাগে। ভালো লাগে ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করতে। ভ্রমণ মানুষকে আনন্দ দেয়, জ্ঞান অর্জনের পথকে সহজ করে।

গত এক মাসে তিনটি প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গা পরিদর্শন করি। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গা তিনটি হলো- নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলায় অবস্থিত ওয়ারি-বটেশ্বর, আমার নিজ জেলা গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ঈশা খাঁর সমাধি এবং মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলায় অবস্থিত বালিয়াটি জমিদার বাড়ি।

উয়ারী বটেশ্বর : গত ৩১ মে স্থানটি পরিদর্শন করতে যাই। আমার এর আগে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ঈদুল ফিতরের ছুটিতে এবার যাওয়া সম্ভব হলো। উয়ারী ও বটেশ্বর মূলত দুটি গ্রাম। বটেশ্বর গ্রামটি দক্ষিণে অবস্থিত। এবং উয়ারী গ্রামটি উত্তর দিকে অবস্থিত। বটেশ্বর গ্রামে একটি যাদুঘর রয়েছে। উয়ারী ও বটেশ্বরে খনন কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে প্রাথমিক যে সকল মূল্যবান নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলো এই যাদুঘরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখতে পারি, এখানে খনন কার্যক্রম পরিচালনা করার পর যে নগর রাজ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে তা তাম্র যুগের বলে ধারণা করা হয়। এরপর উয়ারী বটেশ্বরে নিয়ে নিজেও গুগুল ঘাটাঘাটি করি। গুগল থেকে জানা যায় - উয়ারী বটেশ্বর হচ্ছে - প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতত্ত্ব স্থল। খননকার্যের মাধ্যমে এখানে একটি সুরক্ষিত নগরকেন্দ্র, পাকা রাস্তা এবং শহরতলির বসতি উন্মোচিত হয়েছে। ধারণা করা হয় এটি মাটির নিচে অবস্থিত একটি দুর্গ-নগরী, যা সাধারণত ভারতীয় উপমহাদেশের তাম্র-পাথর যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে দেখা যায়। প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী, এই স্থানের প্রধান বসতি ছিল লৌহ যুগে, আনুমানিক আড়াই হাজার বছর পূর্বে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ থেকে ১০০ অব্দের মধ্যে। এখান থেকে প্রচুর ছাপাঙ্কিত মুদ্রা এবং উত্তর-ভারতীয় কৃষ্ণ চিক্কণ মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে, যা এই সময়কালের সাক্ষ্য বহন করে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী এটি প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো।

উয়ারী গ্রামের বাসিন্দা রতনের বাড়ির পশ্চিম পাশে পর্যটকদের পরিদর্শনের জন্য একটি উন্মুক্ত যাদুঘর রাখা হয়েছে। এই যাদুঘর রয়েছে - টেরাকোটা দেয়াল, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিমাপের জন্য নির্মিত আবহাওয়া কেন্দ্র, গর্ত বসতি ঘর, আড়াই হাজার বছর পূর্বের বাথটাব, ইট-পাথরের ঢালাই করা রাস্তার অংশ বিশেষ ইত্যাদি। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় - উয়ারী বটেশ্বর গ্রামের পাশ দিয়ে সাগর প্রবাহিত ছিল ( এখনও এই দুই গ্রামের তিন কিলোমিটার পূর্ব পাশ দিয়ে ব্রক্ষ্মপুত্র নদ প্রবাহিত রয়েছে। অর্থাৎ ব্রক্ষ্মপুত্র নদের পাড়ে এই নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল বলে মনে করা হয়।  আরও জানা যায়- বর্তমানে খনন কার্যক্রম সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যাতে নষ্ট না হয় সে জন্য পুরো এলাকাটি মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিক নগর সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এই উয়ারী বটেশ্বর। আমাদের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদেরকে উয়ারী বটেশ্বরের মতো ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ  জায়গা ঘুরে দেখানো উচিত।

ঈশা খাঁর সমাধি : গত পাঁচ জুন সপরিবারে দেখে আসলাম মহাবীর ঈশা খাঁর সমাধি।বার ভূইয়াদের অন্যতম প্রতাপশালী শাসক ছিলেন  ঈশা খাঁ। ঈশা খাঁর রাজধানী ছিল সোনারগাঁও। কিন্তু ঈশা খাঁকে সমাহিত করা হয় গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর গ্রামে। ১৫৯৯ সালে তিনি মারা যান এবং তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী বক্তারপুর দুর্গে সমাহিত করা হয়।

আমাদের কন্যা নুঝহাত জামান রূপকথা আমার কাছে জানতে চাইলো- ঈশা খাঁর রাজধানী ছিল  সোনারগাঁও, তাহলে তিনি এখানে সমাহিত হলেন কেন?

ইতিহাস থেকে যতটুকু জানতে পারি,  সে মোতাবেক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। তাকে বলি, মোঘল শাসকদের সাথে একাধিক যুদ্ধ হয়েছিল ঈশা খাঁর। মোঘল সেনাপতি মানসিংহ ১৫৯৫ সালে কাপাসিয়ার টুকে এক সম্মুখ যুদ্ধে ঈশা খাঁর সাথে পরাজিত হন। পরবর্তীতে আরও যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে এগারো সিন্ধু ও বক্তারপুরে দুর্গ স্থাপন করেন ঈশা খাঁ। জীবনের শেষ দিকে সোনারগাঁও থেকে নৌকা করে কিশোরগঞ্জ যাওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বক্তারপুর দুর্গে চিকিৎসার জন্য অবস্থান নেন এবং এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আর মৃত্যুর পর তাঁকে এখানে সমাহিত করা হয়।

ঈশা খাঁর সমাধিটির খোঁজ  খুব সম্প্রতি সময়ে পাওয়া যায়। সমাধিস্থলে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে লাল সিরামিক ইট ব্যবহার করে একটি সমাধিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। সমাধিস্তম্ভটি প্রায় সাড়ে ১৭ ফুট উচ্চতা এবং প্রায় ২৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থবিশিষ্ট। এতে প্রাচীন নির্মাণ কৌশলের ছাপ রাখা হয়েছে। এ সমাধি স্থলটি দেখার জন্য প্রতিদিন মানুষের আগমন ঘটে থাকে।

বালিয়াটি জমিদার বাড়ি, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ। ৫.৮৮ একর জায়গার উপর বিস্তৃত এই বালিয়াটি জমিদার বাড়ি, যা বালিয়াটি প্রাসাদ নামে পরিচিত। এটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন  জমিদার গোবিন্দ রাম সাহা। তার ছিল চার ছেলে। দধী রাম, পন্ডিত রাম, আনন্দ রাম, গোলাপ রাম। ধারণা করা হয় ছেলেরাই বালিয়াটি প্রাসাদের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। এই প্রাসাদটি ভিতরের দিকে সাতটি খন্ডে বিভক্ত। এই সাতটি খন্ড আবার চার ছেলে আলাদা আলাদা ভবনে বিভক্ত করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতো বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরো প্রাসাদের উত্তর দিকে একটি বিশাল বড় পুকুর রয়েছে। পুকুরে ছিল সাতটি ঘাট। একটি ঘাট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ছয়টি ঘাট এখনও স্পষ্ট রয়েছে। এই জন্য এই পুকুরকে ছয়ঘাট পুকুর বলা হয়। বিশুদ্ধ পানির জন্য পুকুর পাড়ে একটি ইঁদারা তৈরি করা হয়। যেটি এখনও রয়েছে এবং ইঁদারার মুখ লোহার রডের ঘন নেট দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে।


অতি আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে - এই পুকুরের উত্তর-পশ্চিম দিকে একটি সুরঙ্গ বা চ্যানেল ছিল যার মাধ্যমে জোয়ার-ভাটার পানি প্রবাহিত হতো। নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে চ্যানেলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বালিয়াটি জমিদার গোবিন্দ রাম সাহা ছিলেন একজন লবন ব্যবসায়ী। তার ছেলেরাও ব্যবসায়ী ছিলেন। এবং এই প্রাসাদ থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করতেন। প্রাসাদের প্রবেশ পথে প্রথম ভবনের দোতলায় একটি যাদুঘর রয়েছে। জমিদার পরিবারের ব্যবহৃত জিনিসপত্র এই যাদুঘরে সংরক্ষণ রয়েছে। ভবনের নিচ তলায় রয়েছে অনেকগুলো লোহার সিন্ধুক। যেগুলো মূল্যবান জিনিসপত্র রাখার জন্য ব্যবহৃত হতো। বিভিন্ন ভবনে ছিল এই সব সিন্ধুক। পর্যটকদের পরিদর্শনের জন্য সবগুলো একসাথে করা হয়েছে। দোতলার যাদুঘরে রয়েছে - ব্যবসায় ব্যবহৃত লোহার তৈরি ক্যাশবাক্স, হ্যাজাক বাতি, হারিকেন, শ্বেতপাথরের টেবিল, থাকার খাট, আলমারি, বেলজিয়াম আয়না, ডাইনিং টেবিল ইত্যাদি। সর্বত্র চোখে পড়ে কারুকাজ খচিত মেঝে ও দেয়াল। পুরো ভবন জুড়ে রয়েছে থাম ও লোহার বীম। দোতলায় তিনতলায় উঠার জন্য সিড়ির পাশাপাশি রয়েছে ঢালাই করা লোহার পেঁচানো সিড়ি। যা দেখতে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এবং মনোমুগ্ধকর।

গেইট দিয়ে ঢুকলে প্রথমেই চোখে পড়ে শ্বেতপাথরের তৈরি দৃষ্টিনন্দন পানির ফোয়ারা। হাতের বাম পাশে রয়েছে মাঝারি আয়তনের একটি পরিচ্ছন্ন মাঠ ও নাট্যমঞ্চ। এই নাট্যমঞ্চের পাশাপাশি এখানে রয়েছে  বালিয়াটি ক্লাব ও একটি লাইব্রেরি।

গত ২৭ জুন এই জায়গাটি পরিদর্শনে যাই। সবমিলিয়ে বলা যায়, বালিয়াটি জমিদার বাড়ি একদিনের ভ্রমণের জন্য দারুণ একটি জায়গা।

বাংলার পথপ্রান্তরে প্রাচীন আমলের যে সব স্থাপনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সেগুলোই আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গভীর শেকড়। এ সবের মাধ্যমে আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের জীবন ও সংগ্রাম এবং আর্থসামাজিক অবস্থা ও নগর সভ্যতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাই। এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো পরিদর্শন করা প্রয়োজন।

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত