এক রাতের বৃষ্টিতেই রাজধানীর পরিচিত সড়কগুলো যেন নদীতে পরিণত হলো। ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকার অলিগলি, প্রধান সড়ক ও বিপণিবিতানের সামনে জমেছে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। কোথাও গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে আছে, কোথাও মানুষ জুতা হাতে নোংরা পানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। নিচতলার বাসাবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকেছে। শিশু, বৃদ্ধ, রোগী ও কর্মজীবী মানুষের দুর্ভোগের যেন কোনো সীমা নেই।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জুলাই ভোর ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ছয় ঘণ্টায় বৃষ্টি হয় ৭৬ মিলিমিটার।ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে গিয়ে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। এমনকি পানিবন্দী সড়কে মাত্র ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে কোথাও প্রায় ৯০ মিনিট সময় লেগেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্যগুলো দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে আমরা কোন দেশের রাজধানীতে বাস করছি? উন্নয়নের এত গল্প, এত বড় বড় প্রকল্প, এত ব্যয় তারপরও কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কেন অচল হয়ে পড়ে প্রায় দুই কোটি মানুষের এই নগরী?
প্রশ্নটি শুধু ক্ষোভের নয়, এটি নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন।
বৃষ্টি প্রাকৃতিক, কিন্তু জলাবদ্ধতা কি পুরোপুরি প্রাকৃতিক?
বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিও হতে পারে। কিন্তু একটি আধুনিক রাজধানীর রাস্তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে থাকবে, গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যাবে, মানুষ হাসপাতালে বা কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবে না এটি স্বাভাবিক নয়।
বৃষ্টিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না; কিন্তু বৃষ্টির পানি কোন পথে, কত দ্রুত শহর থেকে বেরিয়ে যাবে সেটি নিশ্চিত করা নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মৌলিক দায়িত্ব।
ঢাকার জলাবদ্ধতা তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এর পেছনে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাশয় দখল, অপর্যাপ্ত ও বিচ্ছিন্ন ড্রেনেজব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। গবেষণায়ও ঢাকার দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ধ্বংসকে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ড্রেন আছে, কিন্তু পানি যাবে কোথায়?
ঢাকায় ড্রেন একেবারেই নেই এ কথা ঠিক নয়। শহরের বিভিন্ন স্থানে ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু ড্রেন থাকলেই তো হবে না; সেই ড্রেনের পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
একটি এলাকার ড্রেন পরিষ্কার থাকলেও সেটি যদি কোনো বন্ধ খাল, ভরাট জলাশয় অথবা সংকুচিত নালার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে পানি বের হবে কীভাবে?
একসময় ঢাকার বৃষ্টির পানি অসংখ্য খাল, পুকুর, নিম্নভূমি ও জলাভূমির মাধ্যমে আশপাশের নদীতে গিয়ে পড়ত। এসব প্রাকৃতিক জলাধার কিছু পানি ধারণ করত, কিছু পানি মাটির নিচে প্রবেশ করাত এবং বাকি পানি ধীরে ধীরে নদীতে নিয়ে যেত।
কিন্তু উন্নয়নের নামে আমরা সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাই ধ্বংস করেছি। খাল ভরাট করে রাস্তা, ভবন ও আবাসন প্রকল্প হয়েছে; পুকুর ও নিচু জমি ভরাট হয়েছে; জলপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়েছে। ফলে পানি নামার পথ না পেয়ে রাস্তায় জমছে।
খালের ওপর শুধু দৃষ্টিনন্দন সেতু বা হাঁটার পথ বানিয়ে তাকে জীবন্ত করা যায় না। খালের শুরু ও শেষ প্রান্ত, ড্রেনের সংযোগ এবং নদীতে পানি পড়ার পথ সচল রাখতে হবে। একটি খালের মাঝের অংশ উদ্ধার করে দুই প্রান্ত বন্ধ রেখে দিলে সেটি পানি নিষ্কাশনের পথ নয়, বরং একটি স্থির জলাধারে পরিণত হবে।
কংক্রিটে ঢাকা শহর
ঢাকার বড় অংশ এখন কংক্রিট, পিচ, টাইলস ও ভবনে ঢাকা। বাড়ির উঠান, মাটির পথ, বাগান, খোলা মাঠ ও নিচু জমি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
আগে বৃষ্টির একটি অংশ মাটিতে শোষিত হতো। এখন অধিকাংশ পানি একসঙ্গে সড়ক ও ড্রেনে এসে পড়ছে। ফলে স্বল্প সময়ে ড্রেনের ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি পানি তৈরি হচ্ছে।
নতুন ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার সময় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ছাদের পানি ধরে রাখা, ভবনের নির্দিষ্ট অংশ খোলা রাখা এবং পানি মাটিতে প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা। বাস্তবে এসব শর্ত কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, তার নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
শুধু ভবন নির্মাণের অনুমতি দিলেই হবে না; সেই ভবনের কারণে এলাকার জনসংখ্যা, যানবাহন, বর্জ্য ও বৃষ্টির পানির চাপ কতটা বাড়বে, সেটিও হিসাব করতে হবে।
পলিথিন ও বর্জ্যে বন্ধ ড্রেন
ঢাকার জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। রাস্তায় ফেলে দেওয়া পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট, কাপ, কাগজ, গৃহস্থালি আবর্জনা ও নির্মাণবর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে গিয়ে জমে।
ফলে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক জায়গায় ড্রেন পরিষ্কারের পর তোলা ময়লা রাস্তার পাশেই রেখে দেওয়া হয়। বৃষ্টি হলে সেই ময়লা আবার ড্রেনে ফিরে যায়।
এখানে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। যে মানুষটি রাস্তায় পলিথিন বা ময়লা ফেলছেন, তিনিই পরদিন জলাবদ্ধতার জন্য কর্তৃপক্ষকে দায়ী করছেন। তবে শুধু নাগরিককে দোষারোপ করে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নির্মাণবর্জ্য অপসারণ এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও নগর কর্তৃপক্ষের কাজ।
পয়োনিষ্কাশন আর বৃষ্টির পানি একই পথে কেন?
ঢাকার বহু এলাকায় বৃষ্টির পানি, গৃহস্থালি বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের সংযোগ একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে। ড্রেন বন্ধ হলে নোংরা ও দূষিত পানি রাস্তায় উঠে আসে।
এই পানির মধ্যে হেঁটে চলতে গিয়ে মানুষ চর্মরোগ, ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নর্দমার পানি বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
একটি আধুনিক নগরে পয়োবর্জ্য বহনের লাইন এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আলাদা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার বহু জায়গায় এখনো এই মৌলিক বিভাজন কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি।
দায়িত্ব অনেকের, জবাবদিহি কার?
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের সঙ্গে সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।
একটি সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করে, আরেকটি ড্রেন করে, অন্য একটি সংস্থা খাল দেখাশোনা করে। আবার রাস্তা নির্মাণের কিছুদিন পর পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বা অন্য কোনো সেবা সংস্থা সেটি খুঁড়ে ফেলে। সমন্বিত নকশা ও কার্যকর তদারকি না থাকায় একটি কাজ করতে গিয়ে আরেকটি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে প্রায় প্রতি বছরই নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়, অর্থ বরাদ্দ হয়, খাল পরিষ্কার ও ড্রেন সংস্কারের ঘোষণা আসে। কিন্তু প্রথম বড় বৃষ্টিতেই শহরের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পায়।
নাগরিকেরা তাই জানতে চান কোথায় কত টাকা ব্যয় হয়েছে? কোন এলাকার ড্রেন কতটুকু বৃষ্টি সামলাতে সক্ষম? কাজের মান পরীক্ষা করেছে কে? ব্যর্থতার জন্য কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়েছে কি?
দায়িত্ব যখন অনেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে, তখন ব্যর্থতার দায় যেন শেষ পর্যন্ত কারও ওপরই পড়ে না।
জলবায়ু পরিবর্তন অজুহাত নয়
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে ভারী ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ছে এটি বাস্তবতা। চলতি বর্ষাতেও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে ঢাকা বিভাগসহ বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনকে সব ব্যর্থতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বরং বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে জেনেই আমাদের নগর পরিকল্পনা, ড্রেনের ধারণক্ষমতা ও জরুরি ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে হবে।
বিশ কিংবা ত্রিশ বছর আগের বৃষ্টিপাত ও জনসংখ্যার হিসাব ধরে বর্তমান ঢাকার ড্রেনেজব্যবস্থা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এখনকার নগর পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলাভূমি সংকোচন এবং জনসংখ্যার চাপ বিবেচনায় নিতে হবে।
সমাধানের পথ কোথায়?
প্রথমেই ঢাকার সব খাল, পুকুর, জলাধার, নিম্নভূমি এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করে একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন দেখতে পারেন, কোন খালের সীমানা কতটুকু এবং কোথায় দখল হয়েছে।
দখলমুক্ত করার পর খালগুলোর সঙ্গে ড্রেন ও নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে। শুধু খনন বা সৌন্দর্যবর্ধন নয়, পানি প্রবাহের পুরো পথ সচল রাখা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, পুরো ঢাকার জন্য একটি সমন্বিত স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে আলাদাভাবে নয়, পুরো রাজধানী ও আশপাশের নদী-খালকে একটি অভিন্ন জলপ্রবাহ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তৃতীয়ত, বর্ষার আগে লোকদেখানো পরিচ্ছন্নতার পরিবর্তে সারা বছর ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। কোন ড্রেন কখন পরিষ্কার হলো, কত বর্জ্য তোলা হলো এবং কত টাকা ব্যয় হলো তা নাগরিকদের জন্য প্রকাশ করতে হবে।
চতুর্থত, জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর, ক্যামেরা ও তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ড্রেনের পানির উচ্চতা, প্রবাহ এবং কোথায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে তা আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। ঢাকার জন্য এমন প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা গবেষণায়ও উঠে এসেছে।
পঞ্চমত, নতুন ভবন ও আবাসন প্রকল্পে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, ছাদবাগান, পানি শোষণযোগ্য খোলা জায়গা এবং নিজস্ব পানি ধারণব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিধিমালা না মানলে ভবনের অনুমোদন বাতিল বা জরিমানার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ষষ্ঠত, পলিথিন ও নির্মাণবর্জ্য ড্রেনে ফেলার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের জন্য সহজ ও নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য একটি প্রধান সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ বা কমান্ড কাঠামো প্রয়োজন। জলাবদ্ধতা হলে কে দায় নেবে, কে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে এবং কার কাছে নাগরিক অভিযোগ জানাবে এটি সুস্পষ্ট হতে হবে।
বৃষ্টি অপরাধী নয়
প্রতি বর্ষায় আমরা একই দৃশ্য দেখি। মানুষ দুর্ভোগে পড়ে, সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করেন, জরুরি বৈঠক হয় এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। কয়েক দিন পর পানি নেমে গেলে আলোচনা থেমে যায়। পরের বৃষ্টিতে আবার একই দুর্ভোগ ফিরে আসে।
এভাবে একটি রাজধানী চলতে পারে না। বৃষ্টির কারণে মানুষ কর্মস্থলে যেতে পারবে না, রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে পারবে না, পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে যেতে পারবে না এবং নিচতলার বাসিন্দারা ঘর রক্ষায় রাত কাটাবেন এটি কোনো আধুনিক শহরের স্বাভাবিক চিত্র নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে বৃষ্টি অপরাধী নয়। অপরাধী সেই নগর পরিকল্পনা, যেখানে পানির বেরিয়ে যাওয়ার পথ রাখা হয়নি সেই উন্নয়ন, যা খাল, জলাধার ও নিম্নভূমি ধ্বংস করেছে; এবং সেই ব্যবস্থাপনা, যা প্রতি বর্ষায় মানুষের দুর্ভোগ দেখেও বদলায় না।
ঢাকাকে বাঁচাতে আর নতুন কোনো স্লোগানের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন খাল উদ্ধার, কার্যকর ড্রেনেজ, জলাধার সংরক্ষণ, সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।
তা না হলে কোটি মানুষের এই রাজধানী ক্রমেই এমন এক নগরীতে পরিণত হবে, যেখানে আকাশে মেঘ জমলেই নাগরিকের মনে একটি আতঙ্ক ঘনীভূত হবে আজ আবার কতটা ডুববে ঢাকা?
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬
এক রাতের বৃষ্টিতেই রাজধানীর পরিচিত সড়কগুলো যেন নদীতে পরিণত হলো। ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকার অলিগলি, প্রধান সড়ক ও বিপণিবিতানের সামনে জমেছে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। কোথাও গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে আছে, কোথাও মানুষ জুতা হাতে নোংরা পানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। নিচতলার বাসাবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকেছে। শিশু, বৃদ্ধ, রোগী ও কর্মজীবী মানুষের দুর্ভোগের যেন কোনো সীমা নেই।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জুলাই ভোর ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ছয় ঘণ্টায় বৃষ্টি হয় ৭৬ মিলিমিটার।ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে গিয়ে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। এমনকি পানিবন্দী সড়কে মাত্র ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে কোথাও প্রায় ৯০ মিনিট সময় লেগেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্যগুলো দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে আমরা কোন দেশের রাজধানীতে বাস করছি? উন্নয়নের এত গল্প, এত বড় বড় প্রকল্প, এত ব্যয় তারপরও কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কেন অচল হয়ে পড়ে প্রায় দুই কোটি মানুষের এই নগরী?
প্রশ্নটি শুধু ক্ষোভের নয়, এটি নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন।
বৃষ্টি প্রাকৃতিক, কিন্তু জলাবদ্ধতা কি পুরোপুরি প্রাকৃতিক?
বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিও হতে পারে। কিন্তু একটি আধুনিক রাজধানীর রাস্তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে থাকবে, গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যাবে, মানুষ হাসপাতালে বা কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবে না এটি স্বাভাবিক নয়।
বৃষ্টিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না; কিন্তু বৃষ্টির পানি কোন পথে, কত দ্রুত শহর থেকে বেরিয়ে যাবে সেটি নিশ্চিত করা নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মৌলিক দায়িত্ব।
ঢাকার জলাবদ্ধতা তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এর পেছনে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাশয় দখল, অপর্যাপ্ত ও বিচ্ছিন্ন ড্রেনেজব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। গবেষণায়ও ঢাকার দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ধ্বংসকে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ড্রেন আছে, কিন্তু পানি যাবে কোথায়?
ঢাকায় ড্রেন একেবারেই নেই এ কথা ঠিক নয়। শহরের বিভিন্ন স্থানে ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু ড্রেন থাকলেই তো হবে না; সেই ড্রেনের পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
একটি এলাকার ড্রেন পরিষ্কার থাকলেও সেটি যদি কোনো বন্ধ খাল, ভরাট জলাশয় অথবা সংকুচিত নালার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে পানি বের হবে কীভাবে?
একসময় ঢাকার বৃষ্টির পানি অসংখ্য খাল, পুকুর, নিম্নভূমি ও জলাভূমির মাধ্যমে আশপাশের নদীতে গিয়ে পড়ত। এসব প্রাকৃতিক জলাধার কিছু পানি ধারণ করত, কিছু পানি মাটির নিচে প্রবেশ করাত এবং বাকি পানি ধীরে ধীরে নদীতে নিয়ে যেত।
কিন্তু উন্নয়নের নামে আমরা সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাই ধ্বংস করেছি। খাল ভরাট করে রাস্তা, ভবন ও আবাসন প্রকল্প হয়েছে; পুকুর ও নিচু জমি ভরাট হয়েছে; জলপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়েছে। ফলে পানি নামার পথ না পেয়ে রাস্তায় জমছে।
খালের ওপর শুধু দৃষ্টিনন্দন সেতু বা হাঁটার পথ বানিয়ে তাকে জীবন্ত করা যায় না। খালের শুরু ও শেষ প্রান্ত, ড্রেনের সংযোগ এবং নদীতে পানি পড়ার পথ সচল রাখতে হবে। একটি খালের মাঝের অংশ উদ্ধার করে দুই প্রান্ত বন্ধ রেখে দিলে সেটি পানি নিষ্কাশনের পথ নয়, বরং একটি স্থির জলাধারে পরিণত হবে।
কংক্রিটে ঢাকা শহর
ঢাকার বড় অংশ এখন কংক্রিট, পিচ, টাইলস ও ভবনে ঢাকা। বাড়ির উঠান, মাটির পথ, বাগান, খোলা মাঠ ও নিচু জমি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
আগে বৃষ্টির একটি অংশ মাটিতে শোষিত হতো। এখন অধিকাংশ পানি একসঙ্গে সড়ক ও ড্রেনে এসে পড়ছে। ফলে স্বল্প সময়ে ড্রেনের ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি পানি তৈরি হচ্ছে।
নতুন ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার সময় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ছাদের পানি ধরে রাখা, ভবনের নির্দিষ্ট অংশ খোলা রাখা এবং পানি মাটিতে প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা। বাস্তবে এসব শর্ত কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, তার নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
শুধু ভবন নির্মাণের অনুমতি দিলেই হবে না; সেই ভবনের কারণে এলাকার জনসংখ্যা, যানবাহন, বর্জ্য ও বৃষ্টির পানির চাপ কতটা বাড়বে, সেটিও হিসাব করতে হবে।
পলিথিন ও বর্জ্যে বন্ধ ড্রেন
ঢাকার জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। রাস্তায় ফেলে দেওয়া পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট, কাপ, কাগজ, গৃহস্থালি আবর্জনা ও নির্মাণবর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে গিয়ে জমে।
ফলে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক জায়গায় ড্রেন পরিষ্কারের পর তোলা ময়লা রাস্তার পাশেই রেখে দেওয়া হয়। বৃষ্টি হলে সেই ময়লা আবার ড্রেনে ফিরে যায়।
এখানে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। যে মানুষটি রাস্তায় পলিথিন বা ময়লা ফেলছেন, তিনিই পরদিন জলাবদ্ধতার জন্য কর্তৃপক্ষকে দায়ী করছেন। তবে শুধু নাগরিককে দোষারোপ করে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নির্মাণবর্জ্য অপসারণ এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও নগর কর্তৃপক্ষের কাজ।
পয়োনিষ্কাশন আর বৃষ্টির পানি একই পথে কেন?
ঢাকার বহু এলাকায় বৃষ্টির পানি, গৃহস্থালি বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের সংযোগ একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে। ড্রেন বন্ধ হলে নোংরা ও দূষিত পানি রাস্তায় উঠে আসে।
এই পানির মধ্যে হেঁটে চলতে গিয়ে মানুষ চর্মরোগ, ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নর্দমার পানি বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
একটি আধুনিক নগরে পয়োবর্জ্য বহনের লাইন এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আলাদা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার বহু জায়গায় এখনো এই মৌলিক বিভাজন কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি।
দায়িত্ব অনেকের, জবাবদিহি কার?
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের সঙ্গে সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।
একটি সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করে, আরেকটি ড্রেন করে, অন্য একটি সংস্থা খাল দেখাশোনা করে। আবার রাস্তা নির্মাণের কিছুদিন পর পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বা অন্য কোনো সেবা সংস্থা সেটি খুঁড়ে ফেলে। সমন্বিত নকশা ও কার্যকর তদারকি না থাকায় একটি কাজ করতে গিয়ে আরেকটি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে প্রায় প্রতি বছরই নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়, অর্থ বরাদ্দ হয়, খাল পরিষ্কার ও ড্রেন সংস্কারের ঘোষণা আসে। কিন্তু প্রথম বড় বৃষ্টিতেই শহরের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পায়।
নাগরিকেরা তাই জানতে চান কোথায় কত টাকা ব্যয় হয়েছে? কোন এলাকার ড্রেন কতটুকু বৃষ্টি সামলাতে সক্ষম? কাজের মান পরীক্ষা করেছে কে? ব্যর্থতার জন্য কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়েছে কি?
দায়িত্ব যখন অনেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে, তখন ব্যর্থতার দায় যেন শেষ পর্যন্ত কারও ওপরই পড়ে না।
জলবায়ু পরিবর্তন অজুহাত নয়
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে ভারী ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ছে এটি বাস্তবতা। চলতি বর্ষাতেও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে ঢাকা বিভাগসহ বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনকে সব ব্যর্থতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বরং বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে জেনেই আমাদের নগর পরিকল্পনা, ড্রেনের ধারণক্ষমতা ও জরুরি ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে হবে।
বিশ কিংবা ত্রিশ বছর আগের বৃষ্টিপাত ও জনসংখ্যার হিসাব ধরে বর্তমান ঢাকার ড্রেনেজব্যবস্থা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এখনকার নগর পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলাভূমি সংকোচন এবং জনসংখ্যার চাপ বিবেচনায় নিতে হবে।
সমাধানের পথ কোথায়?
প্রথমেই ঢাকার সব খাল, পুকুর, জলাধার, নিম্নভূমি এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করে একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন দেখতে পারেন, কোন খালের সীমানা কতটুকু এবং কোথায় দখল হয়েছে।
দখলমুক্ত করার পর খালগুলোর সঙ্গে ড্রেন ও নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে। শুধু খনন বা সৌন্দর্যবর্ধন নয়, পানি প্রবাহের পুরো পথ সচল রাখা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, পুরো ঢাকার জন্য একটি সমন্বিত স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে আলাদাভাবে নয়, পুরো রাজধানী ও আশপাশের নদী-খালকে একটি অভিন্ন জলপ্রবাহ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তৃতীয়ত, বর্ষার আগে লোকদেখানো পরিচ্ছন্নতার পরিবর্তে সারা বছর ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। কোন ড্রেন কখন পরিষ্কার হলো, কত বর্জ্য তোলা হলো এবং কত টাকা ব্যয় হলো তা নাগরিকদের জন্য প্রকাশ করতে হবে।
চতুর্থত, জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর, ক্যামেরা ও তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ড্রেনের পানির উচ্চতা, প্রবাহ এবং কোথায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে তা আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। ঢাকার জন্য এমন প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা গবেষণায়ও উঠে এসেছে।
পঞ্চমত, নতুন ভবন ও আবাসন প্রকল্পে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, ছাদবাগান, পানি শোষণযোগ্য খোলা জায়গা এবং নিজস্ব পানি ধারণব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিধিমালা না মানলে ভবনের অনুমোদন বাতিল বা জরিমানার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ষষ্ঠত, পলিথিন ও নির্মাণবর্জ্য ড্রেনে ফেলার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের জন্য সহজ ও নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য একটি প্রধান সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ বা কমান্ড কাঠামো প্রয়োজন। জলাবদ্ধতা হলে কে দায় নেবে, কে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে এবং কার কাছে নাগরিক অভিযোগ জানাবে এটি সুস্পষ্ট হতে হবে।
বৃষ্টি অপরাধী নয়
প্রতি বর্ষায় আমরা একই দৃশ্য দেখি। মানুষ দুর্ভোগে পড়ে, সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করেন, জরুরি বৈঠক হয় এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। কয়েক দিন পর পানি নেমে গেলে আলোচনা থেমে যায়। পরের বৃষ্টিতে আবার একই দুর্ভোগ ফিরে আসে।
এভাবে একটি রাজধানী চলতে পারে না। বৃষ্টির কারণে মানুষ কর্মস্থলে যেতে পারবে না, রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে পারবে না, পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে যেতে পারবে না এবং নিচতলার বাসিন্দারা ঘর রক্ষায় রাত কাটাবেন এটি কোনো আধুনিক শহরের স্বাভাবিক চিত্র নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে বৃষ্টি অপরাধী নয়। অপরাধী সেই নগর পরিকল্পনা, যেখানে পানির বেরিয়ে যাওয়ার পথ রাখা হয়নি সেই উন্নয়ন, যা খাল, জলাধার ও নিম্নভূমি ধ্বংস করেছে; এবং সেই ব্যবস্থাপনা, যা প্রতি বর্ষায় মানুষের দুর্ভোগ দেখেও বদলায় না।
ঢাকাকে বাঁচাতে আর নতুন কোনো স্লোগানের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন খাল উদ্ধার, কার্যকর ড্রেনেজ, জলাধার সংরক্ষণ, সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।
তা না হলে কোটি মানুষের এই রাজধানী ক্রমেই এমন এক নগরীতে পরিণত হবে, যেখানে আকাশে মেঘ জমলেই নাগরিকের মনে একটি আতঙ্ক ঘনীভূত হবে আজ আবার কতটা ডুববে ঢাকা?
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

আপনার মতামত লিখুন