সংবাদ

প্রকাশনা উৎসবে কবি লেখক বুদ্ধিজীবীগণ

ভ্রমণ কাহিনিকে অতিক্রম করেছে ‘লোরকার দেশে’


ওবায়েদ আকাশ
ওবায়েদ আকাশ
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৮:২০ পিএম

ভ্রমণ কাহিনিকে অতিক্রম করেছে ‘লোরকার দেশে’
চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ রচিত ‘লোরকার দেশে’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসবের কিছু আলোকচিত্র। প্রথম ছবি: আলোচনা করছেন মুখ্য আলোচক সাংবাদিক-কবি সোহরাব হাসান। দ্বিতীয় ছবি: আলোচনা করছেন গ্রন্থ প্রণেতা চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ। তৃতীয় ছবি: অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবি লেখক শুভাকাঙ্ক্ষীবৃন্দ। চতুর্থ ছবি: আলোচকবৃন্দ।

তখনও ঝরছিল মৃদু মৃদু বৃষ্টির ফোঁটা টিপ টিপ করে| একটু আগেই ঝরেছে আষাঢ়ের ভারি বর্ষণ| রাজধানীর শুক্রবারের ছুটির দিনে নাগরিকমনে পরম স্বস্তির ভেজা স্নিগ্ধতা| হয়তো ঘরে ঘরে রান্না চলছিল ভোনা খিচুড়ি-বেগুনভাজি-মাছভাজি কিংবা মাংসের রেসিপি| কেউ কেউ আহার শেষে ছুটির দিনে বিশ্রামে যাবেনএটাই তো স্বাভাবিক| কিন্তু গত ১০ জুলাই ২০২৬ শুক্রবারের দিনটি ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম| রাজধানীর একাংশের কিছু সাহিত্য বইপ্রেমী মানুষ সেদিন ছুটে এসেছিলেন সাহিত্য, বই, লোরকা, শালুক লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের টানেবাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান মিলনায়তনে| উদ্দেশ্য: ‘শালুকথেকে প্রকাশিত চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদেরলোরকার দেশেভ্রমণগ্রন্থটি নিয়ে শুভেচ্ছা সমাবেশ আলোচনা অনুষ্ঠান| অনুষ্ঠান ছিল বিকাল চারটায়| আর আলোচক ছিলেন দেশের নবীন-প্রবীণ সাহিত্যিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বগণ| মুখ্য আলোচক ছিলেন সাংবাদিক-কবি-সম্পাদক সোহরাব হাসান| আলোচক ছিলেন কবি প্রাবন্ধিক অনুবাদক কুমার চক্রবর্তী রাজু আলাউদ্দিন, কবি অনুবাদক মাহফুজ আল-হোসেন, অনুবাদক সুরাইয়া ফারজানা হাসান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুজতবা রেজা, মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ, আশরাফ উদ্দিন আহমদ এবং গ্রন্থ রচয়িতা কবি প্রাবন্ধিক সম্পাদক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ| ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য সম্পাদক শালুক’-সম্পাদক কবি ওবায়েদ আকাশের সঞ্চালনায় বিকাল সাড়ে চারটায় শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের ভিতর দিয়ে শুরু হয় মূল পর্ব|

আলোচনায় প্রত্যেক বক্তার বক্তব্যে যে সারকথাটি উঠে এসেছে, সেটি হলোলোরকার দেশেভ্রমণ কাহিনিটি শুধুমাত্র একটি ভ্রমণ কাহিনি নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক গ্রন্থ| ইতিহাস, ঐতিহ্য, কবিতা, গবেষণা, সমালোচনার মিশেলে গ্রন্থটি রূপ নিয়েছে একটি অনন্য জ্ঞান জানার আকর হিসেবে| আলোচনায় আরও উঠে এসেছে, লেখক-সম্পাদক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের জন্মগত সাহিত্যবোধ, সাহিত্যের প্রতি প্রগাঢ় নিষ্ঠা, মহত্তর মানসিকতা অমায়িক-বন্ধুবৎসল সব গুণাবলি

আলোচক মাহফুজ আল-হোসেন লোরকার কাব্যপ্রবণতা বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা উত্থাপন করেন| তিনি বলেন, “চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদেরলোরকার দেশেকেবল একটি ভ্রমণ কাহিনি নয়, এটি একই সঙ্গে ভ্রমণ, সাহিত্য সমালোচনা, সাংস্কৃতিক ইতিহাস, নন্দনতত্ত্ব এবং এক মহান কবির জীবনদর্শনের অনুসন্ধান| বইটি স্পেনের আন্দালুসিয়ায় লোরকার পদচিহ্ন অনুসরণ করতে করতে স্পেন ছাড়িয়ে লোরকার স্মৃতিধন্য কয়েকটি দেশে শহরেনিউ ইয়র্ক, হাভানা বুয়েনোস আইরেসে, কবির অনূদিত কবিতায়, অসংখ্য লেখায়, শিল্পকর্মে, অগণিত মূল্যবান তথ্যসূত্রের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধিক যাত্রায় পাঠককে আমন্ত্রণ জানায়, যেখানে ভূগোল ধীরে ধীরে রূপ নেয় কাব্যভূমিতে, আর ভ্রমণ রূপান্তরিত হয় এক নান্দনিক দার্শনিক অন্বেষণে| লেখক স্পেনের গ্রানাদা, ফুয়েন্তে বাকেরোস, লোরকা সেন্টার কিংবা আন্দালুসিয়ার প্রকৃতিকে পাঠ করেছেন লোরকার কবিতার প্রতীকতত্ত্বের আলোকে| ফলে প্রতিটি স্থান যেন লোরকার একটি কবিতার ব্যাখ্যায় পরিণত হয়েছে| এই অর্থে গ্রন্থটি একটি Literary Pilgrimage অর্থাৎ সাহিত্যিক তীর্থযাত্রা| লোরকার নন্দনতত্ত্বের সবচেয়ে মৌলিক ধারণা দুয়েন্দে| সালাহউদ্দিন মাহমুদ এই দুয়েন্দের ধারণাকে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখিয়েছেন| আন্দালুসিয়ার রোদ, শুষ্কতা, পাহাড়, ফ্লামেঙ্কোর ব্যথাভেজা সুরসবকিছুই যেন দুয়েন্দের অভিব্যক্তি| গ্রন্থটিতে লেখক লোরকা সেন্টারের বিবরণের মধ্য দিয়ে এই মহান কবির পাণ্ডুলিপি, চিত্রকর্ম, সংগীতচর্চা নাট্যচর্চার তথ্য পাঠককে পৌঁছে দেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন| এই গ্রন্থের অন্যতম নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হলোPoetics of Place | আন্দালুসিয়ার জলপাই বাগান, সিয়েরা নেভাদা, জিপসি পল্লী, গ্রানাদার অলিগলি, আরব স্থাপত্য, ফ্লামেঙ্কোর মঞ্চসবকিছুই লেখকের বর্ণনায় লোরকার কবিতার প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে| ‘লোরকার দেশেমূলত এক নন্দনতাত্ত্বিক ভ্রমণ| এটি এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে পথের বর্ণনা অপেক্ষা পথের অন্তর্নিহিত অর্থ অধিক গুরুত্বপূর্ণ| ফলেলোরকার দেশেএকটি সাধারণ ট্রাভেলগ নয়; এটি বাংলা ভাষায় লোরকা-চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন| গ্রন্থটির মূল লক্ষ্যই লোরকার জীবন, কবিতা স্পেনের ভূগোলকে একাকার করে দেখা|”

আলোচক সুরাইয়া ফারজানা হাসান বলেন, “‘লোরকার দেশেবইটি হয়ে উঠেছে সাহিত্যের এক তীর্থযাত্রা| সাধারণ ভ্রমণ কাহিনিতে আমরা পথের বর্ণনা, দর্শনীয় স্থানের বর্ণনা পাই; কিন্তু লেখক যে যাত্রা করেছেন এই বইটিতে সেটি একই সঙ্গে ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক এবং কাব্যিক| তিনি আমাদের নিয়ে গেছেন এমন একটি ভূখণ্ডে, যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, সঙ্গীত, স্থাপত্য এবং কাব্যপরস্পর এমনভাবে মিশে আছে যে, একটি থেকে আরেকটিকে আলাদা করা যায় না| আমি বইটির পর্যালোচনায় না গিয়ে স্পেনের আন্দালুসিয়া এবং গ্রানাডা কীভাবে একটি অনন্য সাংস্কৃতিক ভূমি হয়ে উঠেছে এবং সেখানে কীভাবে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার মতো একজন কবির জন্ম হয়েছে সেদিকটাতে আলোকপাত করতে চাই| কোনো কবিকে বুঝতে হলে তার অর্থনৈতিক, সামাজিক ইতিহাস তার ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে জানতে হয়| একজন কবি শূন্যে জন্ম নেন না; তিনি প্রকৃতির সন্তান, মাটির সন্তান| আমরা জানি, আন্দালুসিয়ায় রোমান সভ্যতা এসেছে, ভিসিগথদের শাসন এসেছে| তারপর প্রায় আটশ বছর ধরে ইসলামিক সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে| তারপর ইতিহাস মোড় নিয়েছে নতুন দিকে| ফলে আন্দালুসিয়া হয়ে উঠেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক মিলনভূমি|”

মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ তার বক্তব্যে বলেন, “চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ একজন প্রকৌশলী হয়েও যে এমন একজন লেখক হয়ে উঠেছেন, এই গুণাবলি তিনি তার পূর্বপুরুষ থেকে অর্জন করেছেন| ওনার নানা হামিদ আলী ছিলেন একজন বড় কবি| সৈয়দ আলী আহসান তার প্রশংসা করেছেন| কিন্তু হামিদ আলী তার প্রতিভার মূল্য পান নি| আমি বিশ্বাস করি সালাহউদ্দীন মাহমুদের ভেতর সেই গুণ বিস্তার লাভ করেছে| আমি তার বইলোরকার দেশে সাফল্য কামনা করি| এরকম আরও অসংখ্য বই তিনি আমাদের উপহার দিবেন বলে বিশ্বাস|”

আলোচক কুমার চক্রবর্তী বলেন, “চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ জাপানি স্টাইলে তার নামটা রেখেছেন| সেখানে পদবি আগে লেখা হয়| গত জানুয়ারির এক শীতার্ত সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে বন্ধু তাপস গায়েনের ঘরে আমাদের সালাহউদ্দীন ভাই এসে হাজির| তার আগে থেকেই তাকে জানতাম| তাকে সেদিন দেখে মনে হলো তিনি সাহিত্যে বাঁচেন এবং সাহিত্যে তার স্বতঃস্ফূত যাপন| তার পরের দিনও আমাদের দেখা হয়েছে| আমরা গাড়িতে বসে যে আলাপ করেছি তার পুরোটাই ছিল সাহিত্য নিয়ে| কথা হয়েছিল লোরকাকে নিয়ে| তার চেয়ে বেশি কথা হয়েছিল জয়েসকে (জেমস জয়েস) নিয়ে| তাকে ওখানে অনেকে ভালবেসে জয়েস নামেও ডাকেন| আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি যে, সাহিত্যের এমন কোনো দিক নেই যে বিষয়ে তিনি জানেন না| যদিও তাকে আমার সবসময় বিচলিত মনে হতো| এটি একটি মানুষের শৈল্পিক সত্তারই অংশ| আমিলোরকার দেশেবইটা দেখে কামুক (অভিলাষী) হয়ে উঠেছি| বইটি শালুক খুব নিখুঁতভাবে প্রকাশ করেছে| আমি তো ভেবেছিলাম এটি কোনো এনজিওর প্রকাশনা কিনা| বইটিতে আমি কোনো বানান ভুল দেখিনি| অথবা শব্দগত বিপর্যয়ও দেখিনি| প্রকাশকও এখানে তার দায়িত্ব পালন করেছেন| বইটি পড়ে আমার সুনীলেরছবির দেশে কবিতার দেশেবইটির কথা মনে হয়েছেযা আমরা অনেক আগে পড়েছি| আমি সালাহউদ্দীন ভাইকে বলব, আপনি সাহিত্য জগৎ থেকে আর বিচ্যুত হবেন না| আমৃত্যু শিল্প-সাহিত্যকে নিয়ে বেঁচে থাকুন|”

আলোচক রাজু আলাউদ্দিন বলেন, “বোর্হেস লোরকাকে খুব গৌণ কবি মনে করতেন| বোর্হেস এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্নকর্তাকে বলেছেনমৃত্যু লোরকাকে মহিমান্বিত করেছে’| কিন্তু আমি তা মনে করি না| কারণ লোরকা যদি আটত্রিশ বছর বয়সে বিগত না হতেন, তবু তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার জন্যই তিনি আজকের মতো গ্রহণীয় হতেন| লোরকা মূলত তিরিশের দশকের কবি হলেও আমাদের এখানে তিরিশের দশকের কবিরাও লোরকার কবিতা অনুবাদ করেছেন| যেমন বিষ্ণু দে| অর্থাৎ লোরকা বহু আগে থেকে আমাদের মাঝে পঠিত| লোরকা এখনো স্পেনের কবিদের মধ্যে অধিক পরিচিত এবং সবার আগে পরিচিত| আজকের আলোচ্যলোরকার দেশেবইটি কোনো গবেষণামূলক বই নয়, কিন্তু এর মধ্যে গবেষণা আছে, এটি কোনো সাহিত্য সমালোচকের মূল্যায়নধর্মী বই নয়, কিন্তু সেটিও কিছু অংশ এখানে আছে| তিনি পর্যটকসত্তা নিয়ে ভ্রমণ করেছেন। আমি বিস্মিত যে, তার সাহিত্যপ্রীতি, সাহিত্যবোধ কতটা প্রবল হলে তিনি লোরকার ভ্রমণতীর্থগুলো ঘুরে ঘুরে বেড়িয়ে একটি বই রচনা করতে পারেন| পাশ্চাত্য জগতে ধরনের নিষ্ঠা দেখা গেলেও বাংলা ভাষায় এমন নিষ্ঠা আমি পাই না| ক্লিনটন বুথ সিলি যেমন জীবনানন্দকে জানতে গিয়ে বরিশালসহ জীবনানন্দ দাশ যে সব জায়গায় ঘুরেছেন, সেসব জায়গায় ভ্রমণ করেছেন, সালাহউদ্দীন মাহমুদও ঠিক সেই কাজটি করেছেন| এই দৃষ্টিতে তিনি ক্লিনটন সিলির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নন| ‘লোরকার দেশেবইটি একটি মিক্সড জনরা| এর মধ্যে কবিতা আছে, সাহিত্যের মানচিত্র আছে, নিজের মূল্যায়নসহ অনেক কিছুই আছে| সুতরাং বই হিসেবে এটি একটি অসাধারণ বই|”

আলোচক আশরাফ উদ্দীন আহমদ বলেন, “লোরকার দেশে বইয়ের লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদকে আমি দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে চিনি| আমরা একসময় সহকর্মী ছিলাম চা বাগানে| তখনই তাকে দেখেছি একজন পরিশীলিত মানুষ হিসেবে এবং তখনই জানতে পেরেছি তার সাহিত্যানুরাগের বিষয়টি| আমার মনে আছে তিনি আমাকে কাহলিল জিবরানের একটি ছোট্ট কবিতার বই উপহার দিয়েছিলেন| এখন তিনি প্রবাসে, অনেক দূরে থাকেন| সেখান থেকে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত অগ্রবীজের সংখ্যাগুলো তিনি আমাকে পাঠাতেন| ‘লোরকার দেশেবইটি আমি পড়েছি| যেন এক মহাকাব্য| আমি লোরকা সম্পর্কে জানতাম না| বইটা পড়ে আমি লোরকারকে যতটুকু জেনেছি; তা আমার কাছে বিস্ময়কর ঠেকেছে| মাত্র আটত্রিশ বছর বেঁচে থাকা এক মহাপ্রতিভাধর কবি সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিয়েছেন চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ| তিনি শুধু স্পেনের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াননি, তিনি খুঁজেছেন লোরকার সেই পঙক্তিগুলোকে যা স্পেনের বাতাসকে ভারি করে রাখে| লোরকা লিখেছেন জিপসিদের কথা, স্পেনের সবুজ জলপাইবনের কথা, আর ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দ্রোহের কথা| চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ তার নিপুণ গীতিময় গদ্যে আমাদের সামনে সেই রূপটি তুলে ধরেছেন|”

আলোচক মুজতবা রেজা বলেন, “ভ্রমণ থেকেই হয় ভ্রমণ কাহিনি| কিন্তু ভ্রমণকারীদের সকলের হাত দিয়ে নয়| অর্থাৎ সুপাঠ্য ভ্রমণসাহিত্যের অত্যাবশকীয় উপাদান হচ্ছেমনোযোগী সিরিয়াস ভ্রমণকারী, ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ে লেখকের আগ্রহ, লেখকের  শৈল্পিক রসবোধআর সর্বোপরি সাহিত্যমূল্যে চিত্তাকর্ষক আর মনোগ্রাহী লেখা বা পরিবেশনা|
বাংলা সাহিত্যে আমরা অনেক বিখ্যাত লেখক যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ মুজতবা আলী, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, (স্বাধীনতা পরবর্তীতে) মুহাম্মাদ হাবিবুর রহমানের, শাকুর মজিদ অন্যদের হাত ধরে বেশ কিছু চমৎকার স্মরণীয় ভ্রমণ সাহিত্য পেয়েছি| এই ধারায় একটি সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে চৌধুরী সালাউদ্দীন মাহমুদেরলোরকার দেশেনামক  ভ্রমণসাহিত্য বিষয়ক এই বইটি| এই বইয়ে আলহাম্বরা প্রাসাদ, মুসলিম শাসনামলের সমৃদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং  লোরকার  স্মৃতি বিজড়িত আবাসস্থল, লাইব্রেরি, পার্ক ইত্যাদি সমুদয় স্থাপনা ঘটনাগুলো, এমনকি লোরকার স্মৃতি বিজড়িত অন্যান্য দেশের স্থাপনাসমূহও এত নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন লেখক দৃশ্যমান জগতের আড়ালে থাকা অদৃশ্য, অসীম অতীত জগতের উপস্থিতিকে তুলে ধরছেন আর আমাদের চোখের সামনে যা কিছু দৃশ্যমান, তার বাইরেও যে  এক বিশাল অতীত লুকিয়ে আছে, তা কল্পনার চোখে দৃশ্যমান হয়ে যায়|”

অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক সোহরাব হাসান বলেন, “কবিদের হৃদয় অনেক বড়, বইটি নিয়ে প্রায় ডজনখানেক বক্তা আলোচনা করলেন, তবু আলোচনা শেষ হচ্ছে না| ‘লোরকার দেশেঅনেকেই বলেছেন এটি ভ্রমণ কাহিনি, কিন্তু আমার কাছে এটিকে ভ্রমণ কাহিনি মনে হয়নি| আমার কাছে মনে হয়েছে এটি একটিআবিষ্কার কাহিনি’| অর্থাৎ তিনি লোরকাকে আবিষ্কার করেছেন, এবং আবিষ্কার করতে গিয়ে তিনি স্পেনের বিভিন্ন শহর, কিউবা, আর্জেন্টিনা, নিউইয়র্কের মতো বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেছেন, যেসব জায়গায় লোরকা ঘুরে বেরিয়েছেন| ভালবাসার টানে লোরকা যেসব জায়গায় ঘুরেছেন, সেখানে নিজেকে উপস্থাপনের সুনিপুণ বর্ণনা এই গ্রন্থ| আমি বইয়ের লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের এই ব্যতিক্রমী ভ্রমণের গল্প শুনে বিস্মিত হয়েছি এই কারণে যে, এসব জায়গায় তিনি একা যাননি, গিয়েছেন স্ত্রী এবং তার দুই সন্তানকে নিয়ে| এসব জায়গায় ঘুরতে গিয়ে নিশ্চয় তার পরিবারের লোকজন সবসময় একমত হতে পারেননি| কোথাও তাদের ভাল লেগেছে, আবার কোথাও লাগেনি| বিষয়গুলোও তিনি সমন্বয় করেছেন| এবং বইয়ের কোথাও কোথাও তার উল্লেখও আছে| এই বইটি একটি জানার বই| ইতিহাস, ঐতিহ্য, দর্শন সব কিছু আছে বইটিতে| কবিতা তো আছেই| লোরকার কবিতাকে সহ্য করতে না পেরে মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে ফ্রাঙ্কোর বাহিনি তাকে হত্যা করে| লোরকার মৃত্যুকে নিয়ে বাংলা ভাষার কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি কবিতা লিখেছেন, যেখানে লোরকার কোনো নাম নেই| এত প্রতীকী এত ব্যঞ্জনাময় কবিতা সবাইকে স্পর্শ করে| লোরকা কি শুধু স্পেনের কবি? লোরকা আমাদের কবি, লোরকা সারা পৃথিবীর কবি| লোরকা শুধু কবি ছিলেন না, সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন, তিনি নাট্যকার ছিলেন, নাট্য নির্দেশক ছিলেন এমনকি তার একটি নাট্য সংগঠনও ছিল| আমাদের চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদেরও একটি নাট্য সংগঠন আছেডালাস বাংলা থিয়েটারনামে| এই যে বাংলাদেশের একজন লেখক লোরকার অন্বেষণে এত জায়গায় ঘুরেছেন| এটি শুধু ভালবাসা থেকে| লেখকরা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ভালবাসার মানুষ| আমি চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদকে অনুরোধ করবোএমন আরও আরও আবিষ্কার করুন| একজন সম্পাদক কীভাবে একজন লেখকের পিছনে লেগে থাকে, বইটি প্রকাশে সেটি প্রমাণিত হয়েছে| ‘লোরকার দেশেবইটির প্রণেতা চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ; কিন্তু তার নেপথ্যের মানুষটি ওবায়েদ আকাশ| আমাদের সম্পাদকদের হতে হয় জহুরি| কোথায় হিরক আছে, কোথায় আরও মূল্যবান কিছু লুকিয়ে আছে তাকে খুঁজে বের করতে হয়| সালাহউদ্দীন মাহমুদকে খুঁজে বের করা তেমনই একটি কাজ| ‘লোরকার দেশেবইটি একটি অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ| চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ হয়তো আমাদেরকে আরও নতুন নতুন আবিষ্কার দিয়ে আমাদের অভিভূত করবেনএমন প্রত্যাশা করি|”

অনুষ্ঠানের মধ্যমণিলোরকার দেশেবইয়ের লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ বলেন, “আজকের বৃষ্টিস্নাত বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে যারা অনুষ্ঠানে এসেছেন, তারা সাহিত্যের টানেও এসেছেন, আমার টানে এসেছেন| আপনাদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে মহিমান্বি করেছে| আমরা বাঙালিরা খুব আবেগপ্রবণ জাতি| ‘লোরকার দেশেবইটি আমার ভালবাসা থেকে লেখা| এই ভালবাসা না থাকলে কোনো মহৎ কাজ হয় না| আপনারা শালুক পরিবারের সদস্যরা শালুককে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন| অনেক মহৎ কাজ সম্পাদন করছেন| এই বইটির প্রকাশনা এই মহৎ কাজের একটি| লোরকা সম্পর্কে আমি প্রথম জানি ২০১৫ সালে| তখন কবি-বন্ধু-সম্পাদক ওবায়েদ আকাশ আমাকে লোরকার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন| ওবায়েদ আকাশের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে কবি মাহফুজ আল-হোসেন সুবর্ণ আকাশনাকে বিশাল আকৃতির একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন| কোনো কবির পঞ্চাশ পূর্তিতে এত সমৃদ্ধ স্মারকসংখ্যা এর আগে আমি দেখিনি| ওবায়েদ সম্পর্কেসুবর্ণ আকাশশব্দ দুটি যথার্থ প্রয়োগ| তখন শালুক লোরকা সংখ্যা প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছে| আমাকে লোরকাকে নিয়ে লিখতে অনুরোধ করেন ওবায়েদ| তখন আমার লোরকা সম্পর্কে ধারণা ছিল না| শালুকের লেখার আমন্ত্রণ পেয়ে ওইদিন বাসায় নিয়ে এলাম লোরকার কবিতা সংকলন| বিশাল সে কবিতাসংকলন| মাত্র আটত্রিশ বছর জীবন পাওয়া একজন কবি এত লিখেছেন! তখন লোরকার নাটক সঙ্গীত সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল না| শালুকের লোরকা সংখ্যায় লেখার মাধ্যমে আমার শুরু হলো লোরকাকে নিয়ে লেখা| এবং তার প্রতি আগ্রহও বাড়তে থাকল| এভাবে আমি লোরকার প্রেমে পড়ে যাই| এবং তার সম্পর্কে জানতে আরও আগ্রহ তৈরি হতে থাকে| আমি লোরকার কবিতা পড়ে প্রাণিত হই| তার স্মৃতির সন্ধানে ঘুরি| যখন স্পেনে গেলাম, তখন ভাবলাম লোরকার স্মৃতিগুলো ঘুরে দেখি| স্পেনের যে নিসর্গ দেখলাম, সেখান থেকে লোরকাকে আলাদা করা যাবে না| দেখলাম লোরকা মিশে আছেন জলপাই বাগানে, মিশে আছেন ফোয়ারায়, মিশে আছেন ঝর্নায়, মিশে আছেন আকাশে বাতাসে এমনকি সমগ্র আন্দালুসিয়ায় এবং লোরকা মিশে আছেন আলহাম্বরায়| আলহাম্বরা নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছেন লোরকা| আমি এর আগে দেখিনি একজন কবি নিসর্গ ইতিহাস সংস্কৃতি ঐতিহ্যসব কিছুর সাথে এভাবে মিশে যেতে পারেন| একটা জিনিস আমি উল্লেখ করিনি| লোরকা আবিষ্কার করেছেন জিপসিদের ফ্ল্যামেঙ্কোকে| এবং আমি সপরিবারে গিয়েছি জিপসিদের নাচ দেখার জন্য| এভাবে আমি ঘুরেছি লোরকার স্মৃতিতীর্থগুলো| আলোচকগণ আমারলোরকার দেশেবইটিকে খুব ইতিবাচক অর্থে নিয়েছেন| চমৎকার আলোচনা করেছেন| আপনাদের সকলের উপস্থিতি আমাকে উৎসাহিত করেছে| আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা|”

গ্রন্থের লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ প্রত্যেক আলোচকের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নিয়ে আলোচনা করেন| এবং উপস্থিত সকললে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন|

বৃষ্টিধোয়া সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সকলের মধ্যে জমে ওঠে জমজমাট আড্ডা| লোভনীয় গুড়ের সন্দেশ, কেক, আফলাতুন, নিমকি আর সিঙ্গাড়া দিয়ে আপ্যায়ন পরস্পর আলাপে সংলাপে সমাপ্ত হয়লোরকার দেশেবইটিকে ঘিরে এই প্রাণবন্ত সমাবেশ|


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬


ভ্রমণ কাহিনিকে অতিক্রম করেছে ‘লোরকার দেশে’

প্রকাশের তারিখ : ২২ জুলাই ২০২৬

featured Image

তখনও ঝরছিল মৃদু মৃদু বৃষ্টির ফোঁটা টিপ টিপ করে| একটু আগেই ঝরেছে আষাঢ়ের ভারি বর্ষণ| রাজধানীর শুক্রবারের ছুটির দিনে নাগরিকমনে পরম স্বস্তির ভেজা স্নিগ্ধতা| হয়তো ঘরে ঘরে রান্না চলছিল ভোনা খিচুড়ি-বেগুনভাজি-মাছভাজি কিংবা মাংসের রেসিপি| কেউ কেউ আহার শেষে ছুটির দিনে বিশ্রামে যাবেনএটাই তো স্বাভাবিক| কিন্তু গত ১০ জুলাই ২০২৬ শুক্রবারের দিনটি ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম| রাজধানীর একাংশের কিছু সাহিত্য বইপ্রেমী মানুষ সেদিন ছুটে এসেছিলেন সাহিত্য, বই, লোরকা, শালুক লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের টানেবাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান মিলনায়তনে| উদ্দেশ্য: ‘শালুকথেকে প্রকাশিত চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদেরলোরকার দেশেভ্রমণগ্রন্থটি নিয়ে শুভেচ্ছা সমাবেশ আলোচনা অনুষ্ঠান| অনুষ্ঠান ছিল বিকাল চারটায়| আর আলোচক ছিলেন দেশের নবীন-প্রবীণ সাহিত্যিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বগণ| মুখ্য আলোচক ছিলেন সাংবাদিক-কবি-সম্পাদক সোহরাব হাসান| আলোচক ছিলেন কবি প্রাবন্ধিক অনুবাদক কুমার চক্রবর্তী রাজু আলাউদ্দিন, কবি অনুবাদক মাহফুজ আল-হোসেন, অনুবাদক সুরাইয়া ফারজানা হাসান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুজতবা রেজা, মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ, আশরাফ উদ্দিন আহমদ এবং গ্রন্থ রচয়িতা কবি প্রাবন্ধিক সম্পাদক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ| ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য সম্পাদক শালুক’-সম্পাদক কবি ওবায়েদ আকাশের সঞ্চালনায় বিকাল সাড়ে চারটায় শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের ভিতর দিয়ে শুরু হয় মূল পর্ব|

আলোচনায় প্রত্যেক বক্তার বক্তব্যে যে সারকথাটি উঠে এসেছে, সেটি হলোলোরকার দেশেভ্রমণ কাহিনিটি শুধুমাত্র একটি ভ্রমণ কাহিনি নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক গ্রন্থ| ইতিহাস, ঐতিহ্য, কবিতা, গবেষণা, সমালোচনার মিশেলে গ্রন্থটি রূপ নিয়েছে একটি অনন্য জ্ঞান জানার আকর হিসেবে| আলোচনায় আরও উঠে এসেছে, লেখক-সম্পাদক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের জন্মগত সাহিত্যবোধ, সাহিত্যের প্রতি প্রগাঢ় নিষ্ঠা, মহত্তর মানসিকতা অমায়িক-বন্ধুবৎসল সব গুণাবলি

আলোচক মাহফুজ আল-হোসেন লোরকার কাব্যপ্রবণতা বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা উত্থাপন করেন| তিনি বলেন, “চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদেরলোরকার দেশেকেবল একটি ভ্রমণ কাহিনি নয়, এটি একই সঙ্গে ভ্রমণ, সাহিত্য সমালোচনা, সাংস্কৃতিক ইতিহাস, নন্দনতত্ত্ব এবং এক মহান কবির জীবনদর্শনের অনুসন্ধান| বইটি স্পেনের আন্দালুসিয়ায় লোরকার পদচিহ্ন অনুসরণ করতে করতে স্পেন ছাড়িয়ে লোরকার স্মৃতিধন্য কয়েকটি দেশে শহরেনিউ ইয়র্ক, হাভানা বুয়েনোস আইরেসে, কবির অনূদিত কবিতায়, অসংখ্য লেখায়, শিল্পকর্মে, অগণিত মূল্যবান তথ্যসূত্রের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধিক যাত্রায় পাঠককে আমন্ত্রণ জানায়, যেখানে ভূগোল ধীরে ধীরে রূপ নেয় কাব্যভূমিতে, আর ভ্রমণ রূপান্তরিত হয় এক নান্দনিক দার্শনিক অন্বেষণে| লেখক স্পেনের গ্রানাদা, ফুয়েন্তে বাকেরোস, লোরকা সেন্টার কিংবা আন্দালুসিয়ার প্রকৃতিকে পাঠ করেছেন লোরকার কবিতার প্রতীকতত্ত্বের আলোকে| ফলে প্রতিটি স্থান যেন লোরকার একটি কবিতার ব্যাখ্যায় পরিণত হয়েছে| এই অর্থে গ্রন্থটি একটি Literary Pilgrimage অর্থাৎ সাহিত্যিক তীর্থযাত্রা| লোরকার নন্দনতত্ত্বের সবচেয়ে মৌলিক ধারণা দুয়েন্দে| সালাহউদ্দিন মাহমুদ এই দুয়েন্দের ধারণাকে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখিয়েছেন| আন্দালুসিয়ার রোদ, শুষ্কতা, পাহাড়, ফ্লামেঙ্কোর ব্যথাভেজা সুরসবকিছুই যেন দুয়েন্দের অভিব্যক্তি| গ্রন্থটিতে লেখক লোরকা সেন্টারের বিবরণের মধ্য দিয়ে এই মহান কবির পাণ্ডুলিপি, চিত্রকর্ম, সংগীতচর্চা নাট্যচর্চার তথ্য পাঠককে পৌঁছে দেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন| এই গ্রন্থের অন্যতম নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হলোPoetics of Place | আন্দালুসিয়ার জলপাই বাগান, সিয়েরা নেভাদা, জিপসি পল্লী, গ্রানাদার অলিগলি, আরব স্থাপত্য, ফ্লামেঙ্কোর মঞ্চসবকিছুই লেখকের বর্ণনায় লোরকার কবিতার প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে| ‘লোরকার দেশেমূলত এক নন্দনতাত্ত্বিক ভ্রমণ| এটি এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে পথের বর্ণনা অপেক্ষা পথের অন্তর্নিহিত অর্থ অধিক গুরুত্বপূর্ণ| ফলেলোরকার দেশেএকটি সাধারণ ট্রাভেলগ নয়; এটি বাংলা ভাষায় লোরকা-চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন| গ্রন্থটির মূল লক্ষ্যই লোরকার জীবন, কবিতা স্পেনের ভূগোলকে একাকার করে দেখা|”

আলোচক সুরাইয়া ফারজানা হাসান বলেন, “‘লোরকার দেশেবইটি হয়ে উঠেছে সাহিত্যের এক তীর্থযাত্রা| সাধারণ ভ্রমণ কাহিনিতে আমরা পথের বর্ণনা, দর্শনীয় স্থানের বর্ণনা পাই; কিন্তু লেখক যে যাত্রা করেছেন এই বইটিতে সেটি একই সঙ্গে ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক এবং কাব্যিক| তিনি আমাদের নিয়ে গেছেন এমন একটি ভূখণ্ডে, যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, সঙ্গীত, স্থাপত্য এবং কাব্যপরস্পর এমনভাবে মিশে আছে যে, একটি থেকে আরেকটিকে আলাদা করা যায় না| আমি বইটির পর্যালোচনায় না গিয়ে স্পেনের আন্দালুসিয়া এবং গ্রানাডা কীভাবে একটি অনন্য সাংস্কৃতিক ভূমি হয়ে উঠেছে এবং সেখানে কীভাবে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার মতো একজন কবির জন্ম হয়েছে সেদিকটাতে আলোকপাত করতে চাই| কোনো কবিকে বুঝতে হলে তার অর্থনৈতিক, সামাজিক ইতিহাস তার ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে জানতে হয়| একজন কবি শূন্যে জন্ম নেন না; তিনি প্রকৃতির সন্তান, মাটির সন্তান| আমরা জানি, আন্দালুসিয়ায় রোমান সভ্যতা এসেছে, ভিসিগথদের শাসন এসেছে| তারপর প্রায় আটশ বছর ধরে ইসলামিক সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে| তারপর ইতিহাস মোড় নিয়েছে নতুন দিকে| ফলে আন্দালুসিয়া হয়ে উঠেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক মিলনভূমি|”

মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ তার বক্তব্যে বলেন, “চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ একজন প্রকৌশলী হয়েও যে এমন একজন লেখক হয়ে উঠেছেন, এই গুণাবলি তিনি তার পূর্বপুরুষ থেকে অর্জন করেছেন| ওনার নানা হামিদ আলী ছিলেন একজন বড় কবি| সৈয়দ আলী আহসান তার প্রশংসা করেছেন| কিন্তু হামিদ আলী তার প্রতিভার মূল্য পান নি| আমি বিশ্বাস করি সালাহউদ্দীন মাহমুদের ভেতর সেই গুণ বিস্তার লাভ করেছে| আমি তার বইলোরকার দেশে সাফল্য কামনা করি| এরকম আরও অসংখ্য বই তিনি আমাদের উপহার দিবেন বলে বিশ্বাস|”

আলোচক কুমার চক্রবর্তী বলেন, “চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ জাপানি স্টাইলে তার নামটা রেখেছেন| সেখানে পদবি আগে লেখা হয়| গত জানুয়ারির এক শীতার্ত সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে বন্ধু তাপস গায়েনের ঘরে আমাদের সালাহউদ্দীন ভাই এসে হাজির| তার আগে থেকেই তাকে জানতাম| তাকে সেদিন দেখে মনে হলো তিনি সাহিত্যে বাঁচেন এবং সাহিত্যে তার স্বতঃস্ফূত যাপন| তার পরের দিনও আমাদের দেখা হয়েছে| আমরা গাড়িতে বসে যে আলাপ করেছি তার পুরোটাই ছিল সাহিত্য নিয়ে| কথা হয়েছিল লোরকাকে নিয়ে| তার চেয়ে বেশি কথা হয়েছিল জয়েসকে (জেমস জয়েস) নিয়ে| তাকে ওখানে অনেকে ভালবেসে জয়েস নামেও ডাকেন| আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি যে, সাহিত্যের এমন কোনো দিক নেই যে বিষয়ে তিনি জানেন না| যদিও তাকে আমার সবসময় বিচলিত মনে হতো| এটি একটি মানুষের শৈল্পিক সত্তারই অংশ| আমিলোরকার দেশেবইটা দেখে কামুক (অভিলাষী) হয়ে উঠেছি| বইটি শালুক খুব নিখুঁতভাবে প্রকাশ করেছে| আমি তো ভেবেছিলাম এটি কোনো এনজিওর প্রকাশনা কিনা| বইটিতে আমি কোনো বানান ভুল দেখিনি| অথবা শব্দগত বিপর্যয়ও দেখিনি| প্রকাশকও এখানে তার দায়িত্ব পালন করেছেন| বইটি পড়ে আমার সুনীলেরছবির দেশে কবিতার দেশেবইটির কথা মনে হয়েছেযা আমরা অনেক আগে পড়েছি| আমি সালাহউদ্দীন ভাইকে বলব, আপনি সাহিত্য জগৎ থেকে আর বিচ্যুত হবেন না| আমৃত্যু শিল্প-সাহিত্যকে নিয়ে বেঁচে থাকুন|”

আলোচক রাজু আলাউদ্দিন বলেন, “বোর্হেস লোরকাকে খুব গৌণ কবি মনে করতেন| বোর্হেস এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্নকর্তাকে বলেছেনমৃত্যু লোরকাকে মহিমান্বিত করেছে’| কিন্তু আমি তা মনে করি না| কারণ লোরকা যদি আটত্রিশ বছর বয়সে বিগত না হতেন, তবু তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার জন্যই তিনি আজকের মতো গ্রহণীয় হতেন| লোরকা মূলত তিরিশের দশকের কবি হলেও আমাদের এখানে তিরিশের দশকের কবিরাও লোরকার কবিতা অনুবাদ করেছেন| যেমন বিষ্ণু দে| অর্থাৎ লোরকা বহু আগে থেকে আমাদের মাঝে পঠিত| লোরকা এখনো স্পেনের কবিদের মধ্যে অধিক পরিচিত এবং সবার আগে পরিচিত| আজকের আলোচ্যলোরকার দেশেবইটি কোনো গবেষণামূলক বই নয়, কিন্তু এর মধ্যে গবেষণা আছে, এটি কোনো সাহিত্য সমালোচকের মূল্যায়নধর্মী বই নয়, কিন্তু সেটিও কিছু অংশ এখানে আছে| তিনি পর্যটকসত্তা নিয়ে ভ্রমণ করেছেন। আমি বিস্মিত যে, তার সাহিত্যপ্রীতি, সাহিত্যবোধ কতটা প্রবল হলে তিনি লোরকার ভ্রমণতীর্থগুলো ঘুরে ঘুরে বেড়িয়ে একটি বই রচনা করতে পারেন| পাশ্চাত্য জগতে ধরনের নিষ্ঠা দেখা গেলেও বাংলা ভাষায় এমন নিষ্ঠা আমি পাই না| ক্লিনটন বুথ সিলি যেমন জীবনানন্দকে জানতে গিয়ে বরিশালসহ জীবনানন্দ দাশ যে সব জায়গায় ঘুরেছেন, সেসব জায়গায় ভ্রমণ করেছেন, সালাহউদ্দীন মাহমুদও ঠিক সেই কাজটি করেছেন| এই দৃষ্টিতে তিনি ক্লিনটন সিলির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নন| ‘লোরকার দেশেবইটি একটি মিক্সড জনরা| এর মধ্যে কবিতা আছে, সাহিত্যের মানচিত্র আছে, নিজের মূল্যায়নসহ অনেক কিছুই আছে| সুতরাং বই হিসেবে এটি একটি অসাধারণ বই|”

আলোচক আশরাফ উদ্দীন আহমদ বলেন, “লোরকার দেশে বইয়ের লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদকে আমি দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে চিনি| আমরা একসময় সহকর্মী ছিলাম চা বাগানে| তখনই তাকে দেখেছি একজন পরিশীলিত মানুষ হিসেবে এবং তখনই জানতে পেরেছি তার সাহিত্যানুরাগের বিষয়টি| আমার মনে আছে তিনি আমাকে কাহলিল জিবরানের একটি ছোট্ট কবিতার বই উপহার দিয়েছিলেন| এখন তিনি প্রবাসে, অনেক দূরে থাকেন| সেখান থেকে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত অগ্রবীজের সংখ্যাগুলো তিনি আমাকে পাঠাতেন| ‘লোরকার দেশেবইটি আমি পড়েছি| যেন এক মহাকাব্য| আমি লোরকা সম্পর্কে জানতাম না| বইটা পড়ে আমি লোরকারকে যতটুকু জেনেছি; তা আমার কাছে বিস্ময়কর ঠেকেছে| মাত্র আটত্রিশ বছর বেঁচে থাকা এক মহাপ্রতিভাধর কবি সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিয়েছেন চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ| তিনি শুধু স্পেনের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াননি, তিনি খুঁজেছেন লোরকার সেই পঙক্তিগুলোকে যা স্পেনের বাতাসকে ভারি করে রাখে| লোরকা লিখেছেন জিপসিদের কথা, স্পেনের সবুজ জলপাইবনের কথা, আর ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দ্রোহের কথা| চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ তার নিপুণ গীতিময় গদ্যে আমাদের সামনে সেই রূপটি তুলে ধরেছেন|”

আলোচক মুজতবা রেজা বলেন, “ভ্রমণ থেকেই হয় ভ্রমণ কাহিনি| কিন্তু ভ্রমণকারীদের সকলের হাত দিয়ে নয়| অর্থাৎ সুপাঠ্য ভ্রমণসাহিত্যের অত্যাবশকীয় উপাদান হচ্ছেমনোযোগী সিরিয়াস ভ্রমণকারী, ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ে লেখকের আগ্রহ, লেখকের  শৈল্পিক রসবোধআর সর্বোপরি সাহিত্যমূল্যে চিত্তাকর্ষক আর মনোগ্রাহী লেখা বা পরিবেশনা|
বাংলা সাহিত্যে আমরা অনেক বিখ্যাত লেখক যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ মুজতবা আলী, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, (স্বাধীনতা পরবর্তীতে) মুহাম্মাদ হাবিবুর রহমানের, শাকুর মজিদ অন্যদের হাত ধরে বেশ কিছু চমৎকার স্মরণীয় ভ্রমণ সাহিত্য পেয়েছি| এই ধারায় একটি সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে চৌধুরী সালাউদ্দীন মাহমুদেরলোরকার দেশেনামক  ভ্রমণসাহিত্য বিষয়ক এই বইটি| এই বইয়ে আলহাম্বরা প্রাসাদ, মুসলিম শাসনামলের সমৃদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং  লোরকার  স্মৃতি বিজড়িত আবাসস্থল, লাইব্রেরি, পার্ক ইত্যাদি সমুদয় স্থাপনা ঘটনাগুলো, এমনকি লোরকার স্মৃতি বিজড়িত অন্যান্য দেশের স্থাপনাসমূহও এত নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন লেখক দৃশ্যমান জগতের আড়ালে থাকা অদৃশ্য, অসীম অতীত জগতের উপস্থিতিকে তুলে ধরছেন আর আমাদের চোখের সামনে যা কিছু দৃশ্যমান, তার বাইরেও যে  এক বিশাল অতীত লুকিয়ে আছে, তা কল্পনার চোখে দৃশ্যমান হয়ে যায়|”

অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক সোহরাব হাসান বলেন, “কবিদের হৃদয় অনেক বড়, বইটি নিয়ে প্রায় ডজনখানেক বক্তা আলোচনা করলেন, তবু আলোচনা শেষ হচ্ছে না| ‘লোরকার দেশেঅনেকেই বলেছেন এটি ভ্রমণ কাহিনি, কিন্তু আমার কাছে এটিকে ভ্রমণ কাহিনি মনে হয়নি| আমার কাছে মনে হয়েছে এটি একটিআবিষ্কার কাহিনি’| অর্থাৎ তিনি লোরকাকে আবিষ্কার করেছেন, এবং আবিষ্কার করতে গিয়ে তিনি স্পেনের বিভিন্ন শহর, কিউবা, আর্জেন্টিনা, নিউইয়র্কের মতো বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেছেন, যেসব জায়গায় লোরকা ঘুরে বেরিয়েছেন| ভালবাসার টানে লোরকা যেসব জায়গায় ঘুরেছেন, সেখানে নিজেকে উপস্থাপনের সুনিপুণ বর্ণনা এই গ্রন্থ| আমি বইয়ের লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের এই ব্যতিক্রমী ভ্রমণের গল্প শুনে বিস্মিত হয়েছি এই কারণে যে, এসব জায়গায় তিনি একা যাননি, গিয়েছেন স্ত্রী এবং তার দুই সন্তানকে নিয়ে| এসব জায়গায় ঘুরতে গিয়ে নিশ্চয় তার পরিবারের লোকজন সবসময় একমত হতে পারেননি| কোথাও তাদের ভাল লেগেছে, আবার কোথাও লাগেনি| বিষয়গুলোও তিনি সমন্বয় করেছেন| এবং বইয়ের কোথাও কোথাও তার উল্লেখও আছে| এই বইটি একটি জানার বই| ইতিহাস, ঐতিহ্য, দর্শন সব কিছু আছে বইটিতে| কবিতা তো আছেই| লোরকার কবিতাকে সহ্য করতে না পেরে মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে ফ্রাঙ্কোর বাহিনি তাকে হত্যা করে| লোরকার মৃত্যুকে নিয়ে বাংলা ভাষার কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি কবিতা লিখেছেন, যেখানে লোরকার কোনো নাম নেই| এত প্রতীকী এত ব্যঞ্জনাময় কবিতা সবাইকে স্পর্শ করে| লোরকা কি শুধু স্পেনের কবি? লোরকা আমাদের কবি, লোরকা সারা পৃথিবীর কবি| লোরকা শুধু কবি ছিলেন না, সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন, তিনি নাট্যকার ছিলেন, নাট্য নির্দেশক ছিলেন এমনকি তার একটি নাট্য সংগঠনও ছিল| আমাদের চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদেরও একটি নাট্য সংগঠন আছেডালাস বাংলা থিয়েটারনামে| এই যে বাংলাদেশের একজন লেখক লোরকার অন্বেষণে এত জায়গায় ঘুরেছেন| এটি শুধু ভালবাসা থেকে| লেখকরা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ভালবাসার মানুষ| আমি চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদকে অনুরোধ করবোএমন আরও আরও আবিষ্কার করুন| একজন সম্পাদক কীভাবে একজন লেখকের পিছনে লেগে থাকে, বইটি প্রকাশে সেটি প্রমাণিত হয়েছে| ‘লোরকার দেশেবইটির প্রণেতা চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ; কিন্তু তার নেপথ্যের মানুষটি ওবায়েদ আকাশ| আমাদের সম্পাদকদের হতে হয় জহুরি| কোথায় হিরক আছে, কোথায় আরও মূল্যবান কিছু লুকিয়ে আছে তাকে খুঁজে বের করতে হয়| সালাহউদ্দীন মাহমুদকে খুঁজে বের করা তেমনই একটি কাজ| ‘লোরকার দেশেবইটি একটি অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ| চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ হয়তো আমাদেরকে আরও নতুন নতুন আবিষ্কার দিয়ে আমাদের অভিভূত করবেনএমন প্রত্যাশা করি|”

অনুষ্ঠানের মধ্যমণিলোরকার দেশেবইয়ের লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ বলেন, “আজকের বৃষ্টিস্নাত বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে যারা অনুষ্ঠানে এসেছেন, তারা সাহিত্যের টানেও এসেছেন, আমার টানে এসেছেন| আপনাদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে মহিমান্বি করেছে| আমরা বাঙালিরা খুব আবেগপ্রবণ জাতি| ‘লোরকার দেশেবইটি আমার ভালবাসা থেকে লেখা| এই ভালবাসা না থাকলে কোনো মহৎ কাজ হয় না| আপনারা শালুক পরিবারের সদস্যরা শালুককে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন| অনেক মহৎ কাজ সম্পাদন করছেন| এই বইটির প্রকাশনা এই মহৎ কাজের একটি| লোরকা সম্পর্কে আমি প্রথম জানি ২০১৫ সালে| তখন কবি-বন্ধু-সম্পাদক ওবায়েদ আকাশ আমাকে লোরকার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন| ওবায়েদ আকাশের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে কবি মাহফুজ আল-হোসেন সুবর্ণ আকাশনাকে বিশাল আকৃতির একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন| কোনো কবির পঞ্চাশ পূর্তিতে এত সমৃদ্ধ স্মারকসংখ্যা এর আগে আমি দেখিনি| ওবায়েদ সম্পর্কেসুবর্ণ আকাশশব্দ দুটি যথার্থ প্রয়োগ| তখন শালুক লোরকা সংখ্যা প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছে| আমাকে লোরকাকে নিয়ে লিখতে অনুরোধ করেন ওবায়েদ| তখন আমার লোরকা সম্পর্কে ধারণা ছিল না| শালুকের লেখার আমন্ত্রণ পেয়ে ওইদিন বাসায় নিয়ে এলাম লোরকার কবিতা সংকলন| বিশাল সে কবিতাসংকলন| মাত্র আটত্রিশ বছর জীবন পাওয়া একজন কবি এত লিখেছেন! তখন লোরকার নাটক সঙ্গীত সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল না| শালুকের লোরকা সংখ্যায় লেখার মাধ্যমে আমার শুরু হলো লোরকাকে নিয়ে লেখা| এবং তার প্রতি আগ্রহও বাড়তে থাকল| এভাবে আমি লোরকার প্রেমে পড়ে যাই| এবং তার সম্পর্কে জানতে আরও আগ্রহ তৈরি হতে থাকে| আমি লোরকার কবিতা পড়ে প্রাণিত হই| তার স্মৃতির সন্ধানে ঘুরি| যখন স্পেনে গেলাম, তখন ভাবলাম লোরকার স্মৃতিগুলো ঘুরে দেখি| স্পেনের যে নিসর্গ দেখলাম, সেখান থেকে লোরকাকে আলাদা করা যাবে না| দেখলাম লোরকা মিশে আছেন জলপাই বাগানে, মিশে আছেন ফোয়ারায়, মিশে আছেন ঝর্নায়, মিশে আছেন আকাশে বাতাসে এমনকি সমগ্র আন্দালুসিয়ায় এবং লোরকা মিশে আছেন আলহাম্বরায়| আলহাম্বরা নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছেন লোরকা| আমি এর আগে দেখিনি একজন কবি নিসর্গ ইতিহাস সংস্কৃতি ঐতিহ্যসব কিছুর সাথে এভাবে মিশে যেতে পারেন| একটা জিনিস আমি উল্লেখ করিনি| লোরকা আবিষ্কার করেছেন জিপসিদের ফ্ল্যামেঙ্কোকে| এবং আমি সপরিবারে গিয়েছি জিপসিদের নাচ দেখার জন্য| এভাবে আমি ঘুরেছি লোরকার স্মৃতিতীর্থগুলো| আলোচকগণ আমারলোরকার দেশেবইটিকে খুব ইতিবাচক অর্থে নিয়েছেন| চমৎকার আলোচনা করেছেন| আপনাদের সকলের উপস্থিতি আমাকে উৎসাহিত করেছে| আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা|”

গ্রন্থের লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ প্রত্যেক আলোচকের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নিয়ে আলোচনা করেন| এবং উপস্থিত সকললে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন|

বৃষ্টিধোয়া সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সকলের মধ্যে জমে ওঠে জমজমাট আড্ডা| লোভনীয় গুড়ের সন্দেশ, কেক, আফলাতুন, নিমকি আর সিঙ্গাড়া দিয়ে আপ্যায়ন পরস্পর আলাপে সংলাপে সমাপ্ত হয়লোরকার দেশেবইটিকে ঘিরে এই প্রাণবন্ত সমাবেশ|



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত