সম্প্রতি পুণ্ড্র প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে নব্বইয়ের দশকের অকাল প্রয়াত কবি শামীম কবীর স্মরণ-পুস্তক “কী কথা উজানে দেবো: শামীম কবীর স্মরণ ও পাঠ”। সম্পাদনা করেছেন নভেরা হোসেন। প্রয়াত এই কবি সম্পর্কে চঞ্চল আশরাফের অভিমত, ‘শামীম কবীর নব্বইয়ের দশকের অন্যতম প্রভাবশালী ও নিভৃতচারী কবি। তাঁর কবিতায় পরাবাস্তবতা, নাগরিক একাকীত্ব এবং আধ্যাত্মিক চেতনার এক অনন্য মিশেল লক্ষ করা যায়। তাঁর কাব্যশৈলীর প্রধান দিকগুলো হলো— বিমূর্ত প্রকাশ, প্রচলিত ছন্দের বাইরে চূর্ণ গদ্য, চিত্রাত্মক পরিচর্যা। ব্যক্তিক বিষাদ ও বিচ্ছিন্নতাবোধ, আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা এবং অস্তিত্বের সংকট বিচিত্রমুখী ব্যঞ্জনায় তিনি প্রকাশ করেছেন। শব্দ চয়নে শামীম অত্যন্ত সতর্ক ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাপ্রবণ ছিলেন, যা তাঁকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করেছে।’
যেকোনো সমাজ কাঠামোয় মৃত লেখকের পুনরাবির্ভাব কিংবা তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের হদিস মেলার মটিফটি কখনোই নিছক একটি আবেগঘন বা স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা নয়। বরং তা এক ধরনের জটিল সাংস্কৃতিক ডিসকোর্স, যা নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠীগত সংহতি এবং স্মৃতির রাজনীতির মধ্য দিয়ে উৎপাদিত হয়। সম্প্রতি রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে কবি শামীম কবীরকে নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। ‘সংস্কৃতিবাংলা’র উদ্যোগে ‘কী কথা উজানে দেবো/শামীম কবীর: স্মরণ ও পাঠ’ নামক এই বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানকে আমরা কেবল একটি সাধারণ সাহিত্যিক জমায়েত হিসেবে দেখতে পারি না। এটি আসলে নব্বইয়ের দশকের একজন কবির সৃষ্টিশীলতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এবং সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস।
নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের কবিতার দিকে তাকালে দেখা যায়, তা এক ধরনের ক্ষয়িষ্ণু আধুনিকতা, রাজনৈতিক মোহভঙ্গ এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক নাগরিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে বিকশিত হচ্ছিল। শামীম কবীর ছিলেন ওই সময়েরই এক প্রতিনিধি, যাঁর প্রয়াণে তাঁর কাব্যপ্রতিভার পূর্ণ বিকশিত হওয়ার পথ মসৃণ থাকে না। সাহিত্যিক আলোচনায় প্রায়শই অল্প বয়সে চলে যাওয়াকে এক প্রকার রহস্যময় মহিমা দেওয়া হয়, যা মূল সাহিত্যকর্মের চেয়ে লেখকের ব্যক্তিজীবনকে বেশি আলোড়িত করে। তবে আলোচকদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, শামীম কবীর কেবল তাঁর জীবনযাপনের আকস্মিকতায় অনন্য ছিলেন না, তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু ও গঠনে ছিল এক গভীর অস্তিত্ববাদী সংকট। তাঁর কবিতায় মানুষের অস্তিত্বের নিগূঢ় সংবাদ যেভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে, তা আমাদের চেনা নাগরিক মধ্যবিত্তের ভণ্ডামিকে এক প্রকার চপেটাঘাত করে। জীবনকে তার সমস্ত ক্লেদ, গ্লানি, নোংরামি এবং অন্তিম সীমাবদ্ধতাসহ গ্রহণ করার যে সাহস তাঁর লেখার ভেতরে পাওয়া যায়, তা নব্বইয়ের দশকের মূলধারার অনেক কবির চেয়ে তাঁকে আলাদা করে চেনার সুযোগ করে দেয়।
নভেরা হোসেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত “কী কথা উজানে দেবো: শামীম কবীর স্মরণ ও পাঠ” গ্রন্থটি একটি গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই টেক্সট বা পাঠের ধারণাটি বোঝা জ রুরি। বএকজন মৃত কবি যখন আর নতুন কোনো শব্দ তৈরি করতে পারেন না, তখন তাঁর পূর্বের সৃষ্টিসমূহ এবং তাঁর সম্পর্কিত স্মৃতিগুলোকে নতুন করে সাজানোর দায়িত্ব পড়ে জীবিতদের ওপর। নভেরা হোসেনের এই সম্পাদনা কাজ মূলত সেই অনুপস্থিত শামীম কবীরকে সমকালীন পাঠকদের সামনে হাজির করার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখলেন ষড়ৈশ্বর্য মুহাম্মদ এবং সম্পাদকের নিজস্ব জবানবন্দি দিলেন নভেরা হোসেন নিজে। এই প্রাতিষ্ঠানিক আচারের ভেতর দিয়ে কবিকে এক প্রকার ‘আইকনিক’ রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কুমার চক্রবর্তী, চঞ্চল আশরাফ, শোয়েব শাহরিয়ার, পিয়াস মজিদ ও আফরোজা সোমার মতো আলোচকদের অংশগ্রহণ এই ইঙ্গিত দেয় যে, সমকালীন সাহিত্যিকেরা শামীম কবীরকে তাঁদের নিজস্ব ডিসকোর্সের অংশ করে নিতে চাইছেন। এখানে ব্যক্তি শামীম কবীরের চেয়েও ‘কবি শামীম কবীর’ নামক যে ধারণা বা মিথ তৈরি হচ্ছে, তা প্রমাণ করে যে, সমাজে সাহিত্যের এক ধরনের নিজস্ব বাজার ও স্মৃতিরক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ রয়েছে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান সুর ছিল— কবি শামীম কবীর মৃত্যুকে নানারূপে তাঁর কবিতায় উদযাপন করেছেন, অথচ শেষাবধি তিনি ছিলেন জীবনেরই জয়গায়ক। এই ধরনের বক্তব্যকে আমরা ‘লিবারেল হিউম্যানিস্ট’ বা উদারনৈতিক মানবতাবাদী বয়ানের অংশ হিসেবে দেখতে পারি। যেকোনো কবির ভাঙচুর, হাহাকার কিংবা নেতিবাচক প্রবণতাকে শেষ পর্যন্ত একটা ‘ইতিবাচক’ বা ‘জীবনমুখী’ তকমায় মুড়িয়ে দেওয়ার এক সামাজিক প্রবণতা আমাদের দেশে প্রবল। কেন একজন কবি কেবল ক্লেদ ও গ্লানির কবি হিসেবে টিকে থাকতে পারবেন না? কেন তাঁর মৃত্যুকামী প্রবণতাকেও শেষ পর্যন্ত ‘জীবনের গান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে আমাদের আশ্বস্ত হতে হবে? শামীম কবীরের কবিতা হয়তো এই সান্ত্বনাদায়ক ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে আরও বেশি চরম, আরও বেশি নির্মম কোনো সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চেয়েছিল পাঠককে। তাঁর মরণোত্তর রচনাসমগ্রের ভেতর যে ‘প্রতিভাদীপ্ত সৃজনশীল সত্তার’ পরিচয় পাওয়া যায়, তা হয়তো এই দ্বিধাবিভক্ত মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্বকে এক প্রকার অস্বস্তিতে ফেলে। তরুণ কবিতাকর্মী, পাঠক ও গবেষকদের কাছে তাঁর কবিতা আজ যে আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে, তার কারণ সম্ভবত এই যে, তিনি কোনো তৈরি করা আদর্শের ফ্রেমে নিজেকে বন্দি রাখেননি।
অনুষ্ঠানে পারিবারের পক্ষ থেকে স্মৃতিচারণ করলেন কবির অনুজ লতিফুল বারী। এই পারিবারিক স্মৃতিচারণ প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার সমান্তরালে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা যেখানে কবিকে তত্ত্ব, শৈলী এবং সাহিত্যের ইতিহাসের ফ্রেমে বিচার করতে চায়, পারিবারিক স্মৃতি সেখানে নিয়ে আসে রক্ত-মাংসের মানুষের ট্র্যাজেডি ও প্রাত্যহিকতার গল্প। এই দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটে যখন কবি ও অনুবাদক গৌরাঙ্গ মোহান্তের মতো ব্যক্তিত্ব সভার সভাপতিত্ব করেন এবং পুরো আলোচনাটিকে একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসেন।

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
সম্প্রতি পুণ্ড্র প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে নব্বইয়ের দশকের অকাল প্রয়াত কবি শামীম কবীর স্মরণ-পুস্তক “কী কথা উজানে দেবো: শামীম কবীর স্মরণ ও পাঠ”। সম্পাদনা করেছেন নভেরা হোসেন। প্রয়াত এই কবি সম্পর্কে চঞ্চল আশরাফের অভিমত, ‘শামীম কবীর নব্বইয়ের দশকের অন্যতম প্রভাবশালী ও নিভৃতচারী কবি। তাঁর কবিতায় পরাবাস্তবতা, নাগরিক একাকীত্ব এবং আধ্যাত্মিক চেতনার এক অনন্য মিশেল লক্ষ করা যায়। তাঁর কাব্যশৈলীর প্রধান দিকগুলো হলো— বিমূর্ত প্রকাশ, প্রচলিত ছন্দের বাইরে চূর্ণ গদ্য, চিত্রাত্মক পরিচর্যা। ব্যক্তিক বিষাদ ও বিচ্ছিন্নতাবোধ, আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা এবং অস্তিত্বের সংকট বিচিত্রমুখী ব্যঞ্জনায় তিনি প্রকাশ করেছেন। শব্দ চয়নে শামীম অত্যন্ত সতর্ক ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাপ্রবণ ছিলেন, যা তাঁকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করেছে।’
যেকোনো সমাজ কাঠামোয় মৃত লেখকের পুনরাবির্ভাব কিংবা তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের হদিস মেলার মটিফটি কখনোই নিছক একটি আবেগঘন বা স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা নয়। বরং তা এক ধরনের জটিল সাংস্কৃতিক ডিসকোর্স, যা নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠীগত সংহতি এবং স্মৃতির রাজনীতির মধ্য দিয়ে উৎপাদিত হয়। সম্প্রতি রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে কবি শামীম কবীরকে নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। ‘সংস্কৃতিবাংলা’র উদ্যোগে ‘কী কথা উজানে দেবো/শামীম কবীর: স্মরণ ও পাঠ’ নামক এই বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানকে আমরা কেবল একটি সাধারণ সাহিত্যিক জমায়েত হিসেবে দেখতে পারি না। এটি আসলে নব্বইয়ের দশকের একজন কবির সৃষ্টিশীলতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এবং সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস।
নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের কবিতার দিকে তাকালে দেখা যায়, তা এক ধরনের ক্ষয়িষ্ণু আধুনিকতা, রাজনৈতিক মোহভঙ্গ এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক নাগরিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে বিকশিত হচ্ছিল। শামীম কবীর ছিলেন ওই সময়েরই এক প্রতিনিধি, যাঁর প্রয়াণে তাঁর কাব্যপ্রতিভার পূর্ণ বিকশিত হওয়ার পথ মসৃণ থাকে না। সাহিত্যিক আলোচনায় প্রায়শই অল্প বয়সে চলে যাওয়াকে এক প্রকার রহস্যময় মহিমা দেওয়া হয়, যা মূল সাহিত্যকর্মের চেয়ে লেখকের ব্যক্তিজীবনকে বেশি আলোড়িত করে। তবে আলোচকদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, শামীম কবীর কেবল তাঁর জীবনযাপনের আকস্মিকতায় অনন্য ছিলেন না, তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু ও গঠনে ছিল এক গভীর অস্তিত্ববাদী সংকট। তাঁর কবিতায় মানুষের অস্তিত্বের নিগূঢ় সংবাদ যেভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে, তা আমাদের চেনা নাগরিক মধ্যবিত্তের ভণ্ডামিকে এক প্রকার চপেটাঘাত করে। জীবনকে তার সমস্ত ক্লেদ, গ্লানি, নোংরামি এবং অন্তিম সীমাবদ্ধতাসহ গ্রহণ করার যে সাহস তাঁর লেখার ভেতরে পাওয়া যায়, তা নব্বইয়ের দশকের মূলধারার অনেক কবির চেয়ে তাঁকে আলাদা করে চেনার সুযোগ করে দেয়।
নভেরা হোসেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত “কী কথা উজানে দেবো: শামীম কবীর স্মরণ ও পাঠ” গ্রন্থটি একটি গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই টেক্সট বা পাঠের ধারণাটি বোঝা জ রুরি। বএকজন মৃত কবি যখন আর নতুন কোনো শব্দ তৈরি করতে পারেন না, তখন তাঁর পূর্বের সৃষ্টিসমূহ এবং তাঁর সম্পর্কিত স্মৃতিগুলোকে নতুন করে সাজানোর দায়িত্ব পড়ে জীবিতদের ওপর। নভেরা হোসেনের এই সম্পাদনা কাজ মূলত সেই অনুপস্থিত শামীম কবীরকে সমকালীন পাঠকদের সামনে হাজির করার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখলেন ষড়ৈশ্বর্য মুহাম্মদ এবং সম্পাদকের নিজস্ব জবানবন্দি দিলেন নভেরা হোসেন নিজে। এই প্রাতিষ্ঠানিক আচারের ভেতর দিয়ে কবিকে এক প্রকার ‘আইকনিক’ রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কুমার চক্রবর্তী, চঞ্চল আশরাফ, শোয়েব শাহরিয়ার, পিয়াস মজিদ ও আফরোজা সোমার মতো আলোচকদের অংশগ্রহণ এই ইঙ্গিত দেয় যে, সমকালীন সাহিত্যিকেরা শামীম কবীরকে তাঁদের নিজস্ব ডিসকোর্সের অংশ করে নিতে চাইছেন। এখানে ব্যক্তি শামীম কবীরের চেয়েও ‘কবি শামীম কবীর’ নামক যে ধারণা বা মিথ তৈরি হচ্ছে, তা প্রমাণ করে যে, সমাজে সাহিত্যের এক ধরনের নিজস্ব বাজার ও স্মৃতিরক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ রয়েছে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান সুর ছিল— কবি শামীম কবীর মৃত্যুকে নানারূপে তাঁর কবিতায় উদযাপন করেছেন, অথচ শেষাবধি তিনি ছিলেন জীবনেরই জয়গায়ক। এই ধরনের বক্তব্যকে আমরা ‘লিবারেল হিউম্যানিস্ট’ বা উদারনৈতিক মানবতাবাদী বয়ানের অংশ হিসেবে দেখতে পারি। যেকোনো কবির ভাঙচুর, হাহাকার কিংবা নেতিবাচক প্রবণতাকে শেষ পর্যন্ত একটা ‘ইতিবাচক’ বা ‘জীবনমুখী’ তকমায় মুড়িয়ে দেওয়ার এক সামাজিক প্রবণতা আমাদের দেশে প্রবল। কেন একজন কবি কেবল ক্লেদ ও গ্লানির কবি হিসেবে টিকে থাকতে পারবেন না? কেন তাঁর মৃত্যুকামী প্রবণতাকেও শেষ পর্যন্ত ‘জীবনের গান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে আমাদের আশ্বস্ত হতে হবে? শামীম কবীরের কবিতা হয়তো এই সান্ত্বনাদায়ক ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে আরও বেশি চরম, আরও বেশি নির্মম কোনো সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চেয়েছিল পাঠককে। তাঁর মরণোত্তর রচনাসমগ্রের ভেতর যে ‘প্রতিভাদীপ্ত সৃজনশীল সত্তার’ পরিচয় পাওয়া যায়, তা হয়তো এই দ্বিধাবিভক্ত মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্বকে এক প্রকার অস্বস্তিতে ফেলে। তরুণ কবিতাকর্মী, পাঠক ও গবেষকদের কাছে তাঁর কবিতা আজ যে আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে, তার কারণ সম্ভবত এই যে, তিনি কোনো তৈরি করা আদর্শের ফ্রেমে নিজেকে বন্দি রাখেননি।
অনুষ্ঠানে পারিবারের পক্ষ থেকে স্মৃতিচারণ করলেন কবির অনুজ লতিফুল বারী। এই পারিবারিক স্মৃতিচারণ প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার সমান্তরালে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা যেখানে কবিকে তত্ত্ব, শৈলী এবং সাহিত্যের ইতিহাসের ফ্রেমে বিচার করতে চায়, পারিবারিক স্মৃতি সেখানে নিয়ে আসে রক্ত-মাংসের মানুষের ট্র্যাজেডি ও প্রাত্যহিকতার গল্প। এই দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটে যখন কবি ও অনুবাদক গৌরাঙ্গ মোহান্তের মতো ব্যক্তিত্ব সভার সভাপতিত্ব করেন এবং পুরো আলোচনাটিকে একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসেন।

আপনার মতামত লিখুন