সংবাদ

বঙ্গোপসাগর সংলাপ: যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্যকে ঔপনিবেশিক যুগে নিয়ে যাচ্ছে


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম

বঙ্গোপসাগর সংলাপ: যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্যকে ঔপনিবেশিক যুগে নিয়ে যাচ্ছে

  • এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থানে বাংলাদেশের বড় সুযোগ আছে: রেহমান সোবহান
  • বঙ্গোপসাগরকে বাহ্যিক সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে চায় বাংলাদেশ: আ ন ম মুনীরুজ্জামান
  • উন্নয়নের স্বার্থে বাংলাদেশ স্থিতিশীলতা চায়: তথ্যমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্র ও এর নেতৃত্বাধীন প্রভাবশালী দেশগুলো বিশ্ব বাণিজ্যকে আবারও ঔপনিবেশিক যুগে নিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

তিনি বলেছেন, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় তারা দুর্বল দেশগুলোকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের পণ্য কিনতে বাধ্য করছে।

শনিবার (৩ অক্টোবর)  ঢাকায় প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর ‘দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডিসঅর্ডার’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, ‘আমরা বাণিজ্যের ঔপনিবেশিক মডেলে ফিরে যাওয়া দেখছি। শুল্কের চাপে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছে অনেক দেশ।’

তিনি বলেন, ‘আপনার পণ্য কিনতে বাধ্য করার মানে হলো, আপনি আর প্রতিযোগিতামূলকভাবে উৎপাদন করতে পারছেন না। যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও শুল্ক ব্যবহার করছে। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করায় তারা ব্রাজিল, কানাডা, চীন এবং এমনকি ভারতকেও চাপে রাখছে।’

তার মতে, এশিয়ার দেশগুলোর উত্থানের বিপরীতে এটি পাশ্চাত্যের ‘বিকৃত’ প্রতিক্রিয়া। তিনি বলেন, উপনিবেশবাদের সময় দেশ দখলের মাধ্যমে বাজার কুক্ষিগত করা হতো। কিন্তু এশিয়ার উত্থান ঘটেছে মূলত ‘বাজারের নিয়মেই’। এর প্রতিক্রিয়ায়, প্রতিযোগিতার বদলে বাজারেই হস্তক্ষেপ করছে পুরোনো শক্তিগুলো।

১৮৯০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাকিনলি বাজার সুরক্ষার মাধ্যমে মার্কিন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। সেই উদাহরণ টেনে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির জন্য এটি এখন অচল কৌশল।’

রেহমান সোবহান বলেন, তারপরও এশিয়া অর্থনৈতিক বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে চীন ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। এখন তারা প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেও যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। ইসরায়েলকে ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে এই যুদ্ধের জন্য তাদের দায়ী করেন তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের আমদানি পণ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে এলেও রপ্তানি গুটিকয়েক বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই তিনি এশিয়ার ‘ভ্যালু চেইনের’ সঙ্গে বাংলাদেশকে ওতপ্রতভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিশ্চিতভাবেই আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়াকে এসব দেশের ভ্যালু চেইনে যুক্ত করেছি। কিন্তু সেখানে আমাদের জন্য যেসব সুযোগ তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে আমরা বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনাকে মেলাতে পারিনি।’

রেহমান সোবহান বলেন, ‘ভবিষ্যতের কৌশলগত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমরা তেমন দক্ষ নই। আর এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি অকার্যকর।’

তার মতে, বাংলাদেশের প্রকৃত কৌশলগত গুরুত্ব বঙ্গোপসাগরে নয়, বরং দেশের মধ্যেই নিহিত। পদ্মা ও যমুনা সেতু ব্যবহার করে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

এর আগে আজ সকালে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এই ফোরামের পঞ্চম আসরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক ফোরামে ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ২০০ জন বক্তা, ৩০০ জন প্রতিনিধি এবং ১ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছেন।

বাহ্যিক সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান সংলাপে অংশ নিয়ে বলেন, বঙ্গোপসাগরকে যে কোনো বাহ্যিক সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে রাখতে চায় বাংলাদেশ।

চীন ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে এবং ভারসাম্য বজায় রাখতে বাংলাদেশ কী ভূমিকা রাখতে পারে প্রশ্ন রাখা হয় মুনীরুজ্জামানের কাছে। জবাবে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়া এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। ভারত ও চীন উভয়কে বাংলাদেশের কাছে অনেক কিছু দেওয়ার আছে।

সামুদ্রিক স্থিতিশীলতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। বঙ্গোপসাগর কেবল এই অঞ্চলের জন্যই নয়, বরং ভারত মহাসাগরের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত মহাসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত পরিকল্পনায় এই বিশাল উপসাগরটির ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখানে সামুদ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে, যা ভারত ও চীন উভয়ের জন্যই অপরিহার্য। আমরা বঙ্গোপসাগরকে যে কোনো বাহ্যিক সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে রাখতে চাই।’

আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু উদাহরণ দিয়ে মুনীরুজ্জামান বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী সেতু হিসেবে কাজ করে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ভূ-কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশ যদি চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত একটি স্থলপথ বা করিডোর তৈরি করে, তবে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সংযোগের মাধ্যমে ভারত ও চীন উভয় ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।

বাংলাদেশ স্থিতিশীলতা চায়: তথ্যমন্ত্রী

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ সংলাপে অংশ নিয়ে বলেন, বাংলাদেশ কোনো যুদ্ধ, নিরাপত্তা ইস্যু, ভূখণ্ড দখল বা শোষণের বিষয়ে আগ্রহী নয়। দেশের উন্নয়ন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশই বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়ের একটি অংশ এবং আমরা স্থিতিশীলতা চাই, কারণ আমরা উন্নতি করতে চাই।’

আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, ‘আমি অবাক হয়েছিলাম যে আপনারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নিয়ে কথা বলছেন না। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক সংকট শুধু চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আমরা সবাই এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তার ভুক্তভোগী।’

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সমস্যাটি সহজে শেষ হওয়ার নয়। এর মূল বিষয় হলো একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা এবং আমি চাই না তুমি ধনী হও-এমন একটি মানসিকতা।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৮০ বা ১৯৯০-এর দশকে ভারত ও চীন প্রায় একই অবস্থানে ছিল। কিন্তু চীন কৃষি খাত থেকে উৎপাদনমুখী শিল্পে মনোযোগ দেয়, আর ভারত কৃষি থেকে সেবা খাতে চলে যায়। এর ফলে চীন অনেক বেশি এগিয়ে যায় এবং ভারত প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়ে পড়ে।’

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়ের একটি অংশ এবং আমরা স্থিতিশীলতা চাই, কারণ আমরা উন্নতি করতে চাই। আমেরিকা ও চীনের মতো দেশগুলো হয়তো ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সামলাতে পারবে, কারণ তারা উৎপাদনের দিক থেকে অনেক এগিয়ে। কিন্তু আমরা ভোক্তা পর্যায়ে আছি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিনের চিন্তা হলো খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা। যুদ্ধ বা অস্থিতিশীলতায় জড়ানোর মতো সময় আমাদের নেই। দিন শেষে আমরাই এসবের ভুক্তভোগী।’

বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি সংকটের কথাও তুলে ধরেন তথ্যমন্ত্রী। তার ভাষ্য, যে যুদ্ধের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সম্পর্ক নেই, সেই যুদ্ধের প্রভাবেও দেশকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।

আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, ‘আমরা কোনো যুদ্ধে জড়াতে চাই না। আমরা চাই চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তিগুলো আমাদের উন্নতি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা করুক।’

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


বঙ্গোপসাগর সংলাপ: যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্যকে ঔপনিবেশিক যুগে নিয়ে যাচ্ছে

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

  • এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থানে বাংলাদেশের বড় সুযোগ আছে: রেহমান সোবহান
  • বঙ্গোপসাগরকে বাহ্যিক সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে চায় বাংলাদেশ: আ ন ম মুনীরুজ্জামান
  • উন্নয়নের স্বার্থে বাংলাদেশ স্থিতিশীলতা চায়: তথ্যমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্র ও এর নেতৃত্বাধীন প্রভাবশালী দেশগুলো বিশ্ব বাণিজ্যকে আবারও ঔপনিবেশিক যুগে নিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

তিনি বলেছেন, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় তারা দুর্বল দেশগুলোকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের পণ্য কিনতে বাধ্য করছে।

শনিবার (৩ অক্টোবর)  ঢাকায় প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর ‘দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডিসঅর্ডার’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, ‘আমরা বাণিজ্যের ঔপনিবেশিক মডেলে ফিরে যাওয়া দেখছি। শুল্কের চাপে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছে অনেক দেশ।’

তিনি বলেন, ‘আপনার পণ্য কিনতে বাধ্য করার মানে হলো, আপনি আর প্রতিযোগিতামূলকভাবে উৎপাদন করতে পারছেন না। যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও শুল্ক ব্যবহার করছে। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করায় তারা ব্রাজিল, কানাডা, চীন এবং এমনকি ভারতকেও চাপে রাখছে।’

তার মতে, এশিয়ার দেশগুলোর উত্থানের বিপরীতে এটি পাশ্চাত্যের ‘বিকৃত’ প্রতিক্রিয়া। তিনি বলেন, উপনিবেশবাদের সময় দেশ দখলের মাধ্যমে বাজার কুক্ষিগত করা হতো। কিন্তু এশিয়ার উত্থান ঘটেছে মূলত ‘বাজারের নিয়মেই’। এর প্রতিক্রিয়ায়, প্রতিযোগিতার বদলে বাজারেই হস্তক্ষেপ করছে পুরোনো শক্তিগুলো।

১৮৯০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাকিনলি বাজার সুরক্ষার মাধ্যমে মার্কিন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। সেই উদাহরণ টেনে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির জন্য এটি এখন অচল কৌশল।’

রেহমান সোবহান বলেন, তারপরও এশিয়া অর্থনৈতিক বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে চীন ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। এখন তারা প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেও যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। ইসরায়েলকে ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে এই যুদ্ধের জন্য তাদের দায়ী করেন তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের আমদানি পণ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে এলেও রপ্তানি গুটিকয়েক বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই তিনি এশিয়ার ‘ভ্যালু চেইনের’ সঙ্গে বাংলাদেশকে ওতপ্রতভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিশ্চিতভাবেই আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়াকে এসব দেশের ভ্যালু চেইনে যুক্ত করেছি। কিন্তু সেখানে আমাদের জন্য যেসব সুযোগ তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে আমরা বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনাকে মেলাতে পারিনি।’

রেহমান সোবহান বলেন, ‘ভবিষ্যতের কৌশলগত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমরা তেমন দক্ষ নই। আর এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি অকার্যকর।’

তার মতে, বাংলাদেশের প্রকৃত কৌশলগত গুরুত্ব বঙ্গোপসাগরে নয়, বরং দেশের মধ্যেই নিহিত। পদ্মা ও যমুনা সেতু ব্যবহার করে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

এর আগে আজ সকালে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এই ফোরামের পঞ্চম আসরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক ফোরামে ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ২০০ জন বক্তা, ৩০০ জন প্রতিনিধি এবং ১ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছেন।

বাহ্যিক সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান সংলাপে অংশ নিয়ে বলেন, বঙ্গোপসাগরকে যে কোনো বাহ্যিক সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে রাখতে চায় বাংলাদেশ।

চীন ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে এবং ভারসাম্য বজায় রাখতে বাংলাদেশ কী ভূমিকা রাখতে পারে প্রশ্ন রাখা হয় মুনীরুজ্জামানের কাছে। জবাবে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়া এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। ভারত ও চীন উভয়কে বাংলাদেশের কাছে অনেক কিছু দেওয়ার আছে।

সামুদ্রিক স্থিতিশীলতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। বঙ্গোপসাগর কেবল এই অঞ্চলের জন্যই নয়, বরং ভারত মহাসাগরের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত মহাসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত পরিকল্পনায় এই বিশাল উপসাগরটির ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখানে সামুদ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে, যা ভারত ও চীন উভয়ের জন্যই অপরিহার্য। আমরা বঙ্গোপসাগরকে যে কোনো বাহ্যিক সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে রাখতে চাই।’

আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু উদাহরণ দিয়ে মুনীরুজ্জামান বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী সেতু হিসেবে কাজ করে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ভূ-কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশ যদি চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত একটি স্থলপথ বা করিডোর তৈরি করে, তবে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সংযোগের মাধ্যমে ভারত ও চীন উভয় ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।

বাংলাদেশ স্থিতিশীলতা চায়: তথ্যমন্ত্রী

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ সংলাপে অংশ নিয়ে বলেন, বাংলাদেশ কোনো যুদ্ধ, নিরাপত্তা ইস্যু, ভূখণ্ড দখল বা শোষণের বিষয়ে আগ্রহী নয়। দেশের উন্নয়ন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশই বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়ের একটি অংশ এবং আমরা স্থিতিশীলতা চাই, কারণ আমরা উন্নতি করতে চাই।’

আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, ‘আমি অবাক হয়েছিলাম যে আপনারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নিয়ে কথা বলছেন না। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক সংকট শুধু চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আমরা সবাই এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তার ভুক্তভোগী।’

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সমস্যাটি সহজে শেষ হওয়ার নয়। এর মূল বিষয় হলো একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা এবং আমি চাই না তুমি ধনী হও-এমন একটি মানসিকতা।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৮০ বা ১৯৯০-এর দশকে ভারত ও চীন প্রায় একই অবস্থানে ছিল। কিন্তু চীন কৃষি খাত থেকে উৎপাদনমুখী শিল্পে মনোযোগ দেয়, আর ভারত কৃষি থেকে সেবা খাতে চলে যায়। এর ফলে চীন অনেক বেশি এগিয়ে যায় এবং ভারত প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়ে পড়ে।’

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়ের একটি অংশ এবং আমরা স্থিতিশীলতা চাই, কারণ আমরা উন্নতি করতে চাই। আমেরিকা ও চীনের মতো দেশগুলো হয়তো ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সামলাতে পারবে, কারণ তারা উৎপাদনের দিক থেকে অনেক এগিয়ে। কিন্তু আমরা ভোক্তা পর্যায়ে আছি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিনের চিন্তা হলো খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা। যুদ্ধ বা অস্থিতিশীলতায় জড়ানোর মতো সময় আমাদের নেই। দিন শেষে আমরাই এসবের ভুক্তভোগী।’

বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি সংকটের কথাও তুলে ধরেন তথ্যমন্ত্রী। তার ভাষ্য, যে যুদ্ধের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সম্পর্ক নেই, সেই যুদ্ধের প্রভাবেও দেশকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।

আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, ‘আমরা কোনো যুদ্ধে জড়াতে চাই না। আমরা চাই চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তিগুলো আমাদের উন্নতি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা করুক।’


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত