একজনের বয়স ১৭। আরেকজনের ১৩। একজন গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে দুর্ঘটনায় একজন শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় এখন শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে। অন্যজন মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়ে আর ঘরে ফেরেনি। পরে উদ্ধার হয়েছে তার মরদেহ।
আলাদা দুটি ঘটনা। প্রেক্ষাপটও আলাদা। কিন্তু দুটিই আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়—শিশুদের হাতে আমরা কতটা ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছি, আর সেই সঙ্গে কতটা দায়িত্ব, সীমারেখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি?
বারিধারার ঘটনায় ১৭ বছরের কিশোরটির বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় ঘটনার পূর্ণ সত্য বেরিয়ে আসবে। একইভাবে অপ্রতিমের মৃত্যুর কারণ, কীভাবে তার মৃত্যু হলো এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত— সেটিও তদন্তেই নিশ্চিত হবে। তাই কোনো ঘটনার পুরো সত্য জানার আগে কাউকে দায়ী করে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এই ঘটনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে। বরং প্রশ্ন তোলাই জরুরি।
গাড়ি, দামি ফোন— কিন্তু দায়িত্ববোধ?
একটি গাড়ি শুধু একটি যানবাহন নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে চালকের দক্ষতা, বয়স, আইন মানার সক্ষমতা এবং অন্য মানুষের জীবনের প্রতি দায়িত্ববোধ। একইভাবে একটি স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়। এটি শিশুর সামনে খুলে দেয় বিশাল এক ভার্চুয়াল জগৎ— বন্ধুত্ব, বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগ, অজানা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, নানা ধরনের কনটেন্ট এবং কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কের দরজাও।
সন্তানের হাতে গাড়ি বা আইফোন দেওয়া যাবে কি না— প্রশ্নটা শুধু এতটুকু নয়। প্রশ্ন উঠেছে- সন্তানের বয়স, মানসিক পরিপক্বতা, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে অভিভাবকরা কীভাবে এসব সুবিধা দিচ্ছেন? সবচেয়ে কঠিন জায়গা এখানেই। সন্তানকে ভালোবাসা মানে তার প্রতিটি চাওয়া পূরণ করা নয়। কখনো ভালোবাসার অর্থ ‘হ্যাঁ’, আবার কখনো ভালোবাসার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শব্দটি ‘না’।
অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের কী শেখায়?
১৩ বছরের অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়েছিল। এরপর সে আর বাড়ি ফেরেনি। প্রায় ২০ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যুর পেছনে কী ঘটেছিল, কারা জড়িত ছিল— এসব তদন্তের বিষয়। কিন্তু একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের উৎকণ্ঠা এবং তাকে খুঁজে বের করার প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের ভাবায়।
একটি শিশু যখন বাড়ি থেকে বের হয়, তার সঙ্গে কে আছে— আমরা কি জানি? সে কোথায় যাচ্ছে— আমরা কি সেটা জানি? তার বন্ধুরা কারা— সে খোঁজ কি নিয়েছি? এছাড়া সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে— সেসব বিষয়ে কোনো নজরদারি আমরা কি করছি? সে নিয়মিত কোথায় আড্ডা দেয়, কোন জায়গাগুলোতে যায়, তার চেয়ে বয়সে অনেক বড় কারও সঙ্গে মেলামেশা করছে কি না— এসব বিষয়ে আমরা কখনো তার সঙ্গে কথা বলি? এসব প্রশ্নের অর্থ এই নয় যে সন্তানকে সারাক্ষণ সন্দেহ করতে হবে। বরং এর অর্থ হলো— সন্তানের জীবনে অভিভাবকের উপস্থিতি থাকতে হবে।
শুধু ‘পুলিশের দায়িত্ব’ বললেই কি শেষ?
পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই— গত ৭ মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ জন শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। কিন্তু ২ হাজার ৩৮ জন শিশুর এখনো সন্ধান মেলেনি।
এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার আছে। একজন মা আছেন, যিনি সন্তানের অপেক্ষায় দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন। একজন বাবা আছেন, যিনি হয়তো প্রতিদিন থানায় যোগাযোগ করছেন। ভাই-বোন আছে, যারা অপেক্ষা করছে— একদিন হয়তো দরজা খুলে তাদের আপনজন ফিরে আসবে।
নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছবি, সর্বশেষ অবস্থান, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য— যত দ্রুত এসব তথ্য কাজে লাগানো যায়, শিশুকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তত বাড়তে পারে। এ কারণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে দ্রুত, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক অনুসন্ধান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে পরিবারকেও জানতে হবে, নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত কী পদক্ষেপ নিতে হবে।
অভিভাবকের দায়িত্ব কোথায়?
সন্তানকে ‘চোখে চোখে রাখা’ মানে তাকে বন্দি করে রাখা নয়। তার ব্যক্তিগত পরিসর ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান রেখেই নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়। প্রথম কাজ সন্তানের বন্ধুদের চিনুন।
সে কার সঙ্গে সময় কাটায়, তাদের বয়স কত, কোথায় যায় সেসব জানুন। সন্তানের বন্ধুদের সম্পর্কে জানতে চাওয়া মানেই তাদের ওপর অবিশ্বাস করা নয়। বরং সন্তানের নিরাপত্তার জন্য এটি স্বাভাবিক দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে জানুন। সন্তান কোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে, কী ধরনের ভিডিও দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে— এসব নিয়ে বন্ধুর মতো কথা বলতে হবে। শুধু ফোন কেড়ে নেওয়া বা বকাঝকা করলে অনেক সময় শিশু আরও গোপনীয় হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ম পরিবারেই স্পষ্ট হওয়া দরকার।
তৃতীয় কাজ হলো তার বয়স অনুযায়ী সীমারেখা তৈরি করুন। যে বয়সে গাড়ি চালানোর অনুমতি নেই, সে বয়সে গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া শুধু স্বাধীনতা নয়, অন্য মানুষের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। একইভাবে দামি ফোন দেওয়ার আগে ভাবতে হবে, শিশুটি সেটি ব্যবহারের দায়িত্ব ও ঝুঁকি বোঝে কি না।
চতুর্থত তাকে সময় দিন। দামি স্কুল, পোশাক, ফোন, খেলনা কিংবা গাড়ি সন্তানের প্রয়োজনের একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তার কথা শোনা এবং তার পরিবর্তনগুলো বোঝার বিকল্প কোনো বস্তুগত সুবিধা হতে পারে না। প্রতিদিন কিছু সময় শুধু সন্তানের জন্য রাখা যেতে পারে। সেই সময়ে জিজ্ঞাসাবাদ নয়, কথা হোক। সে কী ভাবছে, কী নিয়ে আনন্দিত, কী নিয়ে ভয় পাচ্ছে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে— এসব জানার চেষ্টা করা জরুরি।
শুধু পরিবার নয়, সমাজেরও দায় আছে
একটি শিশুর নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু মা-বাবার নয়। স্কুল, শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী— সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।
শিশুর আচরণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন, অস্বাভাবিক বন্ধুত্ব, বাড়ির বাইরে দীর্ঘ সময় কাটানো, ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় যাতায়াত বা অনলাইনে অস্বাভাবিক যোগাযোগ— এসবকে শুধু ‘বয়সের দোষ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। আবার কোনো শিশুকে বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা দেখলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও ঠিক নয়। শিশুর ক্ষেত্রে প্রয়োজন নজরদারির পাশাপাশি সহমর্মিতা, কাউন্সেলিং, শিক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশ।
অপ্রতিমরা ফিরবে না, কিন্তু প্রশ্ন থাকবে
অপ্রতিম আর ফিরবে না। তার পরিবারের শোক কোনো ভাষায় পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা হয়ে থাকতে পারে— যদি আমরা শিক্ষা নিতে চাই।
একইভাবে বারিধারার ঘটনায় ১৭ বছরের এক কিশোরের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং কীভাবে এলো, সেটিও তদন্তের পাশাপাশি অভিভাবক, সমাজ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শিশুর হাতে গাড়ি তুলে দেওয়ার আগে আমরা কি তার দায়িত্ববোধ যাচাই করেছি? তার হাতে দামি স্মার্টফোন দেওয়ার আগে আমরা কি তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিখিয়েছি? সন্তান বাইরে গেলে সে কার সঙ্গে আছে, কোথায় আছে- সেসব বিষয়ে খোজ কী রাখছি? আর সবচেয়ে বড় কথা, সন্তানকে বাবা-মায়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কথা বলার মতো নিরাপদ পরিবেশ কি আমরা তৈরি করেছি?
সন্তানকে ভালোবাসা মানে শুধু তার চাহিদা পূরণ করা নয়। ভালোবাসা মানে প্রয়োজনের সময় সীমা টেনে দেওয়া, ভুল থেকে ফিরিয়ে আনা, বিপদের আগে সতর্ক করা এবং এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যাতে বিপদে পড়লে সে সবার আগে মা-বাবার কাছেই ফিরে আসে।
একটি আইফোন সন্তানের হাতে দেওয়া যায়, কিন্তু তার সঙ্গে দায়িত্ববোধ না দিলে সেটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। গাড়ির চাবি দেওয়া যায়, কিন্তু আইন ও জীবনের মূল্য না শেখালে সেটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে আমরা তাদের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু সেই পৃথিবীতে কীভাবে নিরাপদে চলতে হয়— সেটিও শেখাতে হবে। কারণ সন্তানকে চোখে চোখে রাখা মানে তাকে বন্দি করা নয়; তাকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব নেওয়া।
অপ্রতিমের পরিবারের কান্না যেন শুধু একটি পরিবারের কান্না হয়ে না থাকে। বারিধারার ঘটনাও যেন কেবল একটি মামলার নথিতে আটকে না যায়। এই ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের প্রত্যেক মা-বাবার অন্তত একবার ভাবা উচিত— সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কী দেখে, কী করে? এছাড়া কোন কারণে বিপদে পড়লে, সে কি আমাকে সবকিছু সাহস করে বলতে পারবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে সচেতনভাবে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প অভিভাবকদের নেই।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬
একজনের বয়স ১৭। আরেকজনের ১৩। একজন গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে দুর্ঘটনায় একজন শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় এখন শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে। অন্যজন মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়ে আর ঘরে ফেরেনি। পরে উদ্ধার হয়েছে তার মরদেহ।
আলাদা দুটি ঘটনা। প্রেক্ষাপটও আলাদা। কিন্তু দুটিই আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়—শিশুদের হাতে আমরা কতটা ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছি, আর সেই সঙ্গে কতটা দায়িত্ব, সীমারেখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি?
বারিধারার ঘটনায় ১৭ বছরের কিশোরটির বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় ঘটনার পূর্ণ সত্য বেরিয়ে আসবে। একইভাবে অপ্রতিমের মৃত্যুর কারণ, কীভাবে তার মৃত্যু হলো এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত— সেটিও তদন্তেই নিশ্চিত হবে। তাই কোনো ঘটনার পুরো সত্য জানার আগে কাউকে দায়ী করে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এই ঘটনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে। বরং প্রশ্ন তোলাই জরুরি।
গাড়ি, দামি ফোন— কিন্তু দায়িত্ববোধ?
একটি গাড়ি শুধু একটি যানবাহন নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে চালকের দক্ষতা, বয়স, আইন মানার সক্ষমতা এবং অন্য মানুষের জীবনের প্রতি দায়িত্ববোধ। একইভাবে একটি স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়। এটি শিশুর সামনে খুলে দেয় বিশাল এক ভার্চুয়াল জগৎ— বন্ধুত্ব, বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগ, অজানা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, নানা ধরনের কনটেন্ট এবং কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কের দরজাও।
সন্তানের হাতে গাড়ি বা আইফোন দেওয়া যাবে কি না— প্রশ্নটা শুধু এতটুকু নয়। প্রশ্ন উঠেছে- সন্তানের বয়স, মানসিক পরিপক্বতা, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে অভিভাবকরা কীভাবে এসব সুবিধা দিচ্ছেন? সবচেয়ে কঠিন জায়গা এখানেই। সন্তানকে ভালোবাসা মানে তার প্রতিটি চাওয়া পূরণ করা নয়। কখনো ভালোবাসার অর্থ ‘হ্যাঁ’, আবার কখনো ভালোবাসার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শব্দটি ‘না’।
অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের কী শেখায়?
১৩ বছরের অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়েছিল। এরপর সে আর বাড়ি ফেরেনি। প্রায় ২০ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যুর পেছনে কী ঘটেছিল, কারা জড়িত ছিল— এসব তদন্তের বিষয়। কিন্তু একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের উৎকণ্ঠা এবং তাকে খুঁজে বের করার প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের ভাবায়।
একটি শিশু যখন বাড়ি থেকে বের হয়, তার সঙ্গে কে আছে— আমরা কি জানি? সে কোথায় যাচ্ছে— আমরা কি সেটা জানি? তার বন্ধুরা কারা— সে খোঁজ কি নিয়েছি? এছাড়া সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে— সেসব বিষয়ে কোনো নজরদারি আমরা কি করছি? সে নিয়মিত কোথায় আড্ডা দেয়, কোন জায়গাগুলোতে যায়, তার চেয়ে বয়সে অনেক বড় কারও সঙ্গে মেলামেশা করছে কি না— এসব বিষয়ে আমরা কখনো তার সঙ্গে কথা বলি? এসব প্রশ্নের অর্থ এই নয় যে সন্তানকে সারাক্ষণ সন্দেহ করতে হবে। বরং এর অর্থ হলো— সন্তানের জীবনে অভিভাবকের উপস্থিতি থাকতে হবে।
শুধু ‘পুলিশের দায়িত্ব’ বললেই কি শেষ?
পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই— গত ৭ মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ জন শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। কিন্তু ২ হাজার ৩৮ জন শিশুর এখনো সন্ধান মেলেনি।
এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার আছে। একজন মা আছেন, যিনি সন্তানের অপেক্ষায় দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন। একজন বাবা আছেন, যিনি হয়তো প্রতিদিন থানায় যোগাযোগ করছেন। ভাই-বোন আছে, যারা অপেক্ষা করছে— একদিন হয়তো দরজা খুলে তাদের আপনজন ফিরে আসবে।
নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছবি, সর্বশেষ অবস্থান, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য— যত দ্রুত এসব তথ্য কাজে লাগানো যায়, শিশুকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তত বাড়তে পারে। এ কারণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে দ্রুত, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক অনুসন্ধান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে পরিবারকেও জানতে হবে, নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত কী পদক্ষেপ নিতে হবে।
অভিভাবকের দায়িত্ব কোথায়?
সন্তানকে ‘চোখে চোখে রাখা’ মানে তাকে বন্দি করে রাখা নয়। তার ব্যক্তিগত পরিসর ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান রেখেই নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়। প্রথম কাজ সন্তানের বন্ধুদের চিনুন।
সে কার সঙ্গে সময় কাটায়, তাদের বয়স কত, কোথায় যায় সেসব জানুন। সন্তানের বন্ধুদের সম্পর্কে জানতে চাওয়া মানেই তাদের ওপর অবিশ্বাস করা নয়। বরং সন্তানের নিরাপত্তার জন্য এটি স্বাভাবিক দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে জানুন। সন্তান কোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে, কী ধরনের ভিডিও দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে— এসব নিয়ে বন্ধুর মতো কথা বলতে হবে। শুধু ফোন কেড়ে নেওয়া বা বকাঝকা করলে অনেক সময় শিশু আরও গোপনীয় হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ম পরিবারেই স্পষ্ট হওয়া দরকার।
তৃতীয় কাজ হলো তার বয়স অনুযায়ী সীমারেখা তৈরি করুন। যে বয়সে গাড়ি চালানোর অনুমতি নেই, সে বয়সে গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া শুধু স্বাধীনতা নয়, অন্য মানুষের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। একইভাবে দামি ফোন দেওয়ার আগে ভাবতে হবে, শিশুটি সেটি ব্যবহারের দায়িত্ব ও ঝুঁকি বোঝে কি না।
চতুর্থত তাকে সময় দিন। দামি স্কুল, পোশাক, ফোন, খেলনা কিংবা গাড়ি সন্তানের প্রয়োজনের একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তার কথা শোনা এবং তার পরিবর্তনগুলো বোঝার বিকল্প কোনো বস্তুগত সুবিধা হতে পারে না। প্রতিদিন কিছু সময় শুধু সন্তানের জন্য রাখা যেতে পারে। সেই সময়ে জিজ্ঞাসাবাদ নয়, কথা হোক। সে কী ভাবছে, কী নিয়ে আনন্দিত, কী নিয়ে ভয় পাচ্ছে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে— এসব জানার চেষ্টা করা জরুরি।
শুধু পরিবার নয়, সমাজেরও দায় আছে
একটি শিশুর নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু মা-বাবার নয়। স্কুল, শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী— সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।
শিশুর আচরণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন, অস্বাভাবিক বন্ধুত্ব, বাড়ির বাইরে দীর্ঘ সময় কাটানো, ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় যাতায়াত বা অনলাইনে অস্বাভাবিক যোগাযোগ— এসবকে শুধু ‘বয়সের দোষ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। আবার কোনো শিশুকে বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা দেখলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও ঠিক নয়। শিশুর ক্ষেত্রে প্রয়োজন নজরদারির পাশাপাশি সহমর্মিতা, কাউন্সেলিং, শিক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশ।
অপ্রতিমরা ফিরবে না, কিন্তু প্রশ্ন থাকবে
অপ্রতিম আর ফিরবে না। তার পরিবারের শোক কোনো ভাষায় পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা হয়ে থাকতে পারে— যদি আমরা শিক্ষা নিতে চাই।
একইভাবে বারিধারার ঘটনায় ১৭ বছরের এক কিশোরের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং কীভাবে এলো, সেটিও তদন্তের পাশাপাশি অভিভাবক, সমাজ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শিশুর হাতে গাড়ি তুলে দেওয়ার আগে আমরা কি তার দায়িত্ববোধ যাচাই করেছি? তার হাতে দামি স্মার্টফোন দেওয়ার আগে আমরা কি তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিখিয়েছি? সন্তান বাইরে গেলে সে কার সঙ্গে আছে, কোথায় আছে- সেসব বিষয়ে খোজ কী রাখছি? আর সবচেয়ে বড় কথা, সন্তানকে বাবা-মায়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কথা বলার মতো নিরাপদ পরিবেশ কি আমরা তৈরি করেছি?
সন্তানকে ভালোবাসা মানে শুধু তার চাহিদা পূরণ করা নয়। ভালোবাসা মানে প্রয়োজনের সময় সীমা টেনে দেওয়া, ভুল থেকে ফিরিয়ে আনা, বিপদের আগে সতর্ক করা এবং এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যাতে বিপদে পড়লে সে সবার আগে মা-বাবার কাছেই ফিরে আসে।
একটি আইফোন সন্তানের হাতে দেওয়া যায়, কিন্তু তার সঙ্গে দায়িত্ববোধ না দিলে সেটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। গাড়ির চাবি দেওয়া যায়, কিন্তু আইন ও জীবনের মূল্য না শেখালে সেটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে আমরা তাদের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু সেই পৃথিবীতে কীভাবে নিরাপদে চলতে হয়— সেটিও শেখাতে হবে। কারণ সন্তানকে চোখে চোখে রাখা মানে তাকে বন্দি করা নয়; তাকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব নেওয়া।
অপ্রতিমের পরিবারের কান্না যেন শুধু একটি পরিবারের কান্না হয়ে না থাকে। বারিধারার ঘটনাও যেন কেবল একটি মামলার নথিতে আটকে না যায়। এই ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের প্রত্যেক মা-বাবার অন্তত একবার ভাবা উচিত— সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কী দেখে, কী করে? এছাড়া কোন কারণে বিপদে পড়লে, সে কি আমাকে সবকিছু সাহস করে বলতে পারবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে সচেতনভাবে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প অভিভাবকদের নেই।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

আপনার মতামত লিখুন