সংবাদ

নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে!


আনোয়ারুল হক
আনোয়ারুল হক
প্রকাশ: ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৪ এএম

নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে!
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র আর মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই ‘দুই জন নয়ন’ বাংলাবাজারের ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে এসে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি বিক্রি করা নিয়ে আপত্তি তুলে বলেন, বইটি নিষিদ্ধ

আমরা আমাদের দু’চোখ দিয়ে গাছপালা, আকাশ, নদী, পাহাড়, পর্বত, মানুষজন—সবকিছুই দেখি। কিন্তু যে শক্তির কারণে আমরা দেখতে পাই, সেই পরম শক্তিকে আমরা দেখি না। কারণ সেই পরম শক্তি তো বাইরে নয়, রয়েছে আমাদের চোখের ভেতর—দৃষ্টি বা আলো হয়ে। রবীন্দ্রনাথ এ কথাই লিখেছিলেন কবিতার ভাষায়, আর গানের সুরে সুরে—‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।’ কিন্তু না, এবার আমরা ঠিকই দেখে ফেলেছি। চোখের সেই বিচ্ছুরিত আলোয় গোটা দেশবাসী এবার দেখতে পেল এক নয়নকে এবং তার পরম শক্তিমত্তাকে। হ্যাঁ, রবিউল ইসলাম নয়নকে আমরা নয়ন ভরে দেখতে পেয়েছি। দেখেছি, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ জাসদ কার্যালয় জয় করে বীরের বেশে কার্যালয়ের তিনতলার বারান্দা থেকে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় স্লোগান উচ্চারণ করছেন, আর নিচে দাঁড়ানো ভক্তকুল তার প্রতিধ্বনি করছেন।

মাগুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্যসচিব নয়ন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাত্র কয়েক দিনে তার ভাগ্য বদলে ফেলেন। সরকার বদলের পরপরই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। তার বিরুদ্ধে দখল ও চাঁদাবাজির নানা অভিযোগ পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে। তার দৃশ্যমান কোনো আয় নেই। তার ভাষায়, ‘এক মামা তার বাসা ভাড়ার টাকা দেন। আরেক ভাই তার যাতায়াতের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এবং বাকি খরচ তিনি শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় থেকে নির্বাহ করেন।’ তবে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তিনি ৫ আগস্ট-পরবর্তী মাত্র কয়েক দিনে দখল আর চাঁদাবাজির রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এ সময় তার নামে ইসলামী ব্যাংকে হামলা, একটি টেলিভিশন চ্যানেল দখলের প্রচেষ্টা ইত্যাদি অভিযোগ ওঠায় দলের মধ্যেও নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অবশ্য দলের চেয়ারপারসনের গাড়ির সামনে দৌড়ে দৌড়ে তিনি কিছুটা ড্যামেজ কন্ট্রোল করেন এবং কেন্দ্রীয় যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক পদেও অধিষ্ঠিত হন।

হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সাংগঠনিক কর্মসূচি হিসেবে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গত ২৬ সেপ্টেম্বর একটি প্রতিনিধি সভা আহ্বান করে। ঘরোয়া হলেও সভাটি যেহেতু বড় আকারের ছিল, তাই তারা পুলিশকেও অবহিত করে সভাটির আয়োজন করে। জাসদ কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকায় নিশ্চয়ই পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা তৎপরতা আছে। তাই উক্ত সভাকে কেন্দ্র করে কোনো ষড়যন্ত্র বা নাশকতামূলক তৎপরতা সন্দেহ করলে পুলিশ নিশ্চয়ই সভা শুরুর আগেই তা বন্ধ করে দিত। কিন্তু সরকারের গোয়েন্দা তৎপরতা ব্যর্থ হতে পারে, নয়নের নয়ন তো ব্যর্থ হতে পারে না!

নয়ন বলেছেন, তার নেটওয়ার্কে নাকি ধরা পড়েছে—জাসদের আড়ালে সেখানে আওয়ামী লীগের ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ জমায়েত হচ্ছিল। তিনি তার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ‘ষড়যন্ত্র’ রুখে দেওয়ার জন্য ঢাকা দক্ষিণের আওতাধীন এলাকা থেকে তার ভক্তকুলকে জাসদ অফিসের সামনে সমবেত করে প্রথমে এক দফা প্রতিনিধিদের ওপর হামলা ও হেনস্তার ব্যবস্থা করলেন। তারপর পুলিশ ডাকলেন। পুলিশ বাহিনীর কমান্ড নিজেই নিয়ে নিলেন। অতঃপর ২৮৯ জন প্রতিনিধিকে আটক করা হলো। আটক প্রতিনিধিরা পুলিশের গাড়িতে ওঠার সময় আরেক দফা তাদের হেনস্তার ব্যবস্থা করে তিনি উঠে গেলেন জাসদ কার্যালয়ের বারান্দায় এবং সেখান থেকে বিজয়ের স্লোগান দিয়ে ক্ষান্ত হলেন।

জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার উচ্ছেদ করার পর এই হলো একেবারে ‘নির্ভেজাল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা’। সেই ‘গণতন্ত্রকে’ সমুন্নত রাখতে আবার রাতের মধ্যেই ২৭ জন বাদে অন্য সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ২৭ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, “জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে তারা জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন।”

কিন্তু প্রশ্ন হলো, জাসদ অফিসের ভেতরে তারা যে ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিলেন’, এমন অভিযোগ কি জাসদ দিয়েছে? তাহলে কিসের ভিত্তিতে এ অভিযোগ? পুলিশ বা সরকার বলতে চায়, জয় বাংলা স্লোগান দেওয়াটাই বিশৃঙ্খলা বা গোলমাল সৃষ্টি। সরকারের বয়স তো সবে সাত মাস। জয় বাংলা স্লোগানকে তারা এত ভয় পেলে বাকি সময় দেশ চালাবেন কীভাবে?

জয় বাংলা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ছিল। আমার মনে পড়ে, মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং সেন্টারে আমরা একটু নিজেদের স্বাতন্ত্র‍্য প্রকাশের জন্য স্লোগান দিতাম—‘জয় স্বাধীন বাংলা’। মর্মবস্তু তো একই। জয় বাংলা স্লোগানটা দলীয়করণ হয়ে যাওয়ায়, আবার যাতে করে স্বাধীন দেশে উগ্র জাত্যাভিমান সৃষ্টি না হয় এবং এর আড়ালে মানুষের রুটি-রুজির স্লোগান চাপা না পড়ে, সেজন্য হয়তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দল এ স্লোগানকে আওয়ামী লীগের মতো দিবানিশি উচ্চারণ করে না। কিন্তু তারা কেউই জয় বাংলার বিরোধী নয়। তবে ন্যায়-অন্যায় সব ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মাহাত্ম্যকে মলিন করেছে। এখন সরকার, বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত কি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে, যাতে মুক্তিযুদ্ধের এই রণধ্বনি আবার নতুন করে উচ্চারণ করতে সবাই বাধ্য হয়?

শুধু একজন রবিউল ইসলাম নয়ন নন, শাসকদলের এলাকাভিত্তিক নেতাকর্মীদের একাংশ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন, যা কিন্তু প্রকৃতই দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। অতি সম্প্রতি মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। শত শত লোক এক্সকাভেটর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে এসব ভাঙচুরে অংশ নিলেন এবং এই দীর্ঘ সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখা মিলল না। সরকারি দল বিএনপির লোকজনের সম্পৃক্ততা থাকার কারণেই কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে তো বিএনপিরই একজন সংসদ সদস্য জড়িত থাকারও অভিযোগ উঠেছে। এটা প্রশংসনীয় যে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিএনপি হাইকমান্ড ওই সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি ইতোমধ্যে পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমাও দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম কোনো সংসদ সদস্যকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পদত্যাগ করতে হলো।

তবে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র আর মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই ‘দুই জন নয়ন’ বাংলাবাজারের ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে এসে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি বিক্রি করা নিয়ে আপত্তি তুলে বলেন, বইটি নিষিদ্ধ। একপর্যায়ে তারা আরও লোকজন জড়ো করে মব সৃষ্টি করলে পুলিশ এসে বিক্রয়কেন্দ্রের দুই কর্মীকে আটক করে। পরবর্তীতে এই বই আর বিক্রি করবে না—এই শর্তে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কেমন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি! বইটি নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু বিক্রি করা যাবে না। অনেকটা আওয়ামী লীগের মতো অবস্থা—অর্থাৎ ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ বই’!

এনসিপি-জামায়াতের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে তো আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিল না। ছিল মবের রাজত্ব। মাঝখানে সামান্য উন্নতির আভাস দেখা গেলেও আবার পূর্বাবস্থায় চলে গেছে। ইউনূস আমলে মবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। ইউনূসের মুখপাত্র শফিকুল আলম বলেছিলেন, মব নয়, এদেরকে প্রেসার গ্রুপ বলা যেতে পারে। যেমনটা জাসদ অফিসে হামলাকে নয়ন এখন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন—‘তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন মানবিক সরকারের আমলে জাসদ অফিস থেকে আটক প্রতিনিধিদের ওপর বিক্ষুব্ধ জনগণ যাতে হামলা করতে না পারে, সেজন্য ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনি তার সমর্থকদের ডেকে এনেছেন এ পবিত্র দায়িত্ব পালনে।’

জাসদ প্রতিনিধিদের জন্য তার এই দরদ দেখে জাসদ নেতৃবৃন্দও এখন ঠাওর করতে পারছেন না—তার ‘নয়ন ভরা জল আর দুহাত ভরা ফুল’ থেকে এখন ফুল নেবেন, না অশ্রু নেবেন! নয়নবাহিনী যে ব্যাখ্যাই দিক না কেন, দেশজুড়ে একটার পর একটা এ ধরনের ঘটনায় নাগরিক সমাজ, সাধারণ মানুষ—সবাই উদ্বিগ্ন। তাদের ‘দু নয়নে ভয় আছে, মনে সংশয় আছে’—এর শেষ কোথায়!

(লেখকের নিজস্ব মত)

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে!

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

আমরা আমাদের দু’চোখ দিয়ে গাছপালা, আকাশ, নদী, পাহাড়, পর্বত, মানুষজন—সবকিছুই দেখি। কিন্তু যে শক্তির কারণে আমরা দেখতে পাই, সেই পরম শক্তিকে আমরা দেখি না। কারণ সেই পরম শক্তি তো বাইরে নয়, রয়েছে আমাদের চোখের ভেতর—দৃষ্টি বা আলো হয়ে। রবীন্দ্রনাথ এ কথাই লিখেছিলেন কবিতার ভাষায়, আর গানের সুরে সুরে—‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।’ কিন্তু না, এবার আমরা ঠিকই দেখে ফেলেছি। চোখের সেই বিচ্ছুরিত আলোয় গোটা দেশবাসী এবার দেখতে পেল এক নয়নকে এবং তার পরম শক্তিমত্তাকে। হ্যাঁ, রবিউল ইসলাম নয়নকে আমরা নয়ন ভরে দেখতে পেয়েছি। দেখেছি, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ জাসদ কার্যালয় জয় করে বীরের বেশে কার্যালয়ের তিনতলার বারান্দা থেকে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় স্লোগান উচ্চারণ করছেন, আর নিচে দাঁড়ানো ভক্তকুল তার প্রতিধ্বনি করছেন।

মাগুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্যসচিব নয়ন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাত্র কয়েক দিনে তার ভাগ্য বদলে ফেলেন। সরকার বদলের পরপরই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। তার বিরুদ্ধে দখল ও চাঁদাবাজির নানা অভিযোগ পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে। তার দৃশ্যমান কোনো আয় নেই। তার ভাষায়, ‘এক মামা তার বাসা ভাড়ার টাকা দেন। আরেক ভাই তার যাতায়াতের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এবং বাকি খরচ তিনি শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় থেকে নির্বাহ করেন।’ তবে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তিনি ৫ আগস্ট-পরবর্তী মাত্র কয়েক দিনে দখল আর চাঁদাবাজির রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এ সময় তার নামে ইসলামী ব্যাংকে হামলা, একটি টেলিভিশন চ্যানেল দখলের প্রচেষ্টা ইত্যাদি অভিযোগ ওঠায় দলের মধ্যেও নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অবশ্য দলের চেয়ারপারসনের গাড়ির সামনে দৌড়ে দৌড়ে তিনি কিছুটা ড্যামেজ কন্ট্রোল করেন এবং কেন্দ্রীয় যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক পদেও অধিষ্ঠিত হন।

হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সাংগঠনিক কর্মসূচি হিসেবে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গত ২৬ সেপ্টেম্বর একটি প্রতিনিধি সভা আহ্বান করে। ঘরোয়া হলেও সভাটি যেহেতু বড় আকারের ছিল, তাই তারা পুলিশকেও অবহিত করে সভাটির আয়োজন করে। জাসদ কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকায় নিশ্চয়ই পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা তৎপরতা আছে। তাই উক্ত সভাকে কেন্দ্র করে কোনো ষড়যন্ত্র বা নাশকতামূলক তৎপরতা সন্দেহ করলে পুলিশ নিশ্চয়ই সভা শুরুর আগেই তা বন্ধ করে দিত। কিন্তু সরকারের গোয়েন্দা তৎপরতা ব্যর্থ হতে পারে, নয়নের নয়ন তো ব্যর্থ হতে পারে না!

নয়ন বলেছেন, তার নেটওয়ার্কে নাকি ধরা পড়েছে—জাসদের আড়ালে সেখানে আওয়ামী লীগের ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ জমায়েত হচ্ছিল। তিনি তার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ‘ষড়যন্ত্র’ রুখে দেওয়ার জন্য ঢাকা দক্ষিণের আওতাধীন এলাকা থেকে তার ভক্তকুলকে জাসদ অফিসের সামনে সমবেত করে প্রথমে এক দফা প্রতিনিধিদের ওপর হামলা ও হেনস্তার ব্যবস্থা করলেন। তারপর পুলিশ ডাকলেন। পুলিশ বাহিনীর কমান্ড নিজেই নিয়ে নিলেন। অতঃপর ২৮৯ জন প্রতিনিধিকে আটক করা হলো। আটক প্রতিনিধিরা পুলিশের গাড়িতে ওঠার সময় আরেক দফা তাদের হেনস্তার ব্যবস্থা করে তিনি উঠে গেলেন জাসদ কার্যালয়ের বারান্দায় এবং সেখান থেকে বিজয়ের স্লোগান দিয়ে ক্ষান্ত হলেন।

জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার উচ্ছেদ করার পর এই হলো একেবারে ‘নির্ভেজাল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা’। সেই ‘গণতন্ত্রকে’ সমুন্নত রাখতে আবার রাতের মধ্যেই ২৭ জন বাদে অন্য সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ২৭ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, “জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে তারা জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন।”

কিন্তু প্রশ্ন হলো, জাসদ অফিসের ভেতরে তারা যে ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিলেন’, এমন অভিযোগ কি জাসদ দিয়েছে? তাহলে কিসের ভিত্তিতে এ অভিযোগ? পুলিশ বা সরকার বলতে চায়, জয় বাংলা স্লোগান দেওয়াটাই বিশৃঙ্খলা বা গোলমাল সৃষ্টি। সরকারের বয়স তো সবে সাত মাস। জয় বাংলা স্লোগানকে তারা এত ভয় পেলে বাকি সময় দেশ চালাবেন কীভাবে?

জয় বাংলা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ছিল। আমার মনে পড়ে, মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং সেন্টারে আমরা একটু নিজেদের স্বাতন্ত্র‍্য প্রকাশের জন্য স্লোগান দিতাম—‘জয় স্বাধীন বাংলা’। মর্মবস্তু তো একই। জয় বাংলা স্লোগানটা দলীয়করণ হয়ে যাওয়ায়, আবার যাতে করে স্বাধীন দেশে উগ্র জাত্যাভিমান সৃষ্টি না হয় এবং এর আড়ালে মানুষের রুটি-রুজির স্লোগান চাপা না পড়ে, সেজন্য হয়তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দল এ স্লোগানকে আওয়ামী লীগের মতো দিবানিশি উচ্চারণ করে না। কিন্তু তারা কেউই জয় বাংলার বিরোধী নয়। তবে ন্যায়-অন্যায় সব ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মাহাত্ম্যকে মলিন করেছে। এখন সরকার, বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত কি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে, যাতে মুক্তিযুদ্ধের এই রণধ্বনি আবার নতুন করে উচ্চারণ করতে সবাই বাধ্য হয়?

শুধু একজন রবিউল ইসলাম নয়ন নন, শাসকদলের এলাকাভিত্তিক নেতাকর্মীদের একাংশ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন, যা কিন্তু প্রকৃতই দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। অতি সম্প্রতি মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। শত শত লোক এক্সকাভেটর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে এসব ভাঙচুরে অংশ নিলেন এবং এই দীর্ঘ সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখা মিলল না। সরকারি দল বিএনপির লোকজনের সম্পৃক্ততা থাকার কারণেই কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে তো বিএনপিরই একজন সংসদ সদস্য জড়িত থাকারও অভিযোগ উঠেছে। এটা প্রশংসনীয় যে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিএনপি হাইকমান্ড ওই সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি ইতোমধ্যে পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমাও দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম কোনো সংসদ সদস্যকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পদত্যাগ করতে হলো।

তবে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র আর মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই ‘দুই জন নয়ন’ বাংলাবাজারের ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে এসে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি বিক্রি করা নিয়ে আপত্তি তুলে বলেন, বইটি নিষিদ্ধ। একপর্যায়ে তারা আরও লোকজন জড়ো করে মব সৃষ্টি করলে পুলিশ এসে বিক্রয়কেন্দ্রের দুই কর্মীকে আটক করে। পরবর্তীতে এই বই আর বিক্রি করবে না—এই শর্তে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কেমন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি! বইটি নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু বিক্রি করা যাবে না। অনেকটা আওয়ামী লীগের মতো অবস্থা—অর্থাৎ ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ বই’!

এনসিপি-জামায়াতের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে তো আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিল না। ছিল মবের রাজত্ব। মাঝখানে সামান্য উন্নতির আভাস দেখা গেলেও আবার পূর্বাবস্থায় চলে গেছে। ইউনূস আমলে মবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। ইউনূসের মুখপাত্র শফিকুল আলম বলেছিলেন, মব নয়, এদেরকে প্রেসার গ্রুপ বলা যেতে পারে। যেমনটা জাসদ অফিসে হামলাকে নয়ন এখন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন—‘তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন মানবিক সরকারের আমলে জাসদ অফিস থেকে আটক প্রতিনিধিদের ওপর বিক্ষুব্ধ জনগণ যাতে হামলা করতে না পারে, সেজন্য ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনি তার সমর্থকদের ডেকে এনেছেন এ পবিত্র দায়িত্ব পালনে।’

জাসদ প্রতিনিধিদের জন্য তার এই দরদ দেখে জাসদ নেতৃবৃন্দও এখন ঠাওর করতে পারছেন না—তার ‘নয়ন ভরা জল আর দুহাত ভরা ফুল’ থেকে এখন ফুল নেবেন, না অশ্রু নেবেন! নয়নবাহিনী যে ব্যাখ্যাই দিক না কেন, দেশজুড়ে একটার পর একটা এ ধরনের ঘটনায় নাগরিক সমাজ, সাধারণ মানুষ—সবাই উদ্বিগ্ন। তাদের ‘দু নয়নে ভয় আছে, মনে সংশয় আছে’—এর শেষ কোথায়!

(লেখকের নিজস্ব মত)

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত