সংবাদ

ধারাবাহিক উপন্যাস ১১

গোমতীকন্যা


মহিবুল আলম
মহিবুল আলম
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪১ এএম

গোমতীকন্যা
শিল্পী: সঞ্জয় দে রিপন


দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন

এক

(পূর্ব প্রকাশের পর)

সকাল-দুপুরের সন্ধিক্ষণ প্রায়। রোদটুকু এখন অনেকটাই খাঁড়া হয়ে পড়ছে। ছায়াটা ছোট হতে হতে পায়ের কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। পিছদোর ঘেঁষা উঠোনের দক্ষিণের অনেকটা অংশজুড়ে শ্যাওলার সবুজ আস্তর। এই শ্যাওলার আস্তর পড়েছে মূলত গরুর চোনা থেকে। সুদিনে গরু যেখানেসেখানে বাঁধা যায়, কিন্তু বর্ষার মওসুমে গোয়ালঘরটাই গরুর সম্বল।

এখন অবশ্য সুদিন। বর্ষার মওসুমে পড়া শ্যাওলা সুদিনে এসে শুকিয়ে কেমন চটা চটা হয়ে উঠছে। উত্তরের জোয়ারের জল বুইদ্দার বিল থেকে নেমে গেছে বেশ আগেই। সমস্ত বিলজুড়ে দিগন্ত বিস্তৃত সরিষা আর নানান জাতের সবজির ক্ষেত। শীতের সবজি। বেগুন, ক্ষীরা, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মটরশুঁটি। কোথাও কোথাও পুরো জমি জুড়ে মাচা দিয়ে শিমগাছ লাগানো হয়েছে। শিমের বেগুনি-শাদা ফুল উত্তরের বাতাসে কেমন তিরতির করে কাঁপে।

কেরামত আলীর গোয়ালঘরটা উঠোনের দক্ষিণে। গোয়ালঘরের পরই পিছদোরের শুরু। পিছদোরের দক্ষিণে পাকঘর। পাকঘরটা দু’চালা টিনের। অর্ধেকটায় পরপর দুটো মাটির চুলা। একটা দুইচোখা চুলা ও অপরটা একচোখা চুলা। সাধারণত ভাত-তরকারি একই সময় পাশাপাশি রান্না বসালে দুইচোখা চুলাটাতে আগুন জ্বালানো হয়। একচোখা চুলাটা আগুন জ্বালায় মূলত ডিম ভাজি বা মাছ ভাজি করার জন্য। কখনও দুধে বলক তোলার জন্যও একচোখা চুলা ব্যবহার করে।

পাকঘরের বাকি অর্ধেকটায় হাঁসমুরগির খোঁয়াড় ও ছাগল রাখার স্থান। এই হাঁসমুরগি ও ছাগল রাখার স্থানটায় একসময় ঢেঁকি ভানার স্থান ছিল। ঢেঁকিটা উধাও হয়ে গেছে সেই কবে, মমিনার জন্মের পরপর। গ্রামে এখন আর ঢেঁকি দিয়ে কেউ ধান ভানে না। মীরবহরি বাজারে ধান ভানার কল আছে দুটো। সারাক্ষণ খট খট, খট খট করে চলে। আঁধারিয়া গ্রামের ভুঁইয়া বাড়িতে একসময় একটি ধান ভানার কল ছিল। সেটি অবশ্য এখন আর নেই।

পাকঘর থেকে সামান্য দূরে চৌচালা বসতঘর। চৌচালা বসতঘরটা টিনের। বেড়াগুলো কাঠ ও টিন দিয়ে করা। টিনের উপর আকাশী রং করা। চৌকাঠে মাইট্টার তেল দেওয়া। ভিত পাকা নয়, লেপে নেওয়া কাঁচা। দরজার মুখে একটা সিমেন্টের পাটাতন। পাকঘরটা বসতঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে বলে ঘাধলার দিনে বৃষ্টির জল একঘরের চাল থেকে ঝনঝন শব্দে আরেক ঘরের চালে গিয়ে পড়ে। রোদ্রের দিনে স্থানটা প্রায় ছায়া করে থাকে। শুধুমাত্র দুপুরের দিকে হলুদ সাপের মতো সরু রেখা করে রোদ পড়ে।

মমিনা বসে আছে সেই ছায়াকরা স্থানটার মুখে, পুবদিকে দৃষ্টি ফেলে। সে দুই ঘরের মাঝখানের সেই সরু স্থানটার মুখে বসলেও তার পা দুটো উঠোনের রৌদ্র স্পর্শ করছে। তার দৃষ্টিটা গোয়ালঘরের দিকে। এখনও তার বিশ্বাস হচ্ছে না, তার স্বামী আলিমুজ্জামান তাদের গোয়ালঘর থেকে দুটো গরু চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে।

মমিনা বিশ্বাস না করলেও একেবারে সন্দেহ যে করছে না, তা নয়। সে সন্দেহ ও বিশ্বাসের দোলাচালের মধ্যে আছে। এক বছর ধরেই আলিমুজ্জামান বেশ টানাটানির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দোকানটা ছেড়ে দিয়েছে একেবারে জলের দামে। দোকান বিক্রির টাকায় তার ঋণ পুরোপুরি শোধ হয়নি। বাড়িতে সম্বল বলতে একটা চৌচালা ঘর মাত্র। যা সামান্য জমিজমা ছিল, তা আগেই বিক্রি করে দিয়েছিল। বিক্রির টাকা দিয়ে দোকান করেছিল। তাই তার আর বাড়তি কোনো জমি নেই যে বিক্রি করে সে অন্য কিছু করবে। সেই সম্ভাবনাও নেই। ঘর সমেত ভিটেটা বিক্রি করতে পারত। কিন্তু বসতভিটে বিক্রি করলে সে থাকবে কোথায়? এছাড়া এই বসতভিটে আবার তার দুই বোনের অংশ আছে। সে ইচ্ছে করলেও তা বিক্রি করতে পারবে না।

মমিনার বিয়ে হয়েছে দুই বছরের মতো হলো। বিয়ের আগে গোমতীর উজানের গ্রাম হোসেনপুরে আলিমুজ্জামানের বাড়িঘর ও দোকানটা দেখে বেশ ভালোই ঠেকছিল। সংসারে আলিমুজ্জামানের বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। আলিমুজ্জামান দেখতে-শুনতেও ভালো। কোনো যৌতুক চায় না। অবশ্য কেরামত আলী যা কিপ্টে, দুই পয়সা যৌতুক দিয়ে মেয়েকে কখনও বিয়ে দিত না।

আলিমুজ্জামানকে মমিনারও বেশ পছন্দ হয়েছিল। শ্যামলা-সুঠাম দেহের, চোখে বেশ মায়া। সরল প্রকৃতির, কিন্তু বেশ ছটফটে ধরনের। কোনো কিছুতেই স্থির হতে পারত না। সারাক্ষণ শুধু এটাসেটা করে ব্যস্ত রাখত। তাকে আদর করে ডাকত গুনাইবিবি। একেবারে সাংসারিক ছিল না। হুটহাট করে তাকে নিয়ে চলে যেত কুমিল্লা, ঢাকা, চট্টগ্রাম। একবার বেশ টাকাপয়সা খরচ করে তাকে নিয়ে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে সাতদিন কাটিয়ে আসে। একটা দামি হোটেলে ছিল। এদিকে তার দোকান বন্ধ, আর বাড়তি কোনো কামাই-রোজগার নেই, সেদিকে তার কোনো খেয়ালই ছিল না।

মমিনা তার স্বামীর দোকানে একবার নয়, কয়েকবারই গিয়েছিল। হোসেনপুর বাজারটা একেবারে ছোট নয়, বেশ বড়। মীরবহরি বাজারের মতোই। তবে উজানে বলে বাজারের আসাযাওয়ার রাস্তাঘাট ভালো। শুধুমাত্র নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয় না। রিকশা-সিএনজি চলে। তার স্বামীর দোকানটাও বড়সড় ছিল। কিন্তু দোকান না বসলে, ঠিকমতো না চালালে, আয়-রোজগার হবে কীভাবে? বিভিন্ন সময় দোকানের মালামাল তুলতে গিয়ে বিয়ের আগেই স্বামী বেশ ধারদেনা করেছিল। বিয়ের সময়ও খরচপাতি কম করেনি। বড় বজরার মতো নৌকা সাজিয়ে বিয়ে করতে আসে। আঁধারিয়া গ্রামের মানুষ তো স্বামীর এই বিয়ের সাজসজ্জা দেখে বলেই বসে, ‘আহা, এমুন জামাই, মমিনার কপাল গো...!’

কিন্তু কিছুদিন যেতেই মমিনার সেই কপালে ঠেক লাগে। সে নতুন বউ, স্বামীকে কিছুই বলতে পারে না। কিন্তু সে বুঝতে পারে, স্বামী দোকান বন্ধ করে যেভাবে শ্বশুর বাড়িতে এসে পড়ে থাকে একদিন তাকে পথে বসতে হবে। একদিন সে স্বামীকে বলেই বসে, ‘আপনেরে একটা কথা কইতে চাই। আপনে যে দোকান খুলতাছেন না, ব্যবসার ক্ষতি হইব না?’

আলিমুজ্জামান আহ্লাদ করে বলে, ‘কী আর ক্ষতি হইব? তুমি হইলা গিয়া আমার নতুন বউ। আমার গুনাইবিবি। তোমারে ছাইড়া দোকানে গিয়া কি বইসা থাকা মানায়?’

মমিনা হাসে। বলে, ‘তারপরও। আমি তো আর কোনোখানে চইলা যাইতাছি না। বিয়া বইছি, সারা জীবনই থাকমু।’

‘আরে বউ, দোকান দোকানের জায়গায় থাকব। কেউ লইয়া যাইব না। দোকান খুলমু নে। আর কয়টা দিন তোমার লগে কাটাই।’

‘হেইডা তো আমারে আপনাগো বাড়িত তুইলা নিয়াও কাটাইতে পারেন। দোকানও খোলা হইল, আমারেও পইত্যাক দিন দেখলেন।’

‘তা জানি। কিন্তুক বউ, শ্বশুর বাড়ি যে কী মজা! জামাই পুরান হইলে হেই মজা কি আর থাকবে নে?’

‘হ, আপনেরে কইছে...!’

আলিমুজ্জামান হাসে, হা হা, হা হা। বড্ড সরল ও প্রাণখোলা হাসি।

আলিমুজ্জামান অবশ্য পরে মমিনাকে নিজ বাড়িতে তুলে নেয়। কিন্তু ততদিনে বেশ দেরি হয়ে গেছে। দোকান লাটে ওঠে। ওদিকে পাওনাদারদের চাপ দিনদিন বাড়তে থাকে। টাকার অভাবে দোকানে ঠিকমতো মাল তুলতে পারে না। শ্বশুরের কাছে টাকা ধার চায়। কিন্তু কেরামত আলী যে কিপ্টে, একটা টাকাও দেয় না। মমিনার বড়ভাইয়ের কাছেও টাকা চেয়েছিল। মমিনার বড়ভাই শওকত আলী চট্টগ্রাম থাকে। একটা কারখানায় কাজ করে। সেখানেই বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকে। সে-ও না করে দিয়েছে। এদিকে জামাই ঘন ঘন বাড়িতে আসে বলে কেরামত আলী জামাই আদরও কমিয়ে দেয়। বাদাম্যা বলে ডাকে। মমিনা পড়ে ফ্যাসাদে।

বিয়ের এক বছরের মাথায় আলিমুজ্জামান দোকানটা অল্প দামে ছেড়ে দেয়। এছাড়া তার উপায়ও ছিল না। দোকানে তেমন মালই নেই, কী দামে আর বিক্রি করবে? দোকান বিক্রি করে সে কিছু পাওনাদারের টাকা দেয়। তারপর থেকে সে শ্বশুর বাড়িতে এসে পড়ে থাকে। ওদিকে আরও কিছু পাওনাদাররা কিছুদিন আগে খুঁজতে খুঁজতে তার শ্বশুর বাড়িতে এসে হানা দেয়।

মমিনা বুঝতে পারে, তার স্বামী সেই পাওনাদারদের টাকা শোধ করার জন্যই গরু দুটো চুরি করে নিয়ে গেছে। শ্বশুর ও সম্বন্ধির কাছ টাকা চেয়ে সে এক কানাকড়িও পায়নি, শেষে গরু দুটোর দিকেই চোখ যায়। গরু দুটো বিক্রি করতে পারলে কমপক্ষে পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা তো পাবেই। কিন্তু এদিকে যে সবার নাক কাটা গেছে!

কেরামত আলী তো গ্রামে মুখ দেখাতে পারবে না বলে হাউমাউ করে কেঁদে গেছে। অবশ্য তার এই কান্নার মধ্যে গরু দুটো খোয়া যাওয়ার কান্নাই বেশি। সে গরু দুটোকে যত্ন করে পেলে বড় করেছিল আগামী কোরবানির ঈদে বড় দামে বিক্রি করবে বলে। গরু দুটোকে দিয়ে জমিতে হালচাষ পর্যন্ত করায়নি।

কেরামত আলী এখন বাড়িতে নেই। সেই সকাল-সকালেই মমিনাকে ও নিজের কপালকে অভিসম্পাত দিয়ে ছোট ছেলে হানিফকে নিয়ে গরু দুটো খুঁজতে বের হয়েছে। ছেলেকে পাঠিয়েছে হোসেনপুরের দিকে। নিজে গেছে মীরবহরি বাজারের দিকে। প্রয়োজনে সে অনুতপুর যাবে। মমিনা জানে, তার বাবা ও ভাইয়ের হোসেনপুর, মীরবহরি বা অনুতপুর গিয়ে কোনো লাভ নেই। সুদিন মাস চলছে। তার স্বামী যদি মাঝরাতে গরু দুটো চুরি করে নিয়ে যায়, ততক্ষণে সে হেঁটে কোথায়, কোন গ্রামে চলে গেছে!

মমিনা ভাবল, তার বাবা অভিসম্পাত করে গেছে, এতে তার কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু তার কষ্ট হচ্ছে স্বামীর জন্য। স্বামীর জন্য সত্যি তার নাক কাটা গেছে। তার স্বামী শেষপর্যন্ত গরু চুরি করল! সে-ই বা গ্রামে মুখ দেখাবে কীভাবে?

মমিনার ভেতর অন্য একটা আশঙ্কা সকাল থেকে দানা বাঁধছে, স্বামী তার কাছে ফিরে আসবে তো? গরু চুরির মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের গ্রাম বা আশেপাশের গ্রামগুলোতে সবচেয়ে নিকৃষ্ট চুরি হলো গরু চুরি। এছাড়া তার বাবা এই গরুচোর জামাইকে কীভাবে গ্রহণ করবে? তবে সে একটা কাজ করতে পারে, আলিমুজ্জামানের বাড়িতে সে চলে যেতে পারে। কিন্তু ওখানে গিয়ে সে কী খাবে? তার স্বামীর ঘরটাই সম্বল। জমিজমার তো ছিটেফোঁটাও নেই। আর সে একলা ঘরে থাকবেই বা কীভাবে?

মমিনা ভাবল, তার একমাত্র ভরসা বাপের বাড়ি। কিন্তু বিয়ের আগে সে বাপের বাড়িতে একভাবে ছিল। এখন অন্যভাবে থাকতে হবে। আগে জামাইর বাড়ি ও নিজের বাড়ি বলে আলাদা করে কোনো কিছু দেখা হতো না। এখন আলাদা করে দেখা হবে। স্বামীর বাড়িটাই যে তার এখন নিজের বাড়ি!

স্বামীর বাড়ি! মমিনা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। স্বামীর বাড়িতে তার ঠিকমতো থাকাই হলো না। তবে যে কয়দিন থেকেছে, কী এক মায়ার স্পর্শ সে পেয়েছে! একটা চৌচালা ঘর, দরজার সামনে সিমেন্টের পাটাতন। বিভিন্ন গাছে ঘেরা একটুকরো উঠোন। পাটাতনের পাশে একটা একটা পেয়ারা গাছ। পেয়ারা গাছটা চালের উপরে উঠে গেছে। সেই পেয়ারা গাছের পেয়ারাগুলো ভেতরে লাল, দারুণ স্বাদের। স্বামী দুপুরে দোকান বন্ধ করে একবার বাড়িতে আসত। গাছে ওঠে সবচেয়ে পাকা পেয়ারাটা পেড়ে দিত। সে অর্ধেকটা খেত, বাকি অর্ধেকটা স্বামীকে দিত। স্বামী আদর করে হাতটা চেপে ধরত। চিতল বুকে তাকে চেপে ধরে বলত, ‘আমার আনারকলি, আমার গুনাইবিবি...।’ স্বামী সত্যি সত্যি তাকে নিয়ে কোম্পানীগঞ্জ লাকী সিনেমাহলে গুনাইবিবি সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। স্বামী বলেছিল, লাকী সিনেমাহলে কখনও আনারকলি সিনেমা চললে তাকে সেটা দেখাতে নিয়ে যাবে।

মমিনা আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এবার তার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিটা কেঁপে উঠল। বাপের ভর্ৎসনার কথা তার আবার মনে পড়ল। তার বাপ কেরামত আলী রাগে, ক্ষোভে ও কান্নায় ভৎসনা করে বলে গেছে, ‘ধুর, পিছা-কপাইল্লা। দুধ দিয়া ঘরে কালসাপ ডাইকা আনছি। তোর জামাই পুরা একটা কালসাপ। আমার কপাল! তুই মর গিয়া। গলায় কলসি বাইন্ধা মর গিয়া। কতজন তো মইরা যায়...।’

রোদটা এখন পুরোপুরি খাঁড়া হয়ে পড়ছে। দুই ঘরের চালের মাঝখান দিয়ে পড়া রোদ সরু রেখা করে মমিনার শরীরের ওপর দিয়ে সাপের মতো হেঁটে গেছে। ডোবা অঞ্চল বলে বর্ষার মওসুমে নৌকা নিয়ে বের হলেই বিলের জলে বেশ সাপ দেখা যায়। বিলের জলে কিলিবিলি করে রঙিন সিঁথি কেটে সাঁতার কেটে চলে। সুদিন মাসেও পুকুরের জলে, খালে বা ডোবার জলে সেই সাপ দেখা যায়। ঢোঁড়া সাপ। মমিনা ভাবল, তার বাবা যতই বলুক তার স্বামী কালসাপ, আসলে সেটা ঠিক কথা নয়। গরু চুরি করে নিয়ে গেছে সাপ বলতেই পারে। তবে তার স্বামী একটা ঢোঁড়া সাপ। জলঢোঁড়া। নির্বিষ।

মমিনার মনে হলো, তার সময়টাও যাচ্ছে নির্জীব ঢোঁড়াসাপের মতোই। গায়ের ওপর রোদটুকুও। রোদের যন্ত্রণা নেই, আবার দুপুরের রোদের আরামও নেই।

মমিনার মা ছেনোয়ারা বেগম তখনই পশ্চিমের ইশা থেকে জামগাছের চিপা পথটা ধরে উঠোনে ঢুকে পাকঘরের দিকে এগিয়ে এল। খানিকটা দূর থেকে মমিনাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘এই লো, তুই এইখানে বইসা আছস ক্যান?’

মমিনা মা’র দিকে সরাসরি দৃষ্টিতে তাকাল। কোনো জবাব দিল না।

ছেনোয়ারা বেগম বলল, ‘এমনে বইসা থাইকা লাভ নাই। জামাই গরু চুরি করছে, হের কাম হেয় করছে। রান্ধাবাড়া কিছু করছস?’

মমিনা একটু নড়ে বসল। এবারও কোনো জবাব দিল না।

ছেনোয়ারা বেগম এবার একটু মেজাজ দেখিয়ে বলল, ‘তোর এমনে ভং ধইরা বইসা থাকলে হইব না। তোর বাপ-ভাই গেছে গরু চোর ধরতে। গরু চোর ধরব না ঘোড়ার ডিম ধরব। হেরা আইলে খাইব কী? তোর না হয় না খাইলে হইব। তোর জামাই গরু চুরি করছে। গরু চোরের বউয়ের না খাইলে হয়। আমাগো না খাইলে কি হইব?’

মমিনা জানে, তার মা’টা এমনই। অন্যসময় হলে সে পাল্টা কথা শুনিয়ে দিত। ছোটবেলা থেকে সে তার মাকে এমন দেখে এসেছে। সংসারের প্রতি টান নেই, খালি পান খায়। একমাত্র বড় জা কমলা খাতুনের বাড়ি বাদে আঁধারিয়া গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার এমন কোনো বাড়ি নেই যে তার পা পড়ে না। সে নিয়ম করে প্রতিদিন একটা বাড়িতে যায়। সেই বাড়িতে বসে পান খান খায়। তবে সবচেয়ে বেশি যায় পশ্চিম ইশার ছালেহা খাতুনের কাছে। ছালেহা খাতুনও তার মা’র মতো পানখোর।

ছেনোয়ারা বেগম বাড়ি-বাড়ি গিয়ে যে এবাড়ির কথা ওবাড়িতে লাগায়, তা নয়। এমনিই পাড়া বেড়ায়। তবে পাড়া বেড়াতে গিয়ে একটা কাজ করে, সুযোগ পেলে কমলা খাতুনের বদনাম করে। কমলা খাতুন যেন তার জানের দুশমন। অথচ কমলা খাতুন ঝগড়াঝাঁটি করা থাক দূরের কথা ছেনোয়ারা বেগমের সঙ্গে কথাই বলে না প্রায় এক যুগ ধরে।

এদিকে মমিনা আবার তার মা’র উল্টো। তার বড়চাচি কমলা খাতুনের সঙ্গেই তার যত ভাব। সব সুখদুঃখের কথা সে বড়চাচির সঙ্গেই ভাগ করে।

ছেনোয়ারা বেগম বসতঘরে পাটাতনে উঠতে উঠতে বলল, ‘ছেমড়ি দেমাগ অখনও কমে নাই। যা, ওঠ। নইলে পিছা দিয়া বাইড়ামু।’

মমিনা কী ভেবে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। দুই চালের ফাঁক গলে আকাশের দিকেও একবার তাকাল। মা’র দিকে একবার তাকিয়ে ধীর পায়ে উঠোনের দিকে পা ফেলল।

ছেনোয়ারা বেগম খেঁকিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করল, ‘ওই, তুই কই যাইতাছস? ওই ছিলানের ঘরে?’

মমিনা এবারও কোনো জবাব না দিয়ে কমলা খাতুনের ঘরের দিকে হাঁটা ধরল।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬


গোমতীকন্যা

প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬

featured Image


দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন

এক

(পূর্ব প্রকাশের পর)

সকাল-দুপুরের সন্ধিক্ষণ প্রায়। রোদটুকু এখন অনেকটাই খাঁড়া হয়ে পড়ছে। ছায়াটা ছোট হতে হতে পায়ের কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। পিছদোর ঘেঁষা উঠোনের দক্ষিণের অনেকটা অংশজুড়ে শ্যাওলার সবুজ আস্তর। এই শ্যাওলার আস্তর পড়েছে মূলত গরুর চোনা থেকে। সুদিনে গরু যেখানেসেখানে বাঁধা যায়, কিন্তু বর্ষার মওসুমে গোয়ালঘরটাই গরুর সম্বল।

এখন অবশ্য সুদিন। বর্ষার মওসুমে পড়া শ্যাওলা সুদিনে এসে শুকিয়ে কেমন চটা চটা হয়ে উঠছে। উত্তরের জোয়ারের জল বুইদ্দার বিল থেকে নেমে গেছে বেশ আগেই। সমস্ত বিলজুড়ে দিগন্ত বিস্তৃত সরিষা আর নানান জাতের সবজির ক্ষেত। শীতের সবজি। বেগুন, ক্ষীরা, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মটরশুঁটি। কোথাও কোথাও পুরো জমি জুড়ে মাচা দিয়ে শিমগাছ লাগানো হয়েছে। শিমের বেগুনি-শাদা ফুল উত্তরের বাতাসে কেমন তিরতির করে কাঁপে।

কেরামত আলীর গোয়ালঘরটা উঠোনের দক্ষিণে। গোয়ালঘরের পরই পিছদোরের শুরু। পিছদোরের দক্ষিণে পাকঘর। পাকঘরটা দু’চালা টিনের। অর্ধেকটায় পরপর দুটো মাটির চুলা। একটা দুইচোখা চুলা ও অপরটা একচোখা চুলা। সাধারণত ভাত-তরকারি একই সময় পাশাপাশি রান্না বসালে দুইচোখা চুলাটাতে আগুন জ্বালানো হয়। একচোখা চুলাটা আগুন জ্বালায় মূলত ডিম ভাজি বা মাছ ভাজি করার জন্য। কখনও দুধে বলক তোলার জন্যও একচোখা চুলা ব্যবহার করে।

পাকঘরের বাকি অর্ধেকটায় হাঁসমুরগির খোঁয়াড় ও ছাগল রাখার স্থান। এই হাঁসমুরগি ও ছাগল রাখার স্থানটায় একসময় ঢেঁকি ভানার স্থান ছিল। ঢেঁকিটা উধাও হয়ে গেছে সেই কবে, মমিনার জন্মের পরপর। গ্রামে এখন আর ঢেঁকি দিয়ে কেউ ধান ভানে না। মীরবহরি বাজারে ধান ভানার কল আছে দুটো। সারাক্ষণ খট খট, খট খট করে চলে। আঁধারিয়া গ্রামের ভুঁইয়া বাড়িতে একসময় একটি ধান ভানার কল ছিল। সেটি অবশ্য এখন আর নেই।

পাকঘর থেকে সামান্য দূরে চৌচালা বসতঘর। চৌচালা বসতঘরটা টিনের। বেড়াগুলো কাঠ ও টিন দিয়ে করা। টিনের উপর আকাশী রং করা। চৌকাঠে মাইট্টার তেল দেওয়া। ভিত পাকা নয়, লেপে নেওয়া কাঁচা। দরজার মুখে একটা সিমেন্টের পাটাতন। পাকঘরটা বসতঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে বলে ঘাধলার দিনে বৃষ্টির জল একঘরের চাল থেকে ঝনঝন শব্দে আরেক ঘরের চালে গিয়ে পড়ে। রোদ্রের দিনে স্থানটা প্রায় ছায়া করে থাকে। শুধুমাত্র দুপুরের দিকে হলুদ সাপের মতো সরু রেখা করে রোদ পড়ে।

মমিনা বসে আছে সেই ছায়াকরা স্থানটার মুখে, পুবদিকে দৃষ্টি ফেলে। সে দুই ঘরের মাঝখানের সেই সরু স্থানটার মুখে বসলেও তার পা দুটো উঠোনের রৌদ্র স্পর্শ করছে। তার দৃষ্টিটা গোয়ালঘরের দিকে। এখনও তার বিশ্বাস হচ্ছে না, তার স্বামী আলিমুজ্জামান তাদের গোয়ালঘর থেকে দুটো গরু চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে।

মমিনা বিশ্বাস না করলেও একেবারে সন্দেহ যে করছে না, তা নয়। সে সন্দেহ ও বিশ্বাসের দোলাচালের মধ্যে আছে। এক বছর ধরেই আলিমুজ্জামান বেশ টানাটানির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দোকানটা ছেড়ে দিয়েছে একেবারে জলের দামে। দোকান বিক্রির টাকায় তার ঋণ পুরোপুরি শোধ হয়নি। বাড়িতে সম্বল বলতে একটা চৌচালা ঘর মাত্র। যা সামান্য জমিজমা ছিল, তা আগেই বিক্রি করে দিয়েছিল। বিক্রির টাকা দিয়ে দোকান করেছিল। তাই তার আর বাড়তি কোনো জমি নেই যে বিক্রি করে সে অন্য কিছু করবে। সেই সম্ভাবনাও নেই। ঘর সমেত ভিটেটা বিক্রি করতে পারত। কিন্তু বসতভিটে বিক্রি করলে সে থাকবে কোথায়? এছাড়া এই বসতভিটে আবার তার দুই বোনের অংশ আছে। সে ইচ্ছে করলেও তা বিক্রি করতে পারবে না।

মমিনার বিয়ে হয়েছে দুই বছরের মতো হলো। বিয়ের আগে গোমতীর উজানের গ্রাম হোসেনপুরে আলিমুজ্জামানের বাড়িঘর ও দোকানটা দেখে বেশ ভালোই ঠেকছিল। সংসারে আলিমুজ্জামানের বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। আলিমুজ্জামান দেখতে-শুনতেও ভালো। কোনো যৌতুক চায় না। অবশ্য কেরামত আলী যা কিপ্টে, দুই পয়সা যৌতুক দিয়ে মেয়েকে কখনও বিয়ে দিত না।

আলিমুজ্জামানকে মমিনারও বেশ পছন্দ হয়েছিল। শ্যামলা-সুঠাম দেহের, চোখে বেশ মায়া। সরল প্রকৃতির, কিন্তু বেশ ছটফটে ধরনের। কোনো কিছুতেই স্থির হতে পারত না। সারাক্ষণ শুধু এটাসেটা করে ব্যস্ত রাখত। তাকে আদর করে ডাকত গুনাইবিবি। একেবারে সাংসারিক ছিল না। হুটহাট করে তাকে নিয়ে চলে যেত কুমিল্লা, ঢাকা, চট্টগ্রাম। একবার বেশ টাকাপয়সা খরচ করে তাকে নিয়ে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে সাতদিন কাটিয়ে আসে। একটা দামি হোটেলে ছিল। এদিকে তার দোকান বন্ধ, আর বাড়তি কোনো কামাই-রোজগার নেই, সেদিকে তার কোনো খেয়ালই ছিল না।

মমিনা তার স্বামীর দোকানে একবার নয়, কয়েকবারই গিয়েছিল। হোসেনপুর বাজারটা একেবারে ছোট নয়, বেশ বড়। মীরবহরি বাজারের মতোই। তবে উজানে বলে বাজারের আসাযাওয়ার রাস্তাঘাট ভালো। শুধুমাত্র নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয় না। রিকশা-সিএনজি চলে। তার স্বামীর দোকানটাও বড়সড় ছিল। কিন্তু দোকান না বসলে, ঠিকমতো না চালালে, আয়-রোজগার হবে কীভাবে? বিভিন্ন সময় দোকানের মালামাল তুলতে গিয়ে বিয়ের আগেই স্বামী বেশ ধারদেনা করেছিল। বিয়ের সময়ও খরচপাতি কম করেনি। বড় বজরার মতো নৌকা সাজিয়ে বিয়ে করতে আসে। আঁধারিয়া গ্রামের মানুষ তো স্বামীর এই বিয়ের সাজসজ্জা দেখে বলেই বসে, ‘আহা, এমুন জামাই, মমিনার কপাল গো...!’

কিন্তু কিছুদিন যেতেই মমিনার সেই কপালে ঠেক লাগে। সে নতুন বউ, স্বামীকে কিছুই বলতে পারে না। কিন্তু সে বুঝতে পারে, স্বামী দোকান বন্ধ করে যেভাবে শ্বশুর বাড়িতে এসে পড়ে থাকে একদিন তাকে পথে বসতে হবে। একদিন সে স্বামীকে বলেই বসে, ‘আপনেরে একটা কথা কইতে চাই। আপনে যে দোকান খুলতাছেন না, ব্যবসার ক্ষতি হইব না?’

আলিমুজ্জামান আহ্লাদ করে বলে, ‘কী আর ক্ষতি হইব? তুমি হইলা গিয়া আমার নতুন বউ। আমার গুনাইবিবি। তোমারে ছাইড়া দোকানে গিয়া কি বইসা থাকা মানায়?’

মমিনা হাসে। বলে, ‘তারপরও। আমি তো আর কোনোখানে চইলা যাইতাছি না। বিয়া বইছি, সারা জীবনই থাকমু।’

‘আরে বউ, দোকান দোকানের জায়গায় থাকব। কেউ লইয়া যাইব না। দোকান খুলমু নে। আর কয়টা দিন তোমার লগে কাটাই।’

‘হেইডা তো আমারে আপনাগো বাড়িত তুইলা নিয়াও কাটাইতে পারেন। দোকানও খোলা হইল, আমারেও পইত্যাক দিন দেখলেন।’

‘তা জানি। কিন্তুক বউ, শ্বশুর বাড়ি যে কী মজা! জামাই পুরান হইলে হেই মজা কি আর থাকবে নে?’

‘হ, আপনেরে কইছে...!’

আলিমুজ্জামান হাসে, হা হা, হা হা। বড্ড সরল ও প্রাণখোলা হাসি।

আলিমুজ্জামান অবশ্য পরে মমিনাকে নিজ বাড়িতে তুলে নেয়। কিন্তু ততদিনে বেশ দেরি হয়ে গেছে। দোকান লাটে ওঠে। ওদিকে পাওনাদারদের চাপ দিনদিন বাড়তে থাকে। টাকার অভাবে দোকানে ঠিকমতো মাল তুলতে পারে না। শ্বশুরের কাছে টাকা ধার চায়। কিন্তু কেরামত আলী যে কিপ্টে, একটা টাকাও দেয় না। মমিনার বড়ভাইয়ের কাছেও টাকা চেয়েছিল। মমিনার বড়ভাই শওকত আলী চট্টগ্রাম থাকে। একটা কারখানায় কাজ করে। সেখানেই বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকে। সে-ও না করে দিয়েছে। এদিকে জামাই ঘন ঘন বাড়িতে আসে বলে কেরামত আলী জামাই আদরও কমিয়ে দেয়। বাদাম্যা বলে ডাকে। মমিনা পড়ে ফ্যাসাদে।

বিয়ের এক বছরের মাথায় আলিমুজ্জামান দোকানটা অল্প দামে ছেড়ে দেয়। এছাড়া তার উপায়ও ছিল না। দোকানে তেমন মালই নেই, কী দামে আর বিক্রি করবে? দোকান বিক্রি করে সে কিছু পাওনাদারের টাকা দেয়। তারপর থেকে সে শ্বশুর বাড়িতে এসে পড়ে থাকে। ওদিকে আরও কিছু পাওনাদাররা কিছুদিন আগে খুঁজতে খুঁজতে তার শ্বশুর বাড়িতে এসে হানা দেয়।

মমিনা বুঝতে পারে, তার স্বামী সেই পাওনাদারদের টাকা শোধ করার জন্যই গরু দুটো চুরি করে নিয়ে গেছে। শ্বশুর ও সম্বন্ধির কাছ টাকা চেয়ে সে এক কানাকড়িও পায়নি, শেষে গরু দুটোর দিকেই চোখ যায়। গরু দুটো বিক্রি করতে পারলে কমপক্ষে পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা তো পাবেই। কিন্তু এদিকে যে সবার নাক কাটা গেছে!

কেরামত আলী তো গ্রামে মুখ দেখাতে পারবে না বলে হাউমাউ করে কেঁদে গেছে। অবশ্য তার এই কান্নার মধ্যে গরু দুটো খোয়া যাওয়ার কান্নাই বেশি। সে গরু দুটোকে যত্ন করে পেলে বড় করেছিল আগামী কোরবানির ঈদে বড় দামে বিক্রি করবে বলে। গরু দুটোকে দিয়ে জমিতে হালচাষ পর্যন্ত করায়নি।

কেরামত আলী এখন বাড়িতে নেই। সেই সকাল-সকালেই মমিনাকে ও নিজের কপালকে অভিসম্পাত দিয়ে ছোট ছেলে হানিফকে নিয়ে গরু দুটো খুঁজতে বের হয়েছে। ছেলেকে পাঠিয়েছে হোসেনপুরের দিকে। নিজে গেছে মীরবহরি বাজারের দিকে। প্রয়োজনে সে অনুতপুর যাবে। মমিনা জানে, তার বাবা ও ভাইয়ের হোসেনপুর, মীরবহরি বা অনুতপুর গিয়ে কোনো লাভ নেই। সুদিন মাস চলছে। তার স্বামী যদি মাঝরাতে গরু দুটো চুরি করে নিয়ে যায়, ততক্ষণে সে হেঁটে কোথায়, কোন গ্রামে চলে গেছে!

মমিনা ভাবল, তার বাবা অভিসম্পাত করে গেছে, এতে তার কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু তার কষ্ট হচ্ছে স্বামীর জন্য। স্বামীর জন্য সত্যি তার নাক কাটা গেছে। তার স্বামী শেষপর্যন্ত গরু চুরি করল! সে-ই বা গ্রামে মুখ দেখাবে কীভাবে?

মমিনার ভেতর অন্য একটা আশঙ্কা সকাল থেকে দানা বাঁধছে, স্বামী তার কাছে ফিরে আসবে তো? গরু চুরির মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের গ্রাম বা আশেপাশের গ্রামগুলোতে সবচেয়ে নিকৃষ্ট চুরি হলো গরু চুরি। এছাড়া তার বাবা এই গরুচোর জামাইকে কীভাবে গ্রহণ করবে? তবে সে একটা কাজ করতে পারে, আলিমুজ্জামানের বাড়িতে সে চলে যেতে পারে। কিন্তু ওখানে গিয়ে সে কী খাবে? তার স্বামীর ঘরটাই সম্বল। জমিজমার তো ছিটেফোঁটাও নেই। আর সে একলা ঘরে থাকবেই বা কীভাবে?

মমিনা ভাবল, তার একমাত্র ভরসা বাপের বাড়ি। কিন্তু বিয়ের আগে সে বাপের বাড়িতে একভাবে ছিল। এখন অন্যভাবে থাকতে হবে। আগে জামাইর বাড়ি ও নিজের বাড়ি বলে আলাদা করে কোনো কিছু দেখা হতো না। এখন আলাদা করে দেখা হবে। স্বামীর বাড়িটাই যে তার এখন নিজের বাড়ি!

স্বামীর বাড়ি! মমিনা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। স্বামীর বাড়িতে তার ঠিকমতো থাকাই হলো না। তবে যে কয়দিন থেকেছে, কী এক মায়ার স্পর্শ সে পেয়েছে! একটা চৌচালা ঘর, দরজার সামনে সিমেন্টের পাটাতন। বিভিন্ন গাছে ঘেরা একটুকরো উঠোন। পাটাতনের পাশে একটা একটা পেয়ারা গাছ। পেয়ারা গাছটা চালের উপরে উঠে গেছে। সেই পেয়ারা গাছের পেয়ারাগুলো ভেতরে লাল, দারুণ স্বাদের। স্বামী দুপুরে দোকান বন্ধ করে একবার বাড়িতে আসত। গাছে ওঠে সবচেয়ে পাকা পেয়ারাটা পেড়ে দিত। সে অর্ধেকটা খেত, বাকি অর্ধেকটা স্বামীকে দিত। স্বামী আদর করে হাতটা চেপে ধরত। চিতল বুকে তাকে চেপে ধরে বলত, ‘আমার আনারকলি, আমার গুনাইবিবি...।’ স্বামী সত্যি সত্যি তাকে নিয়ে কোম্পানীগঞ্জ লাকী সিনেমাহলে গুনাইবিবি সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। স্বামী বলেছিল, লাকী সিনেমাহলে কখনও আনারকলি সিনেমা চললে তাকে সেটা দেখাতে নিয়ে যাবে।

মমিনা আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এবার তার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিটা কেঁপে উঠল। বাপের ভর্ৎসনার কথা তার আবার মনে পড়ল। তার বাপ কেরামত আলী রাগে, ক্ষোভে ও কান্নায় ভৎসনা করে বলে গেছে, ‘ধুর, পিছা-কপাইল্লা। দুধ দিয়া ঘরে কালসাপ ডাইকা আনছি। তোর জামাই পুরা একটা কালসাপ। আমার কপাল! তুই মর গিয়া। গলায় কলসি বাইন্ধা মর গিয়া। কতজন তো মইরা যায়...।’

রোদটা এখন পুরোপুরি খাঁড়া হয়ে পড়ছে। দুই ঘরের চালের মাঝখান দিয়ে পড়া রোদ সরু রেখা করে মমিনার শরীরের ওপর দিয়ে সাপের মতো হেঁটে গেছে। ডোবা অঞ্চল বলে বর্ষার মওসুমে নৌকা নিয়ে বের হলেই বিলের জলে বেশ সাপ দেখা যায়। বিলের জলে কিলিবিলি করে রঙিন সিঁথি কেটে সাঁতার কেটে চলে। সুদিন মাসেও পুকুরের জলে, খালে বা ডোবার জলে সেই সাপ দেখা যায়। ঢোঁড়া সাপ। মমিনা ভাবল, তার বাবা যতই বলুক তার স্বামী কালসাপ, আসলে সেটা ঠিক কথা নয়। গরু চুরি করে নিয়ে গেছে সাপ বলতেই পারে। তবে তার স্বামী একটা ঢোঁড়া সাপ। জলঢোঁড়া। নির্বিষ।

মমিনার মনে হলো, তার সময়টাও যাচ্ছে নির্জীব ঢোঁড়াসাপের মতোই। গায়ের ওপর রোদটুকুও। রোদের যন্ত্রণা নেই, আবার দুপুরের রোদের আরামও নেই।

মমিনার মা ছেনোয়ারা বেগম তখনই পশ্চিমের ইশা থেকে জামগাছের চিপা পথটা ধরে উঠোনে ঢুকে পাকঘরের দিকে এগিয়ে এল। খানিকটা দূর থেকে মমিনাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘এই লো, তুই এইখানে বইসা আছস ক্যান?’

মমিনা মা’র দিকে সরাসরি দৃষ্টিতে তাকাল। কোনো জবাব দিল না।

ছেনোয়ারা বেগম বলল, ‘এমনে বইসা থাইকা লাভ নাই। জামাই গরু চুরি করছে, হের কাম হেয় করছে। রান্ধাবাড়া কিছু করছস?’

মমিনা একটু নড়ে বসল। এবারও কোনো জবাব দিল না।

ছেনোয়ারা বেগম এবার একটু মেজাজ দেখিয়ে বলল, ‘তোর এমনে ভং ধইরা বইসা থাকলে হইব না। তোর বাপ-ভাই গেছে গরু চোর ধরতে। গরু চোর ধরব না ঘোড়ার ডিম ধরব। হেরা আইলে খাইব কী? তোর না হয় না খাইলে হইব। তোর জামাই গরু চুরি করছে। গরু চোরের বউয়ের না খাইলে হয়। আমাগো না খাইলে কি হইব?’

মমিনা জানে, তার মা’টা এমনই। অন্যসময় হলে সে পাল্টা কথা শুনিয়ে দিত। ছোটবেলা থেকে সে তার মাকে এমন দেখে এসেছে। সংসারের প্রতি টান নেই, খালি পান খায়। একমাত্র বড় জা কমলা খাতুনের বাড়ি বাদে আঁধারিয়া গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার এমন কোনো বাড়ি নেই যে তার পা পড়ে না। সে নিয়ম করে প্রতিদিন একটা বাড়িতে যায়। সেই বাড়িতে বসে পান খান খায়। তবে সবচেয়ে বেশি যায় পশ্চিম ইশার ছালেহা খাতুনের কাছে। ছালেহা খাতুনও তার মা’র মতো পানখোর।

ছেনোয়ারা বেগম বাড়ি-বাড়ি গিয়ে যে এবাড়ির কথা ওবাড়িতে লাগায়, তা নয়। এমনিই পাড়া বেড়ায়। তবে পাড়া বেড়াতে গিয়ে একটা কাজ করে, সুযোগ পেলে কমলা খাতুনের বদনাম করে। কমলা খাতুন যেন তার জানের দুশমন। অথচ কমলা খাতুন ঝগড়াঝাঁটি করা থাক দূরের কথা ছেনোয়ারা বেগমের সঙ্গে কথাই বলে না প্রায় এক যুগ ধরে।

এদিকে মমিনা আবার তার মা’র উল্টো। তার বড়চাচি কমলা খাতুনের সঙ্গেই তার যত ভাব। সব সুখদুঃখের কথা সে বড়চাচির সঙ্গেই ভাগ করে।

ছেনোয়ারা বেগম বসতঘরে পাটাতনে উঠতে উঠতে বলল, ‘ছেমড়ি দেমাগ অখনও কমে নাই। যা, ওঠ। নইলে পিছা দিয়া বাইড়ামু।’

মমিনা কী ভেবে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। দুই চালের ফাঁক গলে আকাশের দিকেও একবার তাকাল। মা’র দিকে একবার তাকিয়ে ধীর পায়ে উঠোনের দিকে পা ফেলল।

ছেনোয়ারা বেগম খেঁকিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করল, ‘ওই, তুই কই যাইতাছস? ওই ছিলানের ঘরে?’

মমিনা এবারও কোনো জবাব না দিয়ে কমলা খাতুনের ঘরের দিকে হাঁটা ধরল।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত