বিচলিত বিব্রতও
হাসান হাফিজ
কফি তো কালোই হয়
চিনির মিশ্রণ যদি
এড়ানো সম্ভব হয়
তাহলে তো ভালো হয়!
এতো ভালো
এতো সুখ
সইবে কপালে?
পুড়েছে কপাল যার
সঙ্গী সাথী নাই তার,
শর্করার নিঝুম ছোবল
দুঃখ দাগা দেয় তারে
দুঃখের বয়ান গাথা
মন খুলে কই কারে?
কেউ নাই কিচ্ছু নাই
যাবো তবে কোন্ ঠাঁই?
জাদুবাস্তবতা
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
একদিকে বোধে বা আংশিক অবাস্তবে মিশ্রিত স্বপ্ন
অন্যদিকে তুমিও আংশিক অলৌকিক
কানামাছি ভোঁ ভোঁ, আমি বিভ্রান্ত। কাকে ছুঁবো!
তোমাকে দেখছি, অথচ দেখছি না
তোমাকে পাচ্ছি, অথচ পাচ্ছি না—
তোমার অনুভূতি ছুঁই, অথচ নিশ্চিত নই!
দৃশ্যের ভেতরে অদৃশ্য এবং সত্যের ভেতরে মিথ্যে
আয়নার ভেতরে আমি
গোপনের অন্তরে, অন্তরালে তুমি অন্তঃপুরবাসিনী—
যেন টিভিতে মাছের জলকেলি
আর বাইরে দর্শক বিড়ালের অস্থিরতা!
তুমি নারী অধিক অসূর্যস্পর্শী নারী বা পরী
আমাদের সম্পর্ক প্রযুক্তিপ্রেমে
আমি পুরুষের অধিক প্রেমিক।
তুমি জাদুবাস্তবতায় জন্ম নেয়া অ্যালগরিদম ভাষা,
আমি তাকে প্রেম বলে ডেকেছি।
চ্যাটজিপিটি, এআই কি তোমার দূরসম্পর্কীয় পিতা?
অনিষ্ট
মঈনউদ্দিন মুনশী
আগুন দৌড়াতে লাগলো আতঙ্কগ্রস্তভাবে
এর ভস্ম থেকে।
রক্তিম আভার মধ্যে এর প্রতিবিম্ব
চলচ্চিত্রের ঘূর্ণমান ছায়ার মতো পালিয়ে গেলো
মানুষের মাংস এবং রক্ত থেকে।
আঘাতের চোখে ক্ষত চিহ্ন দৃষ্টিগোচর হলো
বহু বছর পর।
রক্ত-বর্ণের ক্ষণিক চমক
ক্ষয়ে যায় নিষ্ঠুর ভাবে!
কিন্তু ঐ প্রক্রিয়ার কোন অবকাশ নেই
থেমে যাবার,
যেন রেলগাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে
এর ভগ্নাবশেষ!
আঘাটে বরষা
হাসান কল্লোল
বরষা ঘন হলে সকালের চায়ে আর
মিশাই না দুধ! গাঢ় একাকীত্ব তার ছাতার নিচে
আমাকে লুকিয়ে রেখে
ভেজা চুল, ভেজা বুক-পিঠ মুছিয়ে বলে:
হাওড়ে আসে না এমনকালে
ষাটের বালক! কিছুটা তো অভিজ্ঞ হয়েছ নিশ্চয়ই;
যদিও চুলগুলো খুব একটা বুদ্ধিতে পাকে নি!
চালাকি তেমন জানি না তবুও বুদ্ধিহীন হয়ে এতটা বরষা
অল্প অল্প ভিজে এসেছি পুবাল মেঘের সাথে সখ্যতায়—
দূরের এই বিরান ঘাটে!
আঘাটের পচা মাছের রক্ত আর গলিত ঘ্রাণে
আজও কদম ফোটে কিশোরীর স্বপ্ন-ধোয়া হাতে!
মাছেদের স্কুলে এই তুমুল বৃষ্টিতে
আনন্দে থাকার কোনো ক্লাসে কী শেখায়
বুড়ো মৎস্য অবতার,
বরষায় তার সাথে আমাদের
দেখা হওয়া খুব দরকার!
প্রেমহীন অবয়ব
নাহার ফরিদ খান
শীতার্ত নগরীতে বরফের প্রান্তর
“তুমিও কি হয়ে গেছ বরফের মতো
নিষ্প্রাণ সৌন্দর্য” ইথারে ভেসেছিল
কণ্ঠ তোমার। আসলেই কি ম্রিয়মাণ!
হয়ে কি আছি শুধু ছায়া! শুধু কি
প্রতিবিম্ব! ধিকিধিকি প্রাণ চলছে
এখনো। প্রাণসঞ্চার ম্রিয়মাণ।
কিছুতেই পারি না সময়কে ধরে রাখতে
নিজের মতো করে, সময় দীর্ঘ হয়
সাজাতে পারি না নিজস্ব ক্যানভাসে।
বয়স বেড়ে যাওয়া মননে চেতনার
শব্দাবলি প্রায়সই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়
হৃদয়ের সাথে কবিতার সখ্যতা শুধু
এটুকুই একান্ত আমার, একান্ত আপন
বলয়। বিমূর্ত পৃথিবীর অপার সৌন্দর্যের
মাঝে একাকী দাঁড়িয়ে পত্রশূন্য বৃক্ষসম
আত্মার গভীরে প্রোথিত চেতনায় দেখি
প্রেমহীন অবয়ব। অবাক জীবনবোধ।
গোধূলির গান
সোহরাব পাশা
মৃতেরাই বেশি কথা বলে
জীবিতদের নীরব মঞ্চে,
ফুলগুলি মেঘে ঢাকা
কালো ব্যাজপরা রুগ্ণদিন
প্রতিবন্ধী চোখ;
অর্ধেক রাত্রি নিয়ে ঘরে ফিরছে নিঃস্ব
বিমর্ষ যুবক। স্বপ্নগুলি তার প্রাচীন পাথর
ভুলে গেছে হৃৎপিণ্ডের গান,
তৃতীয় মুদ্রণ করে রাত্রির দুপুর
হাঁটতে হাঁটতে শূন্যতার কাছাকাছি
পুরনো অন্ধকারে হঠাৎ পৌঁছে গেছি
তোমার পথে আলোর পাতা
পড়েনি এখনো;
আরো কয়েক পা এগুলে নির্জন সমুদ্র
পেছন ফেরার পথ জুড়ে কাঁটাতার,
তোমার জন্য দাঁড়িয়ে আছি ভোরের
অপেক্ষায়
সুকান্ত, আবার হাঁকো—
মনজুর শামস
(কবি সুকান্তের জন্মশতবর্ষে বিপ্লবী অভিবাদন জানিয়ে)
চিরকিশোর কবির আহ্বানের পর শতবর্ষ তো পেরিয়ে গেল প্রায়!
না, এখনো আসেনি ফিরে মহামানব এই গ্রাম নগরের ভিড়ে,
এখানে মৃত্যু এখনো হানা দেয় বারবার, লোকচক্ষুর আড়ালে নয়
বরং দিনের আলোতেও নেমে আসে সর্বনাশের চাপানো অন্ধকার
শুধু মৃত্যু নয়; এই আকাশ, দিগন্ত, মাঠ স্বপ্নে সবুজ মাটি
হয়ে ওঠে আজ ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের ঘাঁটি
হে কিশোর কবি, তুমিই বরং ফিরে আসো আরেকবার
চতুর্মুখি আঘাতে ম্রিয়মাণ আঠারো-বছরিদের উজ্জীবিত করে
করো সেই দৃঢ় উচ্চারণ— ‘বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগে, সুতীক্ষ্ম করো চিত্ত,
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।’
দ্বৈরথ
আসিফ নূর
তুমি সারাদিন থাকো শান্তশিষ্ট,
রাত নামলেই হয়ে যাও পাগলা কুকুর;
আমি দিনভর জ্বলি উলটা-পালটা—
সন্ধ্যার পর থেকেই শব্দহীন শীতল পুকুর।
দুই বিপরীতে হঠাৎ দেখাদেখি—
গাঢ় পরিচয় শেষে জমলো গূঢ় পরিণয়,
আমাদের দ্বন্দ্ব-সংঘাত লাগাতার;
কেননা দুজনার কেউই জানি না অভিনয়।
ভাসাও আকাশে
আহমদ জামাল জাফরী
অদৃশ্য ধুলোর মতো ছুঁয়ে থাকে স্তব্ধ বিষণ্নতা,
অন্ধকারের জানালা দিয়ে আকাশের সীমানার ভেতর
বিষণ্ন ঘুড়ির মতো আবছায়া মেঘ উড়ে যায়,
দূর দিগন্তে ঝুঁকে থাকা মলিন মেঘে ধূসর বিভ্রম।
পোড়ো বাড়ির নির্জনতা সঙ্গীহীন
মলিন ঘাসের মতো এই উচ্ছিষ্ট জীবন;
শঙ্খচুড় রেশমের ডানার মতো হাওয়া খুলে খুলে যায়
ব্রহ্মপুত্রের নীল ধোঁয়ার মতো বৃষ্টি নামে
জলপাই রঙের গ্রামগুলি ভিজে মাটির গন্ধে মাতাল,
এইখানে রাত্রির পুরোনো মানচিত্র অন্য এক মহাদেশ!
ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে মায়ার পৃথিবী
স্বপ্নের মতো এই অচেনা মৌতাত!
বেভুল সুরে বাজে কোন সমাপনী গান?
বাতাসের গা ছুঁয়ে ঝরে পড়ে অন্ধকার
আহত পখির উড়াল ডানায়
লেখা থাকে সূর্যাস্তের রঙ!
ভুলে যাওয়া স্বপ্নের মতো স্মৃতি-বিস্মৃতি
সমস্ত সীমানা ছেড়ে ভাসাও আকাশে!
অনিবার্য সুখ
মুশাররাত
আমাদের যে কোনো মূল্যে ভালো থাকতে হবে
দূর্নীতিমুক্ত দপ্তরের কেরানীর সুকঠিন সততার মতো
যে কোন মূল্যে সুন্দর থাকতে হবে আমাদের
বৃষ্টি ধোঁয়া কাঠগোলাপের মতো
রাজপথ উত্তপ্ত করে রাখা বিপ্লবীর স্লোগানের
মতো মুখর হয়ে জীবনের প্রাপ্যটুকু
আদায় করে নিতে হবে
মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মতো
শক্তি অর্জন করে তাকে হারানো
দরকার নির্লজ্জের মতো
হায়াতের কাছে বেঁধে দেয়া সময়টুকুর
যাঁতাকলে পিষ্ট হতে দেখে
ভিলেনের মতো অট্টহাসিতে তাকে
উল্লাসে নৃত্যরত মূর্তির রূপে দেখতে চাই না আর
আমাদের দুঃখগুলো সেজে থাকুক
অনিবার্য সুখের মতো
আমাদের অশ্রুকনাগুলো মুক্তো হয়ে
ঝরে পড়ুক প্রতিবন্ধী সময়ের বাঁকে বাঁকে
আমাদের মৃত্যু হোক উচ্ছ্বসিত জীবনের দর্শন
সীমাহীন আনন্দে ভাসতে ভাসতে জলযন্ত্রে
রাঙিয়ে দিয়ে আযরাইলের আকাশ।
দেশের বাড়ি
আফরোজা সোমা
একদিন ফিরবে বলে
প্রাণভরা আশা নিয়ে
বেঁচে থাকে অভিবাসী।
হয়তো জানে না তারা,
ফেরা একটা মিথ,
একবার গেলে আর
হয় না ফেরা
চিরচেনা দেশের বাড়ি।
তবু তাদের বুকের পরে
কী রঙিন সরিষা ফুল
ফুটে থাকে ভরা মৌসুমে!
আমার তো নাই ভিটা, নাই ঘর,
দেশের বাড়ি বলতে শুধু তুমি।
যেভাবে করাল পদ্মা ভাঙে পাড়,
মুছে দেয় বাড়ি ও গ্রামের ঠিকানা,
সেভাবে চিরতরে গিয়েছো তুমি,
মুছে দিয়ে ভূচিত্র সকল।
ফিরতে হলে ঠিকানা লাগে,
ফিরবো বলো, কোথায় তোমার বুক!
অসন্দিগ্ধ
শেলী সেনগুপ্তা
তাড়া নেই,
কোনো তাড়া নেই,
অনন্তকাল বসে থাকতে পারি
পশ্চিমের মেঘ ছুঁয়ে
জীবন আমার কাছে
চিবুকের দৃঢ়তা
এবং
নিঃশব্দময় ভয়াবহ এক দাবানল...
এক্স সেলসম্যান
ঋজু রেজওয়ান
যন্ত্রণার ডাস্টবিন থেকে... তুলে আনি প্রশান্ত বাড়ির
শান্ত স্নিগ্ধ সুখ!
একই রেখায় চললেও সে, চলছে... নিক্তিতে নিক্তিতে
বিপরীত লুপ;
কেউ কারও অধীনও নয়, সমান্তরাল দেখায়, দুটি—
লাশকাটা স্যুপ!
যন্ত্রণা ও সুখ— বিপ্রতীপ,গরলরেখায় মস্তিষ্কের
অভিন্ন ময়ূখ।
হুড়ুমভাজায় বাজিতেছ... সাদা সাদা নক্ষত্র বিমুখ—
মৃত্যুর দরজা!
যখন গড়িয়ে.. পড়ে যায়, অমনি ফুটে ওঠে নীল ও সায়ানের বেগুনি তরজা।
কর্টিসল অস্থি থেকে... খুলি, খোলা ডোপামিনের অন্তর;
মেলে দেখি... দাঁড়িপাল্লা!
সুখ যতটা, ততই দুঃখ— প্রকৃতির এ বিধান করে...!
কোন শালা মাল্লা?
মেঘে ঢাকা সমস্ত শরীরে... দৃষ্টি যতটুকু, ততটুকু—
অদৃশ্য কার্বন।
তবুও ব্ল্যাক হোলের মত দুটি— চোখে থমকে দাঁড়ায়,
বিস্মৃতি-পার্বণ।
হেড! নাকি— টেল? আগত্যাই, ক্ষয়ে যাওয়া জুয়ার আসর!
এমনই কয়েন;
সেখানেই..বাজি মেরে দাও, নিয়তি ও ম্যাজিকে... তুমিও—
এক্স সেলসম্যান।
যম দুয়ার
চামেলী বসু
পথের সম্মোহন ভুলে দাঁড়াবো এসে তোমার দুয়ারে—
হয়তো সে দরজায় শিকল তুলে ঝুলে রবে কালের ঘড়ি!
বকুলের মতো টুপ করে ঝরে গেলে সময়
জ্বেলে দিও আলো—
আঁধারের প্রলোভনে ক্ষয়ও তো হতে পারে দিনের লিখন!
তুমি ঘর ভালোবাসো, শিকলও?
তবে রেখে যাবো দিকভ্রান্ত পা—
ক্ষয়িত পলেস্তারা যেভাবে আঁকড়ে বাঁচে বাস্তুভিটে
আমিও তোমাকে—
তোমার ব্যবহৃত জীর্ণ জীবন থেকে খসে পড়া বিচ্ছেদ নিয়ে হন্যে হবো।
বাতাস বাহিত কবিতা
হাসনাত মোবারক
জলবৃক্ষ বর্ষা; কে জানে
চকিতে পরস্পরবিরোধী মেঘ ও
চাপান-উতর জের— টানটান
সম্পর্কে আমরা খুব বৃষ্টি নিরপেক্ষ।
জলের ধোঁয়া; মদিরার লাল ছন্দস্রোত—
ঢুকে পড়ছে হাওয়ায়, উড়ছে কুশীলবের
ঠিকুজি, ফলকথার ছেঁড়া স্বর,
লোকে যাকে বলে ক্রমাগত ঢেউ।
অহম
শাহান সাহাবুদ্দিন
তোমার অহম জারি থাকুক আমার আকাশে।
আমি অলি-গলি হাঁটা লোক
ভাঙা বেঞ্চিতে বসে টঙ দোকানের চা খাওয়া ভাবুক;
আমারও আছে অহম আমার মতো করে—
আমার অহমও জারি থাকুক আমার আকাশে।
তোমার অহম তোমার মতোই সুন্দর
এমন সুন্দরের গান লেখা হবে সভ্যতার
চাদরে—
চাদরের দাম কী খুব বেশি?
দাম-দর যাই থাক্, তোমার অহমের দাম
গানে গানে জারি রাখবে বেবাক লোক!
তোমার অহম কেনা সম্ভব, কবিতা বা শিল্পকলার দৌলতে?
আজ রাতে সে কবিতাও লেখা হবে, লেখা হবে গান;
শিল্পকলার আঙিনায় এসো, তোমার অহমের পাশাপাশি
তোমাকেও দেখবে সংবেদী-লোক!
তোমার অহম জারি থাকুক আমার আকাশে
আমার অহম জারি থাকুক সভ্যতার বাতাসে
অহমে অহমে লেখা হবে যে কবিতা বা গান
বেবাক লোকের কলবে তা জারি থাকুক!
বুভুক্ষু নোনা জল
কুমারেশ বিশ্বাস
এখানে সূর্য ওঠে সবুজ বনের ফাঁকে
বাতায়নে উঁকি দেয় রুপালি চাঁদ
আষাঢ়ের বরষায় দিগন্তে রংধনু হাসে।
মায়াময় ধরণীর একি বিচিত্র রূপ
কল্পনার রঙিন নিশান উড়ে উড়ে
মিশে যায় বাস্তবতার সমীকরণে।
প্রিয়ার ভালোবাসায় খুঁজে ফিরি যৌবনের ঘ্রাণ!
অবশেষে সবুজ ঘাসের ডগায়
শিশির বিন্দুর মতো ভালোবাসা আসে।
সে কি ভালোবাসে? জানি না— তাতে কী যায় আসে
তবুও হৃদয়ের ক্যানভাসে তাঁর ছবি ভাসে!
হে স্বপ্নের পুণ্যভূমি— তুমি কি দেখেছো তাঁকে
হৃদয়ের মাঝে রঙ তুলি দিয়ে এঁকেছি যাকে?
জান না! সীমাহীন কাল ধরে এই পথে হেঁটেছে যেজন
তাঁকে রাখোনি মনে! বা কী প্রতিদান!
নিয়তির খেয়াঘাটে ডুবেছে তরী কে বাঁচায় তাঁরে
মাঝি সব ছেড়েছে হাল— একি বেসামাল
ঢেউয়ে ঢেউয়ে মিশে যায় বুভুক্ষু নোনা জল!
সাম্পান
মামুন অপু
চোখের নদীতে ভেসে যায় তোমার সাম্পান
ছাউনি-ঘরে আশাগুলো জড়িয়ে আছে সুখের দিনগুলোর সঙ্গে।
ভয়ার্ত, করুণ চাহনি—
বহুদিন রোদ দেখেনি।
বেদনার বাতাস তাড়িয়ে নিয়ে যায় লোনা সাগরে।
ঢেউগুলো বারবার পা জড়ায় বোবা অনুরোধে—
যেও না
তোমার সাম্পান বড্ড বেসামাল; উন্মত্ত—
দড়ি-ছেঁড়া ষাঁড়ের মতো ঘাড় তেড়ে ছুটছে।
মেঘ ছুটে এলো; বিজলি হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
জলগুলো হাউমাউ করে কাঁদছে যেন অনাথ কিশোর।
সোনালি পাখিগুলো উড়ে নীলাকাশে।
সেথায় কতবার চিঠি পাঠিয়েছি প্রেমের হাতে;
সে পৌঁঁছাতে পারেনি; অভুক্ত, নিষ্প্রাণ দেহ—
মৌনতার সাদা পৃষ্ঠায় ভেজা হরফে লেখা।
“কতদিন দেখি না
ডানার গল্প
শামীম রফিক
ডানা ছিল মনে
মন কি পারে না উড়াতে
উড়বার কত ছিল আকাশ
শত শত আকাশ
ঝকমকে চোখে আকাশ দেখেছি,
ডানা মেলেছি হাওয়ায়।
এখন হাওয়া আছে, ডানা নেই?
কীভাবে হারালো ডানা
ধীরে ধীরে উড়বার মন
অনেক গল্প জমেছে মনে
অনেক গল্প জমেছে বাধ্যতায়
ডানা হারাবার গল্প নীরবে কাঁদায়।
গল্পগুলো হাওয়ার মতো
এদিকে ওদিকে ছড়ায় আপনে আর হাওয়ায়
বাড়ে গল্পের ডালপালা
বাড়ে হৃদয়ের দুরত্ব, হৃদয় থেকে
ধীরে মরে আসে সত্যের আগুন
বহুকথা বাধ্যগত চুপচাপ
গন্ধ শোনায় না প্রকৃত ফাগুনের।
শুধু উড়বারই তো শখ ছিল
উড়বার জন্য শক্ত করেছিলাম মগজ
উড়বার গল্পে যত ছিল ক্লিভেজ
ডানা ভাঙার গল্পে সবই অন্ধকার
আমার শুধু ডানা চাই
উড়বার গল্প নিয়ে আর আসবো না এই অবেলায়।

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
বিচলিত বিব্রতও
হাসান হাফিজ
কফি তো কালোই হয়
চিনির মিশ্রণ যদি
এড়ানো সম্ভব হয়
তাহলে তো ভালো হয়!
এতো ভালো
এতো সুখ
সইবে কপালে?
পুড়েছে কপাল যার
সঙ্গী সাথী নাই তার,
শর্করার নিঝুম ছোবল
দুঃখ দাগা দেয় তারে
দুঃখের বয়ান গাথা
মন খুলে কই কারে?
কেউ নাই কিচ্ছু নাই
যাবো তবে কোন্ ঠাঁই?
জাদুবাস্তবতা
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
একদিকে বোধে বা আংশিক অবাস্তবে মিশ্রিত স্বপ্ন
অন্যদিকে তুমিও আংশিক অলৌকিক
কানামাছি ভোঁ ভোঁ, আমি বিভ্রান্ত। কাকে ছুঁবো!
তোমাকে দেখছি, অথচ দেখছি না
তোমাকে পাচ্ছি, অথচ পাচ্ছি না—
তোমার অনুভূতি ছুঁই, অথচ নিশ্চিত নই!
দৃশ্যের ভেতরে অদৃশ্য এবং সত্যের ভেতরে মিথ্যে
আয়নার ভেতরে আমি
গোপনের অন্তরে, অন্তরালে তুমি অন্তঃপুরবাসিনী—
যেন টিভিতে মাছের জলকেলি
আর বাইরে দর্শক বিড়ালের অস্থিরতা!
তুমি নারী অধিক অসূর্যস্পর্শী নারী বা পরী
আমাদের সম্পর্ক প্রযুক্তিপ্রেমে
আমি পুরুষের অধিক প্রেমিক।
তুমি জাদুবাস্তবতায় জন্ম নেয়া অ্যালগরিদম ভাষা,
আমি তাকে প্রেম বলে ডেকেছি।
চ্যাটজিপিটি, এআই কি তোমার দূরসম্পর্কীয় পিতা?
অনিষ্ট
মঈনউদ্দিন মুনশী
আগুন দৌড়াতে লাগলো আতঙ্কগ্রস্তভাবে
এর ভস্ম থেকে।
রক্তিম আভার মধ্যে এর প্রতিবিম্ব
চলচ্চিত্রের ঘূর্ণমান ছায়ার মতো পালিয়ে গেলো
মানুষের মাংস এবং রক্ত থেকে।
আঘাতের চোখে ক্ষত চিহ্ন দৃষ্টিগোচর হলো
বহু বছর পর।
রক্ত-বর্ণের ক্ষণিক চমক
ক্ষয়ে যায় নিষ্ঠুর ভাবে!
কিন্তু ঐ প্রক্রিয়ার কোন অবকাশ নেই
থেমে যাবার,
যেন রেলগাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে
এর ভগ্নাবশেষ!
আঘাটে বরষা
হাসান কল্লোল
বরষা ঘন হলে সকালের চায়ে আর
মিশাই না দুধ! গাঢ় একাকীত্ব তার ছাতার নিচে
আমাকে লুকিয়ে রেখে
ভেজা চুল, ভেজা বুক-পিঠ মুছিয়ে বলে:
হাওড়ে আসে না এমনকালে
ষাটের বালক! কিছুটা তো অভিজ্ঞ হয়েছ নিশ্চয়ই;
যদিও চুলগুলো খুব একটা বুদ্ধিতে পাকে নি!
চালাকি তেমন জানি না তবুও বুদ্ধিহীন হয়ে এতটা বরষা
অল্প অল্প ভিজে এসেছি পুবাল মেঘের সাথে সখ্যতায়—
দূরের এই বিরান ঘাটে!
আঘাটের পচা মাছের রক্ত আর গলিত ঘ্রাণে
আজও কদম ফোটে কিশোরীর স্বপ্ন-ধোয়া হাতে!
মাছেদের স্কুলে এই তুমুল বৃষ্টিতে
আনন্দে থাকার কোনো ক্লাসে কী শেখায়
বুড়ো মৎস্য অবতার,
বরষায় তার সাথে আমাদের
দেখা হওয়া খুব দরকার!
প্রেমহীন অবয়ব
নাহার ফরিদ খান
শীতার্ত নগরীতে বরফের প্রান্তর
“তুমিও কি হয়ে গেছ বরফের মতো
নিষ্প্রাণ সৌন্দর্য” ইথারে ভেসেছিল
কণ্ঠ তোমার। আসলেই কি ম্রিয়মাণ!
হয়ে কি আছি শুধু ছায়া! শুধু কি
প্রতিবিম্ব! ধিকিধিকি প্রাণ চলছে
এখনো। প্রাণসঞ্চার ম্রিয়মাণ।
কিছুতেই পারি না সময়কে ধরে রাখতে
নিজের মতো করে, সময় দীর্ঘ হয়
সাজাতে পারি না নিজস্ব ক্যানভাসে।
বয়স বেড়ে যাওয়া মননে চেতনার
শব্দাবলি প্রায়সই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়
হৃদয়ের সাথে কবিতার সখ্যতা শুধু
এটুকুই একান্ত আমার, একান্ত আপন
বলয়। বিমূর্ত পৃথিবীর অপার সৌন্দর্যের
মাঝে একাকী দাঁড়িয়ে পত্রশূন্য বৃক্ষসম
আত্মার গভীরে প্রোথিত চেতনায় দেখি
প্রেমহীন অবয়ব। অবাক জীবনবোধ।
গোধূলির গান
সোহরাব পাশা
মৃতেরাই বেশি কথা বলে
জীবিতদের নীরব মঞ্চে,
ফুলগুলি মেঘে ঢাকা
কালো ব্যাজপরা রুগ্ণদিন
প্রতিবন্ধী চোখ;
অর্ধেক রাত্রি নিয়ে ঘরে ফিরছে নিঃস্ব
বিমর্ষ যুবক। স্বপ্নগুলি তার প্রাচীন পাথর
ভুলে গেছে হৃৎপিণ্ডের গান,
তৃতীয় মুদ্রণ করে রাত্রির দুপুর
হাঁটতে হাঁটতে শূন্যতার কাছাকাছি
পুরনো অন্ধকারে হঠাৎ পৌঁছে গেছি
তোমার পথে আলোর পাতা
পড়েনি এখনো;
আরো কয়েক পা এগুলে নির্জন সমুদ্র
পেছন ফেরার পথ জুড়ে কাঁটাতার,
তোমার জন্য দাঁড়িয়ে আছি ভোরের
অপেক্ষায়
সুকান্ত, আবার হাঁকো—
মনজুর শামস
(কবি সুকান্তের জন্মশতবর্ষে বিপ্লবী অভিবাদন জানিয়ে)
চিরকিশোর কবির আহ্বানের পর শতবর্ষ তো পেরিয়ে গেল প্রায়!
না, এখনো আসেনি ফিরে মহামানব এই গ্রাম নগরের ভিড়ে,
এখানে মৃত্যু এখনো হানা দেয় বারবার, লোকচক্ষুর আড়ালে নয়
বরং দিনের আলোতেও নেমে আসে সর্বনাশের চাপানো অন্ধকার
শুধু মৃত্যু নয়; এই আকাশ, দিগন্ত, মাঠ স্বপ্নে সবুজ মাটি
হয়ে ওঠে আজ ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের ঘাঁটি
হে কিশোর কবি, তুমিই বরং ফিরে আসো আরেকবার
চতুর্মুখি আঘাতে ম্রিয়মাণ আঠারো-বছরিদের উজ্জীবিত করে
করো সেই দৃঢ় উচ্চারণ— ‘বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগে, সুতীক্ষ্ম করো চিত্ত,
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।’
দ্বৈরথ
আসিফ নূর
তুমি সারাদিন থাকো শান্তশিষ্ট,
রাত নামলেই হয়ে যাও পাগলা কুকুর;
আমি দিনভর জ্বলি উলটা-পালটা—
সন্ধ্যার পর থেকেই শব্দহীন শীতল পুকুর।
দুই বিপরীতে হঠাৎ দেখাদেখি—
গাঢ় পরিচয় শেষে জমলো গূঢ় পরিণয়,
আমাদের দ্বন্দ্ব-সংঘাত লাগাতার;
কেননা দুজনার কেউই জানি না অভিনয়।
ভাসাও আকাশে
আহমদ জামাল জাফরী
অদৃশ্য ধুলোর মতো ছুঁয়ে থাকে স্তব্ধ বিষণ্নতা,
অন্ধকারের জানালা দিয়ে আকাশের সীমানার ভেতর
বিষণ্ন ঘুড়ির মতো আবছায়া মেঘ উড়ে যায়,
দূর দিগন্তে ঝুঁকে থাকা মলিন মেঘে ধূসর বিভ্রম।
পোড়ো বাড়ির নির্জনতা সঙ্গীহীন
মলিন ঘাসের মতো এই উচ্ছিষ্ট জীবন;
শঙ্খচুড় রেশমের ডানার মতো হাওয়া খুলে খুলে যায়
ব্রহ্মপুত্রের নীল ধোঁয়ার মতো বৃষ্টি নামে
জলপাই রঙের গ্রামগুলি ভিজে মাটির গন্ধে মাতাল,
এইখানে রাত্রির পুরোনো মানচিত্র অন্য এক মহাদেশ!
ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে মায়ার পৃথিবী
স্বপ্নের মতো এই অচেনা মৌতাত!
বেভুল সুরে বাজে কোন সমাপনী গান?
বাতাসের গা ছুঁয়ে ঝরে পড়ে অন্ধকার
আহত পখির উড়াল ডানায়
লেখা থাকে সূর্যাস্তের রঙ!
ভুলে যাওয়া স্বপ্নের মতো স্মৃতি-বিস্মৃতি
সমস্ত সীমানা ছেড়ে ভাসাও আকাশে!
অনিবার্য সুখ
মুশাররাত
আমাদের যে কোনো মূল্যে ভালো থাকতে হবে
দূর্নীতিমুক্ত দপ্তরের কেরানীর সুকঠিন সততার মতো
যে কোন মূল্যে সুন্দর থাকতে হবে আমাদের
বৃষ্টি ধোঁয়া কাঠগোলাপের মতো
রাজপথ উত্তপ্ত করে রাখা বিপ্লবীর স্লোগানের
মতো মুখর হয়ে জীবনের প্রাপ্যটুকু
আদায় করে নিতে হবে
মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মতো
শক্তি অর্জন করে তাকে হারানো
দরকার নির্লজ্জের মতো
হায়াতের কাছে বেঁধে দেয়া সময়টুকুর
যাঁতাকলে পিষ্ট হতে দেখে
ভিলেনের মতো অট্টহাসিতে তাকে
উল্লাসে নৃত্যরত মূর্তির রূপে দেখতে চাই না আর
আমাদের দুঃখগুলো সেজে থাকুক
অনিবার্য সুখের মতো
আমাদের অশ্রুকনাগুলো মুক্তো হয়ে
ঝরে পড়ুক প্রতিবন্ধী সময়ের বাঁকে বাঁকে
আমাদের মৃত্যু হোক উচ্ছ্বসিত জীবনের দর্শন
সীমাহীন আনন্দে ভাসতে ভাসতে জলযন্ত্রে
রাঙিয়ে দিয়ে আযরাইলের আকাশ।
দেশের বাড়ি
আফরোজা সোমা
একদিন ফিরবে বলে
প্রাণভরা আশা নিয়ে
বেঁচে থাকে অভিবাসী।
হয়তো জানে না তারা,
ফেরা একটা মিথ,
একবার গেলে আর
হয় না ফেরা
চিরচেনা দেশের বাড়ি।
তবু তাদের বুকের পরে
কী রঙিন সরিষা ফুল
ফুটে থাকে ভরা মৌসুমে!
আমার তো নাই ভিটা, নাই ঘর,
দেশের বাড়ি বলতে শুধু তুমি।
যেভাবে করাল পদ্মা ভাঙে পাড়,
মুছে দেয় বাড়ি ও গ্রামের ঠিকানা,
সেভাবে চিরতরে গিয়েছো তুমি,
মুছে দিয়ে ভূচিত্র সকল।
ফিরতে হলে ঠিকানা লাগে,
ফিরবো বলো, কোথায় তোমার বুক!
অসন্দিগ্ধ
শেলী সেনগুপ্তা
তাড়া নেই,
কোনো তাড়া নেই,
অনন্তকাল বসে থাকতে পারি
পশ্চিমের মেঘ ছুঁয়ে
জীবন আমার কাছে
চিবুকের দৃঢ়তা
এবং
নিঃশব্দময় ভয়াবহ এক দাবানল...
এক্স সেলসম্যান
ঋজু রেজওয়ান
যন্ত্রণার ডাস্টবিন থেকে... তুলে আনি প্রশান্ত বাড়ির
শান্ত স্নিগ্ধ সুখ!
একই রেখায় চললেও সে, চলছে... নিক্তিতে নিক্তিতে
বিপরীত লুপ;
কেউ কারও অধীনও নয়, সমান্তরাল দেখায়, দুটি—
লাশকাটা স্যুপ!
যন্ত্রণা ও সুখ— বিপ্রতীপ,গরলরেখায় মস্তিষ্কের
অভিন্ন ময়ূখ।
হুড়ুমভাজায় বাজিতেছ... সাদা সাদা নক্ষত্র বিমুখ—
মৃত্যুর দরজা!
যখন গড়িয়ে.. পড়ে যায়, অমনি ফুটে ওঠে নীল ও সায়ানের বেগুনি তরজা।
কর্টিসল অস্থি থেকে... খুলি, খোলা ডোপামিনের অন্তর;
মেলে দেখি... দাঁড়িপাল্লা!
সুখ যতটা, ততই দুঃখ— প্রকৃতির এ বিধান করে...!
কোন শালা মাল্লা?
মেঘে ঢাকা সমস্ত শরীরে... দৃষ্টি যতটুকু, ততটুকু—
অদৃশ্য কার্বন।
তবুও ব্ল্যাক হোলের মত দুটি— চোখে থমকে দাঁড়ায়,
বিস্মৃতি-পার্বণ।
হেড! নাকি— টেল? আগত্যাই, ক্ষয়ে যাওয়া জুয়ার আসর!
এমনই কয়েন;
সেখানেই..বাজি মেরে দাও, নিয়তি ও ম্যাজিকে... তুমিও—
এক্স সেলসম্যান।
যম দুয়ার
চামেলী বসু
পথের সম্মোহন ভুলে দাঁড়াবো এসে তোমার দুয়ারে—
হয়তো সে দরজায় শিকল তুলে ঝুলে রবে কালের ঘড়ি!
বকুলের মতো টুপ করে ঝরে গেলে সময়
জ্বেলে দিও আলো—
আঁধারের প্রলোভনে ক্ষয়ও তো হতে পারে দিনের লিখন!
তুমি ঘর ভালোবাসো, শিকলও?
তবে রেখে যাবো দিকভ্রান্ত পা—
ক্ষয়িত পলেস্তারা যেভাবে আঁকড়ে বাঁচে বাস্তুভিটে
আমিও তোমাকে—
তোমার ব্যবহৃত জীর্ণ জীবন থেকে খসে পড়া বিচ্ছেদ নিয়ে হন্যে হবো।
বাতাস বাহিত কবিতা
হাসনাত মোবারক
জলবৃক্ষ বর্ষা; কে জানে
চকিতে পরস্পরবিরোধী মেঘ ও
চাপান-উতর জের— টানটান
সম্পর্কে আমরা খুব বৃষ্টি নিরপেক্ষ।
জলের ধোঁয়া; মদিরার লাল ছন্দস্রোত—
ঢুকে পড়ছে হাওয়ায়, উড়ছে কুশীলবের
ঠিকুজি, ফলকথার ছেঁড়া স্বর,
লোকে যাকে বলে ক্রমাগত ঢেউ।
অহম
শাহান সাহাবুদ্দিন
তোমার অহম জারি থাকুক আমার আকাশে।
আমি অলি-গলি হাঁটা লোক
ভাঙা বেঞ্চিতে বসে টঙ দোকানের চা খাওয়া ভাবুক;
আমারও আছে অহম আমার মতো করে—
আমার অহমও জারি থাকুক আমার আকাশে।
তোমার অহম তোমার মতোই সুন্দর
এমন সুন্দরের গান লেখা হবে সভ্যতার
চাদরে—
চাদরের দাম কী খুব বেশি?
দাম-দর যাই থাক্, তোমার অহমের দাম
গানে গানে জারি রাখবে বেবাক লোক!
তোমার অহম কেনা সম্ভব, কবিতা বা শিল্পকলার দৌলতে?
আজ রাতে সে কবিতাও লেখা হবে, লেখা হবে গান;
শিল্পকলার আঙিনায় এসো, তোমার অহমের পাশাপাশি
তোমাকেও দেখবে সংবেদী-লোক!
তোমার অহম জারি থাকুক আমার আকাশে
আমার অহম জারি থাকুক সভ্যতার বাতাসে
অহমে অহমে লেখা হবে যে কবিতা বা গান
বেবাক লোকের কলবে তা জারি থাকুক!
বুভুক্ষু নোনা জল
কুমারেশ বিশ্বাস
এখানে সূর্য ওঠে সবুজ বনের ফাঁকে
বাতায়নে উঁকি দেয় রুপালি চাঁদ
আষাঢ়ের বরষায় দিগন্তে রংধনু হাসে।
মায়াময় ধরণীর একি বিচিত্র রূপ
কল্পনার রঙিন নিশান উড়ে উড়ে
মিশে যায় বাস্তবতার সমীকরণে।
প্রিয়ার ভালোবাসায় খুঁজে ফিরি যৌবনের ঘ্রাণ!
অবশেষে সবুজ ঘাসের ডগায়
শিশির বিন্দুর মতো ভালোবাসা আসে।
সে কি ভালোবাসে? জানি না— তাতে কী যায় আসে
তবুও হৃদয়ের ক্যানভাসে তাঁর ছবি ভাসে!
হে স্বপ্নের পুণ্যভূমি— তুমি কি দেখেছো তাঁকে
হৃদয়ের মাঝে রঙ তুলি দিয়ে এঁকেছি যাকে?
জান না! সীমাহীন কাল ধরে এই পথে হেঁটেছে যেজন
তাঁকে রাখোনি মনে! বা কী প্রতিদান!
নিয়তির খেয়াঘাটে ডুবেছে তরী কে বাঁচায় তাঁরে
মাঝি সব ছেড়েছে হাল— একি বেসামাল
ঢেউয়ে ঢেউয়ে মিশে যায় বুভুক্ষু নোনা জল!
সাম্পান
মামুন অপু
চোখের নদীতে ভেসে যায় তোমার সাম্পান
ছাউনি-ঘরে আশাগুলো জড়িয়ে আছে সুখের দিনগুলোর সঙ্গে।
ভয়ার্ত, করুণ চাহনি—
বহুদিন রোদ দেখেনি।
বেদনার বাতাস তাড়িয়ে নিয়ে যায় লোনা সাগরে।
ঢেউগুলো বারবার পা জড়ায় বোবা অনুরোধে—
যেও না
তোমার সাম্পান বড্ড বেসামাল; উন্মত্ত—
দড়ি-ছেঁড়া ষাঁড়ের মতো ঘাড় তেড়ে ছুটছে।
মেঘ ছুটে এলো; বিজলি হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
জলগুলো হাউমাউ করে কাঁদছে যেন অনাথ কিশোর।
সোনালি পাখিগুলো উড়ে নীলাকাশে।
সেথায় কতবার চিঠি পাঠিয়েছি প্রেমের হাতে;
সে পৌঁঁছাতে পারেনি; অভুক্ত, নিষ্প্রাণ দেহ—
মৌনতার সাদা পৃষ্ঠায় ভেজা হরফে লেখা।
“কতদিন দেখি না
ডানার গল্প
শামীম রফিক
ডানা ছিল মনে
মন কি পারে না উড়াতে
উড়বার কত ছিল আকাশ
শত শত আকাশ
ঝকমকে চোখে আকাশ দেখেছি,
ডানা মেলেছি হাওয়ায়।
এখন হাওয়া আছে, ডানা নেই?
কীভাবে হারালো ডানা
ধীরে ধীরে উড়বার মন
অনেক গল্প জমেছে মনে
অনেক গল্প জমেছে বাধ্যতায়
ডানা হারাবার গল্প নীরবে কাঁদায়।
গল্পগুলো হাওয়ার মতো
এদিকে ওদিকে ছড়ায় আপনে আর হাওয়ায়
বাড়ে গল্পের ডালপালা
বাড়ে হৃদয়ের দুরত্ব, হৃদয় থেকে
ধীরে মরে আসে সত্যের আগুন
বহুকথা বাধ্যগত চুপচাপ
গন্ধ শোনায় না প্রকৃত ফাগুনের।
শুধু উড়বারই তো শখ ছিল
উড়বার জন্য শক্ত করেছিলাম মগজ
উড়বার গল্পে যত ছিল ক্লিভেজ
ডানা ভাঙার গল্পে সবই অন্ধকার
আমার শুধু ডানা চাই
উড়বার গল্প নিয়ে আর আসবো না এই অবেলায়।

আপনার মতামত লিখুন