সংবাদ

ঋষি সঞ্জয় গল্প করেন জ্যোতি ঠাকুরের সঙ্গে

পৌরাণিক তিন নায়িকা বিষয়


সাদ কামালী
সাদ কামালী
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৬ এএম

পৌরাণিক তিন নায়িকা বিষয়
গান্ধারী ও দেবযানী (কল্পিত ছবি)


(পূর্ব প্রকাশের পর)

দেবযানী

সঞ্জয়ের চওড়া কপালে নক্ষত্রের আলো, চোখে আলোর প্রতিবিম্ব। মুহূর্তের জন্য নৈঃশব্দ্য তৈরি হয়। সঞ্জয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, মহাভারতের কাহিনীর আভাসে ‘চিত্রাঙ্গদা’ (১২৯৮) কাব্য নাটকে তাঁর শাশ্বত নারী ভাবনাকে নিজেই কিছু বদল ক’রে নিলেও ১৩০০ সালে লেখা ‘বিদায়-অভিশাপ’ কাব্যনাটকে তাঁর নারী ভাবনার চিরন্তন রূপের ব্যতিক্রম ঘটে না পরবর্তীকালের ওই পাঠ মতো। তবে আমি মনে করি, বিদায় অভিশাপ কাব্যনাটকটি সে সময়ের রবির রচনা থেকে স্বতন্ত্র, এবং দেখবে ওই ধরনের পাঠে প্রায়ই সামাজিক মত যত প্রধান্য পায় কাব্যগুণ ও আঙ্গিকের সৌন্দর্য তত তাদের মন কাড়ে না। স্বাধীন কবি বাধ্য নয় চলতি মত বা উৎসের আখ্যান হুবহু নকল করার। রবীন্দ্রনাথের বিদায়-অভিশাপ নাটকে অভিশাপটি নারীর, শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানীর। যে “মেয়ে সংসার স্থিতির লক্ষ্মী, আবার সংসার ছারখার করবার প্রলঙ্করীও তার মতো কেউ নেই” (পশ্চিম যাত্রীর ডায়ারি)। সেই মেয়ে দেবযানী দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের কাছ থেকে হাজার বছরে শেখা সঞ্জীবনী মন্ত্রকে এক অভিশাপে নিষ্ফল করে দেয়, পুরুষ কচ এই মন্ত্র নিজে কখনো কাজে লাগাতে পারবে না। তবে অন্যকে শেখাতে পারবে।

          “... তোমা ’পরে

এই মোর অভিশাপ— যে বিদ্যার তরে

মোরে কর অবহেলা, সে বিদ্যা তোমার

সম্পূর্ণ হবে না বশ— তুমি শুধু তার

ভারবাহী হয়ে রবে, করিবে না ভোগ;”

এই ভয়াবহ অভিশাপের জবাবে রবীন্দ্রনাথের দেবপুরুষ কচ পাল্টা ক্ষোভ অভিশাপ নয়, উদারতার পরাকাষ্ঠা হয়ে দেন বর, এবং বরই নাটকের অন্তিম চয়ন:    

         “আমি বর দিনু দেবী, তুমি সুখী হবে।

     ভুলে যাবে সর্বগলানি বিপুল গৌরবে।”

সঞ্জয় বলে চলেন, গীতিকবিতা হিসেবে নাটকটি পড়লে বড়ো আনন্দ হয়, কেউ বলতে পারেই, চিত্রাঙ্গদার মতো এই কাব্যে কবির প্রত্যয়-ভাবনা তেমন নেই। রবির নাটকে কেন কচ শুধু বরই দেয়, অভিশাপ নয়! এখানেই রবির বোধ খুঁজতে হবে, তিন তিনবার রাক্ষসের হাত থেকে দেবযানী কচকে উদ্ধার করে। কচের প্রতি তার প্রেম স্নেহ ও অধিকারবোধ প্রবল। তখন প্রায় হঠাৎ কচ বিদায় নিতে চাইলে আবেগ বিগলিত হয়ে বেদযানী নিবেদন করে প্রেম। প্রেমের শক্তিতে কচকে বাঁধতে চায়। কচ নিষ্ঠ ব্রাহ্মণ, স্বর্গের প্রতিশ্রুতি মতে তাকে ফিরে যেতেই হবে। তখন মানবীয় অনুভূতির অভিঘাতে অভিশাপ নয়, বরই মাত্র উচ্চারণ করতে পারে। হৃদয়ে প্রেমের আলোড়নও তার সত্য, বলছে সেই রত্নময় প্রেমানুভূতির কথা।

“আর যাহা আছে তাহা প্রকাশের নয়

সখী। বহে যাহা মর্মমাঝে রঙ্গময়

বাহিরে তা কেমনে দেখাব।”

                               (বিদায় অভিশাপ)

অভিশাপ উচ্চারণ করে কচ নিজের প্রেমকে অপমানিত করতে পারে না। দেবযানীর অভিশাপ আকস্মিক আঘাতের উচ্চারণ। তাছাড়া, মনে রাখতে হবে, ‘বিদায় অভিশাপ’ কোনো মহাকাব্য নয়, মহাকাব্যের নির্মোহ বৈশিষ্ট্য এর প্রয়োজন নেই। বিশাল মহাভারতের ক্ষুদ্র খণ্ড, একটি ঘটনা মাত্র। অন্যদিকে কচের যে গভীরতর উদ্দেশ্য নিয়ে সঞ্জীবনী মন্ত্র শিখতে এসেছিল সেই উদ্দেশ্য ও কর্তব্যের প্রতি অবিচল আস্থা তার চরিত্রের গৌরব; ব্যক্তিগত আবেগ অনূভূতির বশ্যতায় অঙ্গীকার রক্ষার দায় উপেক্ষা করতে পারে না। মহাভারতে কচও অভিশাপ বর্ষণ করে, কারণ ওই গল্পের আরও বহু সম্প্রসারিত রূপ আছে। মহাভারতে কচের অভিশাপে ব্রাহ্মণ পুত্র নয়, যদু বংশে দেবযানীর বিয়ে হয়, সেই বংশেই পরে জন্ম নেন শ্রীকৃষ্ণ। ব্যাসদেব কচকে দিয়ে অভিশাপের পিছনে এই উদ্দেশ্যও জড়িয়ে ছিল হয়তো।

জ্যোতি মুগ্ধ হন, বাহ্ পণ্ডিতবর, আপনি ধৃতরাষ্ট্রের ভাষ্যকার ছিলেন, অবলীলায় আপনি ব্যাসদেব ও রবির যৌক্তিক ভাষ্যকার হয়ে উঠলেন, আজকালের অভিজ্ঞ সাহিত্য-আলোচকদের মতো।

সঞ্জয়ের ঠোঁট ঘিরে হাসি, প্রশংসায় তারও পুলক হয় বৈকি। সঞ্জয় বলেন, রবি জীবনে মেয়েদের নিয়ে অনেক লিখেছেন, এবং তা কলিকালের পাঠক ভাবুকদের হাতে অন্য যে কোনো বিষয়ের তুলনায় এই নারী ভাবনা নিয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছেন। এমনকি ঘোর কলিকালে পূর্বদেশের একজন অধ্যাপক রবিকে ‘নারীর শত্রু’ বলে সারগর্ভ প্রবন্ধ লিখেছে। তবে এসব কিছু নয়, কালের কষ্টি পাথরে কবি যাচাই হয়ে গেছে। আর কোনো কবিকে এমন করে নয় যেভাবে ওই ঘোর কলির মানুষই রবিকে ভক্তির সঙ্গে চর্চা করে। দিনে দিনে রবির সব লেখা পড়া হবে, ওর ঔজ্জ্বল্য বাড়বে। তুমি নিশ্চয় ওর হিন্দুবিবাহ প্রবন্ধটি পড়বে। কী বিতর্ক, রবিকে গোড়া হিন্দুরা খুব করে সমালোচনা করল। কেন? সময়ের অগ্রবর্তী ভাবনার ভয়ে ধর্মবন্দি মানুষগুলো অস্বস্তিতে পড়েছে বলেই তো। রবির নিজের জীবনের কিছু স্ববিরোধিতার কথাও ওঠে।

জ্যোতি সঞ্জয়কে থামিয়ে বলেন, বিতর্ক হয়তো আরও বেধে ছিল ওই রবির কিছু বক্তব্যের সঙ্গে নিজের জীবনের সঙ্গতিহীনতার জন্য। স্ববিরোধিতার কথা ওরা জোর গলায় বলেছে নিশ্চয়।

শোনো জ্যোতি, স্ববিরোধী বৈশিষ্ট্য একটি মানবীয় বৈশিষ্ট্য, ইতর প্রাণির ভিতর হয়তো স্ববিরোধিতা নেই। সময়ের বিভিন্ন অভিঘাতের সঙ্গে মানুষকে সমঝোতা করতে হয়, মানুষই দ্বান্দ্বিক জীব, আর কেউ নয়, স্বর্গের দেবতারাও নয়। সে কারণে এর থেকে মানুষ মাত্র এড়াতে পারে না। সমালোচকদের মধ্যে প্রধান সেই চন্দ্রনাথ বসু কি স্ববিরোধী নন, তিনি রবির কবিতার ভূয়সি প্রশংসা করে তার গদ্য ভাবনার তীব্র নিন্দা করতে বসল। রবির কাব্যেও তো যুক্তি ও নতুন কালের বাণী আছে। তোমাকে আর একটা কথা বলি, কালে কালে রবীন্দ্রনাথের অনেক নিন্দা হয়, আবার গুণগ্রাহী ভক্তরা ওই নারী ভাবনার প্রচুর প্রশংসা করছে। অথচ দুই পক্ষের কাউকেই দেখিনি হিন্দুবিবাহ থেকে রবির মতকে দলিল হিসেবে সামনে আনছে। এই প্রবন্ধে রবি ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির বা মনুর তীব্র সমালোচনা করছেন নারী নিন্দা করার জন্য, আবার বিজ্ঞান, সময়ের দাবি ও কল্যাণ চিন্তা থেকে বিবাহ বিশেষ করে নারীদের বিবাহ নিয়ে অত্যন্ত বিজ্ঞাননির্ভর যুক্তি দিয়েছেন, বৈজ্ঞানিকের মতকে নিজের পক্ষের যুক্তির সঙ্গে যুক্ত করেই সব বলছেন।

জ্যোতি আবার কথা বলেন, কিন্তু পণ্ডিতবর অন্যের জন্য এক ব্যবস্থা নিজের জন্য আর একরকম হলে কথা বলতেই পারে। সঞ্জয়ের কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা, জ্যোতি তুমি বিয়ে করেছিলে নয় বছরের বালিকাকে, শোনো লেখক তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ফেরি করে চলে না, সবার জন্য পরের কালের জন্য তার রচনারাজিই থাকে। লেখকের রচনাই কথা বলে, ঘরের একান্ত জীবন নয়। লেখক রচনা প্রকাশ করেন সবার জন্য, জীবনটা শুধু তার নিজের, ব্যক্তিগত। যাইহোক, সেটা খুব কথা নয়, রবি প্রচুর লেখাতেই নারীর জীবন নিয়ে যে ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে তা কালে মনে করি যুক্তির সঙ্গেই সমালোচিত হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু জীবনটা তো কালো সাদা নয়, তার অনেক রকম বৈচিত্র্য ও মাত্রা আছে। তাই নিন্দা বচনের মধ্যেও প্রাপ্য প্রশংসাটুকু করতে হবে। সেই সময় ওর মতো ব্যক্তি খুব ঝুঁকি নিয়েই মহাভারত ও মনুর সমালোচনা করেছেন। রবির সব কথাই পাঠ ও মুদ্রণ হয়ে যায়, আলোড়িত করে। তোমাকে হিন্দুবিবাহ থেকে রবির কথাই বলছি, ‘মনুসংহিতায় স্ত্রীনিন্দাবাচক যে-সকল শ্লোক আছে তাহা উদ্ধৃত করিতে লজ্জা ও কষ্ট বোধ হয়। যাঁহারা জানিতে চাহেন তাঁহারা মনুসংহিতার নবম অধ্যায়ে চতুর্দশ পঞ্চদশ ও ষোড়শ শ্লোক পাঠ করিবেন...


সঞ্জয়ের কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা, রবির প্রতি আবেগ। জ্যোতি চুপ করে থাকেন, না হলে বলতেন, হিন্দুবিবাহ, বা আরও দু-একটি রচনা ব্যতিক্রম হিসেবেই অন্যরা দেখেন হয়তো, প্রবন্ধ গল্প কবিতায় সবিস্তারে যে নারী— তার সমালোচনা রবিকে হয়তো সইতে হবে, তবে কবি শিল্পী রবি অপ্রতিরোধ্য।


গান্ধারী

সঞ্জয় মহাভারতের গান্ধারীর প্রসঙ্গ তুলে বলেন, গান্ধারী মহাভারতের এমন একজন, যার মধ্য দিয়ে এই মহাকাব্যই পূর্ণ হয়, মহাকাব্যিক বৈশিষ্ট্যের সফলতা আসে। গান্ধারীর ব্যক্তিত্বের দ্বান্দ্বিকতা, এবং চরিত্রের পূর্ণ বিকাশ কাব্যটিকে ভিন্নমাত্রা দেয়। লক্ষ্য কর অন্ধ স্বামীর প্রতি তাঁর প্রেম ও ভক্তি অপার, নিজের দুই চোখ বেঁধে রাখেন নিজের দৃষ্টিশক্তি দিয়ে স্বামীর দৃষ্টি অক্ষমতাকে ছোট করতে চান না। ব্যাসদেবের বরে দিব্যসৃষ্টি অর্জন করেন।

গান্ধার দেশের রাজা সুবলের সুন্দরী শিক্ষিত কন্যা গান্ধারী যুদ্ধ, রাজনীতি, সন্তানদের বিষয়ে স্বামী ধৃতরাষ্ট্রের মুখ্য উপদেশক। একদিকে পুত্র দুর্যোধন, দুঃশাসন, দুঃসহ প্রমুখের অন্যায় আচরণের জন্য ক্ষমাহীন, পুত্রদের পক্ষে আশীর্বাদ করতেও অপারগ, অন্যদিকে পুত্রদের প্রতি স্নেহে কাতরতা। পুত্রদের প্রতি ধৃতরাষ্ট্রের অক্ষমতার জন্য গান্ধারী ধৃতরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করছেন, পুত্র দুর্যোধনকে বর্জনের জন্য স্বামীর প্রতি আবেদন করছেন, অন্যদিকে স্বামীর প্রতি আনুগত্যের শেষ নেই। আবার দেখো অন্যায় যুদ্ধে ও পাণ্ডবদের প্রতি অন্যায় আচরণের জন্য গান্ধারী দুর্যোধনের ওপর ক্ষুদ্ধ, অন্যদিকে পাণ্ডবদের হাতে দুর্যোধনসহ তার শত পুত্র নিহত হওয়ার জন্য কান্নায় বিলাপ করছেন, এমনকি যুধিষ্ঠিরকে অভিশাপ দিতেও কুণ্ঠিত হন না। মহাকাব্যের মহা দ্বন্দ্বিকতা মুখ্যত গান্ধারীর ভিতর দিয়েই সফল হয়ে ফুটে ওঠে। আর রবি ‘গান্ধারীর আবেদন’ (১৩০৪) কাহিনী কাব্যে এই মহিয়সী নারীর পূর্ণ রূপটিকে অল্প পরিসরে কী অসাধারণ নির্মাণ করে ফেলেন। ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি বিশেষ আবেদন পুত্রকে বর্জন কর, নাথ-এর কাছে অনুনয়, ‘ত্যাগ করো এইবার।’ ধৃতরাষ্ট্র যেন বুঝতে পারেন না, সহসা পুত্রকেই ত্যাগ করতে বলছে গান্ধারী!

ধৃতরাষ্ট্র : কারে হে মহিষী

গান্ধারী : পাপের সংঘর্ষে যার / পড়িছে ভীষণ শাপ ধর্মের কৃপাণে সেই মূঢ়ে।

পুত্র দুর্যোধনকে ত্যাগ করার আবেদনে ধৃতরাষ্ট্র যেন অবাক হয়।

ধৃতরাষ্ট্র : দারুণ প্রার্থনা, হে গান্ধারী রাজ মাতা!

গান্ধারী তার আবেদনের পক্ষে স্বর্গবাসী কুরুকুল পিতৃপিতামহের কথা জানায়। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র পুত্রের অন্যায় আচরণের কথা যেনেও যেমন পুত্রের পক্ষেই অবলম্বন করে এসেছে, এখনো পুত্রের পক্ষে ধর্মের দোহায় দিয়ে বলে,

ধৃতরাষ্ট্র : ধর্ম তারে করিবে শাসন

ধর্মরে যে লঙ্ঘন করেছে— আমি পিতা।

মাতা গান্ধারী বিগলিত কণ্ঠে জানায়,

গান্ধারী : মাতা আমি নহি? গর্ভভারজর্জরিতা

জাগ্রত হৃৎপিণ্ডতলে বহি নাই তারে?

স্নেহ বিগলিত চিত্ত শুভ্র দুগ্ধধারে

উচ্ছ্বসিয়া উঠে নাই দুই স্তন বাহি

...   ...   ...

           দুই ক্ষুদ্র বাহুবৃন্ত দিয়ে— লয়ে টানি

মোর হাসি হতে হাসি, বাণী হতে বাণী,

প্রাণ হতে প্রাণ, তবু কহি, মহারাজ,

সেই পুত্র দুর্যোধনে ত্যাগ করো আজ।

গান্ধারীর আবেদন আরও জোরালো হয়ে ওঠে, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রত্যাগ অসম্মতি ঘোচে না, গান্ধারীর গলায় আবেগ, পুত্রস্নেহ সত্ত্বেও ন্যায়ের জন্য পুত্রত্যাগে নিবেদন করে যেতে থাকে—

গান্ধারী :...মহারাজ, শুন মহারাজ,

এ মিনতি। দূর কর জননীর লাজ,

বীরধর্ম করহ উদ্ধার, পদাহত

সতীত্বের ঘুচাও ক্রন্দন; অবনত

ন্যায়ধর্মে করহ সম্মান— ত্যাগ করো

দুর্যোধনে।

পণ্ডিতবর সঞ্জয় অনর্গল বলে চলেন, জ্যোতি চোখে বিস্ময় ও আলো ফুটিয়ে শুনে যায়— দুর্যোধনও এই রবির কাব্যে অল্প কিছু চরণে নিজের চাপা ক্ষোভ অভিমান প্রকাশ করে যেমন, তেমন, এই অন্যায় যুদ্ধে সে নিজের পক্ষে যুক্তি দেওয়ারও সুযোগ করে নেয়, রবির ভাষা ও কাব্য এখানে দারুণ- পুরাণ থেকে বের হয়ে যুক্তির প্রয়াস পায়। দুর্যোধন পিতা ধৃতরাষ্ট্রকে নিজের মনের কথা বলে,

দুর্যোধন : সুখ চাহি নাই, মহারাজ।

জয়, জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ।

ক্ষুদ্র সুখে ভরে নাকো ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধা

কুরুপতি দীপ্তজ্বালা অগ্নিঢালা সুধা

জয়রস, ঈর্ষাসিন্ধু মন্থন সঞ্জাত,

সদ্য করিয়াছি পান : সুখী নহি তাত,

অদ্য আমি জয়ী। পিতঃ, সুখে ছিনু যবে

একত্রে আছিনু বদ্ধ পাণ্ডবে কৌরবে,

কলঙ্ক যেমন থাকে শশাঙ্কের বুকে

কর্মহীন গর্বহীন দীপ্তিহীন সুখে।

...   ...   ...

           সুখে ছিনু, পাণ্ডবেরা জয়দৃপ্ত ক’রে

ধরিত্রী দোহন করি ভ্রাতৃপ্রীতিভরে

দিত অংশ তায়— নিত্য নব ভোগসুখে

...   ... ...

সুখে ছিনু পাণ্ডবের জয়ধ্বনি যবে

হানিত কৌরবকর্ণ প্রতিধ্বনি রবে।

পাণ্ডবের গৌরব তলে স্নিগ্ধশান্ত রূপে

হেমন্তের ভেক যথা জড়ত্বের কূপে।

দুর্যোধনের চমকে যাওয়ার মতো অসাধারণ চরণ পড়, মহাভারতের নয় রবির—

           ‘ক্ষুদ্র নহে ঈর্ষা সুমহতী।

           ঈর্ষা বৃহতের ধর্ম।’

এতে রয়েছে প্রচলিত ধারণার বাইরে লুকিয়ে থাকা কঠিন এক সত্য।

সঞ্জয় স্মৃতিতাড়িত, ধৃতরাষ্ট্রের সারথি এবং দূত হয়ে এই দুর্যোধন ও যুধিষ্ঠিরকে কত বুঝিয়েছেন, যুদ্ধ ধ্বংস করবে, সন্ধি সমঝোতা করো। সঞ্জয়ের চোখ আকাশে, আকাশের নক্ষত্ররাজি স্থির, শুধু আলো বিকরণ করে যায়, বলেন, সত্যি জ্যোতি, রবির এই কাব্য পড়ার আগে আমিই কি কখনো দুর্যোধনের আত্মভিমান, কষ্টের কথা এইভাবে ভেবেছি! সবল সক্ষম যোদ্ধা কৌরব অপর আত্মীয়দের শুধু বিজয় ও গৌরব শুনে, তাদের অর্জিত ফলের অংশ ভোগ ক’রে জীবন কাটিয়ে দিবে! কৌরবের শৌর্য বীর্যের এতে সম্মান রক্ষা হয়? ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে অন্যায়ভাবে হলেও রাজ্য দখলের মানসিক চাপ কৌরবের মনে দানা বেঁধেছে এ-কথা কি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ ভেবেছিলেন! রবির ‘গান্ধারীর আবেদন’ পড়ে একদিকে মহিষী নারীর মহাকাব্যতুল্য সম্পূর্ণরূপ, অন্যদিকে পুত্রদের প্রতি  স্নেহে কাতর দুর্বলতা ও দুর্যোধনের মানসিক অবস্থা চোখের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে। শর্তানুযায়ী বারো বৎসর বনবাস এবং এক বৎসর অজ্ঞাতবাসের পর যখন পাণ্ডবেরা নিজেদের রাজ্য ফিরে পেতে বা পুনঃ উদ্ধারের জন্য হস্তিনাপুরে দূত পাঠায়, তখন মা গান্ধারী, এই আমি এমনকি শ্রীকৃষ্ণ মিলে চেষ্টা করেছি দুর্যোধনকে সন্ধির জন্য রাজি করাতে। দুর্যোধন সন্ধির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে। গান্ধারী আশীর্বাদ প্রার্থী দুর্যোধনকে বলে, ‘যতো ধর্ম স্ততো জয়ঃ।’ অর্থাৎ যেখানে ধর্ম সেখানেই জয়। গান্ধারী পুত্রকে আগেই বুঝিয়েছিল ধর্মহীন ঐশর্যপ্রাপ্তির চেষ্টা পরিণামে মৃত্যু আনায়ন করে। রবির কাব্য পড়ে, আমি বোধহয় প্রথম ভাবতে পারি যে, ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর পুত্র হয়েও দুর্যোধন যুদ্ধের জন্য এত মরিয়া হয়ে উঠল কেন? কোনো বোধই কাজ করছে না। একদিকে একদা আত্ম-অবমাননার প্রতিশোধ আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে মামা শকুনিগংদের মন্ত্রণা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সব দায় ও নিষ্ঠুরতার জন্য আমি শুধু দুর্যোধনকে দায়ী করি না। রবির কাব্য দুর্যোধনকে বুঝতে সাহায্য করে মহাভারতের আখ্যান থেকে গান্ধারীর আবেদন কাব্যে আখ্যানের কোনো পরিবর্তন না ঘটালেও রবির কাব্য শক্তি ওই আখ্যানকে বহুস্তরে, মনোজগতে আলো ফেলে, রস-আনন্দের সঙ্গে সঙ্কট অনুধাবনের সুযোগ করে দেয়।

জ্যোতি বলেন, পণ্ডিতবর আপনি কি বিশ্রাম নিবেন, রাত্রির বেশি বাকি নেই। সঞ্জয়ের মুখে হাসি, আমি কি আর মর্তের নশ্বর দেহে তৈরি, কাব্যের সৃষ্টি আমি, স্বর্গবাসী সঞ্জয়ের শরীরে কেন ক্লান্তি আসবে! এই মর্তে আমার অভিলাষের কথা তুমি জানো, তোমাকে এও আমি দেখিয়ে দিব, কেন সহস্র বছরের কবিদের মধ্যে রবির মধ্যে সেই শক্তি আমি দেখেছি যে পারে আমার অভিলাষ পূর্ণ ক’রে একটি নব্য সঞ্জয় পুরাণ সৃষ্টি করতে! প্রকৃত কবি স্বাধীন, প্রয়োজন মতো পুরাণের ভিতর নতুন পৌরাণিক তৈরি করে নিবে; কাব্যগুণ ও শব্দের অশেষ সম্ভাবনাকে নতুন নতুন মাত্রায় রবি সম্ভব করে তুলছে। (সমাপ্ত) 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬


পৌরাণিক তিন নায়িকা বিষয়

প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬

featured Image


(পূর্ব প্রকাশের পর)

দেবযানী

সঞ্জয়ের চওড়া কপালে নক্ষত্রের আলো, চোখে আলোর প্রতিবিম্ব। মুহূর্তের জন্য নৈঃশব্দ্য তৈরি হয়। সঞ্জয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, মহাভারতের কাহিনীর আভাসে ‘চিত্রাঙ্গদা’ (১২৯৮) কাব্য নাটকে তাঁর শাশ্বত নারী ভাবনাকে নিজেই কিছু বদল ক’রে নিলেও ১৩০০ সালে লেখা ‘বিদায়-অভিশাপ’ কাব্যনাটকে তাঁর নারী ভাবনার চিরন্তন রূপের ব্যতিক্রম ঘটে না পরবর্তীকালের ওই পাঠ মতো। তবে আমি মনে করি, বিদায় অভিশাপ কাব্যনাটকটি সে সময়ের রবির রচনা থেকে স্বতন্ত্র, এবং দেখবে ওই ধরনের পাঠে প্রায়ই সামাজিক মত যত প্রধান্য পায় কাব্যগুণ ও আঙ্গিকের সৌন্দর্য তত তাদের মন কাড়ে না। স্বাধীন কবি বাধ্য নয় চলতি মত বা উৎসের আখ্যান হুবহু নকল করার। রবীন্দ্রনাথের বিদায়-অভিশাপ নাটকে অভিশাপটি নারীর, শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানীর। যে “মেয়ে সংসার স্থিতির লক্ষ্মী, আবার সংসার ছারখার করবার প্রলঙ্করীও তার মতো কেউ নেই” (পশ্চিম যাত্রীর ডায়ারি)। সেই মেয়ে দেবযানী দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের কাছ থেকে হাজার বছরে শেখা সঞ্জীবনী মন্ত্রকে এক অভিশাপে নিষ্ফল করে দেয়, পুরুষ কচ এই মন্ত্র নিজে কখনো কাজে লাগাতে পারবে না। তবে অন্যকে শেখাতে পারবে।

          “... তোমা ’পরে

এই মোর অভিশাপ— যে বিদ্যার তরে

মোরে কর অবহেলা, সে বিদ্যা তোমার

সম্পূর্ণ হবে না বশ— তুমি শুধু তার

ভারবাহী হয়ে রবে, করিবে না ভোগ;”

এই ভয়াবহ অভিশাপের জবাবে রবীন্দ্রনাথের দেবপুরুষ কচ পাল্টা ক্ষোভ অভিশাপ নয়, উদারতার পরাকাষ্ঠা হয়ে দেন বর, এবং বরই নাটকের অন্তিম চয়ন:    

         “আমি বর দিনু দেবী, তুমি সুখী হবে।

     ভুলে যাবে সর্বগলানি বিপুল গৌরবে।”

সঞ্জয় বলে চলেন, গীতিকবিতা হিসেবে নাটকটি পড়লে বড়ো আনন্দ হয়, কেউ বলতে পারেই, চিত্রাঙ্গদার মতো এই কাব্যে কবির প্রত্যয়-ভাবনা তেমন নেই। রবির নাটকে কেন কচ শুধু বরই দেয়, অভিশাপ নয়! এখানেই রবির বোধ খুঁজতে হবে, তিন তিনবার রাক্ষসের হাত থেকে দেবযানী কচকে উদ্ধার করে। কচের প্রতি তার প্রেম স্নেহ ও অধিকারবোধ প্রবল। তখন প্রায় হঠাৎ কচ বিদায় নিতে চাইলে আবেগ বিগলিত হয়ে বেদযানী নিবেদন করে প্রেম। প্রেমের শক্তিতে কচকে বাঁধতে চায়। কচ নিষ্ঠ ব্রাহ্মণ, স্বর্গের প্রতিশ্রুতি মতে তাকে ফিরে যেতেই হবে। তখন মানবীয় অনুভূতির অভিঘাতে অভিশাপ নয়, বরই মাত্র উচ্চারণ করতে পারে। হৃদয়ে প্রেমের আলোড়নও তার সত্য, বলছে সেই রত্নময় প্রেমানুভূতির কথা।

“আর যাহা আছে তাহা প্রকাশের নয়

সখী। বহে যাহা মর্মমাঝে রঙ্গময়

বাহিরে তা কেমনে দেখাব।”

                               (বিদায় অভিশাপ)

অভিশাপ উচ্চারণ করে কচ নিজের প্রেমকে অপমানিত করতে পারে না। দেবযানীর অভিশাপ আকস্মিক আঘাতের উচ্চারণ। তাছাড়া, মনে রাখতে হবে, ‘বিদায় অভিশাপ’ কোনো মহাকাব্য নয়, মহাকাব্যের নির্মোহ বৈশিষ্ট্য এর প্রয়োজন নেই। বিশাল মহাভারতের ক্ষুদ্র খণ্ড, একটি ঘটনা মাত্র। অন্যদিকে কচের যে গভীরতর উদ্দেশ্য নিয়ে সঞ্জীবনী মন্ত্র শিখতে এসেছিল সেই উদ্দেশ্য ও কর্তব্যের প্রতি অবিচল আস্থা তার চরিত্রের গৌরব; ব্যক্তিগত আবেগ অনূভূতির বশ্যতায় অঙ্গীকার রক্ষার দায় উপেক্ষা করতে পারে না। মহাভারতে কচও অভিশাপ বর্ষণ করে, কারণ ওই গল্পের আরও বহু সম্প্রসারিত রূপ আছে। মহাভারতে কচের অভিশাপে ব্রাহ্মণ পুত্র নয়, যদু বংশে দেবযানীর বিয়ে হয়, সেই বংশেই পরে জন্ম নেন শ্রীকৃষ্ণ। ব্যাসদেব কচকে দিয়ে অভিশাপের পিছনে এই উদ্দেশ্যও জড়িয়ে ছিল হয়তো।

জ্যোতি মুগ্ধ হন, বাহ্ পণ্ডিতবর, আপনি ধৃতরাষ্ট্রের ভাষ্যকার ছিলেন, অবলীলায় আপনি ব্যাসদেব ও রবির যৌক্তিক ভাষ্যকার হয়ে উঠলেন, আজকালের অভিজ্ঞ সাহিত্য-আলোচকদের মতো।

সঞ্জয়ের ঠোঁট ঘিরে হাসি, প্রশংসায় তারও পুলক হয় বৈকি। সঞ্জয় বলেন, রবি জীবনে মেয়েদের নিয়ে অনেক লিখেছেন, এবং তা কলিকালের পাঠক ভাবুকদের হাতে অন্য যে কোনো বিষয়ের তুলনায় এই নারী ভাবনা নিয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছেন। এমনকি ঘোর কলিকালে পূর্বদেশের একজন অধ্যাপক রবিকে ‘নারীর শত্রু’ বলে সারগর্ভ প্রবন্ধ লিখেছে। তবে এসব কিছু নয়, কালের কষ্টি পাথরে কবি যাচাই হয়ে গেছে। আর কোনো কবিকে এমন করে নয় যেভাবে ওই ঘোর কলির মানুষই রবিকে ভক্তির সঙ্গে চর্চা করে। দিনে দিনে রবির সব লেখা পড়া হবে, ওর ঔজ্জ্বল্য বাড়বে। তুমি নিশ্চয় ওর হিন্দুবিবাহ প্রবন্ধটি পড়বে। কী বিতর্ক, রবিকে গোড়া হিন্দুরা খুব করে সমালোচনা করল। কেন? সময়ের অগ্রবর্তী ভাবনার ভয়ে ধর্মবন্দি মানুষগুলো অস্বস্তিতে পড়েছে বলেই তো। রবির নিজের জীবনের কিছু স্ববিরোধিতার কথাও ওঠে।

জ্যোতি সঞ্জয়কে থামিয়ে বলেন, বিতর্ক হয়তো আরও বেধে ছিল ওই রবির কিছু বক্তব্যের সঙ্গে নিজের জীবনের সঙ্গতিহীনতার জন্য। স্ববিরোধিতার কথা ওরা জোর গলায় বলেছে নিশ্চয়।

শোনো জ্যোতি, স্ববিরোধী বৈশিষ্ট্য একটি মানবীয় বৈশিষ্ট্য, ইতর প্রাণির ভিতর হয়তো স্ববিরোধিতা নেই। সময়ের বিভিন্ন অভিঘাতের সঙ্গে মানুষকে সমঝোতা করতে হয়, মানুষই দ্বান্দ্বিক জীব, আর কেউ নয়, স্বর্গের দেবতারাও নয়। সে কারণে এর থেকে মানুষ মাত্র এড়াতে পারে না। সমালোচকদের মধ্যে প্রধান সেই চন্দ্রনাথ বসু কি স্ববিরোধী নন, তিনি রবির কবিতার ভূয়সি প্রশংসা করে তার গদ্য ভাবনার তীব্র নিন্দা করতে বসল। রবির কাব্যেও তো যুক্তি ও নতুন কালের বাণী আছে। তোমাকে আর একটা কথা বলি, কালে কালে রবীন্দ্রনাথের অনেক নিন্দা হয়, আবার গুণগ্রাহী ভক্তরা ওই নারী ভাবনার প্রচুর প্রশংসা করছে। অথচ দুই পক্ষের কাউকেই দেখিনি হিন্দুবিবাহ থেকে রবির মতকে দলিল হিসেবে সামনে আনছে। এই প্রবন্ধে রবি ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির বা মনুর তীব্র সমালোচনা করছেন নারী নিন্দা করার জন্য, আবার বিজ্ঞান, সময়ের দাবি ও কল্যাণ চিন্তা থেকে বিবাহ বিশেষ করে নারীদের বিবাহ নিয়ে অত্যন্ত বিজ্ঞাননির্ভর যুক্তি দিয়েছেন, বৈজ্ঞানিকের মতকে নিজের পক্ষের যুক্তির সঙ্গে যুক্ত করেই সব বলছেন।

জ্যোতি আবার কথা বলেন, কিন্তু পণ্ডিতবর অন্যের জন্য এক ব্যবস্থা নিজের জন্য আর একরকম হলে কথা বলতেই পারে। সঞ্জয়ের কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা, জ্যোতি তুমি বিয়ে করেছিলে নয় বছরের বালিকাকে, শোনো লেখক তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ফেরি করে চলে না, সবার জন্য পরের কালের জন্য তার রচনারাজিই থাকে। লেখকের রচনাই কথা বলে, ঘরের একান্ত জীবন নয়। লেখক রচনা প্রকাশ করেন সবার জন্য, জীবনটা শুধু তার নিজের, ব্যক্তিগত। যাইহোক, সেটা খুব কথা নয়, রবি প্রচুর লেখাতেই নারীর জীবন নিয়ে যে ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে তা কালে মনে করি যুক্তির সঙ্গেই সমালোচিত হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু জীবনটা তো কালো সাদা নয়, তার অনেক রকম বৈচিত্র্য ও মাত্রা আছে। তাই নিন্দা বচনের মধ্যেও প্রাপ্য প্রশংসাটুকু করতে হবে। সেই সময় ওর মতো ব্যক্তি খুব ঝুঁকি নিয়েই মহাভারত ও মনুর সমালোচনা করেছেন। রবির সব কথাই পাঠ ও মুদ্রণ হয়ে যায়, আলোড়িত করে। তোমাকে হিন্দুবিবাহ থেকে রবির কথাই বলছি, ‘মনুসংহিতায় স্ত্রীনিন্দাবাচক যে-সকল শ্লোক আছে তাহা উদ্ধৃত করিতে লজ্জা ও কষ্ট বোধ হয়। যাঁহারা জানিতে চাহেন তাঁহারা মনুসংহিতার নবম অধ্যায়ে চতুর্দশ পঞ্চদশ ও ষোড়শ শ্লোক পাঠ করিবেন...


সঞ্জয়ের কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা, রবির প্রতি আবেগ। জ্যোতি চুপ করে থাকেন, না হলে বলতেন, হিন্দুবিবাহ, বা আরও দু-একটি রচনা ব্যতিক্রম হিসেবেই অন্যরা দেখেন হয়তো, প্রবন্ধ গল্প কবিতায় সবিস্তারে যে নারী— তার সমালোচনা রবিকে হয়তো সইতে হবে, তবে কবি শিল্পী রবি অপ্রতিরোধ্য।


গান্ধারী

সঞ্জয় মহাভারতের গান্ধারীর প্রসঙ্গ তুলে বলেন, গান্ধারী মহাভারতের এমন একজন, যার মধ্য দিয়ে এই মহাকাব্যই পূর্ণ হয়, মহাকাব্যিক বৈশিষ্ট্যের সফলতা আসে। গান্ধারীর ব্যক্তিত্বের দ্বান্দ্বিকতা, এবং চরিত্রের পূর্ণ বিকাশ কাব্যটিকে ভিন্নমাত্রা দেয়। লক্ষ্য কর অন্ধ স্বামীর প্রতি তাঁর প্রেম ও ভক্তি অপার, নিজের দুই চোখ বেঁধে রাখেন নিজের দৃষ্টিশক্তি দিয়ে স্বামীর দৃষ্টি অক্ষমতাকে ছোট করতে চান না। ব্যাসদেবের বরে দিব্যসৃষ্টি অর্জন করেন।

গান্ধার দেশের রাজা সুবলের সুন্দরী শিক্ষিত কন্যা গান্ধারী যুদ্ধ, রাজনীতি, সন্তানদের বিষয়ে স্বামী ধৃতরাষ্ট্রের মুখ্য উপদেশক। একদিকে পুত্র দুর্যোধন, দুঃশাসন, দুঃসহ প্রমুখের অন্যায় আচরণের জন্য ক্ষমাহীন, পুত্রদের পক্ষে আশীর্বাদ করতেও অপারগ, অন্যদিকে পুত্রদের প্রতি স্নেহে কাতরতা। পুত্রদের প্রতি ধৃতরাষ্ট্রের অক্ষমতার জন্য গান্ধারী ধৃতরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করছেন, পুত্র দুর্যোধনকে বর্জনের জন্য স্বামীর প্রতি আবেদন করছেন, অন্যদিকে স্বামীর প্রতি আনুগত্যের শেষ নেই। আবার দেখো অন্যায় যুদ্ধে ও পাণ্ডবদের প্রতি অন্যায় আচরণের জন্য গান্ধারী দুর্যোধনের ওপর ক্ষুদ্ধ, অন্যদিকে পাণ্ডবদের হাতে দুর্যোধনসহ তার শত পুত্র নিহত হওয়ার জন্য কান্নায় বিলাপ করছেন, এমনকি যুধিষ্ঠিরকে অভিশাপ দিতেও কুণ্ঠিত হন না। মহাকাব্যের মহা দ্বন্দ্বিকতা মুখ্যত গান্ধারীর ভিতর দিয়েই সফল হয়ে ফুটে ওঠে। আর রবি ‘গান্ধারীর আবেদন’ (১৩০৪) কাহিনী কাব্যে এই মহিয়সী নারীর পূর্ণ রূপটিকে অল্প পরিসরে কী অসাধারণ নির্মাণ করে ফেলেন। ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি বিশেষ আবেদন পুত্রকে বর্জন কর, নাথ-এর কাছে অনুনয়, ‘ত্যাগ করো এইবার।’ ধৃতরাষ্ট্র যেন বুঝতে পারেন না, সহসা পুত্রকেই ত্যাগ করতে বলছে গান্ধারী!

ধৃতরাষ্ট্র : কারে হে মহিষী

গান্ধারী : পাপের সংঘর্ষে যার / পড়িছে ভীষণ শাপ ধর্মের কৃপাণে সেই মূঢ়ে।

পুত্র দুর্যোধনকে ত্যাগ করার আবেদনে ধৃতরাষ্ট্র যেন অবাক হয়।

ধৃতরাষ্ট্র : দারুণ প্রার্থনা, হে গান্ধারী রাজ মাতা!

গান্ধারী তার আবেদনের পক্ষে স্বর্গবাসী কুরুকুল পিতৃপিতামহের কথা জানায়। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র পুত্রের অন্যায় আচরণের কথা যেনেও যেমন পুত্রের পক্ষেই অবলম্বন করে এসেছে, এখনো পুত্রের পক্ষে ধর্মের দোহায় দিয়ে বলে,

ধৃতরাষ্ট্র : ধর্ম তারে করিবে শাসন

ধর্মরে যে লঙ্ঘন করেছে— আমি পিতা।

মাতা গান্ধারী বিগলিত কণ্ঠে জানায়,

গান্ধারী : মাতা আমি নহি? গর্ভভারজর্জরিতা

জাগ্রত হৃৎপিণ্ডতলে বহি নাই তারে?

স্নেহ বিগলিত চিত্ত শুভ্র দুগ্ধধারে

উচ্ছ্বসিয়া উঠে নাই দুই স্তন বাহি

...   ...   ...

           দুই ক্ষুদ্র বাহুবৃন্ত দিয়ে— লয়ে টানি

মোর হাসি হতে হাসি, বাণী হতে বাণী,

প্রাণ হতে প্রাণ, তবু কহি, মহারাজ,

সেই পুত্র দুর্যোধনে ত্যাগ করো আজ।

গান্ধারীর আবেদন আরও জোরালো হয়ে ওঠে, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রত্যাগ অসম্মতি ঘোচে না, গান্ধারীর গলায় আবেগ, পুত্রস্নেহ সত্ত্বেও ন্যায়ের জন্য পুত্রত্যাগে নিবেদন করে যেতে থাকে—

গান্ধারী :...মহারাজ, শুন মহারাজ,

এ মিনতি। দূর কর জননীর লাজ,

বীরধর্ম করহ উদ্ধার, পদাহত

সতীত্বের ঘুচাও ক্রন্দন; অবনত

ন্যায়ধর্মে করহ সম্মান— ত্যাগ করো

দুর্যোধনে।

পণ্ডিতবর সঞ্জয় অনর্গল বলে চলেন, জ্যোতি চোখে বিস্ময় ও আলো ফুটিয়ে শুনে যায়— দুর্যোধনও এই রবির কাব্যে অল্প কিছু চরণে নিজের চাপা ক্ষোভ অভিমান প্রকাশ করে যেমন, তেমন, এই অন্যায় যুদ্ধে সে নিজের পক্ষে যুক্তি দেওয়ারও সুযোগ করে নেয়, রবির ভাষা ও কাব্য এখানে দারুণ- পুরাণ থেকে বের হয়ে যুক্তির প্রয়াস পায়। দুর্যোধন পিতা ধৃতরাষ্ট্রকে নিজের মনের কথা বলে,

দুর্যোধন : সুখ চাহি নাই, মহারাজ।

জয়, জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ।

ক্ষুদ্র সুখে ভরে নাকো ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধা

কুরুপতি দীপ্তজ্বালা অগ্নিঢালা সুধা

জয়রস, ঈর্ষাসিন্ধু মন্থন সঞ্জাত,

সদ্য করিয়াছি পান : সুখী নহি তাত,

অদ্য আমি জয়ী। পিতঃ, সুখে ছিনু যবে

একত্রে আছিনু বদ্ধ পাণ্ডবে কৌরবে,

কলঙ্ক যেমন থাকে শশাঙ্কের বুকে

কর্মহীন গর্বহীন দীপ্তিহীন সুখে।

...   ...   ...

           সুখে ছিনু, পাণ্ডবেরা জয়দৃপ্ত ক’রে

ধরিত্রী দোহন করি ভ্রাতৃপ্রীতিভরে

দিত অংশ তায়— নিত্য নব ভোগসুখে

...   ... ...

সুখে ছিনু পাণ্ডবের জয়ধ্বনি যবে

হানিত কৌরবকর্ণ প্রতিধ্বনি রবে।

পাণ্ডবের গৌরব তলে স্নিগ্ধশান্ত রূপে

হেমন্তের ভেক যথা জড়ত্বের কূপে।

দুর্যোধনের চমকে যাওয়ার মতো অসাধারণ চরণ পড়, মহাভারতের নয় রবির—

           ‘ক্ষুদ্র নহে ঈর্ষা সুমহতী।

           ঈর্ষা বৃহতের ধর্ম।’

এতে রয়েছে প্রচলিত ধারণার বাইরে লুকিয়ে থাকা কঠিন এক সত্য।

সঞ্জয় স্মৃতিতাড়িত, ধৃতরাষ্ট্রের সারথি এবং দূত হয়ে এই দুর্যোধন ও যুধিষ্ঠিরকে কত বুঝিয়েছেন, যুদ্ধ ধ্বংস করবে, সন্ধি সমঝোতা করো। সঞ্জয়ের চোখ আকাশে, আকাশের নক্ষত্ররাজি স্থির, শুধু আলো বিকরণ করে যায়, বলেন, সত্যি জ্যোতি, রবির এই কাব্য পড়ার আগে আমিই কি কখনো দুর্যোধনের আত্মভিমান, কষ্টের কথা এইভাবে ভেবেছি! সবল সক্ষম যোদ্ধা কৌরব অপর আত্মীয়দের শুধু বিজয় ও গৌরব শুনে, তাদের অর্জিত ফলের অংশ ভোগ ক’রে জীবন কাটিয়ে দিবে! কৌরবের শৌর্য বীর্যের এতে সম্মান রক্ষা হয়? ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে অন্যায়ভাবে হলেও রাজ্য দখলের মানসিক চাপ কৌরবের মনে দানা বেঁধেছে এ-কথা কি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ ভেবেছিলেন! রবির ‘গান্ধারীর আবেদন’ পড়ে একদিকে মহিষী নারীর মহাকাব্যতুল্য সম্পূর্ণরূপ, অন্যদিকে পুত্রদের প্রতি  স্নেহে কাতর দুর্বলতা ও দুর্যোধনের মানসিক অবস্থা চোখের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে। শর্তানুযায়ী বারো বৎসর বনবাস এবং এক বৎসর অজ্ঞাতবাসের পর যখন পাণ্ডবেরা নিজেদের রাজ্য ফিরে পেতে বা পুনঃ উদ্ধারের জন্য হস্তিনাপুরে দূত পাঠায়, তখন মা গান্ধারী, এই আমি এমনকি শ্রীকৃষ্ণ মিলে চেষ্টা করেছি দুর্যোধনকে সন্ধির জন্য রাজি করাতে। দুর্যোধন সন্ধির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে। গান্ধারী আশীর্বাদ প্রার্থী দুর্যোধনকে বলে, ‘যতো ধর্ম স্ততো জয়ঃ।’ অর্থাৎ যেখানে ধর্ম সেখানেই জয়। গান্ধারী পুত্রকে আগেই বুঝিয়েছিল ধর্মহীন ঐশর্যপ্রাপ্তির চেষ্টা পরিণামে মৃত্যু আনায়ন করে। রবির কাব্য পড়ে, আমি বোধহয় প্রথম ভাবতে পারি যে, ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর পুত্র হয়েও দুর্যোধন যুদ্ধের জন্য এত মরিয়া হয়ে উঠল কেন? কোনো বোধই কাজ করছে না। একদিকে একদা আত্ম-অবমাননার প্রতিশোধ আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে মামা শকুনিগংদের মন্ত্রণা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সব দায় ও নিষ্ঠুরতার জন্য আমি শুধু দুর্যোধনকে দায়ী করি না। রবির কাব্য দুর্যোধনকে বুঝতে সাহায্য করে মহাভারতের আখ্যান থেকে গান্ধারীর আবেদন কাব্যে আখ্যানের কোনো পরিবর্তন না ঘটালেও রবির কাব্য শক্তি ওই আখ্যানকে বহুস্তরে, মনোজগতে আলো ফেলে, রস-আনন্দের সঙ্গে সঙ্কট অনুধাবনের সুযোগ করে দেয়।

জ্যোতি বলেন, পণ্ডিতবর আপনি কি বিশ্রাম নিবেন, রাত্রির বেশি বাকি নেই। সঞ্জয়ের মুখে হাসি, আমি কি আর মর্তের নশ্বর দেহে তৈরি, কাব্যের সৃষ্টি আমি, স্বর্গবাসী সঞ্জয়ের শরীরে কেন ক্লান্তি আসবে! এই মর্তে আমার অভিলাষের কথা তুমি জানো, তোমাকে এও আমি দেখিয়ে দিব, কেন সহস্র বছরের কবিদের মধ্যে রবির মধ্যে সেই শক্তি আমি দেখেছি যে পারে আমার অভিলাষ পূর্ণ ক’রে একটি নব্য সঞ্জয় পুরাণ সৃষ্টি করতে! প্রকৃত কবি স্বাধীন, প্রয়োজন মতো পুরাণের ভিতর নতুন পৌরাণিক তৈরি করে নিবে; কাব্যগুণ ও শব্দের অশেষ সম্ভাবনাকে নতুন নতুন মাত্রায় রবি সম্ভব করে তুলছে। (সমাপ্ত) 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত