ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ রোগে কী খাওয়া যাবে আর কী যাবে না-এ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা ভুল ধারণা। কেউ মনে করেন, কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, আবার কেউ মনে করেন মিষ্টি খেলেই ডায়াবেটিস হয়। এসব ধারণার কারণে অনেক সময় রোগীরা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাবার বাদ দিয়ে ফেলেন কিংবা ভুল খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।
কিটো ডায়েটেই মিলবে সমাধান-এ ধারণা ঠিক নয়
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কিটো ডায়েট নিয়ে আগ্রহ রয়েছে অনেকের। কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ খুব কম থাকায় এ ধরনের খাদ্যাভ্যাসে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে তাই বলে দীর্ঘমেয়াদে সবার জন্য কিটো ডায়েট উপযোগী-এমনটি নয়।
কিটো ডায়েটে সাধারণত চর্বি বেশি এবং কার্বোহাইড্রেট খুব কম থাকে। দীর্ঘদিন এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে প্রয়োজনীয় কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বিপাকক্রিয়ায়ও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি লিভার বা কিডনির সমস্যা থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস শুরু করা উচিত নয়।
শুধু মিষ্টি খেলেই ডায়াবেটিস হয় না
‘বেশি মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হয়’-এ ধারণাটিও পুরোপুরি সঠিক নয়। ডায়াবেটিসের পেছনে বংশগত প্রবণতা, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও খাদ্যাভ্যাসসহ একাধিক বিষয় ভূমিকা রাখে।
তবে মিষ্টি ও অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার নিয়মিত বেশি খেলে ওজন বাড়ার ঝুঁকি থাকে। অতিরিক্ত ওজন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই মিষ্টিকে সরাসরি একমাত্র কারণ না ভাবলেও অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরিযুক্ত খাবার সীমিত রাখা জরুরি।
রক্তে শর্করা কমলেই নিয়ম করে মিষ্টি খেতে হবে?
ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে আরেকটি ভুল ধারণা হলো, মাঝেমধ্যে মিষ্টি না খেলে রক্তে শর্করা হঠাৎ কমে যেতে পারে। বাস্তবে নিয়ম করে মিষ্টি খাওয়া হাইপোগ্লাইসেমিয়া প্রতিরোধের কোনো উপায় নয়।
বরং রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে দ্রুত শর্করাজাতীয় খাবার বা পানীয় প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে যারা ইনসুলিন বা নির্দিষ্ট ধরনের ডায়াবেটিসের ওষুধ ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
ডাল ও বীজ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই
ডায়াবেটিস হয়েছে বলে ডাল, বাদাম বা বিভিন্ন বীজজাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এসব খাবার উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টি উপাদানেরও উৎস। পরিমাণ ও খাবারের ধরন ঠিক রেখে এগুলো খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
তবে ডায়াবেটিসের সঙ্গে কিডনির সমস্যা থাকলে প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত।
মায়ের ডায়াবেটিস থাকলেও বুকের দুধ দেওয়া যায়
মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে শিশুকে বুকের দুধ দেওয়া যাবে না-এ ধারণাও ঠিক নয়। সাধারণভাবে ডায়াবেটিস থাকা মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। শিশুর প্রথম ছয় মাসের পুষ্টির জন্য মায়ের বুকের দুধ গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মায়ের নিজের স্বাস্থ্য ও ওষুধ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মা ও শিশুর জন্য উপযুক্ত খাদ্য ও চিকিৎসা পরিকল্পনা অনুসরণ করাই নিরাপদ।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সবার জন্য একই ধরনের খাদ্যতালিকা কার্যকর নয়। বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা, ওষুধ এবং অন্যান্য রোগের উপস্থিতি বিবেচনায় খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণ করা উচিত। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ রোগে কী খাওয়া যাবে আর কী যাবে না-এ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা ভুল ধারণা। কেউ মনে করেন, কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, আবার কেউ মনে করেন মিষ্টি খেলেই ডায়াবেটিস হয়। এসব ধারণার কারণে অনেক সময় রোগীরা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাবার বাদ দিয়ে ফেলেন কিংবা ভুল খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।
কিটো ডায়েটেই মিলবে সমাধান-এ ধারণা ঠিক নয়
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কিটো ডায়েট নিয়ে আগ্রহ রয়েছে অনেকের। কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ খুব কম থাকায় এ ধরনের খাদ্যাভ্যাসে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে তাই বলে দীর্ঘমেয়াদে সবার জন্য কিটো ডায়েট উপযোগী-এমনটি নয়।
কিটো ডায়েটে সাধারণত চর্বি বেশি এবং কার্বোহাইড্রেট খুব কম থাকে। দীর্ঘদিন এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে প্রয়োজনীয় কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বিপাকক্রিয়ায়ও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি লিভার বা কিডনির সমস্যা থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস শুরু করা উচিত নয়।
শুধু মিষ্টি খেলেই ডায়াবেটিস হয় না
‘বেশি মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হয়’-এ ধারণাটিও পুরোপুরি সঠিক নয়। ডায়াবেটিসের পেছনে বংশগত প্রবণতা, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও খাদ্যাভ্যাসসহ একাধিক বিষয় ভূমিকা রাখে।
তবে মিষ্টি ও অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার নিয়মিত বেশি খেলে ওজন বাড়ার ঝুঁকি থাকে। অতিরিক্ত ওজন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই মিষ্টিকে সরাসরি একমাত্র কারণ না ভাবলেও অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরিযুক্ত খাবার সীমিত রাখা জরুরি।
রক্তে শর্করা কমলেই নিয়ম করে মিষ্টি খেতে হবে?
ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে আরেকটি ভুল ধারণা হলো, মাঝেমধ্যে মিষ্টি না খেলে রক্তে শর্করা হঠাৎ কমে যেতে পারে। বাস্তবে নিয়ম করে মিষ্টি খাওয়া হাইপোগ্লাইসেমিয়া প্রতিরোধের কোনো উপায় নয়।
বরং রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে দ্রুত শর্করাজাতীয় খাবার বা পানীয় প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে যারা ইনসুলিন বা নির্দিষ্ট ধরনের ডায়াবেটিসের ওষুধ ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
ডাল ও বীজ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই
ডায়াবেটিস হয়েছে বলে ডাল, বাদাম বা বিভিন্ন বীজজাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এসব খাবার উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টি উপাদানেরও উৎস। পরিমাণ ও খাবারের ধরন ঠিক রেখে এগুলো খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
তবে ডায়াবেটিসের সঙ্গে কিডনির সমস্যা থাকলে প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত।
মায়ের ডায়াবেটিস থাকলেও বুকের দুধ দেওয়া যায়
মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে শিশুকে বুকের দুধ দেওয়া যাবে না-এ ধারণাও ঠিক নয়। সাধারণভাবে ডায়াবেটিস থাকা মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। শিশুর প্রথম ছয় মাসের পুষ্টির জন্য মায়ের বুকের দুধ গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মায়ের নিজের স্বাস্থ্য ও ওষুধ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মা ও শিশুর জন্য উপযুক্ত খাদ্য ও চিকিৎসা পরিকল্পনা অনুসরণ করাই নিরাপদ।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সবার জন্য একই ধরনের খাদ্যতালিকা কার্যকর নয়। বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা, ওষুধ এবং অন্যান্য রোগের উপস্থিতি বিবেচনায় খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণ করা উচিত। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

আপনার মতামত লিখুন