নিখোঁজ হওয়ার পর কেটে গেছে ১০ দিন। স্বজনরা তাঁর বেঁচে থাকার আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে অষ্টম দিনে খড় দিয়ে তার কুশপুত্তলিকা বানিয়ে পারলৌকিক ক্রিয়াও শুরু করেছিল পরিবার। কিন্তু ১১তম দিনে ঘটল সেই অলৌকিক ঘটনা। কাদা আর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে সেই বৃদ্ধাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু তিনি নন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকেও উদ্ধার করা হয়েছে আরও কয়েকজনকে। নেপালের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় এই ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক উদ্ধারগুলো এখন নিখোঁজ ৫ হাজার মানুষের স্বজনদের মনে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
নুয়াকোট জেলার বেত্রাবতী এলাকার বাসিন্দা ৬৪ বছর বয়সী চান্দিকা শ্রেষ্ঠা গত ২৬ আগস্ট থেকে নিখোঁজ ছিলেন। ভোরে ভোটকোশি নদীর অববাহিকায় ধেয়ে আসা আকস্মিক বন্যা আর ভূমিধসে নিমিষেই বিলীন হয়ে গিয়েছিল পুরো বসতি। চান্দিকার সঙ্গে নিখোঁজ হয়েছিলেন তার পরিবারের আরও চার সদস্য। দীর্ঘ ১০ দিন তাঁর কোনো সন্ধান না মেলায় পরিবারের সদস্যরা ধরে নিয়েছিলেন তিনি আর বেঁচে নেই। সনাতন ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচার পালন করা হচ্ছিল। কিন্তু শনিবার হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় কর্দমাক্ত একটি বিধ্বস্ত বাড়ি থেকে এক বৃদ্ধাকে বের করে আনছেন উদ্ধারকর্মীরা।
চান্দিকার স্বজন রমেশ মান শ্রেষ্ঠা বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে যখন খবর এল একজন বৃদ্ধাকে পাওয়া গেছে, আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। হাসপাতালে গিয়ে তাকে দেখার পর নিজেদের চোখকেও বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।’
চান্দিকার বেঁচে ফেরাটা ছিল স্রেফ ভাগ্যের খেলা। শনিবার সকালে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (এপিএফ) একটি দল রাস্তা পরিষ্কারের কাজ করার সময় মাটির নিচ থেকে একটি ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। এপিএফ পরিদর্শক সুমন বিকে জানান, ‘এর আগে আমরা ঠিক এই জায়গাতেই তল্লাশি চালিয়েছিলাম, কিন্তু তখন কোনো শব্দ পাওয়া যায়নি। আজ যাওয়ার সময় গোঙানির শব্দ শুনে আমরা কাদা সরাতে শুরু করি।’
জানালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের পর উদ্ধারকর্মীরা দেখেন, চারতলা বাড়িটির সাড়ে তিন তলাই কাদার নিচে দেবে গেছে। কোনোমতে ভেতরে ঢুকে বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুর বীরেন্দ্র হাসপাতালে পাঠায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল।
চান্দিকার উদ্ধারের একদিন আগেই শুক্রবার আপার ত্রিশূলি-৩এ প্রকল্পের ১৭০ মিটার গভীর সুড়ঙ্গ থেকে সঞ্জয় শাহ ও কবির মহরজন নামের দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। টানেল বা সুড়ঙ্গ বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্স জানিয়েছেন, মাটির নিচে বা সুড়ঙ্গে মানুষ প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে।
শনিবার রসুয়া জেলার আপার ত্রিশূলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকেও লু হাইতাও নামের এক চীনা নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করেছে নেপালি সেনাবাহিনী। ২২৫ মিটার গভীর সুড়ঙ্গে ১১ দিন আটকে থাকার পর তিনি বের হতে সক্ষম হন। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলা এই চীনা নাগরিক মোবাইলের ট্রান্সলেশন অ্যাপের মাধ্যমে উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
নেপালের গত এক দশকের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বন্যায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৩৮ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ। রসুয়া জেলার বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেই নিখোঁজের সংখ্যা অন্তত এক হাজার।
বিপর্যয়ের সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে চান্দিকার ভগ্নিপতি ঈশ্বরী লাল শ্রেষ্ঠা বলেন, ‘মনে হচ্ছিল বিশাল কোনো ভূমিকম্প হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি কাগজের নৌকার মতো ভেসে গেল। আমার স্ত্রী সুষমা চোখের সামনেই হারিয়ে গেল, কিছুই করতে পারলাম না।’
বর্তমানে নেপালের বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত জেলায় সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর মোট ২১ হাজার ৪৬৫ জন সদস্য তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানে নিয়োজিত রয়েছেন। কাদার নিচ থেকে এই অলৌকিক উদ্ধারগুলো উদ্ধারকর্মীদের আরও উদ্যমী করে তুলেছে। তাদের বিশ্বাস, প্রতিকূলতার মাঝেও হয়তো এখনো কোথাও প্রাণের স্পন্দন বাকি আছে।
সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট
/

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিখোঁজ হওয়ার পর কেটে গেছে ১০ দিন। স্বজনরা তাঁর বেঁচে থাকার আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে অষ্টম দিনে খড় দিয়ে তার কুশপুত্তলিকা বানিয়ে পারলৌকিক ক্রিয়াও শুরু করেছিল পরিবার। কিন্তু ১১তম দিনে ঘটল সেই অলৌকিক ঘটনা। কাদা আর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে সেই বৃদ্ধাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু তিনি নন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকেও উদ্ধার করা হয়েছে আরও কয়েকজনকে। নেপালের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় এই ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক উদ্ধারগুলো এখন নিখোঁজ ৫ হাজার মানুষের স্বজনদের মনে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
নুয়াকোট জেলার বেত্রাবতী এলাকার বাসিন্দা ৬৪ বছর বয়সী চান্দিকা শ্রেষ্ঠা গত ২৬ আগস্ট থেকে নিখোঁজ ছিলেন। ভোরে ভোটকোশি নদীর অববাহিকায় ধেয়ে আসা আকস্মিক বন্যা আর ভূমিধসে নিমিষেই বিলীন হয়ে গিয়েছিল পুরো বসতি। চান্দিকার সঙ্গে নিখোঁজ হয়েছিলেন তার পরিবারের আরও চার সদস্য। দীর্ঘ ১০ দিন তাঁর কোনো সন্ধান না মেলায় পরিবারের সদস্যরা ধরে নিয়েছিলেন তিনি আর বেঁচে নেই। সনাতন ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচার পালন করা হচ্ছিল। কিন্তু শনিবার হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় কর্দমাক্ত একটি বিধ্বস্ত বাড়ি থেকে এক বৃদ্ধাকে বের করে আনছেন উদ্ধারকর্মীরা।
চান্দিকার স্বজন রমেশ মান শ্রেষ্ঠা বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে যখন খবর এল একজন বৃদ্ধাকে পাওয়া গেছে, আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। হাসপাতালে গিয়ে তাকে দেখার পর নিজেদের চোখকেও বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।’
চান্দিকার বেঁচে ফেরাটা ছিল স্রেফ ভাগ্যের খেলা। শনিবার সকালে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (এপিএফ) একটি দল রাস্তা পরিষ্কারের কাজ করার সময় মাটির নিচ থেকে একটি ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। এপিএফ পরিদর্শক সুমন বিকে জানান, ‘এর আগে আমরা ঠিক এই জায়গাতেই তল্লাশি চালিয়েছিলাম, কিন্তু তখন কোনো শব্দ পাওয়া যায়নি। আজ যাওয়ার সময় গোঙানির শব্দ শুনে আমরা কাদা সরাতে শুরু করি।’
জানালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের পর উদ্ধারকর্মীরা দেখেন, চারতলা বাড়িটির সাড়ে তিন তলাই কাদার নিচে দেবে গেছে। কোনোমতে ভেতরে ঢুকে বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুর বীরেন্দ্র হাসপাতালে পাঠায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল।
চান্দিকার উদ্ধারের একদিন আগেই শুক্রবার আপার ত্রিশূলি-৩এ প্রকল্পের ১৭০ মিটার গভীর সুড়ঙ্গ থেকে সঞ্জয় শাহ ও কবির মহরজন নামের দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। টানেল বা সুড়ঙ্গ বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্স জানিয়েছেন, মাটির নিচে বা সুড়ঙ্গে মানুষ প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে।
শনিবার রসুয়া জেলার আপার ত্রিশূলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকেও লু হাইতাও নামের এক চীনা নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করেছে নেপালি সেনাবাহিনী। ২২৫ মিটার গভীর সুড়ঙ্গে ১১ দিন আটকে থাকার পর তিনি বের হতে সক্ষম হন। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলা এই চীনা নাগরিক মোবাইলের ট্রান্সলেশন অ্যাপের মাধ্যমে উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
নেপালের গত এক দশকের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বন্যায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৩৮ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ। রসুয়া জেলার বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেই নিখোঁজের সংখ্যা অন্তত এক হাজার।
বিপর্যয়ের সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে চান্দিকার ভগ্নিপতি ঈশ্বরী লাল শ্রেষ্ঠা বলেন, ‘মনে হচ্ছিল বিশাল কোনো ভূমিকম্প হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি কাগজের নৌকার মতো ভেসে গেল। আমার স্ত্রী সুষমা চোখের সামনেই হারিয়ে গেল, কিছুই করতে পারলাম না।’
বর্তমানে নেপালের বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত জেলায় সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর মোট ২১ হাজার ৪৬৫ জন সদস্য তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানে নিয়োজিত রয়েছেন। কাদার নিচ থেকে এই অলৌকিক উদ্ধারগুলো উদ্ধারকর্মীদের আরও উদ্যমী করে তুলেছে। তাদের বিশ্বাস, প্রতিকূলতার মাঝেও হয়তো এখনো কোথাও প্রাণের স্পন্দন বাকি আছে।
সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট
/

আপনার মতামত লিখুন