এক কাপ চা, সঙ্গে জমজমাট আড্ডা কক্সবাজারে নতুন নয়। তবে একই দোকানে যদি মেলে মাল্টা, পুদিনাপাতা, তেঁতুল, মধু-লেবু কিংবা কাজুবাদামের স্বাদের চা, তাহলে কৌতূহল জাগাটাই স্বাভাবিক। সেই কৌতূহল থেকেই এখন কক্সবাজার শহরের ঝাউতলায় ভিড় করছেন স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকেরাও।
দোকানটির নাম ‘স্মার্ট চা-ওয়ালা’। ছোট্ট এই দোকানের কর্ণধার মোহাম্মদ নোমান। একসময় সাধারণ চা বিক্রি করেও তেমন ক্রেতা পেতেন না তিনি। পরে চায়ের স্বাদে ভিন্নতা এনে এখন নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। তাঁর দোকানে পাওয়া যায় ভিন্ন স্বাদের ১২ রকমের চা।
কক্সবাজার শহরের ঝাউতলার প্রধান সড়কের পাশে কেন্দ্রীয় সমবায় সুপার মার্কেটের নিচতলায় দোকানটির অবস্থান। সকাল ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সেখানে চলে চা, আড্ডা আর মানুষের আনাগোনা। কেউ চা পান করছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শার্টের ওপর কোট, হাতে গ্লাভস ও মাথায় গেরুয়া ক্যাপ পরে ব্যস্ত হাতে চা তৈরি করছেন নোমান। ছোট্ট দোকানটির সামনে দাঁড়িয়ে ও বসে চা খাচ্ছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। পর্যটকদের কেউ এসেছেন সৈকত ঘুরে, কেউ আবার শহরের অন্য এলাকা থেকে শুধু এই দোকানের চা খেতে।
নোমানের দোকানে সাধারণ চায়ের পাশাপাশি পাওয়া যায় মাল্টা চা, দুধ-কফি মিশ্রিত চা, মিশ্র মসলা চা, গ্রিন টি, পুদিনাপাতা চা, টক-ঝাল বা চিলি চা, মধু-লেবু চা, তেঁতুল চা, ‘আদানি’ চা, কপি চা ও কাজুবাদাম চা।
চায়ের দামও রাখা হয়েছে সাধ্যের মধ্যে। সাধারণ চায়ের দাম ১০ টাকা। মাল্টা, দুধ-কফি মিশ্রিত, মিশ্র মসলা, গ্রিন টি, পুদিনাপাতা ও টক-ঝাল চায়ের দাম ২০ টাকা করে। মধু-লেবু ও তেঁতুল চা ৩০ টাকা। ‘আদানি’ ও কপি চা ৪০ টাকা এবং কাজুবাদাম চায়ের দাম ৫০ টাকা। দোকানের এক পাশে টাঙানো রয়েছে চায়ের মূল্যতালিকা। সেটি দেখে পছন্দের চা বেছে নিচ্ছেন ক্রেতারা।
নোমানের বাড়ি ভোলার বাংকেরহাটের চররমেশ গ্রামে। পৈতৃক সূত্রেই চা বিক্রির সঙ্গে তার পরিচয়। জীবিকার সন্ধানে সাত বছর আগে কক্সবাজারে আসার পর নিজের মতো করে ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন তিনি।
শুরুতে কক্সবাজার শহরের ঝাউতলা গাড়ির মাঠ এলাকায় একটি কুলিং কর্নার চালু করেছিলেন। কিন্তু ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় সেটি বন্ধ করে গ্রামে ফিরে যান। পরে আবার নতুন উদ্যমে কক্সবাজারে ফিরে আসেন।
এবার তিনি পর্যটকদের চাহিদা বোঝার চেষ্টা করেন। শহরের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে তাঁর মনে হয়, পর্যটকদের আড্ডায় চা থাকলেও বেশির ভাগ দোকানে চায়ের স্বাদ প্রায় একই। সেখান থেকেই ভিন্ন স্বাদের চা বিক্রির পরিকল্পনা করেন তিনি।
প্রায় দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করে কেন্দ্রীয় সমবায় সুপার মার্কেটের নিচে একটি ছোট দোকান নেন নোমান। এরপর নতুনভাবে শুরু করেন ব্যবসা। দোকানের নাম দেন ‘স্মার্ট চা-ওয়ালা’। নোমান বলেন, ‘শুরুর দিকে সাধারণ চা বিক্রি করতাম। তেমন বিক্রি হতো না। চায়ে ভিন্নতা আনার পর ক্রেতা বেড়েছে।’
ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সৈকতের কয়েকটি দোকানে চা খেয়েছি। তবে এই দোকানের চা আলাদা। নানা রকম ফল ও মসলার মিশ্রণে চায়ের স্বাদও ভিন্ন।’
চট্টগ্রাম থেকে আসা আরেক পর্যটক বলেন, ‘অনেক জায়গায় চা খেয়েছি। তবে এখানকার চা ব্যতিক্রম লেগেছে। মাল্টা ও পুদিনাপাতার মিশ্রণের এমন স্বাদ আগে পাইনি। তাই সৈকত এলাকা থেকে এত দূর এসেও এখানে চা খেতে এসেছি।’
স্থানীয়রাও নোমানের চায়ের প্রশংসা করেন। কক্সবাজার কেন্দ্রীয় সমবায় সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নোমানের বানানো চা খেলে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে মাঝেমধ্যে এখানে আমরা চা খাই।’
একসময় ব্যবসায় লোকসান করে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন নোমান। সেই জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এখন ‘স্মার্ট চা-ওয়ালা’ নামেই পরিচিত তিনি।
নোমান জানান, সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। এই আয় দিয়েই চলছে তাঁর সংসার। তাঁর সংসারে রয়েছেন মা, স্ত্রী ও ছেলে। ছেলে মাদ্রাসার হিফজ বিভাগে পড়ছে।
ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার বার্তাও ছড়িয়ে দিতে চান নোমান। দোকানের পাশে টাঙানো একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘ধূমপানকে “না” বলুন, সুস্থ জীবন গড়ে তুলুন।’
নোমান বলেন, ‘কুলিং কর্নারে লোকসানের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, এখন মানুষ চা খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ায়। যেদিকে যাই, সবাই স্মার্ট চা-ওয়ালা নামে ডাকে। দোকানে এখন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আড্ডা দেন।’
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসা মানুষের কাছে চা যেন আড্ডারই একটি অংশ। সেই চায়ের স্বাদে নতুনত্ব এনে নোমান তাঁর ছোট্ট দোকানটিকে এখন স্থানীয় ও পর্যটকদের পরিচিত এক আড্ডাস্থলে পরিণত করেছেন। এক কাপ চায়ের সঙ্গে তাই এখানে মিলছে ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতাও।

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এক কাপ চা, সঙ্গে জমজমাট আড্ডা কক্সবাজারে নতুন নয়। তবে একই দোকানে যদি মেলে মাল্টা, পুদিনাপাতা, তেঁতুল, মধু-লেবু কিংবা কাজুবাদামের স্বাদের চা, তাহলে কৌতূহল জাগাটাই স্বাভাবিক। সেই কৌতূহল থেকেই এখন কক্সবাজার শহরের ঝাউতলায় ভিড় করছেন স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকেরাও।
দোকানটির নাম ‘স্মার্ট চা-ওয়ালা’। ছোট্ট এই দোকানের কর্ণধার মোহাম্মদ নোমান। একসময় সাধারণ চা বিক্রি করেও তেমন ক্রেতা পেতেন না তিনি। পরে চায়ের স্বাদে ভিন্নতা এনে এখন নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। তাঁর দোকানে পাওয়া যায় ভিন্ন স্বাদের ১২ রকমের চা।
কক্সবাজার শহরের ঝাউতলার প্রধান সড়কের পাশে কেন্দ্রীয় সমবায় সুপার মার্কেটের নিচতলায় দোকানটির অবস্থান। সকাল ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সেখানে চলে চা, আড্ডা আর মানুষের আনাগোনা। কেউ চা পান করছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শার্টের ওপর কোট, হাতে গ্লাভস ও মাথায় গেরুয়া ক্যাপ পরে ব্যস্ত হাতে চা তৈরি করছেন নোমান। ছোট্ট দোকানটির সামনে দাঁড়িয়ে ও বসে চা খাচ্ছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। পর্যটকদের কেউ এসেছেন সৈকত ঘুরে, কেউ আবার শহরের অন্য এলাকা থেকে শুধু এই দোকানের চা খেতে।
নোমানের দোকানে সাধারণ চায়ের পাশাপাশি পাওয়া যায় মাল্টা চা, দুধ-কফি মিশ্রিত চা, মিশ্র মসলা চা, গ্রিন টি, পুদিনাপাতা চা, টক-ঝাল বা চিলি চা, মধু-লেবু চা, তেঁতুল চা, ‘আদানি’ চা, কপি চা ও কাজুবাদাম চা।
চায়ের দামও রাখা হয়েছে সাধ্যের মধ্যে। সাধারণ চায়ের দাম ১০ টাকা। মাল্টা, দুধ-কফি মিশ্রিত, মিশ্র মসলা, গ্রিন টি, পুদিনাপাতা ও টক-ঝাল চায়ের দাম ২০ টাকা করে। মধু-লেবু ও তেঁতুল চা ৩০ টাকা। ‘আদানি’ ও কপি চা ৪০ টাকা এবং কাজুবাদাম চায়ের দাম ৫০ টাকা। দোকানের এক পাশে টাঙানো রয়েছে চায়ের মূল্যতালিকা। সেটি দেখে পছন্দের চা বেছে নিচ্ছেন ক্রেতারা।
নোমানের বাড়ি ভোলার বাংকেরহাটের চররমেশ গ্রামে। পৈতৃক সূত্রেই চা বিক্রির সঙ্গে তার পরিচয়। জীবিকার সন্ধানে সাত বছর আগে কক্সবাজারে আসার পর নিজের মতো করে ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন তিনি।
শুরুতে কক্সবাজার শহরের ঝাউতলা গাড়ির মাঠ এলাকায় একটি কুলিং কর্নার চালু করেছিলেন। কিন্তু ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় সেটি বন্ধ করে গ্রামে ফিরে যান। পরে আবার নতুন উদ্যমে কক্সবাজারে ফিরে আসেন।
এবার তিনি পর্যটকদের চাহিদা বোঝার চেষ্টা করেন। শহরের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে তাঁর মনে হয়, পর্যটকদের আড্ডায় চা থাকলেও বেশির ভাগ দোকানে চায়ের স্বাদ প্রায় একই। সেখান থেকেই ভিন্ন স্বাদের চা বিক্রির পরিকল্পনা করেন তিনি।
প্রায় দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করে কেন্দ্রীয় সমবায় সুপার মার্কেটের নিচে একটি ছোট দোকান নেন নোমান। এরপর নতুনভাবে শুরু করেন ব্যবসা। দোকানের নাম দেন ‘স্মার্ট চা-ওয়ালা’। নোমান বলেন, ‘শুরুর দিকে সাধারণ চা বিক্রি করতাম। তেমন বিক্রি হতো না। চায়ে ভিন্নতা আনার পর ক্রেতা বেড়েছে।’
ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সৈকতের কয়েকটি দোকানে চা খেয়েছি। তবে এই দোকানের চা আলাদা। নানা রকম ফল ও মসলার মিশ্রণে চায়ের স্বাদও ভিন্ন।’
চট্টগ্রাম থেকে আসা আরেক পর্যটক বলেন, ‘অনেক জায়গায় চা খেয়েছি। তবে এখানকার চা ব্যতিক্রম লেগেছে। মাল্টা ও পুদিনাপাতার মিশ্রণের এমন স্বাদ আগে পাইনি। তাই সৈকত এলাকা থেকে এত দূর এসেও এখানে চা খেতে এসেছি।’
স্থানীয়রাও নোমানের চায়ের প্রশংসা করেন। কক্সবাজার কেন্দ্রীয় সমবায় সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নোমানের বানানো চা খেলে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে মাঝেমধ্যে এখানে আমরা চা খাই।’
একসময় ব্যবসায় লোকসান করে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন নোমান। সেই জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এখন ‘স্মার্ট চা-ওয়ালা’ নামেই পরিচিত তিনি।
নোমান জানান, সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। এই আয় দিয়েই চলছে তাঁর সংসার। তাঁর সংসারে রয়েছেন মা, স্ত্রী ও ছেলে। ছেলে মাদ্রাসার হিফজ বিভাগে পড়ছে।
ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার বার্তাও ছড়িয়ে দিতে চান নোমান। দোকানের পাশে টাঙানো একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘ধূমপানকে “না” বলুন, সুস্থ জীবন গড়ে তুলুন।’
নোমান বলেন, ‘কুলিং কর্নারে লোকসানের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, এখন মানুষ চা খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ায়। যেদিকে যাই, সবাই স্মার্ট চা-ওয়ালা নামে ডাকে। দোকানে এখন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আড্ডা দেন।’
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসা মানুষের কাছে চা যেন আড্ডারই একটি অংশ। সেই চায়ের স্বাদে নতুনত্ব এনে নোমান তাঁর ছোট্ট দোকানটিকে এখন স্থানীয় ও পর্যটকদের পরিচিত এক আড্ডাস্থলে পরিণত করেছেন। এক কাপ চায়ের সঙ্গে তাই এখানে মিলছে ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতাও।

আপনার মতামত লিখুন